মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বাইশ
রঙ্গনাথবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চাষিবউটিকে রঙ্গনাথ সেই যে কোথায় কী রেখে আসতে বলেছিলেন, তা নিয়ে কিন্তু এবারেও আপনি কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না!”
বললুম, “ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করব নাকি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক, সন্ধে হয়ে আসছে, এখন ফিরে যাওয়াই ভাল।”
চৌধুরিদের বাড়িতে ফিরে আমাদের ঘরে ঢুকে সদ্য ইজিচেয়ারে গা ঢেলে দিয়েছি, এমন সময় কোথায় যেন শাঁখ বেজে উঠল। খানিক বাদেই পাওয়া ণেল ঘন্টার আওয়াজ।
তারও খানিক বাদে নিরু এসে ঘরে ঢুকল।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোসো নিরু। ওই চেয়ারটায় বোসো। কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে আমার বড় অস্বস্তি হয়।”
নিরু বসল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু আগে শাঁখ আর ঘন্টা বাজতে শুনলুম। মনে হল, আওয়াজটা বাইরের উঠোনের দিক থেকে আসছে।”
নিরু বলল, “ঠাকুরমশাই পুজোয় বসেছেন।
“মা আর পিসিমা কোথায়?”
“একটু আগে জপ করতে বসলেন। এখন অন্তত ঘন্টা দেড়েক আমার ডাক পড়বে না। সেই জন্যেই কয়েকটা কথা আপনাকে জানাতে এলুম”
“সত্যি তুমি তা হলে সত্যপ্রকাশবাবুর স্ত্রীর ছোট বোন?”
“হ্যাঁ, আমি তাঁর ছোট বোন। আমার আসল নাম কিন্তু নিরু নয়। আমার নাম…..”
ভাদুড়িমশাই হাত তুলে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও, দেখা যাক এটাও আমি আঁচ করতে পারি কি না। তোমার আসল নাম সম্ভবত সুহাসিনী। কী, ঠিক বলেছি তো?”
চমকে উঠে নিরু বলল, “কী করে জানলেন?”
“এ তো জানার ব্যাপার নয়, আন্দাজ করবার ব্যাপার। আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়লুম, সেটা লেগে গেল, ব্যস্।”
“কিন্তু আন্দাজটাই বা করলেন কীভাবে? এ-নাম তো এক জামাইবাবু ছাড়া এ-বাড়িতে কারও জানবার কথা নয়।”
“তা হলে ধরে নাও যে, তোমার জামাইবাবুরই একটা কথা থেকে এটা আমি আন্দাজ করেছি।….ওই মানে হঠাৎ তাঁর মুখ ফশকে বেরিয়ে যাওয়া একটা কথা থেকে।”
ভুরু কুঁচকে গেল নিরুর। বলল, “কী কথা?”
“না-শুনে ছাড়বেই না?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তা হলে শোনো। মনসার তো অনেক ভাল-ভাল নাম আছে। এই যেমন ধরো পদ্মাবতী। মনসামঙ্গলের আর-এক নাম যে পদ্মাপুরাণ, সেটা এইজন্যেই। মনসামঙ্গল কার লেখা জানো তো?….. বিজয় গুপ্তের। মনসা তাঁকে নাকি স্বপ্নে দেখা দিয়ে লিখতে বলেছিলেন এই পুঁথি। বলেছিলেন, ‘মনে ভয় না করিও দেখিয়া নাগজাতি/মহাদেবের কন্যা আমি নাম পদ্মবতী।’ তা সে-কথা থাক। আসল কথা হল, যেমন পদ্মাবতীর মতোই আরও বেশ কিছু সুন্দর নাম আছে মনসাদেবীর, তেমনি আবার একটা বিদঘুটে নামও আছে। নামটা হল জরৎকারু। কাল রাত্তিরে তোমার জামাইবাবুর কাছে আমি কথায়-কথায় এই জরৎকারু নামটার উল্লেখ করেছিলুম। তাতে তিনি কী বললেন জানো?”
“কী বললেন?”
“বললেন, এ যেন যে-মেয়ের এক-নাম সুহাসিনী, তার অন্য-নাম জগদম্বা।”
হঠাৎ যেন নিরু একেবারে পাথরের মতো স্থির হয়ে গিয়েছে। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে। কিন্তু কোনও কথা বলছে না।
আমি বললুম, “বাস, অমনি আপনি বুঝে গেলেন যে, নিরুর নাম আসলে সুহাসিনী?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না-বুঝবার কী আছে। আমরা যাকে হঠাৎ মুখ ফশকে বেরিয়ে যাওয়া কথা ভাবি, সত্যিই তো আর সেগুলি আমাদের মুখ ফশকে বেরোয় না, তার পিছনেও কাজ করে আমাদের ইচ্ছা। আর সেইজন্যেই আমার মনে হল যে, বিদঘুটে নামের বিপরীত কোনও সুন্দর নামের কথা বলতে গিয়ে সত্যপ্রকাশ হঠাৎ ‘সুহাসিনী’ নামটাই বা বললেন কেন? নিশ্চয় এটা এমন কারও নাম, যাকে তিনি খুব স্নেহ করেন, ভালবাসেন।”
বললুম, “সুহাসিনী নামটা তো সত্যপ্রকাশের দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়েরও হতে পারত। তাদেরও তো তিনি কম স্নেহ করেন না। তা হলে আপনি তাদের কথা না-ভেবে বিশেষ করে নিরুর কথাই বা ভাবতে গেলেন কেন?”
“এটা কি আপনি খুব বুদ্ধিমানের মতো কথা বললেন, কিরণবাবু?” ওঁর বড় মেয়ে…..মানে ওই কলকাতায় যার বিয়ে হয়েছে…… মালতীদের বাড়ির কাছে ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের দক্ষিণে যার শ্বশুরবাড়ি…. তার নাম যে সুজাতা, তা তো আমরা শুনেইছি। বাকি রইল তার বোন। তা সুজাতার বোনের নাম হবে সুগতা কি সুলতা কি সুনন্দা কি ওই রকমেরই তিন অক্ষরের অন্য কোনও নাম।”
মৃদু গলায় নিরু বলল, “সুরূপা।”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হল তো? আর তা ছাড়া সুহাসিনী যতই সুন্দর হোক, একটু সেকেলে তো, একেবারে এ-কালের মেয়েদের ও-নাম হয় না। তা হলে ও-নাম এ-বাড়িতে কার হতে পারে? তখন মনে হল, নিরুর হওয়া কিছু বিচিত্র নয়।…..কী নিরু, ঠিক বলিনি? হাহা!”
নিরু যখন জড়সড় হয়ে বসে আছে, ভাদুড়িমশাই তখন এত হাল্কা গলায় কথা বলছেন কেন আর হাহা করে হাসছেনই বা কেন, প্রথমটায় আমি তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলুম না। পরে মনে হল, এটা ইচ্ছাকৃত ব্যাপার। আসলে নিরুর সঙ্কোচটাই ভেঙে দিতে চাইছেন ভাদুড়িমশাই। যাতে কিনা তার অস্বস্তিটা সে কাটিয়ে উঠতে পারে, লজ্জা না করে সমস্ত কথা খুলে বলতে পারে।
নিরু বলল, “ঠিক বলেছেন। জামাইবাবু সত্যিই আমাকে খুব স্নেহ করেন।”
হাসতে-হাসতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক তা হলে নামের ধাঁধাটা মিটল। এখন একটা কথা বলো তো। এ-বাড়িতে কি একমাত্র সত্যপ্রকাশই তোমার আসল পরিচয়টা জানেন? আর কেউ জানে না?”
মুখ তুলে নিরু বলল, “রামদাসও জানে। কিন্তু জামাইবাবু নিষেধ করে দিয়েছেন তো, তাই মরে গেলেও সেটা সে কাউকে বলবে না।”
“মা আর পিসিমা জানেন না কেন?”
“কী করে জানবেন। আমি এসে এ-বাড়িতে ঢুকবার আগে তো তাঁরা আমাকে দেখেননি।”
“সত্যপ্রকাশের শ্বশুরবাড়িতে কখনও যাননি তাঁরা?”
“কোনও দিনই যাননি।”
“কেন?”
“এ-বাড়ির গিন্নিরা কখনও ছেলে কিংবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান না, যাবার নিয়মই নেই। জামাইবাবুর মা যেমন কখনও ছেলের শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ মাড়াননি, তেমন জামাইবাবুর ঠাকুমাও কখনও চৌকাঠ মাড়াননি পিসিমার শ্বশুরবাড়ির। দিদির বড় মেয়ের কথাই ধরুন। বছর তিনেক হল সুজাতার বিয়ে হয়েছে, বিয়েটা আমার দিদি দেখে যেতে পারেনি, তার দু’বছর আগেই সে মারা যায়। কিন্তু যদি বেঁচে থাকত, তা হলেই কি দিদি কক্ষনো সুজাতার শ্বশুরবাড়িতে যেত?”
“যেতেন না?”
“কক্ষনো যেত না। জামাইবাবুর সঙ্গে কলকাতায় গেলে হয় জামাইবাবুর কোনও বন্ধুর বাড়িতে উঠত, নয়তো কোনও হোটেলে। কিন্তু মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কক্ষনো নয়।”
“তা তো বুঝলুম, কিন্তু সুহাসিনী নামে যে সত্যপ্রকাশের একটি শ্যালিকা রয়েছে, মা আর পিসিমা অন্তত সেটুকু নিশ্চয় জানতেন। তাই না?”
“জানতেন বই কী। কিন্তু আমিই যে সেই সুহাসিনী, তা জানতেন না।”
“তাতেও কিন্তু ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছে না, একটা খিঁচ থেকে যাচ্ছে।”
“কেন?”
“কোথায় খিঁচ থেকে যাচ্ছে, বুঝতে পারছ না?”
“না তো।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝিয়ে বলছি। মা আর পিসিমা নাহয় এ-বাড়ির নিয়ম মেনে কখনও সত্যপ্রকাশের শ্বশুরবাড়িতে যাননি, কিন্তু তোমার ব্যাপারটা কী? দিদির শ্বশুরবাড়িতে বোনের আসাটা তো আর কোনও পরিবারেই একটা নিয়মবিরুদ্ধ ব্যাপার বলে গণ্য হয় না, অন্তত হয় বলে আমি শুনিনি। দিদি বেঁচে থাকতে তুমিই বা তা হলে এ-বাড়িতে কখনও আসোনি কেন? অনায়াসেই তো আসতে পারতে, দু’চার দিন থেকেও যেতে পারতে। তাই না?”
নিরু এবারে সরাসরি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাল। বলল, “হ্যাঁ, তা পারতুম বটে।”
“তা হলে আসোনি কেন?”
“এই প্রশ্নের জবাব কি আমাকে দিতেই হবে?”
“মোটেই না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জবাব তোমাকে দিতেই হবে, এমন কথা কি আমি বলেছি? বলিনি। জবাব দিতে তোমার যদি কোনও অসুবিধে থাকে তো দিও না।”
আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সত্যিই কিছু অসুবিধে আছে এই মেয়েটির নিজের থেকে সব বলতে এসেও, যে-জন্যে ও সব কথা আমাদের খুলে বলতে পারছে না।
ইজিচেয়ার থেকে আমি উঠে পড়লুম। টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দে গলাইটা কুড়িয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “আপনারা বরং কথা বলুন, আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”
নিরুই বাধা দিল আমাকে। বলল, “বসুন, আপনাকে বাইরে যেতে হবে না। সব কথা খুলে বলতে আমার একটু অসুবিধে আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা আপনার জন্যে নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কার জন্যে?”
“যাঁর জন্যে, দুপুরে তিনি শিলিগুড়ি রওনা হয়ে গেছেন।”
“অর্থাৎ সত্যপ্রকাশের জন্যে। তাই না?”
মৃদু গলায় নিরু বলল, “হ্যাঁ, জামাইবাবুর জন্যে। তিনি অবশ্য তাঁর নিজের মান-সম্মান নিয়ে খুব টিন্তিত নন; এ-ব্যাপারে তাঁর যা-কিছু দুর্ভাবনা, আমি খুব ভালই বুঝতে পারি যে, তা শুধু আমারই জন্যে। আমারই মান-সম্মানের কথা ভেবে তিনি অনেক ব্যাপার তাঁর মা আর পিসিমার কাছ থেকে তো বটেই তাঁর ছেলেমেয়েদের কাছ থেকেও গোপন করে রেখেছেন। আমি যে কে, তা পর্যন্ত কাউকে কখনও জানাননি।”
একটুক্ষণের জন্যে চুপ করে রইল নিরু। তারপর মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে ম্লান হেসে বলল, “অথচ মজা কী জানেন, নিজের মান-অপমানের কথা আমি আর এখন ভাবছি না, আমি শুধু ভাবছি যে, শিলিগুড়ির যে নরক থেকে উনি আমাকে তুলে নিয়ে এসেছেন, দরকার হয় তো সেই নরকেই আমি আবার ফিরে যাব, তবু আমার জন্যে যেন ওঁর গায়ে কোনও কলঙ্কের দাগ না লাগে।
