আজব বলের রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
দুই
কর্নেলের কথামতো সন্ধে ছ’টা নাগাদ যখন বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তের বাড়ি পৌঁছলুম, দেখি, হালদারমশাই আগেই চলে এসেছেন। যথারীতি এক প্লেট সিন্থেটিক পকৌড়া এবং কফি খেয়ে নস্যিতে নাক জেরবার করে ফেলেছেন। মুখে চাপা উত্তেজনা থমথম করছে। চন্দ্রকান্ত তার ল্যাবে ছিলেন। এসে খুশি-খুশি মুখে বললেন, “সুস্বাগত জয়ন্তবাবু! আপনি মহাকাশ থেকে কিটো গ্রহে পৌঁছেও রেগুলার আপনার দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় রিপোর্ট পাঠাতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হল, আপনাদের কাগজের অফিসের টেলেক্স তা রিসিভ করতে পারবে না। দেখা যাক, যদি কোনো ব্যবস্থা করতে পারি।”
বললুম, “রিপোর্ট পরে হবে চন্দ্রকান্তবাবু! আমরা কিটো গ্রহে যাচ্ছি বললেন। সেটা কোথায়?”
“সেকেন্ডে গ্যালাক্সিতে। তবে ও-নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। গ্রহ ইজ গ্রহ।”
“সেখানে বাতাস আছে তো?”
বিজ্ঞানী হাসলেন, “কয়েকশো টন বাতাস সঙ্গে নিয়ে যাব। আপনি তো আমার এ. জি. এল. যন্ত্রটি দেখেছেন। বাতাসকে চাপ দিয়ে ঘনীভূত করে ফেলব। এ. জি. এল. তার ওজন জিরো করে ফেলবে। ব্যস!”
কোথায় প্রিঁ-প্রিঁ শব্দ হল। চন্দ্রকান্ত বললেন, “ধুন্ধু সন্দেহজনক কিছু দেখেছে। এক মিনিট, আসছি।”
চন্দ্ৰকান্তের এই বাড়িটা দমদম শহরতলি এলাকায় এক টেরে। এলাকাটা গ্রাম বলেই মনে হয়। চারদিকে ঘন গাছপালা। হালদারমশাই সন্দেহজনক শব্দটা কান পেতে শুনে তড়াক করে উঠে বললেন, “বসুন, আসছি।”
বললুম, “ধুন্ধু’র পাল্লায় পড়বেন কিন্তু!”
অমনি গোয়েন্দাপ্রবর বসে পড়লেন। বেজার মুখে বললেন, “হঃ! ওই এক হতচ্ছাড়া! জয়ন্তবাবু, ওই পাজিটাকে যদি সঙ্গে নেন সায়েন্টিস্ট, আমি কিন্তু যাচ্ছি না।”
মনে পড়ল, সেবার চুপিচুপি বিজ্ঞানীর বাড়ি ঢুকতে গিয়ে হালদারমশাইয়ের কী অবস্থা হয়েছিল ধুন্ধু’র হাতে। কিন্তু এমনিতে শ্রীমান ধুন্ধু বেশ খোশমেজাজি রোবট। ইদানীং তাকে চন্দ্রকান্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাচ্ছেন। ধাতব গলায় বেশ গায় সে।
চন্দ্রকান্ত ফিরে এসে বললেন, “ধুন্ধুটা ভিতু হয়ে যাচ্ছে দিনে-দিনে। অন্ধকারে বেড়াল দেখেও চমকে ওঠে।”
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল এসে পড়লেন। ওঁর পিলোব্যাগে প্রজাপতি-ধরা নেটের স্টিক উঁকি মেরে আছে চেনের ফাঁকে। অবাক হয়ে বললুম, “চন্দ্রকান্তবাবু! কিটো গ্রহে প্রজাপতিও আছে নাকি?”
বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ অট্টহাসি হাসলেন। বিজ্ঞানী বললেন, “আহা! চান্স মিস করতে নেই। যদি সত্যিই থাকে? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আমরা কতটুকু জানি মশাই, যাই হোক, আমাদের রেডি হওয়া দরকার। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাইম সিডিউল পেয়েছি সাড়ে সাতটা থেকে আটটা। এই আধঘণ্টা পৃথিবীর স্পেস-উইন্ডোর ট্রাফিক আমাদের জন্য বরাদ্দ।”
হালদারমশাই নড়ে উঠলেন। “সেটা কী?”
কর্নেল বললেন, “আমি বুঝিয়ে বলছি। চন্দ্রকান্তবাবু, আপনি স্পেসশিপ রেডি করুন ততক্ষণ।”
বিজ্ঞানী চলে গেলে কর্নেল বললেন, “পৃথিবীর আকাশ থেকে মহাকাশে পৌঁছনো একটা সমস্যা, হালদারমশাই! যেখান-সেখান দিয়ে বেরনো যায় না। একটা নিরাপদ যাত্রাপথ আছে, সেটাই স্পেস-উইন্ডো। কোনো দেশ থেকে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্পেসশিপ পাঠাতে হলে আগে জানা দরকার পথটা ফাঁকা আছে কি না। নইলে অন্য দেশের পাঠানো স্পেসশিপের সঙ্গে ঠোক্কর লাগতে পারে। তা ছাড়া উল্কার বিপদ আছে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র আছে। সেইসব বিপদ-আপদ এড়িয়ে নিরাপদ পথ আবিষ্কার করতে হয়েছে।”
হালদারমশাই খুব মাথা নাড়ছিলেন বটে, মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, কিছু বুঝতে পারছেন না।
বিজ্ঞানীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আপনারা ল্যাবে’চলে আসুন। ল্যাবের গেট নাম্বার টু’র সামনে দাঁড়ান। লিফট পাবেন। লিফট সরাসরি স্পেসশিপে পৌঁছে দেবে। কুইক!”
ল্যাবে ঢুকে দু’নম্বর গেটের সামনে আমরা দাঁড়ালুম। দরজা দু’পাশে সরে লিফট দেখা গেল। লিফটে ঢুকে হালদারমশাই ফিসফিস করে বললেন, “সেই পাজি ধুন্ধুটা সঙ্গে যাচ্ছে না তো?”
নেপথ্যে চন্দ্ৰকান্তের হাসি শোনা গেল। “ধুন্ধু মাস্ট মিঃ হালদার। তবে ওকে ভয় পাবেন না। ওকে বলে দিয়েছি, ও আপনার বন্ধু হয়ে থাকবে!”
স্পেসশিপে ঢুকে বুঝলুম গড়ন ডিমালো এবং ছাদের একটা গম্বুজের মাথায় বসানো। চন্দ্ৰকান্তের পাশে কর্নেল বসলেন। আমি আর হালদারমশাই বসলুম পেছনে। তারপর হালদারমশাই হঠাৎ আঁতকে উঠে বললেন, “গেছি! গেছি!”
পেছন থেকে ধুন্ধু ওঁর কাঁধে হাত রেখেছে। হাসতে হাসতে বললুম, “ধুন্ধু আপনার কাঁধে হাত রেখে বন্ধুতা জানাচ্ছে, হালদারমশাই! আপনিও ওকে বন্ধুতা জানান।”
হালদারমশাই ভয়ে-ভয়ে ঘুরে ধুন্ধু’র চিবুকে ঠোনা মেরে আদর করলেন, “লক্ষ্মীসোনা!”
চন্দ্রকান্ত বললেন, “আমরা উড়ছি। রেডি!”
একটা ঝাঁকুনি লাগল। তারপর কাঁচের জানালা দিয়ে দেখলুম, নীচের অজস্র আলোর ফুটকি দেখতে-দেখতে মিলিয়ে গেল। হালদারমশাই ফিসফিস করে বললেন, “আচ্ছা জয়ন্তবাবু! আমাদের স্পেসসুট পরালেন না তো সায়েন্টিস্টমশাই! আমার কেমন যেন ঠেকছে!”
চন্দ্রকান্ত তা শুনতে পেয়ে সহাস্যে বললেন, “এই শর্মার সেটাই কৃতিত্ব মিঃ হালদার। স্পেসসুট-টুট সবই প্রিমিটিভ করে ফেলেছি। কত কিলোমিটার বেগে যাচ্ছি, জানেন? সেকেন্ডে দু’হাজার মাইল। ওই দেখুন, সূর্য ঝলমল করছে।”
হালদারমশাই বললেন, “কিন্তু রোদ্র কোথায়? আকাশই বা এত কালো কেন? ধুস!”
তিনি নস্যি নিলেন। অমনি ধুন্ধু পিছন থেকে মুণ্ডু এগিয়ে দিল। হালদারমশাই খি-খি হেসে তার নাকে খানিকটা নস্যি গুঁজে দিলেন। ধুন্ধু নস্যির চোটে ধাতব হাঁচি হাঁচতে হাঁচতে কাত হয়ে পড়ল। চন্দ্রকান্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, “মিঃ হালদার! কেলেঙ্কারি করবেন দেখছি। ধুন্ধু’র নড়াচড়ায় স্পেসশিপ ব্যালান্স হারালেই…এই রে! সর্বনাশ!”
হালদারমশাই প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “ক্কী? কী? কী?”
চন্দ্রকান্ত খুটখুট শব্দে বোম টেপাটেপি করতে করতে বললেন, “গতিপথ বদলে গেছে। আপনি মশাই বড্ড ঝামেলা বাধান! এই রে! আমরা কোথায় চলেছি কে জানে?”
কর্নেল চুপচাপ নির্বিকার মুখে চুরুট টানছেন। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলুম। বললুম, “চন্দ্রকান্তবাবু, অ্যাসিডেন্ট হবে না তো?”
“হবে কী মশাই? হয়ে গেছে।” বিজ্ঞানী তেতো মুখে বললেন, “আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছি।”
“কিন্তু স্পেসশিপ ভেঙে পড়বে না তো?”
“দেখা যাক।”
আরও ভয় পেয়ে হালদারমশাইয়ের দিকে তাকালুম। উনি মুখ চুন করে বসে আছেন। বললুম, “এবার কী হবে ভাবুন তো হালদারমশাই!”
গোয়েন্দা ভদ্রলোক বললেন, “হঃ। ভাবতাছি। তবে আমারে দোষ দেবেন না য্যান। ওই পাজি হতচ্ছাড়া নাক বাড়াইয়া…”
উনি থেমে গেলেন। ধুন্ধু আবার নাক বাড়িয়েছে ওঁর কাঁধের ওপর দিয়ে। বিজ্ঞানী টের পেয়ে ধমকে দিলেন, “ধুন্ধু! ট্রাট ট্রাট ট্রাট!”
ওটা নিশ্চয় সাঙ্কেতিক ভাষা। ধুন্ধু ধাতব স্বরে বলল, “ক্রাট ক্রাট ক্রাট!”
“ক্রিও ক্রিও ক্রিও!” হুঙ্কার দিলেন বিজ্ঞানী।
ধুন্ধু তার চৌকো থাবা দিয়ে হালদারমশাইয়ের কাধ আঁকড়ে ধরল। কর্নেল বললেন, “নস্যি হালদারমশাই! ধুন্ধু নস্যির মজা টের পেয়েছে। না পেলে আপনার কাঁধের হাড় ভেঙে দেবে। শিগগির!”
হালদারমশাই দ্রুত নস্যির কৌটো বের করে বাকি নস্যির সবটাই ধুন্ধু’র নাকে খুঁজে দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হল ধুন্ধু’র বিকট হাঁচি এবং হাঁচতে হাঁচতে সে এমন নড়তে থাকল, স্পেসশিপ বেজায় ঝাঁকুনি খাচ্ছিল। চন্দ্রকান্ত হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, “ইমপসিবল! নিন! কোথায় নামছেন, দেখুন আপনারা।”
নীচে রোদে ঝকমকে সোনালি বালি। যতদূর চোখ যায়, শুধু বালি। অসমতল, কোথাও সমতল বালির বিস্তার। কাছে ও দূরে বালিরই পাহাড়। জায়গাটা মরুভূমি তাতে সন্দেহ নেই। প্রচণ্ড বালি উড়িয়ে স্পেসশিপ অবশ্য নিরাপদে থামল। কর্নেল দরজা খুলে নেমেই বললেন, “বাঃ! অসাধারণ।”
তারপর উনি যথারীতি চোখে বাইনোকুলার তুলে চারদিক দেখতে থাকলেন। আমি আর হালদারমশাই দরজা খুলে নেমে গেলুম। ঘড়ি দেখে অবাক। সাতটা চল্লিশ বাজে! তার মানে দশ মিনিটের জার্নি। ঘড়িতে একই তারিখ যে। সাধারণ জ্ঞানে বুঝলুম, আমরা নিশ্চয় পশ্চিম দিকে সূর্যের পেছন-পেছন ছুটে এসেছি। তাই এখন বিকেলের দেখা পাচ্ছি এখানে। কিন্তু কী বিচ্ছিরি গরম!
হালদারমশাইয়ের দোষেই মহাকাশযাত্রা ব্যর্থ এবং পৃথিবীর কোনো সৃষ্টিছাড়া মরুভূমিতে এসে পড়েছি। হালদারমশাইকে সম্ভবত সেজন্যই কাতর দেখাচ্ছে। তাই ওঁকে সান্ত্বনা দিতে বললুম, “সত্যি বলতে কী, আমার আনন্দ হচ্ছে জানেন হালদারমশাই? কোন্ উদ্ভুট্টে গ্রহে গিয়ে কী বিপদে পড়তুম কে জানে। তার চেয়ে এটা বরং ভালোই হল।”
হালদারমশাই কিন্তু বেজার মুখে বললেন, “হঃ! ভালোই হল! মরুভূমিতে আইয়া পড়ছি। এখন বেদুইন ডাকাতগুলি আইয়া পড়লেই গেছি!”
“আপনি বেদুইনের কথা ভাবছেন কেন? এটা মেক্সিকোর মরুভূমিও হতে পারে।”
হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, “আমি ডিটেকটিভ, ডোন্ট ফরগেট দ্যাট। নামবার সময় গম্বুজওয়ালা ঘর দেখছিলাম একখানে। আরবের ড্যাজার্ট না হইয়া যায় না।”
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, “হুঁ, ‘ড্যাজার্টে’ অনেক হ্যাজার্ড আছে মনে হচ্ছে হালদারমশাই!”
“ক্যান, ক্যান?” হালদারমশাই তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“ওইদিকে বালির পাহাড়ের মাথায় একটা বেঁটে লোক দেখলুম। গোল কুমড়োর গায়ে নাক-মুখ-চোখ এঁকে দিলে যেমন দেখায়, তেমনি চেহারা। লোকটার হাত-পা কিছু নেই। দিব্যি গড়াতে গড়াতে ওধারে উধাও হয়ে গেল। কুমড়ো-মানুষের দেশে এসে পড়েছি আমরা।”
রসিকতা করছেন ভেবে একটু হেসে বললুম, “কুমড়োপটাশের দেশে বলুন!”
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘হাসির কথা নয়, ডার্লিং! মনে হল, কুমড়ো-মানুষটা বসতিতে খবর দিতে গেল।” বলে ডাকলেন, “চন্দ্রকান্তবাবু! নেমে আসুন।”
বিজ্ঞানী স্পেসশিপের ভেতর বসে কীসব করছিলেন। তড়াক করে নেমে এসে বললেন, “আশ্চর্য কর্নেল, খুবই আশ্চর্য! আমরা পথভ্রষ্ট হইনি। সঠিক জায়গায় পৌঁছেছি।”
চমকে উঠে বললুম, “সেই কিটো গ্রহে এসে গেছি নাকি?”
চন্দ্রকান্ত খুশি-মুখে বললেন, “হ্যা! খামোকা ধুন্ধুকে দোষ দিচ্ছিলুম। ধুন্ধু দু’-দু’বার জার্ক না দিলেই বরং গতিপথ থেকে এক ডিগ্রি সরে যেতুম। ফলে কী হত জানেন? অনন্তকাল মহাকাশে ভেসে বেড়াতুম। কর্নেল! চলে আসুন। জয়ন্তবাবু! মিঃ হালদার! কুইক। ডিটেক্টরের কাঁটা সেই বলটার দিকে তাক করে আছে। আমরা সেদিকেই এবার যাব।”
কর্নেল আবার বাইনোকুলারে দূরে কিছু দেখছিলেন। বললেন, “যাওয়ার আগে কুমড়ো-মানুষদের একটা গ্রুপফোটো নিতে চাই চন্দ্রকান্তবাবু!”
“কুমড়ো-মানুষ!” বিজ্ঞানী অবাক হয়ে বললেন। “কই, কোথায়?”
“ওই দেখুন, দলবেঁধে গড়াতে গড়াতে আসছে।”
এবার ব্যাপারটা চোখে পড়ল। সেই বালির পাহাড় বেয়ে অন্তত শ’খানেক জ্যান্ত কুমড়ো গড়াতে-গড়াতে নামছিল। সমতলে নেমে এবার তারা গড়াতে-গড়াতে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। অবিকল প্রকাণ্ড ফুটবল মনে হচ্ছে। মাঝে-মাঝে কয়েকটা যেন কিক খেয়ে আকাশে উঠছে। আবার নেমে পড়ছে।
চন্দ্রকান্ত বললেন, “কী বিপদ! নাঃ, ধুন্ধুকে বের করি। কিছু বলা যায় না।”
তিনি স্পেসশিপের পেছনের খোপের দরজা খুলে দিলেন। শ্রীমান ধুন্ধুমার বেরিয়ে এসে আমাদের পাশে দাঁড়াল। হালদারমশাই তার কাছ ঘেঁষে রইলেন। চন্দ্রকান্তকে দেখলুম, হাতে মারাত্মক লেসার-পিস্তল নিয়েছেন।
কিন্তু আমার বৃদ্ধ বন্ধু ক্যামেরা তাক করে আছেন।
কুমড়ো-মানুষেরা আমাদের প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে এসে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল। নাঃ! দাঁড়াবে কী করে? ঠ্যাংই তো নেই। কাজেই থামল বলা ভালো। এই সময় লক্ষ করলুম, কেমন অদ্ভুত চাপা একটা ঝাঁ-আঁ শব্দ হচ্ছে। ওটাই কি ওদের ভাষা? ক্রমে চোখে পড়ল, ওদের মধ্যে নানা বয়সি কুমড়ো-মানুষ আছে। তারপর সবাই আমাদের জিভ দেখাতে থাকল।
হালদারমশাই খাপ্পা হয়ে বললেন, “অসভ্যতা দ্যাখছেন? মুখ ভ্যাঙায় কেমন!”
কর্নেল টেলিলেন্স ফিট করে কয়েকটা ছবি নিলেন। তারপর আমাদের অবাক করে সোজা এগিয়ে গেলেন ওদের দিকে। চন্দ্রকান্ত চেঁচিয়ে উঠলেন, “যাবেন না! যাবেন না!”
আমিও চেঁচিয়ে ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”
কর্নেল কান করলেন না। সেই আঁ-আঁ শব্দটা এখন থেমে গেছে। হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, “বিপদ বাধবে! ওই দ্যাখেন, কর্নেল-স্যারেরে চক্কর দিয়া ঘিরতাছে।”
কিন্তু এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও আমার হাসি পেল, যখন দেখলুম, কর্নেলও ওদের মতো জিভ বের করে অনবরত ভেংচি কাটার ভান করছেন।
তারপর সে এক বিচিত্র ব্যাপার। কুমড়ো-মানুষগুলো কর্নেলের ওপর এসে পড়ল। কেউ ওঁর কাঁধে, কেউ ওঁর মাথায় চড়ল। মাথারটি কর্নেলের টুপি খুলে নিজের মাথায় পরল এবং কর্নেলের চকচকে টাকে সেঁটে বসে রইল। একজন ওঁর দাড়িতে আটকে গেল। এবার আরও আজব দৃশ্য। সার্কাসে লোহার বলের ওপর পা রেখে বলটাকে গড়াতে-গড়াতে এগনো দেখেছি। কর্নেল কি সে-খেলাও জানেন? ওঁর পায়ের তলায় কয়েকটা কুমড়ো-মানুষ এবং উনি দিব্যি নাচার ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছেন। এদিকে ওঁর চারপাশে ওড়াউড়ি করছে আরও সব কুমড়ো-মানুষ। সম্ভবত বসার জুতসই জায়গা খুঁজছে।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ব্যস্তভাবে বললেন, “মনে হচ্ছে, কর্নেলকে ওরা বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। অসহ্য বেয়াদপি! ধুন্ধু। টুট টুট, ক্রুট ক্রুট!”
ধুন্ধু বালির ওপর দমাস-দমাস পা ফেলে এগিয়ে গেল। ওকে পেছনে দেখামাত্র কুমড়ো-মানুষের একটা দঙ্গল কঁ-আঁ শব্দে তেড়ে এল। ধুন্ধু’র ওপর তারা প্রকাণ্ড ঢিলের মতো পড়তে থাকল। ধুন্ধু টাল সামলে নিয়ে খপ করে একটাকে ধরে দূরে ছুঁড়ে ফেলল।
কিন্তু তার কিছুই হল না। সে আবার গড়াতে-গড়াতে এসে লাফ দিয়ে ধুন্ধুর একটা কানে এসে পড়ল। চন্দ্রকান্ত বললেন, “ওই যাঃ!”
দেখলুম, ধুন্ধু নেতিয়ে হাঁটু দুমড়ে ধরাশায়ী হল। চন্দ্রকান্ত বললেন, “বাঁ কানের নীচেই সুইচ। চাপ পড়লে ধুন্ধু ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে যায়।” বলে তিনি লেসার-পিস্তল উঁচিয়ে দৌড়ে গেলেন।
লেসার-পিস্তলের গুলিতে কোনো কাজ হল না। কুমড়ো-মানুষেরা কর্নেলের মতোই বিজ্ঞানী ভদ্রলোককে নাচাতে-নাচাতে নিয়ে চলল। উনি পেছন ফিরে চেঁচিয়ে কিছু বললেন। বোঝা গেল না।
হালদারমশাই ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, “কোনো মানে হয়? ব্যাটাচ্ছেলেরা…”
ওঁর কথা থেমে গেল। আমাদের পেছনে স্পেসশিপ। তার আড়ালে কখন একদঙ্গল কুমড়ো-মানুষ এসে লুকিয়ে ছিল টের পাইনি। আচমকা তারা এসে হালদারমশাইকে ঘিরে ফেলল এবং তারপর একই দৃশ্য দেখতে পেলুম। ঢ্যাঙা গোয়েন্দাপ্রবর নাচতে-নাচতে চলেছেন আর চাঁচাচ্ছেন, “জয়ন্তবাবু! জয়ন্তবাবু! বাঁচান, বাঁচান!”
কিন্তু আমার দিকে কুমড়ো-মানুষদের লক্ষ নেই কেন? একা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম। এ তো ভারি অপমানজনক ব্যাপার! আমাকে ওরা বন্দী করল না, গ্রাহ্যই করল না! আমি কি এতই ফেলনা? আঁতে বড্ড ঘা লাগছিল এবং অভিমান হচ্ছিল।
আর-এক আশ্চর্য ব্যাপার, সূর্য যেখানকার সেখানেই আছে। এ কি তা হলে এক চির-বিকেলের দেশ? সোনালি বালির ওপর নরম গোলাপি রোদ্দুর। একটু ভ্যাপসা গরম আছে, এই যা। একটুও বাতাস বইছে না। কুমড়ো-মানুষেরা তিন বন্দীকে নিয়ে বালির পাহাড় পেরিয়ে উধাও হয়ে গেলে ধুন্ধুর কাছে গেলুম।
হঠাৎ মনে হল, ধুন্ধুর এক কানে অফ করার সুইচ আছে যখন, অপর কানেও কি পালটা অন করার সুইচ নেই?
যেই কথাটি মাথায় আসা, ডান কানের সুইচটা টিপে দিলুম। অমনি ধুন্ধু ঝনঝন শব্দে উঠে দাঁড়াল। তারপর আমার দিকে ঘুরে একখানা স্যালুট ঠুকল। খুশি হয়ে বললুম, “হ্যালো ধুন্ধু! কনগ্রাচুলেশন!”
ধুন্ধু তার ধাতব কণ্ঠস্বরে বলল, “ট্রাও ট্রাও ট্রাও!”
এই রোবট-ভাষা আমি বুঝি না। ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বললুম। স্পেসশিপের কাছে গিয়ে দেখি, সে আমার ইশারা বুঝতেই পারেনি। বালির পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মরুক হতচ্ছাড়া! আমার তেষ্টা পেয়েছে, যা-সব আক্কেল গুড়ুম করা কাণ্ড ঘটল! স্পেসশিপে ঢুকে জলের ফ্লাক্স থেকে অনেকটা জল খেলুম। চন্দ্ৰকান্তের সিটে গিয়ে স্পেসশিপ চালানোর চেষ্টা করব নাকি?
এই ভেবে উঠতে যাচ্ছি, চোখে পড়ল ধুন্ধু দমাস-দমাস করে বালির পাহাড়টার দিকে হেঁটে চলেছে। রাগে গা জ্বালা করছিল। কিন্তু কী আর করা যায়? নিজের আসনে বসে সিগারেট ধরালুম। এখন আমি মরিয়া। বরাতে যা আছে ঘটুক।
কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ কী একটা শব্দ। দরজা খোলা ছিল বলেই কানে এল। তাকিয়ে দেখি, কী আশ্চর্য, একটা রোগা খেকুটে চেহারার মানুষ, হ্যাঁ, আমার মতোই মানুষ, অবাক চোখে স্পেসশিপটা দেখছে।
