মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

তিরিশ

রাত সাড়ে আটটায় সত্যপ্রকাশ আমাদের ডাকতে এলেন। চেহারা দেখেই বুঝতে পারছিলুম যে, ভদ্রলোক একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। পর-পর যে-সব খবর তাঁকে দেওয়া হয়েছে, তার ধাক্কা তিনি এখনও ঠিক সামলে উঠতে পারেনি। যার আশা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, সেই পঞ্চাশ লাখ টাকা ব্যাঙ্ক-লোনের ব্যবস্থা হয়ে গেল, অথচ তার জন্যে একটা পয়সাও কাউকে খাওয়াতে হল না, তার উপরে আবার দাঙ্গাবাজ যে পাওনাদারটির ভয়ে ভদ্রলোক একেবারে কাঁটা হয়ে ছিলেন, সেই সম্পৎলালও বেঁছে নেই, তিনবাত্তির মোড়ে মাথা ফাটবার আশঙ্কাটাও অতএব এক নিমেষে ঘুচে গেল, সত্যপ্রকাশ সম্ভবত বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, স্রেফ একটা দিনের মধ্যেই পর-পর এমন চমৎকার সব ঘটনা ঘটে যেতে পারে!

 

বললেন, “খেতে আসুন।”

 

খাওয়ার পর্ব যে একেবারে নিঃশব্দে সমাধা হল, তা নয়। তবে বেশির ভাগ কথা বলছিলেন মা আর পিসিমা-ই। তাও আমাদের খাওয়া নিয়েই। ভাদুড়িমশাইয়ের পাতে একটা বাড়তি-পদ দেওয়া হয়েছিল। শাকভাজা। পিসিমার দেখলুম সব দিকেই সমান নজর। বললেন, “আজ ভূত-চতুদশী, চোদ্দোশাক খেতে হয়। তুমি তো বাবা ও-বেলা এখানে ছিলে না, তাই ঠাকুরকে তোমার জন্যে আলাদা করে এ-বেলা ভাজতে বলে দিয়েছিলুম।”

 

সত্যপ্রকাশের মা বললেন, “একটুখানি মুখে দাও বাবা, দিতে হয়। তাই বলে আবার বেশি খাবার দরকার নেই, অন্য-সব পদ তা হলে পাতেই পড়ে থাকবে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার ভাগ্যকে হিংসে হয় সত্যপ্রকাশবাবু, কী মা আর কী পিসিমাই না পেয়েছেন! ইচ্ছে ছিল, আর ক’টা দিন থেকে ওঁদের আদর-যত্নে ভাগ বসাই। কিন্তু তা তো হবার নয়, কালকেই আমাদের কলকাতায় ফিরতে হচ্ছে।”

 

শেষ কথাটা শুনে সত্যপ্রকাশ যেন একটু অবাক হয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন একবার। কিন্তু পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিলেন। কিছু বললেন না।

 

খাওয়া শেষ হল। মশলার ডিবে হাতে নিয়ে দরজার কাছে নিরু দাঁড়িয়ে ছিল। বেসিনে মুখ ধুয়ে একটিপ করে এলাচ-মৌরি মুখে ফেলে আমরা ঘরে ফিরে এলুম। সত্যপ্রকাশও আমাদের সঙ্গে এলেন। মিনিট দশেক বসলেন। একটা সিগারেট ধরালেন। এখানে থাকার ব্যাপারে আমাদের সুবিধে নসুবিধে নিয়ে খুচরো কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। তারপর, আমরা যখন ভাবছি যে, এবারে তিনি বিদায় নেবেন, তখন উঠে দাঁড়িয়ে, বলা নেই কওয়া নেই, ড়িমশাইয়ের হাত দুখানা হঠাৎ জড়িয়ে ধরলেন তিনি। বললেন, “আপনাকে যে কী বলে আমার কৃতজ্ঞতার কথা জানাব, ভেবে পাচ্ছি না। আপনি…আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে দূর মশাই, আমি আবার কী করলুম!”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ও-কথা বলবেন না, মিঃ ভাদুড়ি। যা করবার, আপনিই করেছেন। আমি বেশ ভালই বুঝতে পারছি যে, নানজাপ্পা আপনার শুধু চেনা মানুষ নয়, ভদ্রলোক আপনাকে যথেষ্ট মান্যি করেন। এও বুঝতে পারছি যে, আমার হয়ে এ-ব্যাপারে আপনি পার্সোন্যালি তাঁকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন।… না না, আপনি ভাববেন না যে, এটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধিও আমার নেই। নিশ্চয় তাঁকে আপনি বলেছিলেন যে, এটা তাঁকে করে দিতেই হবে। যে-লোন এতদিন ধরে আটকে আছে, তা নইলে কি আর আজই হঠাৎ এইভাবে সেটা স্যাংশান হয়ে যায়?”

 

সত্যপ্রকাশের মুঠো থেকে নিজের হাত দুখানা ছাড়িয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না মশাই, আমি কেন এ-সব ব্যাবসার ব্যাপারে নাক গলাতে যাব? আর তা ছাড়া এটা তো একটা নর্মাল প্রসিডিওর। ব্যাঙ্কের কাজ লোন দেওয়া। আপনি আপনার ব্যাবসার জন্যে লোন চেয়েছেন, তারা দিয়েছে। ব্যস্, মিটে গেল।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনার যা বলবার আপনি বলুন; আমার যা বুঝবার, তা আমি ঠিকই বুঝেছি। শুধু একটা কথা। আমি জানি যে, আপনি ব্যস্ত মানুষ, অনেক দাম আপনার সময়ের। তবু একটা প্রার্থনা না-জানিয়ে পারছি না। আপনি আমার জন্যে অনেক করেছেন। কিন্তু এতই যখন করলেন, তখন মুর্তিটিও উদ্ধার করে দিন। নইলে আমার পূর্বপুরুষের কাছে আমি অপরাধী হয়ে থাকব।…না না, আমি আর কোনও কথা শুনছি না। কাল আপনারা চলে যাবেন না, দয়া করে আর ক’টা দিন থেকে যান। এই শেষ কাজটা করে দিন। মিঃ ভাদুড়ি, আপনি সব পারেন। একটু যদি চেষ্টা করেন তো এটাও আপনি পারবেন।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পারব কি না জানি না, তবে কাজটা যখন নিয়েছি, তখন চেষ্টা তো করতেই হবে। মিঃ চৌধুরি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, চেষ্টার কোনও ত্রুটি হবে না। কাল অবশ্য কলকাতায় একটা কাজ রয়েছে, ফিরতে পারলে ভাল হত, এমন দেখি কদ্দুর কী হয়।” তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওরেব্বাবা, এরই মধ্যে দশটা বেজে গেল! যান মশাই, আর রাত জাগবেন না, এবারে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

 

সত্যপ্রকাশ চলে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে ভাদুড়িমশাই তাঁকে ডাকলেন। বললেন, “সিগারেট প্রায় ফতুর, পারেন তো কাউকে দিয়ে এক প্যাকেট পাঠিয়ে দিন।”

 

“এখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।” বলে সত্যপ্রকাশ বেরিয়ে গেলেন।

 

সিগারেট নিয়ে নিরু তার মিনিট পাঁচেক বাদেই ঘরে এসে ঢুকল।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশ কী করছেন?”

 

“জামাইবাবু এইমাত্র দোতলায় উঠে গেলেন।” নিরু বলল, “কেন, তাঁকে কিছু বলতে হবে?”

 

“না, থাক, দরকার নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জানাবার ছিল, তা সেটা কাল সকালে জানালেও চলবে। তুমি বরং একটা কাজ করো। তোমার খাওয়া হয়েছে তো?”

 

“এইমাত্র খেয়ে উঠলুম।”

 

“তা হলে বরং রামদাসকে একটু ডেকে আনো। সেদিনকার চুরির ব্যাপারটা নিয়ে আরও দু-একটা কথা ওকে জিজ্ঞেস করতে চাই।”

 

“এত রাত্তিরে?”

 

“যা বলছি, করো তো সুহাসিনি। এক্ষুনি গিয়ে রামদাসকে ডেকে আনো। বলো, জরুরি দরকার।”

 

নিরু বেরিয়ে গেল।

 

খানিক বাদেই বাইরের দিকের দরজায় টোকা পড়ল। আমিই উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। রামদাস এসে ঘরে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরজাটা ভেজিয়ে দাও, রামদাস।”

 

দরজা ভেজিয়ে দিয়ে রামদাস বলল, “আমাকে ডাকছিলেন বাবু?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, রামদাস। একটা খুব জরুরি কথা বলবার জন্যেই ডেকেছি। আমি একটা কাজ করতে চলেছি। কিন্তু সে-কথা যদি ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারে, তা হলে রঙ্গিলা তো মারা পড়বেই, মনসাকেও উদ্ধার করা যাবে না, ফলে তোমাদের খোকাবাবুরও সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাই আমাকে কথা দাও যে, ব্যাপারটা একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেউ জানবে না।”

 

মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলুম যে, ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে রামদাস ভীষণ ঘাবড়ে গেছে। অস্ফুট গলায় সে বলল, “খোকাবাবুকেও জানাতে পারব না?”

 

“খোকাবাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাঁকে কাল সকালে জানালেই চলবে। কিন্তু তুমি এখন কাউকে এ-ব্যাপারে কিছু বোলো না। কী, মনে থাকবে?”

 

“থাকবে বাবু, কাউকে কিচ্ছু বলব না।”

 

লক্ষ করছিলুম, রামদাসের মুখের উপর থেকে পলকের জন্যেও ভাদুড়িমশাইয়ের নজর অন্যদিকে সরে যাচ্ছে না। অজগরের দৃষ্টির ফাঁদে একটা খরগোশের ছানা যেভাবে আটকে যায়, রামদাসকে যেন প্রায় সেইভাবেই একেবারে নজরবন্দি রেখেছেন তিনি। আরও খানিকক্ষণ তিনি একইভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে জেনে রাখো যে, রঙ্গিলার আয়াকে ইচ্ছে করেই এখান থেকে সরিয়ে দিয়েছি। যদি আমরা জোর করতুম, সুশীলা তা হলে হয়তো আরও দু-চার দিন এখানে থেকে যেত; কিন্তু ও যদি রঙ্গিলার ঘরে থাকত, তা হলে কাজের অসুবিধে হত আমার, তাই আমিই চাইনি যে, ও এখানে থাকুক। শুধু সুশীলা বলে কথা নেই, রঙ্গিলার ঘরে আজ রাত্তিরে আর কেউ থাকুক, এটাই আমি চাই না।”

 

“কেউ থাকবে না?”

 

“আমি আর কিরণবাবু থাকব। তুমি থাকবে পার্টিশানের এদিকে, তোমার ঘরে। আর পার্টিশানের ওদিকে অর্থাৎ রঙ্গিলার ঘরের এক কোণে আমাদের দুজনের জন্যে দুটো মোড়া রেখে দেবে। তোমার কাছে ঘড়ি আছে?”

 

“না বাবু।”

 

“ঠিক আছে, আমার হাতঘড়িটা তুমি নিয়ে যাও। কিরণবাবুর ঘড়িতেই আমার কাজ চলে যাবে। এখন দশটা পঁয়ত্রিশ। রাত্তির ঠিক বারোটায় আমরা রঙ্গিলার ঘরে গিয়ে ঢুকব। তোমাদের দরজাটা যেন খোলা থাকে। স্রেফ ভেজিয়ে রেখো, ভিতর থেকে যেন খিল এঁটে দিয়ো না। কিন্তু আবার বলছি, কথাটা যেন কেউ জানতে না পারে।…ব্যাস্, এখন তুমি যাও। তবে জেগে থাকো, আমরা না-যাওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়ে পোড়ে। না।”

 

রামদাস বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ করে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার মতলবটা কী বলুন তো?”

 

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “আজ ভূত-চতুর্দশী না?”

 

“হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?”

 

“হুঁশিয়ার থাকুন, কিরণবাবু, আজ রাত্তিরে আমরা ভূত ধরব।”

 

তারপর একটু থেমে গম্ভীর গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “কে জানে, ভূতের বদলে শেষ পর্যন্ত একটা পেত্নিকেও হয়তো পাকড়াও করতে পারি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *