ষোল
ঘরে এখন আর কেউ নেই। চুপচাপ আমরা বসে আছি। মুখ ফুটে একবার জিজ্ঞেস করেছিলুম, “কী ব্যাপার বলুন তো,” কিন্তু ভাদুড়িমশাই আমার কথার কোনও জবাব দেননি। গম্ভীর থমথমে মুখ। বুঝতে পারছিলুম, কিছু একটা বিষয়ে তিনি চিন্তা করছেন। আমার প্রশ্নটা যে তিনি শুনতে পেরেছেন এমনও মনে হল না।
মিনিট পাঁচ-দশ পরে তিনি আমার দিকে তাকালেন। দেখলুম, অদ্ভুত একটা হাসি ছড়িয়ে গিয়েছে তাঁর মুখে। চোখে ঝিলিক দিচ্ছে কৌতুকের আলো। বললেন, “কিরণবাবু, আমার অবস্থা এতক্ষণ ছিল দৃষ্টিহীন সেই মানুষটির মতো, অমাবস্যার রাত্তিরে জানালা-দরজা-বন্ধ একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে যে কিনা একটা কালো বেড়ালকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।”
বললুম, “তার মানে?”
“তার মানে একদিকে মূর্তি উধাও, অন্য দিকে চাঁদসদাগর দি গ্রেট। আবার তারই মাঝখানে এই ব্যাপার! না মশাই, আমি আর এখন অন্ধ নই, চোখ ফুটেছে, অমাবস্যার রাত পুইয়েছে, ঘরের মধ্যে একটু-একটু আলোও ঢুকছে; তা এই রকম যদি চলতে থাকে তো বেড়ালটাকে নিশ্চয় ধরে ফেলতে পারব।”
কিছুই বুঝতে পারলুম না। তবে এইটুকু বুঝলুম যে, কিছুক্ষণ এখন চুপ করে থাকাই ভাল।
সত্যপ্রকাশ ফিরলেন প্রায় আধ ঘন্টা বাদে। ফিরেই ধপাস করে সোফায় বসে পড়ে বললেন, “দূর দূর, যত সব অপদার্থ! কাজের কাজ কিছু করতে পারেনি, নাহক শুধু বকর-বকর করে আমার সময় নষ্ট করা! …আর এক প্রস্ত চা হয়ে যাক্, কেমন?”
“হোক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু পুলিশ একটা-কিছু আন্দাজ করে তো এগোচ্ছে। সেটা কী?”
সত্যপ্রকাশ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “আর-এক পট চা দিয়ে যাও।” তারপর ফিরে এসে ফের সোফায় বসে হাত উলটে বললেন, “কি আন্দাজ করতে পারেনি। সাধে কি আর অপদার্থ বলছি! এদিনে আবার বায়নার অন্ত নেই! কেন এসেছিল জানেন?”
“কেন? কিছু-একটা সুবিধে আদায় করতে?”
“ঠিক ধরেছেন! ঠিক ধরেছেন! এ্যাবসলিউটলি রাইট! কী করে বুঝলেন মশাই?”
“এর আর বোঝাবুঝির কী আছে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা বায়নাটা কী?”
“আর বলেন কেন, দারোগাবাবুর মেজো শালা আলিপুরদুয়ারে চাকরি করে, সেখান থেকে তাকে শিলিগুড়িতে ট্রান্সফার করা হয়েছে। তা আলিপুরদুয়ারের পাট তুলে সংসারের যাবতীয় লটবহর নিয়ে তাকে এখন শিলিগুড়িতে যেতে হবে তো, তাই বলছিল যে, একটা দিনের জন্যে আমার একটা ট্রাক যদি তাকে দিই তো বেচারার বড্ড উপকার হয়।”
“বেচারাই বটে!”
“শুধু কি তা-ই,” তেতো গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “শিলিগুড়িতে পৌঁছেই তো আর সব গুছিয়ে উঠতে পারবে না, মেজো শালাবাবুটিব হোল্ ফ্যামিলিকে তাই অন্তত দুটো দিনের জন্যে আমার হোটেলে নাকি থাকতে দিতে হবে। দু’দুটো বর চাই। বুঝুন বা পার।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ট্রাকের ভাড়া আর হোটেল চার্সে দেবে তো?”
“তা হলে আর বলছি কী। কিস্তু দেবে না মশাই, কিসু দেবে না।”
“যাচ্চলে! তবে আর আপনি ট্রাকই বা দেবেন কেন” হোটেলেই বা রাখবেন কেন?”
“উপায় কী,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “জলে থেকে এদি-বা কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা চলে, ডাঙায় থেকে পুলিশকে চটানো চলে না। ও হ্যাঁ, একটা কণা আপনাদের বলা হয়নি। শিলিগুড়ি থেকে আমার হোটেলের ম্যানেজার সুবিমল এই খানিক আগে এখানে একটা মেসেজ নিয়ে এসেছে। তার সঙ্গে একটু বাদেই আমাকে শিলিগুড়ি যেতে হবে। এখন তো এগারোটা বাজে। এই ধরুন মোটামুটি বারোটা নাগাদ আমরা রওনা হব।”
জিজ্ঞেস করলুম, “আমরা মানে?”
“আমরা মানে আমি আর সুবিমল। আপনারা এখানে থাকুন, ভাবুন, বিশ্রাম করুন। আর হ্যাঁ, সুবিমল গাড়ি নিয়ে এসেছে. সেই গাড়িতেই আমি যাচ্ছি। আমার গাড়িটা রইল। ইচ্ছে হলে বিকেলে আলিপুরদুয়ার থেকে একটু ঘুরও আসতে পারেন। আপনারা ড্রাইভ করতে পারেন তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পারি।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “না-পারলেও ক্ষতি ছিল না। রামদাস অতি চমৎকার গাড়ি চালায়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ আর আমরা কোথাও যাচ্ছি না। কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে আপনি ফিরছেন কবে?”
“কবে মানে?” সত্যপ্রকাশ বললেন, “কাজটা জরুরি, না গিয়ে উপায় নেই, তাই যাচ্ছি, তবে সময় বেশি লাগবে না, রাত্তিরেই ফিরে আসছি। অবশ্য একটু বেশি-রাত হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপনারা খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়বেন, আমার জন্যে বসে থাকবেন না।”
“ঠিক আছে। কিন্তু ‘শাপনি থাকছেন না বলেই দু-একটা কথা আপনাকে জানাতে চাই, কেননা সেই অনুযায়ী কিছু ব্যবস্থা করা দরকার।”
চা এসে গিয়েছিল। যে নিয়ে এল, সে যে নিরু নয়, সেটা লক্ষ করলুম। পট থেকে চা ঢেলে দুধ-চিনি মেশাতে মেশাতে স্ত্যপ্রকাশ বললেন, “গোপালের মা, রান্নাঘরে বলে দাও যে, একটু বাদেই আমরা খেতে বসব।”
গোপালের মা বেরিয়ে গেল। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “এবারে বলুন কী বলবেন।”
“খুড়োমশাইয়ের উপরে সবাই খাপ্পা হয়ে আছে, সেটা তো জানেন?”
“জানি বই কী।”
“কিন্তু কতটা খাপ্পা হয়ে আছে, তা হয়তো জানেন না। যা বুঝতে পারছি, তাঁর উপরে একটা বিচ্ছিরি রকমের হামলা হওয়া কিছু বিচিত্র নয়। সেটা আটকাতে হবে। আপনাকে এখানে ভালবাসে সবাই। তাই সবাইকে আপনি বুঝিয়ে বলুন, দু-একটা দিন তারা একটু ধৈর্য ধরে থাকুক। সবাইকে যদি না বলা সম্ভব হয়, তো দু-চারজন প্রবীণ লোককে বলুন। নিজে যদি না সময় পান তো রঙ্গনাথবাবুকে ডেকে পাঠান। তিনি বুঝিয়ে বললেও কাজ হবে।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “এই ব্যাপার? এতটা তো আমি বুঝতে পারিনি। ঠিক আছে। যাবার আগে রঙ্গনাথবাবুকে আমি বলে যাচ্ছি। এনি আদার প্রবলেম?”
“অন্তত আজকের রাতটার জন্যে রঙ্গিলার ঘরে একটা ভাল রকমের পাহারার ব্যবস্থা করে দিন।”
“কেন?”
“বুঝতে পারছেন না? চোর যদি বাইরে থেকে এসে থাকে তো ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু সে তো এই গ্রামেরও কেউ হতে পারে। তা যদি হয় তো একটা মারাত্মক বিপদের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।”
“এ-কথা বলছেন কেন?”
“এই জন্যে বলছি যে, রঙ্গিলা সে-ক্ষেত্রে চোরকে যে শুধুমাত্র দেখেছে, তা নয়, চিনতে ও পেরেছে। অর্থাৎ রঙ্গিলা য?ি সুস্থ হয়ে ওঠে, তো চোরকে সে শনাক্ত করতে পারবে। চোর যে তার আগেই রঙ্গিলাকে খতম করতে চাইলে, এটা আপনি বুঝতে পারছেন না?”
“ওরে বাবা,” শিউরে উঠে সত্যপ্রকাশ বললেন, “এটা তো আমি ভেবে দেখিনি। ঠিক আছে, জগদীশকে আমি ডেকে পাঠাচ্ছি। সে এসে আপনার সঙ্গে শো করুক। পাহারার ব্যাপারে যা-কিছু ইনস্ট্রাকশন দেবার, তাকে দেবেন।”
“জগদীশ কে?”
“আমার হোটেলের দরোয়ান। সুবিমলের সঙ্গে শিলিগুড়ি থেকে এসেছে। খুনের আসামি। পাঁচ বছর জেল খেটেছে। তবে বিশ্বাসী লোক।”
“আর একটা কথা ছিল।”
“বলুন।”
“রঙ্গিলার ডাক্তারবাবু আজ বিকেলে আসবেন তো?”
“নিশ্চয় আসবেন।”
“তিনি তো শুনেছি হাসিমারার লোক, আর আপনারাও তো হাসিমারা হয়েই শিলিগুড়ি যাচ্ছেন, তা যাবার পথে তাঁকে একটু বলে যাবেন যে, আমার একটু সর্দি-জ্বরের মতো হয়েছে, রঙ্গিলাকে দেখবার আগে যেন আমাদের ঘরে এসে আমাকে একটু দেখে যান।”
“সত্যি জ্বর হয়েছে নাকি?”
“আরে না! আসলে ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।”
“ঠিক আছে,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি বাথরুমে ঢুকছি। আপনারাও চটপট চান করে নিন। রাত্রিরের খাওয়া। হয়তো একসঙ্গে বসে হবে না, অন্তত দুপুরেরটা একসঙ্গে হোক।”
স্নান করে বেরিয়ে ডাইনিং হলে ঢুকে দেখলুম, সত্যপ্রকাশ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। তাঁর পাশে যিনি বসে আছেন, থ্রি-পিস স্যুট পরা সেই যুবকটির বয়স বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। সত্যপ্রকাশ আলাপ করিয়ে দিলেন। “ইনি মিঃ সুবিমল সেন, আমাদের হোটেলের ম্যানেজার। আর এঁরা হচ্ছেন মিঃ ভাদুড়ি আর মিঃ চ্যাটার্জি। আমার বন্ধু। কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছেন, এদিকটা একটু ঘুরে দেখবেন।”
লক্ষ করলুম, আমরা যে মনসামূর্তি উদ্ধারের কাজে এসেছি, সত্যপ্রকাশ সেটা চেপে গেলেন। Tমস্কার বিনিময়ের পরে অবশ্য সুবিমল সেনের সঙ্গে আমাদের আলাপ বিশেষ এগোল না। সুবিমল যে খবর নিয়ে এসেছেন, বলতে গেলে সারাক্ষণ শুধু তারই সূত্রে তাঁর মালিকের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলে যেতে লাগলেন। তার থেকে যা বুঝতে পারলুম, সেটা এই যে শিলিগুড়িতে সত্যপ্রকাশ আরও ‘একটা হোটেল খুলতে চান, তার জন্যে জমি কিনেছেন, গাঁটের কড়ি খরচা করে তার ফার্স্ট ফেজের কাজ চুকিয়েও রেখেছেন, কিন্তু টাকার অভাবে কাজটা এগোচ্ছে না। ব্যাঙ্ক লোনের জন্যে যে চেষ্টা করছিলেন, তাতে বিশেষ সুবিধে হচ্ছিল না, হরেক গাঁটে আটকে গিয়ে ব্যাপারটা গত এক বছর ধরে ঝুলে ছিল। তবে কিনা এবারে হয়তো একটা সুরাহা হতে পারে। ব্যাঙ্কের জেনারেল ম্যানেজার কলকাতা থেকে মাত্র দু’দিনের জন্যে শিলিগুড়িতে এসেছেন, সত্যপ্রকাশ আজই বিকেলের মধ্যে যদি একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেন তো খুব ভাল হয়।
সত্যপ্রকাশ যে খুব-একটা কথা বলছিলেন, তা নয়। যা বলবার সুবিমলই বলে যাচ্ছিলেন, আর সত্যপ্রকাশ বাঝে-মাঝে হুঁ-হ্যাঁ দিয়ে যাচ্ছিলেন মাত্র। খাওয়া যখন শেষ হয়ে এসেছে, তখন তিনি বললেন, “হোটেলের বুকিং এখন কীরকম?”
“একসেলেন্ট। এইটেই তো সিজন স্যার।”
“দিন দুয়েকের জন্যে দুটো ঘর দিতে পারবে? …না না, ভাল ঘরগুলো চাইছি না, আলো-বাতাস ঢোকে না, এমন এঁদো ঘরও তো গোটা কয়েক আছে, তার থেকে দুটো ছেড়ে দেওয়া যায়?”
“দিন পনরোর মধ্যে পারব না, স্যার। এখন একেবারে টোটাল বুকিং চলছে। …কেন, কার জন্যে ঘর চাই স্যার?”
“এক দারোগার শালাবাবুর জন্যে। ব্যাটা আবার শিলিগুড়িতেই পোস্টিং পেয়েছে।”
“ও, এই ব্যাপার?” মালিকের সামনে যতটা উঁচু গায় হাসা যায়, সুবিমল ঠিক ততটা উঁচু গলায় হেসে বললেন, “তা হলে তো একে পয়সা দেবে না, তার উপরে আবার যেখানে-সেখানে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো ফেলে কার্পেট দুটোও পুড়িয়ে ছাড়বে!”
বিষণ্ণ গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, তা তো পোড়াতেই পারে।”
“তার চেয়ে এক কাজ করা যাক,” সুবিমল বললেন, “আমাদের হোটেলে না-ঢুকিয়ে বরং কাছাকাছি কোনও শস্তার হোটেলে চালান করে দিই। তার চার্জেস না হয় আমরাই মিটিয়ে দেব।”
“যা ভাল বোঝো করো।”
সত্যপ্রকাশের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তিনি উঠে পড়লেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা বিশ্রাম করুন। যাকে যা বলবার, সব বলে তবেই আমি শিলিগুড়ি রওনা হব; তার আগে একবার দেখাও করে যাব আপনাদের সঙ্গে। চিন্তার কিছু নেই। রাত্তিরেই তো ফিরছি। তখন সব শুনব।”
হাতমুখ ধুয়ে আমরা আমাদের ঘরে গিয়ে ঢুকলুম।
