এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
হিমাদ্রির সর্বনাশ
শ্রাবন্তীর চেহারা দেখে শিউরে উঠেছিল হিমাদ্রি। দশ বছর আগে দেখা মোটামুটি স্বাস্থ্যবতী একটি মেয়ের শুটকো মড়া যেন–কোটরগত একজোড়া উজ্জ্বল চোখে অস্বাভাবিক চাউনি। হিমাদ্রিকে চিনতে পেরেছিল অবশ্য। কিন্তু সামান্য দু-একটা কথা বলে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। ও নিচের একটা ঘরে থাকে। মণিয়া থাকে ওর ঘরের বারান্দায়। ওর সঙ্গে রাতে ঘরের ভেতর থাকতে মণিয়ার মতো সাহসী মেয়েও ভয় পায়।
অপালা থাকে একা ওপরে ওর বাবার ঘরে। পাশের দুটো ঘর খালি পড়ে ছিল। ইদানীং একটা ঘরে ইন্দুবাবু থাকছেন। ইন্দুবাবুকে দেখলে কিছুতেই বাঙালি বলে মনে হয় না। হিমাদ্রি ওঁকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারেনি। একেবারে ছাতুখোর হিন্দুস্থানীর আদল এসে চেপে বসেছে ভেতো বাঙালির গায়ে। স্বাস্থ্যটিও এখন পুষ্ট ও পেল্লায় হয়েছে। বলছিলেন, ক্লাইমেটের গুণ হে! দেখ না, বিশ বছর আগে এখানে প্রথম যখন এলাম, তখন আমার একটুতে ঠাণ্ডা জ্বর-জ্বালা সর্দিকাশি, তার ওপর ওই অম্বলের রোগ। রুদ্রদা আমার পেছনে লাগল। রোজ টানতে টানতে গঙ্গার ধারে নিয়ে গিয়ে গলাধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিত। ভাবতাম কালই পালিয়ে যাব। তো পালাব কেমন করে? সব সময় রুদ্রদার কড়া নজর।
হিমাদ্রি আজও জানে না, ইন্দুবাবুর সঙ্গে রায়চৌধুরীদের সম্পর্কটা কী। জানে না সুনেত্রা বা অপালাও। ঊর্মিও সম্ভবত জানত না। তবে হিমাদ্রি দেখেছে, ইন্দুবাবু বরাবর ওঁদের চাষবাস আর বাড়ির সব কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। রুদ্রবাবুর সঙ্গে ছায়া হয়ে ঘুরতেন।
হিমাদ্রি জানতে চেয়েছিল, রুদ্রবাবু কীভাবে খুন হন। ইন্দুবাবু শ্বাস ফেলে বলেছিলেন, একটু ভুলের জন্য ওই অপঘাত ঘটে গেল। খুকুর ভরের সময় ওর মুখ দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে এসেছিল, বুঝলে? …রুদ্র, আজ তোর শেষ দিন! কিন্তু আমরা ওর ব্যাপারটা প্রলাপ বলেই জানতাম। আমল দিইনি।
হিমাদ্রি বলেছিল, তাহলে কি বলতে চাইছেন, সত্যি শ্রাবন্তীদির কোনো দেবীর ভর হয়?
কে জানে! ইন্দুবাবু গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন। আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।
এমনও তো হতে পারে, শ্রাবন্তীদি ওর বাবা খুন হওয়ার আভাস পেয়েছিল? কিছু দেখেছিল অথবা শুনেছিল কোথাও।
ইন্দুবাবু হেসেছিলেন একটু। মাথা দুলিয়ে বলেছিলেন, নাঃ! তাহলে সরাসরি বলত। সবসময় তো আর দেবী ওর মধ্যে থাকেন না। মাঝেমাঝে হঠাৎ এসে পড়েন, হঠাৎ চলে যান। কাজেই সুস্থ অবস্থায় থাকার সময় কথাটা বলতে বাধা ছিল না। তাছাড়া জন্মদাতা বাবা বলে কথা।
হিমাদ্রি বলেছিল, আচ্ছা ইন্দুজ্যাঠা, এমন তো হতে পারে, শ্রাবন্তীদি ভরওঠা অবস্থায় ওর বাবাকে খুন করেছে! এরকম কেসের কথা আমি সাইকলজির বইতে পড়েছি। তখন সাইকিক পেসেন্ট নিজেই জানে না কী করছে!
ইন্দুবাবু, হো হো করে হেসে উঠেছিলেন। দেখ হে হিমু, তোমাদের ওই সাইকলজি-টাইকলজি কী আমি বুঝি না। কিন্তু এটুকু বুঝি, খুকু একটা আরশোলা দেখলে চেঁচিয়ে এক কাণ্ড করে। তাছাড়া ওকে তো দেখলে! গত তিন-চার মাসেও এমনি দুবলা হয়ে ছিল। কাঠির মতো নড়বড়ে শরীর। কোনরকমে হাঁটাচলা করে বেড়ায়। ঠেলে দিলে আছাড় খায়।
কিন্তু আমি শুনেছি, এক রাত্রে শ্রাবন্তীদি ছুরি হাতে নিয়ে ওর বাবার ঘরের দরজায়–
ইন্দুবাবু নড়ে উঠেছিলেন। ভারি গলায় বলেছিলেন, কে বলেছে তোমাকে?
ঊর্মির কাছে শুনেছিলাম।
ঊর্মি মিথ্যা বলেছে। ও কী করে জানবে? তখন কি ও ছিল এখানে? অপুকে জিজ্ঞেস করো, কী হয়েছিল। অপু, বল্ তো হিমুকে ব্যাপারটা।
অপাল একটু তফাতে বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, খালি ওই কথা!
ইন্দুবাবু আবার জোরে হেসে বলেছিলেন, অপু রুদ্রদার বকাবকি শুনে বেরিয়ে দেখে, খুকু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে। হাতে ছুরি-উরি কিছু নেই। তারপর তো আমি নিচে থেকে তুরন্ত এসে ওকে ধরলাম। ব্যস, ভর হয়ে গেল। আসলে টুকুটা বরাবর ওইরকম। তিলকে তাল করে বসে।
তাহলে কে খুন করল রুদ্রজ্যাঠাকে?
সে তো পুলিশ এনকোয়ারি করে এত্তেলা দিয়েছে আদালতে। রঘুয়া হারামীর নামে হুলিয়া ঝুলছে।
রঘুয়া–মনে সাহুজীর ছেলে রঘুনাথ?
আবার কে? রঘুয়ার কীর্তি এখানকার লোকের কাছে শুনতে পাবে।… একটু চুপ করে থাকার পর ইন্দুবাবু আস্তে বলেছিলেন ফের, আমাদের বিহারের পুলিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অবস্থা এখন ভাল নয়। সাহুজী টাকা খাইয়ে রেখেছে। কী আর করা যাবে?
হিমাদ্রি বলেছিল, আচ্ছা, তাহলে উঠি ইন্দুজ্যাঠা। বিশ্রাম করুন।
তুমি থাকছ কয়েকদিন?
দেখি।
কাল দুপুরে খেও আমাদের বাড়ি। নাকি এখনও রাগ করে আছ আমাদের ওপর?
কী যে বলেন! ওসব কিছু মনে নেই।
মনে থাকলেও যার জন্য রাগ, সে তো নেই। এসো বাবা হিমু?
আচ্ছা বলে হিমাদ্রি চলে এসেছিল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সুনেত্রাকে বলেছিল, কিছু বোঝা গেল না। ঊর্মি কেন আমাকে মিথ্যা বলবে?
সুনেত্রা ঝাঁঝালো কণ্ঠ স্বরে বলেছিল, টুকু ভারি সতীলক্ষ্মী মেয়ে! ওর মুখে এক কথা, পেটে আর এক কথা।
হঠাৎ ওর ওপর খাপ্পা হলে যে?
টুকু সবসময় উল্টোপাল্টা কথা বলে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে সুনেত্রা মুখ খুলেছিল ফের। এদিকে আমি এক কাণ্ড করে বসেছি টুকুর কথায়। এখন ভাবছি, ভুল হয়ে গেছে। কেঁকের বশে কর্নেলকে আসতে লিখেছি। খামোকা বুড়ো মানুষটাকে হয়রান করা হবে।
কর্নেল মানে? কী ব্যাপার?
ও। তুমি তো চেন না। তোমার কলকাতার লোক। থাকেন এলিয়ট রোডে। বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভদ্রলোক। ভেরি চার্মিং পার্সোনালিটি। এসে পড়লে দেখবে, কী ওয়ান্ডারফুল আদমি!
ওপরের ঘরে গিয়ে বাকিটা বলেছিল সে। টুকু ওমাসে আমাকে হঠাৎ একটা চিঠি লিখেছিল। চিঠিটা পেয়ে আমি তো তাজ্জব। ওর বাবাকে খুন করার পর এখানে এসে ওর ধারণা হয়েছে, এই খুনের পেছনে ইন্দুকাকার হাত আছে। ইদুকাকা ওদের সব সম্পত্তি হাতানোর চক্রান্ত করেছেন!
অসম্ভব নয়।
ভ্যাট! তাহলে ইন্দুকাকাকে আরও দু-দুটো খুন করতে হবে জানো? খুকুদি আর অপু বেঁচে আছে না? ওদের যদি কিছু হয়, সেতাপগঞ্জের লোক এমন বুদ্ধু নয় যে ইন্দুকাকার ঘাড়ে সব দোষ পড়বে না! তাছাড়া সম্পত্তি হাতানোর জন্য ওঁর খুন করার কী দরকার? এমনিতেই তো উনি সবকিছুর প্র্যাকটিক্যালি মালিক হয়ে বসে আছেন।
কর্নেল ভদ্রলোককে আসতে লিখেছ কেন? উনি কী করবেন?
সুনেত্রা ওর দিকে একটু তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। হিমুদা! যা হয়, ভালর জন্যই হয়। দেখছ, কথাটা কিছুতে আমার মাথায় আসেনি? কর্নেল এলে তুমি ওঁকে সব বলবে, যা যা আমাকে বলেছ। তুমি না বললে আমিই বলব।
বিবি!
চুপ রহো জী! সুনেত্রা হেসেছিল। লেট হিম কাম। আনে দো!
কে তিনি?
ক্রিমিনোলজিস্ট, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার, ন্যাচারালিস্ট, অ্যাডভেঞ্চারার কী নন বলো? মিলিটারিতে ছিলেন একসময়। বাবার কাছে ওঁর কতসব সাংঘাতিক গস্প শুনেছি আর তাজ্জব হয়ে গেছি, জানো? ওয়েট। কাল মর্নিংয়ে ওঁকে পোস্টঅফিস থেকে ট্রাঙ্ক কল করছি। বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।…
সারারাত হিমাদ্রি অদ্ভুত-অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে কাটিয়েছে। শ্রাবন্তী প্রেতিনী হয়ে ওকে তাড়া করেছে। রুদ্রে রায়চৌধুরীকে হিমাদ্রি খুন করে লাস নিয়ে বিপদে পড়েছে। ঊর্মি নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে হিমাদ্রির সামনে। কিন্তু তার পেছনে মৃগাঙ্ক। তারপর মৃগাঙ্ক আর অপালা ভরা গঙ্গায় সাঁতার কাটতে চলে গেল। ভোরে হিমাদ্রি দেখল, পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করতে এসেছে। হাতকড়া পরিয়ে দিতেই ঘুম ভেঙে গেল হিমাদ্রির। তখনও দু হাতের কবজিতে হাতকড়ার ঠাণ্ডা স্পর্শ লেগে আছে যেন।
সকালে সুনেত্রা বলল, যাবে নাকি আমার সঙ্গে?
কোথায়?
পোস্টঅফিসে।
থাক। তুমি যাও। আর শোনো, কলকাতার কাগজ যদি পাও, একটা এনো।
কলকাতার কাগজ এখানে পৌঁছুতে বিকেল হয়ে যায়। তবে আগের দিনেরটা পেতে পারি মধুবাবুর কাছে। উনি এজেন্ট।
হিমাদ্রি হাসল। এখনও একই অবস্থা সেতাপগঞ্জের। সেই মধুবাবু!
সুনেত্রা চলে গেলে সে কিছুক্ষণ জানালার ধারে বসে সিগারেট টানতে টানতে গঙ্গা দেখল। তারপর নিচে এল। সুনেত্রার মা সুনয়নী লনের পাশে ফুলবাগানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছু ফলের গাছও আছে। সুনয়নী পেয়ারাগাছে বাদুড়ের অত্যাচারের অভিযোগ করলেন। তারপর একথা-ওকথার শেষে চাপা গলায় বললেন, বসন্তনিবাসে তোমার এবেলা নেমন্তন্ন শুনলাম। আমি বলি কী, তুনি বলে পাঠাও ওদের শরীর খারাপ। কেন নিষেধ করছি জানো হিমু? ও : বাড়ির অন্ন তুমি ছুঁলে তোমার বাবার আত্মা কষ্ট পাবেন। তখন তোমার বয়স কম ছিল। সব জানো না। আমরা জানি। ডাক্তারবাবুর ওপর কী অত্যাচার না করেছিল রুদ্রবাবু! তারই পরিণাম। ভগবান হাতে-নাতে দেখিয়ে দিচ্ছেন! তুমি রিফিউজ করো, হিমু।
হিমাদ্রি একটু হাসল। বলছেন যখন—
বলছি। ধনিয়াকে দিয়ে ইন্দুবাবুকে বলে পাঠাচ্ছি, হিমুর শরীর খারাপ।
হিমাদ্রি অন্যমনস্কভাবে গেট পেরিয়ে খোয়াঢাকা নির্জন রাস্তা ধরে বাজারের মোড়ে গেল। সিগারেট কিনল। সেই সময় সাইকেলরিকশোয় সুনেত্রা ফিরল। হিমাদ্রিকে দেখে সে রিকশো ছেড়ে দিল। তারপর চাপা গলায় বলে উঠল, হিমুদা! বহৎ খতরনাক। কালকের কাগজে তোমার ছবি বেরিয়েছে। শিগগির বাড়ি চলো। টুকুকে মার্ডারের জন্য পুলিশ কাগজে হুলিয়া ছেপে দিয়েছে। ধরে দিলে পাঁচ হাজার টাকা প্রাইজ।
হিমাদ্রির মনে হল, সে শূন্যে নিঃসাড় ভেসে চলেছে।…
