দশ
গল্পে-উপন্যাসে যে ছবি পাই, তার থেকে এইরকমের একটা ধারণা আমার মাথার মধ্যে গজিয়ে উঠেছিল যে, জমিদারবাড়ির গিন্নি যখন, ভদ্রমহিলা তখন পর্দানশিনা না-হয়ে যান না, নির্ঘাত একটা চিকের আড়াল থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। মুকুন্দবাবু একেবারে সরাসরি তাঁর সামনে আমাদের পেশ করায় তাই একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। দোতলার পেছন দিকের চওড়া টানা বারান্দার একদিকে শ্বেতপাথরের একটা গোল টেবিল ঘিরে খানকয়েক গদি-আঁটা চেয়ার সাজানো। তারই একটায় বসে চৌধুরানি আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। গেস্ট হাউসের দোতলার হ্যাংগিং ব্রিজ দিয়ে যে সরাসরি এই বারান্দায় চলে আসা যায়, আগেই সেটা লক্ষ করেছিলুম। একটা কোলাপসিবল গেট অবশ্য রয়েছে। সব সময়ে সেটায় তালা লাগানো থাকে, তাও দেখেছি। তবে আমরা আসব বলেই সেটা বোধহয় আজ খুলে রাখা হয়েছিল। মুকুন্দবাবুর সঙ্গে সেই গেট পেরিয়ে মূল বাড়ির বারান্দায় গিয়ে পৌঁছতেই ভদ্রমহিলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে আমাদের নমস্কার করে বললেন, “আসুন, আসুন, আপনাদের কথা আমার স্বামীর কাছেই আমি শুনেছি।
চৌধুরানি পর্দানশিনা তো ননই, মাথার উপরে ঘোমটাটিও খুব মস্ত করে টানেননি। নাকে একটা ফাঁদিনথ অন্তত থাকতেই পারত, আর তার সোনার চেনের প্রান্তদেশটা জড়ানো থাকতে পারত তাঁর কানের সঙ্গে। না, তাও নেই। কবজি থেকে মোটা-মোটা সোনার গয়না কনুই ছাড়িয়ে আরও খানিকটা উপরে উঠে গেছে, এই রকমের একটা চিত্র আমার কল্পনায় ছিল; বাস্তবে কিন্তু মোটা-মোটা খাড়ু কি অঙ্গদ তো দূরের কথা, সোনার দু’গাছা হালকা কঙ্কণও আমার চোখে পড়ল না। নাকের ফুলটি অবশ্য হিরের হওয়াই সম্ভব। কিন্তু তা ছাড়া আর কোনও দামি অলঙ্কার নেই। দু’হাতে স্রেফ কিছু রং-বেরঙের কাচের চুড়ি। অর্থাৎ নাটকে-নভেলে যা পড়েছি, এই জমিদার-গিন্নিটির বেশভূষাকে তার সঙ্গে মোটেই মেলানো গেল না। স্বীকার করব যে, তাতেও আমি একটু ধাক্কা খেয়েছিলুম।
তৃতীয় ধাক্কা খাই তাঁর কথা শুনে। অবাঙালি জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে যে এমন স্বচ্ছন্দ বঙ্গভাষা শুনব, এটাা আমি ভাবতে পারিনি। চৌধুরানিকে সে-কথা বলতে তিনি জানালেন যে, তাঁর পিতৃকুল তিন-পুরুষ ধরে কলকাতার বাসিন্দা। বাপ-ঠাকুর্দা বড়বাজারের গদিতে বসে ব্যাবসার কাজকর্ম চালাতেন বটে, তবে ভাইয়েরা সেখান থেকে সরে এসে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের উপরে আপিস খুলেছেন। বিয়ে হবার আগে পর্যন্ত তাঁর নিজেরও জীবন কেটেছে কলকাতার জোড়াসাঁকো অঞ্চলে। তা ছাড়া তিনি মহাকালী পাঠশালার ছাত্রী ছিলেন। ম্যাট্রিকটাও সেখান থেকেই পাশ করেছেন। সুতরাং তাঁর বাংলায় যদি কোনও জড়তা না থাকে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
দাসী এসে পাথরের গেলাসে শরবত দিয়ে গিয়েছিল। তাতে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “জিনিস তো মোট দুটো খোয়া গিয়েছে, কেমন?”
“হ্যাঁ। কানহাইয়ার মুকুট আর বহুর নেকলেস।”
“কোনটা কবে খোয়া গেল?”
ভুরু কুঁচকে চৌধুরানি বললেন, “কেন, আমার স্বামীর কাছে সে-কথা শোনেননি?”
“শুনেছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে আপনার কাছেও একবার শুনতে চাই।”
“মুকুটটা আগে চুরি যায়।”
“আগে মানে ঠিক কবে?”
“সাতুই সেপ্টেম্বর রাত্তিরে আমার স্বামী যখন ঠাকুরঘরে তালা লাগিয়ে শুতে যান, তখনও সেটা কানহাইয়াজির মাথায় ছিল। আটুই সেপ্টেম্বর সকালে আমি ঠাকুরঘরে ঢুকে আর সেটা দেখতে পাইনি।”
“চাবি দিয়ে তালা খুলে ঠাকুরঘরে ঢুকেছিলেন, এটা আপনার স্পষ্ট মনে আছে?”
“একেবারে ছবির মতো মনে আছে। আপনি ভাবছেন, ঠাকুরঘরের দরজায় তখন তালা লাগানো ছিল না?”
“ভাবাই তো স্বাভাবিক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাত্তিরবেলায় তালা লাগিয়ে চৌধুরিজি শুতে গেলেন, আবার সেই তালা খুলে সকালবেলায় আপনি ঠাকুরঘরে ঢুকে দেখলেন যে, মুকুট নেই। এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে, সেটা আপনি বুঝতে পারছেন তো?”
“তা কেন পারব না?” চৌধুরানি বললেন, “মানেটা এই দাঁড়াচ্ছে যে, মুকুট চুরি হয়েছে তালাবন্ধ ঘরের ভিতর থেকে।”
“কিন্তু তা কি সম্ভব?”
“সেটা তো আপনার ভাববার কথা।” চৌধুরানি হেসে বললেন, “ভাবার জন্যেই তো বড়িদিদি আপনাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন।…আরে মুনিমজি, আপনি কেন দাঁড়িয়ে আছেন? বসুন, বসুন।”
মুকুন্দবাবু এঁদের ঠাকুর্দার আমলের লোক, কিন্তু বয়সে যতই প্রবীণ হোন, বেতনভোগী কর্মচারী। সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর মালকিনের সামনে চেয়ার টেনে বসতে পারছিলেন না, সংকুচিতভাবে চুপচাপ এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবারে চৌধুরানির কথা শুনে একটা চেয়ারের একপ্রান্তে খুব জড়সড় হয়ে বসে পড়লেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাকে যে জানকী দেবী এখানে পাঠিয়েছেন, তা আবার আপনাকে কে বলল?”
চৌধুরানি বললেন, “কেন, আমার স্বামীর কাছ থেকে কি কথাটা আমি জানতে পারি না?”
“নিশ্চয়ই পারেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আবার এমনও হতে পারে যে, চৌধুরিজির কাছ থেকে নয়, কথাটা আপনি মুকুন্দবাবুর কাছে শুনেছেন।…কী মুকুন্দবাবু, আমি ভুল বলছি?”
মুকুন্দবাবু কিছু বললেন না। কিন্তু চকিতে একবার ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়েই যেভাবে চোখ নামিয়ে নিলেন, তাতে মনে হল, হঠাৎ তাঁর নামটা উঠে পড়ায় তিনি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। ভদ্রলোকের চোখে যে মিনতি ফুটে উঠেছিল, সেটা আমার নজর এড়ায়নি। মিনতির যে ভাষা, তার তো কোনও তর্জমা হয় না। হলে বোধহয় তর্জমা এইরকম দাঁড়াত : “এর মধ্যে আবার আমাকে টানছেন কেন স্যার? দয়া করে ভুলে যাবেন না যে, আমি এখানে নেহাতই একজন কর্মচারী।”
চৌধুরানি বললেন, “ও-সব কথা বাদ দিন। কার কাছ থেকে কোন খবর পেয়েছি, তাই নিয়ে যদি জেরা করতে থাকেন, তা হলে আসল ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাবেন কখন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসল ব্যাপারের মধ্যে ওই মুকুট নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করবার নেই, এবারে নেকলেসটার কথায় আসা যাক। ওটা কবে চুরি গেল?”
“আমার ধারণা, আপনাকে আমার স্বামী তা কালই বলেছেন।”
“তা বলেছেন। কিন্তু আপনার কাছ থেকেও সেটা আমি জানতে চাই।”
“ওটা যে কবে চুরি গিয়েছে, তা কিন্তু বলা শক্ত।”
“কেন?”
“তার কারণ, সোনার গয়না তো আর রোজ আমরা পরি না, ও সব আয়রন-চেস্টের মধ্যে থাকে, বাড়িতে কোনও উৎসব থাকলে কি কোথাও ইনভিটেশন থাকলে ওগুলো বার করে পরা হয়। তো বিজয়া দশমীর দিন মনে হল, আজ একটা ভাল দিন, সন্ধের দিকে লোকজন আসতে পারে, তাই ছেলের বউকে বললুম, কিছু গয়নাগাটি বার করে পরে নাও। সাত ভরির নেকলেসটাও তখন তাকে আয়রন চেস্ট থেকে বার করে পরে নিতে বলেছিলুম। তো আমার কাছ থেকে চাবি নিয়ে আয়রন চেস্ট খুলে সে বলল যে, নেকলেসটা পাওয়া যাচ্ছে না।”
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বার করে সে-দুটোকে টেবিলের উপরে রেখে একটু ইতস্তত করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি যদি একটা সিগারেট খাই তো আপনার তাতে খুব অসুবিধে হবে না তো?”
“তা কেন হবে?” চৌধুরানি বললেন, “আমার স্বামী সিগারেট খান না। তবে আমার বাবা খেতেন, ভাইরাও খায়। আপনি স্বচ্ছন্দে খেতে পারেন, আমার কোনও অসুবিধে হবে না।…মুনিমজি, একটা অ্যাশট্রে আনিয়ে দিন।”
মুকুন্দবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠবার উপক্রম করছিলেন, কিন্তু তার আর দরকার হল না, একজন দাসী একটা অ্যাশট্রে এনে টেবিলের উপরে রেখে গেল। ভাদুড়িমশাই ধীরেসুস্থে সিগারেট ধরালেন, চুপচাপ টানলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “বিজয়া দশমীর দিন সকালে আয়রন চেস্ট খুলে দেখা গেল যে, নেকলেসটা সেখানে নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তার আগে শেষ কবে ওই আয়রন চেস্ট খুলবার দরকার হয়েছিল।”
চৌধুরানি একটুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, “তার আগে শেষ খোলা হয়েছিল মে মাসের একেবারে শেষের দিকে। ছেলে যেদিন বোম্বাই থেকে বউ নিয়ে ফিরল, সেইদিন আয়রন চেস্ট খুলে ওই নেকলেসটা দিয়ে বউকে আমি আশীর্বাদ করি। বউভাত মিটে যাবার পর সেই রাত্তিরেই ওটা আবার তুলে রাখা হয়। বাস, তারপর আর ওই আয়রন চেস্ট খোলা হয়নি।”
“আয়রন চেস্টে শুধু গয়নাই তো থাকে না, জরুরি নানা দলিলও থাকে। সে-সব বার করবার জন্যেও মাঝে-মাঝে আয়রন চেস্ট খুলবার দরকার হয়।”
চৌধুরানি বললেন, “যেটার কথা হচ্ছে, তাতে আমরা শুধু গয়নাগাটিই রাখি, আর কিছু রাখি না। দলিলপত্র রাখবার জন্যে আলাদা আয়রন চেস্ট আছে। না, বউভাতের রাত্তির থেকে বিজয়া দশমীর মধ্যে এটা খোলা হয়নি।”
“তার মানে চুরিটা হয়েছে মে মাসের শেষ থেকে বিজয়া দশমীর মধ্যে।” সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিল, সেটাকে অ্যাশট্রের মধ্যে পিষে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সময়টা বড্ডই লম্বা হয়ে গেল। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। আয়রন চেস্টের চাবি থাকে কোথায়?”
“চাবি রিঙেই থাকে,” চৌধুরানি বললেন, “কিন্তু তা নিয়ে ভাববার কিছু নেই।”
“নেই কেন?”
“এই জন্যে যে, রিংটা আমি যেখানে-সেখানে ফেলে রাখি না, সব সময়ে সেটা আমার আঁচলে বাঁধা থাকে।”
“তা হলে তো বুঝতে হবে যে, নেকলেসটার পাখা গজিয়ে গিয়েছিল।” এটা আমার কথা।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পাখা গজালেই সিন্দুকের ভিতর থেকে উড়ে যাওয়া যায়? একটা পায়রাকে ধরে এনে যদি ওই আয়রন চেস্টের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে আমরা ডালা বন্ধ করে দিই, তা হলে সেটা উড়ে পালাতে পারবে?”
সদানন্দবাবু বললেন, “পায়রা কি পি. সি. সরকার? সে ভ্যানিশিং ট্রিক জানে?”
চৌধুরানির দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাকে আজ আর কষ্ট দেব না। আপনার ছেলে এখন কেমন আছেন?”
“তার অ্যাকসিডেন্টের কথাটা শুনেছেন?”
“আপনার স্বামীর কাছে শুনেছি।”
“এখন একটু ভাল আছে, তবে বিছানা থেকে উঠতে পারে না।”
“তাঁকে তো এ-সব কথা বলা হয়নি, কেমন?”
“বলে লাভ কী?” চৌধুরানি ক্লিষ্ট হাসলেন, “সে তো কিছু করতে পারবে না। মাঝখান থেকে এ-সব শুনে তার মন আরও খারাপ হয়ে যাবে।”
“আপনার বউমারও তো শরীর ভাল নয়। তিনি কেমন আছেন?”
“ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে আস্তে-আস্তে ভাল হয়ে উঠছে। একদিকে ছেলের এই অবস্থা, অন্যদিকে তার বউও কঠিন অসুখ বাধিয়ে বসেছে; আমাদের সময় এখন একটুও ভাল যাচ্ছে না। আমার কী মনে হয় জানেন?”
“কী মনে হয়?”
“নেকলেসটা নিয়ে আমি ভাবছি না,” প্রায় অস্ফুট গলায় চৌধুরানি বললেন, “কিন্তু কানহাইয়ার মুকুটটা আপনি উদ্ধার করে দিন। ওটা যদি ফিরে পাই তো আমার মনে হয়…আমার মনে হয় সব আবার ঠিক হয়ে যাবে।”
ভাদুড়িমশাই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলেন। বললেন, “আপনার কথাটা আমার মনে থাকবে। যদি দরকার হয় তো পরে আপনাকে আর একবার বিরক্ত করব। আজ চলি।”
কোলাপসিবল গেট পেরিয়ে হ্যাংগিং ব্রিজের উপর দিয়ে আমরা গেস্ট হাউসের দোতলায় চলে এলুম। মুকুন্দবাবু বললেন, “আপনারা কি এখন একটু চা খাবেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “অসম্ভব। সকালে সেই যে জিলিপি আর কচুরির সঙ্গে চা খেয়েছি, চায়ের উপরে তাতে আমার অভক্তি এসে গেছে। চা তো নয়, গর্মাগরম খয়ের-গোলা।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সদানন্দবাবু চা খাবেন না। কিন্তু আমি খাব। যদ্দুর মনে হয় কিরণবাবুও খাবেন।”
মুকুন্দবাবু বললেন, “ঠিক আছে, বাড়ি যাবার পথে একতলায় আমি চায়ের কথা বলে দিয়ে যাচ্ছি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা বলুন, কিন্তু তারপরেই যেন বাড়ি চলে যাবেন না। আর তা ছাড়া আপনাকেই বা চায়ের কথা বলবার জন্যে নীচে যেতে হবে কেন? আপনি বসুন। কিরণবাবু, সুইচবোর্ডে যে ‘সার্ভিস’-লেখা সুইচটা রয়েছে, ওটা টিপুন তো।”
সুইচ টিপতেই একতলা থেকে একটি লোক উপরে এসে লম্বা একটা সেলাম ঠুকে জিজ্ঞেস করল, “বুলায়া সাব?”
মুকুন্দবাবু বললেন, “চায়ের সঙ্গে আর-কিছু খাবেন? নমকিন, সামোসা, মিঠাই-উঠাই….”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্রেফ চা। আপাতত আর কিছু চাই না।”
লোকটি চলে গেল। ভাদুড়িমশাই তক্ষুনি কিছু বললেন না। নিঃশব্দে একটা সিগারেট ধরিয়ে খানিকক্ষণ একেবারে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মুকুন্দবাবুর দিকে। চুহার মতন লোকটিকে এখন ফাঁদে-পড়া চুহার মতোই দেখাচ্ছে। বুঝতে পারছিলুম যে, তিনি বেশ অস্বস্তি বোধ করছেন। তারই মধ্যে একতলার কিচেন থেকে সেই লোকটি এসে আমাদের চা দিয়ে ফের মিনিট দশেক বাদে এসে ট্রের উপরে পেয়ালা-পিরিচ গুছিয়ে নিয়ে চলেও গেল, কিন্তু ভাদুড়িমশাই তবু নির্বিকার, চুপচাপ তিনি একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছেন। মুকুন্দবাবুকে কেন যে তিনি বাড়ি যেতে না-দিয়ে এখানে বসিয়ে রেখেছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।
ভাদুড়িমশাইয়ের প্রশ্নটা যেন গুলির মতন ছুটে এল। “আপনি এদের ভাল চান না মন্দ চান?”
প্রশ্ন শুনে মুকুন্দবাবু চমকে উঠেছিলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুব কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “আমাকে জিজ্ঞেস করছেন?”
“তা ছাড়া আর কাকে করব? রামাশ্রয় চৌধুরি যা-ই করে থাকুন, তিনি আপনার ছেলের বয়সি। আপনি তাঁকে শোধরাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পুরোপুরি পারেননি। কিন্তু তাই বলেই কি আপনি চান যে, তাঁর সর্বনাশ হোক?”
মুকুন্দবাবু বললেন, “এ আপনি কী বলছেন ভাদুড়িসাব? তা আমি কখনও চাইতে পারি? আমি এঁদের নিমক খাচ্ছি না?”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে যা জিজ্ঞেস করছি, তার ঠিকঠাক জবাব দিন। জানকী দেবীকে আপনি শেষ কবে ফোন করেছিলেন?…আবার বলছি, ঠিকঠাক জবাব দিন, তা নইলে আমি কাজ করতে পারব না।”
“হর হপ্তায় দু’বার করে আগে বড়িদিদিকে ফোন করতাম। এখন তো আপনি আসিয়ে গেছেন। তাই হররোজ একবার করে ফোন করতে হবে। সেই রকমের হুকুম আছে।”
“হুকুমটা কার?”
“বড়িদিদির।”
“ফোন আপনি কোত্থেকে করেন?”
“গিরিডির একটা দুকান থেকে।”
“কিন্তু সেখান থেকে ট্রাঙ্ককলই করুন আর এস.টি.ডি.ই করুন, খৰ্চা তো নেহাত কম হয় না। সেটা যে আপনারই গাঁট থেকে যায়, তা ভাবা শক্ত। টাকাটা কে জোগাচ্ছে?”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন মুকুন্দবাবু। তারপর সেই একই রকমের কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বললেন, “সেটা আমি বলতে পারব না।”
“তো বাস,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও তা হলে কাজ বন্ধ করে কলকাতায় ফিরে যাই, কেমন?”
শুনে একেবারে হাঁহাঁ করে উঠলেন মুকুন্দবাবু। বললেন, “না না, আপনি কাজ চালিয়ে যান; ভাদুড়িসাব। নামটা আমি বলছি। কিন্তু যা বলব, সেটা আপনি কাউকে বলতে পারবেন না। তাতে আপনি রাজি আছেন?”
“ঠিক আছে, আমি রাজি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে কিনা অনর্থক আপনি ভয় পাচ্ছেন। চৌধুরানিই যে আপনার টেলিফোনের টাকা জোগাচ্ছেন, এমনিতেও আমি সে-কথা কাউকে বলতুম না।”
মুকুন্দবাবুর চোয়াল একেবারে ঝুলে পড়েছিল। সেই অবস্থায় খানিকক্ষণ একেবারে হাঁ করে তিনি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর, বিস্ময়ের ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে, জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী করে জানলেন?”
“জানি না, আন্দাজ করেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সে-কথা থাক। রঘুনন্দনের বউয়ের ব্যাপারটা কী? আপনি কিছু জানেন?”
“শুনছি তো তাঁর মন-খারাপ বেমারি।”
“তা তো আমিও শুনেছি। কিন্তু মন খারাপ হবার একটা কিছু কারণ তো থাকবে। বোম্বের মতো ভারী শহর ছেড়ে আসতে হয়েছে বলে মনে খারাপ?”
কথাটাকে মুকুন্দবাবু কোনও পাত্তাই দিলেন না। বললেন, “সে তো শাদির পরে ছোড়ে আসতেই হয়। রানি-মা কি কলকাত্তার মতন ভারী শহর ছোড়ে ইখানে আসেননি? তার জন্যে কেন মাসের পর মাস মন খারাপ থাকবে? না না, উ-সব বাত আমার বিশোয়াস হয় না। বেমারি যা ছিল, সেটা শাদির আগেও ছিল। মগর ইয়ে হো শকতা, শাদির পরে সেটা আরও বেড়েছে। হাঁ, সেটা আমি মানব। তো বেমারি যখন আছে, তখন গাড়ি চালানো শিখবার দরকার কী?”
দিব্যি কথা বলছিলেন মুকুন্দবাবু, কিন্তু এই পর্যন্ত বলেই যেন হঠাৎ আবার সতর্ক হয়ে গেলেন। নিচু গলায় বললেন, “আমি নৌকর আছি, ভাদুড়িসাব। মালিক লোগ যেটা ভাল বুঝবে, সেটা করবে। তার মধ্যে কুছু বলা আমার ঠিক না।”
কথাটা বলে মুকুন্দবাবু উঠে পড়বার উপক্রম করছিলেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল, উঠে পড়ছেন কেন?”
“একটু কাজ ছিল,” মুকুন্দবাবু বললেন, “একবার গিরিডি যাব।”
“বড়িদিদিকে ফোন করবার জন্য?”
“না না,” মুকুন্দবাবু হেসে বললেন, “সে তো আজ দুপুরবেলাতেই করেছি।”
“তা হলে আবার কী কাজ?”
“দো-চারঠো জিনিস কিনবার আছে।”
“রাত প্রায় আটটা বাজতে চলল,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আর গিরিডিতে গিয়ে দোকান খোলা পাবেন না। তা ছাড়া আমার কথা এখনও ফুরোয়নি। আর দু’একটা প্রশ্ন করব।”
মুকুন্দবাবু উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে আবার সোফায় বসে পড়ে বললেন, “ঠিক আছে। কী জানতে চান বলুন।”
“চৌধুরিজি কাল কখন ফিরবেন?”
“দুপুরবেলায় ফিরবার কথা আছে, লেকিন বিকাল হয়ে যেতে পারে।”
“আসানসোলে ওঁর কাজটা কী?”
“ওঁর ট্রাকের তো সির্ফ বিহার-পারমিট, তার বাইরে যাবার হুকুম নাই। তবু দুটা ট্রাক নাকি আসানসোলে ঘুষে গিয়েছিল। এ-রকম যে যায় না, সেটা বলব না, যায়, আবার পুলিশকে দশ-বিশ রুপেয়া দিলে তারা হাঙ্গামা করে না, ছোড়ে দেয়। লেকিন ইসবার শুনছি ছোড়েনি। তো রাজাবাবুকে সেই খবর পেয়ে আসানসোল যেতে হল। দশ-বিশ রুপেয়ায় কাম হবে না, দোশো চারশো রুপেয়া দিয়ে ছোড়াতে হবে। …আর কিছু জিজ্ঞাসা করবেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আর মাত্র একটাই কথা জিজ্ঞেস করব। রঘুনন্দনের…মানে চৌধুরিজির ছেলের অ্যাকসিডেন্টটা কবে হয়েছিল?”
মুকুন্দবাবু যে প্রশ্নটা শুনে বেশ বিস্মিত হয়েছেন, সেটা ওঁর চাউনি থেকেই বুঝতে পেরেছিলুম। বললেন, “এটা কেন জিজ্ঞাসা করছেন? রাজাবাবু আপনাদের কুছু বলেন নাই?”
“বলেছেন। কিন্তু তারিখটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। আপনার মনে আছে?”
“তা কেন থাকবে না?” মুকুন্দবাবু বললেন, “অগস্ট মাসের চৌঠা ওটা হল। বিকালবেলায়।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিছু মনে করবেন না, মুকুন্দবাবু। সত্যি কথাটা জানবার জন্যে একটা মিথ্যে কথা আপনাকে বলেছি। আসলে আপনাদের রাজাবাবুও মাস আর তারিখ দুটোই আমাদের বলেছিলেন।”
“তা হলে আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কেন?”
“এই জনে, জিজ্ঞেস করলুম যে, তাঁর দেওয়া মাস-তারিখটা নির্ভুল কি না, সেটা একটু যাচাই করে দেখবার দরকার হয়েছিল। না, মুকুন্দবাবু, আপনার দেওয়া তারিখের সঙ্গে তাঁর তারিখটা মিলছে না। তিনি বলেছেন, এটা তেসরা সেপ্টেম্বরের ঘটনা, আর আপনি বলছেন চৌঠা অগস্টের। আমার ধারণা, আপনার কথাই ঠিক। চৌধুরিজি অন্তত এই একটা ব্যাপারে সত্যি কথা বলেননি।”
মুকুন্দবাবু বললেন, “ইচ্ছা করে তিনি কেন মিছা বলবেন ভাদুড়িসাব? না না, তিনি যে ইচ্ছা করে ঝুট বলেছেন, তা আমার বিশোয়াস হয় না। তবে হাঁ, তাঁর ভুল হতে পারে।”
ভাদুড়িমশাই সে-কথায় কান না দিয়ে বললেন, “যেমন আজ সকালে দরকার হয়েছিল, কাল সকালেও তেমন একটা গাড়ির দরকার হবে। এই ধরুন আটটা নাগাদ।”
“ঠিক আছে,” মুকুন্দবাবু বললেন, “যে-লোকটা গাড়ির চার্জে আছে, তাকে আমি বলে দিয়ে যাচ্ছি। তো আজ কোন গাড়িটা আপনারা নিয়েছিলেন?”
“সবুজ রঙের একটা ফিয়াট। ওই যেটাতে করে কাল গিরিডি গেস্ট হাউস থেকে এখানে এলুম।”
“ঠিক আছে, সেটাই পাবেন।” মুকুন্দবাবু উঠে পড়লেন। কিন্তু দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন আবার। বললেন, “ওই গাড়িতেই কিন্তু অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।”
