এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

ব্ল্যাকমেলারের শাস্তি

 

অফিসঘরে ফিরে এসেছেন সবাই। অরিজিতের মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। ছবিটা এখনও তার হাতে। ডাঃ ভাদুড়ী আর কৃতান্ত হালদার তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। কর্নেল বুঝতে পারছিলেন ডিসি ডিডি খুব ফাঁপরে পড়েছেন। মিনিস্টারের ভাগ্নেকে গ্রেফতারের হুকুম দেওয়া শুধু নয়, এ কেসের মুখ একেবারে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়তো একটু কঠিন। পুলিশ প্রশাসন ঝাঁকুনি খাবে। হিমাদ্রির ছবি ছাপিয়ে পুরস্কার ঘোষণা করে যে হঠকারিতা ঘটানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কাগজগুলোও তেড়েমেড়ে আসরে নামবে। অরিজিতের কপালে ঘামের ফোঁটা জমছে।

 

অরিজিৎ একটা আড়ষ্ট হাত টেবিলের ফোনে রাখলে কর্নেল একটু হেসে বললেন, স্ত্রীর সতীত্বে মৃগাঙ্কের সংশয় ছিল। তাই প্রাইভেট গোয়েন্দা আমাদের এই মিঃ হালদারকে সে স্ত্রীর গতিবিধির খবর নিতে বলেছিল। তারপর নিঃসংশয় হয়ে সে সিদ্ধান্ত করে, একটা ফয়সালা করতেই হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পরে, ডিভোর্সের পথে না গিয়ে সে এই সাংঘাতিক পথে গেল কেন? আসলে এই প্রবণতা নিহিত ছিল তার চরিত্রের ভেতর। সে আজীবন লড়াই করে বড় হয়েছে। তার প্রকৃতি রুক্ষ। ন্যায়-অন্যায় বোধ কম। মামা মন্ত্রী হবার পর স্বভাবত সে বড়লোক হবার সবরকম সুযোগ-সুবিধা লুটে নিতে ছাড়েনি। দুর্নীতির পথে হাঁটতে হাঁটতে একটা পর্যায়ে মানুষের মধ্যে ক্রমশ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ক্রুরতা জেগে ওঠে। বেপরোয়া হতে থাকে সে। সেই ক্রুরতা আর উদ্ধত সাহসই তাকে অসতী স্ত্রীর প্রতি হিংস্র করে তুলেছিল। সে নিজের হাতে শাস্তি দিতে চেয়েছিল ঊর্মিকে। সেই সময়–গত ১১ এপ্রিল হঠাৎ তার শ্বশুর খুন হয়ে গেলেন। সে ওঁদের পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে ফেলেছে। অমনি সে ঊর্মিকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিল। বলা যায়, রুদ্ৰেন্দুবাবুর হত্যাকাণ্ড তাকে প্রেরণা যোগাল। হত্যার পদ্ধতি–মোডুস অপারেন্ডি যদি এক হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ঊর্মিদের পারিবারিক ঘটনার সঙ্গে ঊর্মির হত্যাকাণ্ডটাও জড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ বাবার হত্যাকারীই মেয়ের হত্যাকারী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে গিয়েই সে হিমাদ্রিকে পেয়ে গেল। অথচ সুব্রতের ওপরও তার রাগ ছিল। কারণ কৃতান্তবাবুর কাছে সে জানতে পেরেছিল, সুব্রত তার বউয়ের প্রেমিক। কিন্তু সুব্রতকে জড়াতে গেলে রুদ্রেন্দুবাবুকে খুন করার মোটিভ পাওয়া। যাবে না। মোটিভ শক্ত হওয়া চাই। এদিকে হিমাদ্রির সঙ্গে ঊর্মির প্রণয়ের কথাও সে কৃতান্তবাবুর মারফত জেনে গেছে। সেতাপগঞ্জে যা যা ঘটেছিল তাও তার অজানা নেই। রুদ্রেন্দুবাবু একই কারণে ভিটেছাড়া করেছিলেন হিমাদ্রিদের ফ্যামিলিকে। কাজেই একমাত্র হিমাদ্রির পক্ষেই বাবা ও মেয়েকে হত্যার মোটিভ অত্যন্ত জোরালো। কিন্তু কাজটা সহজ নয়। নিজের হাতে অসতী স্ত্রীকে শাস্তি দিতে হলে যে নিষ্ঠুর ক্রুরতা থাকা চাই, তা তার আছে। হত্যাপদ্ধতিও একই হবে। তাই সে হাত প্র্যাকটিস করতে চাইল।

 

কৃতান্ত হালদার বললেন, বুঝে ফেলেছি। ওই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েটার ওপর দিয়ে হাত প্র্যাকটিস

 

অরিজিৎ অনুচ্চস্বরে ধমক দিলেন, আঃ! আপনি চুপ করুন তো!

 

কৃতান্তবাবু ক্ষুব্ধ হয়ে তোক গিয়ে বললেন, বলুন কর্নেল স্যার! প্রথম দিনই আমি বলেছিলাম কি না, মৃগাঙ্কবাবুই খুনী?

 

কর্নেল বললেন, লোডশেডিং থাকলে দরজা তিনবার নক করা এবং অন্য সময় তিনবার কলিংবেল বাজানো মৃগাঙ্কের অভ্যাস। সেটা রঞ্জনবাবুর স্ত্রীর কাছে জেনেছি, কিন্তু যেই ঊর্মি দরজা খুলবে, তাকে অমনি নিঃশব্দে এবং কয়েকসেকেন্ডের মধ্যে খতম করতে হবে শ্বাসনালী কেটে। টু শব্দ করতে দেওয়া হবে না। কারণ পাশের ফ্ল্যাটের একটা কুকুর এবং এক ভদ্রমহিলার বড় নাকগলানো স্বভাব। তাছাড়া উভয়ের কান বড্ড বেশি সজাগ। অতএব হাত প্র্যাকটিশ জরুরি ছিল। সে তখন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এক বোকাসোকা বারবনিতা মিস প্যাটিকে খুঁজে বের করল।

 

অরিজিৎ আস্তে বললেন, কিন্তু মৃগাঙ্ক ১১ জুলাই বোম্বেতে ছিল! তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

 

না। তার নামে প্লেনের টিকিট কাটা হয়েছিল। গিয়েছিল তার প্রতিনিধি হেমন্ত বোস। ১২ জুলাই হোটেল ডিলাইটে যাকে তোমাদের ইন্সপেক্টর মোহনবাবু ট্রাঙ্ককল করে ঊর্মির মৃত্যুসংবাদ দিয়েছিলেন, সে হেমন্ত বোস। কিন্তু হেমন্ত বোস ধুরন্ধর লোক। সে বোম্বে পৌঁছেই একটা টেলিগ্রাম করেছিল মৃগাঙ্ককে। ওটাই তার সেদিন বোম্বেতে থাকার একটা শক্ত এভিডেন্স। সম্ভবত সে ব্যাপারটা টের পেয়েই মৃগাঙ্ককে ব্লাকমেলের ফন্দি এঁটেছিল। টেলিগ্রামটা সে পাঠিয়েছিল তারই সংকেত হিসেবে। চতুর মৃগাঙ্ক বুঝতে পেরেছিল হেমন্তের উদ্দেশ্য।

 

অরিজিৎ দ্রুত ডায়াল করলেন মৃগাঙ্কের অফিসে। হেমন্তবাবুকে চাইছি! কী? কখন? কী আশ্চর্য! হ্যাঁলা! হ্যালো! হ্যালো!

 

কর্নেল তাকিয়ে ছিলেন। অরিজিৎ ফোন নামিয়ে রেখে বললেন, হেমন্ত বোস কিছুক্ষণ আগে অফিসের পাঁচতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে।

 

কৃতান্ত হালদার চেঁচিয়ে উঠলেন, মার্ডার! মার্ডার না হয়ে যায় না!

 

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–মার্ডার। অরিজিৎ! অরিজিৎ! আর এক মুহূর্তও দেরি নয়। তোমার এবার অনেক জরুরি কাজ এসে গেছে।

 

অরিজিৎ আবার ফোন তুলে ডায়াল করলেন। এবার লালবাজার সদর দফতরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *