এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

কার কী ভূমিকা

 

থানা থেকে কর্নেল ফিরলেন, তখনও সুনেত্রা, হিমাদ্রি আর সুনয়নী জেগে আছেন। শ্রাবন্তী ঘুমিয়ে গেছে নিচের ঘরে। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা।

 

ফেরার সঙ্গে সঙ্গে গরম কফি পেয়ে গেলেন কর্নেল। সুনয়নী বললেন, ওই গুণধর মামার কীর্তির কথা বলছিলাম এতক্ষণ এদের। কিন্তু ভাবতেও পারিনি সে নিজের ভগ্নীপতিকে খুন করবে!

 

সুনেত্রা বলল, তুমি চুপ করো তো, মা! তারপর সে কর্নেলের দিকে তাকাল। কেমন করে বুঝলেন ওই লোকটাই খুনী?

 

কর্নেল একটু হাসলেন। ১৮ জুলাই সকালে ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ীর সঙ্গে ভবানীপুরে বনবিহারীবাবুর বাড়ি গিয়েছিলাম। ওঁর ডান তর্জনীর ডগায় কাটা দাগ দেখতে পেলাম। মাথায় বাবরি চুলও আছে। মনে হল সেতার বাজান ভদ্রলোক। তাই মেজরাবের দাগ। জিগ্যেস করলে সায় দিলেন। কিন্তু আমার চোখ রয়ে গেল ওখানে। একটু পরে বুঝলাম, ওটা মেজরাবের দাগ হতেই পারে না। দাগটা মোটা এবং আঙুলের পেছন অব্দি রয়েছে। তাহলে ওটা কাটার দাগ। অথচ ভদ্রলোককে সেতারশিল্পী বলায় মেনে নিলেন দিব্যি। খটকা লাগল। আমার চোখ গেল ওঁর স্ত্রীর দিকে। দেখলাম, মুখের রেখা হঠাৎ বদলে গেছে। খটকা বেড়ে গেল। ব্যস, এই থেকে শুরু।

 

হিমাদ্রি বলল, কম্পাউন্ডার রুনুবাবু সাক্ষী দেবেন।

 

সুনেত্রা বলল, শুধু ওই একজনের এভিডেন্স আদালত মেনে নেবে?

 

কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন, হুঁ–তুমি ল পড়লে উকিল হতে পারতে, বিবি। ঠিকই বলেছ। তবে আমার হাতে এভিডেন্স একাধিক। দশ এপ্রিল বিকেল পাঁচটার আপ দিল্লি পাসেঞ্জারে বনবিহারীবাবু সেতাপগঞ্জ স্টেশনে নেমেছিলেন। স্টেশন মাস্টার হরিদপদবাবু সাক্ষী। রাতে রেস্ট রুমে ছিলেন। তার রেকর্ড আছে। তারপর গতকাল বিকেল পাঁচটায় একই গাড়িতে পৌঁছে বনবিহারীবাবু ফের রেস্টরুম বুক করেন। রাতে রেস্টরুমে ছিলেন। আজ ভোরে সোজা মাঠের ফার্মে চলে যান। আমি দূর থেকে বাইনোকুলারে ওঁকে দেখতে পেয়েছিলাম। তখনই বুঝেছিলাম, ওঁর মতলব খারাপ। কারণ ইন্দু ভটচাযকে এবার না সরালে জোতদার বাচ্চু সিংকে জমিজমা বেচতে বাগড়া পড়বে।

 

আপনি বাচ্চু সিংয়ের কথা জানতেন বুঝি?

 

হিমাদ্রি বলল, আমি বলেছিলাম কর্নেলকে। তারপর ওঁর কথামতো ভাগলপুরে গিয়ে এই কাজটাও সেরে ফেললাম। বাচ্চু সিংয়ের ওখানে ট্রান্সপোর্টেরও কারবার আছে। সোজা বলে দিল, রুদ্রবাবুর সব প্রপার্টি শিগগির কিনে নিচ্ছে। রুদ্রবাবুর শ্যালক নাকি আইনত গার্জেন।

 

কর্নেল বললেন, বনবিহারীবাবু আমাকে বলেছিলেন, রুদ্রেন্দুবাবু কোনো উইল করে যাননি। অথচ এখানকার পুলিশের সঙ্গে কলকাতা পুলিশের মারফত যোগাযোগ করে জানতে পেরেছিলাম, উইল করে গেছেন। তাতে তিন মেয়ের গার্জেন করা হয়েছে মামা বনবিহারী চক্রবর্তীকে। রুদ্রেন্দুবাবু জানতেন শ্যালক কী জিনিস। তবু উপায় ছিল না হয়তো। ইন্দুবাবুকে বিশ্বাস করতে পারেননি। কারণ ইন্দুবাবু লম্পট প্রকৃতির লোক। আফটার অল, মামা হয়ে ভাগ্নীদের সর্বনাশ করবেন, কে ভাবতে পারে?

 

সুনেত্রা বলল, ইন্দু ভটচাযের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়নি যে? কর্নেল হাসলেন। ইন্দুবাবু রাজসাক্ষী হবেন।

 

কিন্তু ও অসভ্যতা করেছে অপুর সঙ্গে। খুকুদিকে চাবুক মেরেছে!

 

ইন্দুবাবু যাতে আর বসন্তনিবাসে না ঢুকতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা হবে। কর্নেল সুনয়নী দেবীর দিকে ঘুরলেন। মিসেস ত্রিবেদী! শিগগির অপালার জন্য বুদ্ধিমান এবং শক্তিমান পাত্র দেখে দিন। স্থানীয় ছেলে হওয়াই ভাল। তেমন। নেই কেউ?

 

সুনয়নী বললেন, আছে বৈকি। পাত্র আবার নেই। দেখবেন, খুকুর অসুখ সেরে গেলে তার জন্যও বর ঠিক করে দেব।

 

সুনেত্রা হাসল। মা এ সব ব্যাপারে খুব এক্সপার্ট!

 

সুনয়নী ফোঁস করে উঠলেন, শুধু তোমার ব্যাপারেই এক্সপার্ট হতে পারলাম না, এই দুঃখ। তবে থামো একটুখানি। বর্ষার মাসটা যাক।

 

সুনেত্রা তক্ষুনি খাপ্পা হয়ে বলল, ছোড় দো জী ফালতু বাত। আননেসেসারি টকিং! এখন একটা সিরিয়াস কথাবার্তা হচ্ছে। আর ওঁর মাথায় খালি–

 

হিমাদ্রি মুখ ফিরিয়ে আস্তে বলল, কপালে শেষ পর্যন্ত খোট্টা বর আছে, বিবি। সাবধান! তারপর সে একটু কেসে কর্নেলের দিকে ঘুরল। নাও সিরিয়াস টকিং! কর্নেল, বলুন!

 

সুনেত্রা চোখ কটমট করে হিমাদ্রির দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ ফিক করে হেসে বলল, হ্যাঁ কর্নেলজেঠু, বলুন–কেন সন্দেহ হয়েছিল খুকুদির মামাকে?

 

কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে বসে দুলছিলেন। ঠোঁটে কামড়ানো চুরুট। চোখ খুলে বললেন, ওই তো বললাম। তবে তাছাড়া আর কিছু ব্যাপারে খটকা বেধেছিল। যেমন ধরো, এখানে ভাগ্নীদের এই অবস্থা–অনাথ, নিঃসহায় দুটি অবিবাহিতা মেয়ে। এক বোন রুগ্ণ। মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে। অন্য বোন বলতে গেলে একা। মাথার ওপর একজন–অনাত্মীয়ই বলা যায়, নেহাত কর্মচারী। অতসব জমিজমা দেখাশোনা, সংসার, টাকাকড়ি–সব তার হাতে। এই অবস্থায় তাদের মামা চুপচাপ সুদূর কলকাতায় বসে আছেন। এসে মাথার। ওপর দাঁড়াচ্ছেন না। এটা কি অস্বাভাবিক নয়? আমি ভেবেছি–ভেবে কোনো সূত্র পাইনি। কেন বনবিহারীবাবু সেতাপগঞ্জে গিয়ে থাকছেন না?

 

হিমাদ্রি বলল, অথচ ওঁর এখানে এসে থাকাটাই তো উচিত। কারণ বাচ্চু সিংকে ভগ্নিপতির জমিজমা বেচে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই খুন করেছেন ভগ্নিপতিকে।

 

তুমি ঠিকই বলেছ। এখানে এসে আইনমোতাবেক অর্থাৎ উইল অনুসারে গার্জেন হয়ে থেকে অপালা আর শ্রাবন্তীকে মিথ্যা বুঝিয়ে শাদা স্ট্যাম্পড পেপারে সই করিয়ে নেওয়াও এমন কিছু কঠিন ছিল না। অথচ বনবিহারীবাবু আসছিলেন না।

 

সুনেত্রা বলল, কিন্তু কেন? অসুবিধেটা কী ছিল?

 

কর্নেল নিভন্ত চুরুট ফের জেবেলে নিয়ে বললেন, ছিল। অসুবিধেটা হল ইন্দুমাধব ভটচায। লোকটার অনেক দোষ। লম্পট, কিছুটা নির্বোধও বটে, গোঁয়ারগোবিদ প্রকৃতির এবং হঠকারী। কিন্তু সে সিনসিয়ার। নিজেকে সে ও বাড়ির প্রকৃত গার্জেন ভেবে বসেছিল। কারণ তাকে হাতে রাখার জন্য তার মনে লোভ জাগিয়ে দিয়েছিলেন বনবিহারীবাবু–অপালার সঙ্গে তার বিয়ে দেবেন বলে। ইন্দুবাবু তাই বিশ্বাস করে বসেছিলেন। তাছাড়া অপুর প্রতি তার বহুদিনের। লোভও ছিল। তাকে সঙ্গে নিয়ে মাঠঘাটে থেকেছেন। জংলি স্বভাব গড়ে উঠেছে অপুর। ইন্দুবাবুর মেঠো মানসিকতায় এই টাইপের মেয়েকে পছন্দ করা স্বাভাবিক।

 

সুনেত্রা বলল, বাপের বয়সী, সেটা ভাবেনি ছোটলোক?

 

কর্নেল হাসলেন। পুরুষচরিত্র এরকমই, ডার্লিং! বলে চোখ বুজলেন আবার। দুলতে দুলতে বললেন, ইন্দুবাবু ভেবেছিলেন, শিগগির তো বাড়ির জামাই হয়ে যাচ্ছেন! তাই মন দিয়ে চাষবাসে মেতে উঠেছিলেন। অপুদের জমি যে বেদখল হয়ে যায়নি, সেটা এই লোকটার জন্যই। কাজেই বুঝতে পারছ, বনবিহারীবাবু যতদিন না ইন্দুবাবুকে সরাতে পারছেন, ততদিন তাঁর এখানে এসেও লাভ হত না। ইন্দুবাবুর হাতেও লোকজন আছে। একজন আউটসাইডারকে সহজে ঘেঁসতে দিতেন না। তাই বনবিহারীবাবু সুযোগের অপেক্ষায় বসে ছিলেন। অথবা মনঃস্থির করতে পারছিলেন না। তারপর অপালা পালিয়ে গিয়ে ওঁর আশ্রয় নিতেই টের পেলেন, ইন্দুমাধবের তর সইছে না জামাই হতে। অপালা হাত ফসকে যেতে লোকটা এবার খচে গেছে। বনবিহারীবাবুকে আর ঘেঁসতেই দেবে। না ওখানে। তখন আর অপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত মনে করলেন না বনবিহারীবাবু। সটান এসে হাজির হলেন।

 

হিমাদ্রি বলল, ফার্মেই তো ইন্দুবাবুকে খুন করতে পারত সে!

 

পারতেন না। ফার্মে লোক থাকে। ফসল পাহারা দেয় সবসময়। ক্ষেতের কাজকর্ম করে। দিনদুপুরে ওখানে ইন্দুবাবুকে খুন করা অসম্ভব। তাই রাতে এসে হানা দিয়েছিলেন।

 

সুনেত্রা বলল, দুপুরে হন্তদন্ত এসে ইন্দুবাবু আমাকে জিগ্যেস করল আপনার কথা। তখন আপনি বেরিয়ে গেছেন–

 

থানায় গিয়েছিলাম। থানা থেকে বেরুতেই দেখা হল। বললেন, কথা আছে।

 

সুনয়নী হাই তুলে বললেন, দেড়টা বাজতে চলল। কর্নেলসায়েবের কি ক্ষিদে পায়নি?

 

সুনেত্রা বলল, তুমিও তো অদ্ভুত। মা! চুপচাপ বসে আছ! লক্ষ্মীদি দেখ গে ঘুমিয়ে পড়েছে।

 

সুনয়নী উঠলেন। না। ওকে খুকুর পাহারায় রেখেছি। লক্ষ্মী ঘুমোবার মেয়ে নয়।

 

সুনয়নী বেরিয়ে গেলে হিমাদ্রি বলল, ইন্দু ভটচায আপনাকে খুকুদির মামার কথা বলল নাকি?

 

কর্নেল বললেন, প্রথমে বলতে চাননি। পরে কবুল করলেন। বললেন, অপুর মামা এসে আমাকে কলকাতা নিয়ে যেতে চাইছেন। ওখানে গিয়েই বিয়েটা হয়ে যাবে। জোর করে মেজভাগ্নীর বিয়ে দিয়েছিলেন। ছোটরও দেবেন।

 

তাই বলেছিল বুঝি?

 

কিন্তু ইন্দুবাবু মাঠঘাট ছেড়ে নড়ার পাত্র নন। সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি। শেষে গোঁ ধরে বললেন, ভাগ্নীকে এখানে এনে বিয়ে না দিলে আর বিয়েই করবেন না। বুঝতে পারছ তো? বনবিহারীবাবুর মতলব ছিল, কলকাতা নিয়ে গিয়ে কিংবা পথেই খতম করে ফেলবেন ইন্দুবাবুকে।

 

সুনেত্রা তাড়া দিল। এনাফ অফ ইট! খেতে চলুন তো এবার। কান ঝালাপালা হয়ে গেল। আর ভাল লাগে না ওসব কথা।

 

বলল ভাল লাগে না, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে নিচের ডাইনিং রুমে সুনেত্রাই আবার ওই কথা তুলল। হঠাৎ বলল, কর্নেলজেঠু! একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন?

 

কর্নেল তাকালেন। হাতে মুর্গির ঠ্যাং।

 

সুনেত্রা বলল, খুকুদিদের ফ্যামিলিতে ১১ তারিখটা অপয়া।

 

হিমাদ্রি বলল, কেন?

 

১১ এপ্রিল খুকুর বাবা খুন হলেন। ১১ জুলাই টুকু খুন হল!

 

কর্নেল তো বলেই দিয়েছেন ১১ এপ্রিল প্রেরণা দিয়েছিল ১১ জুলাইকে।

 

আর আজ ইন্দুবাবু খুন হতে যাচ্ছিল–আজও ১১ তারিখ।

 

যাঃ! আজ পঁচিশ জুলাই।

 

না বুঝে কথা বলো না তো! সুনেত্রা রেগে গেল। আজ বাংলা শ্রাবণ মাসের ১১ তারিখ, তা জানো?

 

কর্নেল মুর্গির ঠ্যাংয়ে কামড় দিয়ে মন্তব্য করলেন, বিপজ্জনক ১১।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *