ছয়
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সত্যপ্রকাশ ফিরে এলেন। মুখ গম্ভীর। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল?”
“ঝামেলা হল।” হাতের টর্চটা নামিয়ে রেখে সত্যপ্রকাশ বললেন, “যে মেয়েটি আয়ার কাজ করে, সে আর এখানে থাকতে চাইছে না।”
“সে-ই চেঁচিয়ে উঠেছিল বুঝি?”
“হ্যাঁ। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল।”
“কীসের ভয়?”
“ভূতের। বলছে, জানলা দিয়ে কে যেন ঘরের মধ্যে উঁকি মেরেছিল। সে চেঁচিয়ে উঠতেই লোকটা পালিয়ে যায়। আয়া বলছে, মানুষ নয়, ভূত।”
“হঠাৎ ভূতের কথা উঠল কেন?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “আর বলবেন না। এরা গ্রামের লোক, এমনিতেই এক-একটা কুসংস্কারের ডিপো, সন্ধে হতে না হতেই ভূতপেত্নির ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে থাকে, তার উপরে আবার মন্দির থেকে বিগ্রহ চুরি যাওয়ার পরে এদের ভয়টা আরও বেড়েছে। গাছ থেকে পাতাটা খসে পড়লেও বলছে যে, ভূতে পাতা ফেলছে।”
ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “বিগ্রহের কথা বলুন। ঠিক কবে ওটি উধাও হয়েছে?”
“বলছি।” সত্যপ্রকাশ একটি সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর বললেন, “সবই আপনাদের বলব। প্রথমে ভেবেছিলুম, দু-একটা কথা চেপে গেলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু পরে মনে হল, সবই আপনাদের জানা দরকার, তা নইলে এই ব্যাপারটার তাৎপর্য আপনারা ঠিক ধরতে পারবেন না। আবার সব কথা যদি শোনেন, তা হলে এমনও আপনাদের মনে হতে পারে যে, কুসংস্কার আমারও কিছু কম নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “অত কিন্তু-কিন্তু করবেন না। কুসংস্কার সকলেরই কিছু-না-কিছু থাকে। ইউরোপ-আমেরিকার লোকরা তো ভাবে….শুধু ভাবে কেন, খোলাখুলি বলওে যে, এই প্রাচ্য পৃথিবীই হচ্ছে কুসংস্কারের সবচেয়ে বড় আড়ত। অথচ…”
আমি বললুম, “অথচ কুসংস্কার ইউরোপ-আমেরিকাতেও কিছু কম নেই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নেই-ই তো। সেখানকার বিস্তর লোক আজও কালো-বেড়ালকে অমঙ্গলের দূত বলে ভাবে, আর পারতপক্ষে তেরো-তারিখে কোনও শুভকর্মে হাত দিতে চায় না।”
“তা ছাড়া,” আমি বললুম, “এ দেশে এলে মঘা-অশ্লেষাকেও তারা এড়িয়ে চলে। প্রভাত মুখুজ্যে মশাই এই নিয়ে বড় চমৎকার একটি গল্প লিখেছিলেন।”
“সুতরাং কুণ্ঠিত হবেন না, সত্যবাবু।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা বলবার, নির্ভয়ে বলুন।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “প্রথমেই জানিয়ে রাখি যে, আমরা এই অঞ্চলের মানুষ নই। অনেক কাল এদিকে আছি তো, তাই এখানকার লোকদের কথাবার্তায় যে একটা অন্যরকমের টান থাকে, আমাদের কথাবার্তাতেও সেটা ঢুকে পড়েছে। আমরা আসলে অন্য জায়গা থেকে এখানে এসেছি।”
আমি বললুম, “সে তো অনেকেই এসেছে। বিশেষ করে পার্টিশানের পর থেকে। আপনারাও নিশ্চয় পুব-বাংলা থেকে এসেছিলেন?”
“না না, আমরা পুব-বাংলার লোক নই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “পার্টিশানের অনেক আগে থেকে আমরা এখানে আছি। তা সেই নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির একেবারে শেষ দিক থেকে।”
“ওরে বাবা,” চারু ভাদুড়ি বললেন, “এ তো দেখছি মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমলের ব্যাপার।”
“তা বলতে পারব না, তবে এগজ্যাক্ট সময়টা বলতে পারি, এইট্রিন নাইনটিওয়ান।”
“আপনাদের আদি বাড়ি কোথায় ছিল?”
“বর্ধমান জেলায়।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “গ্রামের নামটা আর বলছি না, বললেও আপনারা চিনতে পারবেন না। তা সেই গ্রাম থেকে আমার ঠাকুরদাই প্রথমে এদিকে এসে এই মুকুন্দপুর গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন। সঙ্গে টাকাপয়সা বেশি আনেননি, তবে যা এনেছিলেন তা-ই যথেষ্ট। সেই টাকায় যেমন এখানে, তেমনি আশেপাশেও একেবারে জলের দরে কিছু জমিজমা কিনেছিলেন। তার কিছুটা তিনি ভাগচাষিদের দিয়েছিলেন বটে, তবে বেশির ভাগই মাইনে-করা লোক দিয়ে চাষ করাতেন। ফসল যা পেতেন, তাতে সংসারের দরকার তো মিটতই, বিক্রিও হত প্রচুর। সত্যি বলতে কী, বর্ধমানে থাকতে আমার ঠাকুর্দার অবস্থা খুব ভাল ছিল না, এখানে আসবার পর থেকেই তাঁর কপাল ফিরে যায়।”
ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন জ্বলছে। তাতে খানিকটা জায়গা আলো হয়েছে বটে, কিন্তু বাকিটা অন্ধকার। তাই, নিরু যে কখন ঘরে এসে ঢুকেছে, আমরা বুঝতে পারিনি। সত্যপ্রকাশ বললেন, “কিছু বলবে?”
নিরু বলল, “আপনাদের কি কিছু লাগবে, দাদাবাবু? উনুনে আগুন রয়েছে, বলেন তো কফি করে দিতে পারি।”
সত্যপ্রকাশ আমাদের দিকে তাকালেন। আমরা মাথা নাড়লুম দেখে সত্যপ্রকাশ বললেন, “না, আর কিছু লাগবে না। মা আর পিসিমা শুয়ে পড়েছেন তো?”
“হ্যাঁ।”
“তুমিও শুয়ে পড়ো গিয়ে।”
চারু চলে গেল। সত্যপ্রকাশ বললেন, “যা বলছিলুম। আমার ঠাকুর্দার নাম মহেশ্বর চৌধুরি। তাঁর দুই ছেলে। নিত্যপ্রকাশ আর চিত্তপ্রকাশ। মেয়ে একটি। নাম সত্যভামা। ঠাকুর্দা খুব ঘটা করে জলপাইগুড়িতে এক বড়লোক ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়নি। জামাতা বাবাজীবনের হরেক রকমের দোষ ছিল, তার মধ্যে একটা হচ্ছে মাত্রাহীন সুরাসক্তি। অতি অল্প বয়স থেকেই তিনি মদ্যপান করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু ওই যা বলছিলুম, এ ব্যাপারে তাঁর কোনও মাত্রাজ্ঞান ছিল না। ফলে তিরিশে পৌঁছবার আগেই লিভারের বারোটা বাজিয়ে তিনি ফৌত হয়ে যান। আমার পিসিমার বয়স তখন কুড়ি-বাইশ। তারপরে আর তিনি জলপাইগুড়িতে থাকেননি। ছেলেপুলে না-হওয়ায় শ্বশুরবাড়ির উপরে তাঁর বিশেষ টানও ছিল না। বিধবা হবার মাসখানেকের মধ্যেই তিনি বাপের বাড়িতে চলে আসেন।”
আমি বললুম, “তিনিই তো আপনার একমাত্র পিসিমা। খাবার ঘরে তা হলে আপনার মায়ের সঙ্গে তাঁকেই আমরা দেখেছি।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার মা আর পিসিমার বয়েস প্রায় একই, এক-আধ বছর এদিক-ওদিক হতে পারে। দুজনে খুব ভাব। পিসিমা যেমন শ্বশুরবাড়িতে যাননি, তেমনি মা-ও কখনও তাঁকে যেতে দেননি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই নিরু মেয়েটি কে? আপনাদের কোনও আত্মীয়া?”
“না মশাই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “নিরু আমাদের কেউ নয়। পাশের গাঁয়ের মেয়ে। ওর বয়েস যখন কুড়ি-বাইশ, তখন টাইফয়েডে ওর স্বামী মারা যায়। তা সে প্রায় বছর দশেক আন্দ্রে কথা। একটা দেওর ছিল, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর দিন-দশেকের মধ্যেই নিরু বুঝতে পেরে যায় যে, দেওরের মতলব খুব ভাল নয়। আমার মা-কে সেই কথা বলে এখানে আশ্রয় চেয়েছিল। বাস, সেই থেকে নিরু এ-বাড়িতে রয়েছে।”
“ওর ছেলেপুলে নেই?”
“একটা ছেলে ছিল। কিন্তু ছেলেটা মারা গিয়েছিল স্বামীর মৃত্যুর আগের বছরেই। সেও টাইফয়েডের ব্যাপার।”
“নিরু এ-বাড়িতে কী কাজ করে?”
“মা আর পিসিমার সেবাযত্ন করে। দুজনেই বুড়োমানুষ, নিরুকে পেয়ে ওঁদের ভালই হয়েছে।”
“আপনার ঠাকুর্দার কথা বলুন। আপনি তাঁর জমিজমার কথা বলেছেন। কিন্তু আপনাদের আয় তো শুধু জমি-জমা থেকে নয়, ব্যাবসাও বেশ বড় মাপের। এই ব্যাবসার পত্তনও কি তাঁর আমলেই হয়েছিল?”
“না।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার ঠাকুর্দার চরিত্র যা আমি আন্দাজ করতে পারি, তাতে মনে হয়, শুধু জমিজমা বাড়িয়ে সন্তুষ্ট থাকবার মতো মানুষ তিনি ছিলেন না, জমি থেকে যা আয় হত, তার থেকে কিছু-না-কিছু সঞ্চয় করে সেই পুঁজি নিয়ে হয়তো ব্যাবসাতেও নামতেন তিনি। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। আসলে তাঁর মন ইতিমধ্যে ভেঙে গিয়েছিল।”
“কেন?”
“একটা কারণ আমার পিসিমা। একমাত্র মেয়ে, মাত্র কুড়ি-বাইশ বছরে সিঁথির সিঁদুর মুছে, হাতের শাঁখা ভেঙে, থানকাপড় পরে সে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এল, বলতে গেলে কোনও সাধ-আহ্লাদ তার মিটল না, এই ধাক্কাটা ঠাকুর্দা সামলে উঠতে পারেননি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার কথা থেকে বুঝতে পারছি, মহেশ্বর চৌধুরির মন ভেঙে যাওয়ার আরও একটা কারণ ছিল। সেটা কী?”
“দ্বিতীয় কারণ আমার কাকা।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনাদের আমি বলেছি যে, আমার ঠাকুর্দার পুত্রসন্তান হয়েছিল দুটি। বড় ছেলে নিত্যপ্রকাশ আমার বাবা। তাঁর লেখাপড়া বিশেষ এগোয়নি। সেই তুলনায় ছোট ছেলে চিত্তপ্রকাশ ছিলেন অনেক মেধাবী ছাত্র। আলিপুরদুয়ার থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তিনি জলপানি পান। ঠাকুমা তখন জিদ করতে থাকেন যে, তাকে কলকাতায় রেখে পড়াতে হবে।”
“তা-ই হয়েছিল?”
“ঠাকুর্দার তাতে মোটেই সায় ছিল না। কিন্তু মায়ের সঙ্গে ছেলেও বায়না ধরে বসল যে, কলকাতায় সে যাবেই। ফলে ঠাকুর্দা তাকে কলকাতার এক নাম-করা কলেজে ভর্তি করে দিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। কলেজের কাছেই হস্টেল। সেইখানে তাকে রাখার ব্যবস্থা হল।”
“তারপর?”
“তারপর সেই হস্টেল থেকেই একদিন নিখোঁজ হয়ে গেলেন চিত্তপ্রকাশ। গেলেন তো গেলেনই, কোনও খোঁজই আর তাঁর পাওয়া গেল না। পিসিমার বিয়ের বছর দুই-তিনের মধ্যেই এই ঘটনা। বুঝতেই পারেন, ঠাকুর্দা এই ঘটনায় কতটা আঘাত পেয়েছিলেন। তারপর তাঁর একমাত্র মেয়েরও যখন কপাল পুড়ল, শোকে দুঃখে ঠাকুর্দা তখন প্রায় উন্মাদ হয়ে যান। মায়ের কাছে শুনেছি, দিবারাত্রি ঠাকুর্দা তখন নাকি ঠাকুরঘরেই পড়ে থাকতেন। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতেন না, শুধু মাঝে-মাঝে তাঁর বুক-ফাটা হাহাকার শোনা যেত—মা, এ .তুই আমার কী করলি?”
সত্যপ্রকাশ আবার একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাত এগারোটা বাজে। আপনাদের ঘুম পায়নি তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না। আপনার বাবার কথা বলুন।”
“বাবার লেখাপড়া যে বিশেষ এগোয়নি, তা তো আপনাদের বলেছি। তবে তিনি উদ্যোগী মানুষ ছিলেন। পিসিমা বিধবা হয়ে এখানে চলে আসার পরে আমার ঠাকুর্দা বেশিদিন বাঁচেননি, তার বছর দুয়েকের মধ্যেই তিনি মারা যান। সংসারের দায়িত্ব তখন পুরোপুরি বাবার উপরে এসে পড়ে। তাঁরই আমলে পত্তন হল আমাদের কাঠের ব্যাবসার। জমিজমার উপরে নির্ভর করে যে বেশিদিন থাকা যাবে না। সেটা তিনি বুঝতে পরেছিলেন। তা ছাড়া তাঁর ব্যাবসা-বুদ্ধি ছিল খুবই ধারালো। সেইসঙ্গে জনাকয় সৎ লোকের সাহায্য পেয়েছিলেন তিনি। ফলে, জঙ্গলের ইজারা নেওয়া কি কাঠ কেনা-বেচার ব্যাপারে কখনও তিনি মার খাননি। বছর কয়েকের মধ্যেই তাঁর ব্যাবসার ভলুম হু হু করে বেড়ে যায়। বছর দশেক আগে তিনি মারা গেছেন।”
“শিলিগুড়িতে যে আপনার হোটেল আর ট্রাকের ব্যাবসার কথা শুনেছি, তারও শুরু কি আপনার বাবার আমলেই?”
“না, ও দুটো আমি শুরু করেছি।” সত্যপ্রকাশ বলেলেন, “টাকা তো ফেলে রাখতে নেই, তাকে খাটাতে হয়। শিলিগুড়িতে এখন হোটেলের ব্যাবসায় মার খাবার কোনও ভয় নেই, আর ট্রাকের ব্যাবসার সঙ্গে তো এখানকার কাঠের ব্যাবসা একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, ফলে সেখানেও কোনও লোকসানের কথা উঠছে না। আমি তো আরও গোটা দুই-তিন ট্রাক কেনার কথা ভাবছি।”
আমি বললুম, “মাঝে-মাঝে যে ট্রাক থেকে মাল লুঠ হয়ে যাবার খবর পড়ি?”
“সে তো ইনসিওর-করা মালপত্র। লুঠ হলেই বা লোকসান কী? অন্তত ব্যক্তিগতভাবে তো কারও কোনও লোকসান হবার কথা নয়।” সত্যপ্রকাশ হাসতে লাগলেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করছি। আপনার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা কি শিলিগুড়িতেই থাকেন?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “বছর পাঁচেক আগে আমার স্ত্রী মারা গেছেন। ছেলেমেয়ে তিনটি। দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে। ছেলেটিই সবার ছোট।”
“তারা কোথায় থাকে?”
“বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সে কলকাতায় থাকে। ছোট মেয়ে আর ছেলেটি থাকে দার্জিলিঙে। দুজনেই হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করে।”
“আপনার ভাইবোনেরা?”
“আমার ভাইও নেই, বোনও নেই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “বাপ-মায়ের আমিই একমাত্র সন্তান।”
“স্ত্রী মারা যাবার পরে আপনি আর বিয়ে করার কথা ভাবেননি?”
“আমি ভাবিনি, তবে মা আর পিসিমা ভেবেছিলেন। ভাবছিলেন আমার বন্ধুবান্ধবরাও।” সত্যপ্রকাশ হাসতে-হাসতেই বললেন, “ওই যে একটা কথা আছে না, যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই, এ হল সেই ব্যাপার। আমার বিয়ের ভাবনায় আমার বন্ধুবান্ধবদের ঘুম হচ্ছিল না। তা ঘুম তাঁদের না-হতেই পারে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, তাঁদের প্রত্যেকেরই একটি করে গলগ্রহ ভাগ্নি কি ভাইঝি কি শালি রয়েছে, সেটিকে আমার ঘাড়ে না চাপানো পর্যন্ত তাঁদের ঘুম হবার আশা নেই। না মশাই, ব্যাবসা-ট্যাবসা নিয়ে এই দিব্যি আছি। ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে, বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, দু-দিন বাদে তারও ছেলেপুলে হবে, এখন বুড়োবয়সে টোপর পরে আমি যদি ছাঁদনাতলায় গিয়ে দাঁড়াই, লোকে তো তা হলে ছ্যা-ছ্যা করবে!”
“এখানে আপনাদের এই পৈতৃক বাড়িতে তা হলে থাকেন কে?”
“থাকেন আমার মা আর পিসিমা! তা ছাড়া থাকে রামদাস আর তার নাতনি রঙ্গিলা। তা ছাড়া থাকে নিরু। আর হ্যাঁ, বাড়িতে নিত্যপূজার একটা ব্যবস্থা আছে তো, তাই একজন পুরুতঠাকুরও থাকেন। শিলিগুড়িতে খুব কাজের চাপ না থাকলে সপ্তাহান্তে আমিও একবার করে আসি। শনিবার রাতে চলে আসি। তারপর রোববারটা এখানে কাটিয়ে সোমবার আবার শিলিগুড়িতে ফিরে যাই। তবে কিনা ওই যা বললুম, হাতে তেমন কাজ না থাকলে আসি, কাজের চাপ থাকলে আসতে পারি না।”
“এখানেও তো অনেক কাজ। সে-সব কে করে?”
“বাড়ির কাজকর্ম যারা করে, তারা গ্রামেরই লোক। কেউ রান্নার কাজ করে, কেউ কাপড় কাচে, কেউ বাসন-কোশন মাজে, কেউ জল তোলে, কেউ ঝাঁট-পাট দেয়। তবে তারা কেউ রাত্তিরে এ-বাড়িতে থাকে না, কাজকর্ম সেরে যে যার বাড়িতে চলে যায়।”
“জমিজমার কাজ?”
“কিছুটা ভাগচাষিরা করে, আর নিজেরা জন খাটিয়ে যে জমিতে চাষ করাই, তার তদারকি করে রামদাস। ও আমার বাবার আমলের বিশ্বাসী লোক,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “ওকে নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। জানেন, আমি যখন ইস্কুলে পড়ি, তখন ও একবার বাঘের মুখ থেকে আমাকে ছিনিয়ে এনেছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে?”
সত্যপ্রকাশ তাঁর পাঞ্জাবির আস্তিন গুটিয়ে বাঁ-হাতটা আমাদের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই দেখুন।”
কনুই আর কব্জির মাঝখানে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে একটা শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন। চামড়া এখনও কুঁচকে আছে। দেখে বোঝা যায়, জখমটা বেশ বড় রকমেরই হয়েছিল। হাতটা সরিয়ে নিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “লছাড়া হয়ে একটা লেপার্ডের মুখে পড়ে গিয়েছিলুম। রামদাস যদি না টাঙ্গি নিয়ে লাফিয়ে পড়ত, তা হলে সেইদিনই আমার খেল খতম হয়ে যেত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর কেউ তা হলে থাকেন না আপনাদের এই বাড়িতে?”
সত্যপ্রকাশ একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “থাকতেন না, কিন্তু এখন থাকেন।”
“কে?”
“আমার সেই কাকা। চিত্তপ্রকাশ। মূর্তিটি যেদিন নিখোঁজ হয়, তার দিন সাতেক আগে ফিরে : এসেছেন।”
