তিন
নাগপুর থেকে তাড়োবা এসেছিলাম আমরা চম্পা হয়ে অম্বা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে এসে উমরের ভিওয়ানপুর ও সারু নদী পেরিয়ে। তারপর জাম্বুল ও চিমুরঘাটা হয়ে ষোলো সতেরো কিমি এসে বাঁদিকে ঢুকতে হয় তাড়োবা যাওয়ার জঙ্গলের পথে। এই পথে উমরের এক বড় জনপদ। এ ছাড়া আর তেমন উল্লেখযোগ্য জনপদ নেই ওপথে এলে তাড়োবা আর নাগপুরের মধ্যে। অন্য পথ দিয়েও যাওয়া যায়। সোজা চিমুর থেকে এসে চন্দ্রপুর, গোঁন্দদের ‘চান্দা’ পেরিয়ে মোহার্লি গেট হয়ে অন্যদিক থেকে ঢুকতে হয় তাড়োবাতে। তাড়োবা থেকে ও পথে নাগপুরে যেতে মোহার্লি গেট দিয়ে বেরিয়ে এসে চন্দ্রপুর পেরিয়ে ওয়ারোরো ও বুটিবারি হয়ে ফিরতে হবে। নাগপুর থেকে আন্ধারী-তাড়োবার দূরত্ব একশো পঞ্চাশ কিমি আর চন্দ্রপুর থেকে পঁয়তাল্লিশ কিমি।
ঋজুদা জঙ্গল থেকে ভি.আই.পি. বাংলোতে ফেরার সময় বলল, কাল সকালে আমরা মোহার্দি গেট অবধি যাব। প্রদীপ বলছিল, সেখানে একটি ইনফরমেশান সেন্টার বানিয়েছে বনবিভাগ রেঞ্জার নীতিন কাকোডকার এর তত্ত্বাবধানে। সেটি নাকি দেখবার মতো।
ওদিকে গেলে, কপাল ভাল থাকলে ঢোলও দেখতে পারবেন সাহেব। গার্ড বিষেন বলল, মোহার্লির নাম শুনে।
তাহলে তো খুবই ভাল। খুব ভোরে উঠে এক কাপ করে চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ব আমরা। ফিরে ব্রেকফাস্ট করব।
ঠিক আছে।
তিতির বলল।
ঠান্ডাও কমে গেছে। ভোরে উঠতে কষ্ট কী?
আফ্রিকার শীতকালে অন্ধকার থাকতে বেরিয়ে ভুষুণ্ডার খোঁজে ঘুরতে যারা অভ্যস্ত তাদের আবার শীতের ভয় কী। আমি বললাম।
তা ঠিক। তবে শীতের কথাই যদি বলিস সমতলে তবে আমি বলব হাজারিবাগের শীতের কথা।
তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুই যখন আমার সঙ্গে মুলিমালোয়াতে গেছিলি অ্যালবিনোর পটভূমিতে তখন তো শীত ছিল না, গ্রীষ্মকালই বলা চলে। তাই…।
তারপর বলল, তুই ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’ আর ‘রুআহা’ বই দুটো কিন্তু ভারী ভাল লিখেছিলি রুদ্র। মাঝে মাঝে অবসর পেলে বইগুলো পড়ি, সেইসব দিনে ফিরে যাই। তোর কিছু মনেও থাকে। কী ডিটেইলস-এই না লিখেছিলি! ‘ঋজুদা সমগ্র’র কোন খণ্ডে আছে যেন?
প্রথম খণ্ডেই তো। তোমার সমগ্রর হিসেব দিয়ে কী কাজ? তোমার কাছে তো আমার সব কটি বইই আছে।
তা ঠিক। তবে সমগ্রর সব খণ্ডই হাতের কাছে থাকলে যখন যেটা খুশি পড়া যায়।
তারপর বলল, পাঁচ খণ্ড বেরুবে না রে? বেরুবে। নতুন বইগুলো লিখি আগে। এই তাড়োবা নিয়েও লিখব একটা আর তুমি যদি এপ্রিল মাসে ছত্তিশগড়ের বস্তারে নিয়ে যাও তবে সেই বস্তার নিয়েও লিখব আর একটা।
তাঁ। মনে হয়, বস্তারে তোদের সকলেরই যাওয়ার সুযোগ হয়তো হবে। গভর্নর সিনহা সাহেবের অতিথি হয়ে যাব। এমনই কথা আছে। প্রিন্সিপাল ফরেস্ট সেক্রেটারি চক্রবর্তী সাহেবও এখন থেকেই সব ডি.এফ.ও.-দের চিঠি দিয়ে রেখেছেন আমাদের দেখভালের জন্যে সব ফরেস্ট ডিভিশনে। ছত্তিশগড় সরকার এয়ারকন্ডিশানড টাটা সুমো দেবেন একটা। রায়পুর ও জগদলপুর-এ এয়ারকন্ডিশনড হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত, নারায়ণপুরে পি. ডাব্লু. ডি.-র চমৎকার বাংলো আর বনবিভাগের ছোট্ট বাংলোতে থাকব আমরা। ভাগ করে। এসব বন্দোবস্তই করেছে প্রদীপ মৈত্র, রায়পুরের।
তিনি কে?
তিনি এই প্রদীপেরই বন্ধু। হিন্দুস্থান টাইমস-এর চিফ রিপোর্টার রায়পুরের। খুবই ভাল ছেলে। তোরা সুদীপ্তকেও দেখিসনি। সেও খুব ভাল। স্কলাস্টিক। নাগপুরের সবচেয়ে বড় স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল। সুদীপ্ত ভট্টাচার্যি খুবই পড়াশুনো করে।
তাই? তিতির বলল।
ওই প্রদীপকাকু আর অন্যান্যরা কী করেন? মানে, এবারে আমাদের যারা নিয়ে এলেন।
প্রদীপ গাঙ্গুলি হল নাগপুরের ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট-এর ইঞ্জিনিয়র। নাগপুর শহরের পথেঘাটে কত সব ক্রিয়াকাণ্ড হচ্ছে দেখলি না। বিরাট চওড়া চওড়া সব রাস্তা, ফ্লাইওভার, এসবই প্রদীপের ডিপার্টমেন্টের কাজ। আর তাপস সাহা হল ভারত হেভি ইলেকট্রিকাল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। ও খুব মেধাবী ছাত্র ছিল যাদবপুরের। টারবাইন স্পেশ্যালিস্ট। সারা বছর ওকে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে হয় আর ওর স্ত্রী মুনমুন, সেও যাদবপুরেরই ছাত্রী, মেয়ে কুর্চিকে নিয়ে প্রায় একাই থাকে নাগপুরে।
প্রোষিতভর্তিকা!
আমাদের সবাইকে তো বটেই এমনকী ঋজুদাকেও চমকে দিয়ে বলল ভটকাই।
সেটা কী বস্তু রে? বাংলাতে খারাপ ঋজুদা জিগ্যেস করল।
যে মহিলার স্বামী প্রবাসে থাকেন তাকে বলে প্রোষিতভর্তিকা।
বাবাঃ! ভটকাই তো বাংলাতে পণ্ডিত হয়ে উঠেছে রে।
ভটকাই চুপ করে থেকে প্রশংসাটা রেলিশ করল।
আর সঞ্জীবকাকু কী করেন? কথা বলেন কম কিন্তু এক মিনিট অন্তর ছবি তোলেন।
তিতির বলল।
ও ছবি তুলবে না তো কে তুলবে? সঞ্জীব তো দারুণ ফটোগ্রাফার। হিন্দুস্থান টাইমস-এর চিফ ফটোগ্রাফার। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার। ও এত ভাল ছবি তোলে যে ইচ্ছে করলে শিবকে বাঁদর আর বাঁদরকে শিব করে দিতে পারে ওর হাতের গুণে। ভারী মজার ছেলে। এই যে টুপিটা পরে আছি আমি নাইকের ওটা ওরই দেওয়া। গত বছর একটা মারাঠি গামছা দিয়েছিল, ভারী মোটা আর নরম। ওর স্ত্রী সুচিত্রা নাগপুরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। তারও আসবার খুব ইচ্ছে ছিল। পারেনি। হয়তো বস্তারে যেতে পারে যদি স্কুল আর মেয়ের একটা বন্দোবস্ত করতে পারে।
ভটকাই অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। ভেরি আনইউজুয়াল ফর হিম। এবারে কিছু একটা কেলো করবে। ওর মৌনতাই তা বলছে।
আমিই ওকে খুঁচিয়ে দিয়ে বললাম, এ তো আর ডেভিল’স আইল্যান্ডে যাবার সময়কার মোটর-বোট নয়। এখানের বাবুর্চিকেও কি পকেটে পুরেছিস না কি? রাতের খাওয়া-দাওয়ার কী হবে? তুই তো একটি জিনিয়াস এ ব্যাপারে।
তা পকেটে পুরতে হয়েছে বই কী?ছ প্যাকেট সিগারেট এবং বহু ডজন গুটকা নিয়ে এসেছিলাম নাগপুর থেকে। এসেই কিচেনে ঢুকে ঘুষ দিলাম।
গুটকাটা কী জিনিস আবার?
ঋজুদা বলল।
সে আছে। তুমি এবারে পাইপ ছেড়ে দিয়ে গুটকা ধরো। পাইপে বড় ঝকমারি।
ভাল মনে করেছিস। অনেকক্ষণ পাইপটা খাওয়া হয়নি। এখন তো কাঁচ খোলা। ধরাই এবারে।
ঋজুদা বলল।
ধরাও।
খাবি তোরা আর বদনাম আমার।
ভটকাই বলল।
তা আজ রাতের মেনুও কি তুইই ঠিক করে দিয়ে এলি নাকি?
আমি বললাম।
বলতে পারিস, তাইই।
তিতির বলল, মেনু কী?
এই জঙ্গলে বেশি কী আর পাওয়া যাবে? তা ছাড়া, আসবার আগে নাগপুর থেকে বাজার করে নিয়ে এলেও কথা ছিল। প্রদীপকাকু তো বলেইছিলেন ঋজুদার তাড়াতেই তা পারলেন না। উমরের এমনই এক জায়গা যে তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। তোরাও সবাই তাড়া দিলি। সঞ্জীবকাকু মুরগিও জোগাড় করতে পারলেন না। ভিন্ডি আর পেঁপে নিয়েছেন বিস্তর, কিছু বেগুন টোম্যাটো, আলু পেঁয়াজ আর ডিম নিয়েছেন কিছু।
তা মেনুটা কী তা তো বলবি?
ভাত, যারা রুটি খাবে রুটি, ভাজা মুগের ডাল, লঙ্কা আর বেগুন ভাজা, স্টাফড টোম্যাটো।
কী দিয়ে হবে স্টাফিং। না মাছ আছে, না কিমা।
হবে আন্ডা দিয়ে। ডিমের ডেভিল খেয়েছিস তো? আজকে আমার ডিরেকশানে ডিম দিয়ে স্টাফড টোম্যাটো খেয়ে দেখিস। ফ্রিজে টক দই ছিল রায়তা বানাতে বলেছি। আর ক্যারামেল কাস্টার্ড–সুইড ডিশ।
সুইট ডিশ বলতে কি তুই একমাত্র ক্যারামেল কাস্টার্ডই জানিস?
হুঁ। একে মায় রাঁধে না তপ্ত আর পান্তা।
ভটকাই বলল। তারপর বলল, তা কেন। সঞ্জীবকাকুর সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। কাল চন্দ্রপুর থেকে মাটন আসবে, কলা ও অন্যান্য ফল, মুরগি, যথেষ্ট পরিমাণ আন্ডা এবং বাসমতি চাল। কাল তোদের দুপুরে পোলাও আর পাঁঠার মাংস খাওয়াব। আফটার লাঞ্চ সুইট ডিশ কালাকাঁদ। রাতে মুরগির রোস্ট, টোস্ট, আর সুইট ডিশ হবে ব্যানানা ফ্রিটারস। কানু ছাড়া যেমন গীত নাই আমি ছাড়াও তোদের গতি নাই।
অন্ধকার হয়ে গেছিল।
আমরা বাংলোর দিকে ফিরে যাচ্ছিলাম। জিপটা, আগেই বলেছি, পেছনে পেছনে আসছিল। হঠাৎই পথের ডানদিকে হাজার হাজার জোনাকি জ্বলে উঠল একসঙ্গে। চিতল হরিণের ঝক, মানে, তাদের চোখে গাড়ির হেডলাইটের আলো পড়ল, তাই। হেড লাইটের আলোতে তাদের চোখগুলি সত্যিই জোনাকিরই মতো ঝিকমিকিয়ে উঠল।
বাঃ! মনটা ভরে গেল।
তিতির স্বগতোক্তি করল।
আন্ধারী নদীটা কোথায়? টাইগার প্রিসার্ভের নাম যে আন্ধারী-তাড়োবা। আর কোনও নদীই তো দেখলাম না! তাড়োবা হ্রদ ঠিক আছে, কিন্তু নদীও তো দেখা চাই। আমি বললাম।
কাল সকালে মোহাৰ্লি দেখে ফেরার সময় দেখাব। আসলে আন্ধারী ওই পুরা প্রিসার্ভ-এর মধ্যে দিয়েই বয়ে গেছে। ফরেস্টার সাহেবকে বলে দিলে তিনি গার্ডকে বলে দেবেন আমাদের দেখাতে। না বললেও হয়। উনি তো জিপে থাকবেনই। দিনের আলোতে ভাল করে দেখা যাবে।
তিতির বলল, এত বড় যে তাড়োবা হ্রদ তাতে পরিযায়ী পাখিরা আসেনি কেন। শীত তো এখনও আছে একটু একটু। সবে জানুয়ারির শেষ।
ঠিক বলতে পারব না। ঋজুদা বলল।
আসবে কী করে? কুমিররা ঠ্যাং ধরে জলের গভীরে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলবে না।
বলেই ভটকাই বলল, একটা গল্প শুনবে ঋজুদা?
কী গল্প?
কুমিরের।
বল।
একজন অশিক্ষিত গ্রাম্য বড়লোক তার ছেলেকে মানুষ করার জন্যে একজন মাস্টারমশাই রেখেছেন। তা মাস্টারমশাই রোজই আসেন, পড়ান পৌনে এক ঘণ্টা এক ঘণ্টা। এদিকে বছর শেষের স্কুলের পরীক্ষাতে ছাত্র ঢ্যাঁঢ়ল।
ঢ্যাঁঢ়াল মানে কী? ঋজুদা বলল।
আঃ। তোমার বাংলা ভোকাবলরি বড় পুওর। ভটকাই বলল, ঋজুদাকে।
আমি বললাম, তাঁঢ়াল মানে ফেল করল।
অ।
পাইপ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে বলল ঋজুদা।
তারপর বলল। তিতির বলল।
তারপর মাস্টারমশাইকে তলব করলেন ছেলের বাবা। তাকে ভাল করে মিষ্টি-টিষ্টি খাইয়ে বললেন, এটা কী হল মাস্টের? এতই যদি পড়ালে পেটালে তো ছেলে আমার এমন সব নম্বর পেল কেন? এ জন্যেই কি আর পেরাইভেট মাস্টের রেখেছিলাম? সরকার যে প্রাইভেট টুশান বন্দ করার কতা বইলতেছেন ভালই কইরতেছেন।
মাস্টারমশাই বললেন, আমার কথাটা শুনুন স্যার। মানে, ব্যথাটা।
কী কথা আর ব্যথা, বলুন।
আমি তো চাদু খোকাকে সবই পড়িয়েছিলাম। কিন্তু একটা কুমির…
কুমির? তুমি বলছ কী মাস্টের। এ মদ্দি কুমির এল কোথ্বিকি?
এল কোথ্বিকি সে কথা তো আমিও ভেবে পাই নাই স্যার কিন্তু কুমির এয়েছে। বিলক্ষণ এয়েছে।
মাস্টারমশাই কঁদো কাঁদো মুখে বললেন।
আমি তো তোমার কথা কিছুই বুঝতিচিনা মাস্টের।
তখন মাস্টারমশাই বললেন, আচ্ছা আপনের সামনেই আমি চাঁদু খোকাকে কোশ্চেন করতিচি, আপনি দেইকে নেন কুমিরের মাহাত্ম্য।
করো তোমার কোশ্চেন।
মাস্টারমশাই বললেন, অ চাঁদু-খোকা, তুমি গোরু সম্বন্ধে কী পড়েছ তোমার বাবাকে শোনাও দিকি, আমাকেও শোনাও।
চাদু খোকা দুচোখ বড় বড় করে বলল, ও গলু? গলু মাত্তামতাই?
হ্যাঁ বাবা গোরু।
গলু অতি উপকারি দস্তু। গলু আমাদের দুধ দেয়। গলুর তামলা দিয়ে ঢাক হয়, ঢোল হয়, খোল হয়, আমাদের দুতো হয়, গলুর থিং দিয়ে নানালকম জিনিস তৈরি হয়।
তারপর?
একদিন হয়েছে কি মাত্তামতাই, গসুটা না মাঠে তলতিল, তলতে তলতে নদীল এক্কেবারে পাথে তলে গেথে, নদীল কুবই কাথে আর অমনি একতা কুমিল দল থেকে উটে গলুটার পা কামলে দলে তাকে নদীতে, মানে নদীর গবিলে নিয়ে তলে গেল।
মাস্টারমশাই বললেন, দেখুন তো স্যার। গোরু সম্বন্ধে আরও কত পড়িয়েছিলাম কিন্তু গোরুকে যদি কুমিরেই ধরে জলের তলে নিয়ে যায় তাহলে নম্বর দেবেন কী করে স্কুলের মাস্টারমশাইরা।
চাঁদুবাবার বাবা বলেন, আরও প্রশ্ন করুন তো দেখি। ইত বড় পোবলেম দেকতিচি।
মাস্টার বললেন, পোবলেম বলে পোবলেম।
তারপর বললেন, চাঁদুবাবা তুমি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী জানো বলো তো দিকি।
ও লবীন্দনাথ? লবীন্দ্রনাথ ঠাকুল খু্ব বড় কবি তিলেন। তিনি নোবেল পেরাইজ পেয়ে তিলেন। তিনি গীতাঞ্জলী লিকেতিলেন, আড়াই হাদার গান লিকেতিলেন, তাঁর বড় বড় দাড়ি থিল, তিনি দমিদার থিলেন।
বাঃ। তারপর?
তাপ্পর তিনি তো জমিদার থিলেন। শিলাদহে তাঁর দমিদারি ধিল। পদ্মা নামের তাঁর একটা লৌকা থিল। সেই পদ্মাতে বথে তিনি অনেক কবিতা লিখতেন। পদ্মা নদীর উপলে ভাসতে ভাসতে…
বাঃ। তারপর?
তাপ্পর একদিন তিনি পদ্ম নৌকা থেকে নেমে পদ্মা নদীর চরে নেমে আলখাল্লা গায়ে দিয়ে পায়তালি করতিলেন…
তারপর?
করতিলেন, পায়তালি করতিলেন, এমন সময় মাত্তামতাই একতা মত্ত কুমির এতে তাঁর পা কামলে ধলে নিয়ে নদীর মধ্যে নিয়ে গেল…
মাস্টার কাঁদো কাঁদো মুখে বললেন, দেখলেন স্যার। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আরও কত কী পড়িয়েছিলাম, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, অবন ঠাকুর, গগন ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাদম্বরী দেবী, শান্তিনিকেতন, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী আর একটা হতভাগা কুমির এসে…
চাঁদু খোকার বাবা খুবই চিন্তান্বিত হয়ে বললেন এ তো সত্যিই ভারী পোবলেম দেকতিচি। তারপর একটু ভেবে বললেন, আচ্ছা, কুমিরে ধরতে না পারে এমন কিছু পড়াননি ছেলেকে আপনি?
হ্যাঁ তাও পড়িয়েছি।
বলেই বললেন, আচ্ছা চাঁদু খোকা, তুমি এরোপ্লেন সম্বন্ধে কী জানো বলল তো?
বাবা বললেন, এইবারে কুমির জব্দ, এইবারে হারামজাদা কুমির কী করে দেখি।
বলব মাত্তামতাই?
হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা বলল।
এলোপ্লেন আকাশে ওলে। তার দুতো ডানা থাকে। আকাথের অনেক উপল দিয়ে উলে যায় এলোপ্লেন। লাতেল বেলা তাল অনেক দানালা দিয়ে আলো দেকা দায়। অনেক লোক বথে থাকে দালানার পাথে।
তারপর? তাপ্পরে প্লেনটা অনেক উঁচু দিয়ে উলতে উলতে দাত্তে অনেক দুলের দেশে, এমন সময় ইঞ্জিনে গ-গোল হয়ে প্লেনটা একটা মত্ত নদীর মদ্দে এতে পড়ল আর…
আর কী?
আল কী? এত্তা কুমিল, দুতো কুমিল, তিনতে কুমিল, তারতে কুমিল অনেক কুমিল এসে সব লোকদের কেয়ে ফেলল…
ভটকাই-এর গল্প শেষ হবার অনেক আগে থেকেই আমরা খকখক করে হাসছিলাম। এরোপ্লেনেরও এই অবস্থা হল দেখে আর হাসি চাপতে না পেরে সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। আর আমরা যখন হাসছি তখন ভটকাই গম্ভীর।
হাসি থামলে তিতির বলল, তুমি একটি এক নম্বরের বাফুন হয়েছ।
ঋজুদা বলল, যাই বলিস তোরা, তাই বলিস, ভটকাই সঙ্গে না থাকলে ব্যাপারটা ঠিক জমে না আজকাল। ও রীতিমতো ইনডিসপেনসিবল হয়ে উঠেছে।
ভটকাই একবার আমার আর তিতিরের দিকে অপাঙ্গে চেয়ে সিরিয়াস মুখ করে ডানদিকের জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইল।
একটু পরই ভি. আই. পি. গেস্ট হাউসের আলো দেখা গেল জঙ্গলের ফাঁকে, ফাঁকে। ওখানে প্রদীপকাকুরাও নামবেন এখন। তারপর চা-টা খেয়ে, পরে গল্প-টল্প করে একেবারে ডিনার খেয়ে কাছেই অন্য বাংলোতে শুতে যাবেন। এই বাংলোটা সত্যিই দারুণ। এয়ারকন্ডিশানার আছে, রুম হিটার আছে, ডাইনিং ড্রয়িং রুম, বিরাট বিরাট বাথরুম, সঙ্গে ড্রেসিং রুম। এলাহি ব্যাপার। সামনে লন। লন আর বারান্দাতে বসে তাড়োবা হ্রদ দেখা যায়।
গাড়ি থেকে নেমেই ঋজুদা বলল, প্রদীপ দেখো তো বাঘিনী আর তার তিন বাচ্চার ভিডিও ফিল্মটা কার হেপাজতে আছে।
ফরেস্টার সাহেব নিজেও নামলেন ওঁদের সঙ্গে। বললেন, সকলে ড্রইংরুমে আসুন। টি. ভি.-টা আর ভি. সি. পি. তো ড্রয়িংরুমেই আছে। ওখানে বসেই দেখব সকলে।
তারপর বললেন, বেয়ারা, বারান্দাসে কুর্সি অন্দর করো। সোফা যে কটা আছে। তাতে এতজন আঁটবে না।
চা খেতে খেতে অনেকক্ষণ ধরে আমরা ভিডিও ফিল্মটা দেখলাম, তিনটি বাচ্চা নিয়ে বাঘিনী মোহার্লির পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। কোনও বাচ্চা পেছিয়ে পড়ছে বা এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে, তাকে গুঁক করে অস্ফুট আওয়াজ করে বকে দিচ্ছে মা।
বাঘিনীর চেহারা বেশ রোগা-সোগা। চারজনের খাবার জোটাতে হচ্ছে তো। তাদের খাবার তো ডাইনিং রুমে সার্ভড হয় না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অনেক পরিশ্রম, অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার পরই শিকার জোটে তাদের কপালে। রীতিমতো মেহনত করতে হয় তাদের। সেদিক দিয়ে ভাবলে দুনিয়ার সকলেই ‘মেহনতি মজদুর’। যেসব মেহনতি মজদুর ভাবেন যে তাঁদের মালিকেরা সবাই পায়ের উপরে পা তুলে খান তারা ঠিক জানেন না। মেহনত মালিককেও কম করতে হয় না, ঝক্কি কম পোয়াতে হয় না, তবে তাদের মেহনতির রকমটা আলাদা। মজদুরের মেহনতিটা সাদা চোখে সহজে দৃশ্যমান কিন্তু মালিকের মেহনতিটা সহজে দৃশ্যমান নয়। তার চিন্তা ভাবনা, হাইপারটেনশান, এত মানুষের দায়িত্ব নেবার দুশ্চিন্তা এবং অবশ্যই মুনাফা করার দুশ্চিন্তাও তাকে সবসময়েই ভাবিত করে রাখে।
বাচ্চাগুলোর বয়স তিন-চার মাস হবে। এখনও অনেকদিন তাদের শিক্ষানবিশি করতে হবে তাদের মায়ের পায়ে পায়ে ঘুরে, তারপর একা একা শিকার ধরতে শিখতে হবে। সেইসব নতুন অনভিজ্ঞতার দিনে তাদের বোকাও বনতে হবে কম নয়, নিজেদের নির্বুদ্ধিতার লজ্জাতে নিজেদেরও লজ্জিত হতে হবে। ময়ুর, বাঁদর এসব ধরতেও যে মুনশিয়ানা লাগে, ক্ষিপ্রতা লাগে, এবং ইংরাজিতে যাকে বলে স্ট্র্যাটেজি, লাগে তা তাদের প্রত্যেককে শিখতে হবে। তার উপরে আছে মানুষ নামক শত্রুর লীলাখেলা। মানুষের ভয় এই অভয়ারণ্যর মধ্যে কম কিন্তু ওইসব অভয়ারণ্যর বাইরে যেসব বাঘ থাকে বা আগে থাকত তাদের বিপদের লেখাজোখা নেই ও ছিল না। বাঘের মতো সৎসাহসী মাথা উঁচু ভদ্রলোক খুব কমই আছে। সৎসাহসী মাত্রই সরল। তাই তারা সহজে মরে, তা সে বাঘই হোক, কী মানুষ। যেসব বাঘ মানুষখেকো হয়ে যায় তাদের কথা আলাদা কিন্তু সে তো মানুষের মধ্যেও যারা মানুষখেকো তাদের কথাও আলাদা। সাধারণভাবে বিচার করলে একজন মানুষের তুলনায় একজন বাঘ অনেক বোকা, ভাল এবং সরল যে, যাঁরাই বাঘের সঙ্গে ওঠাবসা করছেন তারাই জানেন। কোনও বাঘকে মারতে যে কোনও ভাল মানুষেরই খুব কষ্ট হয়। আর এক ধরনের শিকারি আছেন বা ছিলেন যারা বাঘ মেরে বাঘের গায়ের উপরে পা রেখে বন্দুক রাইফেল হাতে ছবি তোলাতেন। তাঁদের দেখে লজ্জা হয় আমার। বাঘ মেরে বাঘকে প্রণাম করা উচিত। অমন একটি প্রাণ নিধন করার অপরাধ ক্ষমা করার প্রার্থনা করা উচিত।
ওধরনের শিকারিরা এক গভীর হীনম্মন্যতাতে ভোগেন, এঁদেরই জ্ঞাতিগুষ্ঠিরা চিড়িয়াখানার গরাদে বন্দি বাঘকে ছাতার খোঁচা দেন, চিনাবাদাম ছুঁড়ে মারেন, শ্যালিকার কাছে নায়ক হবার জন্যে। তাদের মতো এমন নীচ ও কাপুরুষ জানোয়ার পৃথিবীর কোনও জঙ্গলের কোনও জানোয়ারই নয়।
ফিল্মটা বার বার রিওয়াইন্ড করে ঘুরিয়ে দেখার পর প্রদীপকাকুরা বললেন ঋজুদাকে, এবারে সেই কানা বাঘের গল্পটা হোক।
ফরেস্টার সাহেবও এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। যে সময়ের ঘটনা সে সময়ে অবশ্য তিনি রায়পুরের কাছের এক গ্রামের বাড়িতে হামাগুড়ি দেন। তার বহু বহু বছর পরেই বনবিভাগে ঢুকেছেন।
ঋজুদা বলল, সে গল্পের জন্যে তোমাদের একটি সন্ধে পুরো দিতে হবে অত অল্প সময়ে তা বলা যাবে না।
ওঁরা সকলেই বললেন, তাহলে শুভস্য শীঘ্রম। আমরা তো পরশু সকালে ব্রেকফাস্টের পর ফিরেই যাব নাগপুরে, তাহলে কাল সন্ধেবেলা জঙ্গল থেকে ঘুরে এসেই হোক।
ঋজুদা বলল, ঠিক আছে।
ভটকাই বলল, তাহলে কাল রাতের মেনুটা এইরকম করা যাক। ভুনি খিচুড়ি, ভাজা মুগ ডালের, মধ্যে কিসমিস, বাদাম এসব দিয়ে। খুব করে লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে পেঁয়াজি, ব্যাসন দিয়ে কড়া করে বেগুনি আর কঁচা লঙ্কা ভাজা, আর সঙ্গে মুরগি ভাজা।
তাপসকাকু চশমার আড়াল থেকে চোখ তুলে বললেন, আর সুইট ডিশ।
সুইট ডিশ হবে মালপো।
মালপোয়া এখানে কে বানাবে।
আমি বানাব। সদর্পে বলল, ভটকাই। এমন করে বলল, যেন মানুষখেকো বাঘই মারবে বলে হলপ করেছে।
তারপর বলল, দুপুরে আমি বন্দোবস্ত করে রাখব। সঞ্জীবকাকুকে শুধু বলবেন চন্দ্রপুর থেকে কেজি ছয়েক চিনি এনে দেবেন আমাকে একস্ট্রা আর পাঁচশো গ্রাম সুজি।
অত কী হবে। তিতির বলল।
আহা! বাবুর্চিখানার সৈন্যদল, ফরেস্টার সায়েব, গার্ডেরা কি বাদ পড়বেন মাস্টার ভটকাই-এর রান্না করা মালপো থেকে? কথাই বলে মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ। আমি বললাম।
আমরা কি সব ইতর জন? ভটকাই বলল।
আমি জিভ কাটলাম।
