এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

অবশেষে সান্তাক্লজ

 

অস্থির সুনেত্রা আবার স্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সকালের আপট্রেনে যদি কর্নেল এসে পৌঁছান! সে কর্নেলের ওপর খাপ্পা হচ্ছিল। অদ্ভুত লোক তো! আসব বলে আর আসবার নাম নেই। নাকি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না উনি? বসন্তনিবাসে এমন একটা সাংঘাতিক ব্যাপার চলেছে। কত কথা মনে গিজগিজ করছে। তবে যে। তার বাবা বলতেন, যেখানে রহস্য, সেখানেই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার!

 

আপট্রেনের দেরি আছে আধ ঘণ্টা–যদি সময়মতো আসে! ডাউন দিল্লি হাওড়া প্যাসেঞ্জার এসে গেল উল্টোদিক থেকে। তত বেশি যাত্রী নামল না। সুনেত্রা অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে ছিল ডাউন সিগন্যালের দিকে। হঠাৎ তার পিঠে কেউ মৃদু স্পর্শ করতেই ঘুরে দাঁড়াল এবং অবাক হয়ে গেল।

 

এসে গেছি ডার্লিং!

 

সুনেত্রা হেসে ফেলল। কী অদ্ভুত মানুষ আপনি! প্রতিদিন আপনার জন্য স্টেশনে এসে হয়রান! বলে সে চঞ্চল হয়ে উঠল। কিন্তু আপনি তো আসবেন এদিক থেকে! উল্টোদিক থেকে এলেন যে?

 

কর্নেল মুখ টিপে হেসে বললেন, তোমাকে চমক দেব বলে!

 

উঁহু আপনার গতিবিধি সন্দেহজনক। বলে সুনেত্রা উৎসাহে পা বাড়ালো।

 

তাই বুঝি? হুঁ–আমি হঠাৎ একটা জরুরি ট্রাঙ্ককল পেয়ে মুঙ্গেরে গিয়েছিলাম।

 

মুঙ্গেরে কী ব্যাপার? সুনেত্রা গেট পেরিয়ে রিকশো ডাকতে লাগল। কর্নেল বললেন, হাঁটার চেয়ে স্বাস্থ্যকর আর কোন প্রক্রিয়া নেই, বিবি! এস, হাঁটি।

 

দুজনে হাঁটতে লাগল। সুনেত্রা আবার বলল, মুঙ্গেরে কী ব্যাপার?

 

অবাক হয়ো না। হিমাদ্রি ওখানেই নিরাপদে আছে এক বন্ধুর বাড়িতে।

 

হিমুদা ওখানে আছে? সর্বনাশ!

 

সর্বনাশের কারণ নেই, ডার্লিং। কর্নেল সংক্ষেপে ঊর্মির হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ও মৃগাঙ্ক ব্যানার্জিকে গ্রেফতারের বিবরণ দিয়ে বললেন, যাই হোক, পুলিশের হঠকারিতায় ওর কেরিয়ারের খুব ক্ষতি হয়েছে। আমি পুলিশকে অনুরোধ করেছি, ও বেচারার দোষস্থালন করে যেন সব কাগজে বিবৃতি দেওয়া হয়। সম্ভবত দু একদিনের মধ্যে পুলিশ কমিশনার সাংবাদিক সম্মেলন ডাকবেন এব্যাপারে।

 

তাহলে হিমুদাকে নিয়ে এলেন না কেন?

 

ওবেলা এসে যাবে। ভাগলপুরে ও কী একটা কাজে গেল।

 

সুনেত্রা হাসল। কর্নেল! আপনার দাড়ি কি ওয়াশ করেছেন? এত সাদা দেখাচ্ছে কেন? একেবারে ক্রিসমাসের সান্তাক্লজ!

 

ওই দেখ ডার্লিং, বাচ্চাগুলো আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে!

 

রাস্তার দুধারে দোকানপাট। এটা বাজার এলাকা। ডাইনে প্রায় নির্জন সংকীর্ণ রাস্তায় ঘুরে সুনেত্রা চাপা গলায় বলল, খুকুদি–মানে শ্রাবন্তী কাল বিকেল থেকে আমাদের বাড়িতে এসে লুকিয়ে আছে। আমি তো ভীষণ ভয়ে-ভয়ে কাটাচ্ছি। মা কিন্তু নির্বিকার। মায়ের ব্যাপার জানেন তো? বলে কী, তোর বাবা মরার সময় সব সাহস আমাকে দিয়ে গেছেন!

 

সুনেত্রা কাল যা ঘটেছিল, শোনাতে থাকল। গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদারের বৃত্তান্ত মনে পড়ছিল কর্নেলের। সবটা শোনার পর বললেন, ছুরিটা তাহলে এখন নেই শ্রাবন্তীর কাছে?

 

সুনেত্রা বলল, না। জিগ্যেস করলে বলছে, কিচ্ছু জানিনে। কিন্তু কাল বিকেল থেকে একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করছি, খুকুদি বেশ নর্মাল হয়ে গেছে যেন। ভর-টর ওঠেনি। অজ্ঞানও হয়নি। আবোল-তাবোল কোনো কথাও বলছে না আগের মতো। অথচ ওদের বাড়িতে থাকার সময় কী যে করত। ভুতুড়ে সব কাণ্ড, ভাবতে পারবেন না!

 

কর্নেল কান করে শুনছিলেন। বললেন, সম্ভবত বসন্তনিবাসেই ওর অস্বাভাবিক আচরণের কারণ লুকিয়ে আছে।

 

ঠিক এই কথাটাই আমি ভেবেছি, জানেন?

 

বাড়ির সামনে পৌঁছে কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, তুমি আর ভুল করেও খোট্টাই বুলি বলছ না যে?

 

সুনেত্রা হেসে ফেলল। ক্যাবলু জী? এত্তা খতরনাক হরবখত–মেরি হাড্ডি ভি পিলি হো গেয়ি!

 

সুনয়নী পেয়ারাতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কর্নেলকে দেখে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আসুতে পারলেন তাহলে! আপনার জন্য বিবি আহার-নিদ্রা ছেড়ে দিয়েছিল! ওকে যে সেবার কী যাদু করে গেলেন কে জানে!

 

ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সুনয়নী। ওপরের সবচেয়ে সাজানো ঘরটায় নিয়ে গিয়ে তুললেন কর্নেলকে। এটা বরদাবাবুর ড্রয়িং রুম। দেয়াল জুড়ে এবং আনাচেকানাচে জীবজন্তুর স্টাফ-করা মাথা বা পুরো শরীর। একটা আস্ত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার পর্যন্ত।

 

সুনয়নী বললেন, একটু আগে ওদের চাকর শ্যামা খুকুকে খুঁজতে এসেছিল। বললাম, জানি না।

 

সুনেত্রা বলল, খুকুদি কোথায় মা?

 

আমার ঘরে শুয়ে আছে। ঘুমুচ্ছে। সারারাত ঘুমোয়নি বেচারী। আমাকেও ঘুমোতে দেয়নি। হঠাৎ আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলে কী, ইন্দুকাকা খুঁজতে আসেনি তো? সুনয়নী আস্তে বললেন, ওদের বাড়িটাই অভিশপ্ত। রুদ্রবাবুর পাপ আর কী! আমি তো কম দেখিনি আর কম শুনিনি। জমিদারি আমলে দিনকে রাত করেছেন রুদ্রবাবু। কত খুনখারাপি করেছেন। কত মেয়ের সর্বনাশ করেছেন। সে-সব হিসট্রি সময়মতো বলব আপনাকে। আমাদের এ অঞ্চলটা চিরদিন এমনি মগের মুলুক। আমাদের বাংলাদেশের মতো শিক্ষিত লোক তো নেই বিশেষ। তাই প্রতিকার হয়নি। ইদানীং যদি বা কিছু শিক্ষাদীক্ষা দেখা যাচ্ছে, তো ওই রাজনীতি! রাজনীতির দাপটে অস্থির।

 

সুনেত্রা বলল, আঃ! মা! তুমি দেখছি সত্যি হিসট্রি নিয়ে বসলে। কর্নেলজেঠু ট্রেন জার্নি করে এসেছেন! বিশ্রাম করতে দাও।

 

সুনয়নী হাসলেন। পরে বলবখন। …কর্নেল তো কফির ভক্ত। কড়া কফি। হুঁউ–আমার সব মনে আছে। সারাদিন দুই বন্ধুতে গঙ্গার চরে টো টো করে ঘুরে এসে এই ঘরে–ঠিক ওই ইজিচেয়ারে বসে বলতেন, বউঠান! এবার কফি চাই। কড়া কফি!

 

মেয়ে মায়ের দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকালে মা হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন। এই মুহূর্তে কর্নেলের মনে হল, শ্রাবন্তী-ঊর্মি-অপালার মা যদি বেঁচে থাকতেন, হয়তো বসন্তনিবাসে এই সাংঘাতিক সর্বনাশগুলো ঘটত না। মায়ের চেয়ে। রক্ষাকর্তী আর কে আছে পৃথিবীতে?

 

চাপা শ্বাস ছেড়ে কর্নেল বললেন, বিবি, শ্রাবন্তীদের ফার্মটা কতদূর?

 

যাবেন নাকি? সুনেত্রা বলল। যে রাস্তায় এলাম, কিছুটা দক্ষিণে গেলে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের শালজঙ্গল। ওটা একসময় ছিল রতুয়ার টাঁড়-মাইল দেড়েক লম্বা বাঁজা ডাঙ্গা। এখন, শালগাছ লাগিয়েছে। তারপর ক্যানেল। ক্যানেলের ওধারে ওদের ফার্ম। দুখানা ছোট-ছোট ঘর আছে। ব্যস, ওই হল ফার্ম। কিন্তু ফার্মে কেন? পাখি দেখতে, না প্রজাপতি ধরতে? … হ্যাঁ, উড্ডাক দুটো কালও দেখে এসেছি। আর সেই প্রজাপতিগুলোও আছে কিন্তু। ও কর্নেল, আমি আপনার সঙ্গে যাব।

 

সুনেত্রা কচি মেয়ের মতো আব্দার জানাল। কর্নেল একটু হেসে বলল, এ বেলা আমি একা বেরুচ্ছি। কারণ তোমাকে থাকতে হবে বাড়িতে। হিমাদ্রি আসবে। তার অবশ্য পুলিশের ভয় আর নেই। আসার আগে কলকাতা পুলিশের মারফত এখানকার পুলিশকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে বলেছি। নিশ্চয় জানিয়ে দিয়েছে। যাই হোক, তুমি বাড়িতে থেকে হিমাদ্রিকে রিসিভ করবে। নাইস চ্যাপ! তোমাদের বাল্যসঙ্গী আফটর অল। …

 

কিছুক্ষণ পরে যৎকিঞ্চিৎ খাওয়া-দাওয়া করে কর্নেল বেরোলেন। শ্রাবন্তী তখনও সুনয়নীর ঘরে ঘুমোচ্ছে।

 

কর্নেলের বুকে ঝুলছে বাইনোকুলার, কাঁধে ঝুলছে ক্যামেরা। হাতের ছড়িটা আসলে প্রজাপতি ধরা জালের হ্যান্ডেল। প্যান্টের পকেটে ভাঁজ করা আছে সুক্ষু জালখানা।

 

রতুয়ার টাঁড়ে কচি শালগাছের জঙ্গল। মাঝখানে একফালি নির্জন পথ। বাইনোকুলারে পাখি দেখতে দেখতে কর্নেল হাঁটছিলেন। ক্যানেলের ধারে পৌঁছে দেখতে পেলেন হলুদ রঙের ছোট্ট ফার্মহাউস-চৌহদ্দিতে কাটাতারের বেড়া। সবুজ ধান-পাট আর আখের ক্ষেত উজ্জ্বল রোদে ঝকঝক করছে। ফার্মহাউসের পাশে কচি তাড়হর আর ভুট্টার ক্ষেতের ধারে একটা লোক চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাইনোকুলারের লেন্স অ্যাডজাস্ট করতেই তার চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

 

কর্নেল ক্যানেলের ব্রিজ পেরিয়ে গেলেন। লোকটা ফার্মে গিয়ে ঢুকেছে এখন। ফার্মের সামনে একটুকরো ফুলবাগিচা। মন্দ না। নদীয়ার মাকড়দহে অবশ্য আরও বড় ফার্মহাউস ছিল। তার সঙ্গে পোলট্রি, ডেয়ারি এবং একটা সাংঘাতিক হরিয়ানা ষাঁড়। ইন্সপেক্টর কৃতান্ত হালদার একটু বোকামানুষ হলেও দুর্দান্ত সাহসী। যাঁড়টা যখন কর্নেলকে তাড়া করে পাঁচিলে চড়িয়ে ছেড়েছে, কৃতান্ত হালদার তখন খড়ের পাঁজাটা বুড়ি করে ঘুরছেন। যাঁড়টাও ঘুরছে। আর। শিঙের গুঁতোয় খড়ের পাঁজাটা ছত্রখান করে ফেলছে।

 

গেটের কাছে যেতেই রুক্ষ চেহারা লম্বাটে গড়নের প্যান্ট-শার্ট আর পায়ে গামবুট পরা একটা লোক বেরিয়ে এল। কাঁহাসে আয়া আপলোগ?

 

ভাগলপুরসে।

 

কিসকো ঢুঁড়তা আপ?

 

ইন্দুবাবুকো।

 

তো বলিয়ে?

 

কর্নেল নমস্কার করে একটু হেসে বললেন, আপনি মিঃ ইন্দুমাধব ভট্টাচার্য?

 

ইন্দুবাবু নির্বিকার মুখে বললেন, হ্যাঁ। বলুন স্যার, কী দরকার?

 

এভাবে দাঁড়িয়ে তো বলা যাবে না মিঃ ভট্টাচার্য। ভেতরে গিয়ে—

 

আমার সময় নেই, স্যার। যা বলার এখানে বলুন!

 

লোকটা তো ভারি অভদ্র। কর্নেল বললেন, আহা! আমি কৃষিদফতর থেকে—

 

কথা কেড়ে ইন্দুবাবু বললেন, ছাড়ুন স্যার! আপনি পুলিশের লোক–আমি জানি। বড়বাবুর মার্ডার কেসে তো এফ আর আই হয়ে গেছে রঘুনাথ সাহুর নামে। যা হবার, কোর্টে হবে।

 

কর্নেল গলা নামিয়ে বললেন, মিঃ ভট্টাচার্য, আপনি বিপন্ন। তারপর দ্রুত ঘুরে হনহন করে চলে এলেন। ক্যানেলের কাছাকাছি এসে পিছু ফিরে দেখলেন, ইন্দু ভটচায তখনও দাঁড়িয়ে আছেন গেটে।

 

কর্নেল ক্যানেলের পাড় ধরে পুবে হাঁটতে থাকলেন। দুধারে সবুজ ক্ষেত। ক্যানেল ক্রমশ উত্তরে ঘুরেছে। তারপর রেললাইন ও পিচের সড়কের তলা দিয়ে গঙ্গায় মিশেছে।

 

ঘণ্টা দুই পাখি দেখে এবং বিস্তর চেষ্টা করে একটি প্রজাপতি ধরার পর সেটা সচ্ছিদ্র ছোট্ট কাঁচের কৌটোয় বন্দী করে কর্নেল সর্বমঙ্গলার মন্দিরতলায় পৌঁছুলেন। কল্কেফুলের জঙ্গলে প্রচুর প্রজাপতি। কিন্তু চেষ্টা করে একটাও ধরা গেল না। হু হু করে বাতাস বইছে। আর প্রজাপতিগুলোও বড় বেশি চঞ্চল।

 

বসন্তনিবাস কি ওই বাড়িটা—আগাছা ভরা ছোট্ট মাঠের পর ভাঙাচোরা পাঁচিলে ঘেরা হানাবাড়ির মতো দেখতে? আগাছার জঙ্গলেও কত প্রজাপতি রঙ-বেরঙের! সেতাপগঞ্জের প্রকৃতির কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু এমন ধড়িবাজ সচরাচর দেখা যায় না।

 

কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। প্রকাণ্ড একটা কালো পাথরের ওপর মস্ত বড় শাদা একটা প্রজাপতি বসে আছে। তার সংগ্রহশালায় এক দুর্লভ সংযোজন ঘটবে যদি–

 

জাল রেডি করে পা বাড়াতে গিয়ে চোখ নিস্পলক হয়ে উঠল। পাথরটার নিচে পড়ে আছে একটা লম্বা ছুরি। প্রজাপতিটা পালিয়ে গেল। ছুরিটা তুলে নিলেন। ইঞ্চি আষ্টেক লম্বা এবং ইঞ্চিটাক চওড়া ছুরিটার বাঁট জীর্ণ হয়ে গেছে। ভীষণ ধারাল। কিন্তু উল্টো দিকটায় মরচে ধরে গেছে। হু, শ্রাবন্তী এই পাথরটাতে বসেছিল সম্ভবত। ছুরিটা তার হাত থেকে পড়ে গেছে বা ফেলে দিয়েছে। সুনেত্রার বিবরণ অনুসারে ব্যাপারটা গতকাল বিকেলেই ঘটা সম্ভব। এই পাথরে বসলে বসন্তনিবাস থেকে কেউ দেখতে পাবে না। ওদিকে সামনে ঘন গাছপালার আড়াল রয়েছে।

 

আতসকাচ বের করে ছুরিটা পরীক্ষা করতে গিয়ে একবার হাত কেঁপে উঠল। এই ক্ষুরধার ছুরি দিয়েই কি এপ্রিলের এক নিঝুম ভোরবেলায় নিষ্ঠুর আততায়ী রুদ্রেন্দুপ্রসাদ রায়চৌধুরির শ্বাসনালী কেটে দিয়েছিল? শ্রাবন্তী কি বলতে পারবে, এ ছুরি সে কোথায় পেল?

 

বৃষ্টি এবং হাতের ঘষা খেয়ে রক্ত মুছে যাওয়া সম্ভব। তবু পিঠের দিকে ভঁজে কালচে জমাট আর সূক্ষ্ম এই ছোপগুলো হয়তো মরচে নয়। ফরেন্সিক টেস্ট করানো দরকার। ছুরিটা রুমালে জড়িয়ে সাবধানে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন কর্নেল।

 

ঊর্মিকে যে ছুরি দিয়ে খুন করা হয়েছিল, সেটা বিদেশী ছুরি। পশ্চিম জার্মানির তৈরি। মৃগাঙ্কের আমদানি-রফতানির কারবার থাকায় ব্লেডের মতো ধারালো অমন একটা ছোট্ট চার ইঞ্চি ছুরি যোগাড় করা খুব সহজ ছিল। এই ছুরিটা দেশী। দ্বিগুণ লম্বা।

 

ঊর্মির কাছে তার বাবার হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি জেনে নিয়েছিল মৃগাঙ্ক। একটা হত্যা থেকে আরেক হত্যার প্রেরণা লাভ করেছিল সে। প্রেরণা ছাড়া আর কী। বলা যাবে–যদিও প্রেরণার সঙ্গে শুভের সম্পর্ক রয়েছে। আসলে হয়তো। কালের নিয়ম। অধুনা সবকিছুর সঙ্গে অশুভ জড়িয়ে যাচ্ছে। স্নেহ পাওয়ার কথা যেখানে, সেখানে এসে পড়ছে কদর্য ব্যাভিচার।…

 

সুনেত্রা ওপরের জানালা থেকে চেঁচিয়ে উঠল, কর্নেল জেঠু!

 

কর্নেল বুঝতে পারেননি অন্যমনস্কতায় আগাছার জঙ্গল ঠেলে বসন্তনিবাসের পেছন ঘুরে কোথায় এসে পড়েছেন। হ্যাঁ, এই তো সুনেত্রাদের বাড়ি। হাত তুলে হাসলেন।

 

হিমুদা এই মাত্র এসে গেছে। সুনেত্রা ঘোষণা করল।

 

ওপরের ঘরে হিমাদ্রি, শ্রাবন্তী ও সুনেত্রা আড্ডা দিচ্ছিল। কর্নেলকে দেখে হিমাদ্রি বলল, কর্নেল, এভরিথিং পজিটিভ। কম্পাউন্ডার ভদ্রলোক আমার চেনা। উনি—

 

এক মিনিট। এই ভদ্রমহিলাকে সামলাই। বলে কর্নেল সচ্ছিদ্র কাঁচের কৌটোটা বের করলেন। হিমাদ্রি ও সুনেত্রা প্রজাপতিটা দেখতে থাকল। কর্নেল বাইনোকুলার, ক্যামেরা টেবিলে রাখলেন।

 

শ্রাবন্তী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছিল কর্নেলকে। কর্নেল তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন না ইচ্ছে করেই। কিন্তু এ কী দেখছেন! এ যেন জীবন্ত এক কংকাল মূর্তি। কোটরগত চোখ। চোখে কী অস্বাভাবিক–যেন অপার্থিব দৃষ্টি জ্বল জ্বল করছে।

 

সুনেত্রা বলল, কর্নেল জেঠু, শ্রাবন্তী।

 

কর্নেল পকেট থেকে রুমালে জড়ানো ছুরিটা বের করছিলেন। ছুরিটা শ্রাবন্তীর দিকে বাড়িয়ে যেই বলেছেন, এটা চিনতে পারছ কি শ্রাবন্তী?–অমনি শ্রাবন্তী দু হাতে মুখ ঢেকে অস্ফুট চিৎকার করে উঠল।

 

সে পড়ে যাচ্ছিল, সুনেত্রা ধরে ফেলল। অজ্ঞান হয়ে গেছে। হিমাদ্রি ও সুনেত্রা তাকে ডিভানে শুইয়ে দিল। ফ্যানটা জোরে চালিয়ে দিল।

 

কর্নেল একটু হাসলেন। এই রি-অ্যাকশনটাই দেখতে চেয়েছিলাম। হু, তোমরা অবাক হয়ো না। এটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। বলে শ্রাবন্তীর মাথার কাছে গিয়ে বসলেন।

 

শ্রাবন্তী হঠাৎ উঠে বসল ডিভানে। এক ধাক্কায় কর্নেলকে সরিয়ে দিল। তারপর সে মাথা দোলাতে শুরু করল। চুলগুলো খুলে ছড়িয়ে পড়ল। সে। প্রথমে বিড় বিড় করে দুর্বোধ্য কী সব বলতে থাকল। তারপর ক্রমশ তার কথা স্পষ্ট হচ্ছিল। ভুতুড়ে কণ্ঠস্বরে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে হাঁফাতে হাঁফাতে সে বলল এবার ইন্দুর পালা। ইন্দুর, গলা কাটব। তারপর শ্যামার গলা কাটব। দয়ালের গলা কাটব মনিয়ার গলা কাটব। ইন্দুর গলা কেটে রক্ত খাব। রক্ত খেয়ে আমি নাচব। আমাকে কেউ ছুঁয়ো না। আমি বলি খেতে এসেছি। আমি কে জানো? আমি সর্বমঙ্গলা। আমি সব্বাইর গলা কেটে রক্ত খাব। রক্ত খেয়ে নাচব। ইন্দুর গলা কাটব।

 

কর্নেল তার কিটব্যাগ খুলে একটা ছোট্ট শিশি নিয়ে এলেন। সুনেত্রা বলল, স্মেলিং সল্টে কিছু হয় না শুনেছি।

 

স্মেলিং সল্ট নয়। আরও তেজী জিনিস। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন। কলকাতার এক বড় সাইকিয়াট্রিস্টের কাছ থেকে নিয়ে এসেছি। দেখা যাক রেজাল্ট কী হয়।

 

নাকের কাছে ধরতেই শ্রাবন্তী ছিটকে ধনুকের মতো বেঁকে চিত হয়ে গেল। তার বুক ও পেট খুব ঝাঁকুনি দিতে থাকল। ক্রমশ ঝাঁকুনি থেমে এল। দু-তিন মিনিট পরে সে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বলল, জল খাব।

 

সুনেত্রা জলের গ্লাস নিয়ে এল তক্ষুনি। কর্নেল শ্রাবন্তীকে জল খাইয়ে দিয়ে বললেন, চুপচাপ শুয়ে থাকো। কেমন?

 

শ্রাবন্তী শুয়ে রইল। সুনেত্রা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।

 

কর্নেল হিমাদ্রিকে বললেন, খবর পজিটিভ?

 

হ্যাঁ। কম্পাউন্ডার ভদ্রলোক বললেন, উনি আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিলেন। আঙুলের ডগা প্রায় দুভাগ হয়ে হাড়ে ঠেকেছিল। তবে লোকটার নার্ভের প্রশংসাও করলেন। রুমালে জড়িয়ে অতক্ষণ ধরে যন্ত্রণা সহ্য করেছে–আর হ্যাঁ, হাতের তালু চিরে গিয়েছিল একটুখানি।

 

সুনেত্রা বলল, কার হিমুদা?

 

হিমাদ্রি কর্নেলের দিকে তাকিয়ে হাসল। একটা লোকের।

 

সুনেত্রা অভিমান করে বলল, যাও, বোলো না।

 

কর্নেল বললেন, শ্রাবন্তীর বাবার হত্যাকারীর ডান তর্জনী কেটে গিয়েছিল, বিবি। রুদ্রেন্দুবাবু তার মতলব টের পেয়ে একটু ধস্তাধস্তি করেছিলেন। এমন কী পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থাতেও প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে দরজার দিকে ঝুঁপিয়ে পড়েছিলেন। হয়তো সেটাই ভুল হয়েছিল। আততায়ী তাকে বাগে পেয়েছিল।

 

সুনেত্রা দম আটকানো গলায়, বলল, কে সে?

 

সম্ভবত আজ রাতের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলতে পারব, যদি আমার অনুমান সঠিক হয়।

 

সে তো ইন্দুবাবু!

 

কর্নেল তার কথার জবাব না দিয়ে শ্রাবন্তীর দিকে ঘুরলেন। শ্রাবন্তী, কেমন বোধ করছ?

 

শ্রাবন্তী আস্তে বলল, ভাল।

 

ছুরিটা কোথায় কুড়িয়ে পেয়েছিলে শ্রাবন্তী?

 

বাড়ির পেছনে খিড়কির কাছে ঘাসের ভেতর পড়েছিল। টাটকা রক্ত লেগে ছিল। খিড়কিও খোলা ছিল।

 

তুমি কাউকে দেখাওনি ছুরিটা?

 

তারপর কী হয়েছিল আমার মনে পড়ছে না।

 

ঠিক আছে। স্মরণ করতে হবে না আর। ও সব কথা ভুলে যাও।

 

সুনেত্রা উঠল। সর্বনাশ! কর্নেল জেঠু বাইরে থেকে ফিরেই কফি খান। ভুলে গেছি। বলে সে হন্তদন্ত বেরিয়ে গেল।

 

হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলল, মাত্র দুদিন আগে আমিই পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে থেকেছি। আজ দিব্যি পুলিশের ডিটেকটিভ সেজে সারা ভাগলপুরের সব ডিসপেন্সারি আর হাসপাতাল চষে বেড়িয়েছি। তবে ভয় হচ্ছিল, যদি কেউ বলে বসত, কৈ, দেখি আইডেন্টিটি কার্ড? স্মার্টলি চালিয়ে গেছি শেষ পর্যন্ত।

 

কর্নেল বললেন, আমার ধারণা ছিল সেতাপগঞ্জের কোনো ডিসপেন্সারিতে ঢুকবে না লোকটা। কারণ ছোট্ট জায়গা। তার ওপর অনেকেই চেনাজানা। ধরা পড়ার ভয় ছিল। কাজেই কাছাকাছি–তার মানে, পরবর্তী কোনো চেনা জায়গায় সে ছুটে যাবে, যেখানে কেউ আঙুলকাটা নিয়ে সন্দেহ করবে না। কাল বিকেলে সেতাপগঞ্জে নেমে দেখি, বিবি গেটে দাঁড়িয়ে। ওর চোখ এড়িয়ে আড়ালে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে স্টেশন মাস্টারের ঘরে গিয়ে হাজির হলাম। ভাগ্যক্রমে আগেরবার এসে যে স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, তিনি বদলি হননি। কাজেই তদন্তে অসুবিধা হল না। সন্ধ্যা সওয়া ছটায় মুঙ্গেরে তোমার কাছে চলে গেলাম। আজ সকালে ফিরে দেখি, বিবি যথারীতি এসে দাঁড়িয়ে আছে গেটে।

 

আপনার জন্য ও ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছিল।

 

বুঝতে পারছি। কিন্তু ঊর্মির হত্যাকাণ্ডের ফয়সালা না করে তো আসা যাচ্ছিল না।

 

আপনি তাহলে বুঝতে পেরেছিলেন দুটো আলাদা কেস?

 

হ্যাঁ। শুরুতেই। দ্বিতীয়টা ঘটেছে প্রথমটা থেকে শিক্ষা নিয়ে।

 

হিমাদ্রি দুঃখিত ভাবে হাসল। পৃথিবীটা কী হয়ে যাচ্ছে, কর্নেল! দয়ামায়া স্নেহভালবাসা–এ সব মানবিক বোধের আর কোনো ঠাঁই নেই। টাকাকড়ি সম্পত্তি এ সব জিনিসই বড় হয়ে উঠছে।

 

কে জানে! কর্নেল অন্যমনস্কভাবে উঠে গেলেন। বাইনোকুলার নিয়ে একটা জানালার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, হয়তো আবহমান কাল ধরে পৃথিবীটা এরকমই, ডার্লিং! বিশ্ব প্রকৃতিতে পাপ-পুণ্য মিলেমিশে আছে। হয়তো থাকবে–যতদিন না পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যায়। আমরা মানুষ। আমাদের মধ্যে

 

সুনেত্রাদের বাগানে উড ডাকের চিৎকার শুনতে পেয়েছেন কর্নেল। চোখে বাইনোকুলার রেখে খুঁজতে থাকলেন।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *