মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

চৌতিরিশ

এই কাহিনির আর মাত্র একটুখানি বাকি, এবারে সেইটুকু বলব। তার আগে আর দু-একটা কথা সংক্ষেপে বলে নিই। সাধুবাবার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। যেমন হঠাৎ তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ আবার সেদিন থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। রঙ্গিলা ভাল আছে, তবে সেদিন ভোর-রাতে যে কী হয়েছিল, কিছুই তার মনে নেই। শিলিগুড়ি থেকে তার নতুন আয়া এসে পৌঁছেছে। নিরু যে সুহাসিনী, মা আর পিসিমাকে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দু’জনেই খুব খুশি। কাল কালীপুজো গেল। মুকুন্দপুরে কালীপুজো হয় না, তাই বোমা-পটকাও ফাটেনি। রাত্তিরে তাই চমৎকার ঘুম হয়েছিল। আজ সকালবেলায় সত্যপ্রকাশ নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাগডোগরায় নিয়ে এসেছেন। মুকুন্দপুর থেকে রওনা হবার সময় সুহাসিনী যে-রকম কৃতজ্ঞ চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল, চট করে সেটা ভোলা যাবে না।

 

প্লেন লেট। সত্যপ্রকাশ ব্যস্ত মানুষ। তবু বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি চলে যাননি, এয়ারপোর্টের রেস্তোরাঁয় বসে অপেক্ষা করছেন আমাদের সঙ্গে। কথায়-কথায় তিনি বললেন, “আমি আপনাদের বলেছিলুম যে, মনসামূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবার পর মুকুন্দপুরে কাউকে সাপে কাটেনি। ওটা কিন্তু মিথ্যে কথা নয়। সত্যিই আমাদের গ্রামে সাপে কাটার ঘটনা তার পরে এই প্রথম ঘটল।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সে আর কী করা যাবে। গোবিন্দ একটা মারাত্মক খারাপ কাজ করেছিল। তার জন্যে একটা শাস্তিও পাওনা ছিল তার। তবে কিনা, মানুষের দরবারে সে-শাস্তি কবে হবে না-হবে, মনসাদেবী সম্ভবত ধৈর্য ধরে তার জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারলেন না, নিজেই পেয়াদা পাঠিয়ে তাকে ছুলে দেবার ব্যবস্থা করলেন।”

 

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর সত্যপ্রকাশ বললেন, “মেয়েটাকে গোবিন্দ কী দিয়ে জখম করল বলুন তো?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হলফ করে সেটা বলতে পারব না, তবে গোবিন্দ তো তখন মূর্তি নিয়ে পালাচ্ছিল, সেই অবস্থায় রঙ্গিলার সামনে পড়ে যায়। তা আমার বিশ্বাস, মূর্তিটা দিয়েই সে রঙ্গিলার মাথা ফাটিয়ে দেয়।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা-ই হবে। সম্ভবত সেইজন্যেই মূর্তিটা একটু ড্যামেজড হয়েছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাই নাকি?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ইঁদারা থেকে তুলে আনার পর মূর্তিটা দেখলেন না? মূর্তিকে যে সাপটা জড়িয়ে রয়েছে, তার লেজের একেবারে ডগার খানিকটা অংশ ভেঙে গেছে। তবে কিনা এমনও হতে পারে যে, ইঁদারা থেকে তুলবার সময়েই হয়তো অসাবধানে ভেঙে গিয়ে থাকবে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও হতে পারে।”

 

আমি আর কিছু বললুম না। কুচকুচে কালো যে সাপের কামড়ে গোবিন্দ মরেছে, ছোবল মেরে সেটা পালিয়ে গেলেও তার লেজের ডগাটাকে আমি গোবিন্দর শাবলের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছিলুম। গোবিন্দ তার হাতের শাবলটা যখন ফেলে দেয়, তখন তারই আঘাতে হয়তো সাপের লেজের ডগার দিকটা কেটে গিয়ে থাকবে। কিন্তু সে-কথা এখন চেপে যাওয়াই ভাল। সব কণা কি সব সময় বলা যায়? না বলা উচিত?

 

তা ছাড়া, বলবার সময়ই বা এখন কোথায়? এই মাত্র ঘোষণা করা হল, প্লেন এসে গেছে, ‘প্যাসেঞ্জারস ফর ক্যালকাটা, প্লিজ প্রসিড ফর ইয়োর সিকিওরিটি চেক।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *