লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৪)

ছুটির দিন। একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠে চোখে-মুখে জল দিয়ে খবরের কাগজের প্রথম পাতার হেডলাইনগুলোর উপরে চোখ বুলোচ্ছি, এই সময়ে সদানন্দবাবু এসে ঢুকলেন। মাথায়-লোহার বল- বসানো যে লাঠিখানা নিয়ে নিত্য তিনি প্রাতঃভ্রমণ করেন, রাস্তাঘাটে নেড়িকুত্তার উপদ্রব বেড়ে যাবার ফলে সেটি ইদানীং তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়েছে। আমার বৈঠকখানা ঘরের ঠিক কোন্ জায়গায় যে লাঠিটা রাখলে ভাল হয়, সেটা অবশ্য তিনি কোনওদিনই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেন না। আজও পারলেন না। বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বারকয় এদিকে ওদিকে তাকিয়ে তারপর দরজার পাশে বইয়ের যে একটা বেঁটে আলমারি রয়েছে, তার উপরে সেটিকে শুইয়ে রাখলেন। রাখতে গিয়ে আলমারির মাথার মাটির ফুলদানিটায় একটা মৃদু রকমের ধাক্কা লাগিয়েছিলেন। ফুলদানিটা বাসন্তীর শখের জিনিস। কেষ্টনগর থেকে কিনে এনেছিল। উলটে পড়ে ভাঙলে আর রক্ষা ছিল না।

 

রাইটিং টেবিলে আমার উলটো দিকের চেয়ারে বসে সদানন্দবাবু বললেন, “ফুলদানিটা ওখানে রেখেচেন কেন?”

 

উত্তরে বলা যেত, আপনার লাঠিটাই বা ওখানে রাখবার দরকার কী, দরজার পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখলেই তো গেল মিটে যায়। কিন্তু পরোপকারী প্রতিবেশীর প্রশ্নের উত্তরে অমন কথা বলা চলে না। তাই বললুম, “ঠিক বলেছেন, ওটাকে ওখান থেকে আজই সরিয়ে দেব।”

 

শুনে সদানন্দবাবু খুশি হলেন। তারপর একটা কাগজ টেনে নিয়ে বললেন, “কালকের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবচেন?”

 

একেবারেই যে কিছু ভাবছিলুম না, তা নয়, কিন্তু কী ভাবছিলুম, তা আর বলা হল না। কেন না, ঠিক এই সময়েই ফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে বললুম, “হ্যালো…”

 

ওদিক থেকে ভাদুড়িমশাইয়ের গলা ভেসে এল। “চাটুজ্যেমশাই, সকালবেলায় বাড়িতেই আছেন তো?”

 

“তা আছি।”

 

“তা হলে বাড়িতেই থাকুন। আমাকে একবার দক্ষিণ কলকাতায় যেতে হবে। এক্ষুনি বেরুচ্ছি। যাবার পথে আপনাকে তুলে নিয়ে যাব। ব্রেফফাস্ট যদি না-হয়ে থাকে তো সেটা সেরে নিন।”

 

“আর দুপুরের খাওয়া?”

 

“ওটা বাড়িতে ফিরে খাবেন। বারোটার মধ্যেই ফিরে আসছি।”

 

ভাদুড়িমশাই এলেন সাড়ে আটটা নাগাদ। সদানন্দবাবুর সঙ্গে আরও পাঁচ-দশ মিনিট গল্প করবার পর তাঁকে বিদায় জানিয়ে, স্নান করে, চা-জলখাবার খেয়ে, জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে নিতে-নিতেই শুনতে পেয়েছিলুম যে, রাস্তায় হর্ন বাজছে। ভাদুড়িমশাইকে আর উপরে আসতে হল না।

 

কলকাতায় থাকতে কৌশিক যে মারুতিটা কিনেছিল, সেটা এখনও বাঙ্গালোরে পাঠানো হয়নি। দেখলুম, ভাদুড়িমশাই সেই লাল মারুতি নিয়েই চলে এসেছেন। গাড়িতে উঠে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে বললুম, “ব্যাপার কী? কাল যা ঘটেছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন মনে হচ্ছে?”

 

“ইচ্ছে করে জড়াইনি মশাই, জড়িয়ে যেতে হল।”

 

“তার মানে?”

 

“চলুন, যেতে-যেতে সব বলছি।”

 

ভাদুড়িমশাই ফের যখন মুখ খুললেন, শেয়ালদার ফ্লাইওভার পার হয়ে তখন আমরা মৌলালির মোড়ের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি। বললেন, “না-জড়িয়ে উপায় ছিল না।”

 

“কেন?”

 

“নাম-টাম জানতে চাইবেন না, আপাতত শুধু এইটুকু জেনে রাখুন যে, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে কেউ-একজন কাল রাত্তিরে আমাকে ফোন করেছিলেন।”

 

“শোভন চৌধুরি?”

 

“ফের নাম জানতে চাইছেন? এ তো আচ্ছা লোকের পাল্লায় পড়লুম দেখছি। না, শোভন নয়, সামওয়ান ফার্দার আপ ইন দ্য ল্যাডার। না, আপনি জিজ্ঞেস করবেন বুঝতে পারছি, কিন্তু জিজ্ঞেস করলেও নামটা আমি বলতে পারব না।”

 

“কিন্তু কী বললেন তিনি, সেটা বলবেন তো?”

 

“তা নিশ্চয় বলব। বললেন যে, বড়-বড় কয়েকটা ক্রাইম নিয়ে ওঁরা একটু টায়েড ডাউন হয়ে আছেন, এদিকে কাঁকুড়গাছির ঘটনাটা তো আমি গোড়া থেকেই জানি, বলতে গেলে ব্যাপারটা আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে, তা ছাড়া এটাকে একটা মামুলি দুর্ঘটনার ব্যাপার বলে যখন আর ভাবা যাচ্ছে না, তখন এর ইনভেস্টিগেশানের ব্যাপারে আমি যদি ওঁদের যথাসম্ভব সাহায্য করি, তা হলে ওঁরা খুবই খুশি হবেন।”

 

বললুম, “আর আপনি অমনি রাজি হয়ে গেলেন?”

 

“হতুম না, কিন্তু একটা চিঠি এসে সব গোলমাল করে দিল।”

 

“কার চিঠি?”

 

ডান হাত স্টিয়ারিং হুইলে রেখে বাঁ-হাতে শার্টের বুক-পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “পড়ে দেখুন।”

 

পড়ে দেখলুম। সাদা একখণ্ড কাগজে ইংরেজিতে টাইপ করা দুটি মাত্র বাক্য।

 

Go back to Bangalore. The climate is much better there.

 

কিছুই বুঝলুম না। কাগজখানা ভাঁজ করে ফের ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো? এর অর্থ কী?”

 

“অর্থ তো অতি পরিষ্কার।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাকে ব্যাঙ্গালোরে ফিরে যেতে বলা হচ্ছে। কেন ফিরে যাব? না সেখনাকার জলবায়ু এখানকার চেয়ে অনেক ভাল। তা এটা হচ্ছে তাৎক্ষণিক অর্থ। নিহিতার্থ হল, ভাল চাস তো ব্যাঙ্গালোরে ফিরে যা হতভাগা, নইলে বিপদে পড়বি।”

 

“এটা কোথায় পেলেন?”

 

“সকালবেলায় জগিং করতে বেরিয়েছিলুম। ফিরে এসে একতলার লেটার বক্স খুলে পেয়েছি। পুলিশের যে কর্তাটি কাল ফোন করেছিলেন, রাত্তিরে তাঁকে বলেছিলুম যে, ব্যাঙ্গালোরে অনেক কাজ জমে আছে, তাই এখন কলকাতায় থেকে এ-ব্যাপারে কিছু করা হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু লেটার-বক্সে এই কাগজখানা পাবার পর তাঁকে জানিয়ে দিই যে, আপাতত কলকাতাতেই থাকছি। তাঁর সঙ্গে কথা হবার পরেই ফোন করি আপনাকে।”

 

“অর্থাৎ এই উড়ো-চিঠির জন্যেই ইনভেস্টিগেশানের দায়িত্বটা নিয়ে নিলেন?”

 

“বাঃ, আমাকে থ্রেন করছে, আর আমি ছেড়ে দেব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাকে আপনি কী ভাবেন বলুন তো?”

 

পার্ক স্ট্রিট আর থিয়েটার রোডের মোড় ছাড়িয়ে এসেছি। লোয়ার সার্কুলার রোড থেকে প্রথমে ডাইনে, তারপর বাঁয়ে টার্ন নিয়ে গাড়ি গিয়ে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে ঢুকল। ছুটির দিন, পথে ভিড় নেই, তাই কোথাও আটকে যেতে হচ্ছে না। বললুম, “আপনাকে কী ভাবি, তা আর আপনি না-ই শুনলেন। তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, সিদ্ধান্তটা রেগে গিয়ে নিলেন না তো? আমার যেন মনে হচ্ছে আপনি একটু রেগে গিয়েছেন।”

 

“আরে না মশাই, এটা রাগের ব্যাপার নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে ওই উড়ো-চিঠি যে-ই লিখে থাকুক, সে যে আমার ইগোতে একটা খোঁচা মেরেছে, সেটা ঠিক। তার ফল তাকে পেতে হবে না? …ও হ্যাঁ, চিঠিটা ভাল করে দেখেছেন?”

 

“কেন ভাল করে কিছু দেখবার আছে নাকি?”

 

“আছে বই কী। যে টাইপরাইটারে ওটা টাইপ করা হয়েছে, সেটা পুরনো মডেলের। টাইপের মেটাল খয়ে গেছে। ছোট-হাতের এ আর বড়-হাতের টি ভাঙা। রিবনে কালি কম। কাগজটা অবশ্য দামি। বন্ড পেপার।”

 

বললুম, “এ-সব খবর কাজে লাগবে?”

 

“লাগতেও পারে।”

 

সেন্ট লরেন্স স্কুলের কাছে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড পুবে বাঁক নিয়েছে। আমরা বাঁক না নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে রিচি রোড ধরেছি। ম্যাডক্স স্কোয়ার পেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলুম, “তা তো হল, কিন্তু আমরা এখন যাচ্ছি কোথায়?

 

“পাসপোর্টের মধ্যে প্রকাশ চৌহানের যে ঠিকানা দেওয়া আছে, সেই ঠিকানায়। দেখা যাক, সেখানে তাকে পাওয়া যায় কি না।”

 

আমার একটু ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল। বললুম, “আপনি কার কথা বলছেন? মোটর-অ্যাক্সিডেন্টে যে-লোকটা ইনজিওর্ড হয়েছে, তার কথা?… মানে নার্সিং হোমে খোঁজ করে যাকে পাওয়া যায়নি?”

 

হাজরা-মোড়ে পুলিশ হাত তোলায় আমরা একটুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছি। সেই অবসরে ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলেন। তারপর একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আপনার প্রশ্ন থেকে বুঝতে পারছি যে, পাসপোর্টটা সম্পর্কে কাল আমি যা বলেছিলুম, তা আপনার মনে নেই।”

 

“কী বলেছিলেন?”

 

“বলেছিলুম যে, পাসপোর্টটা জাল নয়, শুধু ছবিটাই জাল। ঠিক জালও নয়, এটা আসলে ডিসটর্শনের ব্যাপার। অর্থাৎ প্রকাশ চৌহানের ছবির উপরে কিঞ্চিৎ কারিকুরি করা হয়েছে, যাতে কিনা মূল ছবির মুখটা একটু বদলে যায়।”

 

“তার মানে…”

 

“তার মানে প্রকাশ চৌহান ইজ আ জেনুইন পাসপোর্ট-হোল্ডার। তাঁর কাছে গিয়ে এখন জানতে হবে যে, তাঁর পাসপোর্টটা কবে কীভাবে বেহাত হয়েছে, আর এই বেহাত হওয়ার ব্যাপারটা তিনি পুলিশে কিংবা রিজিওনাল পাসপোর্ট অফিসে জানিয়েছেন কি না।”

 

“প্রকাশ চৌহান থাকেন কোথায়?”

 

হাজরা রোড পার হয়ে উল্টো দিকের রাস্তায় ঢুকেছি। খানিক এগিয়ে দেশপ্রিয় পার্ক। পার্কটাকে বাঁয়ে রেখে, ল্যান্সডাউন রোডে পৌঁছে বাঁয়ে মোড় ফিরলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর রাসবিহারী অ্যাভিনিউ পার হয়ে বললেন, “সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে। পাসপোর্টে অন্তত সেটাই লেখা রয়েছে।”

 

সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের যে বাড়ির সামনে আমরা থামলুম, সেটা একটা হাইরাইজ বিল্ডিং। গাড়ি লক করে বাড়ির নম্বর দেখে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক।”

 

বললুম, “তা যাচ্ছি, কিন্তু যাঁর জন্যে আসা, তিনি এই বিশাল বাড়ির ক’তলায় কত নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন, তা বুঝব কী করে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এসব বাড়িতে লিফটের পাশেই সাধারণত সারি-সারি লেটার বক্স থাকে। পি. চৌহানের নাম লেখা লেটার বক্স দেখলেই সেটা বোঝা যাবে।”

 

যে বাক্সটার উপরে পি. চৌহানের নাম লেখা, তার নম্বর দেখলুম এইট-সি। লিফটে উঠে আট নম্বর বাটন টিপে ভাদুড়িমশাই বললেন, “মানেটা বুঝলেন তো? ভদ্রলোক এইট্‌থ ফ্লোরের সি-ফ্ল্যাটে থাকেন।”

 

সি-ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। ভিতরে ঢুকে দেখলুম, সচ্ছল গেরস্তের ফ্ল্যাটবাড়ি হলে যেটাকে বেশ প্রশস্ত একটা লিভিং কাম ডাইনিং রুম বলে ভাবা যেত, পুরু কার্পেটে মোড়া সেই ঘরটির একদিকে কিছু সোফা-সেট ও একটি গ্লাস-টপ সেন্টার টেবিল সাজানো, আর অন্যদিকে ছাইরঙা ট্রাউজার্স ও সাদা শার্ট পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে একটি মেয়েকে ইংরেজিতে কিছু-একটা ডিকটেশন দিচ্ছেন। মেয়েটির সামনে ছোট একটি টেবিল। টেবিলের উপরে একটা টাইপরাইটার। ফলে এটা রেসিডেন্সিয়াল ফ্ল্যাট না কারও আপিস, সেটা ঠিক বোঝা গেল না।

 

আমরা গিয়ে ঘরে ঢুকতে ডিকটেশনে ছেদ পড়েছিল। ভদ্রলোক আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আর ইউ কামিং ফ্রম মিস্টার রুংতা?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *