এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সুটকেস এবং অ্যালসেসিয়ান
বিকেলে ছাদের প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ড-এ স্প্রে হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কর্নেল। চ্যাটালো লম্বাটে পাতা, কিনারা ঢেউখেলানো, এই অর্কিডটার আশ্চর্য স্বভাব–যত বেলা বাড়ে, তত গুটিয়ে যেতে থাকে নিজের কেন্দ্রের দিকে। সূর্যাস্তের পর ক্রমশ আবার ছড়িয়ে পড়ে। কালচে সবুজ রঙের ওপর লাল নীল হলুদ সাদা ফুটকি। ফুল ফুটবে সেই শীতে। বেগুনি রঙের থোকাথোকা ফুল। এপ্রিলে ফুল শুকিয়ে গুটি বাঁধে। হঠাৎ কখন ফেটে যায় গুটিগুলো। অর্কিডের বইতে আছে, এই হিষ্পনোলিয়া সিডারিকা অর্কিডের একটা কেন্দ্র থেকে ৪৪৭৭২০টা করে সূক্ষ্ম বীজ বাতাসে ছড়িয়ে যায়। উড়ে যায়ও বহুদূর। পথে দেবদারু গাছ পেলে তবে বীজ থেকে আবার আঁকুর গজায়। না পেলে ধ্বংস হয়ে যায় প্রাকৃতিক নিয়মে।
কর্নেল হিস্পানোলিয়া সিডারিকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কলকাতার আকাশ আজ প্রায় নির্মেঘ। তিনতলা বাড়ির এই ছাদ থেকে বহুদূর দেখা যায়। কারণ এলাকায় উঁচু বাড়ির সংখ্যা কম। গঙ্গার শিয়রে চাপচাপ সিঁদূরে মেঘ জমে আছে। সূর্য নেমে গেছে তার ভেতরে। ক্রমশ ফুটে উঠছে সেই আশ্চর্য। কনেদেখা আলো। অন্যমনস্কভাবে পকেট থেকে বাঁ হাতে ঊর্মির ফোটোটা বের করলেন কর্নেল। আবার দেখতে থাকলেন।
ফোটোটা সকালে অরিজিৎ পাঠিয়ে দিয়েছেন। মৃগাঙ্ক যেন তার ঘর থেকে ঊর্মির সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চেয়েছে। আগের দিন তার ফ্ল্যাটে গিয়ে কর্নেল তা লক্ষ্য করেছেন। অথচ মৃগাঙ্ক চাইছে খুনীকে ধরতেই হবে। মিনিস্টার মামাকে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছে। এ কি তার নিতান্তই চরিত্রগত জেদ? অর্থাৎ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কি সে এমনি একগুঁয়ে?
ওকে ঠিক বোঝা যায় না। যন্ত্রমানুষের মতো মনে হচ্ছিল। যেন ভাবাবেগহীন, অকপট, নির্বিকার। সে তত রূপবান স্বাস্থ্যবান মানুষও নয়। অথচ ঊর্মির মতো মেয়ে তার প্রেমে পড়েছিল! অসাধারণ রূপবতী ছিল ঊর্মি। অবশ্য ফোটো অনেকক্ষেত্রে প্রবঞ্চনা করে। ঊর্মির বোনদের মুখোমুখি না হলে কিছু বোঝা যাবে না।
খুনের মোটিভ মৃগাঙ্কেরও থাকা স্বাভাবিক। রঞ্জনবাবুর স্ত্রীর কথায় বোঝা গেছে মৃগাঙ্কের অনুপস্থিতিতে ঊর্মির কাছে কেউ এসেছে। কিন্তু ঊর্মি নাকি তত আলাপী মেয়ে ছিল না। তাহলে কে আসতে পারে? সমস্যা হয়েছে, বাড়িটা বহুতল, ফ্ল্যাটও অসংখ্য। তাছাড়া এ ধরনের ফ্ল্যাটবাড়ি প্রত্যেকটাই নির্জন একেকটা দ্বীপের মতো–যোগাযোগবিহীন। ঊর্মির কাছে কোনো পরিচিত মহিলা আসতে পারে। আবার কেউ মৃগাঙ্কেরও খোঁজেও আসতে পারে। নিঃসংশয় হওয়া কঠিন। তবে ওর মামা বনবিহারীবাবুর কথাতেও মনে হয়েছে, ঊর্মি নিষ্কলুষ চরিত্রের মেয়ে ছিল না।
মৃগাঙ্কের কী ধারণা স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কে? প্রশ্নটা সরাসরি করতে বেধেছিল কর্নেলের। কিন্তু আভাস পেয়েছেন, ধারণা ভাল ছিল না। মৃগাঙ্ক দুবার বলেছিল, ডিসিশনে ভুল হয়েছিল।
হুঁ, মৃগাঙ্কেরও একটা শক্ত মোটিভ পাওয়া যায়। কিন্তু তার শ্বশুরের হত্যাকাণ্ডটা এক্ষেত্রে জট পাকিয়ে তোলে। একই পদ্ধতিতে হত্যা। শ্বাসনালী কেটে। ডেডবডি দরজার খুব কাছেই পড়ে থাকাটাও একই হত্যাকারীর দিকে নির্দেশ করে। তারিখ সেই এগারো। কিন্তু মৃগাঙ্কের শ্বশুরঘাতী হওয়ার কোনো কারণ আছে কি?
কাজেই এভাবে পাঁচমিনিটের মধ্যে ঊর্মির স্যুটকেস চুরি যাওয়াটা বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না। আর অরিজিতের কাছে জানা গেছে, মৃগাঙ্কের অ্যালিবাই খুব মজবুত। বোম্বের হোটেলের রসিদ, প্লেনের টিকিট–সবই ঠিক আছে। বোম্বে পুলিশের কাছে এও জানা গেছে, ঘটনার সময় মৃগাঙ্ক সেই হোটেলেই ছিল। সেদিন বোম্বেতেও প্রচণ্ড বৃষ্টি দিনভর রাতভর।
ষষ্ঠী একটা মোড়া দিয়ে গেছে কফি আনার সময়। স্প্রে রেখে ছবিটা হাতে নিয়ে কর্নেল মোড়ায় বসলেন। কনেদেখা আলোটা মরে যাচ্ছে দ্রুত। পুবের আকাশে খানিকটা অতর্কিত ধুসর মেঘ। রাতে বৃষ্টি নামতে পারে।
রঞ্জনবাবুর স্ত্রী সেই সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ অন্তর দুবার দরজায় নক করার শব্দ শুনেছিলেন। দুবারই ওঁদের অ্যালসেসিয়ান কুকুরটা চ্যাঁচামেচি করেছিল। রঞ্জনবাবুর স্ত্রীর কথায় সনির অপছন্দের লোক এসেছিল তিন নম্বর ফ্ল্যাটে।
খাটের তলায় পড়ে ছিল একটা দামী লাইটার।
এবং থানায় কেউ ফোন করে বলেছিল, লেকভিলার সাততলার তিন নম্বর ফ্ল্যাটে একটা ডেডবডি পড়ে আছে।
হঠাৎ কর্নেলের মনে হল ঊর্মির ছবির ভেতর কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে-না, লাইটার নয়, একটা ড্যাগার। ক্রমশ একটা আদল ফুটে উঠছে। ঋজু, শক্ত একটা কাঠামো। কিন্তু মুখটা অস্পষ্ট।
চেষ্টা করেও তার মুখটা দেখতে পেলেন না কর্নেল। উত্তেজনায় কেঁপে উঠলেন।
সেইসময় ষষ্ঠী সিঁড়ির মাথায় মুখ বাড়িয়ে ঘোষণা করল, নালবাজারের নাহিড়িসায়েবের ফোং বাবামশাই!
ফোন নামিয়ে রেখেছিস তো?
ষষ্ঠীর দাঁত দেখা গেল। আর নজ্জা দেবেন না বাবামশাই! একবার করিছি বলে কি বারম্বার ভুল হবে?
কর্নেল হাসলেন। ওরে হতভাগা! ভুলের নিয়মই যে এই। একবার করে ফেললে-ওই যে বললি বারম্বার–হ্যাঁ, বারম্বার হয়।..
অরিজিতের গলা শোনা গেল, কর্নেল, খবর আছে।
বলো ডার্লিং!
হিমাদ্রি রায়ের আঙুলের ছাপের সঙ্গে সেই লাইটারের ছাপ মিলে গেছে।
হু–ওঁর আঙুলের ছাপ পেলে কীভাবে? অ্যারেস্ট করেছ?
না। নিখোঁজ বলতে পারেন। বাড়িতে বলে গেছেন দিল্লি যাচ্ছি অফিসের কাজে। ফিরতে দেরি হবে। অফিসে ছুটি নিয়েছেন এক মাসের। বলেছেন, স্বাস্থ্যোদ্ধারে পাহাড়ে যাচ্ছেন। যাই হোক, ওঁর গাড়িটা গ্যারেজে ছিল তালাবন্ধ। ওঁর বাড়িতে কেউ ড্রাইভ করার মতো নেই। শুধু এক বৃদ্ধা আত্মীয়া আছেন।
গাড়ি থেকে আঙুলের ছাপ পেলে?
আবার কোথায় পাব? স্টিয়ারি থেকে কয়েকটা ছাপ পাওয়া গেছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হল, স্টিয়ারিঙের একখানে একটু রক্তের ছাপ ছিল। টেস্ট করা হয়েছে। আর
কর্নেল উত্তেজনা চেপে বললেন, আর কী?
মার্ডার উইপন। ইঞ্জিনের পাশে লুকোনো ছিল রক্তমাখা ছোট্ট ইঞ্চিচারেক লম্বা একটা বিদেশী ছুরি। বাঁটে অবশ্য আঙুলের ছাপ মুছে ফেলা হয়েছে।
গাড়ির ভেতর পেয়েছ ছুরিটা?
গাড়ির ভেতর। ব্লেডের মতো ধারালো ছুরি। রক্তমাখা।
কী করবে ভাবছ–মানে হিমাদ্রিবাবুর ব্যাপারে?
সর্বত্র পুলিশকে অ্যালার্ট করা হয়েছে। দেখা যাক।..অরিজিতের হাসি শোনা গেল। আপনার কাছে এজন্য কৃতজ্ঞ। বনবিহারীবাবুকে ওভাবে প্রশ্ন করার ধৈর্য আমাদের ছিল না–থাকে না কোনোক্ষেত্রেই। অসংখ্য ধন্যবাদ, কর্নেল!
তাহলে তো কেস ইজ সেটলড।
অবশ্যই। সব মার্ডারের ভাইটাল পয়েন্ট যেটা–অর্থাৎ মোটিভ, সেটা হিমাদ্রি রায়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত এস্টাব্লিশড। রুদ্রেন্দুবাবুকে খুন করে সে সুযোগ খুঁজছিল__
একমিনিট, অরিজিৎ! রুদ্রেন্দুবাবুকে খুনের মোটিভ নিশ্চয় স্পষ্ট। কিন্তু ঊর্মিকে?
আবার অরিজিতের হাসি শোনা গেল।সেও আরও স্পষ্ট। আমরা কাল দুপুর থেকে একটানা কাজ করছি। সংক্ষেপে বলছি, শুনুন। মৃগাঙ্কবাবুর যে বন্ধুর বাড়ি বিয়েতে গিয়ে ঊর্মির সঙ্গে পরিচয় হয়, সে-ভদ্রলোকের নাম সুব্রত সিংহরায়। সুব্রতবাবু ওঁদের-মানে মৃগাঙ্কবাবু, ঊর্মি আর হিমাদ্রির কমন ফ্রেন্ড। ওঁর একটা ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কারবার আছে। ওঁর এক বোনের শ্বশুরবাড়ি পাটনায়। সেই সুত্রেই ঊর্মির সঙ্গে ওঁদের চেনাজানা। হিমাদ্রিবাবুর চেনাজানা মৃগাঙ্কবাবুরই সূত্রে। তো সুব্রতবাবুর কাছে জানা গেছে, মৃগাঙ্কের সঙ্গে ঊর্মির মাখামাখিতে হিমাদ্রি ভীষণ চটে গিয়েছিল। সুব্রতবাবুকে বলেছিল, ঊর্মির চরিত্র ভাল নয়।
শুধু এই?
ওয়েট, ওয়েট! আরও আছে। সুব্রতবাবু স্বীকার করেছেন, হিমাদ্রি ও ঊর্মির মধ্যে পুরনো প্রেম ছিল। কাজেই ঊর্মি মৃগাঙ্কবাবুকে বিয়ে করায় সে প্রতিহিংসাবশে তাকে খুন করেছে। অবশ্য আমার ধারণা সুব্রত আরও কিছু ব্যাপার জানেন হিমাদ্রি সম্পর্কে। কোনো কারণে চেপে যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের হাবভাব দেখেও মনে হয়েছে, কেমন যেন নার্ভাস হয়ে গেছেন। এর একটাই অর্থ হয়। উনি হিমাদ্রিকে ভীষণ ভয় করেন।
কিন্তু
কিন্তু কিসের? দেখুন না, শিগগির আমরা দেশের সব ন্যাশনাল ডেলিতে হিমাদ্রির ছবি ছাপিয়ে ওয়ান্টেড বলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি।
ডার্লিং! হিমাদ্রিকে তাহলে আর খুঁজে পাবে না।
পুরস্কার ঘোষণা থাকবে। পাবলিক হেল্প করবে টাকার লোভে।
যদি হিমাদ্রি নির্দোষ হয়, ভেবে দেখেছ কি ওর কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে?
আশ্চর্য, কর্নেল! কেস তো সেটলড।
হুঁ, ইট অ্যাপিয়ার্স অ্যাজ সেটলড। গাড়ির ভেতর মার্ডার উইপন, স্টিয়ারিঙে রক্তের ছাপ, সিগারেট লাইটারে আঙুলের ছাপ। কিন্তু রঞ্জনবাবুর স্ত্রী বলেছেন, দুজন লোক এসেছিল, মৃগাঙ্কের ফ্ল্যাটে। কিছুক্ষণ অন্তর দুবার নক করার শব্দ শুনেছিলেন। তাছাড়া ঊর্মির সুটকেস চুরি গেল। অরিজিৎ, কেস কি সত্যি সেটলড?
ধরুন, হিমাদ্রি খুন করে চলে যাবার পর মৃগাঙ্কবাবুর কোনো বন্ধু বা কোনো চেনা লোক মৃগাঙ্কবাবুর খোঁজেই এসেছিলেন। সাড়া না পেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন।
কিন্তু স্যুটকেস কেন চুরি গেল? কে চুরি করল? আর লোকাল থানায় ফোন করে খুনের কথা জানিয়েছিল কে?
হিমাদ্রি নিজে অথবা কোনো ক্রিমিন্যালকে দিয়ে চুরি করিয়েছে। স্যুটকেসে নিশ্চয় পুরনো প্রেমপত্র ছিল। ঊর্মির সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রমাণ হয়ে যাবে ভেবেই একাজ সে করেছে। আর ফোনের ব্যাপারটা তদন্ত করা হচ্ছে।
তাহলেও হুট করে বিজ্ঞাপন দেওয়া উচিত হবে না, অরিজিৎ।
ভীষণ চাপ আসছে রাইটার্স থেকে। সামলাতে পারছি না কর্নেল! বিজ্ঞাপনটা ছাপা হলে বোঝাতে পারব, আমরা চুপচাপ বসে নেই।
বিহার পুলিশ থেকে আশা করি রিপোর্ট পেয়ে গেছ?
কিছুক্ষণ আগে পেয়েছি। তবে হিমাদ্রির নামগন্ধ নেই। সেতাপগঞ্জের জনৈক রঘুনাথ সাহুর সঙ্গে ঊর্মির বাবার বিবাদের কথা আছে। রঘুনাথ ছিল নকশাল। জমি দখল করে হাঙ্গামা বাধিয়েছিল। ডাকাতি খুনোখুনি আর জেলপালানোর দায়ে তার নামে একডজন কেস ঝুলছে। লোকাল পুলিশ রুদ্ৰেন্দু রায়চৌধুরীর মার্ডারের জন্য রঘুনাথের নামে এফ আই আর করেছে।
রঘুনাথ জেল থেকে পালিয়েছিল?
পাটনা জেল থেকে মাসচার আগে পালিয়ে গেছে।
একটা শ্বাস ছেড়ে কর্নেল বললেন, আচ্ছা, ছাড়ি ডার্লিং।
আপনি যাচ্ছেন নাকি সেতাপগঞ্জে?
দেখা যাক। বলে কর্নেল ফোন রেখে দিলেন।
একটু পরে ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে ঊর্মির ছবিটা আবার বের করলেন। ছবির ভেতর হিমাদ্রির আদল–নাকি অন্য কেউ, মুখটা আগের মতো আবছা। কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না। অথচ হিমাদ্রি ওই ফ্ল্যাটে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত। কিন্তু আরেকজনও নক করেছিল দরজায়।
কে আগে ঢুকেছিল, এটাই গুরুত্বপূর্ণ। লাইটারটা যখন নিশ্চিত হিমাদ্রির, তখন সে ও ঘরে সিগারেট খেয়েছিল। কথা হচ্ছে, তখন ঊর্মি জীবিত, না মৃত? ঊর্মির লাস পাওয়া যায় দরজার কাছে এবং লাইটারটা বেডরুমের মেঝেয় খাটের নিচে। ঊর্মিকে দরজার কাছে খুন করে তার বেডরুমে গিয়ে সিগারেট খাওয়ানাঃ। যত নার্ভই থাক, এটা পাগলামি স্রেফ। কাজেই জীবিত ঊর্মির সামনেই সিগারেট খেয়েছিল হিমাদ্রি। সেক্সের ব্যাপারটাও এসে যায় এ পরিবেশে। মৃগাঙ্ক সুদূর বোম্বেতে।
কর্নেল চুরুট জ্বেলে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। ঠোঁটে জ্বলন্ত চুরুটটা কামড়ানো। অভ্যাসমতো শাদা দাড়িতে আঙুলের চিরুনি টানতে থাকলেন।
অনুমান নয়, নিশ্চিত তথ্য থেকে ডিডাকশান করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো যায়। এবং তা থেকে এও বেরিয়ে আসে যে হিমাদ্রিই যদি তারপর ঊর্মিকে খুন করে থাকে (ধরা যাক, বেরিয়ে আসার সময় দরজার কাছে গিয়েই তাকে ধরে তার গলায় ড্যাগার চালায়), তাহলে লাইটারের খোঁজে সে ফিরে যেতে পারে ওই ফ্ল্যাটে। কিন্তু তাহলে আবার সে দরজায় নক করবে কেন?সে তো জানে দরজা খোলা আছে!
কাজেই লাইটারের খোঁজে সে দ্বিতীয়বার যায়নি। আরেকজন এসে দরজায় নক করেছিল। দরজা ভেতর থেকে লক করা নেই দেখে সে দরজা খুলেছিল। তারপর ঊর্মির ডেডবডি দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই কি ফোন করেছিল থানায়? কে সে? অরিজিৎ বলল, মৃগাঙ্কের কোনো বন্ধু বা চেনা লোক দ্বিতীয়বার দরজায় নক করে থাকবে। হ্যাঁ, সেও স্বাভাবিক। পুলিশ এভাবেই কেসটা দাঁড় করাচ্ছে। হিমাদ্রির বাঁচার উপায় নেই। ঊর্মির সঙ্গে তার পুরাতন প্রেম যখন, তখন তার সাহায্যে ওদের ফ্ল্যাটের চাবির একটা ডুপ্লিকেট বানিয়ে নেওয়া তার পক্ষে কঠিন ছিল না। স্যুটকেসে প্রেমপত্র ছিল অনেকদিনের। হিমাদ্রি তাই ওটা নিজে না হলেও কারুর সাহায্যে চুরি করিয়েছে। উদ্দেশ্য, কোনো সম্পর্ক থাকার প্রমাণ লোপ। নাঃ, হিমাদ্রি বাঁধা পড়ে গেছে। তাকে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে একেবারে।
আর মোটিভও স্পষ্ট, মজবুত। অথচ…
কর্নেল চোখ খুললেন। হিমাদ্রির পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার। আরও অনেক তথ্য চাই। তার চরিত্র, তার অতীতকাল, তার সাম্প্রতিক গতিবিধি। কারণ কোথায় যেন হিসেবে মিলছে না। কী একটা গণ্ডগোল থেকে যাচ্ছে।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে ফোন তুললেন। সাতটা বাজে। যদি পাওয়া যায় মৃগাঙ্ককে। ফ্ল্যাটে না থাকলে অফিসে। অফিসে নাকি কোনো-কোনোদিন সন্ধ্যার পরও থাকে।
প্রথমে ওর ফ্ল্যাটে রিং করলেন। পাওয়া গেল মৃগাঙ্ককে। কর্নেল বললেন, একটু বিরক্ত করছি, মৃগাঙ্কবাবু!
না, না। আমিই আপনাকে রিং করব ভাবছিলাম!
তাই বুঝি? তাহলে আপনিই আগে বলুন।
সেই স্যুটকেসটা পাওয়া গেছে। মিঃ লাহিড়ীকে জানিয়ে দেবেন প্লিজ।
পাওয়া গেছে? কোথায়?
নিচের গ্যারেজে দারোয়ান কুড়িয়ে পেয়ে কাল সকালেই আমাদের কোঅপারেটিভ অফিসে জমা দিয়েছিল। ওরা তো জানত না ব্যাপারটা। হঠাৎ কিছুক্ষণ আগে ফোন করে জানিয়েছিল। ওরা অবশ্য সব ফ্ল্যাটেই ফোন করেছিল। আমি নিয়ে এসেছি।
কী অবস্থায় পেলেন?
তালা ভাঙা। ভেতরে ঊর্মির ছোটবেলার খেলনা, পুতুলের পোশাক, এইসব হাবিজাবি জিনিসপত্র আছে। কিছু ইমপর্ট্যান্ট জিনিস নিশ্চয় ছিল। নৈলে চুরি যাবে কেন?
তেমন কিছু নেই স্যুটকেসে?
না।
মৃগাঙ্কের ঘরে কেউ আছে যেন। আবছা শোনা গেল, কাকে ধমক দিয়ে কী বলল। কর্নেল বললেন, হ্যালো! হ্যালো!
আছি বলুন কর্নেল!
একটা কথা জানা দরকার। হিমাদ্রিবাবুর সঙ্গে আপনার কীভাবে আলাপ?
আমার একটা ছোটখাট কারখানাও আছে। কোল-ডাস্ট দরকার হয়। কোল ইন্ডিয়া থেকে কিনি। সেই সূত্রে হিমাদ্রির সঙ্গে আলাপ।
আপনি শুনেছেন কি যে সিগারেট লাইটারটা হিমাদ্রিবাবুর?
কয়েক সেকেন্ড পরে মৃগাঙ্ক আস্তে বলল, আমি জানতাম।
জানতেন?
মানে জাস্ট অনুমান। তাছাড়া সুব্রত সিংহরায় নামে আমার এক বন্ধু আছে, তার বোন পাটনায় থাকে। সে আমাকে হিমাদ্রি আর ঊর্মির কিছু ঘটনা বলেছিল। আমি পাত্তা দিইনি। আসলে তখন আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
শুনুন। হিমাদ্রিই খুনী বলে পুলিশ সিওর হয়েছে। অরিজিৎ আপনাকে জানাবে সব। ইতিমধ্যে একটা কথা বলতে চাই আপনাকে।
বলুন!
হিমাদ্রি ফেরার হয়েছে। তাকে ধরার জন্য পুলিশ কাগজে বিজ্ঞাপন দেবে। শিগগির। পুলিশের ধারণা, এ সব ক্ষেত্রে পুরস্কার ঘোষণা না করা হলে পাবলিক হেল্প পাওয়া যাবে না। আপনি কি–
আমাকে কী করতে হবে বলুন, করব।
প্রাইজমানি গভর্নমেন্ট যদি না দেয়, আপনি দেবেন কি?
নিশ্চয় দেব। কেন দেব না?
এক সেকেন্ড! ছাড়বেন না প্লিজ! আর একটা কথা আছে।
বলুন।
কথাটা আপনার প্রতিবেশী রঞ্জনবাবুর কুকুর সম্পর্কে।
কুকুর সম্পর্কে? কী ব্যাপার বলুন তো?
কুকুরটা সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
কুকুর-টুকুর নিয়ে আমি ভাবি না। আপনার প্রশ্নটা ভারি অদ্ভুত!
ভুলে যাবেন না মৃগাঙ্কবাবু! কুকুরটা সেদিন যথেষ্ট
ড্যাম ইট! হোয়াট হেল আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?
আপনি কি কখনও কুকুর পুষেছেন মৃগাঙ্কবাবু?
নেভার। আই হেট দ্যাট ব্লাডি অ্যানিম্যাল! কিন্তু হঠাৎ এসব কথা বলছেন কেন?
রঞ্জনবাবুর অ্যালসেসিয়ানটার ভয়েই নাকি আপনাদের ফ্লোরের এক নম্বর ফ্ল্যাটের সাউথ ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক ফ্ল্যাট বেচতে চাইছেন!
আমি জানি না। খবর রাখি না।
আশাকরি কুকুরটা আপনার কোনো প্রব্লেম বাধায়নি কখনও?
কিন্তু কেন এসব কথা–
শুনুন, আমি একনম্বর ফ্ল্যাটটা কিনতে চাই। আমারও কুকুরভীতি প্রচণ্ড। তাই জিগ্যেস করছি।
তাই বলুন! মৃগাঙ্কের হাসি শোনা গেল। রঞ্জনবাবুর কুকুরটা অনেককেই পছন্দ করে না দেখেছি। আমাকেও করে না। আপনাকে করবে কি না বলা কঠিন। প্রথম-প্রথম তো ছাড়া থাকত। অনেকে কমপ্লেন করার পর আজকাল বেঁধে রাখে। একবার আমার বুকে দুই পা তুলে গলা কামড়াতে এসেছিল। ভেরি ন্যাস্টি ডগ!
ছাড়ছি মৃগাঙ্কবাবু!
কিছু মনে করবেন না যেন। ইদানীং আমার মেজাজটা ভাল যাচ্ছে না।
জানি। থ্যাঙ্কস মৃগাঙ্কবাবু!
ফোন রেখে কর্নেল হাসতে লাগলেন। ষষ্ঠী কাপ নিতে এসে বলল, হাসছেন কেন বাবামশাই?
তোকে দেখে।
ষষ্ঠী নিজেকে দেখার চেষ্টা করে ক্ষুব্ধ মুখে বলল, আমি কি সার্কেসবাজির কেলাউন সেজেছি নাকি? এই গেঞ্জিটা তো আপনিই কিনে এনেছেন! হাসলে পরে খুলে রেখে দেব।
কর্নেল তক্ষুনি গম্ভীর হয়ে বললেন, তুই যদি ওটা খুলে রাখিস, আমি নিচের ফ্ল্যাটের মিসেস ডিসুজার কুকুরটা এনে তোর পেছনে লেলিয়ে দেব হতভাগা!
ষষ্ঠী আঁতকে উঠে চলে গেল। মেমসায়েবের কুকুরটা তার গাল চাটতে আসে। ছ্যা ছ্যা।
কর্নেল আবার চোখ বুজলেন। স্যুটকেসটা তাহলে পাওয়া গেছে। কী ছিল ওর মধ্যে? ছোটবেলার খেলনা বা তুচ্ছ অনেক জিনিস কেউ কেউ যত্ন করে রেখে দেয়। মেয়েদের এ স্বভাব আছে। কর্নেলের মা তার বাচ্চা বয়সের পোশাকগুলো রেখে দিয়েছিলেন। পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা যেন বেশি স্মৃতি অনুগামী। ঊর্মির স্যুটকেসের জিনিসগুলো একবার দেখলে হত। মৃগাঙ্কের কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি, কর্নেলের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ হতেও পারে। কিছু বলা যায় না।
হুঁ–সেতাপগঞ্জ যাবেন। তার আগে কিছু জরুরি কাজ সেরে নেওয়া দরকার।
বাইরের ঘরের ওদিকে কলিং বেল বাজল। একটু পরে ষষ্ঠী এসে বলল, এক ভদ্রলোক এয়েছেন।
নিয়ে আয়।
যিনি ঢুকলেন, তার পরনে ঢোলা প্যান্ট-শার্ট, মাথায় কর্নেলের চেয়েও চওড়া টাক। বয়স বোঝা কঠিন। রোগা চ্যাঙা চেহারা। নাকে নস্যির ছোপ। নমস্কার করে বসে পড়লেন সোফায়…
