মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

একতিরিশ

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পৌনে এগারোটা বাজে। ঠিক বারোটায় আমরা রঙ্গিলার ঘরে গিয়ে ঢুকব। তার মানে আমাদের হাতে এখনও সওয়া এক ঘন্টা সময় রয়েছে। কিরণবাবু, স্বচ্ছন্দে আপনি এখন ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিতে পারেন।”

 

বললুম, “খেপেছেন নাকি? বারোটায় যাকে ভূত ধরতে বেরোতে হবে, এগারোটায় তার পক্ষে ঘুমোনো সম্ভব? কেউ পারে?”

 

“কেন, না-পারবার কী আছে?”

 

“বেশ তো, আপনি যদি পারেন তো ঘুমিয়ে নিন; ঠিক পৌনে বারোটায় আমি আপনাকে তুলে দেব। কিন্তু, মশাই, একটা কথা ভেবে দেখুন, বারোটার আগেই কিছু ঘটে যাবে না তো?”

 

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “বারোটা কেন, দু’টো-আড়াইটের আগে কিছু ঘটবে না।”

 

“কেন, তার আগে ঘটতেই বা বাধা কোথায়?”

 

“বাধা নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে কিনা রাত্তিরের প্রথম দিকটায় মানুষের ঘুমটা থাকে একটু পাতলা-রকমের, যার জন্যে চোর ওই সময় গেরস্তবাড়িতে পারতপক্ষে ঢুকতে চায় না। তারও ধরা পড়বার ভয় আছে তো। মানুষের ঘুম সবচেয়ে গাঢ় হয় কখন জানেন? রাত দু’টো-আড়াইটে থেকে চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যে। ফলে চুরিও হয় ওই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি। আমার বিশ্বাস, এক্ষেত্রেও যা ঘটবার, তা ওই সময়েই ঘটবে।”

 

“ঠিক আছে, তা হলে আপনি শুয়ে পড়ুন।”

 

“থাক, আপনি যখন ঘুমোচ্ছেন না, তখন আমিও না হয় জেগেই রইলুম। ঠিক আছে, দরকারি জিনিসগুলোও এই ফাঁকে গুছিয়ে নিতে পারব। তবে আলোটা একেবারে কমিয়ে দিন, জানলাগুলোও বন্ধ করুন। আমরা যে জেগে আছি, বাইরে থেকে তা কেউ বুঝতে না পারে।”

 

“তা তো হল, কিন্তু ঘর অন্ধকার হয়ে গেলে গোছগাছ করবেন কী করে?”

 

“ও নিয়ে ভাববেন না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অন্ধকারেও আমি মোটামুটি দেখতে পাই। তা ছাড়া, শিলিগুড়ির হংকং-বাজারে আজ যা-যা সওদা করেছি, তার মধ্যে একটা পেনসিল-টর্চও আছে। তবে কিনা এখুনি তার দরকার হবে না। ও হ্যাঁ, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনার আলোয়ানটা কী রঙের?”

 

“নস্যি-রঙের।”

 

“বাঃ, ভালই হল। সাদা পোশাক পরে বার হবেন না, অন্ধকারেও দেখতে পাওয়া যাবে। ঘুমোবার সময় যে নীল পায়জামাটা পরেন, ওইটে পরে নেবেন। জামাটাও সাদা হওয়া চলবে না। রঙিন শার্ট কি পাঞ্জাবি না-থাকলে বলুন, আমার থেকে একটা দিয়ে দেব। তার উপরে ওই নস্যি-রঙা আলোয়ান দিয়ে নিজেকে যতটা পারেন ঢেকে নেবেন।”

 

“আপনি কী পরবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “আমার জন্যে ভাববেন না। যেখানেই যাই, কালো এক সেট পায়জামা-পঞ্জাবি আমি সঙ্গে রাখি। অর্ডার দিয়ে কালো সিল্কের একটা মুখ-ঢাকা মাঙ্কি ক্যাপও বানিয়ে নিয়েছি। সে-সব যখন আমি পরে নেব, অন্ধকার রাতে এক-হাত দূর থেকেও তখন বুঝতে পারবেন না যে, একটা লোক আপনার একেবারে সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।…কিন্তু না, আর কথা নয়। এবারে জানালাগুলো বন্ধ করুন, আলোটাও একেবারে কমিয়ে দিন।”

 

জানালা বন্ধ করে, হ্যারিকেনের ফিতেটাকে যথাসম্ভব নামিয়ে দিয়ে একদিকের একটা চেয়ারে এসে বসলুম আমি। হ্যারিকেনটা একেবারে নিবু-নিবু হয়ে জ্বলছে। আলো এখন এতই কম যে, ঘরের মধ্যে স্পষ্ট করে কিছুই ঠাহর হচ্ছিল না। শুধু আবছা-আবছা যা দেখছিলুম, তাতে মনে হল, ভাদুড়িমশাই একটা ব্যাগের মধ্যে কিছু তরে নিচ্ছেন।

 

বারোটা বাজতে যখন মাত্র দু-তিন মিনিট বাকি, ঠিক তখনই নিঃশব্দে আমাদের ঘর থেকে আমরা বেরিয়ে এলুম। আর বেরিয়েই মনে হল যেন ঝুপ করে একেবারে অন্ধকারের অতলে আমরা তালিয়ে গিয়েছি। ঘরের মধ্যেও যে আলো ছিল, তা নয়, কিন্তু এ একে বারে মিশকালো নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ভাদুড়িমশাই আমার সামনে, হাত বাড়িয়ে তাঁর কাঁধটা আমি ছুঁয়ে আছি, নইলে তিনি যে আমার থেকে মাত্র এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সেটাও আমি বুঝতে পারতুম না। আজন্ম যারা শহরের মানুষ, এমন জমাট অন্ধকার তারা কস্মিনকালেও দেখেনি। দেখা সম্ভবই নায়।

 

কথায় বলে অন্ধের কিবা রাত্রি কিবা দিন। খুবই সত্যিকথা। তবে কিনা বড়-বড় সব শহরের ক্ষেত্রে এই কথাটা একেবারে উল্টোদিক থেকেও সত্যি। সেখানেও দিন আর রাত্রির মধ্যে কোনও ফারাক নেই। থাকলেও সেই ফারাকটা খুব বড়-রকমের নয়। সেখানেও রাত্রি নামে বটে, তবে অন্ধকার নামে না। কী করে নামবে। ঘরবাড়ি আর রাস্তাঘা`ের আলো তো আছেই, তার উপরে আবার বিজ্ঞাপনের নিয়ন-সাইনের দপদপানিই যেন অন্ধকারকে কাছে আসতে দেয় না, রক্তচক্ষুর নিঃশব্দ ধমক মেরে তাকে শহরের সীমানার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে। এই রকমের প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের কথা সেখানে ভাবাই যায় না।

 

মিনিট খানেক একেবারে ঝিম মেরে আমি দাঁড়িয়ে রইলুম। ভাদুড়িমশাই বলে দিয়েছিলেন, অন্ধকারটা যতক্ষণ পর্যন্ত না চোখে একটু সয়ে আসছে, ততক্ষণ যেন এক পাও না এগোই। তা আস্তে-আস্তে সেটা সয়ে এলও। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী। চাঁদ নেই। কিন্তু গোটা আকাশ জুড়ে আজও অজস্র অসংখ্য নক্ষত্র একেবারে বিজবিজ করছে। মনের যা অবস্থা, তাতে আজ অবশ্য তারাগুলোকে আর হিরের কুচি বলে ভাবা গেল না,—মনে হল ওগুলো যেন আকাশের গা-ভর্তি ঘামাচি। তারই আবছা আলোয় চারপাশটা যেন একটু-একটু করে ঠাহর হতে লাগল। ঘষা কাচের মধ্যে দিয়ে কাউকে দেখলে যেমন একটা আবছা আভাসমাত্র পাওয়া যায়, এও অনেকটা সেইরকম।

 

বারান্দা থেকে আস্তে-আস্তে পা ফেলে আমরা বাইরের উঠোনে নেমে এলুম। কিন্তু উঠোনটা সরাসরি পার না হয়ে বারান্দার ধার ঘেঁষে ঘেঁষে চলে গেলুম ইঁদারাটার দিকে। তারপর ইঁদারার চত্বর পেরিয়ে, মন্দিরের পিছন দিয়ে খানিকটা এগিয়ে, ডাইনে ঘুরে আবার উঠোনে এসে পড়লুম। দু’পা এগোলেই রামদাসের ঘর। দরজা খোলাই ছিল। পাল্লাটা আস্তে ঠেলে ভিতরে ঢুকলুম আমরা; ঢুকেই আবার পাল্লাটা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিলুম।

 

ভাদুড়িমশাই তাঁর পেনসিল-টর্চটা জ্বেলেই আবার নিবিয়ে দিলেন। রামদাস ঘুমোয়নি। চুপ করে সে তার তক্তাপোশের উপরে বসে আছে। আবার টর্চ জ্বাললেন ভাদুড়িমশাই। রামদাস কিছু বলতে যাচ্ছিল; ভাদুড়িমশাই ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, এখন একটাও কথা চলবে না। পার্টিশানের দরজা দিয়ে রঙ্গিলার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লুম আমরা।

 

রামদাসের ঘরে আলো ছিল না। এ-ঘরে কিন্তু একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। তবে তার ফিতেটা নামানো, আলোও তাই জোরালো নয়। ভাদুড়িমশাই ফিতেটা আরও নামিয়ে দিলেন।

 

এ-ঘর আগেও দেখেছি। এর দক্ষিণ আর পুব, দু’দিকে দুটো জানালা। রোগীর ঠান্ডা লাগতে পারে, সম্ভবত এই আশঙ্কাতেই জানালা দুটো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ঘরের এক দিকে, পার্টিশান ঘেঁষে, পুবে-পশ্চিমে লম্বালম্বি করে পাতা একটা তক্তাপোশ। পুব দিকের জানালাটা সেই তক্তাপোশের শিয়রে। তক্তাপোশের বিছানার উপরে পাতলা নাইলনের একটা মশারি খাটানো। ম্লান আলোতেও মোটামুটি ঠাহর করা গেল যে, পুবের জানালার দিকে মাথা রেখে রঙ্গিলা ঘুমিয়ে আছে। ঘরটার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে পুবের জানালাটা খুলে দিলেন ভাদুড়িমশাই। দক্ষিণের জানালা বন্ধই রইল।

 

ঘরের পশ্চিম দিকের দেওয়াল যেখানে দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে গিয়ে মিশেছে, সেখানে কোণ-বরাবর দুই দিকের দুই দেওয়ালে দুটো পেরেক পুঁতে খাটানো রয়েছে একটা দড়ি। ঘরে আলনা নেই, দড়িটাই আলনার কাজ করে। তাতে গোটা দুই শাড়ি আর ব্লাউজ ঝুলছে। ভাদুড়িমশাই কী যেন ভাবলেন, তারপর আমার গা থেকে আলোয়ানখানা খুলে নিয়ে সেই দড়ির উপরে সেটাকে একটা পর্দার মতো করে ঝুলিয়ে দিলেন। তাঁর নির্দেশ-মতো ঘরের এক দিকে আমাদের বসবার জন্যে রামদাস দুটো মোড়া রেখে দিয়েছিল। মোড়া দুটোকে ঝুলন্ত আলোয়ানের “পছনে সরিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশাই। তারপর হ্যারিকেনটা একেবারে নিবিয়ে দিয়ে, পেনসিল-টর্চ জ্বেলে, একটা মোড়ায় নিজে বসে অন্যায় আমাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। পেনসি।-টর্চ নিবে গেল। প্রায় অস্ফুট গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “চুপ করে বসে থাকুন। যা-ই ঘটুক, ভয় পাবেন না।”

 

ভাদুড়িমশাই বুঝতে পেরেছিলেন, আমি ভয় পেয়েছি। পাবারই কথা। আমাদের ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসি, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল যে, আজ রাতে ভয়ঙ্কর কোনও ঘটনা ঘটবে। তা ছাড়া, ডান-পায়ের হাঁটুর ব্যথাটা ক্রমেই যেন বেড়ে যাচ্ছিল। মন্দিরের পিছন দিয়ে আসবার সময় একটা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। তখনই হাত বুলিয়ে বুঝতে পারি যে, হাঁটুটা ছড়ে গিয়ে রক্ত পড়ছে। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা জানাতে তিনি পেনসিল-টর্চ জ্বেলে তাঁর ঝোলা থেকে একে-একে কয়েকটা জিনিস বার করলেন। একটা ডেটলের শি িা, ছোট্ট একটা কাঁচি আর লিউকোপ্লাস্টের ছোট্ট একটা কাটিম। তারপর ঝোলাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এটাকে খুব সাবধানে ধরুন।” ক্ষতস্থানে ডেটল লাগিয়ে কাঁচি দিয়ে একটুকরো লিউকোপ্লাস্ট কেটে নিয়ে সেই টুকরোটাকে ক্ষতস্থানে সেঁটে দিলেন ভাদুড়িমশাই। তিনি যখন এইসব করছেন, ঝোলার ভিতরে হাত চালিয়ে তখন বুঝতে পেরেছিলুম, যে, তার মধ্যে আরও তিনটে জিনিস রয়েছে। খুব বড় মাপের একটা টর্চ, এক বান্ডিল দড়ি আর একটা ভীষণ রকমের ভারী জিনিস। হাত বুলিয়ে মনে হল, একটা পিস্তল। সত্যি বলতে কী, আমার ভয় তাতে আরও বেড়েই গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলুম, আজ রাত্তিরে সম্ভবত গুলিগোলা চলবে।

 

চাপা গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুব ভয় পেয়ে গেছেন। তাই না?”

 

“পাবারই কথা। পিস্তলটা এনেছেন কেন?”

 

“কেন এনেছি, সেটা খানিক বাদেই বুঝতে পারবেন। তবে পিস্তল নয়, ওটা রিভলভার আর কথা নয়।”

 

আমার বুক ঢিপঢিপ করছিল। মনে হচ্ছিল, গলাটা যেন শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে আছে। একটু জল খেতে পারলে ভাল হত। কিন্তু সে-কথা কাকে বলব? কথা বলাই তো বারণ। উঠে গিয়ে রামদাসের ঘরে ঢুকে জল খেয়ে আসব, এমন সাহস হচ্ছিল না।

 

ঘরে এক ফোঁটাও আলো নেই। শুধু ঘর বলে কথা কী, গোটা বিশ্বভুবনই যেন অন্ধকার এক মহাসমুদ্রের মধ্যে ডুবে গেছে। পুবের জানালাটা হাট করে খোলা, তবু ঘরের সঙ্গে বাইরের কোনও তফাত আমার চোখে পড়ছে না। যেদিকে মুখ ফেরাই, সব অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকারও আস্তে-আস্তে সয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, আলোয়ানের পর্দাটাকে একটু সরিয়ে দিয়ে স্থির চোখে জানালাটার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ভাদুড়িমশাই। পেনসিল-টর্চটা মাঝখানে মাত্র এক লহমার জন্যে একবার জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু তারই মধ্যে দেখতে পেয়েছিলুম যে, ঝোলার ভিতর থেকে সন্তর্পণে দুটি জিনিস তিনি বার করে নিলেন। বিশাল সেই টর্চ আর রিভলভার। বাঁ হাতে টর্চ আর ডান হাতে রিভলভার নিয়ে পাথরের একটা মূর্তির মতন তিনি এখন বসে আছেন।

 

আমার হাতে রেডিয়াম-ডায়ালের ঘড়ি। মাঝে-মধ্যেই ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলুম। চারদিক শুধু যে অন্ধকার, তা নয়, একেবারে নিঃশব্দ। একমাত্র আমার বুকের ঢিপঢিপ ছাড়া আর কোনও শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি না। অনেকক্ষণ বাদে-বাদে অবশ্য ট্রাক চলার একটা আওয়াজ পাওয়া যায়। দূব থেকে ঝড়ের মতো ছুটে এসে আবার দূরে চলে যাওয়ার শব্দ। শুনেছি এখানকার জঙ্গলে নাকি রাত্তিরেও কাঠ কাটার কাজ চলে। কাঠ কেটে ট্রাকে বোঝাই করা হয়। তারপর সেই কাঠবোঝাই ট্রাক এই রাস্তা দিয়ে ছুটতে থাকে হাইওয়ের দিকে। হাতঘড়িতে এখন পৌনে তিনটে। খানিক আগে একটা মোটর-বাইকের শব্দও যেন শুনেছিলুম। দূরে একটা কুকুরও যেন কঁকিয়ে উঠেছিল একবার। তারপরেই আবার সব স্তব্ধ।

 

ঘরের মধ্যে গোটা তিন-চার জোনাকি হঠাৎ ঢুকে পড়েছে। একটা গিয়ে মশারির গায়ে বসল। অন্যগুলো ওড়াউড়ি করে বেড়াচ্ছে। কুকুরটা আবার কঁকিয়ে উঠল।

 

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, অন্ধকারের জমাট বিশাল পর্দাটাকে ফ্যাস করে ছিড়ে ফেলে, জ্বলে উঠল পাঁচ ব্যাটারির বিশাল টর্চ। টর্চের আলো পুবের জানালার উপরে গিয়ে পড়েছে। সেই আলোয় যে মুখখানা আমার চোখে পড়ল, তাতে একেবারে থ হয়ে গেলুম আমি। গোবিন্দ ভট্‌ট্চাজ।

 

ভাদুড়িমশাইয়ের ডান হাতে রিভলভার। তিনি দাঁড়িয়ে উঠলেন না পর্যন্ত। বাঁ হাতের জ্বলন্ত টর্চের আলোটাকে নিষ্কম্পভাবে জানালার উপরে ধরে রেখে, স্থির কঠিন গলায় বললেন, “তোমার হাতে যা-ই থাক, সেটা ফেলে দিয়ে হাত দুখানা মাথার উপরে তুলে ধরো গোবিন্দ। পালাবার চেষ্টা করলেই গুলি চালাব।”

 

গোবিন্দর হাতে একটা ডান্ডার মতো দেখতে পেয়েছিলুম। সেটা মোটা একটা লাঠিও হতে পারে, লোহার মোটা শিক কি শাবলও হতে পারে। ভাদুড়িমশাই তাকে সেটা ফেলে দেবার হুকুম দেবার পর-মুহূর্তেই ঝন্‌ঝন্ করে একটা শব্দ হল। আর প্রায় তৎক্ষণাৎ ‘উঃ, মরে গেলুম’ বলে এমনভাবে চেঁচিয়ে উঠল গোবিন্দ যে, মনে হল, আমার হৃৎপিন্ডটা যেন একটা লাফ মেরে হঠাৎ একেবারে গলার কাছে উঠে এসেছে। সে এমন আর্ত চিৎকার যে, শুনবামাত্র বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।

 

কয়েকটা ঘটনা এরপর প্রায় একইসঙ্গে ঘটে গেল। পাশের ঘর থেকে পার্টিশানের দরজা ঠেলে ছুটে এল রামদাস। যে রঙ্গিলা জখম হবার পর থেকে একটা কথাও বলেনি, বিছানায় উঠে বসে সে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল, “কে, কে, আমার ঘরে কে তোমরা?” ভাদুড়িমশাই আর আমি একলাফে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম।

 

টর্চের জোরালো আলো মাটির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন ভাদুড়িমশাই। সেই আলোয় আমরা দেখতে পেলুম, জানালার বাইরের বারান্দার মেঝেয় শুয়ে ছটফট করছে গোবিন্দ, আর তার পায়ের কাছ থেকে কুচকুচে কালো একটা সাপ এঁকেবেঁকে, অতি দ্রুত গতিতে, বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে মাটির দিকে নেমে যাচ্ছে। একটু বাদেই সাপটাকে আর দেখা গেল না।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেউটে!”

 

গোবিন্দ ভট্‌চাজকে বাঁচাবার চেষ্টায় কোনও ত্রুটি হয়নি। সাপ তার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে দাঁত বসিয়ে বিষ ঢেলে দিয়েছিল। ঝোলার মধ্যে যে দড়ির বান্ডিল ছিল, তৎক্ষণাৎ সেটা বার করে নিয়ে ভাদুড়িমশাই তার হাঁটুর নীচে আর উপরে খুব শক্ত করে কয়েকটা বাঁধন লাগিয়ে দেন। রামদাস ইতিমধ্যে ভিতরবাড়িতে গিয়ে সকলের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। খবর পেয়ে সবচেয়ে আগে ছুটে এসেছিল নিরু। তার পিছনে-পিছনে প্রথমে এলেন সত্যপ্রকাশ, তার একটু পরেই মা আর পিসিমা। ঘুম থেকে উঠে এসেছেন, সত্যপ্রকাশের পরনে স্রেফ পায়জামা আর গেঞ্জি। কিন্তু তিনি পোশাকটা পর্যন্ত পালটালেন না। যে-অবস্থায় ছিলেন, সেই অবস্থাতেই গোবিন্দকে তাঁর ফিয়াটে তুলে নিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে হাসিমারার পথে রওনা হয়ে গেলেন।

 

পুরুতমশাইকে সাপে কাটায় গোটা বাড়ি স্তম্ভিত। তারই মধ্যে শুনতে পাচ্ছি রঙ্গিলার গলা। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা মতো রামদাস গিয়ে বসে আছে তার কাছে। রঙ্গিলা তাকে ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করছে, “কী হয়েছে দাদু, কী হয়েছে? তোমরা আমাকে কিছু বলছ না কৈন?”

 

মা আর পিসিমা অঝোরে কাঁদছেন। মাঝে-মাঝেই গিয়ে মন্দিরের সামনে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা, আর ফুঁপিয়ে বলে উঠছেন, “হে মা মনসা, এ কী হল?”

 

সত্যপ্রকাশের অপেক্ষায় আমরা বসে আছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *