এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
টেলিগ্রামের গেরো
আজ সারা দুপুর সারা-বিকেল প্রচণ্ড অস্থিরতায় কাটিয়েছেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। সন্ধ্যা অব্দি ছাদের প্ল্যান্ট ওয়ার্লডে গাছপালার পরিচর্যা করেছেন আর কানে প্লেনের শব্দ এলেই বাইনোকুলার চোখে রেখে আকাশে দৃষ্টিপাত করেছেন। আকাশে হাল্কা মেঘের ভেতর লুকোচুরি খেলতে-খেলতে আজ কেন যেন সব প্লেনই বিপরীতমুখী! প্রত্যাশিত প্লেনটি আসবে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে। দমদমে মাটি ছোঁবার কথা তিনটে পঞ্চাশে। দুর্ঘটনা ঘটল না তো?
ষষ্ঠী কফি দিতে এসে অবাক হয়ে বলেছিল, কী পাখি বাবামশাই?
তখন কর্নেল হেসে ফেলেছিলেন। মাঝে মাঝে অস্থিরতা তাঁকে বালক করে ফেলে। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট নম্বর ২৩১-এ বোয়িং বিমানের পাইলট বদলে যেতেও পারে। অনিন্দ্যর বদলে কোন মালহোত্র কিংবা সিং। আর অনিন্দ্যরও বড্ড ভুলো মন। এইসব ভেবেই মনে অস্থিরতা এত।
রাত আটটায় ফোন করলেন আবার দমদম এয়ারপোর্ট। ইতিপূর্বে দুবারই ফোন করে জেনেছেন, ফ্লাইট লেট। বোম্বে এলাকায় আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ। ফ্লাইট ২৩১ স্থগিত হবার সম্ভাবনা আছে। এতক্ষণে শুনলেন, প্লেনটি টেকঅফ করেছে আধঘণ্টা আগে।
প্রত্যাশিত ফোন এল রাত সওয়া দশটায়। কর্নেল, অনিন্দ্য বলছি। ফ্লাইট সাড়ে ছ ঘণ্টা লেট। যদি না একদঙ্গল ভি আই পি প্যাসেঞ্জার থাকতেন, ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়ে যেত।
কর্নেল উত্তেজনা দমন করে বললেন, বুঝতে পেরেছি। খবর বলো, ডার্লিং!
অনিন্দের হাসি ভেসে এল। আমি তো ভাবছিলাম আপনাকে পাব না। কোথায় যেন যাবেন বলেছিলেন আজ?
যাওয়া পিছিয়ে দিয়েছি। যাই হোক, খবর বলো।
হ্যাঁ, শুনুন। আইটেম বাই আইটেম বলে যাচ্ছি।
কর্নেল ঝটপট কাগজকলম টেনে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ।
৯ জুলাই মর্নিং ফ্লাইটের ফ্লাইট নম্বর ২২৭ প্যাসেঞ্জার লিস্টে হেমন্ত বোস নামে এক ভদ্রলোকের নাম আছে। কিন্তু উনি সেদিন দমদম এয়ারপোর্টে চেক ইন করেননি। কোনো খবর দিয়ে বুকিং ক্যান্সেলও করেননি। কাজেই সিট খালি ছিল একটা।
হু–১১ জুলাই?
১১ জুলাই মর্নিং ফ্লাইটে হেমন্ত বোস নামে কোনো যাত্রীর নাম নেই।
মৃগাঙ্ক ব্যানার্জির নাম আছে তো?
আছে। উনি চেক ইন করেছিলেন। সিট নম্বর এ-৩৭।
১২ জুলাই?
আমাদের বোম্বে অফিসে ১২ জুলাইয়ের মর্নিং ফ্লাইটে মৃগাঙ্ক ব্যানার্জির নামে বুকিং করা হয়েছিল ২৬ জুন।
কর্নেল চমকে উঠলেন। ঠিক দেখেছ?
দেখেছি মানে? রেকর্ড চেক করে বলছি। যাই হোক, ১২ জুলাই মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি চেক ইন করেছিলেন। ওর সিট নাম্বার ছিল বি-১৭।
ওই দিনের ওই ফ্লাইটে হেমন্ত বোস নামে কারুর নাম নেই লিস্টে?
না। লিস্টে নেই।
ওক্কে। হোটেল ডিলাইটে খোঁজ নিয়েছ?
অনিন্দের হাসি শোনা গেল। আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস, কর্নেল। হোটেল ডিলাইটে স্যুট নাম্বার ৭২-এ মৃগাঙ্ক ব্যানার্জির রিজার্ভেশন ছিল। পৌঁছান ১১ জুলাই বেলা দুটোয়। পরদিন সকাল সাড়ে নটায় চেক আউট করে সোজা এয়ারপোর্টে যান।
চেহারার বর্ণনা কিছু পেয়েছ?
চেষ্টা করেছিলাম। ওদের মনে রাখা সম্ভব নয়। শুধু টেলিফোন অপারেটর বলল, তার মনে আছে, স্যুট নাম্বার ৭২-এ কলকাতা থেকে ট্রাঙ্ককল এসেছিল। বুঝলেন তো? ওদের একটু নাকগলানো স্বভাব–মানে মেয়েদের যা হয়। বলল, বউ মরার খবর এসেছিল। খবর পেয়েই ভদ্রলোক চেক-আউট করেন।
কর্নেল শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ, ডার্লিং! ওয়েলডান।
আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস, মাই ডিয়ার অল ওল্ড ম্যান! গুডনাইট।
গুডনাইট! কর্নেল শান্তভাবে ফোন রাখলেন। তারপর কাগজে লেখা নোটগুলোর দিকে তাকালেন। হু, সব ঠিক করা ছিল। ১২ জুলাই মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি ফিরে আসবে বলে ২৬ জুন প্লেনের টিকিট কেটে রাখা হয়েছিল বোম্বে থেকে। ওইদিন সকালে যদি গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর মোহনবাবু ট্রাঙ্ককল না করতেন, তাও মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি ফিরে আসতেন কলকাতা।
১১ জুলাই রাতে টেলিগ্রাম করেছিল হোটেল ডিলাইট থেকে হেমন্ত বোস। তার মানে, হেমন্ত বোস তখনও জানত না তার মনিবের উদ্দেশ্য কী। মনিবের নামের টিকিটে সে বোম্বে গিয়েছিল। হয়তো কার্গো সম্পর্কে খবর নিয়ে স্বাভাবিক কর্তব্যবোধে জরুরি টেলিগ্রাম করেছিল। হোটেলে মৃগাঙ্ক ব্যানার্জির নামেই স্যুট বুক করা ছিল। কাজেই তার মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি সাজা ছাড়া উপায় ছিল না। ১২ জুলাই সকালে ইন্সপেক্টর মোহনবাবুর ফোন পেয়ে সে চমকে গিয়ে থাকবে। কিন্তু তাহলে একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ১২ জুলাই মৃগাঙ্কের নামে প্লেনের টিকিট বুক করা ছিল। হেমন্ত যদি জানত একথা, তাহলে আগের রাতে টেলিগ্রাম করল কেন?
কৃতান্ত হালদার সত্যিই একটা অসাধারণ সূত্র হাতে এনে দিয়েছেন। হেমন্ত বোসের টেলিগ্রামটা একটা মূল্যবান ডকুমেন্ট। শিপিং কোম্পানিতে খোঁজ নিলেও নিশ্চয় জানা যাবে হেমন্ত বোসই সেখানে কার্গো সম্পর্কে খবর নিতে গিয়েছিল।
কর্নেল চোখ বুজে দাড়ি টানতে শুরু করলেন।
স্বাভাবিক কর্তব্যবোধেই কি টেলিগ্রামটা করেছিল হেমন্ত বোস? কিন্তু সে তো জানত, ১২ জুলাই তাকে কলকাতা ফিরতে হবে আবার মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি হয়ে। তাহলে কেন সে টেলিগ্রাম করল মৃগাঙ্ক ব্যানার্জির নামে?
হুঁ, টেলিগ্রামটা ছিঁড়ে–শুধু ছিঁড়ে নয়, পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন মৃগাঙ্কবাবু। বিব্রত বোধ করেছিলেন কি? ধূর্ত হেমন্ত বোস কি তাকে
কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। ডিসি ডিডি অরিজিৎ লাহিড়ী এখন রাত এগারোটায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকার সম্ভাবনা।
সাড়া পেলেন সঙ্গে সঙ্গে। কর্নেল বললেন, আশা করি, ঘুম ভাঙাইনি ডার্লিং?
না। গোদারের একটা চিত্রনাট্য পড়ছি। অসাধারণ!
বুঝতে পারছি, তুমি ভবিষ্যতে চাকরি ছেড়ে আর্ট ফিল্ম করবে। পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটে অর্জিত জ্ঞান-বুদ্ধি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা তোমার আছে।
প্রশংসা, না নিন্দা করছেন কে জানে!
প্রশংসা। তো শোনো
মাই গুডনেস! আপনি সেতাপগঞ্জ যাননি?
যাব। শোনো–কাল এগারোটা নাগাদ একবার সময় করে নাও। তোমাকে নিয়ে একবার বেরুতে চাই। বেশি দূরে নয়। টাংরা অঞ্চলে একটা মেন্টাল ক্লিনিকে।
কী সর্বনাশ! আমার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে আপনি কি সন্দিহান?
ডাঃ অশোক ভাদুড়ী সাইকিয়াট্রিস্টের নাম আশা করি শুনেছ।
শুনেছি। কিন্তুমাই গড়! আপনি কী বলছেন!
প্রতিশ্রুতি দিতে পারি, তোমার অভিজ্ঞতাটা হবে অত্যন্ত চমকপ্রদ।
ব্যাপারটা কী খুলে বলুন না প্লিজ! একে তো গোদার গোলমেলেনার্ভের বারোটা বাজিয়ে ছাড়েন ভদ্রলোক, তার ওপর আপনি আরও এককাঠি সরেস। কাল সকালেই ডাঃ ভাদুড়ীর পেসেন্ট করতে চাইছেন আমাকে! ও! হরি!
ডার্লিং, লজিক শাস্ত্রে অবভাসতত্ত্ব বলে একটা টার্ম আছে জান তো? হোয়াট অ্যাপিয়ারস, ইজ নট রিয়্যাল। যাই হোক, আমি অপেক্ষা করব তোমার জন্য।
অরিজিৎ কিছু বলার আগে ফোন রেখে দিলেন কর্নেল। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের পাইলট ক্যাপ্টেন অনিন্দ্য মিত্রের দেওয়া তথ্যগুলোর ওপর আবার চোখ রাখলেন। হুঁ, টেলিগ্রামটা মূল্যবানই বটে।
