এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
মধ্যরাতের আততায়ী
সন্ধ্যায় আকাশ কালো করে মেঘ উঠেছিল। তারপর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছিল। সেই বৃষ্টি আর থামতেই চায় না। রাত দশটাতেও টিপ টিপ করে পড়তে থাকল। তারপর ক্রমশ কমে গেল। তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। আরও কিছুক্ষণ পরে মেঘ সরে ঝলমলে চাঁদ বেরিয়ে এল আকাশে। বৃষ্টিভেজা প্রকৃতিকে রহস্যময় করে ফেলল তার জ্যোৎস্না।
বসন্তনিবাসের ভাঙা পাঁচিল পেরিয়ে কেউ সাবধানে নামল বাগানের ভেতর। একটু দাঁড়াল ফোয়ারাটার কাছে। তারপর সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেল বাড়ির সামনের দিকে।
শ্যামা গাঁজা টেনে মড়ার মতো পড়ে আছে বারান্দার খাঁটিয়ায়। দয়াল ঠাকুর বাড়িতে খুন হবার পর বাইরে শুতে পারে না। কপাট বন্ধ করে ঘুমোচ্ছে। শুধু মনিয়ার চোখে ঘুম নেই। রোগা মেয়েটা কোথায় গেল, সেই ভাবনায় কষ্ট পাচ্ছে। রান্নাঘরের পাশের ঘরে শুচ্ছে সে গত রাত থেকে। এখন তার শ্বাস। ফেলতেও ভয় হচ্ছে। ঘাপটি পেতে পড়ে আছে।
মরাইগুলোর আড়ালে ছায়া জমেছে। সেই ছায়ার ভেতর লোকটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পা টিপেটিপে বারান্দায় উঠল। রাত একটায় গয়াপ্যাসেঞ্জার। হঠাৎ মনে পড়ল কথাটা। একটু চঞ্চল হল সে। তারপর সাবধানে বারান্দায় উঠল। চওড়া সিঁড়ির প্রথম ধাপে উঠে সে পিছু ফিরে দেখে নিল চারদিক। গাছের পাতা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ার শব্দ ব্যাঙ আর পোকামাকড়ের ডাক আর দুরের শব্দ।
স্টেশনের শান্টিং ইয়ার্ডে একটা কোনো ইঞ্জিনের হুইসি। আরও দূরে গঙ্গার ধারে শ্মশানে শেয়ালের চিৎকার। সর্বমঙ্গলার মন্দিরের বটগাছে পাচা ডেকে উঠল ক্রাও…ক্রাও…ক্রাও!
সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে ওপরের বারান্দায় পৌঁছুল লোকটা। তারপর মাঝের ঘরের দরজায় নক করল। বারকতক নক করার পর চাপা গলায় ডাকল, ইনু, ইনু! ইনু ঘুমুচ্ছ নাকি? ও ইনু!
একটু পরে ভেতর থেকে সাড়া এল, কে?
আমি। বড়দা!
বড়দা! মাঠে ঘুম হল না বুঝি? খ্যা খ্যা খ্যা!
না রে। বড্ড মশা! সত্যি বলছি।
খ্যা খ্যা খ্যা!
হাসছিস যে? মশার কামড় খেলে বুঝতিস। নে, দরজা খোল।
খুলি।
দরজা খুলে গেল। খোলার সঙ্গে সঙ্গে বড়দা ঝাঁপিয়ে পড়ল। খড় খড় খস। খস অদ্ভুত শব্দ হবার সঙ্গে সঙ্গে দুটো টর্চ জ্বলে উঠল এবং প্রায় একই সঙ্গে ঘরের আলোর সুইচও কেউ টিপে দিল। মাত্র একটা সেকেন্ড।
জামাকাপড় পরানো খড়ের তৈরি ডামি মূর্তিটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছে বড়দা এবং হাতে চকচকে একটা ছোরা। পেঁচিয়ে গলা কাটতে গিয়ে মুহূর্তে এই নাটকীয় উপদ্রব। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেই একলাফে যেই বেরুতে গেছে, দরজায় হিন্দুস্থানী সেপাই ডাণ্ডা উঁচিয়ে বলল, আবে ভেসড়িবালে, চুপ সে খাড়া যা! তখন বড়দা কাচুমাচু মুখে ঘুরল এদিকে।
তিনজন পুলিশ অফিসার ঘরের ভেতরে ওত পেতে ছিলেন। রিভলবার দেখে হাত থেকে ছুরি পড়ে গেল বড়দার। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সামনে এসে বললেন, জানতাম আজ রাতেই যে কোনো সময়ে আপনার আবির্ভাব ঘটবে। তাই সন্ধ্যা থেকে আমরা তৈরি ছিলাম। যাই হোক, ফঁদটা কেমন দেখছেন?
একজন পুলিশ অফিসার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলে বড়দা মুখ নামিয়ে ঘোঁত-ঘোত করে বলল, ইনুর সঙ্গে ইয়ার্কি করছিলাম। আমি কি মানুষ খুন করতে পারি?
ইন্দু ভটচায ভেংচি কেটে বললেন, পারো না? তুমি সব পারো! ওঃ, এতক্ষণ আমি গলাকাটা হয়ে বড়বাবুর মতো দরজার কাছে পড়ে থাকতাম। আর নাম হত রঘুয়ার! এবার তো সব জানা গেল। তুমি অপুর পেছনে আমাকে। লেলিয়ে দিয়েছিলে! লোভ দেখিয়েছিলে অপুর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে। আর আমিও এক রামপাঁঠা-তাই বিশ্বাস করে–ছ্যা ছ্যা ছ্যা! ছ্যাঃ! ওয়াক থুঃ!
বড়দার পরনে প্যান্ট-শার্ট, পায়ে রবার সোলের হান্টিং বুট, দুহাতে রবারের দস্তানা, মাথার চুল ঢেকে রুমাল বাঁধা। বড়দা ফুঁসে উঠল। থাম রে লম্পট মাতাল! তোরও রেহাই নেই। তুই-ও ধোয়া তুলসীপাতা নোস। তুই যা যা করেছিস, সব ফাঁস করে দেব কোর্টে।
ইন্দু ভটচায তেড়ে এলেন। কী? কী ফাঁস করবি কোর্টে? কী করেছি আমি? তোর মতো মানুষ খুন করেছি? আপনারা শুনে নিন স্যার! লখনউতে বাইজীদের দালালী করে খেত। পদ্মাবতাঁকে খুন করে ধরা পড়েছিল হাতেনাতে। বড়বাবু এই নেমকহারামকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। জিগ্যেস করুন, কেন ভাগলপুর ছেড়েছিল চিরকালের মতো? নিজের বউটাকে মেরে কড়িকাঠে ঝুলিয়ে কালীবাবুর বিধবা বোনকে ইলোপ করেছিল। বড়বাবুর জোরে সে দিন ওর ধড় থেকে মুণ্ডুটা খসে যায়নি। উঃ এতটুকু যদি জানতাম, এ ব্যাটাই বড়বাবুকে খুন করে গেছে, আমি তখনই সাবধান হয়ে যেতাম! ভাবতেও পারিনি, বুঝলেন স্যার–যে লোকটা ওর সব সময় মাথা বাঁচিয়েছে, সাহায্য করেছে, নেমকহারাম তারই গলায় ছুরি চালাবে! আমি ভেবেছিলাম রঘুনাথ সাহুর কাজ! ছ্যা ছ্যা ছ্যা! ওয়াক থুঃ!
বড়দা লাল কুতকুতে চোখে তাকিয়ে ছিল। ইন্দু ভটচায আবার গায়ে থুতু ফেলতে এলে সে হাতকড়াআঁটা দুহাত বাড়িয়ে ওঁর গলা টিপে ধরল।
কর্নেল ও পুলিশ অফিসাররা মুখ টিপে হেসে দুজনের বাকযুদ্ধ উপভোগ করছিলেন। এবার কর্নেল বড়দার পেছন থেকে জামার কলার ধরে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বললেন, মিঃ শর্মা! মিঃ বড়দাকে যথাস্থানে নিয়ে চলুন। আর ইন্দুবাবু, আপনিও আসুন।
ইন্দু ভটচায ফেঁসে যাওয়া বেলুনের মতো নেতিয়ে গিয়ে বললেন, আমি… আমি কেন স্যার? আমি তো নিজে থেকেই কো-অপারেশান করলাম আপনাদের সঙ্গে। ফার্মে গিয়ে যখনই বলে এলেন আমি বিপন্ন, তখনই চলে আসিনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে? সব কথা খুলে বলিনি, বলুন? তারপর আপনার কথামতো শ্যামাকে দিয়ে খড়ের ডামি তৈরি করিয়ে–কী করলাম না স্যার?
হ্যাঁ। যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন খুনীকে ফাঁদ পেতে ধরতে।. ধন্যবাদ ইন্দুবাবু। তবু আপনাকে দরকার। পুলিশের কাছে স্টেটমেন্ট দিতে হবে আপনাকে।
বড়দাকে নিয়ে যাচ্ছিল দুজন কনস্টেবল। বড়দা দরজার কাছে ঘুরে বলল, তুইও বাঁচবি না। আমার চেয়ে তোর পাপ আরও সাংঘাতিক। সব ফাঁস করে দিচ্ছি। আয় না তুই!
ইন্দু ভটচায ভেংচি কাটলেন। আরে যা যা উল্লুকের বাচ্চা ভল্লুক!
চোপ ব্যাটা রামপঠা। লম্পট! মা-মাসি জ্ঞান নেই–লজ্জা করে না?
ইন্দুবাবু গর্জালেন, খুনী! নেমকহারাম! কসাই!
গিদ্ধড়! উজবুক! গাড়োল!…
এইরকম চলতে থাকল বাড়ির গেট অব্দি। শ্যামাকে ওঠানো যায়নি। মনিয়া দয়ালকে জাগিয়েছে। বারান্দায় দুজনে কাঠপুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্দুবাবু পিছু ফিরে বললেন, আমি ফেরা না অব্দি জেগে থাকবি মনিয়া! দেখবি চোর ডাকাত না ঢোকে। সদর দরজা এঁটে দিয়ে যা এক্ষুনি।
রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল বললেন, ইন্দুবাবু উনি আপনার কোন সম্পর্কে বড়দা?
ইন্দু ভটচায বললেন, রামোঃ! ভাগলপুরে থাকতে পাড়া সম্পর্কে কেউ কেউ বড়দা বলত। আমিও বলতাম। তা যদি বলেন, বরং বড়বাবু–মানে অপুর বাবার সঙ্গে একটুখানি সম্পর্ক ছিল। জ্যাঠামশাই বলতে পারেন কিংবা নাও পারেন–এইরকম আর কী!
আপনি এখনও বিয়ে করেননি?
আজ্ঞে না।
বয়স কত হল?
তা উনপঞ্চাশ হয়ে এল।
আপনি শ্রাবন্তীকে চাবুক মারতেন শুনেছি!
ইন্দু ভটচায ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, বড় জ্বালাত যে মেয়েটা। ছুরিটুরি নিয়ে হাঙ্গামা করত। একরাত্রে তো আমাকে স্ট্যাব করার জন্য ঝুঁপিয়ে পড়েছিল। তবে ভেবে দেখুন, আমি ওর গায়ে হাত তুলি সাধ্য কী? ওই নেমকহারামটা আমাকে বলেছিল, বাড়াবাড়ি করলে চাবুক মেরো। ভূত ছেড়ে যাবে।
সুনেত্রাদের বাড়ির সামনে উত্তেজনায় অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সুনেত্রা ও হিমাদ্রি। এঁদের দেখে রাস্তায় নেমে এল। এ রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট নেই। চাঁদটা আবার মেঘে ঢেকেছে। কিন্তু গেটের মাথায় একটা বাল্ব জ্বলছে। সেই আলোয়। হাতকড়া পরা বড়দাকে দেখেই থমকে দাঁড়াল দুজনে। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না ওরা।
কর্নেল সামনে এসে বললেন, ফাঁদ পাতা ব্যর্থ হয়নি, ডার্লিং!
সুনেত্রা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, এ কী কর্নেল জেঠু! ওই লোকটা যে খুকুদির কর্নেল জবাব দেবার আগেই পিছন থেকে হিমাদ্রি বলে দিল, খুকুদির মামা বনবিহারী চক্রবর্তী। ১১ এপ্রিল খুকুদির বাবাকে খুন করে কাটা আঙুল রুমালে জড়িয়ে ভাগলপুর গিয়েছিল ব্যান্ডেজ বাঁধতে।..
