এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
দুবার দরজায় নক
ফ্ল্যাটগুলো এই গড়নের, একই আয়তনের। কিন্তু রঞ্জনবাবুর ফ্ল্যাটে সংসারী মানুষের ভোগী মনোভাবের ছাপ স্পষ্ট। অরিজিৎ বললেন, প্লিজ, চা-ফা আর নয়। মৃগাঙ্কবাবুর ওখানে হয়ে গেছে। আমরা বেশি সময় নেব না আপনার।
পাশের ঘরে কুকুরের গজরানি শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল একটু হেসে বললেন, রঞ্জনবাবুর, নাকি আপনার পেট?
রঞ্জনবাবুর স্ত্রী হাসলেন। দুজনেরই।
চেহারায় সৌন্দর্য এবং বুদ্ধিমত্তার ছাপ আছে মহিলার। সপ্রতিভ ভঙ্গি। একটু যেন স্মিতভাষিণীই। কথা বলেন যেন হিসেব করে। কর্নেল বললেন, আপনার ছেলেমেয়েরা স্কুলে?
স্কুলে, কলেজে।
ঊর্মিদেবীর সঙ্গে আপনার আলাপ ছিল শুনলাম।
ছিল–তত বেশি কিছু না।
যাতায়াত ছিল পরস্পর?
বিশেষ না। একটু খামখেয়ালী মনে হত ভদ্রমহিলাকে।
আপনার ছেলেমেয়েরা যেত ওঁর কাছে?
গেছে কখনও-সখনও।
একটু অপ্রীতিকর প্রশ্ন হয়তো কিন্তু আপনার সাহায্য মূল্যবান হতে পারে। কর্নেল একটু ইতস্তত করছিলেন। একটু হাসলেন এবার। অবজার্ভার হিসেবে পুরুষের চাইতে মেয়েরা শ্রেষ্ঠ। মেয়েদের ইনটুইশানে আমি বিশ্বাসী।
রঞ্জনবাবুর স্ত্রী বললেন, নিঃসঙ্কোচে বলুন কী জানতে চান।
মৃগাঙ্কবাবুকে কেমন লোক মনে হয় আপনার?
আমিশুকে প্রকৃতির। কৃপণটাইপ বলতে পারেন। ভীষণ হিসেব করে চলে।
আপনার কি মনে হয় ওঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নর্মাল ছিল?
তেমন কিছু দেখিনি যে মতামত দেব। তবে
তবে?
কয়েকবার ঝগড়া হতে শুনেছি। সেটা কোথায় না হয়?
ফ্ল্যাটে–ধরুন, যখন মৃগাঙ্কবাবু নেই, তখন কেউ এসেছে কি না দেখেছেন?
কেউ এলে আবছা কলিং বেলের বা লোডশেডিং থাকলে নক করার শব্দ শোনা যায় আমাদের ফ্ল্যাট থেকে। তাছাড়া সনি, মানে আমাদের কুকুরটা একটু চাচামেচি করে। রঞ্জনবাবুর স্ত্রীর ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। আমার নাক গলানোর অভ্যাস নেই অন্যের ব্যাপারে।
তাহলে কেউ এসেছে মাঝে মাঝে–মানে মৃগাঙ্কবাবু না থাকার সময়?
হ্যাঁ। এসেছে বৈকি। ফ্ল্যাটগুলোর দরজা ডিফেক্টিভ। প্রাইভেসি রাখা একটা প্রব্লেম।
দৈবাৎ কি আপনার চোখে পড়েনি মৃগাঙ্কবাবুর ফ্ল্যাটে কারা আসেন?
ভদ্রমহিলা কয়েক সেকেন্ড আঙুল খুঁটে মুখ তুললেন। মৃগাঙ্কবাবুর বউ মার্ডার হওয়ার দিন–মানে সন্ধ্যা ৭টা হবে তখন, সনি হঠাৎ দরজায় আঁচড় কাটতে কাটতে চাঁচামেচি করছিল। শুনলাম কেউ নক করছে ওদের দরজায়। তাই দরজা একটু ফাঁক করে উঁকি দিয়েছিলাম।
কাকে দেখলেন?
লোডশেডিং ছিল। তাছাড়া তখনই দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। দেখতে পাইনি।
বাই দা বাই, মৃগাঙ্কবাবু বাড়ি ফিরলে সনি কি চাচামেচি করে?
সনি কিন্তু খুব মেজাজী। কখন কাকে তার পছন্দ বলা কঠিন। তবে তিনবার নক করলে বুঝতে পারি মৃগাঙ্ক এল। শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সনি কমবেশি চাচামেচি তো করেই।
কাউকে দেখতে পেয়েছিলেন সেদিন সন্ধ্যাবেলা? কর্নেল রিপিট করলেন।
না। রঞ্জনবাবুর স্ত্রী আবার নখ খুঁটতে থাকলেন। একটু পরে মুখ তুলে বললেন, বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার সনি দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ে চাঁচামেচি করতে লাগল। তখন আমার ভয় করছিল। ওঁকে বললাম, সনি এমন করছে। কেন। উনি একটু ভীতু মানুষ। বললেন, বেঁধে রাখো। দরজা খুলো না আর। …..হ্যাঁ, আবার শুনতে পেয়েছিলাম কেউ ওদের দরজায় নক করছে। ভেবেছিলাম। মৃগাঙ্ক। কিন্তু সে নাকি বোম্বে গেছে।
তাহলে কিছুক্ষণ অন্তর দুবার নক করার শব্দ?
হ্যাঁ। সনির ব্যাপারটাতে বুঝতে পেরেছিলাম দুবারই ওর অপছন্দ লোক এল ও ফ্ল্যাটে।
অরিজিৎ বললেন, আপনি পুলিশকে একথা বলেছেন। নিশ্চয়?
না জিগ্যেস করলে কেন আগ বাড়িয়ে বলব? ইনি জিগ্যেস করছেন, তাই বলছি।
অরিজিৎ হাসলেন। আপনার স্বামীর নিষেধ ছিল।
রঞ্জনবাবুর স্ত্রী জোরে মাথা দুলিয়ে বললেন, মোটেও না। উনি মৃগাঙ্ককে খুব ভালবাসেন। খুনী, ধরা পড়ার জন্য সবরকম সাহায্য করেছেন পুলিশকে। অথচ পুলিশের লোকেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত।
কর্নেল বললেন, এক নম্বর ফ্লাটে কে থাকেন।
মিঃ নায়ার। সাউথ ইন্ডিয়ান। অবশ্য একনাগাড়ে থাকেন না–মাঝে মাঝে এসে থাকেন। পার্ক স্ট্রিটেও ওঁদের ফ্ল্যাট আছে।
এখন আছেন কি?
না। মার্ডারের সময়ও ছিলেন না ওঁরা। দুদিন পরে এসে আবার চলে গেছেন। এ বাড়ির অনেকেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আচ্ছা–অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
রঞ্জনবাবুর স্ত্রী ওঁরা লিফটে ওঠা অব্দি দরজা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
