ছয়
বাংলোতে ফিরে আমরা বারান্দাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলাম। ওয়াশিষ্ট সাহেবও এসে বসলেন আমাদের সঙ্গে। প্রদীপকাকু, তাপসকাকু এবং সঞ্জীবকাকু। দিনে কি রাতে ছবি তোলার বিরাম নেই।
প্রদীপকাকু তাই বললেন, দাদা যখন গল্পটা বলবেন তখন বিরক্ত কোরো না সঞ্জীব। ছবি তোলার সুযোগ পরেও পাবে। গোটা দশেক রিল তো শেষ করেছ। আর না তুলেও চলবে।
ঠিক আছে। যদিও নিসপিস করবে হাত। তবু, তুমি যখন বলছ তখন চুপ করেই বসে থাকব।
ভটকাই বলল, আমি কিচেনে ইনস্ট্রাকশনটা দিয়ে আসছি দশ সেকেন্ডে। আমি ফেরার আগে আরম্ভ কোরো না কিন্তু।
ঠিক আছে। আয়।
তারপরে ঋজুদা বলল, ট্রিগার টানলাম, হয় গুলি লাগল নয় লাগল না, এই তো শতকরা নব্বইভাগ শিকারের গল্প। কিন্তু গুলি লাগল কিন্তু বেজায়গাতে লাগল যখন, তখনই শিকার বিপজ্জনক। এবং বিপজ্জনক বলেই সেখানে গল্প জমে।
ভটকাই ফিরে আসতেই ঋজুদা শুরু করল। গরমের দিন। এপ্রিলের প্রথম অথচ তখনও যা গরম তা বলার নয়। লু চলতে শুরু করেছে। আমরা উঠেছিলাম কোলসার বাংলোতে। তবে ঘটনা যা ঘটার তা ওই তাড়োবাতেই ঘটেছিল। কাল বিকেলে যেখানে মস্ত মাঠটাতে, মানে তৃণভূমিতে আমরা হাজার হাজার চিতল হরিণ দেখলাম সেইখানেই ছিল মস্ত একটি গ্রাম। গোন্দদের গ্রাম। আমরা আসার একমাস আগে প্রথম মানুষ মারে বাঘটা অন্য গ্রামে। পরে আরও দুটি। তারপরে আমরা পৌঁছবার দিন পনেরো আগে আরও একটি মানুষ মারে।
জেঠুমনি আমাকে নিয়ে গ্রামে এসে গাঁওবুড়োদের সঙ্গে কথা বলল। বুড়ো বলল, সব সাহায্য দেবে। বাঘটা মেরে দিলে খুবই কৃতজ্ঞ থাকবে ওরা। প্রথমে ওই গাঁওবুডোর নাতিকেই ধরেছিল বাঘটা। বাঘের প্রথম কিল। ধরে, বাঁশবনের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রায় সবটুকুই খেয়ে ফেলে কোমর আর ডান পায়ের কিছুটা ফেলে চলে রেখে গেছিল। Kill বা মড়িতে আর ফিরে আসেনি। ছেলেটা গোরু চরাবার জন্যে গেছিল গ্রামের লাগোয়া বনে। সকালবেলাই বাঘটা তাকে ধরাতে কেউ জানতেও পারেনি। দুপুরে তার জন্যে ছোট ভাই খাবার নিয়ে গিয়ে তাকে দেখতে না পেয়ে ফিরে আসার পরে গ্রামে খোঁজ পড়ে এবং তারপর খোঁজাখুঁজির পরে বিকেলে তার দেহাবশেষ নিয়ে এসে দাহ করা ওরা। তারপর থেকে বাঘের আর খোঁজ নেই।
তবে পায়ের দাগ দেখেছিল গাঁয়ের লোকেরা। গরমের দিন, মাটির ওপরে। ধুলোর আস্তরণ ছিল তাই পায়ের ছাপ দেখতে অসুবিধে হয়নি ওদের। ওরা বলল, খুব বড় বাঘ, হয়তো বুড়োও হবে, মদ্দা বাঘ, ওরা এও বলল যে এই জঙ্গলের বাঘেদের পায়ের ছাপ ওরা চেনে। এ বাঘের পায়ের ছাপ আগে ওরা নাকি কখনও দেখেনি।
জেঠুমনি সে কথা শুনে আমাকে বললেন হতেই পারে না। এক বাঘের এলাকার মধ্যে অন্য বাঘ চলে এল বিনা লড়াইয়ে তা তো হয় না।
ওদের কোথাও ভুল হচ্ছে।
প্রদীপকাকু বললেন, ফেরোমন স্প্রে করে বাঘেরা তাদের সীমানা চিহ্নিত করে রাখে। অন্যের সীমানার মধ্যে বড় বাঘ ঢুকে পড়ল আর বিনাযুদ্ধে সেখানে রয়ে গেল এমন তো সত্যিই হবার কথা নয়।
ঠিক। বলল, ঋজুদা।
তারপর বলল, গোরু না চরাতে গিয়ে যদি মোষ চরাতে যেত তাহলে বাঘ অত সহজে ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যেতে পারত না। মোষেরা বাধা দিতই আর জঙ্গুলে এলাকার গৃহপালিত মোষেরাও বুনো মোষেরই মতো শক্তিধর। তারা বাঘকে অত সহজে কাজ হাসিল করতে দিত না।
একটা অর্জুন গাছের নীচে আমরা একটা গোরু বেঁধে বসব ঠিক হল। গ্রামের লোকেরা বলল, জঙ্গলের এই অঞ্চলেই সেই বাঘের পায়ের ছাপ বেশি দেখা গেছে গত কদিনে। গত এক মাসে চারটি গোরুও মেরেছে বাঘে। ছোট গোরু মারে বা বাছুর। সামান্য দুরে টেনে নিয়ে গিয়ে একটুখানি খায় কিন্তু মাচা বেঁধে বসলে মড়িতে ফিরে আসে না। অথচ যতখানি খায় ততখানি একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের খাদ্যের তুলনায় খুবই কম। হয়তো বাঘটার দাতে কোনও গোলমাল আছে অথবা মুখে। বাঘটার গায়ে শক্তি কম অথবা তার খিদে কম। তা নয়তো বাঘটার লিভার ফাংশান ভাল না। জেঠুমনি সাব্যস্ত করলেন। অথবা অন্য যে কোনও কারণেই হোক বাঘটা স্বাভাবিক নয়। আর স্বাভাবিক হলে সে মানুষই বা মারবে কেন? মানুষ তো বাঘের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।
নাগপুর থেকে জিপে কোলসাতে আসার সময়েই জেঠুমনির লু লেগে গেছিল। তখন কোনও গাড়িই এয়ারকন্ডিশানড ছিল না। খাওয়ার জলও ঠান্ডা পাওয়া যেত না। একমাত্র সম্ভব ছিল আইসবক্সে করে আনলে। সেও মহা ঝক্কির ছিল। ভিস্তিওয়ালারা যে চামড়ার ছাগলে করে জল দেয়, এখনও দেখতে পাবি কলকাতার যেসব অঞ্চলে জলাভাব আছে ভিস্তিওয়ালারা ভিস্তিতে করে জল দিচ্ছে, সেই ছাগলে জল ভরে জিপের বনেটের সামনে শক্ত করে দড়ি বেঁধে নিয়ে তখন গরমের মধ্যে পথ চলতে হত। তাহলে চলন্ত গাড়ির কারণে জলে ভেজা ভিস্তিতে হাওয়া লাগায় ভিস্তির জল ঠান্ডা থাকত। ওই জল খেতে খেতে এগোতে হত পথে। আমরাও তেমন করেই এসেছিলাম। কিন্তু লু বইছিল পুরো পথে। আমরা ভোরে রওয়ানা হয়েও দুপুরে একটার আগে পৌঁছতে পারলাম না কোলসাতে। পথেই জেঠুমনির লু লেগে গেছিল। তখন রাস্তাঘাটও এত ভাল ছিল না। অনেকখানি পথই কঁচাও ছিল জঙ্গলের বাইরেও।
কোলসা পৌঁছে বিকেলেই আমরা তাড়োবার ওই গ্রামে এসে সব বন্দোবস্ত করলাম। মাচাও বাঁধানো হল অর্জুন গাছটাতে। গাছটা আমার পছন্দ হল না কিন্তু ওই গাছটাতে বসেই পথের দুদিক এবং জঙ্গলের গভীরেও অনেকখানি দেখা যাবে। পাহাড়ি জায়গা হলে জুতসই উঁচু পাথরে বসা যেত কিন্তু তোমরা তো দেখলেই তাড়োবার টাইগার রিজার্ভ এর এলাকা প্রায় সমতলই। এখানে গাছে বসা ছাড়া উপায় নেই।
জেঠুমনি বলে গেলেন আমরা কাল এসে বসব। আমার লু লেগে গেছে মনে হচ্ছে। কিন্তু বাঘ রাতে যদি কোনও গোরু বা মানুষ ধরে তবে সকালেই খবর পাঠাবে কোলসাতে। আমরাও আসব। যদি আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি তাহলে এই বাবু আসবে।
আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। সবে গোঁফ গজিয়েছে। আমার মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে বুড়ো বলল, এ খোকাবাবু কি পারবে?
জেঠুমনি বিরাট এক ধমক দিয়ে আমার প্রতি তার সব অভক্তি গায়ের জোরেই মেরে দিলেন। বলল, সে চিন্তা তোমার নয়, আমি বুঝব।
রাতে জেঠুমনির জ্বর বাড়ল। ভুল বকতে লাগলেন। ফরেস্টার সাহেবকে বললাম, সকালেই ডাক্তারের বন্দোবস্ত করতে হবে। তিনি বললেন ডাক্তার তো আনতে হবে চন্দ্রপুর থেকে। এখান থেকে প্রায় তিরিশ মাইল। তখন তো মাইল ছিল।
জেঠুমনি জ্বরের মধ্যেই বলতে লাগলেন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাব আমি। আমার জন্যে চিন্তা নেই। তারপর বললেন, সকালে উঠেই ভরপেট খেয়ে জলের বোতলে জল, পাঁচ ব্যাটারির টর্চ আর রাইফেল নিয়ে তুই জিপ নিয়ে চলে যা। কানিটকার সাহেব যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা পালন না করতে পারলে মুখ থাকবে না। জিপটা তোর কাছেই রাখবি। ড্রাইভারকে গোঁদের কারও ঘরে রাতে শোওয়ার বন্দোবস্ত করবি যদি রাতে ফিরতে না পারিস। তোর উপরে আমার ভরসা আছে। আমি অযথা চিন্তা করব না।
বললাম, কোন রাইফেল নিয়ে যাব জেঠুমনি?
আমার ফোর ফিফটি ফোর-হান্ড্রেডটা নিয়ে যা। মানুষখেকো বাঘ বলে কথা। হালকা রাইফেল নিয়ে কাজ নেই। আর আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করে যাবি কাল যখন বেরবি।
কী জেঠুমনি? কীসের প্রতিজ্ঞা?
প্রতিজ্ঞা করে যাবি যে বাহাদুরি করবি না, রাতে বাঘকে মাচা থেকে গুলি করে মাচা থেকে নামবি না। বাঘ যদি আহত হয়, না মরে তবে তাকে ব্লিড করার সময় দিবি। প্রয়োজনে সারা রাত, যাতে সে দুর্বল হয়ে যায় তোর সঙ্গে মোকাবিলা করার সময়ে। এই হল বাঘ শিকারের নিয়ম।
তারপর বললেন, ওড়িশাতে বাঘকে কী বলে ডাকে শুনিসনি? মহাবল। সে হচ্ছে মহাবলী জানোয়ার। এখানে আমিই তোর বাবা-মা। তোকে নিজে হাতে যমের মুখে পাঠালে অনুতাপে আমি আর বাঁচব না। তবে তুই আমার চেলা, ভয় করবি না কিছুকেই। আমি জানি, তুই একাই পারবি। আমার চেলাগিরি তো কমদিন করলি না।
তিতির বলল, সত্যি। এমন বাঙালি গার্জেনের কথা ভাবা যায় না।
ভটকাই বলল, “সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।”
প্রদীপকাকু বললেন, একসেপশন প্রভস দ্য রুল।
সঞ্জীবকাকু বললেন, তোমরা মধ্যে কথা বলে ঋজুদার কনসেনট্রেশান নষ্ট করে দিও না।
তা ঠিক।
তাপসকাকু বললেন, বাঘ মারতে যেমন কনসেনট্রেশান লাগে, বাঘ মারার গল্প বলতেও লাগে।
সঞ্জীবকাকু বললেন, বিশেষ করে মানুষখেকো বাঘ মারার গল্প।
তারপর? প্রদীপকাকু বললেন।
ঋজুদা বলল, সেই রাত যে কী করে কাটল! বাঘ মারতে যাব কী, মাঝে মাঝেই মনে হতে লাগল, জেঠুমনি বোধহয় এই রাতেই দেহ রাখবেন। কী যে করি! বারবার চিনি নুনের শরবত আর গ্লুকোজের জল খাইয়ে খাইয়ে শেষ রাতের দিকে ঘুমোলেন জেঠুমনি। আমিও ঘুমোলাম ওঁরই সঙ্গে।
তারপর?
সকালে ঘুম ভেঙে দেখি জেঠুমনি বাংলোর বারান্দার যেদিকটাতে রোদ পড়েনি সেদিকে ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন। আমি উঠতেই বললেন, তোর জন্যে নাস্তা বানাতে বলেছি। একবারে পেট ভরে খেয়ে যা। পরে গ্রামে কিছু পেলি তো খেলি, যদি ওরা খেতে দেয়। টুপি তো নিয়ে যাবিই, একটা গামছাও নিয়ে যা। মাঝে মাঝেই ভিজিয়ে মাথায় দিয়ে তার উপরে টুপিটা চাপাবি। ছটা গুলি নিয়ে যা। দুটো দু ব্যারেলে রাখবি আর চারটে বুশ-কোটের ডান পকেটে রাখবি। পকেটের বোতাম খুলে রাখবি যাতে প্রয়োজনে তাড়াতাড়ি গুলি বের করতে পারিস। জঙ্গলে যতক্ষণ থাকবি ব্যারেলে গুলি রাখবি। সেফ করে নিয়ে মাঝে মাঝেই সেফটি ক্যাচে আঙুল ছুঁইয়ে দেখবি ক্যাচটা ঠিক আছে কি না।
