মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

চব্বিশ

চা আর জলখাবার নিয়ে মিনিট কুড়ি বাদেই নিরু ফিরে এল। ট্রেটা টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাইকে বলল, “জামাইবাবু বলছিলেন, আপনার সর্দিজ্বর হয়েছে। চায়ে তাই একটু আদার রস দিয়েছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, জড়িয়ে গেলে বিচ্ছিরি লাগবে।”

 

আমি বললুম, “আমার তো আর সর্দি-টর্দি হয়নি, তা হলে আমি কেন আদা-চা খাব?”

 

নিরু বলল, “খেয়ে নিন, খারাপ লাগবে না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জ্বর তো আমারও হয়নি।”

 

নিরু বলল, “জানি।

 

“কী করে জানলে?”

 

“জামাইবাবু বলেছেন।”

 

“জ্বর না-হওয়া সত্ত্বেও কেন জ্বরের ভান করছি, তাও বলেছেন নিশ্চয়?”

 

নিরু হাসল। বলল, “তাও বলেছেন।” তারপর রঙ্গনাথবাবু যে কৌটোটা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটার উপরে চোখ পড়তে বলল, “ওটা কী?”

 

“নারকোলের নাড়ু। রঙ্গনাথবাবু দিয়েছেন।”

 

“তা-ই? মজুমদার-মাসিমা চমৎকার নাড়ু করেন। নারকোলের সঙ্গে ক্ষীর বাদামগুঁড়ো এলাচদানা, কর্পূর আরও কী-কী যেন দেন উনি। দারুণ লাগে। নাড়ু তো আমরাও করি, কিন্তু অত ভাল হয় না।….না না, আমি খাব না, আপনারা খান।”

 

নাড়ুর কৌটাটা তুলে নিরুর দিকে এগিয়ে দিয়েছিলুম। খাবে না শুনে সেটা আবার টেবিলে রেখে দিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “মা আর পিসিমা এখন কী করছেন?”

 

“জপ হয়ে গেছে। এখন পড়ছেন মনসার পাঁচালি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রোজই এইসময়ে পাঁচালি পড়েন ওঁরা?”

 

“আগে পড়তেন না,” নিরু বলল, “গত বুধবার থেকে রোজ এই সময়ে পড়ছেন। আসলে ব্যাপার কী জানেন, জামাইবাবু তো বলেই দিয়েছেন যে, যতদিন না ওই মূর্তি উদ্ধার হয়, পুজোও ততদিন বন্ধ থাকবে, তাই এখন মন্দিরে আর পূজো হয় না, শুধু পাঁচালি পড়া হয়।”

 

“খানিক আগে ওই যে শাঁখের আওয়াজ আর ঘন্টার শব্দ শুনলুম, ও তা হলে ঠাকুরমশাই কার পূজো করছিলেন?”

 

“মা-মনসারই।”

 

“তার মানে?”

 

নিরু হাসল। বলল, “ঠাকুরমশাই ভিতু মানুষ। বলেন, মূর্তি থাক আর না-ই থাক পুজো বন্ধ করাটা উচিত হবে না। বন্ধ করলে অমঙ্গল হবে। নন্দিরে অবশ্য যান না। নিজের ঘরে মা-মনসার একখানা পট রয়েছে, তার সামনে বসে পূজো করেন।”

 

“সত্যপ্রকাশের নিষেধ সত্ত্বেও করেন?”

 

“তা করেন বই কী। তবে জামাইব।বু যখন এখানে থাকেন তখন শাঁখও বাজে না, ঘন্টার শব্দও শোনা যায় না, ঠাকুরমশাই তখন একেবারে নিঃশব্দে তাঁর পুজোটা সেরে নেন। আজ তো দুপুর থেকেই জামাইবাবু নেই, তাই শাঁখ বাজাতে আর ঘন্টা নাড়তে ঠাকুরমশাইয়ের কোনও ভয়ও নেই।”

 

“সত্যপ্রকাশের নিষেধ যে উনি মানছেন না, রোজই পুজো হচ্ছে, সেটা তাঁকে কেউ বলেনি?”

 

“কেন বলবে? বললেই তো জামাইবাবু রেগে যাবেন। তাঁকে রাগিয়ে কার কী লাভ? আর তা ছাড়া, ঠাকুরমশাই তো কারুর কিচ্ছুমাত্র ক্ষতিও করছেন না। পুজোটা যে তিনি বন্ধ করেননি, সে তো এই চৌধুরি-পরিবারের মঙ্গলের কথা ভেবেই।”

 

“তা বটে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু নিরু, আমাদের কথাটা ক্রমেই অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। চৌধুরিবাড়ির সঙ্গে তোমাদের সম্পর্কের কথা হচ্ছিল। তোমার জামাইবাবু আর দিদিকে এঁরা বিয়ের পরে আর তোমাদের বাড়িতে পাঠাননি, তোমাদেরও কখনও আসতে বলেননি এখানে, তাই তো?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“অর্থাৎ দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক কি যোগাযোগ বলতে আর কিছু রইল না, কেমন?”

 

“কী করে আর থাকবে।”

 

“দিদি কোনও চিঠিও লিখতেন না তোমাদের?”

 

“বিয়ের পরে খান দুয়েক চিঠি লিখেছিল। তার উত্তরও দিয়েছিলুম আমরা। কিন্তু তারপরে আর কোনও চিঠি পাইনি।”

 

“ফেন পাওনি কিছু আন্দাজ করতে পারো?”

 

“আন্দাজই করতে পারি, কিন্তু সেটা সত্যি না মিথ্যে, তা কী করে বলব? হতে পারে যে, আমরা যে চিঠি লিখেছিলুম, তা দিদির হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। আবার এমনও হতে পারে যে, দিদি যে-চিঠি লিখত, ডাকবাক্সে না ফেলে সেগুলো মাঝপথেই ছিঁড়ে ফেলত এরা। ঠিক করে তো কিছু বুঝবার উপায় নেই।”

 

“এ-বাড়িতে এসে ঢুকবার পরে জামাইবাবুকে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করোনি?”

 

“একদিন করেছিলুম। কিন্তু জামাইবাবু তাতে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে যে, বুঝতে পারলুম, গোটা ব্যাপারটা নিয়ে একটা চাপা কষ্ট রয়েছে ওঁর মনে। সেটা বুঝবার পরে আর আমি কথাটা কখনও তুলিনি। আর তা ছাড়া, কথাটা তুলতে হলে অন্তত খানিকক্ষণের জন্যেও তো ওঁকে একা পাওয়া দরকার। তা আমি পাচ্ছি কোথায়?”

 

“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে বলো তারপরে কী হল?”

 

“তারপরে আর কী হবে? তারপরে আমার বাবা মারা গেলেন। এ হল দিদির বিয়ের তিন বছর পরের কথা। আমার বয়েস তখন দশ বছরের বেশি হবে না। বাড়িতে শুধু মা আর আমি। অবস্থাটা বুঝে দেখুন।”

 

“তোমার বাবার শ্রাদ্ধেও এঁরা কেউ যাননি?”

 

“কেউ না। মেয়েকে তো চতুর্থীর কাজ করতে হয়। দিদি সে-কাজ এই বাড়িতেই করেছিল। তবে হ্যাঁ, রামদাসদার হাত দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এঁরা। মা অবশ্য সে টাকা নেয়নি।”

 

“আলিপুরদুয়ারে তোমাদের কোনও আত্মীয়স্বজনও নেই?”

 

“কেউ না। আসলে আমরা পুব-বাংলার লোক। পার্টিশনের সময়ে মা আর আমাদের দুই বোনকে নিয়ে বাবা এ-দিকে চলে আসেন। এ হল সাতচল্লিশ সালের কথা। দিদির বয়েস তখন চোদ্দ আর আমার চার।”

 

“তোমাদের পরিবারের আর-কেউ তখন পুব-বাংলা থেকে চলে আসেননি? মানে তোমার কাকা-জ্যাঠাদের কেউ?”

 

“তখন আসেননি। বাবার কাছে শুনেছি যে, দু’চার বছর বাদে তাঁরা এসেছিলেন। তাঁরা নাকি কেউ মালদায় আছেন, কেউ বালুরঘাটে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই।”

 

শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপরে বললেন, “তোমাদের অবস্থা তো যদ্দুর বুঝতে পারছি মোটেই ভাল ছিল না। তা হলে কী করে চলত তোমাদের?”

 

“গরিবদের যেভাবে চলে। ইস্কুল থেকে আমাকে ছাড়িয়ে আনা হল। বাড়িতে সেলাইয়ের কল ছিল একটা। পাড়ার লোকেরা ছিট-কাপড় দিয়ে যেত, মা তাই দিয়ে ফ্রক, ব্লাউজ আর সায়া বানিয়ে দিতেন। আমার কাজ ছিল মা’কে সাহায্য করা। তবে মজুরি তো বিশেষ পাওয়া যেত না, বাড়িটা ছাড়া বাবাও বিশেষ-কিছু রেখে যাননি, ‘তাই কষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে নিতে হত।”

 

“তারপর?”

 

“তারপর আমি বড় হতে লাগলুম। কাগজে বিয়ের বিজ্ঞাপন দেখে মা চিঠি লিখতে লাগলেন। তারপর চিঠি লিখতে-লিখতে, আর নিজেদের উপোসি রেখে পাত্রপক্ষের লোকদের রসগোল্লা খাওয়াতে-খাওয়াতে একদিন তিনিও মারা গেলেন।”

 

“বাড়িতে তুমি তখন একা?”

 

“একেবারে একা।”

 

“পাড়া-প্রতিবেশীরাও কেউ আশ্রয় দিলেন না তোমাকে?

 

“কেউ না। আর তা দেবেই বা কেন। মা যখন মারা যান, আমার বয়েস তখন ষোলো-সতেরো। ওই বয়সের মেয়েকে কেউ কখনও নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়? প্রতিটি বাড়িতেই তো উঠতি-বয়সের ছেলে রয়েছে, আমি তাদের মাথাগুলোকে চিবিয়ে খাব, এই ভয় নেই তাদের?”

 

ভাদুড়িমশাই স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন নিরুর দিকে। বললেন, “তারপর?”

 

“তারপর আর কী,” নিরু বলল, “তারপর আমাদের বাড়ির জানলায় রাত-দুপুরে টোকা পড়তে লাগল। দিনের বেলাতেও স্বস্তি ছিল না। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটতুম, তখন বুঝতে পারতুম যে, পিছন থেকে কয়েক জোড়া চোখ আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। যারা তাকিয়ে থাকত, তাদের সবাই যে নেহাত ছেলে-ছোকরা, তাও নয়, তার উপরে আবার বাসদেও এসে জুটে গেল তাদের সঙ্গে।”

 

“বাসদেও কে?”

 

“ট্রাক-ড্রাইভার। পাড়ায় তখন নতুন-নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। সেইসব বাড়ির জন্য শিলিগুড়ি থেকে ট্রাকে করে লোহা, সিমেন্ট আর পাথরকুচি নিয়ে আসত বাসদেও। কুলিরা যখন তার ট্রাক থেকে মাল নামাত, তখন সেই যে সে আমাদের বাড়ির বারান্দায় এসে বসত, সহজে আর সেখান থেকে নড়তে চাইত না। অনেক সময় সে আলিপুরদুয়ারেই রাত কাটাত, আমাদের বাড়ির সামনে ট্রাক রেখে তারই মধ্যে শুয়ে থাকত সে। বিচ্ছিরি-বিচ্ছিরি গান গাইত। তাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পেতুম আমি। সন্ধের পর থেকেই ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে থাকতুম। সাপের ভয়…ভূতের ভয়…রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ভয়ও যেন বেড়ে যেত…সারা রাত আমি দু’চোখের পাতা এক করতে পারতুম না। উঃ,

 

সে যে কী ভয়, তা আমি আপনাদের কী করে বোঝাব! মনে হতে, যে-দিকে দু’চোখ যায়, পালিয়ে যাই!” আবার খানিকক্ষণ চুপ করে রইল নিরু। কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “এ-সব কথা শুনতে নিশ্চয় খুব খারাপ লাগছে আপনাদের?”

 

আমার খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু ভাদুড়িমশাই দেখলুম নির্বিকার। বললেন, “কেমন লাগছে, সেটা কোনও ব্যাপার নয়। তোমার যদি মনে হয় যে, আমার শোনা দরকার, তা হলে বলো। যা তোমার বলবার আছে, সবই আমি শুনব।”

 

নিরু বলল, “হ্যাঁ, আপনার শোনা দরকার। না-শুনলে আমাকে আপনি ভুল বুঝবেন, জামাইবাবুকেও ভুল বুঝবেন।”

 

“বেশ তো, তা হলে বলো।”

 

“হ্যাঁ, আমি বলব, সবটাই বলব।… কোন্ পর্যন্ত বলেছি যেন?”

 

“যে-দিকে দু’চোখ যায়, পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করত তোমার।”

 

“হ্যাঁ, ইচ্ছে করত। যত রাজ্যের ভয় তো আমাকে পাগল করে তুলেছিল, তা একদিন রাতদুপুরে সেই ভয়ের হাত ধরেই আমি পালিয়ে গেলুম। পালিয়ে যে কোথায় যাচ্ছি, কোন্ ঘাটে, না কোন্ আঘাটায়, তাও তখনও জানি না। এখানে-ওখানে ঠেক খেতে-খেতে শেষ পর্যন্ত কোথায় এসে উঠলুম জানেন? শিলিগুড়ির এক বস্তিতে। একটা বাচ্চা হয়েছিল। বাঁচেনি। বাচ্চাটার বাপ মরল তার বছর খানেক বাদে। হঠাৎ একদিন জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরল, সেই জ্বর আর সারেনি।…কী জানেন, বাসদেও লোকটা যে খুব খারাপ ছিল, তা নয়। ওই মানে বস্তির আর-পাঁচটা মাতাল যতটা খারাপ হয় আর কি, তার চেয়ে বেশি কিছু খারাপ ছিল না। একটু বোকা, একটু গোঁয়ার, একটু রাগী, একটু সন্দেহবাতিগ্রস্ত, ..আর হ্যাঁ, আকন্ঠ মদ গিলে যে-দিন বাড়ি ফিরত, সে-দিন তো আর কান্ডজ্ঞানের বালাই থাকত না, তখন তাই বউকে ধরে খুব ঠ্যাঙাত। তা সে তো মারা গেল। তখন উড়ে এসে জুড়ে বসল তার এক ভাই। কোত্থেকে উড়ে এল, ভগবান জানেন…বাসদেও যখন বেঁচে ছিল, তখন তো তাকে একদিনও এসে তার দাদার খোঁজখবর করতে দেখিনি। তা বস্তির লোকেরা বলল, হ্যাঁ, বাসদেওয়েরই ভাই বটে। তখন আর কী করি। সাক্ষাৎ দেওর যখন, তখন তো আর থাকতে না-দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু বিপদ কী হল জানেন, থাকতে পেলেই লোকে শুতে চায় তো, তা এই দেওরটির দেখলুম একা শুতে খুব আপত্তি।”

 

টিপাইয়ের উপরে জলের জাগ ছিল। কাচের গেলাসও ছিল একটা। জাগ থেকে গেলাসে জল ঢালল নিরু। তারপর গেলাসটা উঁচু করে ঢকঢক করে জলটা খেয়ে নিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রেখে আঁচলে মুখ মুছে বলল, “আরও শুনবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশ এ-সব কথা কিছুই জানতেন না?”

 

“মা যে মারা গেছেন, এই খবর শুনে আলিপুরদুয়ারে এসেছিলেন। নিজের চোখেই দেখে গিয়েছিলেন যে, আমি একেবারে একা হয়ে গেলুম। দিদি তাঁর সঙ্গে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে, আমি যেন মুকুন্দপুরে চলে আসি। যেমন করেই হোক, মুকুন্দপুরে আমাকে যাতে থাকতে দেওয়া হয়, তার জন্যে সে তার শ্বশুরকে যে রাজি করাবে, তাও জানিয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি।”

 

“রাজি হওনি কেন?”

 

সাপের গায়ে খোঁচা লাগলে যেমন হয়, একেবারে সেইভাবেই যেন হঠাৎ ফুঁসে উঠল নিরু। বলল, “তাও আমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে? তা হলে জেনে রাখুন যে, গরিবদেরও মান-অপমান বোধ থাকে, রাগ-অভিমান থাকে। কে জানে, হয়তো বড়লোকদের চেয়ে একটু বেশিই থাকে। সব কথা আপনি শোনেননি ভাদুড়িমশাই। ধুলো-পা’র ব্যাপারটা জানেন তো, বিয়ের দিন কয়েক বাদে মেয়ে-জামাইকে একবার নিয়ে আসতে হয়। বাবা যে তারই জন্যে মুকুন্দপুরে গিয়েছিলেন, সে-কথা বলেছি। জামাইবাবুর বাবা তখন তাঁকে কী বলেছিলেন জানেন?”

 

“বলেছিলেন যে, চৌধুরি পরিবারে এ-সব নিয়ম নেই। তাই না?”

 

“শুধু তা-ই নয়, বলেছিলেন যে, আলিপুরদুয়ারে গেলে তাঁর ছেলে আর ছেলের বউয়ের থাকা-খাওয়ার বড় কষ্ট হবে। বলেছিলেন, “বিশ্বাসমশাই, এখানে ওরা যে-ভাবে রয়েছে, সে-ভাবে তো আপনি ওদের রাখতে পারবেন না, তা হলে কেন নিতে এসেছেন?’ বলুন ভাদুড়িমশাই, এর পরেও এখানে আসা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল?”

 

“সত্যপ্রকাশের বাবা যে ও-কথা বলেছিলেন, তা তুমি জানলে কী করে?”

 

“বাবাই একদিন দুঃখ করে মা’কে সব বলেছিলেন, আমি আড়াল থেকে শুনেছি।”

 

“মায়ের মৃত্যুর পরেও তাই সত্যপ্রকাশের সঙ্গে তুমি এখানে চলে আসতে রাজি হওনি, কেমন? “

 

“হ্যাঁ।” নিরু বলল, “ওইভাবে অপমানিত হয়ে আমার বাবা একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। তা নইলে যে আরও কয়েকটা বছর হয়তো বাঁচতেন তিনি, আমার মায়ের জীবনটাও আর-একটু স্বস্তিতে কাটতে পারত, এই কথাটা যেন কিছুতেই আমি ভুলতে পারছিলুম না। জামাইবাবুকে আমি সেদিন বসতে পর্যন্ত বলিনি। বলেছিলুম, আপনি ফিরে যান, না-খেয়ে মরতে হয় তো তাতেও আমি রাজি, তবু আমি মুকুন্দপুরে যাব না।”

 

“তারপর?”

 

“তার কিছুদিন পরেই দিদির শ্বশুর মারা যায়। শুনেছি, দিদি নিজেই সেদিন আলিপুরদুয়ারে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে আর আমার খোঁজ পায়নি। কী করে পাবে, তার আগেই তো আমি বাসদেওয়ের সঙ্গে ঘর ছেড়েছি।…দিদি নাকি ভীষণ কেঁদেছিল সব শুনে। জামাইবাবুকে খুব গালমন্দও করেছিল। বলেছিল, “তোমরা বড়লোক হতে পারো, কিন্তু মানুষ নও। তোমাদেরই জন্যে আমার বাবা মরেছেন, মা মরেছেন, এবারে হাসিটাও হারিয়ে গেল।’ কয়েকটা দিন দিদি নাকি তখন মুখেও কিছু তোলেনি। শুধু হাপুস নয়নে কাঁদত।”

 

“এ-সব কথা কার কাছে শুনলে?”

 

“জামাইবাবুর কাছে। জামাইবাবু নাকি কাগজে কাগজে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কিন্তু বস্তিতে তো আর কাগজ যায় না, তাই আমার চোখে পড়েনি। আর চোখে পড়লেই যে তক্ষুনি আমি মুকুন্দপুরে চলে আসতে পারতুম, তাও তো নয়।”

 

এতক্ষণে কথা ফুটল আমার মুখে। বললুম, “তোমার ডাক-নাম বুঝি হাসি?”

 

“হ্যাঁ। সুহাসিনী থেকে হাসি। দিদির ভাল নাম সুভাষিণী। ডাক-নাম সুভা। দিদি কিছু ভুল বলেনি। ওদের জীবন থেকে সত্যিই তো আমি হারিয়ে গিয়েছিলুম। শেষ পর্যন্ত সেই হারানো মেয়েটার খোঁজ অবশ্য পাওয়া গেল।”

 

বললুম, “কবে?”

 

“আজ থেকে পাঁচ পছর আগে। দিদি আব তখন বেঁচে নেই। সুজাতার তখনও বিয়ে হয়নি, আর-দুটো ছেলেমেয়ে তো অনেক ছোট। শুনেছি মরবার আগে দিদি নাকি জামাইবাবুকে মাথার দিব্যি দিয়ে বলেছিল, ‘আমার বাপের বাড়ির জন্যে তা তোমরা কিছু করলে না, অন্তত নিজের ছেলেমেয়ে তিনটের কথা ভেবে হাসিকে তুমি খুঁজে বার করো, নইলে এদের কে দেখবে?’ তা জামাইবাবুও আমার খোঁজ কিছুতেই পেতেন না, যদি না আমি নিজের থেকেই তাঁকে একদিন খবর পাঠাতুম।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথায় খবর গাঠালে?”

 

“কেন, শিলিগুড়ির হোটেল ফ্লোরায়। হোটেলটা তো আপনারা দেখেছেন। শুনেছি কলকাতা থেকে শিলিগুড়িতে পৌঁছবার পরে সেইখানেই কাল আপনাদের তোলা হয়েছিল। আমি অবশ্য হোটেলের কথা জানতুম না। বাসদেও কন্তু সমস্ত খবর রাখত। মাতাল অবস্থায় সে-ই একদিন আমাকে বলেছিল যে, শিলিগুড়ির হংকং বাজারের কাছে জামাইবাবু একটা মস্ত হোটেল খুলেছেন। তা সে মারা যাবার দিন কয়েক বাদেই আমি বস্তির একটা ছেলেকে দিয়ে জামাইবাবুর কাছে আমার খবর পাঠাই। না পাঠিয়ে তখন আর আমার উপায় ছিল না।”

 

“কেন?”

 

“তা তো একটু আগেই বলেছি।” মুখ নিচু করে নিরু বলল, “বাসদেওয়ের ভাইটা বড় উৎপাত করছিল। তা চিঠি পেয়েই জামাইবাবু ‘মামাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাবার জন্যে তাঁর একজন কর্মচারীকে পাঠিয়ে দেন। সেদিন অবশ্য আমি আসতে পারিনি। ঠিক সেই সময়ে আমি ঘরে ছিলুম না, টিউবওয়েল থেকে জল ধরতে একটু দূরে যেতে হয়েছিল। ফিরে এসে শুনি, কে একজন নাকি আমার খোঁজ করতে এসেছিল, তা বাসদে “য়ের ভাই তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপর?”

 

নিরু বলল, “কথাটা শুনে আহার মনে হয়েছিল যে, ওই নরক থেকে আর কোনও দিনই আমি বেরিয়ে আসতে পারব না। কিন্তু সেই রাত্তিরেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বাসদেওয়ের ভাই তখনও বাড়ি ফেরেনি, হঠাৎ একটা চিত্রার-চেঁচামেচি কানে যেতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে শুনতে পেলুম যে, ‘কে একটা লোক নাকি আমারে বস্তির সামনের রাস্তার উপরে খুন হয়ে পড়ে আছে। লোকটা যে কে, খানিক বাদে তা-ও জানা গেল। বাসদেওয়ের ভাই। পরদিন সকালেই জামাইবাবু আবার লোক পাঠিয়ে আমাকে তাঁর হোটেল নিয়ে যান। তারপর সেইদিনই সেখান থেকে নিয়ে আসেন মুকুন্দপুরে।”

 

ঘর একবারে নিঃশব্দ। আমি কোনও কথা বলতে পারছিলুম না। ভাদুড়িমশাইও চুপ করে বসে আছেন। কপালে ভাঁজ পড়েছে কয়েকটা। মনে হল, তিনি কিছু ভাবছেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনিই প্রথম মুখ খুললেন। বললেন “সুহাসিনী, তোমার আর কিছু বলার নেই?”

 

“না।” নিরু বলল, “আনার যা বলবার ছিল, সব বলেছি, কিন্তু দোহাই আপনাদের, জামাইবাবু যেন কিছুতেই এ-কথা জানতে না পারেন।”

 

এতক্ষণে হাসি ফুটল ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে। বললেন, “সত্যপ্রকাশকে কতটা কী বলব না বলব, সেটা তুমি আমার উপরে ছেড়ে দাও। তবে তোমাকে বলি, সব কথা আমাদের জানিয়ে তুমি খুব বুদ্ধির কাজ করেছ, না-জানালেই ভূল করতে। এখন যাও, মা আর পিসিমা হয়তো তোমার খোঁজ করতে পারেন।”

 

ট্রে-র উপরে কাপ-ডিশ গুছিয়ে নিয়ে নিরু বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু দাঁড়াও।”

 

দরজা থেকে আবার ফিরে এল নিরু। দেখলুম, তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। স্খলিত গলায় বলল, “কিছু বলবেন আমাকে?”

 

স্থির চোখে নিরুর দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুমি তো আমাদের অনেক কথাই বললে। এবারে বরং আমি তোমাকে একটা কথা বলি। বাসদেওয়ের যে ভাইটা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে শিলিগুড়ির একটা অন্ধকার রাস্তায় খুন হয়েছিল, তার নাম নিশ্চয় রাজদেও কুমি। তাই না?”

 

চারুর চোখে যেন আতঙ্ক ফুটে উঠল হঠাৎ। চাপা গলায় সে বলল, “আপনি কী করে জানলেন?”

 

“বা রে, আমি জানব না কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সব কিছু জানাই তো আমার কাজ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *