এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

মন্দিরে এক সন্ন্যাসী

 

সেতাপগঞ্জের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের আটচালায় মাঝেমাঝে সাধু-সন্ন্যাসী এসে ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকেন। নিছক গাঁজার লোভেও ভক্ত জুটতে দেরি হয় না। তারপর খবর পেয়ে পরমতত্ত্বের খোঁজে দু-চারজন, কেউ বা আধিব্যাধি মামলা মোকর্দমার ঝামেলা থেকে উদ্ধারের আশাতেও জুটে যায়।

 

গাঁজালোভীরা ঘুরঘুর করেছে কাল সন্ধ্যা থেকে। দেখেছে এই সাধুবাবার লাইন অন্যরকম। গাঁজার বদলে নস্যি আর হাঁচি। কখনও যোগাসনে ধ্যানীমূর্তি, কখনও ধুনির আলোয় শাস্ত্রপাঠে নিবিষ্ট। লম্বা খেকুটে চেহারা। মাথায় জটা, মুখে লম্বা দাড়ি, পরনে গেরুয়া কাপড়, গলায় রুদ্রাক্ষ–সবই ঠিক আছে। কিন্তু ইনি চা খান। কাছেই রেলের ফটক। ফটকওয়ালা শিবুয়া গাঁজার লোভেই জুটেছিল। কিন্তু সাধুবাবা তাকে পাঁচটাকার নোট দিয়ে বলেছেন, বেটা! হাম চায় পিয়েগা হরঘড়ি। ঔর রাতমে স্রিফ দো রোটি, থোড়াসা ডাল-উল। ব্যস! ঔর শুনো বেটা, টিশনবাজারসে ডিব্বাভরকে থোড়া সা নস্যি।

 

শিবুয়া লোকটা ভাল। সে আদিবাসী। তার ছোঁয়া চা-রোটি-ডাল খাবেন সাধুবাবা, এর চেয়ে আনন্দের আর কী থাকতে পারে? হাবভাব দেখে তার মনে হয়েছে, এতদিনে একজন সাচ্চা সাধুর সঙ্গলাভ তার হয়েছে। তার বউটা বাঁজা মেয়ে। এদিক থেকেও একটা আশীর্বাদসহ দাওয়া আশা করছে সে।

 

সকালে কাঁধে প্রকাণ্ড বোঁচকার মতো ঝোলা ঝুলিয়ে কমণ্ডুল হতে সাধুবাবা গঙ্গাস্নান করে ফেরার সময় ফটকে শিবুয়াকে চা আনতে বলে এসেছিলেন।

 

আটচালায় আসন করে বসে আছেন, হঠাৎ দেখলেন মন্দিরের ধারে কল্কেফুলের জঙ্গলের ভেতর একটা কেমন চেহারার মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চমকে উঠেলেন দিনদুপুরে ভূত দেখছেন ভেবে। ময়লা যেমনতেমন শাড়ি পরনে, খালি পা, মাথায় রুক্ষ একরাশ চুল। রোগা হাড়জিরেজিরে মেয়ে। তার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকার পর একটা পাথরে বসে পড়ল সে।

 

শিবুয়া চা আনলে সাধুবাবা জিগ্যেস করলেন, বেটা! দেখো তো উও লড়কি কৌন?

 

শিবুয়া হাসল। উও তো খুখুদিদি! মঙ্গলামাইকী ভর হোতি উসকি উপ্পর, সাধুবাবা!

 

কিধার রহতি উও?

 

উধার! বহৎ বড়া ঘরকী বেটি, বাবা! উও দেখিয়ে, উও মকান। বাঙালি জমিদারবাবুকা। লেকিন, জমিদারবাবু তো মার্ডার হো গেয়া!

 

মার্ডার হো গেয়া?

 

হাঁ সাধুবাবা!

 

শিবুয়া উঠে গেল বউয়ের চিলাচানিতে। বউটা বড় হাড়জ্বালানী মেয়ে। একটু কোথাও গিয়ে বসার যো নেই শিবুয়ার।

 

সাধুবাবা মাটির ভাঁড়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখছিলেন মেয়েটিকে। চা শেষ করে হাত নেড়ে ডাকলেন, এ বেটি! ইধার আ! মেরা পাশ আ যা!

 

কিন্তু মেয়েটি গ্রাহ্য করল না দেখে উঠে গেলেন কাছে। অমনি সেও উঠে দাঁড়াল। তারপর জঙ্গলে ঢুকে গেল। সাধুবাবাও জঙ্গলে ঢুকলেন। ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো! একবারে অদৃশ্য হয়ে গেল যে! সাধুবাবা ডাকলেন, বেটি! তু কঁহা হ্যায়? মেরা বাত তো শুন্ বেটিয়া!

 

তারপর জঙ্গল ঠেলে ওপাশে গিয়ে দেখেন, নিচু পাঁচিল ডিঙিয়ে মেয়েটি পোছড়া পাথুরে মাঠটায় গিয়ে পৌঁছুল। সাধুবাবা পাঁচিল ডিঙিয়ে এগিয়ে গেলেন। ডর কাহে বেটি! বাত তো শুন!

 

এবার মেয়েটি একটি পাথর কুড়িয়ে নিল। সাধুবাবা ভড়কে গেলেন। মেয়েটির চোখদুটি থেকে যেন হিংসা ঠিকরে বেরুচ্ছে।

 

সাধুবাবা কী করবেন ভাবছিলেন। মেয়েটি হঠাৎ হন হন করে চলতে শুরু করল। তখন উনিও পা বাড়ালেন। কয়েক পা গেছেন, অমনি মেয়েটি ঘুরে হাতের পাথরটা ছুড়ল তার দিকে। অল্পের জন্য মাথা বাঁচল। আর এগোনোর সাহস হল না! বাপস! এ যে একেবারে গোখরো সাপের মতো ফণা তুলেই। আছে।

 

মেয়েটি যেতে-যেতে মাঝেমাঝে পিছু ফিরে দেখে নিচ্ছে। একটু পরে রাস্তা ডিঙিয়ে গাছপালার ভেতর একটা বাড়ির দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

 

ওই বাড়িটাই তাহলে বসন্তনিবাস। সাধুবাবা আটচালায় ফিরে গুম হয়ে বসলেন পদ্মাসনে। একটু পরে একজন দেহাতী লোক মন্দিরে প্রণাম করতে এল। প্রণাম করে সে সাধুবাবাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর আটচালার নিচে সাষ্টাঙ্গে আবার একটা প্রণাম ঠুকে করযোড়ে বসে রইল। কিন্তু সাধুবাবা চোখ খুলছেন না দেখে নিরাশ হয়ে সে চলে গেল। সাধুবাবা পিটপিট করে তাকিয়ে গলার ভেতর বলেন, জ্বালাতন! বসন্তনিবাস থেকে কেউ আসছে না। যে এসেছিল, সে তো কাছ ঘেঁসতেই দিল না। দেখা যাক, সারাটা দিন পড়ে। আছে সামনে। অগত্যা রাত্রিবেলা দেখা যাবে।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *