চার
যখন আমরা বেড-টি খেয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম তখন সবে পুবের আকাশে সালের ছোপ লেগেছে। আমরা আমাদের কালিস গাড়িতে উঠতে না উঠতে প্রদীপকাকুদের নিয়ে ও ফরেস্টার সাহেবকে নিয়ে জিপটাও এসে গেল। ফরেস্ট গার্ড মহেন্দ্র সিং বিযেন আমাদের পেছনে উঠে বসতেই গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করল মামাজি।
ঋজুদা বলল, এখন ধুলো নেই। তা ছাড়া ধুলো থাকলেও জঙ্গলের মধ্যে গাড়ির কাঁচ কেউ নামাবি না। এসিও চলবে না। জঙ্গলে এসে যদি জঙ্গলের শব্দ ও গন্ধই না পাওয়া গেল তাহলে না আসাই ভাল।
আট দশ মিনিট আমরা গেছি, পেছনে জিপে প্ৰদীপকাকু, তাপসকাকু সঞ্জীবকাকুরা আসছেন। ঋজুদা গাড়ির সামনের সিটে এসে বসার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা পাইপের গোল্ডক তামাকের সুগন্ধে ভরে গেল। যেন আনন্দে ভরে গেল। ঋজুদা কোনও বাড়িতে ঢুকলে বা ঘরে ঢুকলেও এমনই হয়। কিছু একটা আছে মানুষটার মধ্যে যা আনন্দ আর মজা বিকিরণ করে। সমস্ত পরিবেশকে জীবন্ত, আনন্দময় করে তোলে।
গাড়িটা বাঁদিকে একটা বাঁক নিতেই ভটকাই চেঁচিয়ে উঠল, রোক্কিয়ে মামাজি, রোক্কিয়ে।
কী হল তা বোঝার আগেই ভটকাই চেঁচিয়ে বলল, ওয়াইল্ড বাফেলো। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখি, একদল ভারতীয় বাইসন বা গাউর ডানদিকের বাঁশঝাড়ে চরাবরা করতে করতে কচি বাঁশ পাতা খাচ্ছে। প্রায় দশ বারোটা হবে। তার মধ্যে প্রকাণ্ড বড় মাপেরও আছে দু-তিনটে।
ঋজুদা বিরক্ত গলাতে ভটকাইকে বলল, জঙ্গলে অমন হঠাৎ চেঁচাবি না। তিতির বলল, মিস্টার ভটকাই, এগুলো বুনো মোষ নয়, এগুলো গাউর বা ভারতীয় বাইসন। আমেরিকান বাইসনেরা এদের কাছে শিশু, অনেকই ছোট।
আমি বললাম, দেখছিস না এদের পায়ে সাদা লোমের মোজা পরানো আছে, কপালেও সাদা লোমের ইলিবিলি। আমেরিকান বাইসনদের রং বাদামি হয়। আমাদের বাইসনদের রংও অনেক সময়ে বাদামি হয় যখন তারা খুব বুড় হয়ে যায়। এমনিতে রং একেবারে জেল্লাদার কালো।
ঋজুদা বলল, বুড়ো হয়ে গেলে চিতল বা শম্বরও অমন বাদামি হয়ে যায়।
তারপর বলল, ভাল করে দ্যাখ ভটকাই। তারপর অবাক হয়ে স্বগতোক্তি করল, এখন পর্যন্ত ভটকাই গাউর দেখেনি এতদিন আমাদের সঙ্গে ঘুরেও। কীরকম চেলা তৈরি করলি রুদ্র তুই!
মামাজি গাড়ি দাঁড় করিয়েই রেখেছিলেন।
আমি বললাম, ও আমার চেলা? ভালই বলেছ। হিন্দিতে একটা কথা আছে না, মুলিমালোঁয়ার বিষেনবাবু বলতেন, গুরু গুড়, চেলা চিনি। তাই।
তারপরে ঋজুদা বলল, আসলে বনের গাছপালা এবং বনের আবহাওয়া অনুযায়ী জানোয়ারদের গায়ের রং পালটে যায়, পরিবেশের সঙ্গে যাতে মিশে যেতে পারে সে জন্যেও রঙের তারতম্য ঘটে তা সেই প্রাণী তৃণভোজীই হোক কি মাংসাশী। সুন্দরবনের বাঘ বা হরিণের চেহারা ও গায়ের রঙের সঙ্গে বিহার বা মধ্যপ্রদেশ বা আসাম বা রাজস্থানের বন্য প্রাণীদের চেহারা ও গায়ের রঙের কোনওই মিল নেই। তা ছাড়া, শীত যেখানে বেশি, সেখানের জানোয়ারদের গায়ে বড় বড় লোম হয়, যেমন রাজস্থানের আলোয়ারের সারিসকাতে।
আমি বললাম, তুমি কিন্তু আমাদের সারিসকাতেও নিয়ে যাওনি কখনও ঋজুদা।
ঋজুদা বলল, নিয়ে যাব একবার। আলোয়ারের রাজার শুটিং প্রিসার্ভ ছিল আগে যে জঙ্গলে সেই জঙ্গলেই এখন সারিসকা টাইগার রিসার্ভ হয়ে গেছে। রাজার শুটিং লজটি এখন একটি হোটেল হয়ে গেছে। দারুণ তার স্থাপত্য। অনেকখানি জায়গা নিয়ে ছড়ানো, একতলা। সেই হোটেলের বারান্দাতে বসে সোজা দেখা যায় যোধপুরের লাল পাথরে তৈরি মস্ত উঁচু ফটক। সেই ফটক পেরিয়েই মহারাজা ও তাঁর ইয়ার-দোস্তরা শিকারে যেতেন। তবে কংক্রিটের টাওয়ার, যাতে বসে বাঘ মারা হত, সেটা শুটিং লজ-এর ডানদিকে, একটি নদীর ধারে, পিচ রাস্তারও ডানদিকে। যখন যাবি, দেখাব। সাধারণ ট্যুরিস্টরা তার খোঁজ জানে না।
এত কথাবার্তাতেও ভটকাই যে বাইসনকে মোষ বলে ফেলে বেইজ্জত হয়েছিল সেটা ভোলেনি। হারবার বা দমবার পাত্র সে একেবারেই নয়। আমাদের ভটকাইচন্দ্রর এটি একটা বিশেষ গুণ।
সে হঠাৎ বলল, তোরা কেউ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক পড়েছিস?
তিতির বলল, যে না পড়েছে সে বাঙালিই নয়, এবং শিক্ষিত তো নয়ই।
তবে তো পড়েইছ। সেখানে বন্য মহিষদের দেবতা যে টাড়বারো’ তার কথাও নিশ্চয়ই পড়েছ?
পড়েছিই তো। আমি বললাম, তারপর বললাম, হঠাৎ এ কথা?
না। মনে পড়ে গেল হঠাৎ তাই-ই বললাম।
তিতির বলল, তুমি অ্যালগারনান ব্লাকউড-এর কোনও বই পড়েছ?
আঃ। বোরা বড় বাক্যবাগীশ হয়েছিস। দুদিকের জঙ্গল দ্যাখ, যা দেখতে এসেছিস। এই সময়ে আর সন্ধেবেলায়ই তো জানোয়ার দেখার মাহেন্দ্রক্ষণ।
আসলে, ঋজুদা ভটকাইকে বাঁচানোর জন্যেই এমন করল। বুঝলাম আমরা। আমরা ঋজু বোস না হতে পারি কিন্তু তার দৌলতে কম বন-জঙ্গল তো ঘুরলাম না এ পর্যন্ত! একেবারেই কিছু জানি না এমন তো নয়। ভটকাই তো দলে ভিড়ল মাত্র সেদিন, আমিই খাল কেটে কুমির আনলাম আর সেই এমন ভাব করে মাঝে মাঝে সে বলার নয়। দুদিনের বৈরাগী ভাতকে বলে অন্ন।
পনেরো মিনিট পরেই বাঁদিকে একদল ঢোল দেখা গেল। একটা পেল্লায় বড় দাতাল শুয়োরকে তারা কবজা করার চেষ্টা করছিল। এগোচ্ছিল, পেছোচ্ছিল, কেউ কেউ লাফ দিয়ে তার ঘাড়ে আর পেটে পিঠে কামড় বসাবার চেষ্টা করছিল। মুখ দিয়ে আমাদের পোষা কুকুরদেরই মতো এক ধরনের কুঁই কুঁই আওয়াজ করছিল। কিন্তু সে বন্য বরাহ তো নয়, রীতিমতো বরাহ অবতার। যেমন তার ভীষণ চেহারা তেমনই তার গায়ের জোর। পিঠের উপরে শিরদাঁড়া বরাবর কালো লোমের গোছ খাড়া হয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই শুয়োর বুনো কুকুরদের স্তম্ভিত করে তাদের ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এবং আমাদেরও হতবাক করে দিয়ে ঘোড়ার মতো টগবগিয়ে বনের গভীরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। ঢোলেরা কিছুক্ষণ ভ্যাবা গঙ্গারাম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ভটকাই স্বগতোক্তি করল, পিঠ তো নয়, ইংল্যান্ডের বেকহ্যামের মাথা।
আমরা হেসে উঠলাম, ওই টেনশানের মধ্যেও।
বুনো কুকুরদেরও আত্মসম্মান আছে, যা অনেক মানুষের নেই। একবারের সম্মিলিত চেষ্টাতেও যখন ওরা ব্যর্থ হল তখন সেই শুয়োরের পেছনে ওরা আর দৌড়ল না। বনের আইনে সেই বিরাট বরাহর আয়ু দীর্ঘায়িত হল। কোনওদিন সে হয়তো কোনও বাঘ বা চিতা বা ভাল্লুকের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়ে ওই বনের কোনও গভীর অন্ধকার রাতে অথবা রূপ-রস-গন্ধ-শব্দে ভরা কোনও আলোকোজ্জ্বল সকালে সম্মানজনক মৃত্যু বরণ করবে কিন্তু জীবন্ত অবস্থায় তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুবলে খুবলে খাবে বুনো কুকুরেরা এমন নারকীয় মৃত্যুর হাত থেকে সে আপাতত বাঁচল। তবে এ যাত্রা বেঁচে সে গেল বটে তার সর্বাঙ্গ কুকুরদের সঁতে নখে ফালা ফালা হয়ে গেছিল নিশ্চয়ই।
আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়েই ছিল। হঠাৎ দেখি পেছনের জিপ থেকে নেমে পড়ে সঞ্জীবকাকু টেলিফটো ফিল্ম দিয়ে ঢোলগুলোর ছবি তুলছেন নানাভাবে। সোজা, দাঁড়িয়ে, মাটিতে বসে, কেতরে, পথের উপরে শুয়ে।
তিতির বলল, ধরে ফেলল বলে ঢোলেরা। একেবারে ধরলে হাত পা ধড় মুণ্ডু নিমেষে আলাদা করে দেবে তা কি উনি জানেন না।
ঋজুদা বলল, খবরের কাগজের লোকদের বুনো কুকুরেরাও এড়িয়ে চলে। ওরা জানে যে সাংবাদিক ও ‘পাপারাৎজি’-দের কোনওক্রমে খেতে পারলেও, খেলেও, হজম কিছুতেই করতে পারবে না। ঢোলদের পেছন দিয়ে ফিল্মের নিউজপ্রিন্ট বা নেগেটিভ বেরোতে আরম্ভ করবে হয়তো।
তবুও, নামা উচিত হয়নি। আমি বললাম।
মুখে তো চেঁচিয়ে ওকে বারণও করতে পারছি না। বনের মধ্যে যে চেঁচামেচি করা বারণ।
ঋজুদা বলল, একবার পালামৌর বেতলার টুরিস্ট লজ-এর পেছনের ঘরের লাগোয়া বারান্দাতে বসে সকালে চা খাচ্ছি। ডিসেম্বর মাস। আর বারান্দাটা পশ্চিমমুখো। রোদ আসে না। তিন চার কাপ চা খেয়েও গা গরম হচ্ছে না। এমন সময়ে হঠাৎই গা গরম হয়ে গেল। দেখি, একটা বিরাট শিঙাল চিতল হরিণকে তাড়া করে নিয়ে আসছে একদল ঢোল। হরিণটা বাংলোর দিকে দৌড়ে আসছিল এই ভেবে যে মানুষের কাছে এসে পৌঁছতে পারলে ঢোলেরা হয়তো ভয় পেয়ে তাকে নিষ্কৃতি দেবে। কিন্তু কথায় বলে না, লজ্জা মান ভয় তিন থাকতে নয়। ঢোলেদের হচ্ছে তাই-ই। আমি যেখানে বসেছিলাম সেই বারান্দা থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে হরিণটাকে ধরে ফেলল ওরা, মানে, শিঙাল হরিণটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মহুয়া গাছতলায়। তারপর মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে তারা তাদের কাজ শেষ করে কুঁই কুঁই করে ডাকতে ডাকতে ফিরে গেল অন্য শিকারের খোঁজে। শিঙালের কঙ্কালটা আর বিরাট শিংটা পড়ে রইল শুধু। ওদের খিদে ব্ল্যাস্ট ফারনেসের মতো। একবার তা জ্বললে কখনই নেভে না মৃত্যুর আগে। শকুন বা কাক যে কিছু খাবে এমন অবশিষ্টও রইল না কিছু, মাংস ও চামড়ার।
ভটকাই বলল, তুমি চেঁচালে না? বন্দুক রাইফেল ন্যাশনাল পার্ক এর মধ্যে–হয় নাই ছিল, পিস্তল তো ছিলই, গুলি করলে না একটাও?
কেন?
একে বলে Balance of Nature। খাদ্য ও খাদক দুই-ই ঈশ্বরের সৃষ্টি। হরিণ ঘাস খায়। পাতা খায়। মহুয়া এবং অন্যান্য নানা গাছের ফুল ফল খায়, সেই ঘাসপাতা ফুল ফলবাহী গাছেদেরও তো প্রাণ আছে। না কি? আর হরিণকে খায় বাঘ, চিতা এবং ঢোল। মানুষ যখন হরিণ মেরে খায় সেটা স্বাভাবিকতা নয়, কিন্তু বাঘ চিতা বা ঢোল যখন হরিণ মারে তখন সেটা পরম স্বাভাবিকতা। প্রকৃতির মধ্যে অগণ্য খাদ্য ও খাদকের যে সহাবস্থান এবং ভারসাম্য আছে তাকে নষ্ট বা ভ্রষ্ট করার অধিকার আমাদের কারওরই নেই। বাঘ বা চিতা যখন হরিণ শম্বর খায়, ডোল যখন কোনও প্রাণীকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় তখন সেটা স্বাভাবিকতা কিন্তু বাঘ চিতা যখন মানুষ ধরে খায় তখন সেটা অস্বাভাবিকতা। অস্বাভাবিক কাজ করেছে। বলেই মানুষখেকো বাঘ বা চিতাকে আমরা মারতে বাধ্য হই।
তা তো হও। কিন্তু সঞ্জীবকাকুকেই যদি ঢোলে খেয়ে ফেলে অস্বাভাবিকতার চরম করে আমাদের নানা পোজ-এর ছবি তুলবে কে? তিতির বলল।
ঋজুদা হেসে বলল, খাবে না।
কী করে জানছ। তিতির বলল।
তুমি এত শিওর কী করে হলে? আমি জিগগেস করলাম।
ঋজুদা বলল, সংস্কার। সুন্দরবনে অস্বাভাবিকতার চরম করে তা প্রায়। স্বাভাবিকতাতেই পর্যবসিত করে বাঘে আকছার মানুষ ধরছে, মধু পাড়তে যাওয়া, কাঠ কাটতে যাওয়া, মাছ ধরতে যাওয়া মানুষকে ধরছে সকলের সামনেই। নোঙর করা জলি বোট থেকে, বড় মহাজনী নৌকা এবং ডিঙি থেকেও মানুষকে ধরে আনছে তারা বহুযুগ হল কিন্তু আজ অবধি কোনও মোটর বোট থেকে মানুষ ধরেনি একটিও।
সত্যি? একটিও না?
না।
কারণ?
কারণ, এটা সুন্দরবনের বাঘেদের সংস্কার। হয়তো মোটর বোটেও আগেকার দিনে আগ্নেয়াস্ত্র থাকত যে সে কথা তারা জানে বলেই ধরে না। কেন যে ধরে না তা কেউই জানে না। কিন্তু ধরে না। এ এক অসীম রহস্য তেমনই আজ অবধি। কোনও ঢোল কোনও মানুষের কোনও ক্ষতি করেনি।
তিতির বলল, পড়েছি, রাশিয়াতে নেকড়েরা মানুষ খায়।
রাশিয়াতে নেকড়েরা দলবদ্ধ হয়ে মানুষ তো বটেই ঘোড়াগাড়ির ঘোড়াকে পর্যন্ত খেয়ে ফেলেছে বলে পড়েছি কিন্তু আমাদের নেকড়েরা কখনও-সখনও ছোট ছেলেমেয়ে জঙ্গলের লাগোয়া গ্রাম থেকে নিয়ে গেলেও প্রাপ্তবয়স্ক কোনও মানুষকে কোনওদিনও আক্রমণ করেনি। তবে আমাদের নেকড়েরা দলেও থাকে না।
তবে?
জোড়ায় থাকে।
তারপর বলল, ভারতের কোনও রাজ্যেই কিন্তু ঢোলেরা মানুষকে আক্রমণ করেনি, তাই সঞ্জীব গাঙ্গুলি পুরোপুরি নিরাপদ। তাদের কোনও চিন্তা নেই।
ফরেস্ট গার্ড মহেন্দ্র সিং বিষেন বলল, কাল যে বাঘিনী ও বাচ্চাগুলোর ছবি দেখলেন তারা গত বছর এই ব্লক-এই ছিল। এখন পশ্চিম দিকে সরে গেছে।
কোনও গুহায় কি? তিতির শুধোল।
বিষেন বলল, কোনও গুহা তো আন্ধারী-তাড়োবার কোর এরিয়ার মধ্যে নেই। কোর এরিয়ার পুরোটাই সমান অঞ্চল। তবে বাইরে পাহাড় আছে রুখুসুখু অঞ্চল সেটা।
তিতির ঋজুদাকে জিগগেস করল, ব্লক কাকে বলে ঋজুদা?
বলছি। এই তাড়োবা ন্যাশনাল পার্ক-এর এলাকা হচ্ছে পাঁচশো আট বর্গ কিমি আর তাড়োবার টাইগার রিসার্ভ হচ্ছে একশো ষোলো কিমি, মানে তাড়োবা-আন্ধেরী অভয়ারণ্য। সবই তাড়োবা টাইগার রিসার্ভ-এর মধ্যে পড়ে। পুরো জঙ্গলটা একটা ডিভিশনের অন্তর্গত। সেই ডিভিশানে অনেকগুলো রেঞ্জ আছে। সব জঙ্গলেই থাকে। অল্প কিছুটা এলাকাকে বলে কম্পার্টমেন্ট। তিন চারটি কম্পার্টমেন্ট মিলিয়ে একটি বিট হয়।
বিট মানে?
মানে তো বললামই। বানান Beat। এসব ভাগাভাগি সেই সাহেবদের আমল থেকেই ভারতের সব বনেই হয়ে আসছে বনাঞ্চলের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও দেখভাল-এর জন্য। এই এক একটি Beat একজন ফরেস্ট গার্ড-এর অধীন। আবার তিন-চারটি বিট নিয়ে Round হয়। সেই রাউন্ড থাকে একজন ফরেস্টারের অধীনে। তিন-চারটে রাউন্ড নিয়ে একটা Range হয়। Range থাকে একজন Ranger-এর অধীনে। এবং তিন চারটি Range নিয়ে একটি ডিভিশান হয়, যার উপরওয়ালা হন একজন ডিভিশানাল ফরেস্ট অফিসার বা ডি. এফ. ও.। কয়েকটা ডিভিশানের উপরওয়ালা হন একজন কনজার্ভেটর। আবার তিন-চারজন কনজার্ভেটরের উপরে থাকেন একজন চিফ কনজার্ভেটর। কয়েকজন চিফ কনজার্ভেটরের উপরে থাকেন প্রিন্সিপাল চিফ কনজার্ভেটর। তারও উপরে ফরেস্ট সেক্রেটারি। অনেক রাজ্যের বনের এলাকা যেখানে খুব বড়, যেমন ছত্রিশগড়, সেখানে আবার একাধিক ফরেস্ট সেক্রেটারি থাকেন। সেখানে তাদের উপরে থাকেন প্রিন্সিপাল ফরেস্ট সেক্রেটারি। তারও উপরে বনমন্ত্রী। যাকে বলে এম. আই. সি. অর্থাৎ মিনিস্টার ইন চার্জ। তার নীচে মিনিস্টার অফ স্টেট থাকতেও পারেন নাও থাকতে পারেন। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন নিয়ম। বুঝলে এবার।
রেঞ্জারদের এখন ডেপুটি কনজার্ভেটরও বলে। ভারত জুড়ে সব দপ্তরেই এখন পদমর্যাদাতে সকলেই এক ধাপ উপরে উঠতে চাইছেন যে এ তারই নজির।
বুঝলাম, কিন্তু তবে মাথা ধরে গেল।
সব গুলিয়েও গেল। তিতির বলল।
মাথা ধরে গেলেও এই অঙ্কটা জেনে রাখবি। এত বনে ঘুরে বেড়াস তোরা তাদের আর বনের অ্যাডমিনিস্ট্রেশান সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা না থাকাটা লজ্জার কথা।
এবারে দেখা গেল সঞ্জীবকাকু অবশেষে জিপে উঠেছেন এবং জিপ স্টার্ট নিল। তা দেখে মামাজিও স্টার্ট দিলেন।
এই দিকেই রামদেগি মন্দিরে যাবার পথ আছে। অনেকে ট্রেকিং করে যান। ফরেস্ট গার্ড বিষেন বলল।
ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। আমি যেবারে জেঠুমনির সঙ্গে এসেছিলাম, রামদেগি মন্দিরে গেছিলাম হেঁটে। তোরা যেতে চাস তো যা।
এসেইছি তো মোটে আড়াইদিনের জন্যে। এর মধ্যে কি অত হয়। আমি বললাম।
তা অবশ্য ঠিক।
এ জঙ্গলে দেখছি শাল গাছই নেই। সেগুনই বেশি আর বাঁশ। একেবারে বংশীবদন নাম দিলেও ক্ষতি ছিল না। তিতির বলল।
ভটকাই বলল, খুব জুতসই হত নামটা।
ঋজুদা বলল, সেগুন ছাড়া এইন গাছ আছে, মধ্যপ্রদেশের নিজস্ব গাছ। আমাদের উত্তরবঙ্গ বক্সার জঙ্গলের নিজস্ব আকাতরু, লালি, দুধে লালি, চিকরাশির মতন। সেগুন আর এইন ছাড়াও এখানে আছে বিজা, ঢাওডা, হলুদ, সালাই, টেণ্ডু, কেন্দু, অর্জুন, জাম এবং মহুয়া। এইসব গাছ অন্যান্য রাজ্যের জঙ্গলেও দেখা যায়।
এই আইন না এইন বললে, এর সঙ্গে সুন্দরবনের বাইন গাছের নামের মিল আছে, তাই না।
ভটকাই বলল।
বাবাঃ। বেশ বলেছিস তো। তা তুই তো সুন্দরবনে যাসনি, তুই বাইন গাছের নাম জানলি কী করে?
বই পড়ে। শিবশঙ্কর মিত্রর সুন্দরবনের আজান সর্দার’ পড়েছি। ও বই পড়লেই সুন্দরবনের ওপরে থিওরিতে অন্তর অথরিটি হয়ে যাওয়া যায়।
এ যা পড়াশুনা শুরু করেছে ন্যাশানাল লাইব্রেরিও তো ফেল পড়বে রে রুদ্র। ঋজুদা বলল।
আমি বললাম, তাই তো দেখছি।
ড্রাইভার মামাজি হঠাৎ বললেন, দেখিয়ে, দেখিয়ে সাব। প্রথমে তার কথাটা বোঝা যায়নি কারণ মুখ ভর্তি গুটকা ছিল। সম্ভবত ভটকাই-এরই সাপ্লাই।
আমরা শুনলাম খেঁকিয়ে খেঁকিয়ে।
গাড়ি ততক্ষণে থেমে গেছে। সামনের বাঁকে পথের মধ্যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা চৌশিঙা হরিণ। যার ইংরেজি নাম Four-hom antelop, বড় শিঙাল। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রভাতী আগন্তুকদের দেখছে। তার উন্নত মাথাতে সকালের রাঙা রোদ পড়েছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সে আমাদের দিকে। আমরাও তাকে মুগ্ধ নয়নে দেখলাম। অনেকক্ষণ। যতক্ষণ সে দেখতে দিল আমাদের। তারপর একটি লাফ মেরে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে গেল।
এখানে চৌশিঙা আছে কিন্তু বারাশিঙা নেই। বারাশিঙার জায়গা হচ্ছে মধ্যপ্রদেশের কানহা-কিসন্সি। বান্ধবগড়েও আছে। এই চৌশিঙা বারাশিঙা বা শম্বরদের মতো বিরাট নয় তবে ওরা অন্যরকম। আমাদের এই ভারতবর্ষে কতরকম হরিণ আর এন্টেলপই যে আছে। যদিও বৈচিত্রে তারা আফ্রিকার মতো নয়। তবু, চিঙ্কারা, কৃষ্ণসার, হগ ডিয়ার, সোয়াম্প ডিয়ার, বার্কিং ডিয়ার, মাউস ডিয়ার, মাস্ক ডিয়ার, পাহাড়ি ঘুরাল, আরও কতরকমের।
ঋজুদা বলল, এখন একটাও নাইজার দেখতে পাচ্ছিস না, লক্ষ করেছিস?
ওরা তো নিশাচর। তিতির বলল।
গত সন্ধেতে কেমন লাল লাল ভূতুড়ে চোখ নিয়ে পথের মধ্যে বসে ছিল আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসে থেকে একেবারে গাড়ির বনেট প্রায় ফুঁড়ে উড়ে যাচ্ছিল উপরে, মনে আছে?
মনে আবার নেই। তারাই তো জঙ্গলকে রহস্যময় করে তোলে। রাত যত গম্ভীর হয় ততই তাদের হরক বাড়ে তবে এখানে তো ভোর ছটা থেকে সন্ধে সাতটা অবধিই জঙ্গলে থাকা চলে। আমি বললাম।
তুই চাইলে, রাতেও আসতে পারিস। তুই হচ্ছিস গিয়ে চিফ কনজার্ভেটর সাহেবের অতিথি।
আমি হেসে বললাম, আমি না ছাই। পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী। আসল তো তুমি।
ভটকাই খুবই বিরল তারিফ জানাল আমাকে, বলল, জিতা রহো।
তিতির বলল, ঋজুকাকা গতকাল বিকেলে যে বিরাট তৃণভূমিতে আমরা হাজার হাজার চিতল হরিণ দেখেছিলাম সেটা কি স্বাভাবিক না বনবিভাগ তৈরি করেছে।
ঋজুদা বলল, বলতে পারিস মাঝামাঝি। এই তাড়োবা-আন্ধারী টাইগার প্রিসার্ভ-এর মধ্যে দুটো মস্ত গ্রাম ছিল এক সময়, যখন আমি কানা মানুষখেকোটা মারি সেই সময়েই ছিল। বনবিভাগ ওই দুটি গ্রামকে উচ্ছেদ করে গ্রামবাসীদের অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিয়েছে।
তিতির বলল, মাধুকরী’ উপন্যাসের ঠুঠা বাইগার গ্রামেরই মতো, তাই না?
তাই। ঠুঠা বাইগার গ্রাম যেখানে ছিল সেখানে জঙ্গল এমন করে জমি জবরদখল করে নিয়েছিল যে সেই গ্রাম শত চেষ্টাতেও ঠুঠা আর খুঁজে পায়নি। জঙ্গলের মধ্যে অন্য জঙ্গল হয়ে তা জঙ্গলের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছিল। কিন্তু এখানে বনবিভাগ গ্রামবাসীদের উৎখাত করে সেই এলাকাতে অন্য প্ল্যানটেশান তো করেইনি চারপাশের জঙ্গলকেও জবরদখল করতে দেয়নি সেই গ্রামের এলাকাটুকু। ফলে তৃণভূমি হয়ে গেছে বিশাল। তাড়োবাতে যে দুটি বিরাট তৃণভূমি আছে সেই দুটিই এক সময়ের গ্রামের স্মৃতিকে বহন করেছে।
ভটকাই বলল, সেই লোকগুলো কি সুখী হয়েছে নতুন জায়গাতে গিয়ে? যাঁরা বাংলা ছেড়ে পশ্চিমবাংলাতে চলে এসেছিলেন তারা কি সুখী হয়েছিলেন? তাঁদের মধ্যে যারা মরে গেছেন তো গেছে এখন যারা বেঁচে আছেন তাদের ফেলে-আসা ভিটেমাটির স্মৃতি তাদের দুঃখী করেই। নিজেদের জন্মস্থান, বাল্যের লীলাভূমি, যৌবনের বিচরণভূমি, মানুষদের পরিবারের নানা ও নানারকম স্মৃতি এসব কি ভুলে যাওয়ার? না কোনও মানুষ ভুলতে পারে। যেসব ইহুদি জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে গেছিল প্রাণ নিয়ে তারা কি জার্মানিকে ভুলতে পারে? তবে এই সব ঘামের মানুষদের সান্ত্বনা এই যে তারা একটা মহৎ ব্যাপারের জন্যে উদ্বাস্তু হয়েছে। দেশ ভাগের মধ্যে তো কিছু ক্ষমতালোভী ও গদিলোভী মানুষের ঘৃণা ও চক্রান্ত ছিল কোনও মহৎ ব্যাপার তো ছিলনা। তাই তাদের যন্ত্রণাটাও দ্বিগুণ ছিল।
আমি বললাম, প্রদীকাকু বলছিলেন এখানে নাকি আফ্রিকার মতো উড়ন্ত কাঠবিড়ালি আছে? ফ্লাইং-স্কুইরেল?
আছেই তো। প্রদীপ ঠিকই বলেছে। প্রদীপরা সকলেই বন আর বন্যপ্রাণী খুব ভালবাসে। বেশ জানেশোনেও। ছুটিছাটা পেলেই সপরিবারে জঙ্গলে চলে আসে। ছেলেমেয়েদের জঙ্গল ও জঙ্গলের প্রাণীদের চেনায়। ওরা বুদ্ধিমান বলেই বুঝতে পেরেছে যে আধুনিক নাগরিক মানুষের বাঁচার শেষ পথ হচ্ছে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, প্রকৃতির সঙ্গে যোগসূত্র বজায় রাখা।
তারপর বলল, বাঘ চিতা নানারকম বাজ ও পেঁচা ছাড়াও এখানে নিশাচর প্রাণী আরও আছে।
যেমন? তিতির শুধোল।
যেমন ছোট ভারতীয় সিভেট ব্যাট, পাম সিভেট, র্যাটেল আর ফ্লাইং-স্কুইরেল তো আছেই।
ওই যে এসে গেলাম আমরা মোহার্লি। দেখা যাচ্ছে ঘর বাড়ি। ভটকাই বলল।
ঘর বাড়ি আবার কী। বনবিভাগেরই যা বাড়ি। এখানে কি আর বসতি আছে। মোহার্লির পশ্চিম দিকে তরাই বাঁধ আছে। সেই বাঁধের জলাধারে জলও আছে। আর আছে তরাই ব্যাকওয়াটার। ভারী সুন্দর। মোহার্লির পুবেই কোলসা বলে একটি জায়গা আছে সেখানেও বনবাংলো আছে। সবাই-ই তো তাড়োবার ভি. আই. পি. বাংলোতে জায়গা পান না–তোরা চিফ কনজার্ভেটরের অতিথি বলে পেলি। জেঠুমনির সঙ্গে যখন এসেছিলাম তখন কোলসাতে উঠেছিলাম। বাঘের বিচরণভূমি কাছে হবে বলে। তা ছাড়া এই ভি.আই.পি. বাংলো তো তখন বানানোই হয়নি, তবে অন্য বাংলো ছিল।
আমি যদি কোনওদিন বিয়ে করি ঋজুকাকা তবে প্রদীপকাকুকে বলে ওই কোলসার নির্জন বাংলো বুক করে হানিমুন করব। এই ভি.আই.পি. বাংলোটা বড় হোটেল হোটেল।
আসিস। ঋজুদা বলল হেসে। জঙ্গলের মতো জায়গা আছে হানিমুনের আর?
আমিও যদি কোনওদিন বিয়ে করি, বুঝলি তিতির, আমিও কোনও জঙ্গলেই এসে হানিমুন করব।
ঋজুদার বিয়ে করার কথায় আমরা সকলেই হেসে উঠলাম।
হাসছিস কেন তোরা? আমার কি বিয়ে করার কোনও আশাই আর নেই?
তাতে আমরা আরও জোরে হেসে উঠলাম।
ভটকাই বলল, মণিপুরের আর স্যেশেলস-এর এই দুই কন্যাকেই তুমি দুঃখ দিয়ে এলে আর তুমি বিয়ে করেছ। তাদের অভিশাপ লেগেছে না?
কী ব্যাপার? তিতির বলল।
ভটকাই বলল, তুমি রুদ্রর লেখা ‘ঋজুদার সঙ্গে স্যেশেলস-এ’ আর ‘কাঙ্গপোকপি’ এই বই দুটো পড়ে ফেলল।
তিতির বলল, ইয়ার্কি হচ্ছে? আমি বুঝি কাঙ্গপোকপিতে যাইনি?
গেছিলে? ভাল। মনেও নেই। অ্যাডভেঞ্চার তো আমাদের কম হল না। মনেও থাকে না ছাই!
ভটকাই-এর কথাতে হেসে উঠলাম আমরা।
তবুও ভটকাই তিতিরকে প্রশ্ন করল, বলো তো কাঙ্গপোকপি’ কোন ভাষার শব্দ। আর শব্দটার মানে কী?
তিতির বলল, নাগা ভাষার শব্দ আর মানে হচ্ছে মশার জন্মস্থান।
রাইট। একশোতে একশো। তবুও তুমি গেছিলে বলে আমার মনে পড়ছে না মণিপুর নাগাল্যান্ডে আমাদের সঙ্গে। না গিয়েও তো জানতে পারো। ভাল করে মনে করতে হচ্ছে।
মোহাৰ্লির ইনফরমেশান সেন্টার দেখে ফেরার সময়ে আমরা আন্ধারী নদীর রেখা আর গত বর্ষাতে তার ক্রিয়াকাণ্ডও দেখে এলাম।
পথের পাশে পাথরের স্তম্ভ আছে একটু দূরে দূরে গোঁন্দা রাজাদের বানানো। তাদের মাথাতে মাথাতে তার বা দড়ি বাঁধা থাকত–রাজধানী চান্দা থেকে সংকেতে খবর আদান-প্রদানের জন্যে। গ্রাহাম বেল যখন টেলিফোন আবিষ্কার করেননি তারও বহু আগে হয়তো এই টেলিফোন ব্যবহৃত হত। স্তম্ভগুলো আজও অটুট আছে। কত দিন আগের তা কে জানে। পড়াশোনা করে জানতে হবে।
