এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

সুব্রতর আবির্ভাব

 

আজ সব কাগজে ওয়ান্টেড শিরোনামে হিমাদ্রির ছবিসহ বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার সন্ধান দিয়ে ধরতে সাহায্য করলে। কর্নেল ছাদের প্ল্যান্ট ওয়ার্লডে ধুলোমাখা হাতে কয়েকটা খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে বিজ্ঞাপনটা দেখছিলেন। এমন সময় ষষ্ঠী এসে খবর দিল, ফোং।

 

অরিজিতের ফোন হলে সে করাসরি ঘোষণা করত নালবাজারের নাহিড়িসায়েব। কর্নেল ফোন তুলতেই গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদারের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনলেন। দেখেছেন স্যার পুলিশের কাণ্ডটা? মিনিস্টারের ভাগ্নের ট্র্যাপে কেমন করে পা দিয়ে বসল! এখন আর কী করব বলুন?

 

কর্নেল শান্তভাবে বললেন, তাহলে আর সেতাপগঞ্জ যাচ্ছেন না?

 

টিকিট–মানে বার্থ রিজার্ভেশান করে রেখেছিলাম আজ সন্ধ্যার ট্রেনে। এখন ক্যান্সেল করা ছাড়া উপায় কী বলুন স্যার? কৃতান্তবাবুর কণ্ঠস্বরে এবার হতাশা ফুটে উঠল।

 

পুলিশ নিশ্চয় কোনো ডেফিনিট ক্লু পেয়েছে।

 

হাতি! হাতি!

 

সম্ভবত হাতি নয় মিঃ হালদার, একটা সিগারেট লাইটার।

 

খি খি খি!

 

মিঃ হালদার, আপনি সেতাপগঞ্জ চলে যান।

 

অ্যাঁ?

 

টিকিট ক্যান্সেল করবেন না। চলে যান।

 

গিয়ে আর লাভ কী!

 

আছে। আপনি কি ভূতপ্রেত পিশাচ তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করেন মিঃ হালদার?

 

অ্যাঁ?

 

বসন্তনিবাসে–মৃগাঙ্কবাবুর শ্বশুরবাড়ির বাগানে একটা পাথরের মূর্তি আছে। রাতে সেটা জ্যান্ত হয়ে চলাফেরা করে। হাতে ড্যাগার থাকে।

 

খি খি খি! যাঃ!

 

সিরিয়াসলি বলছি, মিঃ হালদার। মৃগাঙ্কবাবুর বড় শালীর শরীরে দেবীর ভর হয়। ভরের সময় অদ্ভুত-অদ্ভুত কথা বলে। তার ভেতর অনেক ক্লু পেতে পারেন।

 

আর ক্লুর কী দরকার? পুলিশ তো কেসের বারোটা বাজিয়ে দিল স্যার!

 

আপনি কলকাতা পুলিশের বারোটা বাজান।

 

প্রব্লেমটা বুঝতে পারছেন না স্যার? মিনিস্টারের

 

বিহার পুলিশের হাতে ক্লু তুলে দিয়ে কলকাতা পুলিশের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ুন আপনি!

 

খি খি খি! স্টেট ভার্সেস স্টেট!

 

একজ্যাক্টলি।

 

একমিনিট স্যার! নোট করে নিই। কী যেন বলছিলেন বসন্ত নিবাসে পাথরের মূর্তি-টুর্তি?

 

কর্নেল রিপিট করলেন।

 

একটু পরে ফোন রেখে কর্নেল হাসতে হাসতে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা। বাড়ালেন। সেই সময় ষষ্ঠী পিছু ডেকে বলল, বাবামশাই, এক ভদ্রলোককে বসিয়ে রেখেছি সিটিং রুমে।

 

কর্নেল ঘুরলেন। কে ভদ্রলোক?

 

রোগা করে ফর্সা করে। এটুখানি দাড়ি আছে। গায়ে নাল গেঞ্জি পরনে—

 

লেজ নেই?

 

ষষ্ঠী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, তা তো দেখিনি! বলেই জিভ কাটল। ও! ন্যাজ বললেন। হি হি হি!

 

হতভাগা, তোকে হাজারবার বলেছি–আগে নামটা জেনে নিবি।

 

আজ্ঞে, ভুল হয়েছে। জেনে আসছি।

 

তার কাধ ধরে আটকে কর্নেল বললেন, কফি নিয়ে আয়। তারপর ড্রইং রুমের বাইরের দিকের দরজার পর্দা তুলে উঁকি মারলেন, আসুন সুব্রতবাবু!

 

সুব্রত সিংহরায় উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। কিন্তু কোনো কথা না বলে নমস্কার করে সে ড্রইংরুমে ঢুকল।

 

কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে বললেন, বসুন সুব্রতবাবু!

 

আপনি আমাকে চেনেন?

 

আপনার ছবি দেখেছি। যাই হোক, বলুন।

 

সুব্রত একটু ইতস্তত করে বলল, মৃগাঙ্ক আমার বন্ধু। মৃগাঙ্কের কাছে কৌশলে আপনার ঠিকানা পেয়েছি। তার পরামর্শেই আপনার কাছে চলে এলাম। বলবেন, সরাসরি পুলিশের কাছে যাইনি কেন–যাইনি, তার কারণ পুলিশের ওপর আমার আস্থা নেই।

 

হু–বলুন।

 

হিমাদ্রির ছবি বেরিয়েছে আজকের কাগজে। কাজেই মৃগাঙ্কের বউকে হিমাদ্রিই খুন করেছে বসে সাব্যস্ত করেছে পুলিশ। কিন্তু আমার ধারণা, খামোকা ও বেচারাকে জড়ানো হয়েছে।

 

কেন এ ধারণা, সুব্রতবাবু?

 

এগারো জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ছটা নাগাদ আমি মৃগাঙ্কের ফ্ল্যাটে যাচ্ছিলাম। লেকভিলার সামনে পৌঁছে দেখি, লোডশেডিং। সিঁড়ি ভেঙে ওঠা আমার পক্ষে ডিফিকাল্ট। তাই গাড়িতে বসে ভাবছি কী করব। হঠাৎ

 

এক মিনিট। আপনি জানতেন মৃগাঙ্কবাবু কলকাতায় নেই ওই দিন?

 

সুব্রত অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, জানতাম।

 

বেশ। বলুন।

 

তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। গাড়িতে বসে আছি। হঠাৎ আমার গাড়ির পেছনে একটা গাড়ি এসে থামল। নিছক খেয়ালে ঘুরে দেখি, সেই গাড়ি থেকে হিমাদ্রি বেরুচ্ছে। ফ্র্যাংকলি বলছি কর্নেল, আমি খুব খাপ্পা হয়েছিলাম বিশেষ করে ঊর্মির ওপর। ঊর্মিই ফোনে ডেকেছিল আমাকে। ভাবলাম, যেভাবে হোক কষ্ট করে সিঁড়ি বেয়ে সাততলায় উঠে ঊর্মির সঙ্গে একটা ভালরকম বোঝাপড়া করব। হিমাদ্রিও জানবে, ঊর্মি আসলে একটা প্রস। এ পার্ভাটেড অ্যানিম্যাল। সুব্রত সংযত হল। ক্ষমা করবেন।

 

তারপর কী হল বলুন?

 

কিন্তু আমার হার্টের অবস্থা ভাল নয়। শেষ পর্যন্ত রিস্ক আর নিলাম না। হিমাদ্রির ফেরার অপেক্ষায় থাকলাম। ভাবলাম ও ফিরে এলে ওকে ঊর্মির লীলাখেলার কথা ফাঁস করে দেব।

 

আপনি অপেক্ষা করলেন?

 

হ্যাঁ। তারপর জাস্ট আধঘণ্টা পরে–একটু বেশিও হতে পারে, আমি ঘড়ি দেখিনি–মনের অবস্থা সাংঘাতিক ছিল তখন হঠাৎ দেখলাম একটা লোক জোরে বেরিয়ে আসছে গেটের দিকে। অন্ধকারে ওকে প্রথমে হিমাদ্রি বলেই মনে করলাম। কারণ সে হিমাদ্রির গাড়ির সামনে এল। একটানে বনেট খুলেই আবার নামিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাড়িয়ে ডাকলাম, হিমাদ্রি! আশ্চর্য, লোকটা থমকে দাঁড়াল। তারপর হনহন করে চলে গেল রাস্তা পেরিয়ে। তখন বৃষ্টিটা বেশ জোরে পড়ছে। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, কেনই বা হিমাদ্রি গাড়ির

 

হুঁ–তারপর?

 

পনের-কুড়ি মিনিট পরে আগের লোকটার মতোই আরেকটা লোক গেট পেরিয়ে এল। সে হিমাদ্রি। গাড়িতে ঢুকলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেটুকু আলো জ্বলল, তাতে অস্পষ্টভাবে ওকে চিনতে পারলাম। বৃষ্টির জন্য আমার গাড়ির কাঁচ ওঠানো ছিল। তবু হিমাদ্রিরই গাড়ি ওটা–তাছাড়া তার ফিজিক্যাল আউটলাইন আমার চেনা। আমি কাঁচ নামিয়ে ওকে ডাকলাম, কিন্তু শুনতে পেল না। ওর গাড়িটা জোরে বেরিয়ে গেল আমার গাড়ির পাশ দিয়ে। মাথায় জেদ চাপল তখন। ওর গাড়ি ফলো করলাম। কিন্তু বড় রাস্তায় পৌঁছে জ্যামে আটকে। ওকে মিস করলাম। বাড়ি পৌঁছে ওকে ফোন করেছিলাম। লাইন পেলাম না।

 

বেশ। আপনার বক্তব্য কী তাহলে?

 

মৃগাঙ্কের অফিসে গিয়েছিলাম কাল। ওর কাছে শুনলাম, পুলিশ হিমাদ্রির গাড়িতে ইঞ্জিনের কাছে রক্তমাখা ড্যাগার পেয়েছে। কথায়-কথায় মৃগাঙ্ক বলল, হিমাদ্রির বাঁচার উপায় নেই। একজন খুব নামকরা ডিটেকটিভ নেমেছেন পুলিশের সঙ্গে। জিগ্যেস করে আপনার কথা জানলাম। আমার কারখানায় লেবার-ট্রাবল চলেছে। সেই ব্যাপারে কিছু ইনফরমেশন দরকার। মৃগাঙ্ক তাই শুনে প্রথমে কে এক কে কে হালদারের কথা বলল–গণেশ এভেনিউতে অফিস। আমি ওর কাছে আপনার ঠিকানা চাইলাম। বললাম, হালদার-টালদার দিয়ে হবে না। আরও ঝানু লোক চাই। তখন আপনার ঠিকানা দিল।

 

কর্নেল চোখ বুজে শুনছিলেন। ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল। বললেন, নিন সুব্রতবাবু।

 

সুব্রত কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, সেই লোকটাই মার্ডারার। তাকেই আমি হিমাদ্রির গাড়ির ভেতর মার্ডার উইপন রাখতে দেখেছিলাম।

 

তাকে চিনতে পারেননি তো?

 

না। ওর পরনে রেনকোট ছিল। ফিজিক্যাল আউটলাইনও অন্ধকারে আঁচ করতে পারিনি। তাতে বৃষ্টি। লোডশেডিংয়ে সারা এলাকা অন্ধকার। আশেপাশে দোকানপাট থাকলে আলো থাকত। দেখেছেন তো রাস্তাটা কেমন নির্জন–আর। বস্তি-টক্তিও আছে।

 

মৃগাঙ্কবাবু নন তো?

 

সুব্রত একটু চমকে উঠল। তারপর একটু হাসল। ও খুব কোল্ডব্লাডেড লোক। বউকে খুন করা ওর পক্ষে অসম্ভব হয়তো নয়। কিন্তু ও সে দিন বোম্বেতে ছিল। আমি জানি, আবুধাবিতে মাল পাঠানোর জন্য কার্গো বুক করে রেখেছিল। কন্ট্রাক্টের মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছিল। বন্দর ধর্মঘটের জন্য কার্গো পাচ্ছিল না। প্রায় তিন লক্ষ টাকার ডিল। কাজেই ওর মতো অর্থলোভী লোকের পক্ষে ওই প্রব্লেম ছেড়ে বউয়ের জন্য কলকাতায় পড়ে থাকা সম্ভব ছিল না।

 

আপনি ওঁর অফিসের লোকেদের চেনেন?

 

কাউকে কাউকে চিনি।

 

হেমন্ত নামে কাউকে?

 

চিনি। মৃগাঙ্কের খুব বিশ্বাসী লোক। ওর কনসার্নের রিপ্রেজেন্টেটিভ। কেন বলুন তো?

 

হেমন্তবাবুকে তো মৃগাঙ্কবাবু নানা জায়গায় পাঠান?

 

হ্যাঁ। ওর ওটাই কাজ।

 

সুব্রতের মুখে প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেল। কর্নেল বললেন, ঠিক আছে। আপনি আপাতত পুলিশকে কিছু বলবেন না। অন্য কাউকে তো নয়ই। দরকার হলে আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

 

সুব্রত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, পুলিশের ওপর আমার আস্থা নেই। অথচ হিমাদ্রি বেচারাকে বাঁচানো কর্তব্য। তাই আপনার কাছেই এসেছিলাম। বেশ বুঝতে পেরেছি, বোকা পেয়ে ওকে ট্র্যাপ করা হয়েছে।

 

কর্নেল দরজা পর্যন্ত এগিয়ে বললেন, হিমাদ্রিবাবু কোথায় এখন?

 

হাসল সুব্রত। বিশ্বাস করুন, জানি না। ভয় পেয়ে একেবারে গা ঢাকা দিয়েছে।…

 

সুব্রত সিংহরায় চলে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরে এলেন ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ী। তখন কর্নেল সবে ব্রেকফাস্ট সেরে চুরুট ধরিয়ে এদিনকার কাগজে চোখ বুলোচ্ছেন। হিমাদ্রির ছবিতে চোখ আটকে গেছে।

 

অরিজিৎ বসেই হাসতে হাসতে বললেন, ভাবতে পারিনি আপনিও শেষে রাম গোয়েন্দার পাল্লায় পড়বেন!

 

রাম নামে কোনো গোয়েন্দার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই ডার্লিং!

 

কে কে হালদারকে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের লোকেরা রাম গোয়েন্দা বলে।

 

কর্নেল হাসলেন। আহা, ওর পেছনে তোমরা লেগো না! লোকটি বড় ভালো। অনেস্ট, সিনসিয়ার। বুদ্ধিসুদ্ধিও আছে। তুমি জানো? মাকড়দহের ফার্মে একটা রহস্যময় মার্ডার কেসে

 

ওঃ! সে গল্প হালদার মশাই ইতিমধ্যে তিনশোবার শুনিয়েছেন। অবশ্য আপনার ভার্সান তার বিপরীত হবেই। অরিজিৎ অ্যাটাচি খুললেন। কিন্তু হাতে সময় কম। এই নিন আপনার সেই টেলিগ্রাম। পোস্ট অফিসের লোকেরাও দেখলাম রাম গোয়েন্দার কথা বলে হাসাহাসি করছে। ওদের খুব ভুগিয়েছেন কে কে হালদার। আপনিও যে কেন ওঁর পাল্লায় পড়তে গেলেন! দেখবেন আপনার কী অবস্থা করে ছাড়ে।

 

টেলিগ্রামের কপিটা নিয়ে চোখ রাখলেন কর্নেল। REACHED TIMELY (.) CARGO NOT AVAILABLE (.) ADVISE (.) HEMANTA HOTEL DELIGHT BOMBAY (.) স্থানীয় পোস্ট অফিসে পৌঁছুনোর তারিখ দেখে কর্নেল অবাক হলেন। এগারো জুলাই রাত নটা। ডেলিভারি হয়েছে পরদিন সকালে। সম্ভবত অফিস খোলার পর। বোম্বের পোস্ট অফিসে টেলিগ্রামটা দেওয়া হয়েছে এগারো জুলাই তারিখেই। জরুরি টেলিগ্রাম। আর সে দিনই সন্ধ্যায় খুন হয়েছে ঊর্মি।

 

কর্নেল মুখ তুললেন। চোখে চোখ পড়লে অরিজিৎ একটু হেসে বললেন, গোলমেলে মনে হচ্ছে তো? আমারও হয়েছিল। হেমন্ত বোসকে মৃগাঙ্কবাবু বোম্বে পাঠিয়ে কার্গোর জন্য তদ্বির করতে বলেছিলেন। হেমন্তবাবু যান ন তারিখে। দুদিন অপেক্ষা করার পর পোর্টস্ট্রাইকের ঝামেলায় কার্গোর ব্যবস্থা না করতে পেরে এই টেলিগ্রাটা করেন। এদিকে মৃগাঙ্কবাবু অধৈর্য হয়ে টেলিগ্রাম পাবার আগেই এগারো তারিখ রওনা হন। তাই এই গণ্ডগোল।

 

মৃগাঙ্কবাবুর ভার্সান?

 

দুজনেরই–মানে, হেমন্তবাবুরও।

 

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ট্রাঙ্ককল করেননি হেমন্তবাবু! টেলিগ্রাম কেন?

 

লাইন পাননি। ন থেকে বারো–এই চারদিন বোম্বে ক্যালকাটা লাইন ডিসটার্বড় ছিল। আমরা হটলাইনে মৃগাঙ্কবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম।

 

ডিলাইটে হোটেলে?

 

হোটেল ডিলাইটে।

 

অরিজিৎ মুখ টিপে হাসছিলেন। ষষ্ঠী কফি রেখে গেল যথারীতি। কর্নেল কফির পেয়ালা ওঁর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, হেমন্তবাবু বোম্বে থেকে কবে ফিরেছিলেন?

 

বারো জুলাই, মৃগাঙ্কবাবুর সঙ্গে।

 

মৃগাঙ্কবাবুর প্লেনের টিকিট তো দেখেছ বলছিলে। যাওয়া এবং ফিরে আসার।

 

হ্যাঁ। আমার কাছে এখনও রয়ে গেছে। দেখবেন নাকি?

 

নেব।

 

অরিজিৎ তেমনি মুখ টিপে হেসে অ্যাটাচি থেকে টিকিট দুটো বের করে দিলেন। তারপর বললেন, অবশ্য হেমন্তবাবুর টিকিট পাইনি। পাওয়ার কথাও না। ও সব কে রেখে দেয়?

 

কিন্তু মৃগাঙ্কবাবু রেখে দিয়েছিলেন!

 

খুব স্বাভাবিক। ওঁর অ্যালিবাই দরকার ছিল। বুদ্ধিমান লোক। অরিজিৎ ঘন ঘন চুমুক দিয়ে কফি শেষ করে ফের বললেন, কর্নেল আপনাকে পরামর্শ দেওয়া ধৃষ্টতা। কিন্তু প্লিজ আপনি হালদার মশাইকে ছাড়ুন। আমার ধারণা, উনি এস্টাব্লিন্ড অ্যান্ড সেট একটা কেসকে ঘুলিয়ে দেওয়ার তালে আছেন। প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে সে জন্যই লাইসেন্স দিতে আজকাল ভীষণ কড়াকড়ি করা হয়। কে বলতে পারে, হালদার মশাই আসামীর কাছে টাকা খেয়ে কাজে নেমেছেন কি না? আমি তো স্পষ্ট দেখছি, ভদ্রলোক আপনাকে মিসগাইড করার চেষ্টা করছেন।..

 

অরিজিৎ চলে গেলে টেলিগ্রামের কপিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন কর্নেল। একটু পরে হলদে কাগজে ফুটে উঠল একটা দশতলা বাড়ি। গেটে লেখা আছে লেকভিলা। অন্ধকার সন্ধ্যাবেলায় ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। সুব্রত সিংহরায় নিয়ে গাড়িতে বসে আছে। তারপর এল হিমাদ্রির গাড়ি।

 

স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন কর্নেল। সাততলার তিন নম্বর ফ্ল্যাটের বেডরুমে হিমাদ্রি সিগারেট টানতে টানতে প্রেমালাপ করছে ঊর্মির সঙ্গে। ঘরে একটা মোম জ্বলছে। নিশ্চিন্ত নিরাপদ সময়। মৃগাঙ্ক বোম্বেতে।

 

ওদের প্রেমের খেলা শেষ। বর্ষাতিপরা আততায়ী দরজায় নক করল। পাশের ফ্ল্যাটে কুকুরটা গরগর করছে। আঁচড় কাটছে দরজায়। জন্তুরা সহজাত বোধেই কি সব টের পায়?

 

কিন্তু ঊর্মি কেন দরজা খুলতে গেল? তার হাতে মোমবাতিটা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয় চেনা লোক দরজায় নক করছে। দরজা খুলতেই অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় আততায়ী তার মুখ চেপে ধরে মুহূর্তেই শ্বাসনালী কেটে দিল। তারপর বেরিয়ে গেল। নিচের ফুটপাতে তাকে দেখতে পেয়েছে সুব্রত সিংহরায়। আততায়ী হিমাদ্রির গাড়ির বনেট খুলে ছুরিটা রেখে দিল। রক্তাক্ত হাতটা ঘসে দিয়ে চলে গেল রাস্তা পেরিয়ে।

 

হিমাদ্রির চোখের সামনে ঘটেছে ওই অতর্কিত ঘটনা। আতঙ্কে সে লাইটারটার কথা ভুলে গেছে। পালিয়ে আসছে দিশেহারা হয়ে। সুব্রত সিংহরায়ের ডাক শোনার মতো কান তার নেই তখন। বৃষ্টিও ঝমঝম করে পড়ছে। হুঁ..হিমাদ্রিকে অনুসরণ করে এসেছিল আততায়ী। কিন্তু কে সে?

 

কর্নেল হাত বাড়িয়ে ফোনের ডায়াল করতে থাকলেন। … মৃগাঙ্ক ব্যানার্জিকে চাইছি।

 

মহিলা অপারেটার বলল, উনি বাইরে গেছেন।

 

তাহলে মিঃ হেমন্ত বোসকে দিন।

 

উনিও বাইরে।…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *