এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
নস্টালজিয়া
সুনেত্রা চিঠি পোস্ট করতে গিয়েছিল ডাকঘরে। ফেরার সময় গঙ্গার ধারে উঁচু বাঁধের ওপর পিচের রাস্তা ধরে আসছিল। এ সড়ক মুঙ্গের হয়ে চলে গেছে পাটনার দিকে। নিচে বর্ষার গঙ্গা ফুলে উঠেছে। ভাগ্যিস এবার বর্ষাটা কম। বেশির ভাগ সময় আকাশ পরিষ্কার, উজ্জ্বল রোদ্দুর–হঠাৎ কখনও একটুখানি মেঘ, তারপর ঝিরঝির করে বৃষ্টি কিছুক্ষণ।
আজ সকাল থেকে অবশ্য মেঘ করে আছে। হাল্কা সাদা মেঘ, কোথাও রঙটা সামান্য ধূসর। ভরা গঙ্গায় পাল উড়িয়ে নৌকো চলেছে। স্টেশনঘাটের নিচে অসংখ্য নৌকোর ঝক। দূরে চরের ওপর হঠাৎ রোদ্দুর আবার হঠাৎ মেঘের ছায়া খেলা করছে।
কর্নেল চিঠিটা পেয়ে অবাক হয়ে যাবেন হয়তো। কিন্তু গুরুত্ব দেবেন কি? বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো ইতিমধ্যে আবার কতবার আসতেন কর্নেল! বাবা। যেমন ছিলেন, তেমনি উনিও এক পাগলা মানুষ। পাখি-প্রজাপতির পেছনে সারাদিন টোটো করে মাইলের পর মাইল ঘুরে কী পান, কে জানে! সুনেত্রা লিখেছে, ডানায় হলুদ-লাল ফুটকিওয়ালা সেই কালো প্রজাপতিগুলো ইটখোলার জঙ্গলে বেরিয়ে পড়েছে। সেবার তো একটা ধরতেই হন্যে হয়েছিলেন। এবার একশোটা ধরতে পারবেন শুধু হাত বাড়িয়ে। জালের দরকার হবে না। আর উড্ডাকের কথা বলেছিলেন। শুশানের ওখানে আশ্বত্থ গাছে একজোড়া উড্ডাক এসে জুটেছে। চিঠি পেয়েই চলে না এলে পালিয়ে যাবে। লোকের যা অত্যাচার!
ঊর্মির অদ্ভুত চিঠিটার কথা সে লেখেনি। কর্নেল এলে তাঁকে দেখাবে। ঊর্মি বেচারীও ওর বাবার মতো মারা পড়ল। ঊর্মির জন্য বড় কষ্ট হয় সুনেত্রার। ছোটবেলায় দুজনে কী কাণ্ড না করে বেড়িয়েছে। আর হিমুদা! সে এসে জুটলে চলে যেত সেই ধোয়াড়ির দহে। সাঁতার শিখতে যেত লুকিয়ে। ফেরার পথে আস্তরের জঙ্গল হয়ে আসার সময় পাকা বৈঁচি পেড়ে খেত। মালা গেঁথে নিয়ে। আসত। কথাটা আস্তর নয়, আতর। ওই জঙ্গলে মাঝেমাঝে আতরের সুগন্ধ ওঠে। একবার ভরদুপুরে সেই গন্ধ পেয়ে ঊর্মি ভয়ে কাঠ। কিছুতেই তাকে আটকানো গেল না। বাড়ি ফিরে সুনেত্রা শুনল, ঊর্মিকে পেয়ারা গাছে বেঁধে খুব পিট্টি দিয়েছে ওর বাবা।
বরদাবাবু ছিলেন অন্যরকম মানুষ। সুনেত্রার এসব দুষ্টুমির প্রশ্রয় দিতেন বরং। রুদ্রবাবুকে বলতেন দেখবে, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো না হয়। বেশি শাসন করলে একদিন মেয়ে দেখবে চম্বলের ডাকুরানী হয়ে উঠেছে।
সুনেত্রা জানে ঊর্মি যত বেপরোয়া ভাব দেখাক, সে ভেতর-ভেতর ছিল খুব ভীতু প্রকৃতির। পাটনা কলেজে পড়ার সময় মাঝেমাঝে বাড়ি আসত। তখন। অনেকটা বদলে গিয়েছিল। খুব ভদ্র আর স্মার্ট থাকার চেষ্টা করত! ইংরেজি বলত অনর্গল। সুনেত্রাও এখানকার মিশনারি স্কুলকলেজে পড়েছে। কিন্তু ইংরেজি বলতে খারাপ লাগে। বরং হিন্দিটাই বেশি বলে। বাংলা সামান্য পাড়ানো হত স্কুলে। বাবার তাগিদে বাড়িতে বাঙালি শিক্ষক রেখে শিখেছে। সেতাপগঞ্জে বাংলা স্কুলও ছিল। এখন সেটা হিন্দির চাপে প্রায় বদলে গেছে। অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট হয়ে গেছে বাংলা। এখানে আর বাঙালিদের সে-প্রভাবও নেই। অনেকে চলে গেছে পশ্চিমবঙ্গে। শুধু যাদের জমিজমা আছে, কিংবা অন্য অসুবিধা, তারাই রয়ে গেছে।
সুনেত্রা রাস্তা থেকে ডাইনে ঘুরে রেলফটক পেরুনোর সময় হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেল। ফটকের ঘুপটি ঘরটার পেছনে গিয়ে মাথা বাঁচাবে ভাবল। কিন্তু এই সাতসকালে ফটকওলার ঘর আর বারান্দাজুড়ে একদঙ্গল দেহাতী মুস্কো চেহারার লোক। একটা প্রকাণ্ড কালো কলসী থেকে সাদা তাড়ি ঢেলে গিলছে আর হাসাহাসি করছে। তারা সুনেত্রার দিকে অশালীন দৃষ্টে তাকাচ্ছিল।
সুনেত্রা হনহন করে সর্বমঙ্গলার মন্দিরতলায় গিয়ে ঢুকল। ওপরে প্রকাণ্ড বটগাছ। চারদিকে নিচু পাঁচিল। খুব পুরনো ভাঙাচোরা মন্দির চত্বরের আটচালাটা এবার বর্ষার মুখে ব্যবসায়ীরা মেরামত করে দিয়েছেন। তার তলায় গিয়ে দাঁড়াতেই চমকে উঠল সুনেত্রা।
একটা থামে হেলান দিয়ে পিছন ফিরে কেউ সিগারেট টানছিল। মুখটা ঘুরিয়েছে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গায়ে নীলচে টিশার্ট, ছাইরঙা প্যান্ট পরনে। দারুণ ঝকমকে চেহারা।
সুনেত্রা আধমিনিট পরে শুনল, তুমি বিবি না?
সুনেত্রা হেসে ফেলল। হিমুদা!
হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলল, মেয়েদের ঝটপট সবকিছু বদলে যায়। ইশ! তুমি তো একেবারে মহিলা হয়ে উঠেছ বিবি!
সুনেত্রা অবাক চোখে ওকে দেখছিল। বলল, কবে এসেছ তুমি। আমাদের বাড়ি যাওনি কেন? কতবছর পরে তোমাকে দেখছি বলো তো!
হিমাদ্রি বলল, পাটনা গিয়েছিলাম অফিসের কাজে। কলকাতা ফেরার সময় হঠাৎ নেমে পড়েছি গতকাল। জন্মভূমি দর্শনের ইচ্ছে হল।
আশ্চর্য! উঠেছ কোথায়?
স্টেশনে রেস্টরুমে। ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যার ট্রেনে ফিরে যাব ভাবছি।
যাওয়াচ্ছি! চলো, ব্যাগেজ নিয়ে আমাদের বাড়ি যাবে।
আরে! বৃষ্টির মধ্যে–একটু দাঁড়াও। বৃষ্টি ছাড়ুক, তারপর দেখা যাবে।
সুনেত্রা উঁকি মেরে আকাশ দেখল। তারপর হিমাদ্রির দিকে ঘুরে মুখ টিপে হাসল। আশ্চর্য! তুমি কাউকে দেখা না করে চলে যেতে? আজিব আদমি!
হিমাদ্রি হাসতে লাগল। এখনও খোট্টাই চাল বজায় রেখেছ, বিবি!
মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। যস্মিন দেশে যদাচার। সুনেত্রা একটু গম্ভীর হল হঠাৎ। হিমুদা, তুমি জানো, টুকুর বাবা মার্ডার হয়েছে–লাস্ট এপ্রিলে?
জানি। টুকুও তো একইভাবে
ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত। তাই না? তারিখ সেই এগারো!
হিমাদ্রি আস্তে বলল, হ্যাঁ। কিছু বোঝা যায় না।
সুনেত্রা চাপা গলায় বলল, গত শীতের সময় থেকে বসন্তনিবাসে অদ্ভুত অদ্ভুত কাণ্ড হচ্ছিল। আমার খালি মনে হত, ওদের কিছু বিপদ ঘটবে। ঘটল।
হিমাদ্রি তাকাল। কেন মনে হত?
সুনেত্রা একটু চুপ করে থাকার পর বল, এ সবই রঘুনাথের কাণ্ড।
রঘুনাথ মানে?
রঘুয়া! সাহুজীর ছেলে। তোমার সঙ্গেও তো খাতির ছিল ওর।
ও, রঘুয়া! সে এখন কী করে? সে তো নকশাল ছিল একসময়।
কিছুদিন খুব পলিটিকস করে বেড়াচ্ছিল। টুকুর বাবার সঙ্গে জমিটমি নিয়ে খুব লড়াই করেছিল। তারপর একটা ডাকাতি কেসে ফেঁসে গিয়েছিল–আমার ধারণা, রুদ্রজ্যাঠাই এর পেছনে ছিলেন। গত পুজোর সময় শুনলাম, জেল থেকে পালিয়ে গেছে ও।
হিমাদ্রি হাসবার চেষ্টা করল। কিন্তু সে ঊর্মিকে খুন করবে কেন?
সুনেত্রা ফিসফিস করে বলল, কিছুদিন আগে টুকুর একটা চিঠি পেয়েছিলাম। লিখেছিল, ওর বরের সঙ্গে কোন হোটেলে একটা পার্টিতে গিয়ে সেখানে। রঘুনাথকে দৈখেছে। ভয় পেয়ে শরীর খারাপ করছে বলে চলে আসে টুকু।
হিমাদ্রি একটু উত্তেজিতভাবে বলল, রঘুয়াকে ঊর্মির অত ভয় পাবার কারণ কী?
সুনেত্রা তাকাল বড়ো বড়ো চোখে। তুমি জান না?
কী?
সুনেত্রা আবার ফিসফিস করে বলল, রঘুনাথের সঙ্গে টুকুর রিলেশান ছিল পাটনায় থাকার সময়। রঘুনাথও তো পাটনা কলেজে পড়ত। ওদের ঝি মনিয়াবুড়ির কাছে শুনতাম এসব। রঘুনাথ নাকি রুদ্রজেঠুকে সামনাসামনি বলেছিল টুকুর সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। রুদ্রজেঠু ওকে গুলি করতে বন্দুক বের করেছিলেন পর্যন্ত।
হিমাদ্রি বাঁকা মুখে বলল, ছেড়ে দাও! ঊর্মি ভাল মেয়ে ছিল না–সে তুমিও যেমন জান, আমিও তেমনি জানি।
বৃষ্টিটা থেমে গেছে। সুনেত্রা বলল, চলো স্টেশনে যাই হিমুদা! জিনিসপত্র নিয়ে রিকশো করে–
কিন্তু আমার যে ছুটি নেই!
সুনেত্রা নিঃসঙ্কোচে তার হাত ধরে টানল। ছোড়ো জী! বলেই সে ঘুরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। মা তোমাকে দেখলে ভীষণ খুশি হবে। প্রায়ই তোমাদের কথা বলে।
হিমাদ্রি মুখে আনন্দ আর স্বস্তিটা প্রকাশ করতে পারছিল না। রেস্টরুমে ব্যাগেজ রেখে সে আসলে মনস্থির করতে এসেছিল নির্জনে। বুঝতে পারেনি, কোথায় কার বাড়ি উঠবে, তারা কীভাবে নেবে তাকে। তার এখানে কিছুদিন থাকা দরকার। ঊর্মি বা তার বাবার খুনী কে, সেটা খুঁজে বের করার তাগিদ সেই ভয়ঙ্কর সন্ধ্যার পর থেকে তার মাথায় ঢুকে গেছে। হয়তো আত্মরক্ষার স্বার্থেই। তার বিশ্বাস, পুলিশ তার সেদিন ওই ফ্ল্যাটে উপস্থিতির সূত্র যদি পায়ও কোনোভাবে, তার কাছে আসার আগেই সে খুনীকে ধরে ফেলতে পারবে।
সুনেত্রা অনর্গল কথা বলতে বলতে হাঁটছিল রেললাইন ধরে। হিমাদ্রি শুনছিল না। দেখছিল–মনের ভেতর আঁধারে একটা আবছা মূর্তি। তার হাতে ঠাণ্ডা নীল একটুকরো ইস্পাতের ফলা।……
