রায়বাড়ির প্রতিমা রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
কর্নেল মকবুলের হাতে একটা ভাজকরা নোট গুঁজে দিলেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে সেলাম ঠুকে কর্নেল ও আমার ব্যাগদুটো নামাল। ভোঁদা নামে বেঁটে একজন যুবক এসে ব্যাগদুটো নিয়ে এগিয়ে গেল। গেটের পর মোরামবিছানো পথ। সরকারি বাংলো যেমন হয়। ফুলে ও সুন্দর গাছপালা-লতা-গুল্মে সাজানো। পশ্চিমপ্রান্তে তিনটে একতলা ঘর। তার মধ্যে একটা গাড়ি রাখার গ্যারেজ।
একজন মালি খুরপি দিয়ে একটা ঝোঁপের গোড়ার মাটি খুঁড়ছিল। সে সটান উঠে দাঁড়িয়ে কর্নেলের উদ্দেশে সেলাম ঠুকল। একতলা ঘরের বারান্দায় সম্ভবত তার বউ পা ছড়িয়ে বসে ভাত খাচ্ছিল। বউটি ঘোমটা টেনে পিছন ফিরে বসল।
দোতলা বাংলোর বাঁদিকে সিঁড়ি। সুখরঞ্জনবাবু, তাঁর পিছনে ভোঁদা সবেগে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যাওয়ার পর আস্তে-সুস্থে কর্নেল ও আমি ওপরে গেলুম। ওপরে শেষপ্রান্তের ঘরটিতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন–সুখরঞ্জনবাবু! বছর তিনেক আগে আমি আর আমার বন্ধু এই ঘরে ছিলুম।
সুখরঞ্জনবাবু বললেন,–আজ্ঞে স্যার! আমি একবছর হল জয়েন করেছি। তখন কেয়ারটেকার ছিলেন নিত্যগোপাল মুখুজ্যে।
-হ্যাঁ। নিত্যগোপালবাবু। নামটা মনে পড়ল।
-হঠাৎ স্ট্রোকে উনি মারা যান। বলে সুখরঞ্জনবাবু তেড়ে গেলেন ভোঁদার দিকে।–হাঁ করে দেখছিস কী? ঠাকমশাই বোধ করি লেপের তলায় ঢুকে পড়েছে। গিয়ে বল সায়েবরা এসে গেছেন। দুটো বাজতে চলল।
ভোঁদা তখনই দুপদাপ শব্দ করতে-করতে চলে গেল। হোঁকা মোটা বেঁটে যুবকটিকে দেখে ন্যালা-ভোলা মনে হচ্ছিল। কর্নেল বললেন,–সেবার রান্নার লোক ছিল না। মুখুজ্যেমশাই নিজেই আমাদের রান্না করে খাইয়েছিলেন।
–আজ্ঞে স্যার! অমন মানুষ আজকাল খুঁজে পাওয়াই কঠিন। যাক্গে। এত বেলায় স্নান না করাই ভালো। বাথরুমে গিজার আছে। গরমজলে হাত-মুখ ধুয়ে নিন। খাবার এখানে পাঠিয়ে দেব, নাকি…
কর্নেল হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।–আমরা নীচের ডাইনিং ঘরেই খাব। আপনার ব্যস্ত হওয়ার কারণ নেই।
সুখরঞ্জন বেরিয়ে গেলেন। বললুম,বাপস! এ যে বিহারের পাহাড়ি শীত! জানলাও খোলা যাবে না।
কর্নেল বাথরুমে ঢুকে গেলেন। আমি উত্তরের পর্দা সরিয়ে কাঁচের জানলা একটুখানি ফাঁক করে দেখে নিলুম। নীচের দিকে জলাধারের তীরে বাঁধানো ঘাট। সেখানে একটা সাদা রঙের বোট বাঁধা আছে। কিন্তু ঠান্ডা হিম জলাধারে রোয়িং করা অম্ভব। অবশ্য কর্নেলের কথা আলাদা। তাঁর মিলিটারি শরীর।
একটু পরে আমরা ঘরের দরজায় তালা এঁটে নীচে ডাইনিংরুমে গেলুম। ঠাকমশাই করজোড়ে নমস্কার করলেন। কর্নেল প্রশ্ন করে জেনে নিলেন, তার নাম বাসুদেব ঠাকুর। তার বাড়ি রানিপুর। কথায়-কথায় জানা গেল, প্রাণকান্ত সেনকে তিনি চেনেন। প্রাণকান্তবাবুর ভাই কাঞ্চন সেন কলকাতায় বড় একটি চাকরি করে। গরিব দাদাকে পাইপয়সা সাহায্য করে না। দাদার বাড়ি আসেও না।
সুখরঞ্জনবাবু একটু তফাতে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বললেন, আমার বাড়ি কনকপুরে। কাঞ্চন কনকপুর হাইস্কুলে আমার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল স্যার! আপনি তাকে চেনেন?
কর্নেল বললেন, আমার এক বন্ধুর কোম্পানিতে ভদ্রলোক চাকরি করেন। সেই সূত্রে একটু আলাপ হয়েছিল। আমার তো পাখিটাখি দেখার বাতিক আছে। কাঞ্চনবাবু বলেছিলেন, তাদের গ্রামের ওদিকে বিশাল বিল আছে। সেখানে শীতের সময় প্রচুর জলচর পাখি আসে। তার কাছে খবর পেয়েই সেবার আমি এখানে পাখি দেখতে এসেছিলুম। তুবে উনি বিল বলেছিলেন। আমি এসে দেখেছিলুম, ওয়াটারড্যাম।
ভোঁদা বারান্দায় রোদে বসেছিল। সে জড়ানো গলায় অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে বলে উঠল,–কাঁছনবাবু না? এই তো সেদিন–কঁকপুরে এসেছিল। বাঁছুবাবু না? বাঁচুবাবুর সঙ্গে বাজারে না? একসঙ্গে রিকশাতে চেঁপেছিল।
সুখরঞ্জনবাবু হাসতে-হাসতে তাকে ধমক দিলেন।–চুপ হতভাগা! স্পষ্ট করে একটা কথা বলতে পারে না। জানেন স্যার? রাতবিরেতে ওর কথা শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। আস্ত ভূত!
কর্নেল বললেন,–ওর বাড়ি কোথায়?
ঠাকমশাই বললেন, আমার গ্রামের ছেলে স্যার! বাবা-মা নেই। কনকপুর বাস্ট্যান্ডে মোট বইত। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ফাইফরমাশ খাটত। ইঞ্জিনিয়ারসায়েব ওকে এখানে চাকরি দিয়েছিলেন।
খাওয়ার পর ওপরের ঘরে গিয়ে বসেছিলুম,–কর্নেল! ভোঁদা কোন বাঁছুবাবুর সঙ্গে ক’দিন আগে কনকপুর বাজারে কাঞ্চন সেনকে দেখেছে। বাঁছুবাবুটি কে জেনে নিলেন না কেন?
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বলেছিলেন,–কম্বলে ঢুকে ভাতঘুম দিয়ে নিতে পারো।
–ইচ্ছে তো করছে। কিন্তু রোদ দেখে লোভ হচ্ছে।
তা হলে বারান্দায় রোদে বসতে পারো।–বলে তিনি একটা চেয়ার নিয়ে বারান্দায় গেলেন। তারপর দেখলুম, বাইনোলারে তিনি সম্ভবত কনকপুর দর্শন করছেন।
রোদের আরাম না কম্বলের আরাম, এই টানাটানির খেলায় শেষপর্যন্ত কম্বল জিতে গেল। আমি কম্বলের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলুম।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি। ঘুম ভেঙেছিল ঠাকমশাইয়ের ডাকে। তিনি চায়ের কাপ-প্লেট হাতে নিয়ে ডাকছিলেন। দেখেই বুঝেছিলুম কর্নেলের নির্দেশ। ঠাকমশাই সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। বললেন,–বড়সায়েব ভোঁদাকে নিয়ে পাখি দেখতে বেরিয়ে গেছেন।
চায়ের কাপ-প্লেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি, দূর পশ্চিমে অর্ধবৃত্তাকার গাঢ় নীল সুর্য যথাসাধ্য রং ছড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু প্রাকসন্ধ্যার ধূসরতা দ্রুত লাল রংটা মুছে ফেলছে। পূর্ব-দক্ষিণে সেই সরকারি জঙ্গলের গায়ে দেখতে-দেখতে ঘন নীল কুয়াশা জমে উঠল। চা শেষ করতে-করতে দক্ষিণে কনকপুরের আলোর বিন্দু ফুটে উঠতে দেখলুম। বারান্দার চেয়ারে বসে আমার প্রকৃতি দর্শনের একটু পরেই বাংলোর নীচের তলায় আলো জ্বলে উঠল। গেটের দিকে আলো পড়তেই কর্নেল আর ভোঁদাকে দেখতে পেলুম।
একটু পরে কর্নেল উঠে এসে যথারীতি সম্ভাষণ করলেন,–গুড ইভনিং জয়ন্ত! আশা করি ভাতঘুমটা ভালোই হয়েছে।
বললুম,–গুড ইভনিং বস! ভোঁদাকে নিয়ে কতদূর ঘুরলেন?
কর্নেল বারান্দার আলোর সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। তারপর ভিতরে তাঁর কিটব্যাগ, ক্যামেরা আর বাইনোকুলার রেখে একটা চেয়ার নিয়ে এলেন। তিনি চেয়ারে বসে আস্তে বললেন,–ইচ্ছে করেই একটা রিস্ক নিয়েছিলুম। সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেতে পারত। তৈরি ছিলুম বলে ঘটেনি। অবশ্য ভোঁদা ছেলেটি সত্যিই যাকে বলে হাঁদারাম। কী ঘটল তা বুঝতে পারেনি।
কথাটা শুনেই চমকে উঠেছিলুম। বললুম, কেউ হামলা করেছিল। তাই না?
কর্নেল হাসলেন। ড্যামের ধারে উঁচু বাঁধের পথে হাঁটছিলুম। বাঁধের দুধারেই গাছপালা ঝোঁপঝাড়। ডাইনে খানিকটা ঢালু জমির নীচে:সেই খালটা। আসবার সময় খালটা তুমি দেখেছ। তো আগেই ঢালু জমিতে একটা বটগাছ লক্ষ করেছিলুম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা লোককে গুঁড়ির ওধারে আড়ালে যেতে দেখেছিলুম।ভোঁদা হাঁটছিল আমার বাঁদিকে। বটগাছটার কাছাকাছি বাঁধের পথে পৌঁছুনোর আগেই দেখি, লোকটা গুঁড়ি মেরে ঢালু জমিতে ঝোঁপের মধ্যে বসে পড়েছে। তার হাতে কী একটা ছিল–সম্ভবত দেশি পিস্তল। আমার উপায় ছিল না, ঝোঁপটার গোড়া লক্ষ্য করে এক রাউন্ড ফায়ার করতেই হল। অমনই লোকটা বটগাছের আড়াল দিয়ে উধাও হয়ে গেল। ভোঁদা ভেবেছিল, আমি পাখি মারবার চেষ্টা করলুম। তার কথায় পরে আসছি। নেমে গিয়ে বটগাছটার কাছে বাইনোকুলারে দেখলুম, লোকটা খালের ধারে-ধারে ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়ে পড়ি-কি-মরি করে দৌড়ে পালাচ্ছে। কাঁচারাস্তায় পৌঁছে সে একবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তারপর আমাকে দেখতে পেয়ে আবার দৌড়ে উধাও হয়ে গেল। ভোঁদা তখনও বাঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখার মতো মূর্তি। চোখ বড়। জিভ খানিকটা বেরিয়ে আছে। ফিরে গিয়ে বললুম, পাখিটা মারতে পারলুম না ভোঁদা! ভোঁদা তার বুলিতে যা বলতে চাইছিল, তা বুঝলুম। এদিকটায় বনমুরগি চরে বেড়ায়। কিন্তু তারা বেজায় চালাক।
এইসময় কফি আর স্ন্যাক্স ট্রেতে করে নিয়ে এলেন ঠাকমশাই। তার পিছনে ভেঁদা। ভোঁদা ঘর থেকে বেতের টেবিল এনে রাখল। ঠাকমশাই সহাস্যে বললেন,–বড়সায়েব বনমুরগিকে গুলি করেছিলেন শুনলুম। ভোঁদা তো হেসে অস্থির। বনমুরগি ফাঁদ পেতে ধরতে হয়। বুঝলেন স্যার? আগের দিনে মুমহররা এসে বনমুরগি ধরত। আজকাল আর তাদের দেখতে পাই না!
ভোঁদা অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ভুতুড়ে হাসি হাসল। তারপর ঠাকমশাইয়ের তাড়া খেয়ে চলে গেল।
ঠাকমশাই বনমুরগি এবং মুমহরদের সম্পর্কে আরও কিছু বলতেন। গেটের দিকে তাকিয়ে কর্নেল বললেন,–ঠাকমশাই! আমার সঙ্গে এক ভদ্রলোকের দেখা করতে আসার কথা। মনে হচ্ছে, তিনি এসে গেছেন। ওঁকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। পটে যা কফি আছে, এতেই হবে। আপনি শুধু একটা কাপ-প্লেট পাঠিয়ে দেবেন।
বাসুদেব ঠাকুর চলে গেলেন। গেটের কাছে হালদারমশাইকে দেখা যাচ্ছিল। মাথায় হনুমানটুপি, পরনে প্যান্ট আর গায়ে সোয়েটারের ওপর কোট চাপানো।
আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি হাত নাড়ছিলেন। একটু পরে ভোঁদা তাকে পৌঁছে দিয়ে গেল। তারপর ঠাকমশাই কাপ-প্লেট নিয়ে এলেন। হালদারমশাইকে বিনীতভাবে নমস্কার করে চলে গেলেন।
গোয়েন্দাপ্রবরকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। কর্নেল বললেন,–কফি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিন হালদারমশাই।
আমি বললুম,–আপনি এলেন কীসে? হালদারমশাই বললেন,–রিকশোওলারা সন্ধ্যার পর এদিকে আইতেই চায় না। একজন হাঁকল তিরিশ টাকা লাগব। হঃ! দুইখান পাও থাকতে অগো সাধাসাধি করুম ক্যান?
কর্নেল তার হাতে কফির কাপ তুলে দিয়ে বললেন,–উঠেছেন কোথায়?
–উঠছি তো রায়বাড়িতে। সুদর্শনবাবু ওনার দাদা সুরঞ্জনবাবুর লগে আমার পরিচয় দিছেন। উনিও খুশি হইয়া কন্ট্রাক্ট ফর্মে সই করছেন। প্রথমে এটুখানি হেজিটেট করছিলেন ভদ্রলোক। তখন সুদর্শনবাবু মিঃ রায়চৌধুরির লেটারখান ওনারে পড়তে দিছিলেন। দোতলায় সুদর্শনবাবুর পাশের ঘরে আছি।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কতদূর এগোলেন বলুন!
প্রাইভেট ডিটেকটিভ চাপা স্বরে বললেন,–সুরঞ্জনবাবু কোথায় চাবি লুকাইয়া রাখেন, তা দেখছি। সুদর্শনবাবু তখন বাইরে গিছলেন। ওনার বউদি ভদ্রমহিলা ছিলেন নীচের তলায়। সুরঞ্জনবাবু আমার ঘরে বইয়্যা ওনাদের ফ্যামিলি হিসটরি কইতাছিলেন। সেইসময় কথাটা তুলছিলাম।
–বাঃ! তারপর?
–উনি নিজের বেডরুমে লইয়া গিছলেন। খাটের মাথার দিকের দেওয়ালে ওনার ঠাকুরদার একখান পোর্ট্রেট টাঙানো আছে। ছবিটার পিছনে দেওয়ালে ছোট্ট তাক আছে। একসময় সেখানে ওনাদের মহালক্ষ্মী দেবীর নকলে তৈরি মাটির ছোট্ট প্রতিমা থাকত। ওনার ঠাকুরদার পোর্ট্রেটখান থাকত অন্য দেওয়ালে। চাবি লুকাইয়া রাখতেন সেই প্রতিমার তলায়। পরে প্রতিমা আলমারির মাথায় রাইখ্যা তাকের মাপে লোহার একখান চৌখুপি বানাইয়া আনছিলেন। বাঁদিকে একখানে আঙুলে চাপ দিলে কপাটের মতন সামনেটা খুইল্যা যাইত। ভিতরে হাবিজাবি জিনিসের মধ্যে চাবি দুইখান লুকাইয়া রাখতেন। চৌখুপির সামনের পাতে দেওয়ালে রঙ করা ছিল। তার ওপরে ঠাকুরদার পোর্ট্রেট। পোর্ট্রেটের তলায় ময়লা দাগ পড়নের কথা। কেউ ছবিখান সরাইলে দাগ দেইখ্যা জানা যাইব। তাই কি না?
–ঠিক বলেছেন। হালদারমশাই বললেন, সুদর্শনবাবুর ঘরের তালা কেউ একবার ভাঙছিল, তা তো অলরেডি শুনছেন! তারপর সুরঞ্জনবাবুও সতর্ক হইয়া তার চাবিদুইখান এমন জায়গায় রাখছিলেন, ভাবা যায় না। বলে হালদারমশাই খিখি করে হেসে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলুম,–কোথায় রেখেছিলেন?
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–ওনার ঘরে বইপত্তরের মধ্যে পুরোনো পঞ্জিকা আছে অনেকগুলি। একখান পুরোনো অ্যাত্তো মোটা পঞ্জিকার মাঝখানে চৌকো এটুখানি গর্ত করছেন।
কর্নেল বললেন,–পাতা কেটে গর্ত?
–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার। ব্লেড দিয়া এক ইঞ্চিরও বেশি গর্ত করছেন। চৌকো গর্ত। তার মধ্যে দুইখান চাবি।
হালদারমশাই আবার খিখি করে হেসে উঠলেন। বললুম,–অদ্ভুত ব্যাপার তো!
–হঃ! কার সাইধ্য ট্যার পায়, পুরোনো পঞ্জিকার মধ্যে গুপ্তধন লুকাইয়া আছে! হালদারমশাই কণ্ঠস্বর আরও চাপা করলেন। কাজটা কিন্তু সহজ নয়। চিন্তা করেন কর্নেলস্যার! ব্লেড দিয়া অতগুলি পাতা কাটতে সময় কত লাগছে? তিনইঞ্চির বেশি লম্বা আর আধা ইঞ্চি চওড়া কইর্যা পাতা কাটছেন।
বললুম,–এক ইঞ্চিরও বেশি গভীর করতে হলে পঞ্জিকাটা খুবই মোটা হওয়া উচিত।
কর্নেল বললেন, আগের দিনে কিছু প্রকাশক প্রকাণ্ড শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা প্রকাশ করতেন। সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা, মেয়েদের ব্রতকথা, শাস্ত্রীয় পাঁচালি পুরে দিতেন। সস্তা নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপা এ সব আট-নশো পৃষ্ঠার পঞ্জিকা আমি দেখেছি। আমার এক বন্ধুর পঞ্জিকাসংগ্রহের বাতিক আছে।
কর্নেলের কথার ওপর হালদারমশাই বললেন–বেশিক্ষণ থাকুম না। দুইখান ইমপর্ট্যান্ট কথা আছে।
–বলুন!
–আইজ সকালে বাজার এরিয়ায় গিছলাম। বড় বেশি ঠান্ডা! রাস্তার ধারে রৌদ্রে খাড়াইয়া চা খাইলাম। তারপর ভিড়ের মধ্যে ক-পাও হাঁটছি, পিছন থেইক্যা কে আমার হাতে কী একখান দিলা। ঘুইর্যা দেখি এক পোলাপান। সে কইল, এক বাবু আমারে দিতে কইছে। তারপরই সে পলাইয়া গেল। তারে তাড়া করলে মাইনরো ভিড় করবে। জিগাইবে কী ব্যাপার। তাই মাথা ঠান্ডা রাখলাম। এই দ্যাখেন কী কাণ্ড!
হালদারমশাই কোটের ভিতর পকেট থেকে ভাজকরা একটুকরো কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল চোখ বুলিয়ে দেখার পর গম্ভীর মুখে বললেন, ক্রমশ একটু-একটু করে ঘটনাটা স্পষ্ট হচ্ছে। রায়বাড়ির গৃহদেবীর জুয়েলস চুরি করে চোর। অথচ তা কনকপুর থেকে নিয়ে যেতে পারেনি এবং বেচতেও পারেনি।
কর্নেলের হাত থেকে প্রায় দলাপাকানো কাগজের টুকরোটা চেয়ে নিলুম। কাগজে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা আছে :
‘টিকটিকির লেজ কাটিয়া দিলেও লেজ গজাইতে পারে। মস্তক কাটিলে কী হইবে?’
হালদারমশাই বললেন,–কর্নেলস্যার! পঁয়তিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করেছি। আমারে কয় টিকটিকি? আইজ বেলা বারোটা পর্যন্ত বাজার এরিয়ায় এখানে-সেখানে ঘুরছি। পোলাটারে খুঁজছি। দেখা পাই নাই!
বললুম,–ভদ্ৰপরিবারের ছেলে, নাকি সাধারণ ঘরের?
-নাঃ! নোংরা পোশাক! পরনে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট। জুতা নাই।
কর্নেল বললেন,–ঘটনাটা কি আপনার মক্কেলদের জানিয়েছেন?
–কক্ষনও না। অগো কমু ক্যান?
–ঠিক করেছেন। আর কী কথা বলতে চাইছিলেন, এবার বলুন!
হালদারমশাই সম্ভবত উত্তেজনায় নস্যি নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। এবার একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন–সুদর্শনবাবু বিকালে ওনাগো ক্লাবে যাইতে কইছিলেন। আমি ওনারে কইলাম, বাইরে আপনাগো লগে মেলামেশা করনের অসুবিধা আছে। উনি যাওয়ার পর আমি আবার বাজার এরিয়ায় গেলাম। পোলাটারে খুঁজছিলাম। শেষে ঠিক করলাম, আপনার লগে কনসাল্টের দরকার আছে। তারপর একটা চৌরাস্তার মোড়ে খাড়াইয়া ওয়েট করছিলাম। ক্যান কী, আপনি কইছিলেন সন্ধ্যার পর আমি য্যান গোপনে এই বাংলোয় আসি।
কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! এবার কথাটা কী বলুন!
গোয়েন্দপ্রবর চাপা স্বরে বললেন,–বাঁ-দিকে মোড়ের মুখে একখান দোতলা বাড়ি থেইক্যা সুরঞ্জনবাবু আর-একটা লোকেরে বারাইতে দেখলাম ওনারা আমারে লক্ষ করেন নাই। ততক্ষণে আলো জ্বলছে। সুরঞ্জনবাবুরে দেইখ্যা মনে হইল, কিছু ঘটছে। দুইজনে সাইকেলরিকশোতে চাপলেন। কিন্তু ওনারা বাড়ির দিকে গেলেন না। উল্টাদিকে গেলেন। আমার খটকা বাধছে।
–কিছু ঘটে থাকলে রায়বাড়ি ফিরেই জানতে পারবেন। সুরঞ্জনবাবুর সঙ্গের লোকটার চেহারা, পোশাক নিশ্চয় লক্ষ করেছেন?
–করছি। বয়স তিরিশ-বত্রিশের বেশি না। গোঁফ আছে। মাথায় মাফলার জড়ানো ছিল। গায়ে অ্যাশকালার ফুলহাতা সোয়েটার। পরনে মেটে রঙের টাইট প্যান্ট। জুতা লক্ষ করি নাই।
এই সময় বাংলোর দিকে একটা গাড়ি এগিয়ে আসতে দেখলাম। বাংলোর গেটের কাছে আসতেই চোখে পড়ল একটা জিপগাড়ি। ভোঁদা থপথপ করে এগিয়ে গিয়ে খুলে দিল। জিপগাড়িটা লন পেরিয়ে নীচে এসে থামল। কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–ইঞ্জিনিয়ারসায়েবের গাড়ি। এতক্ষণে বোধহয় মেকানিকরা গাড়িটা সচল করে দিয়েছে।
একটু পরে একজন টাই-স্যুট এবং কানঢাকা টুপি পরা এক ভদ্রলোক এবং তার পিছনে কেয়ারটেকার সুখরঞ্জনবাবু এগিয়ে এলেন। সুখরঞ্জনবাবু বললেন, স্যার! আমাদের ইঞ্জিনিয়ারসায়েব!
ইঞ্জিনিয়ারসায়েব নমস্কার করে কর্নেলকে বললেন-কর্নেলসায়েবের খুব কষ্ট হয়েছে বুঝতে পারছি। কিন্তু সরকারি গাড়ির অবস্থা কী আর বলব?
সুখরঞ্জনবাবু একটা চেয়ার এনে দিলে তিনি বসলেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি। আর ইনি আমার বন্ধু মিঃ কে, কে. হালদার। অবশ্য মিঃ হালদার কনকপুর রায়বাড়ির গেস্ট!
–আমি এ. কে. গোস্বামী। চিফ ইঞ্জিনিয়ার মিঃ কে. এল. বোস আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, আপনার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু প্রথমেই অসুবিধা ঘটিয়ে ফেলেছি। ক্ষমা করবেন।
–ও কিছু না। বছর তিনেক আগে ডিসেম্বরে আমি মিঃ জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির সঙ্গে এই বাংলোয় এসে কয়েকটা দিন ছিলুম।
আমি তখন ফরাক্কায় ছিলুম।–বলে মিঃ গোস্বামী ঘড়ি দেখলেন। আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আর কৈফিয়ত দিতে এসেছিলুম। মিঃ বোস বলে দিয়েছেন, আপনার গাড়ির দরকার হলে যেন ব্যবস্থা করে দিই। জিপগাড়িটা আমাকে আমার কোয়ার্টারে পৌঁছে দিয়ে বাংলোয় থাকবে।
কর্নেল বললেন,–ধন্যবাদ মিঃ গোস্বামী। আমার গাড়ির দরকার হবে না। আমি জল-জঙ্গলে ঘুরতে এসেছি। আমার কিছু হবি আছে। পাখি, প্রজাপতি, অর্কিডের খোঁজে ঘুরে বেড়াই। নৌকোর ব্যবস্থা করে নেব। আমার এই কার্ডটা রাখুন!
কর্নেল তার নেমকার্ড দিলেন। মিঃ গোস্বামী কার্ডটা দেখে নিয়ে পকেটে ঢোকালেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–রোয়িং করার একটা ছোট্ট বোট আছে। তবে এখন যা অবস্থা, রোয়িং করার রিস্ক আছে। সুখরঞ্জনবাবুকে বললে নৌকোর ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি চলি কর্নেলসায়েব! ফিশারিজ কো-অপারেটিভের একটা আর্জেন্ট মিটিং শেষ করে আসছি। কো-অপারেটিভের প্রেসিডেন্ট এবং সেক্রেটারিকে বসিয়ে রেখে এসেছি। কিছু কাজ এখনও শেষ হয়নি।
কর্নেল বললেন,–মিঃ গোস্বামী! তা হলে একটা অনুরোধ। আমার বন্ধু মিঃ হালদারকে রায়বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দিলে খুশি হব। আপনি না এলে ওঁকে কষ্ট করে হেঁটে যেতে হত।
–নিশ্চয় পৌঁছে দেব। চলুন মিঃ হালদার!
গোয়েন্দাপ্রবরের আরও কিছুক্ষণ হয়তো থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এই শীতে জিপগাড়িতে ফেরার সুযোগ পেয়ে উনি খুশিই হলেন।
একটু পরে আমরা ঘরে গিয়ে বসলুম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেলের নির্দেশে এবার ভোঁদা কফির ট্রে রেখে গেল। বোঝা যাচ্ছিল কর্নেলকে তার ভালো লেগেছে। তার সেবা করতে পারলে সে যেন ধন্য হয়ে যাবে।
কফি খেতে-খেতে কর্নেল হালদারমশাইয়ের সেই কাগজটা টেবিলল্যাম্পের আলোতে আতশকাঁচ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তারপর তিনি টেবিলল্যাম্প নিভিয়ে দরজার পর্দা তুলে বাইরেটা দেখে এলেন। চেয়ারে বসে তিনি আস্তে বললেন–হালদারমশাই সুদর্শনবাবুকে কার্ডটার কথা বলেননি। আবার সুদর্শনবাবুরও কার্ডটা সম্বন্ধে মাথাব্যথা থাকলে হালদারমশাইকে জানাতেন। এ থেকে আমার ধারণা কার্ডটা কেউ ইচ্ছে করেই সুদর্শনবাবুর ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
-কেন?
–প্রশ্নের আগে তুমি চিন্তা করো, কখন কার্ডটা ঢোকানো হয়েছিল? কলকাতা যাওয়ার জন্য উনি ব্যাগে মহালক্ষ্মীর ফোটো এবং কিছু জিনিসপত্র ঢুকিয়েছিলেন। তারপরই কার্ডটা ঢোকানো হয়েছিল। বাড়িতে এটা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। কাজেই স্টেশনে যাওয়ার সময় বাসের ভিড়ে অথবা ট্রেনে ওঠার পর কেউ কার্ডটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়। তুমি লক্ষ করে থাকবে, দুদিকে বোতাম আঁটা কাপড়ের ব্যাগ। এবার তোমার প্রশ্নের একটা উত্তর দেওয়া যায়। সে জানত, সুদর্শনবাবু কোথায় যাচ্ছেন এবং কেন যাচ্ছেন। বাঁধানো ফোটো বের করলেই কার্ডটা বেরিয়ে পড়ার কথা। ওঁর হইচই বাধানোর স্বভাব। কার্ড দেখতে পেলেই উনি আমাকে দেখাতেন। লোকটা ভেবেছিল, উনি যা-ই বলুন, চন্দ্র জুয়েলার্সের কার্ড দেখলে আমার মনে ওঁর প্রতি সন্দেহ জাগবে। আমি ওঁকে অবিশ্বাস করব। তখনই ঘর থেকে বের করে দেব। নয়তো ওঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেব। কারণ ওঁর ব্যাগ থেকে কার্ডটা ছবির সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছে। আমি কার্ডটা প্রখ্যাত রত্নব্যবসায়ী চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির।
হাসি পেল কথাগুলো শুনে। বললুম,–কার্ডটা ঠিকই বেরিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সুদর্শনবাবুর দৃষ্টি তখন আপনার দিকে ছিল।
কর্নেলও হাসলেন। সুদর্শনবাবুর অজান্তে কার্ডটা পড়ার ফলে তাঁর প্রতি আমার সন্দেহ আরও প্রবল হওয়ার কথা। কিন্তু এটাই অদ্ভুত ব্যাপার জয়ন্ত, চালাকির মাত্রাটা বেশি হলেই চালাক নিজের ফাঁদে নিজেই পড়ে। কার্ড লোকে বুকপকেটে রাখে। সুদর্শনবাবুর বুকপকেটে ভিড়ের মধ্যে কার্ডটা সে ঢুকিয়ে দিতেও পারত। তা দেয়নি। কারণ সে চেয়েছিল, কার্ডটা মহালক্ষ্মীর ফোটোর সঙ্গে থাকলে ওটা ছিটকে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য।
–তা হলে সে জানত সুদর্শনবাবুর ব্যাগে মহালক্ষ্মীর বাঁধানো ছবি আছে?
–নিশ্চয়ই জানত।
–কর্নেল! এবার বলুন ভোঁদার মুখে শোনা বাঁছুবাবুটি কে?
–তুমি সুখরঞ্জনবাবু বা ঠাকমশাইকে জিগ্যেস করোনি কেন?
–ঠিক আছে। খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করব। কাঞ্চনবাবু আপনাকে যার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন, তিনি নিশ্চয় সেই লোক।
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–গ্যারান্টি দিতে পারছি না।
–তার মানে এটা আপনার ট্রাম্পকার্ড। তুরুপের তাস?
কর্নেল চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিলেন। কিছুক্ষণ পরে বাইরে থেকে সাড়া দিয়ে সুখরঞ্জনবাবু বললেন,–আসতে পারি স্যার?
বললুম,–আসুন সুখরঞ্জনবাবু!
–আপনারা কখন ডিনার খাবেন জানতে এলুম!
কর্নেল বললেন, শীতের রাত্রে আপনাদের কষ্ট দেব না। নটায় খেয়ে নেব।
সুখরঞ্জনবাবু চলে যাচ্ছিলেন। বললুম,–একটা কথা সুখরঞ্জনবাবু!
–বলুন স্যার?
–তখন ভোঁদা আপনার ক্লাসফ্রেন্ড কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে কাকে দেখেছিল, তা-ই নিয়ে কর্নেলসায়েবের সঙ্গে আমার তর্ক হয়েছে। কর্নেল বলছেন, ভদ্রলোকের নাম বাঞ্ছাবাবু। লোকে বলে বাঙ্কুবাবু। আমি বলছি বাচ্চুবাবু। কারটা ঠিক?
সুখরঞ্জনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন,–কনকপুরে বাঙ্কুবাবুও আছেন। বাচ্চুবাবুও আছেন। বাঙ্কুবাবুর নাম বাঞ্ছারাম দত্ত। নামকরা ব্যবসায়ী। আর বাচ্চুবাবুর নাম বিশ্বনাথ সিংহ। বাচ্চুবাবু হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ভোঁদাকে নিয়ে প্রবলেম আছে স্যার। ও কার নাম বলছে, তা বোঝার সাধ্য কারও নেই। লোকটিকে দেখিয়ে দিলে তবে বোঝা যাবে ভোঁদা কার নাম বলছে।
-কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে দুজনের মধ্যে কার সম্পর্ক থাকতে পারে?
-কাঞ্চন বড় চাকরি করে। সায়েব সেজে থাকে, তা-ও শুনেছি। সে ওই দুজনের সঙ্গে এক রিকশোতে বসে কোথায় যাবে? ভোঁদার একটা বদভ্যাস আছে স্যার। ওর সামনে কারও কথা নিয়ে আলোচনা করলে ও বলবে, তাকে অমুক জায়গায় দেখেছে।
কর্নেল হাসলেন। –ভোঁদা দিব্যদর্শী!
আজ্ঞে স্যার! ছেলেটা এমনিতে খুব ভালো। সরল। বিশ্বাসী। শুধু একটাই দোষ। বিশ্বসুন্ধু লোককে ও চেনে।–বলে সুখরঞ্জনবাবু হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গেলেন।
একটু পরে বললুম,–কর্নেল! সুখরঞ্জনবাবু দুটো গুলি ছুঁড়ে গেলেন। টার্গেটে কোনটা বিঁধল!
কর্নেল আস্তে বললেন, কোনওটাই টার্গেটে বেঁধেনি।…
প্রচণ্ড শীতের আরামও আছে। সকাল আটটায় আমার ঘুম ভেঙেছিল ঠাকমশাইয়ের ডাকে। তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট। ঠাকমশাই বিনীতভাবে বললেন–বড়সায়েব বলে গেছেন, আপনি বেড-টি খান।
বিছানায় বসে বেড-টি খাওয়ার মতো আনন্দ আর কীসে আসে, বিশেষ করে এমন শীতের সময়? চা নিয়ে বললুম,–বড়সায়েব কখন বেরিয়েছেন!
–আজ্ঞে সেই ছটায়। ফ্লাস্কে কফি তৈরি রেখেছিলুম। উনি ভোঁদাকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন!
–সুখরঞ্জনবাবু কী করছেন?
–উনি নৌকোর ব্যবস্থা করতে গেছেন। বড়সায়েব গতরাত্রে নৌকোর কথা বলছিলেন না?
বলে বাসুদেব ঠাকুর চলে গেলেন। তারপর বাথরুমে গিয়ে দাড়ি কামিয়ে বেরুলুম। রাত-পোশাক ছেড়ে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরে বারান্দায় গিয়ে বসলুম। নীল কুয়াশা দূরে সরিয়ে রোদ নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে, যতদূর দেখা যায়।
ন’টা নাগাদ কর্নেল ফিরে এলেন। সঙ্গে অনুগত ভোঁদা। কর্নেল ওপরে এসে যথারীতি সম্ভাষণ করলেন,–মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
–মর্নিং বস! আশা করি আজ কোথাও আরেক রাউন্ড ফায়ার করার দরকার হয়নি?
কর্নেল হাসলেন। ভেঁদা আজ সত্যি একটা বনমুরগি আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু তাকে নিরাশ হতে হয়েছে। ওকে বললুম, দেখছ না বেচারা রোগে ভুগে আধমরা হয়ে গেছে?
বলে তিনি ঘরে ঢুকলেন। বাথরুম সেরে তিনি শুধু প্যান্টটা বদলে নিলেন। হান্টিং বুট ব্রাশ দিয়ে সাফ করলেন। টুপি থেকে মাকড়সার জালের ছেঁড়া কিছু অংশ সাফসুতরো করে বললেন,–এখনও সুখরঞ্জনবাবু ফেরেননি। দেখা যাক। ঠাকমশাইকে বলে এলুম, দশটায় ব্রেকফাস্ট করার পর কফি খাব।
সুখরঞ্জনবাবু ফিরে এলেন প্রায় আধঘন্টা পরে। খবর দিলেন,–ছই নৌকো পাওয়া গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এসে যাবে। ওই যে বাঁধের ডাইনে খাল আছে, ওই খাল বেয়ে আসবে। বড্ড বেশি দর হাঁকছিল বেচু। ষাট টাকায় রফা হয়েছে।
ব্রেকফাস্টের পর কফি খাওয়া হল। কর্নেলের কথামতো আবার ফ্লাস্কভর্তি কফির ব্যবস্থা করলেন ঠাকমশাই। লক্ষ করলুম, একটা খাবার প্যাকেটও তৈরি হয়ে আছে। ভোঁদা খালের ধারে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। পৌনে এগারোটায় সে থপথপ করে ভালুকের মতো হেঁটে এসে খবর দিল, নৌকো এসে গেছে।
নৌকোটা ছোট। বেচুমাঝি কর্নেলকে হাঁ করে দেখছিল। কর্নেল বললেন, “তোমার নাম বেচু?
–আজ্ঞে হুজুর!
–তোমার নৌকোয় তো হাল বা দাঁড় নেই দেখছি!
বেচু একটু হেসে বলল,–ওসবের দরকার হয় না হুজুর। এই যে লগি দেখছেন, এই যথেষ্ট। নৌকো তো ড্যামে ঢুকবে না। এই খাল দিয়ে গিয়ে ডাকিনিতলার ঝিলে পড়বে। ঝিলে তত বেশি জল নেই। তারপর আবার খাল। হুজুর কালুখালি যাবেন শুনলুম। তা আজ্ঞে, দু-ঘণ্টা তো লাগবে।
নৌকোয় ছইয়ের সামনে বসলেন কর্নেল। ভোঁদা বসল তার সামনে নৌকোর ডগায়, আমি ছইয়ের মুখে বসলুম। বেচু ভোঁদাকে চেনে দেখে অবাক হইনি। সে ভোঁদাকে বলল,–এই ভোঁদারাম! তোর নীচে ফাঁক দিয়ে দ্যাখ, একখানা দা আছে। বের করে হাতে রাখ। হুজুরদের মাথায় ঝোঁপঝাড়ের ডাল-লতাপাতা ঠেকতে পারে। আগেই দায়ে কেটে ফেলবি।
ভোঁদা নৌকোর তলা থেকে একটা লম্বা চকচকে দা বের করে রাখল। তার মুখে হাসি।
কর্নেল মুখে ভয়ের ছাপ ফুটিয়ে বললেন,–কী সর্বনাশ! দেখো বাবা ভোঁদা, যেন আমার মাথায় কোপ দিয়ো না।
ভোঁদা বলল,–নাঁ ছাঁর! এ কাঁছ খুঁব পাঁরি। আঁমি নাঁ? আঁমি আঁমনার ছাঁর উলথোঁ দিকে বঁসে নাঁ? কোঁপ–কোঁপ মাঁরব!
নৌকোর পিছনে দাঁড়িয়ে বেচু লগি ডুবিয়ে ঠেলে দিল। তারপর কখনও ছইয়ের বাঁ-পাশ, কখনও ডানপাশ দিয়ে হেঁটে নৌকো এগিয়ে নিয়ে চলল। একটু পরে কর্নেলকে চাপাস্বরে ইংরেজিতে বললুম–অন্য একটা কাজে এসে নিজের বাতিকে মেতে উঠলেন! হালদারমশাইয়ের জন্য আমার উদ্বেগ হচ্ছে! আপনার এই জলজঙ্গলে নৌযাত্রা কি পরে করা যেত না?
কর্নেল চুরুট টানছিলেন। ধোঁয়া ছেড়ে ইংরেজিতে বললেন,–জয়ন্ত! সব চেয়ে সেরা রহস্য প্রকৃতির ভিতরে লুকিয়ে আছে।
–কিন্তু এটা ক্লান্তিকর। একঘেয়ে!
–প্রকৃতিতে কত বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে তুমি জানো না!
সেই সময় খালের ওপর ঝুঁকে পড়া ঝোঁপের ডালে ভেঁদা দায়ের কোপ মারতেই কী একটা পাখি উড়ে গেল। কর্নেল বাইনোকুলার তুলে দেখে নিয়ে উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন,–উডডাক! জয়ন্ত! দেখলে তো?
উডডাক দুর্লভ প্রজাতির পাখি। অবিকল হাঁসের মতো দেখতে। কিন্তু এ পাখি জলচর নয়। কর্নেলের পাল্লায় পড়ে উডডাকের কথা শুধু শুনেছি তা-ই নয়, তার পিছনে কতবার পাহাড়ি বনজঙ্গলে হন্যে হয়ে ঘুরেছি। ভোঁদা তার ভাষায় কী সব আওড়াল বুঝলুম না।
বেচু বলল,–ভাগ্যি ভালো হুজুর! এখন শীতের সময়। অন্যসময় হলে সাপের দেখাও পাওয়া যেত!
কর্নেল বললেন, তুমি কোথায় থাকো?
–শেতলপুরে হুজুর! ওই যে বলছিলুম ডাকিনিতলার ঝিল। তার কাছাকাছি। এই খাল বেয়ে নৌকো আনা সহজ নয় আজ্ঞে! সুখরঞ্জনবাবু বললেন, কলকাতা থেকে সায়েবরা এসেছেন। তাই-অ্যাই ভোঁদা!
ভোঁদা খালে ঝুঁকে পড়া লতাপাতার একটা ঝালর কেটে ফেলল।
কর্নেল বললেন,–ওহে বেচু! তা হলে দেখছি, জঙ্গলের এই খাল বেয়ে নৌকো আনতে তোমার খুব কষ্ট হয়েছে।
বেচু হাসল,–আমার কী কষ্ট বড়হুজুর? আমি পাঁচখালি তল্লাটের লোক। কনকপুর তল্লাটের লোকে আমাদের বলে বুনো। আই ভোঁদা!
ভেঁদা দুদিক থেকে খালে ঝুঁকে পড়া ডাল-লতাপাতায় কোপ মারল। কর্নেল বললেন,–ভোঁদা তুমি এদিকে সরে এসো। আমাকে দা-খানা দাও! যা বলছি শোনো!
বেচু মজা পেয়ে হেসে উঠল। আমি বললুম,–বেচু! উনি একসময় মিলিটারিতে ছিলেন। মিলিটারি বোঝো?
-বুঝব না কেন ছোটহুজুর? পাঁচখালি থেকে বাংলাদেশের বডার তত দূরে নয়। ছোটবেলা থেকে আঁকে-ঝাঁকে মিলিটারি দেখেছি।
কর্নেলকে দেখিয়ে বললুম,–ইনি সেই মিলিটারি অফিসার। ইনি কর্নেলসায়েব। জঙ্গলে-পাহাড়ে যুদ্ধ করে জীবন কাটিয়েছেন। জঙ্গলের মধ্যে যুদ্ধ করতে হলে ঝোঁপঝাড় কেটে এগোতে হয়। কাজেই এ কাজে ওঁর হাত পাকা।
বেচু আরও সমীহ করে বলল, “আজ্ঞে! সুখরঞ্জনবাবু যেন তা-ই বলছিলেন বটে! হ্যাঁ, হ্যাঁ। কল্লেলসায়েব!
ভোঁদা ভুতুড়ে হাসি হেসে বলল,–আঁমি দাঁনি-দাঁনি! কঁনেল সাঁয়েম!
তার ‘কঁনেল সাঁয়েম’ তখনই ডানধারের উঁচুগাছ থেকে ঝুলে পড়া লতার একটা বিশাল ঝালর প্রায় নিঃশব্দে কেটে ফেললেন। আমি জানি ওঁর পিঠে আঁটা কিটব্যাগে ভাঁজ করা ধারালো জঙ্গল-নাইফ আছে, তবে বেচুর দা তার চেয়ে সাংঘাতিক।
ওয়াটারড্যামের উঁচু বাঁধ বাঁদিকে রেখে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর নৌকো চলল ডানদিকে। জঙ্গলের ভিতরে শীতের ঝরাপাতার স্তূপ দেখা যাচ্ছিল। প্রায় এক ঘন্টা ক্লান্তিকর যাত্রার পর বেচু বলল,ডাকিনিতলার ঝিলের কাছে এসে পড়েছি হুজুর!
কিছুক্ষণ পরে সামনে বিশাল আকাশ চোখে পড়ল। ঝিলের গড়ন ধনুকের মতো বাঁকা। কোথাও-কোথাও ঘন কচুরিপানার ঝক। কর্নেল বললেন,–এবার কফির তৃষ্ণা পেয়েছে। ভোঁদা ওই ব্যাগটা এগিয়ে দে বাবা! জয়ন্ত! তুমি ব্যাগ থেকে কাপটা বের করো। ভোঁদা কফি খেতে পারে না। ওকে আর বেচুকে বরং বিস্কুট বের করে দাও।
দুরে ধানখেত আর ধূসর গ্রাম চোখে পড়ছিল। কফি খেতে-খেতে রোদে এতক্ষণে চাঙ্গা হয়ে উঠলুম। ঝিলের জলের একধারে কোথাও জাল পাতা আছে। ডাইনে উঁচু জমির উপর মাঝে-মাঝে কয়েকঘর করে বসতি দেখা যাচ্ছিল। ঝিলের ঘাটে ছেলেমেয়েরা জল ছিটিয়ে স্নান করছিল। আমাদের দেখে–অবশ্য কর্নেলকে দেখেই বলা উচিত, নিস্পন্দ পুতুল হয়ে যাচ্ছিল।
তারপর আবার একটা কচুরিপানাভরা খালে নৌকো ঢুকল। কর্নেল বাইনোকুলারে একটা গাছের ডালে সারসের ঝাক দেখার পর দ্রুত ক্যামেরার টেলিলেন্স ফিট করে ফেললেন। তারপর কয়েকটা ছবি তুললেন। ঘাটে বাঁধা ঘোট-ঘোট নৌকো কোথাও। বিদেশি ছবিতে দেখা অবিকল ক্যাননা। সেই ক্যানো বেয়ে চলেছে কোনও মেয়ে। কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলুম,–এখানে ক্যাননা দেখছি! আশ্চর্য তো!
কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন শুধু। বেচু বলল, “হুজুর! ওগুলোকে বলে ডোঙ্গা। তালগাছের গুঁড়ি খোদাই করে তৈরি।
আবার একটা খালে নৌকো ঢুকল। দুধারে ঘন জঙ্গল। কর্নেল বললেন,–বেচু! কালুখালি আর কতদূর?
বেচু বলল,–এসে গেছি বড়হুজুর। এই খাল থেকেই কালুখালি গ্রাম। সামনে যে বাঁক দেখছেন, তার মুখেই ডাইনে-বাঁয়ে দুটো বসতি।
-তুমি দশরথকে চেনো?
কথাটা শুনেই চমকে উঠলুম। বেচু বলল,–খুব চিনি বড়হুজুর। দশরথ কেন যে এখানে পড়ে আছে কে জানে? ওর হাতের বেতের কাজ কলকাতা অব্দি একসময় চালান যেত। কনকপুরের দত্তবাবুরা ওকে দিয়ে নৌকোবোঝাই মাল নিয়ে যেতেন। তা হুজুর, দশরথের অবিশ্যি দোষ নেইকো। বুড়ো হয়ে গেল। এ তল্লাটে বেতের জঙ্গলও কমে এল। বড়জোর ধামা, চুপড়ি এইসব জিনিস তৈরি করে ওরা কনকপুরে চৈত-সংক্রান্তির গাজনের মেলায় বেচতে যায়। এ সব জিনিস সরু বেতে তৈরি হয়। আগে দশরথরা তৈরি করত মোটা বেতের চেয়ার-টেবিল। এখন অমন বেত খুঁজে পাওয়াই কঠিন।
বাঁকের মুখে গিয়ে ডানদিকের ঘাটে নৌকো রাখল বেচু। একটা গাছের গুঁড়িতে দড়ি দিয়ে নৌকোর ডগার দিকটা বেঁধে দিল। কর্নেল একলাফে নেমে গিয়ে বললেন,–ভোঁদা! ব্যাগটা নিয়ে এসো।
নৌকোর ডগা টলমল করছিল। বেচু তার বাঁশের লগি আমাকে ধরতে বলল। টাল সামলে নেমে গেলুম। কর্নেল বললেন, বেচু! তুমি তোমার নৌকোয় বসে থাকে। আমরা বেশি দেরি করব না।
ঘড়ি দেখলুম। একটা বেজে গেছে। ঢালু পাড় বেয়ে উপরে উঠে দেখি, একদল নানাবয়সি নর-নারী, কাচ্চা-বাচ্চা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল একজনকে বললেন, দশরথ কোথায়?
অবাকচোখে কর্নেলকে সবাই দেখছিল। যে লোকটাকে কর্নেল দশরথের কথা জিজ্ঞেস করলেন, সে শুধু আঙুল তুলে একটা কুঁড়েঘরের সামনে একটা গাছের তলায় বাঁশের মাচানে বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখাল।
আমরা তার কাছে যেতেই সে চোখ তুলে তাকাল। কর্নেল বললেন, তুমি দশরথ?
দশরথের পরনে খাটো ধুতি। খালি গা। মোটাসোটা মানুষ। সে বলল,–কে বলছেন আজ্ঞে? চোখে ভালো দেখতে পাইনে।
সেই লোকটা বলল,–দুই সায়েব তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন দাশুখুড়ো! কর্নেল বললেন,–কলকাতা থেকে এসেছি!
দশরথ মাচা থেকে নেমে ঝুঁকে প্রণাম করে বলল, আমার সৌভাগ্য সার! ও রঘু! সারদের বসতে দে। মাদুরখানা এনে মাচানে পেতে দে শিগগির!
কর্নেল দশরথের কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না দশরথ! আমি বসব না। শোনো! আমার এক বন্ধুর হাতে তোমার তৈরি ছড়ি দেখেছিলুম। সেই ছড়ি দেখে আমার খুব লোভ হয়েছে। বুঝলে? মোটা বেতের ছড়ি। মাথার দিকটা ছাতার বাঁটের মতো বাঁকানো। কালো রঙের বাঁট। বাঁটটা ঘোরালে খুলে যায়। কনকপুরের জমিদারবাড়ির সুদর্শনবাবুকে তুমি ওইরকম একটা ছড়ি তৈরি করে দিয়েছিলে। তাই না?
–আজ্ঞে সার! বুঝেছি! তবে ওরকম বেত খুঁজে পাওয়া আজকাল কঠিন!
–তোমাকে আমি অগ্রিম পুরো টাকাই দিয়ে যাব। বলো, কত টাকা দিতে হবে।
দশরথ হাসবার চেষ্টা করে বলল,–কথা দিয়ে যদি কথা রাখতে না পারি সার?
–তুমি পারবে। ওইরকম বেত খুঁজতে হলে তুমি এ বয়সে একা তো পারবে না।
–আজ্ঞে! আমার নাতি কানু এসব খোঁজখবর রাখে!
–তাকে বখশিস দেব। কোথায় সে?
একজন লোক বলল,–কানু আমার ছেলে সার। উনি আমার বাবা। কানু বেত কাটতেই গেছে। আমাদের সার বেত নিয়েই কাজ। দলবেঁধে ওরা জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। খুব কষ্টের কাজ।
কর্নেল আমাকে অবাক করে দশরথের হাতে একটা একশোটাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, –একশোটাকা রাখো। ছড়ি তৈরি হলে তোমার নাতিকে দিয়ে ইরিগেশন বাংলোর সুখরঞ্জনবাবুকে পৌঁছে দিয়ো। উনি আমাকে কলকাতায় ছড়িটা পৌঁছে দেবেন। ইরিগেশন বাংলো তুমি নিশ্চয় চেনো?
দশরথকে চঞ্চল দেখাচ্ছিল। সে বলল,–চিনি বইকি সার! তবে আগাম টাকা–
কর্নেল তাকে বাধা দিয়ে বললেন,–টাকা নিয়ে ভেবো না। শুনেছি তুমি কমাস আগে কনকপুরের এক ভদ্রলোককেও ওইরকম ছড়ি তৈরি করে দিয়েছ?
দশরথ হাসল।–আজ্ঞে সার! দিয়েছি বটে। অনেক খুঁজে মোটা বেতখানা পেয়েছিলুম।
–কী যেন নাম ভদ্রলোকের?
–দত্তবাবু। বাঞ্ছারাম দত্ত। দশ-বারো বছর আগে ওনাকে মোটা বেতের চেয়ার-টেবিল তৈরি করে দিতুম। নৌকো বোঝাই করে নিয়ে যেতেন। কলকাতায় চালান দিতেন।….
সেচবাংলোয় ফিরতে বিকেল চারটে বেজে গিয়েছিল। সুখরঞ্জনবাবু কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, দশরথের সঙ্গে দেখা হল স্যার? কী বলল?
কর্নেল বললেন,–অ্যাডভান্স দিয়ে এসেছি। ছড়ি তৈরি হলে আপনার কাছে পৌঁছে দেবে। আপনি যখন সময় পাবেন, কলকাতা গেলে আমাকে দিয়ে আসবেন।
আমি বলেছিলুম,লোকটা এখনও গরিব থেকে গেছে কেন, বোঝা গেল না!
সুখরঞ্জনবাবু বলেছিলেন,–বন্যা স্যার! দু-একটা বছর অন্তর বন্যা! বন্যায় ওদের ঘর-সংসারের সবকিছু ভেসে যায়। তবু ওখানে না থেকেও ওদের উপায় নেই। শুধু বেত নয়, ওই এলাকায় বাঁশঝাড়ও প্রচুর। বাঁশ থেকেও ওরা কতরকম জিনিস তৈরি করে। বাঁশ অবশ্য কিনতে হয়। বেত কিনতে হয় না। তবে স্যার বলতে নেই–এই ওয়াটারড্যাম করেই বন্যা বেড়ে গেছে। বেশি বৃষ্টি হলেই জল ছেড়ে দেওয়ার অর্ডার আসে। হিতে বিপরীত হয়েছে। তা স্যার, আপনাদের খাওয়াদাওয়া?
কর্নেল বলেছিলেন,–ডাকিনিতলার ঝিলের ধারে নৌকো বেঁধে লুচি-আলুরদমের শ্রাদ্ধ করেছি। বেচু অবশ্য কাছেই তার বাড়িতে খেতে গিয়েছিল।
সুখরঞ্জনবাবু পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, চাপাগলায় বলেছিলেন, দুপুরে কনকপুর বাজারে গিয়েছিলুম। রানিপুরের একজন চেনা ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার কাছেই একটা সাংঘাতিক কথা শুনলুম স্যার!
-সাংঘাতিক কথা মানে?
-কাঞ্চনকে কলকাতায় কারা নাকি মার্ডার করেছে। আজ সকালে ওর দাদা প্রাণকান্তবাবুর কাছে খবর এসেছিল। উনি খবর পেয়েই কলকাতা গেছেন।
-বলেন কী? কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে আমার তত বেশি চেনাজানা ছিল না। কিন্তু ভদ্রলোক খুন হয়ে গেলেন! আশ্চর্য তো!
–স্যার! আমিও খুব অবাক হয়েছি। খারাপ লাগছে। আফটার অল একসময় আমার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। একটু চাপা স্বভাবের ছেলে ছিল। তবে ওকে ব্যাড বয়দের দলে ফেলা যেত না।
–যাকগে! আমরা ক্লান্ত। ঠাকমশাইকে কফির তাগিদ দিন। হ্যাঁ–একটা কথা শুনে যান। আপনাদের ভোঁদার কানে যেন ওই খারাপ খবরটা না পৌঁছয়।
–আমার মাথাখারাপ স্যার? ভোঁদা বলছিল, কদিন আগে নাকি তাকে কার সঙ্গে কনকপুর বাজারে দেখেছে! ভেঁদার স্বভাব বড় বাজে। পুলিশের কানে গেলে ওকে লক-আপে ঝোলাবে না?
-–ঠাকমশাই রানিপুরের লোক। তাকে বলেছেন নিশ্চয়?
–বলেছি। উনিও অবাক।
–উনি ভোঁদার কানে খবরটা তুলবেন না তো?
সুরঞ্জনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, আমি অলরেডি ঠাকমশাইকে সাবধান করে দিয়েছি।
–বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছেন।
সুখরঞ্জনবাবু চলে গিয়েছিলেন। আমি বাথরুমে ঢুকে গরমজলে হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছিলুম। কিছুক্ষণ পরে বারান্দা থেকে কর্নেল ডাকলেন,–জয়ন্ত! কফি! নার্ভ চাঙ্গা করে নাও।
বারান্দায় গিয়ে বসলুম। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম,–প্রশ্নটা করার সুযোগ পাইনি। হঠাৎ আপনার মাথায় বেতের ছড়ির বাতিক চাগিয়ে উঠল কেন? আপনার ঘরে অনেক সুন্দর ছড়ি দেখেছি।.একটাও ব্যবহার করতে আজ পর্যন্ত দেখিনি। সুদর্শনবাবুর ছড়িটা নেহাত ছড়ি।
–কুটিরশিল্পের সৌন্দর্য তুমি বুঝবে না জয়ন্ত! তাই ও নিয়ে কোনো কথা নয়। কফি খেয়ে তৈরি হয়ে নাও। বেরুব।
–সর্বনাশ! আবার কোথায় যাবেন?
–কনকপুর!
–পায়ে হেঁটে!
–পায়ে হেঁটে। নৌকোয় পাঁচ-ছঘণ্টা বসে পায়ে বাত ধরে গেছে। পেশি সচল করা দরকার।
–কিন্তু এখনই তো সন্ধ্যা হয়ে এল!
–তাতে কী? কনকপুর পর্যন্ত দুধারে লাইটপোস্ট আছে। ওই দেখো, আলো জ্বলে উঠল।
–কাল সন্ধ্যায় এই আলোগুলো জ্বলতে দেখিনি!
বোধহয় বিদ্যুতের যে ফেস থেকে এই রাস্তার আলো জ্বলে, সেটা খারাপ ছিল। যাই হোক, আলো নিয়ে আলোচনায় লাভ নেই। কর্নেল হাসতে-হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ঘরে গিয়ে বললেন,–টর্চ নেবে। লোডেড ফায়ার আর্মস সঙ্গে নেবে।
ভিতরে গিয়ে বললুম,–আপনার সেই বনমুরগি বাঁদিকের বন থেকে সাড়া দেবে না তো?
কর্নেল হাসলেন। কাল এসেই বাইনোকুলারে দেখে হিসেব করে নিয়েছি। কনকপুরগামী পিচরাস্তা থেকে বাঁদিকের জঙ্গলের দূরত্ব অন্তত একশো মিটারের বেশি। ডানদিকে অনেকদূর অবধি ধানক্ষেত। তারপর কনকপুরের আগে ডানদিকে বিদ্যুতের সাবস্টেশন। আলোয়-আলোয় ছয়লাপ। তার চেয়ে বড় কথা, চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানির এজেন্ট কাঞ্চন সেন খুন হয়ে যাওয়ার খবর ইতিমধ্যে রটে গেছে। আর কিছু বলার দরকার আছে কি?
–নাঃ! আমাদের প্রতিপক্ষ সতর্ক হয়ে গেছে।…
ভোঁদা আমাদের সঙ্গী হতে চেয়েছিল। সুখরঞ্জনবাবুও বলেছিলেন,–ওকে নিয়ে যান স্যার। যেখানে যেতে চান, ও সেখানে পৌঁছে দেবে। রিকশাওয়ালারা কাছের জায়গাকে দূর বানিয়ে ছাড়বে।
কর্নেল বললেন,–কনকপুর আমার চেনা জায়গা। ভোঁদাকে দরকার হবে না।
প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা একেবারে জনহীন। বিদ্যুতের সাবস্টেশন পেরিয়ে গিয়ে বাঁদিকে খেলার মাঠ। ক্রিকেট ব্যাট হাতে একদল ছেলে তখনও দাঁড়িয়ে কী নিয়ে তর্কাতর্কি করছে। ডাইনে দোতলা বাড়িটার শীর্ষে আলো জ্বলছিল দেখলুম, বড়-বড় হরফে লেখা আছে ‘ফণিভূষণ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়’।
একটু পরে মানুষজন আর সাইকেলরিকশোর আনাগোনা দেখা গেল। একটা সাইকেলরিকশো দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন,–থানায় যাব।
রিকশোওয়ালা বলল,–দশ টাকা লাগবে সার!
কর্নেল উঠে বসলেন। তার তাগড়াই গড়নের জন্য পুরো গদিটাই দরকার ছিল। ঠাসাঠাসি চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে বসলুম। কর্নেল রিকশোর হুড তুলে দিলেন। বসতি এলাকার বড় রাস্তায় এই শীতসন্ধ্যাতেও যানবাহন আর মানুষের ভিড়। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ছোট রাস্তায় একটার পর একটা আঁক নিতে-নিতে যেখানে পৌঁছলুম, সেখানে ঘন বসতি নেই। গাছপালার ফাঁকে বাড়িগুলোকে দেখে সরকারি অফিসের কোয়ার্টার মনে হচ্ছিল। তারপর একটা চওড়া রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে রিকশো থামল। রিকশোওয়ালা বলল,–এসে গেছি সার!
ডাকদিকে থানার গেট। গেটে বেয়নেট লাগানো বন্দুক হাতে সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে ছিল। আগে কর্নেল, তারপর আমি নামলুম। রিকশাওয়ালা টাকা পেয়ে সেলাম ঠুকে বলল,–সায়েবদের দেরি না হলে আমি এখানে অপেক্ষা করব। বলুন সার!
কর্নেল বললেন, তুমি চলে যাও। আমাদের অনেক দেরি হবে।
রিকশোওয়ালা রিকশো ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে সদর দরজায় পৌঁছে কর্নেল বেঞ্চে বসে থাকা একজন কনস্টেবলকে বললেন,–ও, সি. মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কনস্টেবল তর্জনী তুলে কোনার একটি ঘর দেখিয়ে দিল। সেই ঘরের দরজার পর্দা তুলে কর্নেল বললেন,–আসতে পারি? আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।
–আপনিই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার? আসুন! আসুন স্যার!
কর্নেলের সঙ্গে ভিতরে ঢুকলুম। কর্নেল তাঁর নেমকার্ড এগিয়ে দিলেন। টেবিলের ওধারে একজন মধ্যবয়সি উর্দিপরা অফিসার কার্ডটি দেখার পর উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কর্নেলের সঙ্গে করমর্দন করলেন। সামনের চেয়ারে একজন ধুতিপাঞ্জাবি পরা স্থূলকায় ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর গায়ে শাল এবং মাথায় মাফলার জড়ানো। তিনি কর্নেলকে দেখছিলেন। কর্নেল বললেন,–পরিচয় করিয়ে দিই। আমার তরুণ বন্ধু সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি আমার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, আপনারা বসুন প্লিজ! তারপর সেই ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে তিনি বললেন, ঠিক আছে অমলবাবু! আমি দেখব কী করা যায়। আপনি কাল বেলা এগারোটার পর একবার টেলিফোন করবেন। আসবার দরকার নেই। নমস্কার।
ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন। তার কাছাকাছি বাঁদিকের চেয়ারে একজন পুলিশ অফিসার ফাইল হাতে বসেছিলেন। মিঃ ভাদুড়ি বললেন, রমেনবাবু! স্বনামধন্য কর্নেলসায়েবের কথা আপনাকে বলেছি। আপনি গেস্টদের পথ্য কফি আর স্ন্যাকসের ব্যবস্থা করুন। ফাইল রেখে যান।
রমেনবাবু তখনই উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে কর্নেলকে তারপর আমাকে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন। তারপর মিঃ ভাদুড়ি বললেন, পুলিশ সুপারের মেসেজ পেয়েছি আজ দুপুরে। বিকেলে ভাবছিলুম, ইরিগেশন বাংলোয় আপনার সঙ্গে দেখা করে আসব। আসলে আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল। ও. সি. হাসলেন। আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলুম আমার এক কলিগের কাছে। তিনি আই. বি.-তে ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–গুজবে কান দেবেন না। তো প্রথমেই একটা কথা জেনে নিই। কলকাতা থেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার এসেছেন। উনি কি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন?
-হ্যাঁ স্যার! আজ দুপুরে এসেছিলেন উনি। ওঁকে প্রয়োজনে সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছি। উনি তো একেবারে ঘটনাস্থলে গেস্ট হয়ে আছেন। ওঁকে সাবধানে থাকতে বলেছি। উনি একটা লোকের চেহারা আর পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন। আমাদের সোর্সকে বলেছি, তাকে শনাক্ত করবে।
-আর-একটা কথা। আপনার এরিয়ায় রানিপুর গ্রামের এক ভদ্রলোক কলকাতায় চাকরি করতেন। কলকাতায় তার ঘরেই কেউ তাকে গত পরশু রবিবার সন্ধ্যায় মার্ডার করেছে।
মিঃ ভাদুড়ি আস্তে বললেন,–হা স্যার। ডি. আই. জি. সায়েবের মাধ্যমে একটা কেস ফাইল হয়েছিল। পুলিশ সুপার ফাইলটা আমার কাছে পাঠিয়েছেন।
-কাঞ্চন সেন সম্পর্কে?
ও. সি. একটু হেসে বললেন, আপনি সম্ভবত আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন স্যার!
–জানি না। শুধু জানতে চাইছি, কাঞ্চনবাবু সম্পর্কে খোঁজখবর আপনারা নিয়েছেন কি না।
–কাঞ্চনবাবু ক’দিন আগে কনকপুর এসেছিলেন। আমাদের সোর্স থেকে এ খবর পেয়েছি।
এই সময় একজন কনস্টেবল ও সেই পুলিশ অফিসার ট্রেতে কফি আর পটাটোচিপস, চানাচুর নিয়ে এলেন। ও. সি. বললেন, রমেনবাবু! আমরা কিছু কনফিডেনশিয়াল কথা সেরে নিই। কেমন?
রমেনবাবু ও কনস্টেবলটি তখনই বেরিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, –আমার ধারণা, মিঃ হালদার যে লোকটির পরিচয় জানতে চেয়েছেন, রায়বাড়িতে তার অবাধ গতিবিধি আছে। তা ছাড়া, লোকটা সম্ভবত স্থানীয় ব্যবসায়ী বাঞ্ছারাম দত্তের কর্মচারী। আমার ধারণার ভিত্তি আছে মিঃ ভাদুড়ি।
মিঃ ভাদুড়ি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আস্তে বললেন,–আই সি!
–আরও বলছি। সে রবিবার সকালের ট্রেনে কলকাতা গিয়েছিল। সেদিন সে কলকাতায় ছিল। সন্ধ্যায় কাঞ্চন সেনকে খুন করে সে সেই রাত্রে কনকপুরে ফিরে এসেছিল। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, আমি তাকে দেখেছি।
–মাই গুডনেস! কোথায় দেখেছেন তাকে?
–গতকাল বিকেলে ইরিগেশন বাংলো থেকে ওয়াটারড্যামের বাঁধের পথে আমি যাচ্ছিলুম। আমার সঙ্গে বাংলোর ভোঁদা নামে একটি ছেলে ছিল। লোকটা আমাকে গুলি করে মারার জন্য ডানদিকের ঢালু জমিতে ঝোঁপের আড়ালে বসে পড়ার আগেই তাকে আমি দেখে ফেলেছিলুম। আমার সামরিক জীবনের অভ্যাস মিঃ ভাদুড়ি! বিশেষ করে বনজঙ্গলে চলার সময় আমি ১৮০ ডিগ্রি বরাবর নজর রাখি।
-তারপর?
–সে তৈরি হওয়ার আগেই আমার লাইসেন্সড সিক্সরাউন্ডার রিভলভার থেকে ঝোঁপের গোড়ায় এক রাউন্ড ফায়ার করেছিলুম। অমনই সে গুঁড়ি মেরে ঝোঁপের আড়াল দিয়ে পালিয়ে যায়। বাইনোকুলারে একটু পরে তাকে জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে দেখি। ভোঁদা একটু বোকাসোকা। তাকে বলেছিলুম, বনমুরগি মারতে গুলি করলুম। বনমুরগিটা পালিয়ে গেল।
-ও মাই গড! কর্নেলসায়েব! শয়তানটা কে আমি তা বুঝতে পেরেছি। আজ রাতেই তাকে লক-আপে ঢোকাব। আপনি প্লিজ ঘটনাটা উল্লেখ করে একটা ডায়রি করুন। কারণ তার গার্জেন প্রভাবশালী লোক।
–করছি। এবার বলুন, রায়বাড়ির গৃহদেবীর মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস চুরির কেসে কি এগোতে পারছেন না?
–সমস্যা হল, প্রাথমিক তদন্তের পর মনে হয়েছিল ওঁদের দুই ভাইয়ের মধ্যে যে-কোনো একজন চুরি করে জুয়েলস বিক্রি করে দিয়েছেন। দুই ভাইকে জেরা করা হয়েছে প্রথমে পৃথক-পৃথকভাবে। পরে দুজনকে একসঙ্গে পাশাপাশি বসিয়ে জেরা করা হয়েছে। এতটুকু সন্দেহজনক কথার আভাস মেলেনি। দ্বিতীয় দফায় ওঁদের কাজের নোক গোবিন্দ ও হরিপদকে সরাসরি অ্যারেস্ট করেছিলাম। কিন্তু তাদের কাছেও কোনো সন্দেহজনক সূত্র পাইনি। অগত্যা আপাতত জামিনে ছেড়ে দিয়েছি। তবে একটা ক্ষীণ সূত্র ওঁদের কাজের মেয়ে শৈলবালার কাছে পেয়েছিলুম। বছর তিনেক আগের কথা। সন্ধ্যা থেকেই লোডশেডিং ছিল। সুদর্শনবাবুর ঘরের তালা সেই সুযোগে কেউ ভাঙছিল। শৈলবালা নাকি চাপা শব্দটা শুনেই উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চুপি-চুপি উঠে যাচ্ছিল। সিঁড়িতে কেউ তাকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়।
–কিন্তু তারপরও তো মহালক্ষ্মীর জুয়েলস চুরি যায়নি।
–যায়নি। তবে শৈলবালার সন্দেহ, সে-ই পরে জুয়েলস চুরি করেছে।
–লোকটাকে কি শৈলবালা চিনতে পেরেছিল?
–আবছা আঁধারে লোকটাকে চেনা মনে হয়েছিল তার। কিন্তু সাহস করে কাউকে বলতে পারেনি। যদি সত্যিই সেই লোকটা না হয়?
মিঃ ভাদুড়ি হেসে উঠলেন। কর্নেল বললেন, আপনাদের কি সে বলেছে, কোন লোকটার কথা সে ভেবেছিল?
মিঃ ভাদুড়ি আরও হাসলেন। তারপর বললেন,–শৈলবালা ভেবেছিল সুদর্শনবাবুই তাকে সিঁড়িতে ধাক্কা মেরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বিদ্যুৎ আসার পর তিনিই নাকি বাড়ি ফিরে এসে হইচই বাধান!
কর্নেলও হাসলেন। –নিজেই নিজের ঘরের তালা কেন ভেঙেছিলেন সুদর্শনবাবু, এ বিষয়ে শৈলবালার কী ধারণা?
-আপনাকে বলেছি, শৈলবালার সন্দেহ অনুসারে সুদর্শনবাবুই চোর। জেরার পর শৈলবালা বলেছে, আগে থেকে নিজেকে–শৈলবালার ভাষায় ‘নিদুষি’–অর্থাৎ নির্দোষ সাব্যস্ত করে রাখার মতলবে কাজটা তাদের ছোটবাবু করে থাকতে পারেন।
-ছোটবাবু, মানে সুদর্শনবাবু?
-হ্যাঁ। শৈলবালার কথার অর্থ দাঁড়ায় : এভাবে একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করে রেখেছিলেন ছোটবাবু! পয়েন্টটা অবশ্য উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
হুঁ৷ যায় না।–কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন।–এর সঙ্গে কাঞ্চন সেনের সম্প্রতি কনকপুরে আসার ব্যাপারটা জুড়ে দিলে একটা কেস দাঁড় করানো যায়!
