এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার

 

কর্নেল তাকিয়ে ছিলেন। ভদ্রলোক খ্যাখ্যা করে হেসে বললেন, চিনতে পারলেন না? নাইনটিন সেভেনটি থ্রির অক্টোবরে মাকড়দহে আলাপ–সেই যে হাবলবাবুর ফার্মে যাঁড়ের কেস! কে কে হালদার। চিনেছেন তো এবার?

 

কর্নেল হাসলেন। চিনেছি। কেমন আছেন হালদারবাবু? কোথায় আছেন এখন?

 

কৃতান্তকুমার হালদার চোখে ঝিলিক তুলে বললেন, আপনার মনে পড়তে পারে কর্নেল স্যার, আপনাকে বলেছিলাম, রিটায়ার করলেই প্রাইভেট এজেন্সি করব। করেছি। গণেশ এভেনিউতে আমার শ্যালক টি কে রায়ের লিগ্যাল কনসাল্টিং এজেন্সি। সেখানেই একটা রুম পেয়েছি। ওদিকে গেলে সাইনবোর্ড চোখে পড়বে, হালদার ডিটেকটিভ এজেন্সি।

 

হালদারবাবু জাঁদরেল পুলিশ সি আই ছিলেন বটে! কর্নেল মুখে প্রশংসা ফুটিয়ে বললেন, বাঃ! খুব ভালো! খাসা! তো কেস-টেস কেমন পাচ্ছেন বলুন?

 

পাচ্ছি। বেশিরভাগই ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনসার্নের। হালদারবাবু পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করলেন। শ্যালক বিরাট লইয়ার। সেদিক থেকেও সুবিধে হয়েছে। বলে একটিপ নস্যি নাকে খুঁজে হাঁ করে রইলেন। হাঁচির আশা করছিলেন। এল না। তখন ফাঁচ করে হেসে বললেন, আপনাকে কাল সকাল দশটা নাগাদ লেকভিলার ফুটপাতে হঠাৎ দেখতে পেলাম। ডি সি ডি ডির সঙ্গে শাদা ফিয়াটে উঠলেন। নেমে যেতে যেতে আপনারা ততক্ষণে মোড় পেরিয়ে গেছেন।

 

আপনি লেকপ্লেসে থাকেন বুঝি?

 

থাকি মানে? লেকভিলারই পাঁচতলায় একনম্বর ফ্ল্যাটটা কিনেছি। বছরখানেক হয়ে গেল প্রায়।

 

কর্নেল একটু নড়ে বসলেন। আর সব খবর বলুন!

 

হালদারবাবু গলা চেপে বললেন, বলব বলেই আসা। আপনাকে কাল দেখার সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেছি, ও কেসের অবস্থা জটিল! তবে একটা কথা আগে বলে নিই কর্নেল স্যার, আমি বরাবর গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি মেনে চলি।

 

বেশ তো!

 

মৃগাঙ্কবাবুকে আমি বলেছিলাম কেসটা আমাকে দিন। আমি তো এর ব্যাকগ্রাউন্ড সবই জানি। ভদ্রলোক গাঁইগুই করতে লাগলেন। পুলিশের ওপরমহল কেস নিয়েছে। প্রাইভেট থেকে নাকগলানো ওরা পছন্দ করবে না। শুনে বুঝলেন, আমার রাগ হল। আসলে পয়সা খরচ করতে চায় না। হাড়কেপ্পন। বদমেজাজী লোক একেবারে। মিনিস্টার মামার দৌলতে পয়সার মুখ দেখেছে! গুমোরে মাটিতে পা পড়ে না। অথচ দেখুন, আগের মাসে নামমাত্র ফিতে আমি ওর কাজ করেছি। আমি হোল বাকগ্রাউন্ড জানি।

 

কর্নেল মুখে নিরাসক্তি ফুটিয়ে বললেন, হু, ভদ্রলোক কেমন যেন।

 

কেমন মানে কী? ধুরন্ধর হাড়ে হারামজাদা। কাউকে বিশ্বাস করে না। কাজ করিয়ে পয়সা না দিতে পারলে বেঁচে যায়। দেখুন না, মাত্র পঞ্চাশটা টাকায় ওর ওয়াইফ সম্পর্কে একগাদা ইনফরমেশন সাপ্লাই করেছিলাম। ওনলি ফিফটি রুপিজ। এদিকে আমার ট্যাক্সিভাড়াই গেছে সত্তর-পঁচাত্তর টাকা। বলবেন, কেন তাহলে কেস নিলেন? নিলাম। নেশা। এই আপনার যেমন। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।

 

কৃতান্ত হালদার আবার খ্যাখ্যা করে হাসতে লাগলেন। কর্নেল বললেন, হা-মৃগাঙ্কবাবুকে সন্দেহপ্রবণ লোক মনে হয়েছে। অথচ নাকি প্রেম করে–

 

হাতি! হাতি! বুড়ো আঙুল দেখালেন কৃতান্ত হালদার। বিহারের মেয়ে মশাই–সাতঘাটে জল খাওয়া চরিত্র। বেশিদিন আমার লাগেনি। কয়েকদিনেই নাড়িনক্ষত্র জেনে গিয়েছিলাম। কলকাতায় পড়ার ছলে চলে আসার কারণ কী জানেন? জেলপালানো এক ডাকুর সঙ্গে প্রেম ছিল। সে মেয়েটার পেছনে। কলকাতায় ধাওয়া করেছিল। তার ভয়েই মিনিস্টারের ভাগ্নের ঘরে এসে ঢুকেছিল। মিঃ লাহিড়ীকে জিগ্যেস করবেন, সব জানতে পারবেন। বলে চোখ নাচালেন হালদারবাবু। পারবেন কী বলছি, আপনার কি তার অজানা আছে? কেস যখন নিয়েছেন।

 

উত্তেজনা চেপে কর্নেল মৃদু হাসলেন। স্ত্রীর গতিবিধি জানতে তাহলে আপনার সাহায্য নিয়েছিলেন মৃগাঙ্কবাবু?

 

হ্যাঁঃ। কৃতান্ত হালদার বাঁকা মুখে বললেন। আমার আরও একটা সুবিধা একই বাড়িতে থাকি। মৃগাঙ্কবাবু যখন থাকেন না, তখন কে আসছে-যাচ্ছে ওঁর বউয়ের কাছে, সেটা নজর রাখা কঠিন ছিল না। শুধু একটা ঝামেলা ছিল ওই ফ্লোরে পাশের ফ্ল্যাটে একটা বজ্জাত অ্যালসেসিয়ান আছে। প্রায়ই ছাড়া থাকত কুকুরটা শেষে মৃগাঙ্কবাবুকে বললাম, কুকুরটার এগেনস্টে কমপ্লেন করুন। নৈলে অসুবিধে হচ্ছে। তখন কুকুরটাকে আর ছাড়া হত না।

 

কারা আসত ঊর্মির কাছে?

 

হালদারবাবু ফাঁচ করে হেসে বললেন, গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি কর্নেল স্যার!

 

বেশ তো। আমি যা জানি বলব আপনাকে।

 

সে তো বলবেনই। আমার ক্লেইমটা একটু অন্যরকম।

 

বলুন।

 

আমাকে আপনার অ্যাসিস্টেন্ট করতে হবে ননঅফিসিয়ালি। বলবেন, এতে আমার কী লাভ? আছে। কাগজে আপনার সঙ্গে আমারও নাম বেরুবে। তাতে আমার এজেন্সির সুনাম হবে। তাছাড়া পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আমার প্রাক্তন কলিগরা বলুন, কিংবা অন্যান্য অফিসাররা যারা আছেন, তারা ভবিষ্যৎ কেসে দরকার হলে আমাকে হেল্প করবেন।

 

এখন করেন না বুঝি?

 

বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়লেন কৃতান্ত হালদার। সব চাকরিতে এ-রকম। রিটায়ার করলে আর কেউ তাকে মনেও রাখে না, পাত্তাও দেয় না। বরং বেঁগড়বাজি করে। তার ওপর আমাদের দেশের পুলিশকে তো জানেন। প্রাইভেটকে নাক গলাতে দেখলেই তেড়ে আসে ডাণ্ডা উঁচিয়ে। আপনার কথা অবশ্য স্বতন্ত্র। আপনি স্যার ভি আই পি লোক। ইন্টারন্যাশান্যালি ফেমাস।

 

কর্নেল হাসি চেপে বললেন, বেশ তো। আপনি আমার সঙ্গে থাকুন। ওদের জানিয়ে দেব, যাতে আপনার কোনো অসুবিধে না ঘটায় কেউ।

 

কৃতান্ত হালদার আর এক টিপ নস্যি নিতে যাচ্ছিলেন, ষষ্ঠী চা নিয়ে এল। এতক্ষণে বাইরে বৃষ্টির শব্দ। চায়ে চুমুক দিয়ে হালদারবাবু বললেন, এ জন্যই আসা। জানতাম, আপনি ফেলে দেবেন না। উরে বাস! মাকড়দহ ফার্মে ষাঁড়ের কেস–মানে, গোঁজ মেরে মার্ডার করে কেমন যাঁড় বেচারার ওপর দোষ। চাপিয়েছিল বলুন, আমি কী রকম কোঅপারেশন করেছিলাম আর আপনিও আমার অ্যাডভাইস নিয়ে শেষপর্যন্ত–উরে বাস! মনে পড়ে আর এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। এমনি বর্ষার রাত। খড়ের গাদার পাশে ওত পেতে আছি। আসামী রক্তমাখা গোঁজটা খড়ের ভেতর থেকে সরাতে এসেছে। অন্ধকারে খড় খড় শব্দ…

 

ঊর্মির কাছে কারা যাতায়াত করত হালদারবাবু?

 

গলা চেপে কৃতান্ত হালদার বললেন, একজন রেগুলার যেত। তাকে ফলো করে নাম-ধাম পেয়েছিলাম। মৃগাঙ্কবাবুরই বন্ধু ভদ্রলোক। সুব্রত সিংহরায় নাম। ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কনসার্নের মালিক।

 

মৃগাঙ্কবাবুকে বলেছিলেন সে কথা?

 

বলতে বাধ্য। প্রফেশনাল এথিকস বলে কথা। নুন খেয়েছি যে জন্য।

 

আর কেউ?

 

দুদিন এসেছিল এক নন-বেঙ্গলি ভদ্রলোক। তখন জানতাম না, ওই ব্যাটা পাটনা জেল ভেঙে ফেরার হয়েছে। অনেকদিন পরে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে একজন প্রাক্তন কলিগের সূত্রে সব জেনেছিলাম। কিন্তু তখন সে বেপাত্তা।

 

কী নাম বলুন তো?

 

রঘুনাথ সাহু। কৃতান্তবাবু ফের গলা চাপলেন। এসব ক্ষেত্রে রিস্ক নিতেই হয়েছে। সাততলার একনম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন মিঃ নায়ার। তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আছে। দাবাখেলার ঝোঁক আছে ভদ্রলোকের। মাঝে মাঝে এ ফ্ল্যাটে এসে থাকেন। বিপত্নীক বড়লোক মানুষ। যাই হোক, ওঁর ফ্ল্যাটটা থেকে নজর রাখার সুবিধে হত। নায়ার তার ফ্ল্যাটের চাবি আমার কাছে রেখে যেতেন। আমি ডাকুব্যাটার ছবি তুলে নিয়েছিলাম। বুঝলেন না? ক্লায়েন্টকে উইথ এভিডেন্স প্রডিউস করতে হবে সব ইনফরমেশান!

 

কৃতান্ত হালদার পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন। খামের ভেতর একগাদা ফোটো।…এই দেখুন রঘুডাকাত! দেখলেই মনে হয় না মার্ডারার? আর এই দেখুন দরজায় ওয়েলকাম করছেন মৃগাঙ্কবাবুর ওয়াইফ। ইনি হলেন সুব্রত সিংহরায়। এবার এগুলো দেখুন, পার্কস্ট্রিটের একটা বারে তোলা। মুখোমুখি বসে বিয়ার খাচ্ছে-চেনেন কি একে? হিমাদ্রি রায়-কোল ইন্ডিয়ার অফিসার। খুব রিস্ক নিয়ে ছবিগুলো তুলতে হয়েছে। আলো কম বলে একটু আবছা হয়েছে। কিন্তু চেনা যায়।

 

কর্নেল প্রশংসা করে বললেন, ওয়েলডান মিঃ হালদার!

 

কৃতান্ত হালদার বিগলিত হয়ে বললেন, একটা করে কপি আপনি রাখুন। দরকার হতে পারে।

 

মৃগাঙ্কবাবুকে এককপি করে দিয়েছেন নিশ্চয়?

 

দিতে হয়েছে। বিলের টাকা এখনও পাওনা। ভাবতে পারেন লোকটা কী কঞ্জুস! বলে বাকি ছবি খামে ভরে কৃতান্ত হালদার সোজা হয়ে বসলেন। এবার আমাকে কিছু ইনফর্মেশান দিন স্যার! যাতে আমি ঠিক রাস্তায় এগুতে পারি।

 

আপনি জানেন কি মৃগাঙ্কবাবুর ফ্ল্যাট থেকে কাল সকালে ওঁর স্ত্রীর একটা স্যুটকেস চুরি গিয়েছিল?

 

খ্যা খ্যা করে হেসে উঠলেন কৃতান্ত হালদার। জানি মানে? প্রচণ্ড জানি। স্যুটকেসটা পাওয়া গেছে।

 

আরও হেসে হালদারবাবু বললেন, যাবে না কেন? কোনো ক্লু না পেলে খামোকা ওটা গাপ করে লাভটা কী? খালি মেয়েলি কারবার। খেলনা, হাবিজাবি, পুঁতির মালা, একগাদা কুঁচফল।

 

কর্নেল হাসলেন। বুঝলাম, আপনারই কীর্তি! চাবি পেলেন কোথায়?

 

এ লাইনে রিস্ক না নিয়ে উপায় থাকে না। আপনি তো সবই জানেন। দরজার লকের ছাঁচ নিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি করিয়েছি সম্প্রতি। দু নম্বরের কুকুর হারামজাদাটার জ্বালায় সে এক প্রাণান্তকর অবস্থা। তাও তো ভেতরে বাঁধা ছিল। আর ওই নাকগলানে ভদ্রমহিলা! কুকুর চাঁচালেই দরজা খোলেন। অমনি ভালমানুষ সেজে নায়ারের ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ি।

 

রঞ্জনবাবুর স্ত্রী?

 

আজ্ঞে দিনদুই আগে দরজা খুলেছি, দেখি দু নম্বরের দরজার ফাঁকে মুখ। চোখ পড়তেই বললাম, পুলিশ অফিসার।

 

মৃগাঙ্কবাবুর ফ্ল্যাটে কোনো ক্লু পেয়েছেন কি মিঃ হালদার?

 

হালদারবাবু থেকে মিঃ হালদার হয়ে কৃতান্তকুমারের মুখে আত্মবিশ্বাস ও গর্বের ভাব ফুটে উঠল। বললেন, ঠিক কু কি না জানি না, ড্রেসিং টেবিলের তলায় দলাপাকানো ছেঁড়াখোঁড়া একটা টেলিগ্রাম পড়ে ছিল। আজ নাইনটিনথ– ওটা পেয়েছি ফিফটিনহ্ জুলাই। মৃগাঙ্কবাবুর স্ত্রী মার্ডার হয়েছে ইলেভেনথ জুলাই। তো টেলিগ্রামটা জোড়াতাড়া দিয়ে খানিকটা উদ্ধার করেছি। এই দেখুন।

 

শাদা কাগজে আঁটা কয়েকটুকরো হলদে কাগজ। টেলিগ্রামই বটে। REACHED….. CARGO NOT…. ADVISE…. HEMANTA HOTEL DELIGHT BOMBAY.

 

কৃতান্ত হালদার বললেন, লোকাল পোস্টঅফিসের নাম ঘেঁড়া। রিসিভিং ডেটটা দেখুন। শুধু ওয়াই এইটুকু আছে। আমার ধারণা জুলাই–মানে এমাসেরই। আমি মৃগাঙ্কবাবুর অফিস-এরিয়ার পোস্টাপিসে আর আমাদের লেক প্লেস এরিয়ার পোস্টাপিসে খোঁজ নিতে গিয়ে হন্যে হয়েছি। একাজ আপনি পুলিশ দিয়ে পারবেন। বুঝলেন না? পুলিশের ইউনিফর্ম দেখলে সবাই জব্দ। এতদিনে হাড়ে হাড়ে সেটা টের পাচ্ছি। ওই যে বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা

 

হেমন্ত? কর্নেল আস্তে বললেন।

 

মৃগাঙ্কবাবুর এক কর্মচারী। হেমন্ত বোস।

 

কিন্তু টেলিগ্রামটাকে ক্লু ভাবছেন কেন?

 

অমন ছেঁড়া অবস্থায় ড্রেসিং টেবিলের তলায় পড়ে থাকার জন্য।

 

কারবারী লোক। এসব টেলিগ্রাম আসতেই পারে। অন্যমনস্কভাবে ছিঁড়ে ফেলতেও পারেন।

 

তাই। ফ্যানের হাওয়ায় কিছু টুকরো উড়ে গিয়ে ওখানে আটকেছিল। কৃতান্ত হালদার নস্যি নিলেন। তারপর বিকট হেঁচে বললেন ফের, তাহলেও ওই যে বলে, যেখানে দেখিবে ছাই, পাইলে পাইতে পারো-হেঁ হেঁ, আপনাকে আর কী জ্ঞান দেব স্যার? আপনি হলেন এ লাইনে রাজা–সম্রাটও বলা যায়।

 

বৃষ্টিটা বেড়েছে। রাস্তায় জল জমবে। কর্নেল উঠে গিয়ে জানালায় বৃষ্টি দেখে এলেন। কৃতান্ত হালদার আবার হাঁচার জন্য হাঁ করে আছেন তো আছেন। ইজিচেয়ারে বসে কর্নেল ডাকলেন, মিঃ হালদার!

 

ব-চ্ছোঁ! হেঁচে নোংরা রুমালে নাম মুছে কৃতান্তবাবু রিপিট করলেন, বলুন স্যার!

 

ঘটনার সময় আপনি কোথায় ছিলেন?

 

কৃতান্ত হালদার বেজার মুখে বললেন, ঠিক ওইদিনটাতে আমি অ্যাবসেন্ট। কুগ্রহ ছাড়া কী বলব? দমদমে দিদির নাতনির বিয়ে। না থাকলেই নয়। টুয়েলফথ দুপুর নাগাদ ফিরে শুনি ওই সাংঘাতিক কাণ্ড। আমি থাকলে কালপ্রিট হাতেনাতে ধরা পড়ত।

 

কাকে সন্দেহ হয় আপনার?

 

গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার এককথায় বললেন, মৃগাঙ্কবাবুই মার্ডারার।

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন, কেন?

 

তাহলে ওই যে বলে, সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মাসি হয়, কর্নেলস্যার! ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো সবই শুনলেন। বউয়ের ওপর সন্দেহ। ডিটেকটিভ এজেন্সির সাহায্যে বউয়ের গোপন গতিবিধি ইত্যাদি খবর যোগাড়। মোটিভ ভেরি ক্লিয়ার। পুলিশ ছিলাম, পুলিশের কারবার তো জানি। তাতে মিনিস্টারের ভাগ্নে। বাকিটা বুঝে নিন। ওই যে বলে, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে–তাই করবে। আমার গ্রিভ্যান্সটা তো এখানেই।

 

কিন্তু আপনি জানেন কি মৃগাঙ্কবাবুর শ্বশুরও মাসতিনেক আগে বিহারের সেতাপগঞ্জের বাড়িতে একইভাবে খুন হয়েছেন? দরজার কাছেই ডেডবডি ছিল শ্বাসনালী কাটা।

 

কৃতান্ত হালদার নড়ে বসলেন। উরে ব্বাস! তাহলে তো মোটিভ আরও স্ট্রং হল স্যার!

 

কেন?

 

শ্বশুরের ওপর ভীষণ রাগ মৃগাঙ্কবাবুর। খুলে বলি, আমার এজেন্সিকে কেউ কাজ দিলে আগে কিছু ইনফরমেশন চাইবই চাইব। ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনে তো এগুনো যায় না। মৃগাঙ্কবাবু সব বলেছিলেন। শ্বশুর ওঁকে নাকি ইনসাল্ট করেছেন। কথা বলেননি। তবে–আশ্চর্য তো! শ্বশুর খুন হওয়ার কথাটা কেন চেপে গেলেন ভদ্রলোক? কৃতান্তবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। চেপে যাওয়াতেই মোটিভ স্ট্রার হলো। আমার কথায় তো ডি ডির কোনো অফিসার কান দেবে না–বরং ঠাট্টাবিদ্রূপ করবে। সবসময় করে। রামগোয়েন্দা নাম দিয়েছে আমার জানেন? ইনসাল্টিং!

 

কর্নেল সহানুভূতি দেখিয়ে বললেন, যাতে আপনি কোঅপারেশান পান, চেষ্টা করব। একপেয়ালা কফি খাবেন মিঃ হালদার?

 

মন্দ হয় না। বৃষ্টিবাদলার রাতে কফি খেতে ভালই লাগবে আশা করি। তবে একটু বেশি দুধ দিতে বলুন। অনিদ্রার রোগী। সারারাত ঘুম হয় না। তিরিশ বছর পুলিশলাইনের অভিশাপ, বুঝলেন না?

 

কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে কফির আদেশ দিলেন। মনে মনে হাসছিলেন। কৃতান্ত হালদারের সারারাত সম্ভবত মাথার ভেতর ধুরন্ধর ক্রিমিন্যাল ঘুরে বেড়ায়। ঘুম হওয়ার কথা নয়। মাকড়দহ ফার্মে সারারাত যা কাণ্ড করেছিলেন।

 

কৃতান্ত হালদার এতক্ষণে ড্রয়িংরুমের ভেতর চোখ বুলোচ্ছেন। বললেন, ঘরখানা যে যাদুঘর বানিয়ে রেখেছেন স্যার! ইশ! কতসব অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস! কত বই! উরে ব্বাস! ঘরের ভেতর গাছ! ফুলও ফোটে!

 

চোখে বিস্ময় নিয়ে উঠে গেলেন। সারা ঘর ঘুরে এটাওটা দেখে নাড়াচাড়া করে ফিরে এলেন। অনেকরকম মুখোস দেখলাম। একবার বর্ধমান খনি এরিয়ায় এক ভদ্রলোক মুখোস পরে নিজের বউ আর ছেলেমেয়েকে মার্ডার করেছিলেন। ওই মুখোসের ক্লু থেকেই ধরে ফেলেছিলাম, জানেন? রথের মেলায় আগেরদিন মুখোস কিনে এনেছিলেন—

 

ষষ্ঠী কফি আনতেই থেমে গেলেন কৃতান্তবাবু। কর্নেল অতিরিক্ত দুধ মিশিয়ে কফির পেয়ালা ওঁর হাতে তুলে দিলে চুমুক দিলে বললেন, মৃগাঙ্ক রায় ইজ দা মার্ডারার। ওকে এখনই অ্যারেস্ট করতে বলুন। আর ওর শ্বশুরের কথা বললেন। বিহারে কোথায় যেন বাড়ি?

 

সেতাপগঞ্জ। মোতিহারির কাছে।

 

আমি এভিডেন্স এনে দেব। আই অ্যাসিওর ইউ। কৃতান্ত হালদার সেই জোড়াদেওয়া টেলিগ্রামের কাগজটা কর্নেলের হাতে গুঁজে দিলেন। পোস্টঅফিস থেকে এটার একটা কিনারা করে ফেলুন। দেখবেন, ওই যে বলে, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। আর এই রইল আমার কার্ড। আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস কর্নেলস্যার! মাকড়দহে তো দেখেছেন আমাকে। এবারও দেখুন। শুধু একটা রিকোয়েস্ট।

 

বলুন!

 

আমার এজেন্সির পাবলিসিটিটা যেন হয়, স্যার। কাগজের লোকও আপনার হাতে আছে শুনেছি।

 

ভাববেন না। সব হবে।

 

গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার আশ্বস্ত হয়ে কফিতে ঘন-ঘন চুমুক দিয়ে বললেন, ব্রিলিয়ান্ট!….

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *