এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

ইন্দু ভটচাযের বিবর্তন

 

সুনেত্রা অস্বস্তিতে আড়ষ্ট। হিমাদ্রি সকালেই বাসে চেপে মুঙ্গেরের দিকে কোথায় চলে গেছে। এখন ভয়, যে কোনো সময় পুলিশ না হানা দেয় সুনেত্রাদের বাড়িতে। হয়তো কতলোক জেনে গেছে হিমাদ্রি ফেরারী আসামী এবং সুনেত্রাদের। বাড়িতেই উঠেছিল। আর সবচেয়ে ভয় ইন্দু ভটচাযকে। উনি যদি জানতেন, ঊর্মিকে খুনের দায়ে হিমাদ্রি পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তাহলে কেলেঙ্কারি ঘটে যেত।

 

তবু সুনেত্রা হিমাদ্রিকে আর দুটো দিন এখানেই লুকিয়ে থাকতে পরামর্শ দিয়েছিল। কলকাতা থেকে কর্নেল এসে গেলে হয়তো হিমাদ্রির আর তত ভয়ের কারণ ছিল না। ওই বুড়ো মানুষটি সম্পর্কে সুনেত্রার বিশ্বাস খুব গভীর। কিন্তু হিমাদ্রি আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গেল।

 

সুনয়নী খুব বকাবকি করেছেন মেয়েকে। হিমুটা ছোটবেলা থেকেই ঝামেলা বাধাতে ওস্তাদ। হুট করে ওকে বাড়িতে ডেকে এনে ভাল করেনি সুনেত্রা। তার ওপর চরিত্রহীন বলে বদনাম আছে হিমুর। তার সঙ্গে সুনেত্রার এমন মাখামাখি দেখে নিশ্চয় বাঙালিপাড়া জুড়ে এতক্ষণ ভেতর-ভেতর ঢি ঢি পড়ে গেছে।

 

সুনয়নীর স্বভাব এই। মায়ের এই বৈপরীত্য দেখতে অভ্যস্ত সুনেত্রা। পাত্তা দেয়নি মাকে। কিন্তু তার অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। প্রথম কথা, পুলিশ হয়রানি করতে পারে। দ্বিতীয় কথা, বসন্তনিবাসে ঢোকার মুখ রইল না আর। ও বাড়ির মেয়ের খুনীকে সে ধরিয়ে না দিয়ে পালিয়ে যেতে দিয়েছে কেন?

 

বিকেলে অস্থির সুনেত্রা বাড়ির পেছনের আগাছাভরা জমিটা পেরিয়ে রেললাইন ডিঙিয়ে নাক বরাবর হেঁটে উঁচু সড়কে উঠল। তারপর গঙ্গার ধারে আকাশিয়া গাছটার তলায় যেতেই চমকে উঠল। অপালা চুপচাপ বসে আছে।

 

তাকে দেখে অপালা একবার মুখ ঘোরালো। সুনেত্রা পাশে নগ্ন মাটিতে বসে বলল, এখানে কী করছিস রে অপু? আজ বুঝি তোদের ফার্মে যাসনি?

 

অপালা মাথা দোলাল। একটু পরে সুনেত্রা আরও অবাক হয়ে টের পেল, অপালা যেন নিরিবিলি বসে কান্নাকাটি করছিল। সুনেত্রা ওর ঘাড়ে হাত রেখে বলল, কী হয়েছে রে?

 

কিছু না।

 

সুনেত্রা বুঝতে পারছিল না, হিমাদ্রির ব্যাপারটা অপালা জানে কি না। বলল, উঁহু-নিশ্চয় কিছু হয়েছে। বল না অপু আমাকে? আমি কাউকে বলব না।

 

অপালা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল হঠাৎ। আমার কেন মরণ হয় না বিবিদি? আমার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না।

 

সুনেত্রা ধমক দিল, কাঁদতে লজ্জা করে না পোড়ারমুখী, ধাড়ী লড়কি হয়েছিস! ওই দ্যাখ, লোকেরা তাকাচ্ছে। চোখ মোছ। মুছে ফ্যাল বলছি!

 

অপালা আস্তে ভাঙা গলায় বলল, আমি সন্ধ্যার ট্রেনে কলকাতায় মামার কাছে চলে যাচ্ছি।

 

হয়েছে কী, বলবি তো খুলে? ইন্দুকাকা বকেছে?

 

অপালা চারদিক দেখে নিয়ে চোখ মুছল। তারপর সুনেত্রার একটা হাত ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল, তুমিই আমার আসলি দিদি, বিবিদি! তুমি যেন কাউকে বলে দিও না। আমি বাড়ি থেকে ভেগে এসেছি। ছটার ট্রেনে কলকাতা। যাব। মঙ্গলা মাইজির দিব্যি বিবিদি, বোলো না যেন।

 

বলব না। কেন তুই ভেগে যাচ্ছিস?

 

অপালা মুখ নামিয়ে আস্তে বলল, ইন্দুকাকা রোজ আমাকে ফার্মে নিয়ে যায় আর আজেবাজে কথা বলে। সে দিন আসবার পথে রতুয়ার টাড়ে সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছিল। কাল অনেক রাতে আমার ঘরের দরজায় গিয়ে ডাকছিল। আমি দরজা খুলিনি। তখন আমাকে শাসালো।

 

সুনেত্রা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, তুই কী বলছিস। অপু! ইন্দুকাকা–

 

অপালা ফুঁসে উঠল। বাবা মার্ডার হবার কিছুদিন পর থেকে ইন্দুকাকা আমার পেছনে লেগেছে। লজ্জায় আমি কাউকে বলতে পারি না, বিবিদি। সময়ে-সময়ে ইচ্ছে করেছে, দিই ওর গলায় ছুরি চালিয়ে। এখন তো বুঝতে পারছি, বাবাকে কে মার্ডার করেছে?

 

সুনেত্রা উত্তেজিতভাবে বলল, জানিস? টুকুও সেটা বুঝতে পেরেছিল। আমাকে লিখেছিল সে।

 

মেজদিকে আমি বলেছিলাম, আমাকে তোমার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখো। মেজদি বলেছিল, বড়দি একা পড়ে থাকবে। ওকে সামলাবে কে?

 

লোকটা–আশ্চর্য, ওকে দেখে মনেও হয় না ভেতর-ভেতর এই। সুনেত্রা সতর্কভাবে চারদিক দেখে নিয়ে বলল। তা তুই তোর মামাকে ইশারায় জানালেও পারতিস?

 

মামা বিশ্বাস করবে না।

 

হ্যাঁ–বিশ্বাস করাও শক্ত।

 

তুমি জানো? আজ সকালেও আমাকে ফার্মে নিয়ে যেতে চাইছিল। শরীর খারাপ বললাম। তখন গায়ে হাত দিয়ে দেখতে এল। আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। সোজা বলে দিলাম, মামাকে সব লিখে পাঠাচ্ছি।

 

তখন কী বলল?

 

দাঁত বের করে বলল, তোমার মামাই আমাকে সাধছেন তোমাকে বিয়ে করতে!

 

অসম্ভব। তোর বাবার বয়সী একটা লোক! সুনেত্রা খাপ্পা হয়ে বলল। ওল্ড হ্যাগার্ড! আজ যদি আমার বাবাও বেঁচে থাকতেন রে অপু, দেখতিস ওকে গুলি করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতেন।

 

অপালা একটু চুপ করে থাকার পর বলল, আমিও কম নই। আমিই এবার শায়েস্তা করে ফেলতাম ওকে। মারতে মারতে বাড়ি থেকে ভাগিয়ে দিতাম। কিন্তু বড়দির মাথাও তো বিগড়ে দিয়েছে। বড়দি পর্যন্ত ওর দলে।

 

সুনেত্রা অবাক হয়ে বলল, সে কী রে? খুকুদি ওকে—

 

কথা কেড়ে অপালা হিসহিস করে বলল, বড়দি ওর কথায় ওঠে বসে। বড়দি কিছুদিন থেকে আমাকে বলছে, আমি তো আর বাঁচব না, অপু। ইন্দুকাকা যা বলবে মেনে চলিস। কক্ষনো ওর অবাধ্য হোসনে। ইন্দুকাকা না থাকলে আজ আমরা ভিখিরি হয়ে যেতাম।

 

খুকুদি তাই বলছে?

 

হ্যাঁ–যখন ভাল থাকে, তখন ওইসব কথা বলে।

 

তুই ওকে বলিসনে কেন, লোকটা তোকে

 

অপালা মুখ নামিয়ে বলল, ছিঃ!

 

শরম বাজে তোর! নাদান ছোঁকড়ি! সুনেত্রা ঘড়ি দেখল অন্যমনস্কভাবে। তাই চলে যা মামার কাছে। গিয়ে ওঁকে সব খুলে বল। আর আমিও দেখছি, বদমাসটাকে কেমন করে শায়েস্তা করা যায়। পুলিশ খামোকা রঘুয়াকে দায়ী করেছে, এদিকে আসলি খুনী দেবতা সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অপু, টুকুকেও এই ইন্দু ভটচায খুন করে এসেছে জেনে রাখ। স্ট্র্যাটেজি ক্লিয়ার হয়ে গেছে আমার কাছে। তোর বড়দির যা অবস্থা, বেঁচেও না বাঁচার শামিল। টুকু রইল না। বাড়ি আর সম্পত্তির মালিক ছিলি তোরা তিন বোন। এখন যদি তোকে বিয়ে করে ফেলতে পারে, ব্যস! বাচ্চু সিংয়ের মতো লর্ড বনে যাবে ইন্দু ভটচায। হ্যাঁ অপু, ওর মতলব ক্লিয়ার। সে জন্যই তোর বিয়ের চেষ্টা করেনি এতদিন। অন্য কোথাও তোর বিয়ে হলে কী হতে পারত ভেবে দ্যাখ। তোর বর এসে বসন্তনিবাসের মালিক হত। তোদের ফার্মের মালিক হত।…অপু, তুই চলে যা। মামার কাছে। সব কথা খুলে বল ওঁকে। শরম করিসনে।

 

অপালা বলল, কটা বাজল দেখ তো বিবিদি?

 

সময় হয়ে গেছে রে! চল, তোকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসি।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *