এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

সেতার শিল্পী বনবিহারী

ভবানীপুরের দিকে এগোচ্ছিল শাদা ফিয়াট। অরিজিৎ বললেন, ওই ভদ্রমহিলা– মানে রঞ্জনবাবুর স্ত্রী সম্ভবত আরও কিছু জানেন। চেপে গেলেন। তাই না কর্নেল?

 

কর্নেল একটু হাসলেন। কেন একথা মনে হল তোমার?

 

মাই গুডনেস! সেটা আমাকেই বলতে হবে?

 

হবে। কারণ ধারণাটা তোমার।

 

আপনার কী ধারণা?

 

আমি অন্তর্যামী নই, ডার্লিং! বিশেষ করে স্ত্রীলোক সম্পর্কে আমি অতিমাত্রায় অজ্ঞ। ক্রনিক ব্যাচেলার–তোমার ভাষায়।

 

অরিজিৎ হাসতে লাগলেন। আপনি যাই বলুন, ভদ্রমহিলা গভীর জলের। মাছ। অনেককিছু জানেন। একটু চাপ দিলেই আরও কথা বেরিয়ে পড়তে পারে। পুলিশী পদ্ধতি সব সময় ইমিডিয়েট রেজাল্ট দেয়।

 

কর্নেল আধপোড়া চুরুটটা হাওয়া বাঁচিয়ে ধরালেন। আমার পদ্ধতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। সাইকো-অ্যানালেসিস প্রক্রিয়ার মতো। কাউকে মনের কথা বলাতে হলে তার স্বাধীনতাবোধকে এগিয়ে দিতে হয়। আরও একটা ব্যাপার আছে, অরিজিৎ! যার কাছে তথ্য পেতে চাইছ, সে কিন্তু জানে না কোন তথ্যটা তোমার কেসে মূল্যবান বা প্রয়োজনীয়। কাজেই আমার স্লোগান হল, প্রাণ খুলে বলতে দাও। তারপর তুমি সেইসব কথা থেকে তোমার দরকারি জিনিসটা বেছে কুড়িয়ে নাও।

 

বাপস! পুলিশ এ পদ্ধতিতে চললে একেকটা কেসে দশ বছর লেগে যাবে চার্জশিট দিতে।

 

কর্নেল চোখ বুজে সিটে হেলান দিয়েছেন। ঠোঁটে চুরুটটা কামড়ানো। সেই অবস্থায় বললেন, ঊর্মির সুটকেসের ব্যাপারটা আরও জট পাকিয়ে তুলল। দেখছি।

 

খুনী ওই বাড়িতেই আছে–দেখবেন। কারণ মাত্র পাঁচ মিনিটের সুযোগে বাইরের কেউ একাজ সারতে পারে না। তাছাড়া দরজার একটা নকল চাবি করা তার পক্ষেই সম্ভব।

 

কো-অপারেটিভ অফিসে মাস্টার কি আছে কি না জানো?

 

থাকতেও পারে। অনেক বাড়িতে আজকাল থাকে। খোঁজ নেব।

 

স্যুটকেসে কি এমন কিছু ছিল, যা খুনীকে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করত? কর্নেল স্বগতোক্তি করলেন। তাছাড়া ওটা চুরির কারণ কী থাকতে পারে?.. হুঁ স্যুটকেসটা একটা প্রব্লেম এনে ফেলল।

 

অরিজিৎ বললেন, সমস্যা হল, অতগুলো ফ্ল্যাট সার্চ করা একটা বিরাট ঝামেলার ব্যাপার। তাছাড়া অনেক প্রভাবশালী লোকও আছে। দেখুন না, লাইটারের হাতের ছাপের সঙ্গে মৃগাঙ্কবাবুর হাতের ছাপ মেলেনি। কিন্তু যদি ও বাড়ির অন্যান্য লোকের হাতের ছাপ মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেতাম–আমার ধারণা, ঠিক লোকটি বেরিয়ে আসত। কিন্তু সেও বড় অসুবিধার ব্যাপার। প্রায় অসম্ভব। মৃগাঙ্কবাবুর মামা মিনিস্টার। অনেকের মামা হয়তো তার চেয়েও ভি আই পি।

 

অরিজিৎ হাসতে লাগলেন। একটু পরে চোখে ঝিলিক তুলে বললেন ফের, লেকভিলার একটা খালি ফ্ল্যাটে আপনার বসবাসের ব্যবস্থা করতে পারি। থাকবেন নাকি?

 

কর্নেল মাথা দোলালেন। না ডার্লিং! বরং তুমি তোমার কোনো লোককে সপরিবারে ওখানে ঢোকানোর ব্যবস্থা করো। তাতে বেশি কাজ হবে।

 

সিরিয়াসলি বলছেন কি?

 

কর্নেল চোখ বুজে আছেন। ঠোঁটে কামড়ানো চুরুট। জবাব দিলেন না।

 

রাসবিহারী অ্যাভেনিউয়ের মোড়ে মিছিল চলেছে। প্রবল স্লোগানের চাপে কথা বলা মুশকিল।

 

ভবানীপুরে পৌঁছে একটা গলির মুখে গাড়ি রেখে এগিয়ে গেলেন দুজনে। পুরনো একটা দোতলা বাড়ির বারান্দায় উঠে নক করলেন অরিজিৎ। একটু পরে এক প্রৌঢ়া দরজা খুলে বললেন, কাকে চান?

 

বনবিহারীবাবু আছেন কি?

 

আছেন। আপনারা কোত্থেকে আসছেন?

 

ওঁকে বলুন অরিজিৎ লাহিড়ী এসেছেন। বললেন বুঝবেন।

 

একটু পরে ঊর্মির মামা বনবিহারীবাবু এসে সসম্মানে অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বসবার ঘরে জীর্ণতা দাঁত বের করে আছে। মাথার ওপরকার ফ্যানটা পুরনো। নিচের সোফা জীর্ণ। বনবিহারীবাবু মোটাসোটা লম্বাটে চেহারার মানুষ। মুখে অমায়িকতা ঝলমল করছে। বয়স ষাটের কাছাকাছি। কিন্তু সমর্থ শরীর। মাথার চুল বাবরি করে রাখা। খাড়া নাক। পোড়খাওয়া মুখের চামড়া। পুরুষ্টু গোঁফ। চোখদুটো কয়রা। সব মিলিয়ে হিন্দুস্থানী চেহারার ছাপ চোখে পড়ে। কর্নেল বললেন, আপনার ভগ্নীপতি রুদ্রেন্দুবাবু সম্পর্কে কিছু কথা জানতে এসেছি।

 

বেশ তো। বলুন কী জানতে চান?

 

বাই দা বাই, আপনি নিশ্চয় সঙ্গীত চর্চা করেন?

 

বনবিহারীবাবু হাসলেন। আমার চুল দেখে বলছেন তো? আমি–

 

না। আপনার আঙুল দেখে। আপনি সেতারশিল্পী।

 

নিজের ডান তর্জনী দেখে নিয়ে বনবিহারীবাবু বললেন, ওই একটু আধটু– মানে একসময় ভীষণ রেওয়াজ করেছি-টরেছি। এখন বিশেষ না। তাছাড়া সাংসারিক প্রব্লেম। বনবিহারীবাবুর হাসিটা কমে একটু বিষণ্ণতা ঘনিয়ে এল মুখে। ভাগলপুরে থাকার সময় একটু নামটামও হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে সবকিছু সয় না। হঠাৎ আঙুলটাতে ক্র্যাম্প হয়ে গেল। মেজরাব পরলেই ব্যথা করে।

 

আপনি ভাগলপুরে ছিলেন?

 

আমার পৈতৃক বসবাস ওখানেই। কলকাতায় চলে এসেছি বছর বিশেক হবে। স্বাধীনতার পর ওখানকার লোকজন ও পরিবেশ খুব বদলে যাচ্ছিল। চলে। এসেছিলাম অগত্যা। এই বাড়িটা ছিল এক মুসলমান ভদ্রলোকের। ভাগ্যিস বুদ্ধি, করে কিনে নিয়েছিলাম। নৈলে এ বয়সে ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হত।

 

রুদ্ৰেন্দুবাবুদের শুনেছি জমিদারি ছিল সেতাপগঞ্জে?

 

ছিল। খুব দাপটে রাজত্ব করেছে একসময়। তারপর অবস্থা পড়ে গিয়েছিল রুদ্রদার আমলে। ভাগলপুরে থাকার সময়ই ওঁদের সঙ্গে আমাদের ফ্যামিলির আত্মীয়তা হয়।

 

রুদ্ৰেন্দুবাবুও শুনেছি খুব তেজী লোক ছিলেন?

 

একটু হাসলেন বনবিহারীবাবু। সেই তেজেই শেষে প্যারালেসিস। তাছাড়া আর কী বলব?

 

কিন্তু উনিও ওঁর মেজমেয়ের মতো খুন হয়েছেন?

 

বনবিহারীবাবু গম্ভীর হলেন সঙ্গে সঙ্গে। একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ব্যাপারটা খুব মিসট্রিয়াস, জানেন? বিহারের আবহাওয়াই অন্যরকম। পুলিশের ব্যাপার-স্যাপারও অন্যরকম। নৈলে একটা ফয়সালা হয়ে যেত–খুনী ধরা পড়ত। হতভাগিনী মেয়েটাকেও ও ভাবে–

 

ঢোক গিলে শোকের আবেগ সামলে নিলেন। কর্নেল বললেন, আপনার ধারণা একই লোক বাবা ও মেয়েকে খুন করেছে?

 

বনবিহারীবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, রুদ্রদার অনেক শত্রু ছিল একসময়। তবে তারা বেশির ভাগই দেহাতী জোতদার। জমিজমা নিয়ে বিবাদ আর কী! কিন্তু একটা ব্যাপার আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগে। রুদ্রদাকে কোনো শত্রু খুন করতেই পারে। কিন্তু তাঁর তিন মেয়ের ভেতর বেছে শুধু মেজকেই সে খুন করল কেন! ঊর্মির তো বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কম। ছোটবেলা থেকে বাইরে-বাইরে মানুষ। পাটনায় পিসিমার কাছে থেকে পড়াশুনো করেছে। যদুর মনে পড়ে, ক্লাস সেভেনেই ওকে সেতাপগঞ্জ স্কুল থেকে পাটনা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বি এ অব্দি সেখানেই পড়েছে। তারপর মাস চারেক মাত্র বাড়িতে ছিল। আমাকে লিখল কলকাতায় এসে এম এ পড়বে। গিয়ে নিয়ে এলাম ওকে।

 

শুনলাম, বড় বোনের নাকি দেবীর ভর ওঠে।

 

ওই এক ঝামেলা ওদের। একবার তো গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে ডুবে মরতে বসেছিল প্রায়। জেলেরা ভাগ্যিস দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে। ডাক্তাররা কেউ বলেন মৃগী, কেউ বলেন হিস্টিরিয়া। সব রকম চিকিৎসা তো হয়েছেই, এমন কী ওঝা-তান্ত্রিক-ফকির সে সবও যথেষ্ট হয়েছে। ঊর্মির খবর পেয়ে অপু–মানে ছোটবোন অপালা এসেছিল লাস্ট উইকে। তার কাছে শুনলাম, ওর বড়দির মাথায় নাকি একটুখানি জটা দেখা যাচ্ছে। ইদানীং শ্মশানের কাছে মন্দির তলায় গিয়ে নাকি বসেও থাকছে। বাড়ি আসতে চায় না।

 

জোরালো শ্বাস ছাড়লেন বনবিহারীবাবু। কর্নেল বললেন, বাড়িতে দুইবোন ছাড়া আর কে থাকেন?

 

ইন্দুবাবু-ইন্দুমাধব ভট্টাচার্য নামে একজন আছে। পুরনো আমলের কর্মচারী। সেই আগলে রেখেছে সংসারটাকে। আর ধরুন, শ্যামা নামে একজন চাকর। সেও আগের আমলের লোক। আর মনিয়া নামে আদিবাসী মেয়েটা–ঝি বলতে পারেন। আর একজন রাঁধুনী দয়াল নামে। ওড়িশার লোক। কানে কালা।

 

আপনি রুদ্ৰেন্দুবাবুর হাতের লেখা দেখলে চিনতে পারবেন? বনবিহারী। চমকে উঠে তাকালেন মুখের দিকে। তারপর মাথা একটু দুলিয়ে বললেন, হ্যাঁ–পারি। কেন স্যার?

 

কর্নেল পকেট থেকে রুদ্রেন্দুবাবুর লেখা চিঠিটা এগিয়ে দিলেন ওর হাতে। অরিজিৎ অবাক। উঁকি মেরে চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে উত্তেজনা থমথম করছে। বনবিহারীবাবু দ্রুত চিঠিটা পড়ে নিয়ে বললেন, রুদ্রদার হাতের লেখা। হ্যাঁ, রুদ্রদা খুন হওয়ার মাস দু তিন আগে থেকে বাড়িতে নাকি ভৌতিক উপদ্রব হচ্ছিল। আমাকেও লিখেছিল রুদ্রদা। কিন্তু আশ্চর্য তো! আমাকে আপনার কথা কিছু জানায়নি রুদ্রদা। শুধু লিখেছিল, ভৌতিক উপদ্রব হচ্ছে।

 

ভৌতিক উপদ্রব মানে?

 

বনবিহারীবাবু হাসবার চেষ্টা করলেন। দেখুন স্যার, আমি নাস্তিক মানুষ। ভূত-ভগবানে বিশ্বাস নেই। ওসব কোনো শত্রুর কারসাজি। বললাম না? জমিদারি রক্তের দাপটে রুদ্রদা অসংখ্য লোককে শক্ত করে ফেলেছিল।

 

কী উপদ্রব হত?

 

রাতবিরেতে ঢিল পড়ত। ওদের বাড়ির পেছনে বাগান আছে। এখন অযত্নে জঙ্গল হয়ে গেছে। সেখানে একটা ফোয়ারাও ছিল একসময়। মদ্যিখানে লাইমকংক্রিটের বেদির ওপর একটা বিদেশী স্কাল্পচার আছে। রুদ্রদার ঠাকুর্দরা আমলের। এখন ওটা বোঝাই যায় না কিসের মূর্তি ছিল। তো সেটা নাকি রাতে চলাফেরা করে বেড়াত বাগানে। রুদ্রদা একরাতে দেখতে পেয়ে বন্দুক নিয়ে। দৌড়ে যান। তারপর কিন্তু ভয় পেয়ে পালাতে গিয়ে পড়ে যান। ব্যস! সেই আছাড় খেয়ে একেবারে পক্ষাঘাত।

 

এ ব্যাপারে আপনার কী ধারণা বনবিহারীবাবু?

 

বনবিহারী গুম হয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, কেউ রুদ্রদাকে ভয় দেখাত। তবে আমি একবার গিয়ে রাত্রি জেগে ওত পেতে থেকেছি। কিছু ঘটেনি, তেমন কিছু দেখিও নি।

 

রুদ্রবাবু খুন হন কীভাবে।

 

গত এগারো এপ্রিল ভোরে অপু বাবার ঘরে রোজকার মতো ফুল দিতে গিয়ে দেখে, রুদ্রদার ঘরের দরজা ফাঁক হয়ে আছে আর একটা হাত বেরিয়ে আছে। সে ভেবেছিল, বাবা বেরুতে গিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। কিন্তু কপাট ঠেলে দেখতে পায়, গলা ফাঁক হয়ে আছে। চাপচাপ জমাটবাঁধা রক্ত।

 

কর্নেল আনমনে বললেন, এগারো এপ্রিল! খুনীর কাছে এগারো তারিখটা পছন্দসই।

 

সেই প্রৌঢ়া মহিলা–বনবিহারীবাবুর স্ত্রী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ কথা শুনছিলেন। এবার চাপা গলায় উত্তেজিতভাবে বললেন, আগের সন্ধ্যার ঘটনাটা বলো ওঁদের! নৈলে বুঝবেন কী করে?

 

বনবিহারীবাবু বললেন, ও হ্যাঁ। আগের সন্ধ্যায় খুকু, মানে রুদ্রদার বড় মেয়ে শ্রাবন্তী বাগানে গিয়েছিল কী জন্য। হঠাৎ জোরে চেঁচিয়ে ওঠে। বাড়ির লোকেরা দৌড়ে যায়। গিয়ে দেখে খুকুর ভর উঠেছে। নাকিস্বরে সুর ধরে বলছে, আজ তোর শেষদিন রুদ্র…

 

তাই বুঝি? আশ্চর্য তো! অরিজিৎ বললেন।

 

হ্যাঁ। গিয়ে ইন্দুর কাছে সব শুনেছিলাম। তখন খুকুর কাছে সে ছিল। মানিয়া ছিল। শ্যামা ছিল। অপুও দাঁড়িয়ে শুনেছিল দোতলার বারান্দা থেকে। ওই এক কথা–আজ তোর শেষদিন রুদ্র। বারবার ওই কথাটা বলছিল খুকু। পরে যখন। জ্ঞান ফিরল, তখন জিগ্যেস করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কিছু জানে না।

 

কর্নেল বললেন, সেরাতে কোনো প্রিকশান নেওয়া হয়নি?

 

খুকুর কথায় গুরুত্ব দেওয়ার কারণ ছিল না। ভর ওঠার সময় সে বাবাকে নাম ধরে অশ্লীল গালাগালি করত। শাসাত। কাজেই ওর ওসব কথা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল। বরং সবাই হাসাহাসি করত। রুদ্রদাও।

 

এতক্ষণে চা এবং প্লেটে সন্দেশ বিস্কুট নিয়ে এল ফ্ৰকপরা একটি মেয়ে। বাড়িতে কাজকর্ম করে এমন মেয়ে। সে প্যাটপ্যাট করে দাড়িওলা কর্নেলকে দেখতে থাকল। প্রৌঢ়া ধমক দিলে সে ফিক করে হেসে চলে গেল।

 

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, কোনো দুর্বোধ্য কারণে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের আমি দ্রষ্টব্য।

 

অরিজিৎ মন্তব্য করলেন, সান্তা ক্লজ মনে করে আর কী! জ্যান্ত সান্তা ক্লজ!

 

বনবিহারীবাবু বললেন, ওনাকে দেখলে সায়েব মনে করে, তাই। সায়েবরা এখনও এদেশের ছোটদের কাছে আজগুবি মানুষ।

 

আমি খাঁটি বাঙালি। বলে কর্নেল চায়ে বিস্কুট ডোবালেন। তারপর ছোটদের মতো চুষতে থাকলেন। শাদা দাড়িতে গলিত বিস্কুট মেখে গেল। টের পেলেন না।

 

চা খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন কর্নেল। অসংখ্য ধন্যবাদ বনবিহারীবাবু। চলি, পরে আপনাকে আবার দরকার হতেও পারে। তবে আপাতত অনেক খবর পাওয়া গেল আপনার কাছে।

 

বনবিহারীবাবু করযোড়ে বললেন, একটা অনুরোধ স্যার। আপনারা বিহার পুলিশকে একটু তাগিদ দেবার ব্যবস্থা করুন। আমার বিশ্বাস খুনী ধরা পড়ে যাবে।

 

অরিজিৎ বললেন, তা আর বলতে! এই ব্যাকগ্রাউন্ডটা আমাদের দেয়নি ওরা। দেখি, এবার কতটা এগোনো যায় নতুন অ্যাঙ্গেলে।

 

কর্নেল দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে বললেন, বনবিহারীবাবু, আর একটু কথা।

 

বলুন স্যার!

 

প্লিজ স্যার-ট্যার বলবেন না। আমি সাধারণ মানুষ আপনার মতোই। শুধু কর্নেল বললেই আমি খুশি হই। কর্নেল নিভন্ত চুরুট জ্বেলে নিলেন। কথাটা হল ঊর্মি সম্পর্কে। ঊর্মিকে কেন বাইরে রেখে পড়াশুনো করানো হয়েছিল? নিশ্চয় জানেন আপনি।

 

বনবিহারীবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, তিন বোনই কমবেশি তেজী আর ডানপিটে মেয়ে। ঊর্মি একটা বয়স পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডানপিটে প্রকৃতির ছিল। এখন যেমন অপু হয়েছে।

 

শুধু কি এটাই কারণ?

 

প্রৌঢ়া এটু রাগ দেখিয়ে বললেন, বলতে তোতলামি করছ কেন? গুণের ভাগ্নী সব! দেখো, আরও কী বরাতে আছে ওদের!

 

বনবিহারীবাবু অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। সামলে নিয়ে বললেন, আসলে ঊর্মির একার দোষ ছিল না। ওদের প্রতিবেশী ছিলেন এক বাঙালি ভদ্রলোক। তিনি ছিলেন ডাক্তার। তার ছেলেটা ছিল হাড়ে বজ্জাত প্রকৃতির। তারই অত্যাচারে রুদ্রদা টুকু–মানে ঊর্মিকে পাটনায় রেখে আসেন। নৈলে কবে ইলোপ করে ফেলত।

 

আপনি চিনতেন ডাক্তারের ছেলেকে?

 

খুব চিনতাম। এখন অবশ্য ভীষণ বদলে গেছে। একদিন দেখা হয়েছিল ওমাসে। প্রণাম করল পায়ে হাত দিয়ে। বলল, কোল ইন্ডিয়ায় অফিসার হয়ে কলকাতা অফিসে আছে।

 

কোল ইন্ডিয়ায় অফিসার? কর্নেল অরিজিতের দিকে তাকালেন।

 

অরিজিৎ বললেন, কী নাম বলুন তো?

 

ডাকনামটা মনে আছে–হিম। আসল নামটা কী যেন…পেটে আসছে, মুখে আসছে না।

 

কর্নেল বললেন, হিমাদ্রি রায়?

 

বনবিহারীবাবু নড়ে উঠলেন। হিমাদ্রিই বটে। ওর বাবার নাম ছিল ডাঃ নিরঞ্জন রায়। একমিনিট! একটা কার্ডও দিয়েছিল। দাঁড়ান, আছে নাকি খুঁজে দেখি।

 

বনবিহারীবাবু ভেতরে গেলেন। একটু পরে একটু কার্ড নিয়ে বেরিয়ে এলেন। হ্যাঁ–এই যে। বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই আছে। কিন্তু…

 

কর্নেল কার্ডটা দেখে অরিজিৎকে দিলেন। তারপর বললেন, কিন্তু কী বনবিহারীবাবু?

 

সে কেন এতকাল পরে খুনোখুনি করতে যাবে? সে-সব ঘটনা দশ-বারো বছর আগের ব্যাপার। তখন ঊর্মি যেমন, তেমনি হিমুরও বয়স কম ছিল। নেহাত দুষ্টুমি করা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে কী জানেন? আজকাল যা হয়েছে, কাউকে চেনা কঠিন।

 

অরিজিৎ বললেন, রুদ্ৰেন্দুবাবুর তো খুব দাপট ছিল। উনি হিমাদ্রিবাবুকে শায়েস্তা করতে পারেননি?

 

করেছিল বৈকি। অবস্থা এমন ঘোরালো করে তুলেছিল, ওদের বাড়ি বেচে চলে আসতে হয়েছিল সেতাপগঞ্জ থেকে।

 

তাহলে?

 

তাহলেও হিমাদ্রি খুন করবে? কিছু বলাও যায় না অবশ্য।

 

বনবিহারীবাবুর স্ত্রী ঝাঁঝালো স্বরে মন্তব্য করলেন, সবাই তো তোমার মতো করুণার অবতার নয়! কার পেটে কী থাকে তুমি জানো? ওঁদের কাজ ওনারা করুন। নাক গলাতে যেও না।….

 

গাড়িতে উঠে অরিজিৎ বললেন, পুরো ব্যাপারটা বিহারে চলে গিয়েছিল দেখে খুব মুষড়ে পড়েছিলাম। যাই হোক, কলকাতায় ফিরে এল শেষপর্যন্ত।

 

কর্নেল আস্তে বললেন, তোমরা কি হিমাদ্রিবাবুকে অ্যারেস্ট করবে?

 

কেন? আপত্তি আছে আপনা?

 

কর্নেল মাথাটা একটু দুলিয়ে বললেন, না। আপত্তি কিসের?..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *