(৯)
আপিসে আজ দশটার মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিলুম। ঠিক ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজকর্ম শেষ করে বিকেল চারটে নাগাদ বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু তিনটে নাগাদ নতুন এক প্রস্ত কাজ একেবারে হঠাৎই এসে পড়ে। সে-সব মিটিয়ে পৌনে পাঁচটার আগে আপিস থেকে বেরুতে পারিনি। তাতে অবশ্য ক্ষতি হয়নি। রাস্তায় বিশেষ ভিড় না থাকায় ধর্মতলা স্ট্রিট ধরে মৌলালি অব্দি গিয়ে, বাঁয়ে টার্ন নিয়ে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে পাঁচটা পাঁচের মধ্যেই পীতাম্বর চৌধুরি লেনে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে পৌঁছে যাই। বৈঠকখানা ঘরে ঢুকে দেখি, সদানন্দবাবু সেখানে বসে আছেন।
এই সময়ে সদানন্দবাবুকে আশা করিনি। বললুম, “কী ব্যাপার?”
সদানন্দবাবু বললেন, “সকাল সাড়ে ন’টায় এসে শুনলুম, আপনি আপিসে বেরিয়েচেন। তারপর খানিক আগে এসে শুনলুম, সকাল-সকাল ফিরে নাকি ফের ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে যাবেন।”
“কথাটা কে বলল?”
“বউমা বললেন। তাই শুনে আমি ভাবলুম, একটু বসে যাই, তা হলে হয়তো আপনার সঙ্গে দেখাটা হয়ে যেতে পারে।”
বাসন্তী এসে ঘরে ঢুকল, বলল, “চায়ের জল চাপাব? নাকি চা খাওয়ারও সময় নেই?” বললুম, “সত্যিই সময় নেই। কিন্তু আমি যে ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে যাব, তুমিই বা সে-কথা কোত্থেকে জানলে? কই, আমি তোমাকে বলেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”
বাসন্তী বলল, “তুমি কেন বলবে, ভাদুড়িমশাই একটু আগে ফোন করে জানালেন। নাকি ছ’টার মধ্যে তুমি ওখানে যাচ্ছ, পারলে যেন আমিও তোমার সঙ্গে যাই। তা আমি কী করে বাড়িঘরেদোর ফেলে এখন বেরোব?”
“সেই কথাটাই দুঃখ করে সদানন্দবাবুকে বলছিলে বুঝি?”
সদানন্দবাবু বললেন, “বা, আমি আপনাদের নেক্সট-ডোর নেবার, আমাকে বলবেন না? তা আমি একটা কথা বলব?”
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললুম, “বলে ফেলুন।”
“মিসেস চ্যাটার্জি তো যেতে পারচেন না! আমি কিন্তু যেতে পারি। যাব? মানে কোনও অসুবিদে হবে না তো?”
“কিছু না। একেবারে তৈরি হয়েই এসেছেন দেখছি। চলুন, তা হলে আর দেরি করে লাভ নেই, রওনা হওয়া যাক।”
নীচে নেমে গাড়িতে উঠে পড়লুম। পিছন থেকে বাসন্তী কিছু বলল। কী বলল, বুঝতে পারলুম না। ফলে স্টার্ট বন্ধ করে জিজ্ঞেস করতে হল, “কিছু বললে?”
বাসন্তী বলল, “বলছিলুম যে, একটু তাড়াতাড়ি ফিরো। কালকের মতো অত রাত কোরো না।”
ফের ফ্লাইওভাবে উঠে বাঁয়ে টার্ন নিয়ে আপার সার্কুলার রোডে পড়লুম। মানিকতলার মোড়ে পৌঁছে একটু দাঁড়াতে হল। ডাইনে ঘুরে যখন বিমল বরাটের বাড়ি পৌঁছলুম, তখন ঠিক পৌনে ছ’টাই বাজে।
বিমল একেবারে তৈরি হয়েই ছিল। দু’বার হর্ন দিতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে পিছনের সিটে উঠে পড়ল। হাতে ব্রাউন পেপারের একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা যে বেশ লম্বা-চওড়া, সেটা দেখে আশ্বস্ত হওয়া গেল যে, প্রিন্টগুলি মোটামুটি বড়সড় সাইজেই করা হয়েছে।
দীনেন্দ্র স্ট্রিটের মোড়ে এসে আটকে যেতে হল। উত্তর-দক্ষিণে একটার-পর-একটা লরি পাস করানো হচ্ছে। স্টার্ট বন্ধ করে দিয়ে বললুম, “অন্তত মিনিট পাঁচেক এখন গরমে সেদ্ধ হতে হবে। জানলার কাচ নামিয়ে দাও, বিমল।”
বিমল বলল, “তা দিচ্ছি, কিন্তু একটা ফিয়াট যেন আমাদের পিছু নিয়েছে।”
“তা-ই নাকি?”
“হ্যাঁ, গাড়িটা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে তা প্রায় ঘন্টাখানেক আগে থেকে পার্ক করা ছিল আমরা রওনা হবার সঙ্গে-সঙ্গেই পিছনে এসে লেপটে গেল।”
সদানন্দবাবু বললেন, “থাক থাক, তা হলে আর জানলা খুলে কাজ নেই।”
বিমল বলল, “আর-একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি, কিরণদা। আজ সকালে আপনার বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পর শুনলুম যে, সকালবেলাতেই এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি বাড়িতে নেই শুনে আমার ছোটভাইকে বলেন যে, ঠিক আছে, দুপুর বারোটা নাগাদ তিনি আবার আসবেন।”
“এসেছিলেন?”
“হ্যাঁ। এসে বললেন, তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন যে, শনিবার সকালের সেই অ্যাক্সিডেন্টের কিছু ছবি আমি তুলেছি। সেগুলি তিনি কিনতে চান।”
“কেন কিনতে চান জিজ্ঞেস করোনি?”
“করেছিলুম। তাতে বললেন যে, কলকাতায় কত রকমের স্ট্রিট-অ্যাক্সিডেন্ট হয়, তাই নিয়ে একটা সার্ভে না কী যেন চলছে। এই ছবিগুলো তাতে কাজে লাগবে।”
“তাতে তুমি কী বললে?”
“কী আর বলব।” বিমল বলল, “আপনি যখন ওগুলো বিক্রি করিয়ে দেবার ভার নিয়েছেন, তখন আর কাউকে কী করে বিক্রি করি? তাই এড়িয়ে যাবার জন্যে বললুম, নেগেটিভ-সুদ্ধ ওগুলো আমি অলরেডি আর-একজনকে বেচে দিয়েছি।”
“ভদ্রলোক সে-কথা বিশ্বাস করলেন?”
“করলেন বলে তো মনে হয় না। কিন্তু এটা কী ব্যাপার হল বলুন তো, শনিবার বিকেলে যে-ছবি অনেক সাধ্যসাধনা করেও কাউকে বেচতে পারিনি, তার জন্যে এখন বাড়ি বয়ে খদ্দের আসছে কেন?”
কেন আসছে, তা কি আমিই জানি? তবে লক্ষণ মোটেই ভাল ঠেকছে না। আয়নায় চোখ রেখে দেখতে পাচ্ছি, ফিয়াট গাড়িটা আমাদের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের মুখ একেবারে ভাবলেশহীন, স্রেফ একটা রোবটের মতন। মোড়ের মাথায় মিনিটের পর মিনিট আটকা পড়ে থাকতে হলে যে-কোনও ড্রাইভার বিরক্ত হয়। এর মুখে সেই বিরক্তিরও চিহ্ন নেই। মুখটা ভাল লাগল না। লোকটার যদি কোনও বদ মতলব থাকে, তা হলে পরপর কী কী ঘটতে পারে, মনে-মনে তার একটা হিসেব কষে নিলুম। এক, আমাকে ওভারটেক করার সময় ও একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে দিতে পারে। দুই, অ্যাক্সিডেন্ট যদি ঘটেই, তা হলে গাড়ি দুটোকে ঘিরে তৎক্ষণাৎ ভিড় জমে যাবে, হই-চই হট্টগোলের সীমা থাকবে না। অর্থাৎ একটা ঘোর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। তিন, সেই বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে ছবির প্যাকেটটা বে-হাত হয়ে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়। এ-ক্ষেত্রে ভাদুড়িমশাই কী করতেন, কে জানে, তবে আমি কী করব সেটা ঠিক করতে আমার এক সেকেন্ডও লাগল না। কনেস্টবল যে পুব-পশ্চিমে গাড়ি ছাড়তে চলেছে, সেটা বুঝেই আমি গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে রেখেছিলুম। এবারে ছাড়া পাবার সঙ্গে-সঙ্গেই এগিয়ে গেলুম ব্রিজের দিকে। কিন্তু ব্রিজে উঠবার পরে আর বেশি না-এগিয়ে বাঁয়ে ঘুরে ধরলুম খালপাড়ের পথ। এখানে যে একটা থানা রয়েছে, সেটা জানাই ছিল। থানার সামনে গাড়ি পার্ক করে বিমলকে বললুম, “গাড়ি থেকে তোমাদের নামবার দরকার নেই, তবে প্যাকেটটা বোধহয় তোমার কাছে রাখা ঠিক হবে না, ওটা আমাকে দাও, ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলে এক্ষুনি আমি আবার ফিরে আসছি।”
সদানন্দবাবু এতক্ষণ একেবারে কাঠের পুতুলের মতন স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন, এবারে ডুকরে উঠে বললেন, “সে কী মশাই, আমরা দু’জনে এখানে একলা বসে থাকব? কোনও বিপদ ঘটবে না তো?” থানার মধ্যে ঢুকতে-ঢুকতে বললুম, “মিনিট পাঁচেক ওই পচা খালের মশার কামড় খেতে হবে। তার চেয়ে বড় কোনও বিপদ ঘটবে না।”
ওসি ছিলেন না। যে ভদ্রলোক ডিউটিতে ছিলেন, তাঁকে আমার পরিচয় দিয়ে বললুম, “একটা ফোন করতে পারি?”
ভদ্রলোক বললেন, “বিলক্ষণ।” বলে ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
ডায়াল ঘোরাতেই কৌশিকের গলা পাওয়া গেল। বললুম, “আমি কিরণমামা বলছি। ভাদুড়িমশাইকে লাইনটা একবার দে তো।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী ব্যাপার, ছ’টা তো বেজে গেছে, তা হলে আসছেন না কেন?”
বললুম, “ছটাতেই পৌঁছে যেতুম, কিন্তু মানিকতলায় এসে মনে হল একটা গাড়ি আমাদের ফলো করছে। মতলব সুবিধের ঠেকল না, তাই থানায় ঢুকে পড়েছি।”
“তা-ই? তা হলে এক কাজ করুন। শোভন এসে গেছে। লাইনটা আমি ওকেই দিচ্ছি। ডিউটি অফিসারের সঙ্গে ও কথা বলুক। দে উইল নো হোয়াট টু ডু।”
রিসিভারটা ডিউটি অফিসারের হাতে তুলে দিয়ে বললুম, “শোভন চৌধুরিকে চেনেন?”
“কোন শোভন চৌধুরি? ইউ মিন আমাদের…”
বললুম, “হ্যাঁ মশাই, আপনাদের না তো কি আমাদের? নিন, তাঁর সঙ্গে কথা বলুন।”
হায়ারার্কির ব্যাপারটা যে যাই-যাই করেও আমাদের পুলিশ বিভাগ থেকে এখনও একেবারে চলে যায়নি, সেটা বোঝা গেল ডিউটি- অফিসারের কথা বলবার ধরন দেখে। ওদিক থেকে শোভন চৌধুরি তাঁকে কী বলছিলেন, তা বুঝবার উপায় নেই, তবে তিন-চার সেকেন্ড অন্তর-অন্তর এদিক থেকে যেমন তিনি ইয়েস স্যার” বলে যাচ্ছিলেন, তাতে আঁচ করা গেল যে, এমন কিছু নির্দেশ তাঁকে দেওয়া হচ্ছে, যা পালন করতে তিনি কোনও গাফিলতি করবেন না।
তা তিনি সত্যিই করলেন না। শোভন চৌধুরির সঙ্গে কথা শেষ করে রিসিভার নামিয়ে রেখে, পকেট থেকে রমাল বার করে ঘাড় ও কপাল মুছে নিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে মশাই, একটা গাড়ি যে আপনাদের ফলো করছিল, সেটা তো আমাকে বলবেন। তা হলে তো তক্ষুনি একজন আর্মড এসকর্ট আপনাকে দিয়ে দিতুম। এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়েও যদি ওপরতলার সাহেবদের কাছে যেতে হয় তো আমরা আছি কী করতে?”
আমরা গাড়িতে করে চলেছি আর মোটর-সাইকেলের ভটভট্ আওয়াজ তুলে একজন আর্মড এসকর্ট আমাদের পিছনে-পিছনে আসছে, সদানন্দবাবু দেখলুম এই ব্যবস্থায় দারুণ খুশি। বললেন, “উরে বাবা রে, এ তো ভাবাই যায় না!
এসকর্টটি আমাদের একেবারে আকাশ-বিহার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল।
কিন্তু সদানন্দবাবু যতই খুশি হোন, থানা থেকে রওনা হওয়ার পর থেকে বিমল বরাট যে একটাও কথা বলেনি, সেটা লক্ষ করেছিলুম। লিফটে উঠে সাততলার বোতাম টিপে দিয়ে বললুম, “কী হে বিমল, হঠাৎ এত ঝিমিয়ে পড়লে কেন?”
বিমল বলল, “কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে, কিরণদা। যে-ছবি কেউ কিনতে চায়নি, তার জন্যে বাড়িতে লোক আসছে, ছবিগুলো পাবার জন্যে ক্যাশ-টাকা নিয়ে সাধাসাধি করছে, রাস্তায় বেরুলে আমাদের ফলো করা হচ্ছে, পুলিশের লোক আমাদের এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় পাহারা দিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে, এ তো ভাবতেও পারিনি!”
লিফ্ট সাত-তলায় পৌঁছে গিয়েছে। দরজা খুলে বেরিয়ে বললুম, “ভয় পেয়ো না, বিমল। একটা কথা সব সময়ে মনে রাখবে। রিপোর্টার আর ফোটোগ্রাফারদের যে কাজ, তাতে ঝুঁকি একটু থাকেই।”
ডোর-বেল বাজতে কৌশিক এসে দরজা খুলে দিল। ভিতরে ঢুকে দেখলুম, শোভন চৌধুরি আর ভাদুড়িমশাই কথা বলছেন। অরুণ সান্যাল এই সময়ে বাড়ি থাকেন না, ধর্মতলার চেম্বারে বসে রুগি দেখেন। আমাদের দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসুন, আসুন। কী সৌভাগ্য, সদানন্দবাবুও এসে গেছেন দেখছি!” তারপর বিমলের দিকে তাকিয়ে, “আপনিই নিশ্চয় মিস্টার বরাট। কাগজে আপনার বিস্তর ছবি দেখেছি। যাক্, এবারে ক্যামেরার পিছনের মানুষটিকে দেখা গেল।”
মালতী এসে ঘরে ঢুকে সকলের উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার ফিরে গেল। বুঝতে পারলুম, ক’ কাপ চা পাঠাতে হবে, সেইটা বুঝে নেবার জন্যেই সে এসেছিল।
শোভন চৌধুরির সঙ্গে বিমলের পরিচয় করিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “এঁর কথা তো সবই তোমাকে বলেছি শোভন। এখন দেখা যাক, ছবিগুলো আমাদের কাজে লাগে কি না।”
ছবির প্যাকেটটা সেই যখন থানায় গিয়ে ঢুকি, তখন থেকে আমার কাছেই রেখে দিয়েছিলুম। প্যাকেটটা এবারে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললুম, “ছবির পিছনে কিন্তু এরই মধ্যে লোক লেগেছে।”
প্যাকেট থেকে ছবিগুলো বার করতে-করতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা গাড়ি যে আপনাদের পিছু নিয়েছিল, সেই কথা বলছেন তো? সে যে এগুলো ছিনতাই করবার মতলবেই ফলো করছিল, তা কিন্তু না-ও হতে পারে।”
বিমল বলল, “না না, ফলো করার কথা হচ্ছে না।”
ছবিগুলো দেখতে-দেখতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে কীসের কথা হচ্ছে?”
“এক ভদ্রলোক আজ দু’দু’বার আমার বাড়িতে এসেছিলেন। বললেন, আমি যে এই অ্যাক্সিডেন্টের ছবি তুলেছি, তা তিনি জানেন। ছবিগুলো তিনি কিনে নিতে চাইলেন। নাকি কী-একটা সার্ভের কাজে এগুলো তাঁর দরকার হবে।”
“বটে?” দুটো ছবির পিছনে পেনসিল দিয়ে মার্ক করতে-করতে চোখ না তুলেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “টাকা অফার করেছিলেন নিশ্চয়?”
“তা করেছিলেন।”
“কত?”
“পাঁচশো।”
ভাদুড়িমশাইয়ের ছবি দেখা হয়ে গিয়েছিল। যত্ন করে তিনি সেগুলোকে আবার প্যাকেটে পুরে রাখলেন। তারপর প্যাকেটটাকে শোভন চৌধুরির হাতে তুলে দিয়ে বিমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিরণবাবুর সঙ্গে যদি আগেই এ নিয়ে আপনার কথা না হত, তা হলে কি পাঁচশো টাকাতেই এগুলি ওই ভদ্রলোককে আপনি বিক্রি করতেন?”
“তার অনেক কমেই করতুম। পাঁচ শো টাকা তো অনেক টাকা।”
“বাঃ, আপনি দেখছি স্ট্রেট লোক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্ট্রেট অ্যান্ড অনেস্ট। ছবিগুলো আমি রেখে দিচ্ছি। সেই সঙ্গে নেগেটিভও। দু’-একটি ছবি হয়তো আর-একটু ব্লো-আপ করবার দরকার হবে। …ওরে, কৌশিক, আমার ভ্যালিজ থেকে মানিব্যাগটা বার করে এঁকে পাঁচশো টাকা দিয়ে দে।” শোভন চৌধুরি ছবি দেখছিলেন। দেখতে-দেখতেই মুখ তুলে একবার আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “ছবিগুলো আপনি দেখেছেন?”
বললুম, “এখনও দেখিনি। আপনাদের দেখা হয়ে যাক। তারপর দেখব। তা কী মনে হচ্ছে আপনার?”
“এই ছবিগুলি সম্পর্কে বলছেন তো?”
“হ্যাঁ।”
ছবিগুলিকে আবার প্যাকেটে পুরে রাখলেন শোভন চৌধুরি। তারপর প্যাকেটটাকে সেন্টার টেবিলের উপরে রেখে বললেন, “ইনভ্যালুয়েল।”
বিমল বলল, “আমি কি তা হলে যেতে পারি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বসে যান। কিরণবাবু তো গাড়ি নিয়ে এসেছেন, বাড়ি ফেরার পথে উনি আপনাকে আপনার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাবেন।”
“তার কোনও দরকার হবে না।” সঙ্কুচিত হয়ে বিমল বলল, “মাত্র তো সাতটা বাজে। প্রচুর বাস-ট্রাম রয়েছে। আমি ঠিকই চলে যেতে পারব।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “দেখুন বিমলবাবু, আপনাকে ভয় পাইয়ে দেবার কোনও ইচ্ছেই আমার নেই। কিন্তু মুশকিল কী হয়েছে জানেন, সেদিন এই ছবিগুলি তুলে আপনি নিজেরই অজান্তে একটা বিপদের মধ্যে জড়িয়ে গেছেন। আপনার পক্ষে এখন কয়েকটা দিন একটু সাবধানে থাকাই ভাল।”
বিমল বলল, “সে কী! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
চা এসে গিয়েছিল। ট্রে থেকে একটা কাপ তুলে নিয়ে বিমলের দিকে এগিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যত কম বুঝবেন, ততই ভাল। নিন, চা খান। আর হ্যাঁ, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। সেই জন্যেও আপনাকে একটু বসে যেতে বলছি।”
