রায়বাড়ির প্রতিমা রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করলেন। নমস্কারের সময় তাঁর ছড়িটা ডানদিকে বগলের সঙ্গে আটকে রেখেছিলেন। তারপর বললেন, আমি সুদর্শন রায়। গতরাতে কনকপুর থেকে আপনাকে ট্রাঙ্ককল করেছিলুম।
কর্নেল বললেন, বসুন সুদর্শনবাবু।
সুদর্শন রায় সোফায় বসলেন। তার ছড়িটা পাশে ঠেস দিয়ে রেখে বললেন,–ট্রাঙ্ককলে একটা কথা বলা হয়নি। একে তো বিচ্ছিরি কীসব শব্দ। তারপর হঠাৎ লাইনটা কেটে গেল। ভবানীপুরে আমার মাসতুতো ভাই জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরিই আমাকে আপনার কাছে আসতে বলেছিল।
–হ্যাঁ। জয়কৃষ্ণবাবু আমাকে গতকাল টেলিফোনে আপনার কথা বলেছেন।
বলেছে?–ভদ্রলোক উৎসাহে একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন।–তা হলে আপনার কাছে আমার আসবার কারণও নিশ্চয় জানিয়েছে?
কর্নেলের হাতে অনেকগুলো পোস্টকার্ড সাইজের রঙিন ছবি ছিল। ছবিগুলো প্রজাপতির। গত অক্টোবরে সরডিহার জঙ্গলে অনেক ঘোরাঘুরি করে ক্যামেরায় দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির প্রজাপতির ছবি তুলে এনেছিলেন। এতক্ষণ সেই ছবিগুলো দেখিয়ে তিনি আমাদের কান ঝালাপালা করছিলেন। অবশ্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্তকুমার হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনছিলেন। কী বুঝছিলেন তা তিনিই জানেন!
এমন একটা অবস্থায় কোন কনকপুরের সুদর্শন রায় এসে বাঁচালেন। ভদ্রলোক বয়সে প্রৌঢ়। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ আছে। সিঁথি-করা কাঁচাপাকা চুল আর পুরু গোঁফে শৌখিনতার ছাপও স্পষ্ট। গায়ে সার্জের পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি। হাঁটু অবধি পশমের মোজা। কাঁধে ভাঁজ করা নকশাদার কাশ্মীরি শাল। অনুমান করলুম, নভেম্বরের শেষাশেষি কলকাতায় ফ্যান চললেও তাঁদের কনকপুরে জাঁকিয়ে শীত পড়েছে এবং টুপি বা মাফলার নিশ্চয় তার কাঁধের সুদৃশ্য পুষ্ট ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছেন। শুধু তাঁর ছড়িটা সাদাসিধে রকমের। দেখে বোঝা যায় মোটা বেতের ছড়ি এবং মাথাটা ছাতার বাঁটের মতো ঘোরালো। কালো রঙের বাঁট। হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে হাসি পেল। কিন্তু এখন আবহাওয়া গুরুগম্ভীর।
যাই হোক, ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে কর্নেল বললেন,–জয়কৃষ্ণবাবু কিছুটা জানিয়েছেন। তবে টেলিফোনে শুধু ওইটুকু জানা যথেষ্ট নয়। উনি আমার পুরোনো বন্ধু। আমার মতো ওঁরও কিছু বাতিক আছে। পাখি দেখা, অর্কিড সংগ্রহ, ক্যাকটাসের বাগান করা।
সুদর্শনবাবু বললেন, হ্যাঁ, জয়কৃষ্ণ একসময় নাম করা শিকারিও ছিল। আমার ঠাকুরদা ছিলেন কনকপুরের জমিদার। কনকপুরের পূর্বে পাঁচখালি নামে একটা মহাল ছিল তার আমলে। ওই মহালটা জলজঙ্গলে কিছুটা দুর্গম ছিল। এখনও ওদিকটায় তত উন্নতি হয়নি। জয়কৃষ্ণ বাইশ বছর বয়সে পাঁচখালির জঙ্গলে একটা বাঘ মেরেছিল। তারপর তো পশুপাখি মারা আইন করে নিষিদ্ধ হল। তবু জয়কৃষ্ণ–ওর ডাকনাম আপনি হয়তো জানেন…
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ঝন্টুবাবু।
–তো ঝন্টু পাঁচখালির জঙ্গলমহলে যাওয়া ছাড়েনি। ওই তল্লাটের মানুষজন ওকে দেবতার মতো ভক্তি করে। আজকাল আর তত যায় না।
এই সময় ষষ্ঠীচরণ কফি আনল। কর্নেল বললেন,–কফি খান সুদর্শনবাবু। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।
সুদর্শনবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–ঝন্টু আপনাকে কতটুকু জানিয়েছে জানি না। তবে ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপনীয়।
কথাটা বলে সুদর্শনবাবু আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই। এ আমার তরুণ বন্ধু খ্যাতিমান সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি। আর উনি মিঃ কে. কে. হালদার। প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর। রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। এঁরা দুজনেই আমার বিশ্বস্ত সহচর।
সুদর্শনবাবু আমাদের নমস্কার করলেন। তারপর বললেন, ঘটনার পর আমি কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে যাওয়ার কথা ভেবেছিলুম। কিন্তু আমার দাদা সুরঞ্জন পুলিশের উপরতলায় কাকেও ধরার পক্ষপাতী। ঝন্টুর পুলিশমহলে জানাশোনা আছে। কিন্তু সে আপনার কাছে আসবার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল।
কর্নেল বললেন, আপনি এঁদের সামনে স্বচ্ছন্দে ঘটনাটা জানাতে পারেন।
সুদর্শনবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আমাদের রায়পরিবারের গৃহদেবী মহালক্ষ্মী। কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে ঘরে-ঘরে লক্ষ্মীপুজো হয়। আমাদের দেবী মহালক্ষ্মীরও ওই রাত্রে পুজো হয়। সারা বছর ওই রাত্রিটা বাদে প্রতিমা রাখা হয় আমাদের দোতলা বাড়ির ওপরতলায় বিশেষভাবে তৈরি একটা ঘরের দেওয়ালসংলগ্ন আয়রনচেস্টে। ঘরের দরজার তালা আর ওই আয়রনচেস্টের তালার দুটো করে চারটে চাবি ছিল। বাবা মৃত্যুর আগে দুটো চাবি আমাকে আর দুটো চাবি আমার দাদা সুরঞ্জনকে দিয়েছিলেন। এবার ব্যাপারটা খুলে বলি। দরজার তালা খুলতে হলে প্রথমে দাদার চাবিটা ঢুকিয়ে একপাক ডাইনে ঘোরাতে হবে। তারপর আমার চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে বাঁদিকে একপাক ঘোরাতে হবে। তবেই দরজার তালা খুলবে।
হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন,–কন কী? একখান চাবি দিয়া তালা খুলব না?
-না। এরপর আয়রনচেস্ট খুলতে হলেও আগে দাদার চাবি তারপর আমার চাবি ঢুকিয়ে একইভাবে ঘোরাতে হবে। তবেই আয়রনচেস্ট খুলবে। তারপর আমরা দুভাই রুপোর থালায় মহালক্ষ্মীকে বের করব। আয়রনচেস্ট একইভাবে বন্ধ করব। ঘর থেকে বেরিয়ে দেবীকে তুলে দেব আমাদের পুরুতঠাকুর দেবনারায়ণ মুখুজ্যের হাতে। দুভাই মিলে এবার ঘরের দরজার তালা আটকে দেব। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায়। সিঁড়ির নীচে অপেক্ষা করবে বাড়ির লোকজন। আমরা সবাই যাব ঠাকুরবাড়িতে। সেখানে মন্দিরের বেদিতে দেবীকে রেখে পুজোআচ্চা শুরু হবে। মোটামুটি এতবছর ধরে এটাই নিয়ম।
কর্নেল বললেন,–বুঝলুম। কিন্তু ঘটনাটা কী?
সুদর্শনবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–অক্টোবর মাসে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে দাদা আর আমি আয়রনচেস্ট থেকে দেবীকে বের করে দেখি, মাথার মুকুট নেই। গলার জড়োয়া নেকলেস নেই। দেখামাত্র আমাদের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। দাদা ঠান্ডামাথার মানুষ। কিন্তু আমি মাথার ঠিক রাখতে পারিনি। চিৎকার, চ্যাঁচামেচি করে হইচই বাধিয়ে দিলুম। খবর রটতে দেরি হয়নি। পাড়ার ভদ্রলোকেরা ছুটে এসেছিলেন। তারপর পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। থানার অফিসার ইন-চার্জ আমাদের দুভাইকে পৃথকভাবে জেরা করে শেষে খুব হম্বিতম্বি শুরু করলেন। দাদা, না হয় আমি, যে-কোনো একজন চুরি করেছি–এই তাঁর মত।
কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, আপনার দাদা কোথায় চাবি রাখতেন, সে কথা আপনি নিশ্চয় জানতেন না?
সুদর্শনবাবু বিষমুখে বললেন,–কর্নেলসায়েব! আপনিও থানার বড়বাবুর মতো কথা বলছেন!
–না। এটা নিছক একটা প্রশ্ন। তা ছাড়া, আমি কখনওই বলছি না আপনার দাদা কোথায় চাবি রাখতেন, তা আপনার জানা ছিল। যাই হোক, এবার বলুন আপনার চাবি আপনি কোথায় রাখতেন?
সুদর্শনবাবু তাঁর বেতের মোটা ছড়িটা হাতে নিয়ে বললেন,–এই ছড়ির ভেতরে। বলে তিনি কালো রঙের অর্ধবৃত্তাকার বাঁটটা ঘোরাতে শুরু করলেন। বাঁটটা খুলে গেল। তারপর ছড়িটা তুলে তিনি একটু নাড়া দিতেই খুদে রিঙে আটকানো দুটো চাবি ছিটকে নীচে পড়ল। চাবিদুটো কুড়িয়ে নিয়ে তিনি বললেন,–কী ধাতুতে তৈরি জানি না। তবে চাবি দুটোর ওজন আছে।
কর্নেল বললেন,–চাবি দুটো একটু দেখতে চাই।
সুদর্শনবাবু তার হাতে চাবি দিলেন। চাবিদুটোর গড়ন দুরকমের। একটা ইঞ্চিতিনেক লম্বা, অন্যটা তার চেয়ে ছোট। কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতশকাঁচ বের করে টেবিলল্যাম্প জ্বেলে দিলেন। তারপর আতশকাঁচ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চাবিদুটো সুদর্শনবাবুকে ফেরত দিলেন। সুদর্শনবাবু চাবিদুটো ছড়ির গর্তে ঢুকিয়ে ঘোরালো বাঁটটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে আঁট করে দিলেন।
কর্নেল বললেন,–এই বেতের ছড়িটা আপনি কতদিন আগে কিনেছিলেন? আমার ধারণা এটা অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন। তাই না?
-ঠিক ধরেছেন। আগে চাবিদুটো আমি আমার ঘরে আলমারির লকারে রাখতুম। বছর তিনেক আগে পাঁচখালি এলাকার একটা বসতিতে দশরথ নামে একটা লোককে দিয়েছড়িটা তৈরি করিয়েছিলুম। ওদের ডোম বলা হয়। পাঁচখালি এলাকায় বেতের জঙ্গল আছে। ডোমেরা বেতের তৈরি ধামা, ধান-চাল মাপবার পাত্র, চুপড়ি, দোলনা এইসব জিনিস তৈরি করে কনকপুরে চৈত্রসংক্রান্তির গাজনের মেলায় বেচতে আসে। দশরথ খুব পাকা কারিগর। আমাদের ছোটবেলায় বাবা দশরথকে দিয়ে বেতের এক সেট টেবিল-চেয়ার তৈরি করিয়েছিলেন। সেগুলো এখনও আছে।
-আপনি বেতের ছড়িতে চাবি রাখা নিরাপদ মনে করেছিলেন। এর কি কোনো বিশেষ কারণ ছিল?
সুদর্শনবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–গ্রামে আমার ঠাকুরদার প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুল আছে। একটা লাইব্রেরিও আছে। ঠাকুরমার নামে নাম। রত্নময়ী পাঠাগার। বাবা লাইব্রেরিঘরের সঙ্গে আরও একটা ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। ওই ঘরে তাস, ক্যারাম, দাবা এইসব খেলার আসর বসত। বিকেল চারটে থেকে রাত্রি নটা অবধি সেখানে খেলা চলত। দাবা খেলার নেশা আমার আছে। এদিকে আমার শোওয়ার ঘরে সেই আলমারি আছে। বছর দিনেক আগে রাত সাড়ে নটায় বাড়ি ফিরে দেখি, শোওয়ার ঘরের দরজার তালা ভাঙা। আমার যা স্বভাব। চিৎকার-চাচামেচি করে হুলস্থূল বাধিয়েছিলুম। দাদা এসে আমাকে বললেন, ঘরে ঢুকে দেখেছ কিছু চুরি গেছে কি না? তারপর নিজেই ঘরে ঢুকে সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। আমি ঘরে ঢুকে দেখলুম, সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
হালদারমশাই একটু হেসে বললেন,–চোর তালা ভাঙছিল। কিন্তু চুরির সময় পায় নাই।
কর্নেল বললেন, আপনার ফ্যামিলি, মানে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা?
সুদর্শনবাবু আস্তে বললেন,–আমি বিয়ে করেছিলুম। কিন্তু আমার স্ত্রী ব্লাডক্যান্সারে মারা যান। তারপর আর বিয়ে করিনি। জমি-পুকুর-বাগান দেখাশোনা এসব নিয়েই থাকতুম। শুধু সন্ধ্যা থেকে দাবা।
–তা হলে আপনি সেই ঘটনার পর এই ছড়ি তৈরি করিয়েছিলেন?
–ঠিক ধরেছেন। ছড়িটা বাইরে গেলে সবসময় হাতে থাকবে। আবার দাবার আসরে বসলেও ছড়িটা আমার হাতের পাশে রাখা থাকবে। কোলে ফেলে রাখতেও অসুবিধে নেই।
–আপনার দাদা কী করেন?
–আপনাকে বলেছি, জমিসম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলুম। কারণ ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় আমার মন ছিল না। ঝন্টুকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন। আর দাদার কথা জিজ্ঞেস করছেন? দাদা পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। কনকপুর হাইস্কুলে দাদা মাস্টারি করত। দুবছর আগে রিটায়ার করেছে। শোভা-বউদিকে আমি মায়ের মতো শ্রদ্ধা করি।
–আপনার দাদার ছেলেমেয়ে?
–এক মেয়ে এক ছেলে। মেয়ের বিয়ে হয়েছিল বহরমপুরে। তার স্বামী সরকারি অফিসার। তার বদলির চাকরি। এখন সুনন্দা শিলিগুড়িতে থাকে। তার একটি মেয়ে আছে। দাদার ছেলে গৌতম ঝন্টুর বাড়িতে থেকে কোনো কলেজে পড়ত। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ঝন্টুর তদ্বিরে সে আমেরিকাতে পড়তে গেছে। কর্নেলসায়েব! দাদা-বউদির প্রতি আমার এতটুকু ঈর্ষা নেই। অথচ বজ্জাত লোকেরা এখন কতরকম আজেবাজে কথা রটাচ্ছে।
-এবার কোজাগরী পূর্ণিমার দিন কি আপনার দাদার মেয়ে-জামাই-নাতনি সবাই এসেছিল?
–হ্যাঁ। তা ছাড়া, আরও কিছু আত্মীয়স্বজনও এসেছিল। প্রতিবছর ওই একটা দিন আমাদের রায়পরিবারে একটা বড় উৎসব। পরদিন কাঙালিভোেজন, বস্ত্রদান এসবও হয়। এবার কিছুই হয়নি।
-এখন বাড়িতে কারা আছে?
–দাদা-বউদি। বাবার আমলের কাজের লোক হরিপদ আর গোবিন্দ। গোবিন্দ জমিসম্পত্তি দেখাশোনার কাজে আমাকে সাহায্য করে। সে আমার বিশ্বস্ত লোক। হরিপদ বাড়ির সব ফাইফরমাশ খাটে। রান্না করে মোনাঠাকুর। সে-ই হাটবাজার করে। আর আছে কাজের মেয়ে শৈলবালা। আমি দুধের জন্য একটা গাইগরু পুষেছি। গোরুর দেখাশোনা, দুধ দোহানো এসব কাজও শৈল করে।
–একটু ভেবে বলুন সুদর্শনবাবু! কোজাগরী পূর্ণিমার দিন আপনি ঘুম থেকে ওঠার পর সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত আপনার এই ছড়িটা কোথায় ছিল?
সুদর্শনবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন–আমি ঘরে থাকলে ছড়িটা ব্র্যাকেটে ঝোলানো থাকে। দোতলা থেকে নীচে কোনো কাজে নামলে ঘরে নতুন দামি তালাটা এঁটে দিই। বাড়ি থেকে বাইরে বেরুলে ছড়িটা আমার হাতেই থাকে। সেদিও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
কর্নেল এতক্ষণ পরে চুরুট ধরালেন। তারপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন–তা হলে আপনার এবং আপনার দাদার চাবি প্রতিবছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন ওই একবার বের। করতে হয় দুজনকে। তাই তো?
–হ্যাঁ। ওই একবার।
–বছরের অন্যসময়, ধরুন গত একবছরে কখনও কি আপনি ছড়ির বাঁট খুলে চাবিদুটো আছে কি না দেখে নিয়েছেন?
–খুলে দেখার দরকার হয় না। কেন জানেন? ছড়িটা হাতে নিয়ে মাটিতে ঠেকিয়ে হাঁটতে হয়। আমি অভ্যাসবশে ঠিক বুঝতে পারি ভিতরে চাবি আছে কি না।
–তার মানে, আবছা শব্দ শুনতে পান?
–ঠিক ধরেছেন কর্নেলসায়েব!
–আর-একটা কথা। আপনি দোতলায় থাকেন। আপনার দাদা-বউদি?
–দোতলায়। বুঝিয়ে বলি। দোতলায় মোট ছখানা ঘর। সিঁড়িটা মাঝখানে। তিনটে করে ঘর তার দুধারে। টানা বারান্দা আছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে, মানে পূর্বের প্রথম ঘরটাতে থাকেন মহালক্ষ্মী। পরের ঘরে জমিদারি আমলের দামি আসবাবপত্র রাখা আছে। পূর্বের শেষ ঘরটাতে থাকে দাদা-বউদি। কনকপুরে বিদ্যুৎ আসবার পর বারান্দার ওদিকটায় দেওয়াল তুলে অ্যাটাচড় বাথরুম করা হয়েছে। আর আমি থাকি পশ্চিমের একেবারে শেষ ঘরটাতে। বাকি দুটো ঘরের মধ্যে আমার পাশের দুটো ঘর আত্মীয়স্বজন বা কোনো বিশেষ অতিথি এলে তাদের জন্য রাখা হয়েছে। ঝন্টু গেলে আমার পাশের ঘরে শোয়।
-এবার কোজাগরী পূর্ণিমার কদিন আগে আপনার দাদার মেয়ে-জামাই-নাতনি এসেছিলেন?
–দুর্গাপুজোর আগেই এসেছিল। ষষ্ঠীর দিন।
-–তারা আপনার পাশের ঘরে, নাকি অন্য ঘরে ছিলেন?
–আমার পাশের ঘরে। দাদার নাতনি পিংকি আমার কাছে ভূতের গল্প শুনতে চায়। সে আমার বিছানায় শুতে।
–তার পরের ঘরে কেউ ছিলেন ওই সময়?
–আমাদের মামাতো ভাই পরেশ। সে থাকে রাঁচিতে। ল্যাব রিসার্চের অফিসে চাকরি করে। সত্যি বলতে কী, মহালক্ষ্মীপুজোর সব কাজের ঝামেলা সে-ই সামলায়।
–পরেশবাবু সম্পর্কে আপনার কোনো সন্দেহের কারণ নেই তা হলে?
–না। পুলিশ তাকে খুব জেরা করেছিল। কিন্তু তাকে অ্যারেস্ট করেনি।
–তা হলে পুলিশ কাকে অ্যারেস্ট করেছে?
–পুলিশের যা নিয়ম। খামোকা গোবিন্দ আর হরিপদকে দিন পাঁচেক আটকে রেখেছিল। দাদা আর আমি বড়বাবুকে ধরাধরি করে বেচারাদের ছাড়িয়ে এনেছিলুম।
–আচ্ছা সুদর্শনবাবু, আপনাদের গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর কি কোনো ছবি তোলা হয়েছিল?
–হ্যাঁ। কনকপুর এখন প্রায় টাউন হয়ে উঠেছে। ছবি তোলার স্টুডিয়োও আছে। গতবছর কোজাগরী পূর্ণিমার দিন দাদা কমলা স্টুডিয়ো থেকে রামবাবুকে ডেকে এনেছিল। প্রতিমার ছবি খুব সুন্দর তুলেছিল রামবাবু। রঙিন ছবি। অনেকগুলো কপি করে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দাদা বিলি করেছিল। আর নীচের তলায় বসার ঘরের জন্য একটা ছবি বড় করে বাঁধানো হয়েছিল। আমার কপিখানা দেখাচ্ছি।
বলে সুদর্শনবাবু তার ব্যাগ থেকে বাঁধানো প্রায় ৯ ইঞ্চি লম্বা আর ৬ ইঞ্চি চওড়া ফ্রেমে বাঁধা একটা রঙিন ছবি বের করে দিলেন। ছবিটা কর্নেল দেখে নিয়ে হালদারমশাইকে দিলেন। তিনি দেখার পর আমাকে দেখতে দিলেন। দেখে মনে হল, মূর্তিটা প্রাচীন। কষ্টিপাথরে তৈরি। মাথায় রত্নখচিত মুকুট। গলায় জড়োয়ার হার।
কর্নেল বললেন,–একমিনিট। আমি এই ছবি থেকে আমার ক্যামেরায় ছবি তুলে নিচ্ছি। দরকার হতে পারে।
কর্নেল তার ক্যামেরায় ছবি তুলে নেওয়ার পর বললেন, ঠিক আছে সুদর্শনবাবু! আমি আপনাদের গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর চুরি যাওয়া অলংকার উদ্ধারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব। বাড়ি ফেরার পথে আপনি মিঃ রায়চৌধুরিকে জানিয়ে যেতে পারেন, আমি আপনাদের সাহায্য করতে চেয়েছি।
সুদর্শনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ঝন্টুর বাড়ি গেলে শেয়ালদা স্টেশনে সাড়ে এগারোটার ট্রেন ফেল করব। মাঠে পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। আমাকে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছতে হবে। আপনি কবে কনকপুর যাচ্ছেন তাই বলুন!
কর্নেল বললেন,–যত শিগগির পারি, যাব। কিন্তু একটা শর্ত। আপনার দাদা আর আপনি ছাড়া ওখানকার কেউ যেন জানতে না পারে, আমি কেন কনকপুরে গেছি। আর-একটা কথা। আপনাদের বাড়িতে আমরা উঠব না। মিঃ রায়চৌধুরির কাছে শুনেছি, কনকপুরের কাছাকাছি ইরিগেশন বিভাগের একটা বাংলো আছে। সেখান থেকে আপনার সঙ্গে যথাসময়ে যোগাযোগ করব।
সুদর্শনবাবু বললেন, আপনার ইচ্ছা। তারপর আমাদের সবাইকে নমস্কার করার পর ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেতের ছড়িটা মুঠোয় ধরে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন-হেভি মিস্ত্রি।
কর্নেল এইসময় একটু ঝুঁকে সোফার নীচে থেকে একটা ছোট্ট কার্ড কুড়িয়ে নিলেন। তারপর সেটা দেখে নিয়ে পকেটস্থ করে বললেন, হ্যাঁ। হেভি মিস্ত্রিই বটে। সুদর্শনবাবুর ব্যাগ থেকে ছবি বের করার সময় এই কার্ডটা ছিটকে পড়েছিল মনে হচ্ছে। কার্ডটা কলকাতার এক জুয়েলারি কোম্পানির।
হালদারমশাই ও আমি দুজনেই চমকে উঠেছিলুম। দুজনে একই সঙ্গে বলে উঠলুম, –জুয়েলারি কোম্পানির কার্ড?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ, চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানি। চৌরঙ্গিতে এঁদের বিশাল দোকান। এই কোম্পানি কলকাতার অন্যতম সেরা রত্নব্যবসায়ী। কিন্তু এঁদের কার্ড সুদর্শনবাবু পকেটে না রেখে ব্যাগে রেখেছিলেন কেন?
গোয়েন্দাপ্রবর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ভদ্রলোকরে ফলো করুম!
তারপর তিনি সবেগে বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল কিছু বললেন না। আমি ব্যস্তভাবে বললুম, –হালদারমশাইকে নিষেধ করা উচিত ছিল। আপনার কথা নিশ্চয় শুনতেন। অথচ আপনি এঁকে বাধা দিলেন না?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, তুমি তো জানো, হালদারমশাই গোয়েন্দাগিরির সুযোগ পেলে ছাড়তে চান না। তা ছাড়া, ইদানীং ওঁর হাতে কোনো কেস নেই। এমন একটা অদ্ভুত রহস্যের গন্ধ পেয়ে উনি চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নন। তা ছাড়া, হালদারমশাই পঁয়ত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন। ওঁকে নিয়ে তোমার উদ্বেগের কারণ নেই।
বললুম, কিন্তু সুদর্শনবাবুদের মহালক্ষ্মীদেবীর মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস চুরি গেছে। এই অবস্থায় সুদর্শনবাবুর কাছে একজন বিখ্যাত রত্নব্যবসায়ীর কার্ড!
–আবার বলছি। কার্ড সবাই পকেটে রাখে। সুদর্শনবাবু কার্ডটা তার ব্যাগে ছবিটার সঙ্গে খুঁজে রেখেছিলেন। কেন ওখানে রেখেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনিই দিতে পারেন। বরং চলো! এগারোটা বাজে। আমরা এক চক্কর ঘুরে আসি।
–কোথায় যাবেন?
–আমি পোশাক বদলে আসি। তারপর বলব।
কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নীচে নেমে আমার গাড়িতে উঠে বসলুম। কর্নেল যথারীতি আমার বাঁদিকে বসলেন। গেট পেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বললেন,–পার্ক স্ট্রিট হয়ে চৌরঙ্গি। তারপর সোজা দক্ষিণে।
রবিবার বলে রাস্তায় গাড়ির ভিড় ছিল না। চৌরঙ্গিতে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে বললুম,–সোজা দক্ষিণেই যাচ্ছি। কিন্তু পৌঁছুব কোথায়? কর্নেল বললেন, ভবানীপুরে।
-–তাই বলুন। সুদর্শনবাবুর মাসতুতো ভাইয়ের বাড়ি!
–নাঃ! চলো তো! আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
হাজরা রোডের মোড় পেরিয়ে কর্নেলের নির্দেশে ডাইনে একটা রাস্তায় গাড়ি ঘোরালুম। তারপর বাঁদিকে আঁকাবাঁকা গলি রাস্তায় ঘুরতে-ঘুরতে একটা চওড়া রাস্তার মোড়ে পৌঁছুনোর পর কর্নেল বললেন,–এসে গেছি। ডানদিকের ওই বড় বাড়িটা। গেটের সামনে হর্ন বাজাবে।
গেটে দারোয়ান ছিল। সে গেট খুলে দিল। নুড়িবিছানো পথের দুধারে দেশি-বিদেশি গাছপালা, আর মরশুমি ফুলের উজ্জ্বলতা। গাড়িবারান্দার তলায় পৌঁছুলে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম। কর্নেল নামতেই তিনি নমস্কার করে সহাস্যে বললেন, আমার সৌভাগ্য! অনেকদিন পরে আপনার দর্শন পেলুম।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–সৌভাগ্য আমারই। কারণ টেলিফোন যিনি ধরেছিলেন, তিনি বললেন, আপনি সাড়ে বারোটার মধ্যে বেরোবেন। তাই আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্তের গাড়িতে এসে গেলুম।
আমি গাড়ি পার্ক করার জন্য একটু এগিয়ে যেতেই ভদ্রলোক বললেন, আপনি গাড়ি থেকে নেমে আসুন। আমার লোক গাড়ি ঠিক জায়গায় রেখে আপনাকে চাবি ফেরত দেবে।
গাড়ি থেকে নেমে গেলুম। কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। জয়ন্ত! ইনি কলকাতা কেন, সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ রত্নবিশারদ মিঃ অবনীমোহন চন্দ্র। চৌরঙ্গিতে এঁদের চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানি প্রায় দুশো বছর ধরে ব্যবসা করছেন। তুমি শুনলে অবাক হবে, ব্রিটেনের রাজপরিবারে এঁর পূর্বপুরুষ প্রাচীন ভারতীয় ডিজাইনের অনেক অলঙ্কার সাপ্লাই করতেন।
ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি, হঠাৎ কর্নেলের এখানে আসবার উদ্দেশ্যটা কী। পোশাক বদলাতে ঘরে ঢুকে কর্নেল টেলিফোন করেই এখানে এসেছেন। চার ধাপ সিঁড়ির উপর বারান্দায় উঠেছি, সেই সময় উর্দি পরা একটা লোক আমার গাড়ির চাবি দিয়ে গেল। আধুনিক রীতিতে সাজানো প্রশস্ত ঘরে মিঃ চন্দ্র আমাদের বসিয়ে কর্নেলের মুখোমুখি বসলেন। তিনি বললেন,–সাড়ে বারোটা নাগাদ আমার বেরুনোর কথা। যাই হোক, আপনার জন্য কফি করতে বলেছি। কফি খেতে-খেতে কথা হবে।
দেখলুম, পাশের ঘরের পর্দা তুলে একজন পরিচারক এগিয়ে এল। সে সেলাম ঠুকে সোফার সেন্টার টেবিলে একটা ট্রে রেখে গেল। আমার আর কফি পানের ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কফির পেয়ালা তুলে নিতেই হল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে আস্তে বললেন, আপনার কোম্পানির একটা কার্ড পেয়েছি। কোথায় পেয়েছি বা কী করে পেয়েছি, এখন তা বলতে চাইনে। সময়মতো নিশ্চয় তা আপনাকে জানাব।
মিঃ চন্দ্র যেন একটু অবাক হয়েছিলেন। বললেন, আমাদের কোম্পানির কার্ড তো আমরা যাকে-তাকে দিই না। কেউ কোনো অলঙ্কার যত বেশি টাকারই কিনুন না কেন, তাকেও আমরা কার্ড দিই না। ক্যাশমেমোই যথেষ্ট। তবে বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে কার্ড দিতে হয়।
–কোন ক্ষেত্রে?
–ধরুন, কোথাও গিয়ে কোনো পয়সাওয়ালা লোকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হল এবং তিনি তাঁর পরিবারে কারও বিয়ে উপলক্ষে বিশেষ অর্ডার দিয়ে অলঙ্কার কিনতে চান, তাঁকে কার্ড দিই, আবার কলকাতার কোনো ধনী পুরুষ বা মহিলা আমাদের দোকানে এলেন এবং তাদের টাকার দরকার আছে বলে দামি অলঙ্কার বিক্রি করতে চাইলেন, তাদের কার্ড দিতে হয়। তারা তো সঙ্গে করে সেই অলঙ্কার নিয়ে যান না। কারণ আজকাল সঙ্গে দামি অলঙ্কার নিয়ে বেরুনোর রিস্ক আছে। তারা কার্ড চেয়ে বলেন টেলিফোনে তারা জানাবেন, কখন আমার কোম্পানির এক্সপার্টরা গিয়ে সেই অলঙ্কার পরীক্ষা করে দরদাম স্থির করবেন।
–বুঝলুম। এ ছাড়া আর কাউকে…..
মিঃ চন্দ্র কর্নেলের কথার উপর একটু থেমে বললেন,–খুলেই বলি। গত বছর আমাদের দোকানে অতবড় একটা চুরির কিনারায় পুলিশ যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন আপনার সাহায্য নিলুম। আপনি দুদিনেই পাঁচলক্ষ টাকার নেকলেস-সহ চোরকে ধরে দিয়েছিলেন। আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ কর্নেলসায়েব!
