রায়বাড়ির প্রতিমা রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

কর্নেল দ্রুত বললেন,–ও কথা থাক। কী খুলে বলতে চাইছিলেন, বলুন।

 

–নানা দেশের রত্নকারবারিদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। খাঁটি মুক্তো আমরা এজেন্ট মারফত কুয়েত, আবু ধাবি, কাতার এইসব আরব দেশ থেকে আমদানি করি। আপনার কাছে লুকোনোর কারণ নেই। কাস্টমসের চোখ এড়িয়ে গোপনে এই লেনদেন হয়। এজেন্টের কাছে। আমাদের কার্ড থাকে। আবার হংকংয়ে আমাদের এজেন্ট আছে। হংকং সবরকমের রত্নের বাজার। হংকংয়ের এজেন্টের কাছে আমাদের কার্ড আছে।

 

–তা হলে আপনার কোম্পানির কার্ডের একটা গুরুত্ব আছে। সেই কার্ড যে-ভাবে হোক, আমার হাতে এসে গেছে। দেখাচ্ছি, তবে কার্ডটা আপনাকে দেব না। আগেই সেটা বলে রাখলুম।

 

বলে কর্নেল বুকপকেট থেকে সেই কার্ডটা বের করে মিঃ চন্দ্রের হাতে দিলেন। মিঃ চন্দ্র কার্ডটা দেখার পর বললেন,–কী আশ্চর্য! এই কার্ডটা আমাদের কোম্পানির কার্ড। এই যে দেখছেন, তলার দিকে ছোট্ট গোল রবার সিলের ছাপ, তার উপর আমার হাতে এ এম সি সই করা আছে কালো কালিতে। এটা কোনোভাবে মোছা যাবে না। কারণ পেনের এই কালিটা বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি। কর্নেলসায়েব! এই কার্ড নিশ্চয় আমার কোম্পানির কোনো এজেন্টের কাছে ছিল। এতে একটা নাম্বার আছে, খালি চোখে তা দেখা যাবে না। হাতে সময় কম। তা না হলে নাম্বার পরীক্ষা করে রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে এই এজেন্টের নাম-ঠিকানা বলে দিতুম।

 

–এজেন্টের কার্ড দৈবাৎ হারিয়ে গেলে তিনি নিশ্চয় আপনাকে জানাবেন? মিঃ চন্দ্র জোর দিয়ে বললেন, অবশ্যই জানাবেন। কিন্তু এখনও তো কেউ জানাননি! এটাই অবাক লাগছে।

 

–তিনি বা আপনি কার্ড হারানোর জন্য পুলিশকে নিশ্চয় জানাবেন। ডায়রি করবেন থানায়।

 

মিঃ চন্দ্র হঠাৎ একটু দমে গেলেন যেন। আস্তে বললেন,–না, তার অসুবিধে আছে। কারণ আপনি আশা করি অনুমান করতে পারছেন। রত্নব্যবসায়ীদের অনেক ঝক্কি আছে। অনেকসময় এজেন্ট জেনে বা না জেনে এমন জুয়েলস বিক্রেতার খবর দিল, যিনি আয়কর ফাঁকি দিতে চান কিংবা জুয়েলস চোরাই মাল। তা ছাড়া, বিদেশ থেকে গোপনে রত্ন আমদানির কথাও আপনাকে বলেছি। কাস্টমস বা রেভেনিউ ইনটেলিজেন্সের গোয়েন্দাদের সূত্রে পুলিশ ওই এজেন্টের খবর পেলে বিপদের ঝুঁকি আছে।

 

কর্নেল তার হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে বললেন,–সব বুঝলুম। আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠি। শুধু একটা অনুরোধ। কোন এজেন্টের কার্ড কোথায় কীভাবে হারিয়েছে, সেই খবর আপনি নিশ্চয় পাবেন। পাওয়ার পর আমাকে তা জানাবেন। আমি কথা দিচ্ছি, এতে আপনাদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেই দায়িত্ব আমার। চলি মিঃ চন্দ্র। নমস্কার…..

 

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে স্নানাহারের পর ড্রয়িংরুমের ডিভানে গড়িয়ে পড়েছিলুম। ভাত-ঘুমের অভ্যাস। কর্নেল যথারীতি ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন।

 

আমার চোখে ভাসছিল, আমরা চলে আসবার সময় অবনীমোহন চন্দ্রের গম্ভীর ও উদ্বিগ্ন মুখ। এটা স্পষ্ট, তার এজেন্টরা আসলে কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করেন। অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে রিপ্রেজেন্টেটিভ। কিন্তু বিদেশি অনেক কোম্পানির মতো চন্দ্র জুয়েলার্স এজেন্ট শব্দটাই ব্যবহার করেন। তা ছাড়া, তারা চোরাই জুয়েলারিও কেনেন। কনকপুরে রায়বাড়ির গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর রত্নখচিত সোনার মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস যে-ই চুরি করুক, সুদর্শনবাবুর সঙ্গে চন্দ্র জুয়েলার্সের কোনো এজেন্ট গোপনে যোগাযোগ করেছে, নাকি সুদর্শনবাবু নিজেই সবার অগোচরে চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির এজেন্ট? অমন ধোপদুরস্ত পোশাক-আশাক আর চেহারা দেখে মনে হয় না তিনি জমিজমা সম্পত্তির দেখাশোনা করেন। চাষবাস-পুকুর-বাগান নিয়ে যাঁরা থাকেন, তাদের চেহারায় রুক্ষ ছাপ পড়তে বাধ্য।

 

উত্তেজনায় আমার ভাত-ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল। কথাটা কর্নেলকে বলার জন্য উঠে বসলুম। সেই সময় টেলিফোন বাজল।

 

কর্নেল হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। …হ্যাঁ। বলছি।… বলুন মিঃ চন্দ্র! …এক মিনিট! আমি লিখে নিচ্ছি। কর্নেল টেবিল থেকে ছোট্ট প্যাড আর ডটপেন নিয়ে বললেন-বলুন। কে, কে, সেন! পুরো নাম বললে ভালো হয়। কাঞ্চনকুমার সেন। ঠিকানা? মানে ওঁর বাড়ির ঠিকানা…ঠিক আছে। এখন আপনি কোথায় আছেন?… মিঃ সেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন কীভাবে?… বুঝেছি। ব্যবসার স্বার্থে এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের একটা ব্যবস্থা করে রাখতেই হয়। …হ্যাঁ। আমি আছি। মিঃ সেনকে আমার কাছে পাঠাতে পারেন। তার সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে চাই। …না, না। আপনার আসবার দরকার হবে না। আপনি একটা চিঠি লিখে দেবেন ওঁকে। আপনার হাতের লেখা চিনতে অসুবিধে হবে না। …ঠিক আছে। রাখছি।

 

কর্নেল রিসিভার রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। উঠে গিয়ে তার কাছাকাছি সোফায় বসলুম। বললুম,–সব বুঝে গেছি। এখন শুধু কাঞ্চনকুমার সেন নামে চন্দ্র জুয়েলার্সের এজেন্টের প্রতীক্ষা। তবে শুধু একটা প্রশ্ন। এই ভদ্রলোকের ঠিকানা কী?

 

কর্নেল প্যাডটা দিলেন। দেখলুম, লেখা আছে ১৩-বি, রামপদ শেঠ লেন, কলকাতা ৭। বললুম,–কলকাতা ৭ কোন এলাকা?

 

–বড়বাজার। বলে কর্নেল হাত বাড়িয়ে টেবিলের কোনায় রাখা টেলিফোন গাইডের উপর থেকে একটা আকার ছোট কিন্তু মোটাসোটা বই টেনে নিলেন। লক্ষ করলুম, বইটার নাম কলকাতার পথ নির্দেশিকা। কর্নেল পাতা উল্টে খুঁজে দেখার পর বললেন,–গলিটা আপার চিৎপুর রোড থেকে শুরু হয়েছে। এটা অনেক পুরোনো স্ট্রিট গাইড। তা হোক। রামপদ শেঠ লেন খুঁজে বের করার অসুবিধে নেই। আপার চিৎপুর রোডে ঢুকলেই ~য়ে যাব।

 

অবাক হয়ে বললুম,–কাঞ্চনবাবু তো আসছেন। তার বাড়ি খুঁজতে যাওয়ার কথা বলছেন কেন?

 

কর্নেল গাইড বুকটা যথাস্থানে রেখে আস্তে বললেন,–দরকার হতেও পারে।

 

এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল অভ্যাসমতো হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!

 

একটু পরে যিনি সবেগে ঘরে ঢুকলেন, তিনি কাঞ্চন সেন নন। আমাদের হালদারমশাই। তিনি সোফায় বসে বললেন,–সুদর্শনবাবুকে ফলো করছিলাম। উনি ট্যাক্সি ধরছিলেন। আমিও একখান ট্যাক্সি ধরলাম। উনি কইছিলেন শেয়ালদা স্টেশনে ট্রেন ধরবেন। কিন্তু উনি চললেন উল্টাদিকে। এক্কেরে ভবানীপুরে। বাড়িটার নাম…

 

কর্নেল বললেন,–মাতৃধাম?

 

অবাক হয়ে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–আপনি জানলেন ক্যামনে?

 

কর্নেল হাসলেন। ওটা ওঁর মাসতুতো ভাই ঝন্টু অর্থাৎ আমার বন্ধু জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির বাড়ি। বোঝা যাচ্ছে, আমার এখান থেকে বেরিয়ে সুদর্শনবাবু শেষপর্যন্ত আমার কথা মেনে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তো আপনি এখন সম্ভবত শেয়ালদা স্টেশন থেকে আসছেন?

 

হালদারমশাই শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হুঁঃ!

 

–আপনার খাওয়াদাওয়া?

 

–স্টেশনের কাছে একটা হোটেলে খাইয়া লইলাম।

 

আবার ডোরবেল বাজল। কর্নেল ষষ্ঠীর উদ্দেশে হাঁক দেওয়ার পর আস্তে বললেন, –হালদারমশাই! সম্ভবত এমন কেউ আসছেন, যাঁর সঙ্গে শুধু আমিই কথা বলব। আপনারা দুজনে বরং ডিভানে বসে পত্র-পত্রিকা পড়ার ভান করুন।

 

হালদারমশাই ও আমি ডিভানে গিয়ে বসলুম। হালদারমশাই দেওয়ালে হেলান দিয়ে খবরের কাগজ খুলে পা ছড়িয়ে বসলেন। আমি একটা রঙিন পত্রিকা খুলে বসলুম। তারপর দেখলুম, একজন রোগাটে গড়নের টাই-স্যুট পরা ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। তার বাঁ-হাতে ব্রিফকেস। তিনি নমস্কার করে বললেন, আমি কে. কে. সেন। মিঃ এ. এম. চন্দ্রের কাছ থেকে আসছি। এই তার চিঠি।

 

কর্নেল চিঠিটা পড়ে দেখে বললেন,–দাঁড়িয়ে কেন? বসুন মিঃ সেন!

 

ইনিই তাহলে সেই এজেন্ট। সোফায় বসে তিনি মৃদুস্বরে বললেন,–গত শুক্রবার আমাকে একটা কাজে বাইরে যেতে হয়েছিল। যে ভদ্রলোকের বাড়িতে ছিলুম, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তার বাড়িতেই আমার কার্ডটা কীভাবে দৈবাৎ পড়ে গিয়েছিল। পরদিন অর্থাৎ গতকাল শনিবার ফিরে গিয়ে তাকে ব্যাপারটা জানালুম। তিনি তন্নতন্ন খুঁজলেন। বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু কার্ডের খোঁজ মিলল না। সেই কার্ড আপনার হাতে কীভাবে এল?

 

কর্নেল বললেন,–যেভাবেই আসুক, আপনার কার্ড আপনি ফেরত পাবেন। কিন্তু আগে আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন।

 

–বলুন!

 

–এই ধরনের সাধারণ কার্ডের বদলে কোম্পানি আপনাদের আইডেন্টিটি কার্ড দেয় না কেন?

 

–অসুবিধে আছে। কী ধরনের অসুবিধে, তা আপনি মিঃ চন্দ্রের কাছে জেনে নিতে পারেন। এজেন্টদের অনেকসময় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।

 

–মিঃ চন্দ্রের কাছে জানবার দরকার মনে করছি না। তবে আমার ধারণা, চোরাই জুয়েলারি বেচা-কেনার ক্ষেত্রে এজেন্টদের ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রাখা উচিত। দৈবাৎ পুলিশ এজেন্টের আইডেন্টিটি কার্ড পেয়ে গেলেই বিপদ। তাতে এজেন্টের ছবি থাকে। কাজেই এই কার্ড নিরাপদ।

 

–ঠিক বলেছেন স্যার।

 

–এবার আমি জানতে চাই, আপনি শুক্রবার কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার কাছে গিয়েছিলেন! মুখে বলার দরকার নেই। আপনি লিখে দিন। মিঃ চন্দ্রের খাতিরে একথা আমি গোপন রাখব।

 

কাঞ্চন সেনের মুখে উদ্বেগ ও অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। বললেন, কোম্পানির স্বার্থে এসব কথা আমাদের গোপন রাখতে হয়। প্লিজ স্যার, কার্ড ফিরে না পেলে আমাকে মিঃ চন্দ্র কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবেন। এ বাজারে এমন বেশি মাইনের চাকরি–তা ছাড়া, কমিশনেরও ব্যবস্থা আছে, এটা চলে গেলে বিপদে পড়ব।

 

আপনি কেন বা কী কাজে সেই ভদ্রলোকের কাছে গিয়েছিলেন, আমি তা জানতে চাইছি না। আপনাকে তো কথা দিচ্ছি, মিঃ চন্দ্র আমার খুব চেনাজানা মানুষ–তার খাতিরে আমি ওকথা গোপন রাখব। হা–আগে আপনাকে কার্ডটা দেখাই।–বলে কর্নেল বুকপকেট থেকে কার্ডটা বের করে দেখালেন।

 

কাঞ্চন সেন একটু ইতস্তত করে বললেন,–কার্ডটা আপনি কি কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছেন স্যার?

 

-হ্যাঁ। কুড়িয়ে পেয়েছি।

 

–কোথায় বলুন তো স্যার?

 

–যদি বলি, আপনি যেখানে পাদুটো রেকেছেন, সেখানে?

 

কাঞ্চন সেন নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন,–এটা স্যার অসম্ভব ব্যাপার।

 

–কেন অসম্ভব? ধরুন, শুক্রবার আপনি যে ভদ্রলোকের কাছে গিয়েছিলেন, তিনি কোনো কারণে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এবং দৈবাৎ পকেট থেকে কিছু বের করতে গিয়ে কার্ডটা পড়ে গিয়েছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি ওটা দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে রেখেছি। তারপর মিঃ চন্দ্রের কাছে গিয়েছি।

 

কাঞ্চন সেন এবার চাপাস্বরে বললেন,–অসম্ভব ব্যাপার স্যার। জোর দিয়ে বলছি, এটা অসম্ভব। আমাকে যিনি গোপনে খবর দিয়ে যেতে বলেছিলেন, আপনার কাছে তার আসবার কথা নয়। মিঃ চন্দ্রের কাছে আপনার পরিচয় পেয়েছি স্যার!

 

–ঠিক আছে। আপনি সেই ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা এই কাগজে লিখে দিন। আপনার টেলিফোন নাম্বারও লিখবেন। আমি আজ রাত্রের মধ্যে আপনার কথার সত্যতা আমার বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে কোনো কৌশলে যাচাই করে নেব। আপনার কথা সত্য হলে আপনি কার্ড পাবেন। আমি আপনার টেলিফোনে আপনাকে খবর দেব।

 

কাঞ্চন সেন ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভেবে নিলেন। তারপর কর্নেলের দেওয়া কাগজে কিছু লিখে কর্নেলকে দিলেন। তারপর করুণ মুখে ভাঙা গলায় বললেন, স্যার! দয়া করে শুধু একটা কথা মনে রাখবেন। আমার প্রাণ এখন আপনার হাতে।

 

কথাটা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল কাগজটা ভাঁজ করে বুকপকেটে ঢোকালেন। তারপর হালদারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সকৌতুকে বললেন–আপনার কথা ঠিক হালদারমশাই! হেভি মিস্ত্রি।

 

কাঞ্চন সেন চলে যাওয়ার পর আমি ও হালদারমশাই কর্নেলের কাছে সেই নাম-ঠিকানা জানতে চেয়েছিলুম। কিন্তু কর্নেল গম্ভীর মুখে বলেছিলেন,–ভদ্রলোককে কথা দিয়েছি এটা গোপন থাকবে। কাজেই এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়।

 

হালদারমশাই বলেছিলেন–আপনিও কইলেন হেভি মিস্ট্রি। তা হইলে এবার আমি কী করুম কন কর্নেলস্যার!

 

এ কথা শুনে কর্নেলের গাম্ভীর্য চিড় খেয়েছিল। সহাস্যে বলেছিলেন, আমার মতো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ঠিক হবে না হালদারমশাই! অবশ্য বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে দুর্লভ প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি বা অর্কিডের খোঁজ পেলে আমার বরং লাভই হয়। তো আপনার সাহায্য নিশ্চয় আমার দরকার। এক মিনিট।

 

বলে তিনি টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করেছিলেন। তারপর সাড়া পেয়ে বলেছিলেন–মিঃ রায়চৌধুরি? কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। …হ্যাঁ। সুদর্শনবাবু এসেছিলেন। ফেরার সময় আপনার সঙ্গে দেখা করেও গেছেন। …না। উনি আমাকে বলেননি। তবে আমার হাতে সে-খবরও আছে। বলে কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর বললেন,–যথাসময়ে বলব। এখন একটা জরুরি কাজের কথা বলতে চাই। আপনি তো বুঝতেই পারছেন, আমার বয়স থেমে নেই। এই বৃদ্ধ বয়সে আগের মতো একা কোনো কাজে নামতে ভরসা পাই না। আমাকে সাহায্য করেন একজন ধুরন্ধর ডিটেকটিভ। তিনি প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এজেন্সি খুলেছেন। তাঁর নাম মিঃ কে. কে. হালদার। …তা হলে সুদর্শনবাবু তার কথা আপনাকে বলেছেন? এবার শুনুন। সুদর্শনবাবুকে তখনই যে-কথা বলা দরকার ছিল, বলিনি। কিন্তু ইতিমধ্যে কিছু তথ্য আমার হাতে এসে গেছে। তাতে মনে হচ্ছে, কেসটা জটিল।…বললুম তো! যথাসময়ে জানতে পারবেন। আপনাকে আমি একটা অনুরোধ করছি। সুদর্শনবাবুকে ট্রাঙ্ককলে জানিয়ে দিন, কাল সোমবার যে-কোনো সময়ে মিঃ হালদার তার সঙ্গে দেখা করবেন। মিঃ হালদারের ডিটেকটিভ এজেন্সির কনট্র্যাক্ট ফর্মে তাকে একটা সই করতে হবে। এই ফর্মালিটিজ উভয়ের স্বার্থেই মেনে চলা দরকার। তবে চুক্তিপত্রে সইয়ের ব্যাপারটা গোপনে হওয়া উচিত। ঘুণাক্ষরে কেউ যেন টের না পায়। চুক্তিপত্রে সই করলে সুদর্শনবাবু হবেন মিঃ হালদারের ক্লায়েন্ট। …হ্যাঁ, টাকার প্রশ্ন আছে। তবে টাকার অঙ্ক যাই হোক, সুদর্শনবাবু যেন সই করতে দ্বিধা না করেন। তবে নেহাৎ অ্যাডভান্স হিসেবে আপাতত একশো টাকা না দিলে মিঃ হালদারের অসুবিধে হবে।..হা। তা হলে আপনি বরং একটা চিঠি লিখে দেবেন মিঃ হালদারকে। এখনই আপনার কাছে মিঃ হালদারকে পাঠাচ্ছি। তবে আপনি ট্রাঙ্ককলে সুদর্শনবাবুকে শুধু জানিয়ে রাখবেন, তার পরিচিত এক ভদ্রলোক আমার পক্ষ থেকে তার কাছে যাবেন। ব্যস!… ধন্যবাদ মিঃ রায়চৌধুরি। মিঃ হালদার তাঁর সরকারি আইডেন্টিটি কার্ড নিয়েই আপনার কাছে যাচ্ছেন।…ঠিক আছে। রাখছি।…

 

ইতিমধ্যে ষষ্ঠীচরণ কফি এনেছিল। কফি পানের পর হালদারমশাই যথেষ্ট চাঙ্গা হয়ে উঠেছিলেন। কর্নেল বলেছিলেন,–মিঃ জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির বাড়ি আপনি ভবানীপুরে দেখে এসেছেন।

 

হঃ। দেখছি। বলে গোয়েন্দাপ্রবর সবেগে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।

 

কর্নেল বলেছিলেন,–একটা কথা হালদারমশাই!

 

-–কন কর্নেলস্যার!

 

–আপনার আর আমার কাছে আসবার দরকার নেই। মিঃ রায়চৌধুরির সঙ্গে দেখা করার পর বাড়ি ফিরে আমাকে টেলিফোনে শুধু জানিয়ে দেবেন, কনকপুরে কাল কোন ট্রেনে যাচ্ছেন। কীভাবে যেতে হবে, তা মিঃ রায়চৌধুরির কাছে জানতে পারবেন। কনকপুরে হোটেল থাকা সম্ভব। না থাকলে সুদর্শনবাবুর বন্ধু হিসেবে রায়বাড়িতে থাকতে পারবেন। আমরা দুজনে উঠব সেচদফতরের বাংলোতে। দরকার হলে গোপনে সেখানে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু সাবধান হালদারমশাই! কনকপুরে আমরা আপনার অপরিচিত। এই কথাটা সবসময় মনে রাখবেন। বুঝলেন তো?

 

–বুঝেছি কর্নেলস্যার।

 

বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ পর্দা ফুঁড়ে উধাও হয়ে গেলেন।

 

.

 

বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ হালদারমশাইয়ের ফোন এল। জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরি তাঁকে সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের ট্রেনে কনকপুর যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। কনকপুর স্টেশন থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। সাইকেলরিকশা, বাস, অটো সবই পাওয়া যায়।

 

কর্নেল সেচদফতরের এক কর্তাব্যক্তির বাড়িতে টেলিফোন করে কনকপুর ইরিগেশন বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা করে নিলেন।

 

পাঁচটায় দ্বিতীয় দফার কফি দিয়ে গেল ষষ্ঠীচরণ। তখন আলো জ্বলে উঠেছে। শীত না পড়লেও ততক্ষণে সন্ধ্যার আমেজ এসে গেছে। কফি খেতে-খেতে বললুম,–আচ্ছা কর্নেল, আপনি কাঞ্চন সেনের কথার সত্যতা যাচাই করবেন বলছিলেন। কীভাবে করবেন?

 

কর্নেল হাসলেন।–করব না।

 

–সে কী! তা হলে ভদ্রলোককে কার্ডটা তখনই ফেরত দিলেই পারতেন।

 

–জয়ন্ত! কাঞ্চন সেন আমাকে মিথ্যা ঠিকানা দিলে আমার শর্ত শোনার পর দ্বিধায় পড়ে যেতেন। ওঁর মুখে কোনো দ্বিধার চিহ্ন দেখতে পাইনি। তা ছাড়া, উনি ওঁর মালিকের কাছে আমার পরিচয় পেয়েছেন। আমার সঙ্গে ছলচাতুরির সাহস ওঁর নেই।

 

–কী আশ্চর্য! তা হলে কার্ডটা…

 

আমাকে থামিয়ে দিয়ে কর্নেল বললেন,–তবু আমি রিস্ক নিতে চাইনি। যেন সত্যিই আমি ওঁর দেওয়া নাম-ঠিকানার সত্যতা যাচাই করব, এ জন্য আমার সময় দরকার–এই কৌশলটুকু এক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেই হয়েছে।

 

একটু ইতস্তত করে বললুম–কাঞ্চন সেন সুদর্শনবাবুর নাম-ঠিকানা দেননি এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–তোমার নিশ্চিত হওয়ার কারণ?

 

–কার্ড রাখার কথা পকেটে। ব্যাগের ভিতরে কেউ কার্ড রাখে না।

 

–কিন্তু সুদর্শনবাবুর ব্যাগ থেকেই কার্ডটা নীচে পড়েছিল।

 

–কনকপুর গিয়ে সুদর্শনবাবুকে জিজ্ঞেস করা উচিত।

 

–চেপে যাও জয়ন্ত! এর পর সুদর্শনবাবুর সঙ্গে দেখা হলে যেন কখনও কার্ডের কথা তুলবে না।

 

–হালদারমশাইকে নিষেধ করেননি। কিন্তু উনি যদি জিগ্যেস করেন?

 

–হঠকারী হলেও হালদারমশাই বুদ্ধিমান। বিচক্ষণ পুলিশ অফিসার ছিলেন। তুমি ওঁকে নিয়ে যতই কৌতুক করো, নিজের কাজে উনি যথেষ্ট সিরিয়াস।

 

বলে কর্নেল ড্রয়ার থেকে প্রজাপতির রঙিন ছবির খাম বের করলেন। সকালে এই ছবিগুলো আমাদের তিনি দেখাচ্ছিলেন। বক্তৃতা শোনার ভয়ে আমি সটান বাথরুমে গেলুম। তারপর ফিরে আসার সময় একটা বুকশেলফের উপর অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকা কয়েকটা বই খুঁজে অবিশ্বাস্যভাবে একটা মলাটছেঁড়া ইংরেজি গোয়েন্দা উপন্যাস পেয়ে গেলুম।

 

কিন্তু কর্নেল নিজের কাজে ব্যস্ত। একেকটা ছবি টেবিলল্যাম্পের আলোয় রেখে আতশকাঁচ দিয়ে কী দেখে-টেখে একটা প্যাড়ে কী সব লিখে চলেছেন। বুঝলুম, এর পর সময়মতো একটা প্রবন্ধ লিখে ছবিগুলো সঙ্গে দিয়ে কোনো বিদেশি পত্রিকায় পাঠাবেন। শুনেছি, তার এসব প্রবন্ধের বাজারদর কমপক্ষে একশো মার্কিন ডলার।

 

রাত নটার মধ্যে তার কাজ শেষ হল। তারপর ছবি ও কাগজপত্র গুছিয়ে ড্রয়ারে ভরার পর তিনি চুরুট ধরালেন। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে কিছুক্ষণ চুরুট টানার পর হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন এবং টেলিফোনটা কাছে টেনে আনলেন। বুকপকেট থেকে ভাজকরা একটা কাগজ খুলে দেখে রিসিভার তুলে কর্নেল ডায়াল করতে থাকলেন।

 

বুঝলুম, এনগেজড টোন। কর্নেল কয়েকবার ডায়াল করার পর বিরক্ত হয়ে রিসিভার রেখে দিলেন। বললুম,–সম্ভবত কাঞ্চন সেনকে ফোনে পাচ্ছেন না।

 

কর্নেল ঘুরে আমার দিকে তাকালেন। তুম্বো মুখে বললেন, আমার হাতে ব্যথা ধরে গেছে জয়ন্ত! এখানে এসো। এই নাম্বারটা ধরে দাও।

 

তাঁর কাছাকাছি সোফায় বসে তার নির্দেশমতো একটা নাম্বার ডায়াল করলুম। এনগেজড। মিনিট তিনেক পরে আবার ডায়াল করলুম। এনগেজড। তৃতীয়বার চেষ্টার পর বললুম–টেলিফোনটা খারাপ।

 

কর্নেল এবার নিজে রিসিভার তুলে একটা নাম্বার ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন,–মিঃ এ. এম. চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলতে চাই।…আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…মিঃ চন্দ্র! আপনার কোম্পানির এজেন্ট কাঞ্চন সেন…ও মাই গড! বলেন কী? কখন?…জাস্ট আ মিনিট মিঃ চন্দ্র। পুলিশকে কি আপনি তার কার্ড সম্পর্কে কিছু বলেছেন?…আপনি বুদ্ধিমান। …ও. কে.! ও. কে.! আমি দেখছি।..হ্যাঁ। আমি ওঁর বাড়িতে এখনই যাচ্ছি। …হ্যাঁ। পুলিশকে জানিয়েই যাচ্ছি।… আপনি ভাববেন না। কার্ড আপনি যথাসময়ে ফেরত পাবেন। রাখছি।

 

হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বললুম,–কাঞ্চন সেনের কী হয়েছে?

 

কর্নেল ডায়াল করতে-করতে বললেন,–কাঞ্চনবাবুকে কেউ তার ঘরে গুলি করে মেরেছে।

 

তারপর তিনি টেলিফোনে সাড়া পেয়ে বললেন,–কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি! ও. সি. হোমিসাইড মিঃ সান্যালের সঙ্গে কথা বলতে চাই। … বেরিয়েছেন? ঠিক আছে।

 

টেলিফোন ছেড়ে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–জয়ন্ত! রেডি হয়ে নাও। কুইক! আমি পোশাক বদলে নিয়ে আসছি।

 

কিছুক্ষণ পরে আমরা নীচে গেলুম। তারপর গাড়িতে চেপে বললুম,–কনকপুরের রায়বাড়ির অদ্ভুত কেসে হাত দিতে না দিতেই একটা বডি পড়ে গেল!

 

কর্নেল আমার কথা কানে নিলেন বলে মনে হল না। বললেন,–পার্ক স্ট্রিট হয়ে ডাইনে ঘুরে গিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ হয়ে চলো। তারপর হ্যারিসন রোডসরি, পুরোনো নামটা মাথায় গেঁথে আছে–

 

–বুঝেছি। মহাত্মা গান্ধী রোডে পৌঁছে চিৎপুরের দিকে এগোব। তবে ওই এলাকায় রবিবারে বলে কিছু নেই। জ্যামে পড়তেই হবে।

 

কর্নেল কোনো কথা বললেন না। আপার চিৎপুর রোড এখন রবীন্দ্র সরণি। কর্নেল নাম্বার লক্ষ করছিলেন। সংকীর্ণ রাস্তায় ট্রাম বাস ট্রাক ঠেলাগাড়ি রিকশার ভিড়। কর্নেল রাস্তায় একটা লোককে রামপদ শেঠ লেনের কথা জিজ্ঞেস করলে সে সামনের দিকে তর্জনী তুলল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে গলিটার মোড়ে পৌঁছলুম। গলির ভিতরে ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে আলো। কিন্তু পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে প্রাণপণে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার গাড়িতে ‘প্রেস’ স্টিকার লাগানো দেখে একজন কনস্টেবল বাঁ-দিকের এক চিলতে ফুটপাতের উপর গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। বা-দিকে দুটো চাকা সেই ফুটপাতে ওঠালুম। কর্নেল নেমে গিয়ে বললেন,–গাড়ি লক করে এসো! একজন চেনা পুলিশ অফিসারকে দেখতে পাচ্ছি।

 

পুলিশের একটা বেতার ভ্যান আর দুটো জিপ ডানদিকে একটা ছ’তলা বাড়ির সামনে দাঁড় করানো ছিল। কর্নেলকে দেখে সেই পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে নমস্কার করলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, স্যার! আপনি এখানে?

 

–প্রণব! তোমাদের বড়বাবু আর লালবাজারের ও. সি. হোমিসাইড কোথায়?

 

-–ওঁরা একটু আগে চলে গেছেন স্যার!

 

–ভিকটিমের বডি?

 

–আধঘণ্টা আগে মর্গে পাঠানো হয়েছে।

 

-–আমি ভিকটিমের ফ্ল্যাটটা দেখতে চাই। লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কেউ আসেননি?

 

প্রণববাবু কথা বলতে-বলতে সিঁড়িতে উঠছিলেন। বললেন,–ডি. ডি. থেকে এস. আই. নরেশবাবু আর দুজন অফিসার এসেছেন। ভিকটিম বিখ্যাত জুয়েলারি কোম্পানির কর্মচারী। কাজেই কর্নেলসায়েবের আবির্ভাবে আমি অবাক হইনি। নরেশবাবুরাও হবেন না!

 

বললুম–ছ’তলা বাড়ি। লিফট নেই?

 

–প্রাচীন আমলের বাড়ি। তবে ভিকটিম ভদ্রলোক থাকতেন তিনতলার একটা ঘরে। ফ্ল্যাটবাড়ি বলা যায় না। তবে অ্যাটাচড বাথরুম আছে।

 

তিনতলার টানা বারান্দা দিয়ে এগিয়ে যেতেই নরেশ ধরকে দেখতে পেলুম। তিনি কর্নেলকে দেখে বললেন,–, যা ভেবেছিলুম। চন্দ্ৰসায়েবের একটা কেসে স্বনামধন্য কর্নেলসায়েব লড়েছিলেন। অতএব এই কেসে তাঁকে দেখতে পাব, এটা স্বাভাবিক।

 

কর্নেল হাসলেন। আশা করি অরিজিতের কানেও খবরটা মিঃ চন্দ্র তুলেছেন?

 

–ডি. সি. ডি. ডি. সায়েবের তাড়া খেয়েই আমাদের ছুটে আসতে হয়েছে। উনি আপনাকেও নিশ্চয় একটু উঁকি মারতে বলেছেন?

 

–না নরেশবাবু। অরিজিৎ লাহিড়ি এই বৃদ্ধের দাড়ি ধরে টানেননি। যাকগে। চলুন। ঘরটা একটু দেখে নিই।

 

নরেশবাবুর পিছনে কর্নেল ও আমি মোটামুটি চওড়া ঘুরে ঢুলুম। দুজন অফিসার ঘরের ভিতর কিছু করছিলেন। আমাদের দেখে তারা ভুরু কুঁচকে তাকালেন। নরেশবাবু বললেন–ওহে

 

আলম! এঁকে চিনতে পারছ কি?

 

একজন অফিসার কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন-আমার সৌভাগ্য! কর্নেলসায়েবের সঙ্গে আলাপের সুযোগ পেলুম।

 

অন্যজন নমস্কার করে বললেন,–কর্নেলসায়েব আমাকে হয়তো চিনতে পারবেন। আমি মানিক দত্ত। এন্টালি থানায় ছিলুম।

 

কর্নেল ঘরের ভিতর চোখ বুলিয়ে বললেন,–কাঞ্চনবাবু একা থাকতেন?

 

নরেশবাবু বললেন, হ্যাঁ। কথায় বলে, একা না বোকা!

 

কর্নেল ডানদিকে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,–মার্ডার এখানেই হয়েছে। নরেশবাবু! বডি কী অবস্থায় ছিল?

 

–বাথরুমের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়েছিলেন ভদ্রলোক। পা-দুটো বাথরুমের দরজার বাইরে। মাথার পিছনে প্রায় পয়েন্টব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করেছে খুনি।

 

–পাশের ঘরের কেউ গুলির শব্দ শোনেনি?

 

–পাশের দুটো ঘরে দুজন করে চারজন থাকেন। ও দুটো ঘরকে মেস বলা যায়। চারজনই বাঙালি। হুগলি, হাওড়া, বর্ধমানে বাড়ি। বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী ওঁরা। শনিবার বিকেলে বাড়ি চলে যান। ফেরেন সোমবার সকালে। তার ওপাশে সিঁড়ি। তারপর চারটে ঘরে এক মারোয়াড়ি ফ্যামিলি থাকেন। কাঞ্চনবাবুর ঘরে সকাল-সন্ধ্যা লোজন আসতে দেখেছেন ওঁরা। আর গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া এই এলাকায় আজ রোববারেও সম্ভব নয়, তা নিজেই বুঝে নিন। মোটরসাইকেলের শব্দ তো সব সময়। তার ওপর নীচের তলায় একটা লোহালক্কড়ের দোকান। রোববারেও লোহার পাত কাটার শব্দ শুনছিলুম। বিরক্ত হয়ে বন্ধ করতে বলেছি।

 

কর্নেল কোণের দিকে খাটের পাশে টেবিলে একজন মহিলার ছবি দেখে বললেন,–কাঞ্চনবাবুর স্ত্রী সম্ভবত।

 

নরেশবাবু বললেন,–হ্যাঁ, সম্ভবত। কাঞ্চনবাবুর দেশের বাড়ির ঠিকানায় খোঁজ নিলে জানা যাবে।

 

–দেশের বাড়ির ঠিকানা পেয়েছেন তা হলে?

 

–একটা চিঠি থেকে পাওয়া গেছে। কাঞ্চনবাবুর দাদা প্রাণকান্তবাবুর চিঠি। ভাইকে পুজোর সময় বাড়ি যেতে লিখেছেন। টাকাকড়িও চেয়েছেন।

 

-–ঠিকানাটা দিতে আপত্তি আছে?

 

নরেশবাবু হাসলেন।–কক্ষনও না। ডি. সি. ডি. ডি. সায়েব শুনলে আমার চাকরি যাবে। লিখে নেবেন কি?

 

কর্নেল পকেট থেকে খুদে নোটবই আর জুটপেন বের করলেন।–বলুন।

 

–গ্রাম রানিপুর, পোস্ট অফিস কনকপুর, জেলা নদিয়া।

 

কনকপুর শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল নির্বিকারমুখে নাম-ঠিকানা লিখে বললেন, –ছোট একটা সোফাসেট আছে দেখছি। সেন্টার টেবিলে দুটো চায়ের কাপ। চা শেষ করে কাঞ্চনবাবু বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর গেস্ট তাকে গুলি করেছে। তো ডেডবডি প্রথম কে দেখেছিল?

 

নরেশবাবু বললেন,–মারোয়াড়ি ফ্যামিলির একটা বাচ্চা ওদের বারান্দায় খেলনা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে খেলছিল। তার দিদি সিঁড়ির মাথা থেকে বল ছুড়ছিল। তারপর বলটা এই ঘরের বারান্দায় এসে পড়েছিল। কিন্তু এখানে বারান্দায় তখন আলো ছিল না। তাই ওরা এখানে আসতে ভয় পাচ্ছিল। তখন মেয়েটির দাদা মোহনলাল বল কুড়াতে আসে। দরজা অর্ধেক খোলা। অথচ ভিতরে অন্ধকার। তার সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক।

 

কর্নেল টেলিফোন দেখিয়ে বললেন,–ওটা কি ডেড?

 

নরেশবাবু টেবিলের পিছন থেকে ছেঁড়া তার তুলে দেখলেন।–খুব হুঁশিয়ার খুনি। ঘরের আলোও নিভিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দরজার কপাট পুরো লাগানোর হয়তো সময় পায়নি।

 

কর্নেল সোফার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে টর্চ জ্বাললেন। তারপর আতশকাঁচ দিয়ে কিছুক্ষণ কী সব পরীক্ষা করলেন, তিনিই জানেন। নরেশবাবু মুচকি হেসে বললেন,–ফরেন্সিক এক্সপার্টদের জন্য অপেক্ষা করছি। দেখা যাক, তার আগে কর্নেলসায়েবের শ্যেনচক্ষুতে খুনির কোনো ক্ল মেলে কি না।

 

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ধনবান রত্নব্যবসায়ীর কর্মচারী। কাজেই ফরেন্সিক এক্সপার্টরা আসবেন বইকি। আমি নিছক হাতুড়ে এসব ব্যাপারে।

 

–হাতের তাস আপনি দেখাবেন না। তা জানি!

 

কর্নেল হাসলেন।–দেখলুম, লোকটার কাপ থেকে একটুখানি চা পড়ে গিয়েছিল। খুব গরম চা ফুঁ দিয়ে খেতে গেলে এমনটা হতেই পারে। আসলে সে শিগগির চা খেয়ে নিয়ে হাতের কাজ শেষ করতে চেয়েছিল।

 

নরেশবাবু বললেন,–কাঞ্চনবাবু নিজেই চা তৈরি করে খেতেন। কেরোসিন কুকার আর চায়ের সরঞ্জাম দেখেই তা বোঝা যায়। খেতেন হোটেলে। কারণ চাল-ডাল বা রান্নার পাত্র দেখছি না।

 

কর্নেল ঘরের ভিতর আবার একবার ঘুরে দেখে নিয়ে বললেন,নরেশবাবু! কেউ কাঞ্চন সেনের ঘর থেকে কিছু নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে খুন করেনি। সে কাঞ্চনবাবুকে খুন করতেই এসেছিল। আর-একটা কথা। সে এই কাজের জন্য রবিবার সন্ধ্যাটা বেছে নিয়েছিল। খুনের নিরাপদ জায়গা কাঞ্চনবাবুর এই ঘর, তা সে বুঝতে পেরেছিল।

 

–আপনি কি বলতে চান, খুনি আগে থেকে টেলিফোনে কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেই এসেছিল?

 

–তা আর বলতে? আচ্ছা, চলি নরেশবাবু! বলে কর্নেল ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকলেন। তাকে অনুসরণ করতে আমার অবস্থা শোচনীয় বললে ভুল হয় না।…

 

.

 

সে-রাত্রে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর তাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, কাঞ্চন সেনকে কারও খুন করার মোটিভ কি থাকতে পারে? আমার ধারণা, কেউ কোনো বিষয়ে তার মুখ চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। তাই না?

 

কর্নেলকে বড় বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি অন্তর্যামী নই, জয়ন্ত!

 

–কী আশ্চর্য, আপনি যেন কোনো কারণে বেজায় চটে গেছেন! খুনির প্রতি, নাকি আমার প্রতি?

 

আমি কৌতুকের মেজাজেই বলেছিলুম কথাটা। লক্ষ করেছিলুম, কর্নেলের স্বভাবসিদ্ধ কৌতুকের মেজাজও নেই। তিনি বলেছিলেন,জয়ন্ত! আমি নিজের প্রতি নিজেই চটে গেছি।

 

–সে কি!

 

–একচক্ষু হরিণের গল্পটা নিশ্চয় তুমি জানো! আমি হঠাৎ কী করে একচক্ষু হরিণ হয়ে গিয়েছিলুম বুঝতে পারছি না।

 

–একটু খুলে বলবেন কি?

 

–খিদে পেয়েছে। ষষ্ঠী! এগারোটা বাজতে চলল! খেয়াল আছে?

 

ষষ্ঠী পর্দার পিছনেই ছিল। উঁকি মেরে বলল,–আপনি বসে-বসে চুরুট খাচ্ছেন বাবামশাই! আপনিই বলেন, চুরুট খাওয়ার সময় আমি যেন আপনাকে ডিসটাপ না করি।

 

কর্নেল তখনই চুরুট অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।–চুপ হতভাগা! খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেলে এবার থেকে ডিসটাপ করবি। উঠে পড়ো জয়ন্ত! নাকি তোমাকে ডিসটাপ করে ফেললুম?

 

এবার স্বাভাবিক আবহাওয়া ফিরে এসেছিল। বলেছিলুম,–ষষ্ঠীকে আপনি বাংলা পড়িয়েছেন। ইংরেজিও নাকি পড়াতে চান। তার আগে ওর ডিসটাপ-টা শুধরে দেবেন।

 

–তোমাকে ওই দায়িত্বটা দিলুম। বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকেছিলেন।

 

সে-রাতে বিছানায় শুয়ে কাঞ্চন সেনের হত্যাকাণ্ডে কর্নেলের নিজের প্রতি চটে যাওয়া এবং নিজেকে একচক্ষু হরিণ বলার কারণ খুঁজতে নাকাল হয়েছিলুম। শুধু এটুকু বোঝা যায়, কাঞ্চন সেনকে কেউ খুন করতে পারে, কর্নেল নিশ্চয় তা ভাবেননি। কিন্তু কাঞ্চন সেন খুন হওয়ার পর তাঁর হয়তো মনে হয়েছে, এরকম একটা শোচনীয় সম্ভাবনার কথা তার মাথায় এলেও যে-কোনো কারণে হোক, সেটা তিনি তখন গ্রাহ্য করেননি। পরে তাই তার অনুশোচনা হয়েছে।

 

কর্নেল তার অ্যাপার্টমেন্টে আমার রাত্রিবাসের সময় একবার বলেছিলেন,–ডার্লিং! ইংরেজিতে একটা প্রবচন আছে, তার মোদ্দা মানেটা হল : রাত্রিকালে যে-সব চিন্তাভাবনা আসে, সেগুলোর বিরুদ্ধে সতর্ক থেকো “Beware of the thoughts, come in night।” সতর্ক না থাকলে অনিদ্রার রোগে ভুগবে।

 

লাইনটা মনে পড়ে গেলে সতর্ক হয়েছিলুম বটে, কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়। সকাল থেকে রাত্রি–পুরো একটা রবিবার ঘটনার পর ঘটনার ধাক্কায় এ যাবৎ অসংখ্যবার বিপর্যস্ত হয়েছি। এটা নতুন কিছু নয়। তবু শুধু মনে ভেসে উঠছিল, কাঞ্চন সেনের করুণ মুখে বলা শেষ কথাটা : স্যার! দয়া করে শুধু একটা কথা মনে রাখবেন। আমার প্রাণ এখন আপনার হাতে।

 

কর্নেলের একসময় একটা লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ি ছিল। গাড়িটা কবে বেচে দিয়েছেন। কিন্তু গ্যারেজটা কাউকে ভাড়া না দিয়ে খালি রেখেছেন। আমার ফিয়াট গাড়িটা সেখানেই রাত্রিযাপন করে। গ্যারেজের চাবি ষষ্ঠীর জিম্মায় থাকে।

 

পরদিন সকাল নটায় ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল বললেন, তুমি তোমার সল্টলেকের ফ্ল্যাটে গিয়ে সোয়েটার-জ্যাকেট-টুপি-মাফলার এইসব গরম পোশাক-আশাক নিয়ে এসো। তোমার লাইসেন্সড আর্মস সঙ্গে থাকা দরকার। তোমার গাড়িতেই ফিরে আসব। গাড়িটা আমার গ্যারেজ থাকবে। ট্যাক্সির ওপর ভরসা করা ঠিক হবে না…..

 

শেয়ালদা স্টেশনে এগারোটা পঁচিশের ট্রেনে তত বেশি ভিড় ছিল না। কর্নেলের সেই চিরাচরিত ট্যুরিস্টের বেশ। পরনে জ্যাকেট, পায়ে হান্টিং বুটজুতো। গলা থেকে ঝুলন্ত ক্যামেরা আর বাইনোকুলার পিঠে সাঁটা সেই কালো কিটব্যাগ, যেটার মাথার দিকে প্রজাপতিধরা জালের হাতল বেরিয়ে তার বাঁ-কাঁধের ওপর দিয়ে বেখাপ্পা খুদে ছড়ির মতো দেখাচ্ছিল। আর-একটা ব্যাগ তার পোশাক-আশাক ইত্যাদিতে ঠাসা। লক্ষ করছিলুম, যাত্রীরা তাকে লক্ষবস্তু করে ফেলেছে। এটা অবশ্য সবখানেই দেখে আসছি।

 

একটা নাগাদ কনকপুর স্টেশনে নেমে দেখলুম, পিছনের চত্বরে বাস, সাইকেলরিকশার ভিড়। এক্কা ঘোড়ার গাড়িও চোখে পড়ল। ছোট্ট একটা বাজার আছে। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত! আমাদের পক্ষে একাগাড়িই ভালো। সাইকেলরিকশায় ঠাসাঠাসি হবে। তা ছাড়া, লক্ষ করো, বেচারা এক্কাওয়ালারা যাত্রী পাচ্ছে না। ক্রমশ গ্রামাঞ্চলের মানুষ নেহাৎ দায়ে না ঠেকলে সেকেলে যানবাহনের প্রতি অবহেলা দেখাতে শুরু করেছে।

 

ট্রেনে আসবার সময় শীতের হিম টের পাচ্ছিলুম। চত্বরে নেমে রোদ্দুর আরাম দিল। তারপর যা হয়, বিদেশি ট্যুরিস্ট ভেবে সাইকেলরিকশাওয়ালারা ঘিরে ধরেছিল। কর্নেল সোজা গিয়ে একটা এক্কাগাড়িতে উঠে বসলেন। বিহার অঞ্চলে কর্নেলের সঙ্গে একাগাড়িতে চাপার অভিজ্ঞতা আমার আছে। ঘোড়াটার পাঁজরের হাড় গোনা যায়। কিন্তু এক্কাওয়ালা মহানন্দে তাকে পক্ষিরাজে রূপান্তরিত করতে চাইছিল। কর্নেল তাকে বললেন,–তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। ইরিগেশন বাংলোয় যেতে কনকপুরের বাইরে দিয়ে একটা রাস্তা আছে শুনেছি। সেই রাস্তায় চলো।

 

এক্কাওয়ালা কর্নেলের মুখে বাংলা কথা শোনার আশা করেনি। সে একবার ঘুরে কর্নেলকে দেখে নিয়ে বলল,–সায়েবরা কি বলকাতা থেকে আসছেন সার?

 

–হ্যাঁ। তোমার নাম কী?

 

–আমার নাম মকবুল সার।

 

–কনকপুরের লোক তুমি?

 

–না সার! ডুবো জায়গায় বাড়ি ছিল। বানবন্যায় নাকাল হয়ে ইস্টিশানের কাছে বসত করেছি।

 

–ডুবো জায়গাটা কোথায়?

 

–পাঁচখালি। এখান থেকে অনেকটা দূর। খালবিল নদীনালা আর জঙ্গল। গরমেন বাঁধ বেঁধেছিল। বাঁধ বারবার ভেঙে যায়। কনটেকটারবাবু টাকা লুঠেপুটে খায়। বেশি কী বলব সার?

 

–লোকজনের বসতি নেই ওই অঞ্চলে?

 

–তা আছে সার! বেদে আছে। সাঁওতাল আছে। আমার মতো কত গরিব-গুরবোও আছে।

 

-–আচ্ছা, ওদিকে শুনেছি বেতের জঙ্গল ছিল একসময়। বেতের আসবাবপত্র নাকি কলকাতায় চালান যেত?

 

–এখনও আছে! কালুখালিতে কয়েকঘর ডোম আছে। তারাই বেতের কাজ করে।

 

–মকবুল! তুমি তো একসময় ওই এলাকায় ছিলে। কালুখালিতে দশরথ নামে একটা লোক ছিল জানো?

 

মকবুল হাসল।–সায়েবরা তা হলে আগে এসেছেন এ তল্লাটে?

 

–হ্যাঁ। আমার এক শিকারি বন্ধুর সঙ্গে এসেছিলুম। উনি দশরথকে আমার জন্য একটা বেতের চেয়ার তৈরি করে দিতে বলেছিলেন। লোকটার হাতের কাজ খুব সুন্দর!

 

–দশরথ এখন বুড়ো হয়ে গেছে। তা হলেও তার হাতের কাজ খুব পাকা।

 

–ওহে মকবুল! আমার মনে হচ্ছে, ডাইনের রাস্তায় যেতে হবে।

 

–সার! দুধারে জঙ্গল। কাঁচা রাস্তায় ঘোড়াটার কষ্টও হবে।

 

-–ঠিক আছে। একটু আস্তেই না হয় চলো। আমরা তো জল-জঙ্গলে ঘুরতেই এসেছি। বখশিস পাবে!

 

বখশিসের লোভে এক্কাগাড়ি ডাইনের রাস্তায় নিয়ে গেল মকবুল। কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে হয়তো পাখি-প্রজাপতি বা গাছের ডালে পরজীবী অর্কিড খুঁজতে মন দিলেন। মাটির রাস্তাটা সংকীর্ণ। মাঝবরাবর হলুদরঙের ঘাস এবং তার দুপাশে ধুলোয় মোটরগাড়ির টায়ারের দাগ। জিজ্ঞেস করলে মকবুল আমাকে বলল,–চোরেরা রাতবিরেতে জঙ্গলের গাছ কাটে। কাঠগোলা থেকে লরি এসে সেই কাঠ নিয়ে যায়। কখনও থানাপুলিশ হয় সার! অভাবী লোকেরা পেটের দায়ে চোর হতেই পারে। কিন্তু আসল চোর তো কড়ি-কাঁড়ি টাকা নিয়ে বসে আছে। তাদের ধরে কে?

 

প্রায় এক কিলোমিটার চলার পর কাঁচারাস্তাটা ডাইনে বাঁক নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। এক্কাগাড়িটা এবার পিচরাস্তায় উঠল। কর্নেল বাইনোকুলারে সামনেটা দেখে নিয়ে বললেন,–ইরিগেশন বাংলো দেখা যাচ্ছে। জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির সঙ্গে বছর তিনেক আগে ওই বাংলোতে উঠেছিলুম।

 

বললুম,–তা হলে তো আপনার চেনা জায়গা!

 

–কতকটা। নৌকো করেই ঘুরেছিলুম। সেটা ছিল ডিসেম্বর মাস। সাইবেরিয়ান হাঁস দেখেছিলুম। ছবি তোলার সুযোগ পাইনি। তা ছাড়া, কনকপুরেও যাওয়া হয়নি। মিঃ রায়চৌধুরিও বলেননি, কনকপুরে তার আত্মীয় আছেন। গত পরশু তার টেলিফোন পেয়ে সেটা জেনেছি।

 

–ভদ্রলোক সম্ভবত তার মাসতুতো দাদাদের এড়িয়ে চলেন। তাই না? কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–তা-ই বা বলি কেমন করে? রায়বাড়ির রহস্যজনক চুরির ঘটনা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ লক্ষ করেছি। পুলিশের উঁচুতলায় তার প্রভাব সত্ত্বেও সুদর্শনবাবুকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন।

 

এবার আমাদের ওপর উত্তরের বাতাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। মকবুলের মন এখন তার হাড়জিরজিরে টাটুর দিকে। প্রবল বাতাস ঠেলে পা বাড়াতে বেচারার কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। কর্নেল মকবুলকে বারবার বলছিলেন, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ইচ্ছেমতো ওকে চলতে দাও!

 

বললুম,–জঙ্গল এলাকাটা বিশাল মনে হচ্ছে।

 

কর্নেল বললেন, সরকারি বনসৃজন স্কিমের ব্যাপার। এখানকার মাটি খুব উর্বর। সেবার এসে এত ঘন জঙ্গল দেখিনি।

 

–তা হলে ফরেস্টবাংলো নিশ্চয় কোথাও আছে?

 

–আছে। ওই কাঁচারাস্তা দিয়ে এগোলে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার দূরে। রাস্তার অবস্থা তো দেখলে! রাস্তা পাকা হতে কত বছর লাগবে কে জানে! সরকারি ব্যাপার।

 

পিছন ফিরে দেখে নিয়ে বললুম,–কনকপুর দেখা যাচ্ছে। জঙ্গল ঘুরে না এলে কখন পৌঁছে যেতুম।

 

কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। রাস্তার বাঁদিকে পশ্চিমে বিস্তীর্ণ ধানখেতে পাকা ধান কাটছে লোকেরা। ডানদিকে জঙ্গল থেকে একটা জলভরা খাল বেরিয়ে রাস্তার সমান্তরালে চলেছে। বাংলোটা মনোরম। পিছনের দিকে, উত্তরে ও পূর্বে বিশাল জলাধার। বাতাসে উত্তরঙ্গ সেই জলাধারে দূরে কয়েকটা নৌকো দেখা যাচ্ছিল।

 

গেটের সামনে একাগাড়ি দাঁড় করাল মকবুল। একজন প্যান্ট-শার্ট সোয়েটার পরা ভদ্রলোক ততক্ষণে গেটের কাছে এসে গেছেন। তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন,–ভেরি-ভেরি সরি স্যার। ইঞ্জিনিয়ারসায়েব স্টেশনে জিপগাড়ি পাঠাতে বলেছিলেন। কিন্তু গাড়িটা মাঝপথে বিগড়ে গিয়েছিল। মেকানিক ডেকে আনতে দেরি দেখে পাঁচুবাবুর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে ফোন করেছিলুম। ওরা বলল,–এত শিগগির গাড়ি দিতে পারব না। আমার অপরাধ নেবেন না স্যার!

 

কর্নেল হাসলেন। –না। আপনার উদ্বেগের কারণ নেই। আমরা মকবুলের গাড়িতে চেপে খুব আনন্দ পেয়েছি। আপনি বুঝি বাংলোর কেয়ারটেকার?

 

–আজ্ঞে! আমার নাম সুখরঞ্জন দাশ। বলে তিনি হাঁক দিলেন,–অ্যাই ভোঁদা। ওখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস হতভাগা? সায়েবরা এসে গেছেন! মালপত্তর নিয়ে যা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *