পনের
চৌধুরি-বাড়িতে ফিরতে-ফিরতে প্রায় দশটা বাজল। আমাদের রাতের খাবার দোতলায় তুলে দেওয়া হয়নি, তবে মুকুন্দবাবুর তত্ত্বাবধানে তার উদ্যোগ চলছে। আমরা গিয়ে পৌঁছতে তিনি বললেন, “আপনারা উপরে গিয়ে মুখহাত ধুয়ে নিন, আমি সব ভেজে দিবার বন্দোবস্ত করছি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “না না, ওসব ভাজাভুজির মধ্যে যাবেন না, ভাজা জিনিসের কোনও ফুড-ভ্যালু নেই, লাভের মধ্যে চোঁয়া ঢেকুর উঠবে।”
হেসে বললুম, “মুকুন্দবাবু ফ্রাই করবার কথা বলছেন না। খাবার ভেজে দেবেন মানে পাঠিয়ে দেবেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঝঞ্ঝাটের দরকার কী, এসেই যখন পড়েছি, তখন খাওয়ার পাট বরং এখানেই চুকিয়ে ফেলি, তারপর দোতলায় উঠব।”
দোতলায় উঠতে-উঠতে সাড়ে দশটা বাজল। মুকুন্দবাবু আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে দোতলায় এলেন। ভদ্রলোকের বয়েস নাকি আশি বছর। হাঁটাচলা দেখে কিন্তু সে-কথা বোঝা যায় না। এই বয়সে বার্ধক্যের লক্ষণ এখনও বিশেষ ফোটেনি। চৌধুরিজি আসানসোল থেকে ফিরেছেন কি না, জিজ্ঞেস করতে মুকুন্দবাবু বললেন, “এখনও ফেরেননি। তবে ফোন করেছিলেন। কাল দুপুরে ফিরবেন। আপনাদের কি কাল সকালে কোথাও যাবার আছে?”
“হ্যাঁ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু গ্যারাজের এই অবস্থা কেন? শাটারটা টানতে নীচে নেমে এল, কিন্তু নীচের লাইনের সঙ্গে ঠিকমতো মিলল না বলে তালা লাগাতে পারিনি। অ্যালাইনমেন্ট ঠিক নেই দেখলুম। শাটারটা কি কখনও বড়-রকমের কোনও ধাক্কা খেয়েছিল?”
“অ্যাঁ, শাটার?” আমতা-আমতা করে মুকুন্দবাবু বললেন, “মানে গেরাজ-ঘরের শাটার? ধক্কা খেয়েছিল?…সে তো আমি কুছু জানি না। আচ্ছা আজ তা হলে চলি, ভাদুড়িসাব। অনেক রাত হল। রাম রাম।”
মুকুন্দবাবু বিদায় নিলেন।
প্রথম দিনই মুকুন্দবাবুর চেহারায় যে একটা সতর্ক সঙ্কুচিত ভঙ্গি লক্ষ করেছিলুম, কিন্তু মাঝখানে আর যেটা বিশেষ চোখে পড়েনি, মনে হল যেন হঠাৎ সেটা আবার ফিরে এসেছে।
বললুম, “ভদ্রলোক একটু গুটিয়ে গেলেন না?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “যেতেই পারেন। একে তো পুরনো আমলের লোক, তায় আবার বেতনভোগী বিশ্বস্ত কর্মচারী, নিমকের মান রাখবেন না? মালিককে যদি কথা দিয়ে থাকেন যে, গোলমেলে কোনও ব্যাপারেই বাইরের লোকের কাছে মুখ খুলবেন না, তা হলে যতই না কেন এ-বাড়ির হিতার্থী হোন, হঠাৎ কী করে আজ কথার খেলাপ করবেন?”
“গ্যারাজের শাটারে কখনও বড়রকমের কোনও ধাক্কা লেগেছিল কি না, এটা কি একটা গোলমেলে প্রশ্ন হল?”
“খুবই গোলমেলে প্রশ্ন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কতটা গোলমেলে, শিগগিরই সেটা জানতে পারবেন। কিন্তু না, আর নয়। রাত হয়েছে, সদানন্দবাবু ঢুলতে শুরু করেছেন, এবারে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”
একটা অস্বস্তি নিয়ে শুয়েছিলুম। ফলে, সাধারণত যা হয় না, মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে যায়। কীসের অস্বস্তি, তখন সেটা বুঝতে পারি। মধুপুর থেকে ফিরে আসবার পথে ভাদুড়িমশাই বলেছিলেন, হিরের আংটির ব্যাপারটা নিয়ে রাত্তিরে কথা হবে। কিন্তু হরেক কাজের মধ্যে আর সেটা হয়ে ওঠেনি। ঘরের মধ্যে ডিম একটা আলো জ্বলছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আড়াইটে বাজে। পাশের ঘরে একটা আওয়াজ হল। তাতে আন্দাজ করলুম, ভাদুড়িমশাই এখনও ঘুমিয়ে পড়েননি। পা টিপে টিপে বাইরে ড্রইং রুমে চলে এলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের বেডরুমের দরজা আধ-ভেজানো, ভিতর থেকে এক চিলতে আলো বাইরে এসে পড়েছে। উঁকি দিয়ে দেখলুম, রাইটিং টেবিলের উপরে একটা কাগজ রেখে টেবল ল্যাম্পের আলোয় ভাদুড়িমশাই খুব নিবিষ্ট হয়ে সেটি দেখছেন। সেই অবস্থাতেই কাগজ থেকে মুখ না তুলে বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে কিরণবাবু, ভিতরে আসুন।”
ভিতরে ঢুকে বললুম, “বাব্বা, আশ্চর্য লোক বটে আপনি। কী করে বুঝলেন যে, বাইরে একটা লোক এসে দাঁড়িয়ে আছে?”
কাগজ থেকে মুখ তুলে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝিনি তো, অনুমান করেছিলুম।”
“সেটাই বা কী করে করলেন?”
“গেস্ট হাউসের গদিগুলো রাবার-ফোমের নয়, স্প্রিংয়ের। ওঠানামা করলে শব্দ হয়। কবজায় নিয়মিত তেল লাগানো হয় না বলে এখানকার দরজাগুলো নিঃশব্দে খোলে না। তা একটু আগে আপনাদের ঘর থেকে দু’দুটো শব্দই কানে এল। তাতে বুঝলুম, বিছানা থেকে নেমে ঘরের দরজা খুলে কেউ বাইরে এলেন। সদানন্দবাবু ভিতু মানুষ। এত রাতে তিনি নিশ্চয় দরজা খুলে বাইরে আসেননি। তা হলে নিশ্চয় আপনি। আর আপনি যদি বাইরে এসে থাকেন, তা হলে কি আর আমার ঘরের দরজা খোলা দেখেও একবার ভিতরে উঁকি মারবেন না? কী মশাই, এটুকু আন্দাজ করতে কি খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় নাকি?…কিন্তু সে-কথা থাক। হঠাৎ আপনার ঘুম ভাঙল কেন? শরীর খারাপ হয়নি তো?”
বললুম, “না, না, সে-সব কিছু নয়, আসলে একটা অস্বস্তি নিয়ে শুয়েছিলুম। ভিতরে ভিতরে সেটা কাজ করছিল নিশ্চয়ই, তাই ঘুমটা তেমন গাঢ় হচ্ছিল না।”
“অস্বস্তি নিশ্চয় হিরের আংটি নিয়ে। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, সাবধানে রেখে দিয়েছি। তবে সদানন্দবাবু একটা বিচ্ছিরি রকমের ভুল করেছেন।”
“উনি আবার কী ভুল করলেন?”
“আংটিটা নাকি এক-চিলতে কাগজ দিয়ে মোড়া ছিল, উনি সেটা ফেলে দিয়েছেন।”
“কাগজটা আপনার দরকারে লাগত?”
“কিছু লেখা ছিল কি না জিজ্ঞেস করেছিলুম। তাতে উনি বললেন, গোট-গোট করে ইংরিজি অ্যালফাবেটের গোটাকয়েক অক্ষর ছাড়া আর কিছু লেখা ছিল না।”
“আপনার ধারণা ওটা একটা মেসেজ?”
“হওয়াই সম্ভব।” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “কথাটা কেন বলছি জানেন? ওই রকমের এক চিলতে কাগজ আজ আমিও পেয়েছি।”
“তাতেও ওইরকমের ইংরিজি অ্যালফাবেটের অক্ষর লেখা?”
“তাতেও ওইরকমের ইংরিজি অ্যালফাবেটের অক্ষর লেখা।”
“কোথায় পেলেন?”
“গেস্ট হাউসের সামনে ড্রাইভওয়ের ওপর।”
“কখন? কিছু দেখিনি তো।”
“চোখ থাকলে তো দেখবেন। গাড়িতে-গাড়িতে যখন ধাক্কা লাগে, তখন নীচে নেমে দেখলুম যে, মুখ নিচু করে রিয়া দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই সে দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে যায়। সম্ভবত তার হাত থেকে এই চিলতে কাগজটা তখনই পড়ে গিয়েছিল। আমি সেটা তৎক্ষণাৎ কুড়িয়ে নিইনি, খানিকক্ষণের জন্যে আমার জুতোর তলায় চাপা দিয়ে রেখেছিলুম। পরে হাজারিলাল যখন উলি গাড়িতে ঢুকে ব্যাক গিয়ার দিয়ে পিছনে তাকিয়ে গাড়িটাকে একটু পিছিয়ে নিচ্ছে তখন সেটা জুতোর তলা থেকে ধীরেসুস্থে কুড়িয়ে নিই। সেটাই তো পরীক্ষা করে দেখছিলুম।”
“কী লেখা রয়েছে ওতে?”
“সেটা নিজেই দেখুন।” রাইটিং টেল থেকে কাগজের টুকরোটা তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। হাতে নিয়ে দেখলুম ইংরিজি অ্যালফাবেটের বড়-হাতের কয়েকটা অক্ষর বটে। যে-ই লিখে থাকুক, তাড়াহুড়ো করে লিখেছে, কিংবা এমনও হতে পারে যে, তার হস্তাক্ষর খুব সুবিধের নয়। অক্ষরগুলো পরপর তিন লাইনে এইভাবে লেখা।
DRPDMNDNC
KLCSNDSMP
LCTHRCLCK
বললুম, “এ তো একেবারেই হযবরল-মার্কা ব্যাপার। আপনার ধারণা, এর মধ্যে কোনও মেসেজ রয়েছে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে কি আপনার ধারণা কেউ হাতের লেখা প্র্যাকটিস করছিল? মেসেজ ঠিকই, তবে কোডে লেখা। যান, আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন!”
“আর আপনি?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমি? আমি দেখি এটাকে ডিসাইফার করা যায় কি না।”
এ-লোকটি রাত জেগে কাজ করছেন আর আমি গিয়ে পড়ে-পড়ে ঘুমোব, ভাবতে ভীষণ খারাপ লাগছিল। ভাদুড়িমশাইয়ের ঘর থেকে তাই চলে আসতে আমার একটুও ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারছিলুম যে, এখানে বসে থাকলে ওঁর কাজের ব্যাঘাত হবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাই নিজের ঘরে ফিরে এলুম। হাতঘড়িতে দেখলুম সাড়ে তিনটে বাজে। ভেবেছিলুম, আজ ঘুম আসবে না। খানিক বাদে তাও কিন্তু এসে গেল।
ঘুম ভাঙল সাড়ে সাতটায়। তাও ভাঙত না, যদি না সদানন্দবাবু এসে বিকট রকমের হল্লা জুড়ে দিতেন। ধড়মড় করে বিছানার উপরে উঠে বসলুম। ভদ্রলোক তখনও সমানে চেঁচাচ্ছেন, “বলি ও মশাই, আমার মর্নিং ওয়াক হয়ে গেল, ভাদুড়িমশাইয়ে জগিং হয়ে গেল, চান হয়ে গেল, চা খাওয়া হয়ে গেল, একটু বাদে ব্রেকফাস্ট খেতে হবে, আজ আবার শুনছি নুচি আর মোহনভোগ হচ্চে, তাও আপনার ঘুম ভাঙবার নাম নেই? ধন্যি লোক মশাই আপনি। নিন, উঠে পড়ুন!”
আমার ঘুম ভাঙতে দেরি হয় বটে, কিন্তু বিছানা ছেড়ে একবার যদি উঠে পড়ি তো তৈরি হয়ে নিতে বিশেষ সময় লাগে না। ভাদুড়িমশাই যে সাড়ে আটটায় বেরিয়ে পড়তে চান, কাল রাত্তিরেই সেটা শুনেছিলুম। নীচে নামলুম আটটায়। লুচি আর মোহনভোগের খবরটা সদানন্দবাবু কোত্থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, তা বলতে পারব না। তবে সেটা যে উড়ো খবর নয়, একটু বাদেই সেটা বোঝা গেল। মোহনভোগ দিয়ে জুবড়ে নিয়ে আস্ত একটা লুচি মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে দু’চোখ বুজে সদানন্দবাবু খুব তৃপ্তিসহকারে সেটিকে উদরদেশে চালান করলেন, তারপর আর-একখানা লুচির দিকে হাত বাড়াতে-বাড়াতে নিচু গলায় আমাকে বললেন, “পিয়োর ঘিয়ের ব্যাপার মশাই, নো ভ্যাজাল। এখন সহ্য হলে হয়।”
ভাদুড়িমশাই সম্ভবত সারা রাত্তিরই জেগে ছিলেন। তারপরে যে ভোরবেলার জগিংটাও বাদ দেননি, সে তো সদানন্দবাবুর কথা থেকেই জানা গেল। দেখে অবশ্য সে-কথা বুঝবার উপায় নেই। রোজকার মতোই সিধে সটান হেঁটে এসে খাবার ঘরে ঢুকলেন। তবে অন্য দিনের তুলনায় আজ যে তাঁকে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল, সেটা ঠিক। নিঃশব্দে ব্রেকফাস্ট খেয়ে উঠে পড়লেন, তারপর বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাঃ, মুকুন্দবাবুও এসে পড়েছেন দেখছি।”
মুকুন্দবাবু ঘরে ঢুকে খুব সংকুচিত ভঙ্গিতে বললেন, “আমার আসতে থোড়া দের হয়ে গেল। কুছু মনে করবেন না। আপনাদের নাস্তা ঠিক সময়ে দেওয়া হয়েছিল তো?”
সদানন্দবাবু একটি পরিতৃপ্ত উদ্গার তুলে বললেন, “নাস্তা ওয়াজ ভেরি গুড।”
“তা হলে কি আপনারা এখনই বেরিয়ে পড়বেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সাড়ে আটটা বেজে গেছে, এবারে বেরিয়ে পড়াই তো ভাল। …আর হ্যাঁ, দুপুরে হয়তো কাজে আটকে যেতে পারি। তা হলে আর এ-বেলায় ফিরব না। একেবার বিকেলে ফিরব।”
“তা হলে খাবেন কোথায়?”
“দুপুরের খাওয়া তো?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেখানে হোক খেয়ে নেব, ও নিয়ে ভাববেন না। চলুন, তা হলে রওনা হওয়া যাক।”
মুকুন্দবাবু আমাদের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে গ্যারাজ পর্যন্ত এলেন। ফিয়াট গাড়িটাকে গ্যারাজ থেকে বার করে এনে, দেউড়ি পেরিয়ে রাস্তায় পড়ে আমরা ডাইনে টার্ন নিলুম। খানিক এগিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিলুম। তখন চোখে পড়েছিল যে, দেউড়ির সামনে রাস্তার উপরে মুকুন্দবাবু একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন
গিরিডিতে পৌঁছে প্রথমেই গেলুম গৌতমদের বাড়িতে। গৌতম আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। ভাদুড়িমশাইকে বলল, “অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাক্কা, মেসোমশাই। মূলচাঁদ কী বলল জানেন?”
“কী বলল?”
“বলল, মিঃ ভাদুড়ি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান, এ তো আমার মস্ত সৌভাগ। আপনি যে কীসের তদন্ত করতে এসেছেন, তাও আন্দাজ করেছে দেখলুম।”
“তা-ই?”
“সেইরকমই তো মনে হল। বলল যে, ওঁর সঙ্গে কথা বললে নাকি আপনার তদন্তের কাজে সুবিধে হবে।”
“কখন যেতে বলল?”
“গোটা সকালটাই নাকি আপনার জন্যে উনি ফ্রি রেখেছেন।” গৌতম বলল, “আপনার যখন খুশি যেতে পারেন।”
