মিসেস তালুকদারের আংটি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
তিন
দুপুরের খাওয়াটা গতকাল আমরা একতলার ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে এসেছিলুম। কিন্তু আজ আর সদানন্দবাবু নীচে নামতে চাইলেন না। বললেন, “শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে।”
কেন যে সদানন্দবাবু নীচে নামতে চাইছেন না, সে আমি খুব ভালই বুঝতে পেরেছিলুম। তাঁর ভয়, ডাইনিং হলে ঢুকলেই ফের মিসেস তালুকদারের সামনে গিয়ে পড়বেন। কিন্তু সে-কথা চেপে গিয়ে বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো? জ্বরটর হয়েছে নাকি?”
“না না, সে-সব কিছু নয়।”
“তা হলে?”
“এই মানে ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে একটু সর্দিমতো হয়েচে আর কী।” বেজার গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “তা আপনারা তো নীচে যাচ্চেন। গিয়ে বরং আমার খাবারটা এখানে পাঠিয়ে দিতে বলবেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো আমাদের তিনজনের খাবারই উপরে আনিয়ে নিতে পারি।”
তা-ই নেওয়া হল। তবে আারে আজ আর সদানন্দবাবুর বিশেষ উৎসাহ দেখা গেল না।
খাওয়ার পাট চুকে যাবার পর ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘরে ফিরবার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় দরজার কাছ থেকে মনোজবাবু বললেন, “ভিতরে আসতে পারি?”
বললুম, “আসুন, আসুন।”
ভিতরে ঢুকে ভদ্রলোক আমাদের জোড়াখাটের একপ্রান্তে বসে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে সেটা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে ধরলেন। নিজেও সিগারেট ধরালেন একটা। তারপর, আমাকে যে সিগারেট অফার করা হয়নি, এটা মনে পড়ে যাওয়ায় প্যাকেটটাকে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে লজ্জিত গলায় বললেন, “কিছু মনে করবেন না মশাই, ভুল হয়ে গেসল।”
বললুম, “আরে দূর, এতে মনে করবার কী আছে? ভুল আমাদের সকলেরই হয়। তবে হ্যাঁ, আপনার ভুলের ফলে দামি ব্র্যান্ডের একটা সিগারেট প্রায় ফসকে যাচ্ছিল।”
মনোজবাবু তাতে হেসে বললেন, “আর লজ্জা দেবেন না মশাই। আর তো কোনও নেশা নেই, নেশার মধ্যে একমাত্র এই সিগারেট। তাও একটু দামি খাব না?”
বললুম, “একশো বার খাবেন। আমাদেরও মাঝেমধ্যে দেবেন। তা নইলে আর এত ভাল সিগারেট আমাদের কপালে কোত্থেকে জুটবে বলুন?”
শুনে মনোজবাবু বিন্দুমাত্র বেজার হলেন না। হোহো করে হাসলেন খানিকক্ষণ। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “সত্যি মশাই, আপনারা বটে লেগপুলিং করতে পারেন! কিন্তু সে-কথা থাক। আজ আপনারা ডাইনিং হলে খেতে যাননি কেন? কারও শরীর খারাপ?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাদের সদানন্দবাবুর শরীরটা একটু বিগড়েছে। একবেলা লঙ্ঘন দিলেই ঠিক হয়ে যাবে অখন। তা ভাবছিলুম যে, ও-বেলা উনি যদি…”
কথাটা শেষ হতে পারল না। লঙ্ঘনের কথা শুনেই উৎকর্ণ হয়েছিলেন সদানন্দবাবু, ভাদুড়িমশাইকে থামিয়ে দিয়ে একেবারে হামলে পড়ে বললেন, “না না, বিগড়োয়-টিগড়োয়নি। সকালবেলায় বার-দুয়েক হেঁচেছিলুম, সেটা অস্বীকার করব না, তবে এখন তো ভালই আছি। শরীরটা বেশ ঝরঝর লাগছে। একদিন একটু ইচ্ছে হল, তাই খাবারটা উপরে আনিয়ে বেশ নিরিবিলিতে বসে খেয়ে নিলুম, এই আর কি।”
মনোজবাবু বললেন, “কিন্তু নীচে যাননি বলে যে একটা দারুণ দৃশ্য আপনারা মিস করেছেন, সেটা জানেন?”
ব্যাপারটা যে একেবারেই আন্দাজ করতে পারিনি, এমন কথা বললে ডাহা মিথ্যে বলা হবে। সম্ভবত সদানন্দবাবুও আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, তা নইলে তাঁর মুখ নিশ্চয় হঠাৎ আবার ফ্যাকাশে হয়ে যেত না। একমাত্র ভাদুড়িমশাই দেখলুম নির্বিকার। হালকা গলায় তিনি বললেন, “কেন, কী হয়েছে?”
“উরেব্বাপ রে বাপ, সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার!”
“কী হয়েছে, সেটা বলবেন তো?”
“যা হয়েছে, সে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না, মশাই,” মনোজবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, “সবে ডাল দিয়ে ভাত মেখে নিয়েছি, প্রথম গেরাসটা মুখে তুলতে যাব, এমন সময় এক ভদ্রমহিলা যা কাণ্ড বাধিয়ে দিলেন না…ওফ্, ভাবতে যেন এখনও আমার বুক কাঁপছে!”
“কী করলেন তিনি?”
“যে দুটো বাচ্চা ছেলে পরিবেশন করছিল, বাঁ হাত দিয়ে তাদের একটাকে এক হ্যাঁচকা টানে কাছে টেনে নিয়ে যাচ্ছেতাই করে ধমকাতে শুরু করলেন। কী, না যা রান্না হয়েছে, তার একটাও নাকি মুখে তোলার জুগ্যি নয়। আমি জাস্ট বলতে গিয়েছিলুম যে, ম্যাডাম, হোটেলের রান্না কি আর বাড়ির রান্নার মতো হয়, নাকি হতে পারে? তা মশাই কথাটা যে বলব, তার ফুরসত পর্যন্ত পেলুম না। ‘ম্যাডাম’ বলে শুরু করতে-না-করতেই আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ পাকিয়ে বাজখাঁই গলায় বললেন, ‘চোওপ!’ আর আমিও অমনি…”
“চুপ করে গেলেন, কেমন?”
মনোজবাবু বললেন, “শুধু আমি কেন, ঘরসুদ্ধু সবাই দেখলুম স্পিকটি নট! ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্র ছুটে এসেছিলেন, কিন্তু এলে কী হবে, তাঁকেও একেবারে উস্তুম-কুস্তুম করে ছেড়ে দিলেন কী মেজাজ, বাপ্স!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কই, কাল তো দু’বেলাই ডাইনিং হলে খেলুম, তখন তো এমন কাউকে দেখিনি।”
“কী করে দেখবেন, ইনি তো আজই এলেন! শুনলুম স্বর্গদ্বারের ওদিকে এক হোটেলে এসে উঠেছিলেন, কিন্তু একটা রাতের বেশি সেখানে থাকতে পারেননি, সেখান থেকে চেক-আউট করে আজ সকালে এখানে এসে ঢুকেছেন।”
“মেজাজের কথা যা শুনছি, তাতে এখানেও কি আর থাকতে পারবেন? নামটা কী?”
“মিসেস বি. তালুকদার!”
“বুঝেছি,” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “পরশু রাতে ইনিই খড়গপুর থেকে জগন্নাথ এক্সপ্রেসে উঠেছিলেন। কী সদানন্দবাবু, একবার গিয়ে দেখা করে আসবেন নাকি?”
বললুম, “সদানন্দবাবুর সঙ্গে আজ সকালেই ওঁর একবার দেখা হয়েছে।”
“তা-ই বলুন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেইজন্যেই বুঝি আজ ডাইনিং হলে গেলেন না?”
সদানন্দবাবু বললেন, “কী যে বলেন! আমাকে অত কাওয়ার্ড ভাববেন না তো!”
ব্যাপারটা নিয়ে আরও কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টা হল। তারপর মনোজবাবু আর ভাদুড়িমশাই যে যার ঘরে চলে গেলেন।
দক্ষিণ দিকের বলতে গেলে প্রায় গোটা দেওয়াল জুড়ে মস্ত বড় কাচের জানলা। তাতে চোখ রেখে দেখতে পাচ্ছি যে, বিশাল-বিশাল সব ব্রেকার এসে ভেঙে পড়ছে। অথচ এমনই দুর্ভাগ্য আমাদের যে, খানিকক্ষণের জন্যে যে ওই সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসব, তার উপায় নেই। আকাশের রাগ এখনও একটুও কমেনি, গোটা আকাশ একেবারে কালোয় কালো। ঝোড়ো বাতাসের মাতামাতিও সমানে চলেছে। আর বৃষ্টিরও কিছু কামাই নেই। পড়ছে তো সমানে পড়েই যাচ্ছে।
সদানন্দবাবু কাওয়ার্ড না-হতেই পারেন, তবে মিসেস তালুকদার সম্পর্কে তাঁর যে একটা অ্যালার্জি জন্মে গেছে, সেটা ঠিক। সম্ভবত সেই কারণেই বিকেলবেলার চায়ের ফরমাশ দেবার জন্যেও আজ আর তিনি নীচে নামলেন না, রুম সার্ভিসে ফোন করে চা আর বিস্কুট উপরে আনিয়ে নিলেন।
সদানন্দবাবু দিনে তিন-কাপের বেশি চা খান না। তাই রাত সাতটার সময় ফের টেলিফোন করে যে চা আনালেন, সেটা শুধু আমার আর ভাদুড়িমশাইয়ের জন্যে। আমি গিয়ে পাশের ঘর থেকে ভাদুড়িমশাইকে ডেকে আনলুম। দুজনে বসে চা খাচ্ছি, এমন সময় সদানন্দবাবু বললেন, “দেখুন মশাই, একটা কথার যতক্ষণ না ফয়সালা হচ্চে, ততক্ষণ আমি শান্তি পাচ্চি না। বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী কাণ্ড, এও জিজ্ঞেস করে বলতে হবে? বলুন, বলুন।”
“আমার ধারণা,” গলাটাকে একটু খাঁকরে নিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “আমার ধারণা, ‘আপনারা দুজনেই আমাকে কাওয়ার্ড ভাবেন। সেটা কি ঠিক?”
ভাদুড়িমশাই একেবারে হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “মোটেই ঠিক নয়। কিরণবাবুর কথা কিরণবাবু বলবেন, আমি শুধু আমার কথাটাই বলতে পারি। কাউকেই আমি কাপুরুষ ভাবি না। আবার কাউকেই যে বীরপুরুষ ভাবি না, তাও ঠিক। আসল কথা, ভয় আর সাহস, দুটো ব্যাপারই আমাদের মধ্যে রয়েছে। তার মধ্যে কখন যে কোনটা মাথা চাড়া দেবে, সেটা স্থান কাল আর ঘটনার উপরে নির্ভর করছে। ঢোঁড়া সাপকেও ভয় পায় অথচ খ্যাপা ষাঁড়কে ডরায় না, এমন মানুষ আমি কম দেখিনি। আবার, নেহাত একবার নয়, তিন-তিন বার আর্মড পুলিশের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের হাত থেকে যে-লোক রাইফেল কেড়ে নিয়েছিল, বাড়ি থেকে তার বাচ্চা ছেলেটাকে তুলে নিয়ে আসবার পরে তাকেও আমি থানায় এসে সারেন্ডার করে দারোগাবাবুর পা জড়িয়ে ধরে হাপুস কাঁদতে দেখেছি। ফলে, কাকে যে কাপুরুষ বলব, আর কাকে বলব বীরপুরুষ, সেটাই আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। কিরণবাবু কী বলেন?”
বললুম, “আমারও ওই একই কথা। না সদানন্দবাবু, মোটেই আপনাকে আমি কাওয়ার্ড ভাবি না।”
এতক্ষণে সদানন্দবাবুর মুখে হাসি ফুটল। বললেন, “বাঁচালেন মশাই। আসলে মিসেস তালুকদারকে আমি ভয় পাই না, অপছন্দ করি। অথচ আমার মনে হচ্চিল যে, আপনারা সেটা বুঝতে পারচেন না, ভাবচেন যে, ওঁর ভয়ে আমি সিঁটিয়ে আচি। অবশ্য একজন ভদ্রমহিলা হওয়া সত্ত্বেও ওঁর ব্যবহার যেমন বিচ্ছিরি আর গলার আওয়াজ যে-রকম মোটা, তাতে এটা হতেই পারে যে, উনিই হচ্চেন জোড়াসাঁকোর সেই ডাকাত। কিন্তু তাতেই বা আমি ভয় পাব কেন? না মশাই, আমি একটুও ভয় পাইনি।”
বললুম, “তা তো আমরা জানিই। তা হলে আর ও-কথা এতবার করে বলবার দরকার কী?”
“আচে মশাই, দরকার আচে।” সদানন্দবাবু চতুর হেসে বললেন, “আসলে ব্যাপারটা কী জানেন, আপনারা যদি ভাবতেন যে, আমি ওই ভদ্রমহিলাকে ভয় পাচ্চি, তা হলে এই বিচ্ছিরি ওয়েদারের মধ্যেও মাটি কামড়ে এখানে আমাকে পড়ে থাকতে হত। নীচে গিয়ে ডাইনিং হলে বসে খেতেও হত। কেন হত বলুন তো? স্রেফ এইটে প্রমাণ করবার জন্যে যে, হতে পারেন উনি ডাকাত, তবু আমি ওঁকে ভয় পাচ্চি না। কিন্তু তা যখন আপনারা ভাবচেন না, তখন আমার দুটো প্রস্তাব আচে। কী ভাদুড়িমশাই, বলব?”
“বলে ফেলুন।”
“ওবেলায় যেমন ডাইনিং-হলে খেতে যাইনি, তেমন এ-বেলাও যাব না।”
আমার হাসি পাচ্ছিল। হাসি চেপে বললুম, “বেশ তো, তা-ই হবে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রস্তাবটা কী?”
“এখান থেকে এবারে সরে পড়াই ভাল। …না না, মিসেস তালুকদারের কথা ভেবে এ-কথা বলচি না, বলছি এই বিচ্ছিরি ওয়েদারের কথা ভেবে।”
পেটের ভিতর থেকে হাসিটা এমন পাক মেরে-মেরে উঠে আসছিল যে, অনেক চেষ্টা করেও সেটাকে আর চেপে রাখা গেল না। ভাদুড়িমশাই কিন্তু একটুও না হেসে বললেন, “কলকাতায় ফিরে যেতে চাইছেন?”
“না না, কলকাতায় নয়।” সদানন্দবাবু বললেন, “মিঃ মহাপাত্র কাল বলছিলেন যে, এখানে টুরিস্ট-কোচের অভাব নেই। সকালবেলায় তারই একটার টিকিট কেটে যদি বেরিয়ে পড়ি, তো কোনারক আর ভুবনেশ্বরটা দেখে নিয়ে রাত্তিরে আবার পুরীতে ফিরে আসা যাবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তো, আপনি আর কিরণবাবু গিয়ে ঘুরে আসুন।”
“আর আপনি?”
“আমি মশাই শনিবার রাত্তিরে পুরী এক্সপ্রেসে উঠে রোব্বার সকালে হাওড়ায় গিয়ে নামব, তার আগে আর এখান থেকে কোথাও যাচ্ছি না। সারাটা দিন ধরে জানলার পাশে বসে এই যে এত বড় একটা সমুদ্র দেখতে পাচ্ছি, এমন সুযোগ কি আর শিগগির পাওয়া যাবে?”
আমি বললুম, “না সদানন্দবাবু, আমিও যাচ্ছি না।”
সদানন্দবাবুর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল। আর্ম-চেয়ারে একেবারে হতাশ ভঙ্গিতে এলিয়ে পড়ে বললেন, “তা হলে আর কী হবে, মেয়ে-ডাকাতের হাতে প্রাণ যায় তো যাক, তাই বলে তো আপনাদের ছেড়ে যেতে পারি না। ঠিক আচে, আমিও তা হলে থাকচি।”
ঠিক এই সময়েই ঝপ করে হঠাৎ ঘরের আলো নিবে গেল। আর তারপর আধ-মিনিটও বোধহয় যায়নি, আমাদের খোলা দরজার ওদিক থেকে মনোজবাবুর গলা পাওয়া গেল : ভিতরে আসতে পারি।
