রাত তখন তিনটে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

তিন 

জমিজায়গার যে চেহারা দেখতে আমরা আজন্ম অভ্যস্ত, দুর্গাপুর স্টেশনের পর থেকেই সেটা একটু-একটু করে পালটে যায়। আগে এদিকটা ছিল ঘোর জঙ্গুলে জায়গা। সে-সব কেটেকুটে সাফ করে দিয়ে এখানে হাজার হাজার একর জমিজায়গা জুড়ে মস্ত-মস্ত কলকারখানা ঘরবাড়ি আর হাট-বাজার বসানো হয়েছিল। এখন আবার ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে নতুন করে গাছপালা লাগানো হচ্ছে। তার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখতে পাই যে, মাঠ আর সমতল নয়, এখানে-ওখানে একটু-আধটু ঢেউ-খেলানো, দূরে-দূরে এক-আধটা বেশ উঁচু মতো ঢিবিও আমাদের চোখে পড়ে। ঢিবির বদলে পাহাড়ের আবির্ভাব ঘটে আসানসোলের পর থেকে। খানিক বাদে সীতারামপুর জংশন পেরিয়ে এলে তো কথাই নেই, তখন রেল-লাইনের দু’দিকে যেমন ন্যাড়ামুণ্ডি পাহাড়ের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে, তেমন আবার একটু দূরে চোখ রাখলে এটাও বোঝা যায় যে, আকাশের গায়ে যা লগ্ন হয়ে রয়েছে, তা আসলে মেঘ নয়, ‘নিবিড় নীলিমায় সমাচ্ছন্ন’ পর্বতমালা।

 

সদানন্দবাবু সেই হাওড়া স্টেশন থেকেই টগবগ করে ফুটছিলেন, তবে শাল-জঙ্গল আর পাহাড় দেখে যতই উত্তেজিত হয়ে থাকুন, এতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর মনোভাব প্রকাশ করছিলেন বঙ্গভাষাতেই। কিন্তু ‘ওই যে দূরে ছায়ার মতো দেখতে পাচ্ছেন, ওটাই সম্ভবত পরেশনাথের পাহাড়, ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে এই কথা শুনবার পরে আর তিনি স্থির থাকতে পারলেন না, ‘ইনক্রেডিউলাস, ইনক্রেডিউলাস’ বলে চেঁচাতে লাগলেন। ভাদুড়িমশাই খুব মিষ্টি করে তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে, এখানে সম্ভবত ইনক্রেডিবল’ বললেই ঠিক হত, কিন্তু সদানন্দবাবু সে-কথায় কানই দিলেন না। বললেন, “উঃ, সেই কবে ছেলেবেলায় একবার বাবার সঙ্গে দেওঘরে গিয়ে পরেশনাথের পাহাড় দেখেছিলুম, তারপরে তো কলকাতা ছেড়ে আর নড়াই হয়নি, ভাগ্যিস এবারে ‘দুগ্‌গা’ বলে আপনাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছি, তাই ফের দেখা হয়ে গেল।”

 

বললুম, “দেওঘর থেকে বোধহয় ত্রিকূট পাহাড় দেখেছিলেন।”

 

সদানন্দবাবু তাতে একটুও বিব্রত না হয়ে বললেন, “ওই একই হল, মশাই, যার নাম চালভাজা তারই নাম মুড়ি। আমি কি অত নাড়িনক্ষত্তর ঘেঁটে দেখতে গেছি? পাহাড় ইজ পাহাড়।”

 

কথা বলতে-বলতে ছোটখাটো আরও গোটা দুই তিন স্টেশন পেরিয়ে এসেছিলুম, গাড়ি সেখানে দাঁড়ায়নি। তাও বর্ধমান থেকেই গাড়ি একটু লেট করে চলছিল বলে মধুপুরে পৌঁছতে-পৌঁছতে সওয়া একটা বেজে গেল। প্ল্যাটফর্মে নেমে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “এখন করেসপন্ডিং ট্রেনটা পেলে হয়।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা তো ট্রেনে করে গিরিড়ি যাব না।”

 

“তা হলে কীসে করে যাব? বাসে বড্ড ভিড় হয়। এই বুড়ো বয়সে যদি হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে যাই, তো রাস্তার ধারে ছিটকে পড়ে মরতে হবে। এক উপায় ট্যাক্সি। কিন্তু সে তো গলাকাটা ভাড়া চাইবে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কত ভাড়া চাইবে? দু’শো? পাঁচশো? ভাড়া নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমি পুরো দু’হাজার টাকা সঙ্গে করে এনেছি। ইয়েস, দু’হাজার। যান, চাটুজ্যেমশাই, ট্যাক্সি ধরুন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অত ব্যস্ত হবেন না তো। ট্যাক্সি-ফ্যাক্সি দরকার হবে না। কাল দুপুরে আমি গিরিডিতে ট্রাঙ্ক-কল করে গৌতমকে সব বলে রেখেছি। এক্ষুনি সে তার গাড়ি নিয়ে এসে যাবে। ওই তো সে এসে গেছে।”

 

বলতে না বলতে একটা নীল রঙের মারুতি গাড়ি মধুপুর স্টেশনের বাইরে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে যে রোগা-পাতলা ছেলেটি নেমে এল, তার বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। ভাদুড়িমশাইকে প্রণাম করে ছেলেটি বলল, “একটু দেরি হয়ে গেল, মেসোমশাই।”

 

ভাদুড়িমশাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসুন, আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। এ হল গৌতম, গিরিডিতে ডাক্তারি করে, এই বয়েসেই ডাক্তার হিসেবে বেশ নাম করেছে। ইনি কিরণবাবু, সাংবাদিক, আমার অনেক দিনের বন্ধু। আর ইনি শ্রীযুক্ত সদানন্দ বসু, কিরণবাবুর প্রতিবেশী। তার চেয়ে বড় কথা, এ-রকম পরোপকারী সজ্জন একালে খুব কমই চোখে পড়ে। তা ইনিও আমাদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে এসেছেন। কাল দুপুরে অবশ্য এঁর কথা তোমাকে জানানো হয়নি।” হাত তুলে আমাদের নমস্কার করে গৌতম বলল, “অর্থাৎ আপনারা সবাই আমার মেসোমশাই! তা হলে আর দেরি করবেন না, মেসোমশাইরা, এবারে গাড়িতে উঠে পড়ুন। নইলে খেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”

 

ভাদুড়িমশাই সামনের সিটে বসলেন, আমি আর সদানন্দবাবু পিছনে।

 

গাড়ি যখন মধুপুরে ছাড়িয়ে একটু ফাঁকায় পৌঁছেছে, তখন ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তোমাকে না দেখে একটু চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলুম হে।”

 

গৌতম বলল, “আর বলবেন না, মেসোমশাই। মাঝপথে একজন রুগি রয়েছে, এক জমিদারবাড়ির বউ, মেলাঙ্কোলিয়ার রুপি, রোজ তাকে এসে একবার দেখে যেতে হয়, সেখানেই আজ একটু দেরি হয়ে গেল।”

 

“এদিকে কি এখনও জমিদার-টমিদার আছে নাকি?”

 

“খাতায়-পত্রে নেই, তবে বেনামিতে তো কেউ কিছু কম লিখিয়ে রাখেনি। তা ছাড়া আবার যেখানে এখনও হাত পড়েনি, সেই জঙ্গলও আছে প্রচুর। রোজগার তার থেকেও কিছু কম হয় না। কেউ-কেউ আবার ব্যাবসাতেও নেমে পড়েছে।”

 

“কীসের ব্যাবসা? কাঠের?”

 

“শুধু কাঠের কেন?” গৌতম বলল, “একটু আগে যাদের কথা বলছিলুম… ওই মানে যাদের বাড়ির বউ আমার পেশেন্ট, তাদের কথাই ধরুন। বছর দশেক আগেও স্রেফ একটা স’মিল ছাড়া আর কিছুই তাদের ছিল না। এখন তারা একটা কোল্ড স্টোরেজ, দুটো সিনেমা হল আর গোটা-পাঁচেক ট্রাকের মালিক। কিন্তু রামাশ্রয় চৌধুরির মুশকিলটা হয়েছে অন্য জায়গায়।”

 

“কে রামাশ্রয় চৌধুরি?”

 

“এই যাদের কথা বলছি, সেই জমিদারবাড়ির বড়কর্তা।”

 

“মুশকিলটা কী?”

 

গৌতমের উত্তরটা আর শোনা হল না। রাস্তাটা সরু, সেই রাস্তা জুড়ে দুটো মোষ শুয়ে রয়েছে। ক্রমাগত হর্ন দেওয়া হচ্ছে, তবু তাদের নড়বার লক্ষণ নেই। সদানন্দবাবু বললেন, “হর্ন দিলেও নড়ে না, এ তো মোষগুলো দেখছি মানুষ হয়ে উঠল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওতে সুবিধে হবে না, রাস্তার ধারে গাছপালার তো দেখছি অভাব নেই, তুমি একটা ডাল ভেঙে নিয়ে এসো তো, গৌতম।”

 

শেষ পর্যন্ত অবশ্য তার দরকার হল না। মোষের আই. কিউ. ইদানীং বেড়ে গিয়েছে নিশ্চয়, গৌতমকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই তারা বোধহয় আঁচ করেছিল সে, এবারে একটা অপ্রীতিকর ব্যাপার ঘটতে চলেছে, ডাল ভাঙবার আগেই তারা তাই রাস্তার পাশের নালার মধ্যে গিয়ে নেমে পড়ল।

 

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে, গিয়ার পালটে গৌতম বলল, “বাবার কাছে হাতির গল্প শুনেছি। রেল-লাইনের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে তো দাঁড়িয়েই থাকে, কিছুতে নড়ে না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “হাতির আর দোষ কী! কাগজে সেদিন পড়লুম যে, কলকব্জা বিগড়ে গিয়ে ট্রেন ছাড়তে মিনিট দশেক দেরি হওয়ায় কোথায় কারা যেন রেল-লাইনের উপরে দাঁড়িয়ে গেসল!” হেসে বললুম, “অর্থাৎ আপনি বলতে চান যে, জন্তু-জানোয়ারেরাও এখন আর বিশেষ পিছিয়ে নেই, মানুষদের তারা নকল করতে শুরু করেছে, কেমন?”

 

“তা নয় তো কী,” সদানন্দবাবু বললেন, “কমলি খুব বায়না করছিল বলে গত হপ্তায় ওকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যেতে হয়েছিল। তা সেখানে গিয়ে কী দেখলুম জানেন?”

 

‘কী দেখলেন?”

 

“দেখলুম একটা শিম্পাজি খুব মৌজ করে সিগারেট ফুঁকছে। আরে মশাই, যেমন মুখ দিয়ে তেমন নাক দিয়েও ব্যাটা গলগল করে ধোঁয়া ছাড়ছিল। বুঝুন ব্যাপার। মানুষের সঙ্গে বাঁদরের তা হলে আর কী তফাত রইল বলুন।”

 

ড্রাইভারের আসনে হাসতে-হাসতে গৌতমের প্রায় বিষম খাবার জোগাড়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, “দোহাই মেসোমশাইরা, আর না, আর না…পিছনের সিটে বসে যদি এই রকমের গল্প আপনারা চালিয়ে যান তো আমি গাড়ি চালাতে পারব না, নির্ঘাত অ্যাকসিডেন্ট করব।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আর গাড়ি চালাবার দরকার নেই, পথের পাশে একটা দোকান-টোকান দেখে একটু থামাও তো। অনেকক্ষণ চা খাওয়া হয়নি, গলাটা একটু ভিজিয়ে নেওয়া যাক।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “চা তো ফ্লাস্কেই রয়েছে, তার জন্যে গাড়ি থামাতে হবে কেন?”

 

“আরে মশাই, রাস্তার ধারের দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে চা খাওয়ার মজাই আলাদা। ফ্লাস্কের চা খেয়ে কি সেটা পাওয়া যায়? তা ছাড়া আপনার ফ্লাস্কের চা আর কতক্ষণ গরম থাকবে, এতক্ষণে নিশ্চয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।”

 

গৌতম একটা চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে বলল, “দোকানের সামনে তো বেঞ্চি দেখছি না, এখানে যদি চা খেতে হয় তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে হবে। কিন্তু তার দরকার কী, আপনারা গাড়িতেই বসে থাকুন, আমি চায়ের কথা বলে আসছি।”

 

তাকেও অবশ্য গাড়ি থেকে নামতে হল না। দোকানি নিজেই তার দোকান ছেড়ে এগিয়ে এল। লোকটি যে গৌতমের চেনা, সে তার হাসি দেখেই বুঝতে পেয়েছিলুম। কিন্তু তার ‘ক’ কাপ চা চাই ডাক্তারবাবু,’ গৌতম এই প্রশ্নের উত্তর দেবার কোনও সুযোগই পেল না। সদানন্দবাবু তার আগেই বললেন, “চার কাপ। কিন্তু দু’কাপ উইদাউট চিনি অ্যান্ড দুধ।”

 

চা এল কাচের গেলাসে। তাতে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাকার ব্যবস্থাটা স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের গেস্ট হাউসেই করেছ তো? আগের বারে এসে ওইখানে ছিলুম।”

 

গৌতম বললে, “না, মেসোমশাই, ওখানে জায়গা পাওয়া গেল না। সব কটা ঘরই ভর্তি। তাই অন্য জায়গায় ব্যবস্থা করতে হল।”

 

“সেটা আবার কোথায়?”

 

“শহরের মধ্যেই। তবে উশ্রী নদীর ওপারে। একটু নিরিবিলি। তাতে আপনার আপত্তি নেই তো?”

 

“আপত্তি হবে কেন, নিরিবিলি হলেই তো ভাল। হোটেল?”

 

“না, এটাও গেস্ট হাউস।”

 

“কাদের?”

 

“একটা মাইকা কোম্পানির। বাগান আছে, মেনটেন্যান্সও খুব ভাল। মালি, চৌকিদার, কোনও কিছুর অভাব নেই। তা ছাড়া যে কুকটি রয়েছে, সে নাকি রান্না করে চমৎকার। যা খেতে চান বলবেন, সে সব করে দেবে। তার উপরে আবার এমন একটা সুবিধে রয়েছে, যা আপনি অন্য কোথাও পেতেন না।”

 

চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ভাদুড়িমশাই গেলাশ ফেরত দিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই জেনারেটর?” গৌতম একেবারে ঝাড়া দশ সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল তার মেসোমশাইয়ের দিকে। তারপর বলল, “কী করে বুঝলেন বলুন তো?”

 

“এর আর বোঝাবুঝির কী আছে? যেমন ওয়েস্ট বেঙ্গল, তেমন বেহার, দুটোই তো বলতে গেলে ডার্ক কন্টিনেন্ট। এখানেও খুব লোডশেডিং হচ্ছে, তাই না?”

 

“আর বলবেন না, মেসোমশাই,” গৌতম বলল, “লোডশেডিংয়ের জ্বালায় একেবারে পাগল হবার উপক্রম। রাত্তিরের দিকে যদি জরুরি কোনও অপারেশন কেস আসে তো ভয় পেয়ে যাই, এই রে, হঠাৎ না লোডশেডিং হয়ে যায়। সেদিন একটা অপারেশন তো স্রেফ মোমবাতি জ্বালিয়ে শেষ করতে হল। সত্যি বলতে কী, মা অনেক করে বলেছিলেন, তবু এই লোডশেডিংয়ের জন্যেই আমাদের ওখানে আপনাকে থাকতে বলার সাহস হল না। ইনভার্টার একটা আছে অবশ্য, কিন্তু সেটা আর কত টানবে, খানিক বাদেই তার দম ফুরিয়ে যায়।… কী বলব, এই লোডশেডিংয়ের জন্যে ইদানীং চুরি-ডাকাতিও এদিকে বেড়ে গেছে।

 

“আর জেনারেটর?” প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর। একে নতুন জায়গা তায় লোডশেডিং। তায় চুরি-ডাকাতি। যে-রকম শুকনো গলায় প্রশ্নটা করলেন, তাতে বুঝলুম যে, ভদ্রলোক একটু ঘাবড়ে গেছেন।

 

গৌতম হেসে বলল, “জেনারেটরে তো আর রিচার্জিংয়ের দরকার হয় না। যত ডিজেল ঢালবেন, তত চলবে। ও-ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন। ছুটি কাটাতে এসে আপনাদের অন্ধকারে সাত কাটাতে হবে না।”

 

যে-দিক দিয়ে আমরা গিরিডি শহরে এসে ঢুকলুম, তাতে খুব একটা ভিড়ভাট্টার পথ পেরিয়ে আসতে হল না। উশ্রী নদীর ব্রিজ পেরিয়ে গেস্ট হাউসে পৌঁছতে পৌঁছতে অবশ্য সাড়ে তিনটে বেজে গেল। গৌতমের মা আর বউ আগেই সেখানে এসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। গিরিডিতে তাঁরা থাকতেও ভাদুড়িমশাই যে আর-এক জায়গায় এসে উঠেছেন, গৌতমের মা তার জন্যে অনেক আক্ষেপ করে তারপর বললেন যে, পরের বার এসে তাঁদের বাড়িতে উঠতেই হবে।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলেন তো এবারেও উঠতে পারি। তবে কিনা এ যাত্রায় বোধহয় গিরিডিতে আমার এক রাত্তিরের বেশি থাকা হবে না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “সে কী মশাই, আমি তো ভেবেছিলুম তা অন্তত পাঁচ-সাত দিন এখানে থাকব। কালই যদি কলকাতায় ফিরি, তা হলে তো সবাই হাসাহাসি করবে। তা ছাড়া এক-রাত্তিরে কি চেঞ্জ হয়?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা পাঁচ-সাত দিনেও হয় না। যারা হাওয়া বদলের জন্যে আসে, তারা অন্তত একটা মাস এখানে কাটিয়ে যায়। আর তা ছাড়া কালই যে কলকাতায় ফিরব, তা-ই বা আপনাকে কে বলল?”

 

“ওই যে বললেন, এখানে হয়তো এক-রাত্তিরের বেশি আপনার থাকা হবে না।”

 

“তার মানে কলকাতায় ফিরব?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখান থেকে আমরা মধুপুরে যেতে পারি, কমার্টারে যেতে পারি, পরেশনাথের পাশ দিয়ে ধানবাদে যেতে পারি, চাই কী দেওঘরেও চলে যেতে পারি। তা যদি যাই তো ত্রিকূট পাহাড়টাও আর একবার আপনার দেখা হয়ে যাবে।”

 

“যাচ্চলে,” সদানন্দবাবু বললেন, “দেওঘরে যাবার দরকার কী? ত্রিকূট তো একবার হয়েই গেচে, তার চেয়ে যদি এখানে থাকি তো পরেশনাথের পাহাড়টা বরং দেখে আসা যায়। ওটা তো শুনছি এখান থেকে খুব দূরেও নয়। ঘুরে আসা যায় না?”

 

গৌতম বলল, “তা কেন যাবে না? বলেন তো কালই আপনাদের মধুবন থেকে ঘুরিয়ে আনতে পারি।”

 

“ওটা আবার কোথায়?”

 

“পাহাড়ের ঠিক নীচে। যাবেন?”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে আঙুল তুলে সদানন্দবাবু বললেন, “সে তো এনার উপরে নির্ভর করছে।…ও মশাই, আর নড়াচড়া করে কাজ কী, এখানেই থেকে যাওয়া যাক না।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “থাকতে কি আমারই অনিচ্ছে? কিন্তু থাকতে পারব কি পারব না, সে তো আমার উপরেও নির্ভর করছে না, নির্ভর করছে কাজের উপরে।”

 

গেস্ট হাউসের বেয়ারা অনেকক্ষণ থেকেই ড্রইং রুমের বাইরে ঘুরঘুর করছিল। এবারে সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, খানা লাগিয়ে দেবে কি না।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চারটে বেজে গেছে। এখন আর ভাত খাব না। তার চেয়ে বরং রাত্তিরের খাওয়ার পাট আটটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়া যাবে। চাটুজ্যেমশাই কী বলেন?”

 

আমি বললাম, “এখন এক কাপ করে চা পেলে মন্দ হত না।”

 

গৌতমের মা বললেন, “আমি যে মিষ্টি নিয়ে এসেছি, সেটা বরং চায়ের সঙ্গে সার্ভ করে দিক।”

 

সদানন্দবাবু মিষ্টি খেলেন, কিন্তু চা খেলেন না। দিনে তিন কাপ চা খান। “আজ অলরেডি এক কাপ বেশি খেয়ে ফেলেছি।”

 

চায়ের পর্ব শেষ হবার পরে গৌতমের মা আর স্ত্রী উঠে পড়লেন। এবারে তাঁদের বাড়িতে না-ফিরলেই নয়। গৌতম তার গাড়ির চাবি স্ত্রীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “গাড়িটা নিয়ে তোমরা বাড়ি চলে যাও। আমি একটা রিকশা নিয়ে একটু বাদে ফিরছি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন, তোমার আজ রুগি-টুগি দেখবার নেই? এখানে বসে বুড়োদের সঙ্গে গল্প করলেই চলবে?”

 

গৌতম বলল, “বিকেলে আজ চেম্বারে বসব না, রুগিদের সে-কথা জানিয়ে রেখেছি। জরুরি কোনও কেস থাকলে আমার কম্পাউন্ডারই এখানে এসে জানিয়ে দেবে।”

 

বললুম, “তাকে আসতে হবে কেন? এখানে ফোন নেই?”

 

“আছে। কিন্তু বিগড়ে আছে। কবে যে ঠিক হবে, ঈশ্বর জানেন।…চলুন, উশ্রীর ধারটা আপনাদের একবার দেখিয়ে আনি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো ব্রিজ পেরিয়ে এদিকে আসবার সময়ই দেখলুম। এখন আর ওদিকে যাচ্ছি না। তার চেয়ে চলো বারান্দায় গিয়ে বসা যাক।”

 

বারান্দার সামনে লন। তার ডান দিকে বাগান। পিছন দিকে বেশ বড়সড় একটা ফলের বাগানও রয়েছে। সুইমিং পুলও আছে একটা। তবে তাতে জল নেই। গৌতম বলল, “আপনারা যদি চান তো রাত্তিরের মধ্যেই জল দিয়ে ভরে দেবে। পাইপলাইন রয়েছে, কোনও অসুবিধে হবে না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে তো ভালই হয়, বেশ সাঁতার কেটে চান করা যাবে। অবশ্য অনেকদিন তো সাঁতার কাটিনি, বিদ্যেটা ভুলে গেছি কি না কে জানে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও বিদ্যে একবার শিখলে কেউ কখনও ভোলে না। কিন্তু আমি বলি কি, এই বুড়ো বয়েসে আর জল ঝাঁপিয়ে দরকার নেই, সর্দি-টর্দি লেগে যেতে পারে। সে খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।”

 

আরও কিছুক্ষণ গল্প করে গৌতম বলল, “আজ তা হলে উঠি মেসোমশাই। বারগান্ডায় একজন পেশেন্টকে দেখে বাড়ি ফিরব।”

 

ভাদুড়িমশাই পকেট থেকে এক-টুকরো কাগজ বার করে তাতে একটা ফোন-নম্বর লিখে দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু এখানকার ফোনটা তো শুনলুম আউট অব অর্ডার, তাই বাড়ি ফিরে এই নম্বরে একটা ফোন করে বলে দিয়ো যে, আমি এসে গেছি। ওঁরা যেন কাল সকাল দশটা নাগাদ এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন।”

 

কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে গৌতম বলল, “নম্বরটা চেনা-চেনা মনে হচ্ছে।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা তো হতেই পারে। ওটা রামাশ্রয় চৌধুরির ফোন-নম্বর। ওই মানে যাঁর পুত্রবধূটি তোমার পেশেন্ট।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *