লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২১)

কৌশিক বলল, “পরের কথা আগে এসে যাচ্ছে। এ-রকম করলে সিকোয়েন্স ঠিক থাকবে না। সো লেট আস গো ব্যাক টু কাঁকুড়গাছি। প্রসাদ গুপ্তের গাড়ির টায়ারে গুলি চালিয়ে সেখানে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে দেওয়া হল। তারপর?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রুংতা নিশ্চয় কাছেপিঠেই ছিল। অ্যাক্সিডেন্ট ঘটবার পরে-পরেই সে বুঝতে পারল যে, দ্য কার ওয়াজ রাইট, বাট দ্য মান ওয়াজ রং। অর্থাৎ ঠিক-গাড়িকেই আটকে দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু যাকে আটকানো হয়েছে, সে প্রকাশ চৌহান নয়, সে অন্য লোক। এটাও তার চোখে পড়ে যে, যে-লোকটা গুলি চালিয়েছে, অ্যাম্বাসাডরের পিছন-দিকের ধাক্কা খাওয়ার ফলে চটপট সে পিস্তলসুদ্ধ হাতখানাকে ভেতরে টেনে নিতে পারেনি, পিস্তলটা তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেছে। বিমল বরাট যে একটার পর একটা ছবি তুলে যাচ্ছে, তাও সে দেখতে পায়।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “থামলেন কেন দাদা, বলে যান।”

 

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “রুংতা নিশ্চয়ই ঘাবড়ে গিয়েছিল।”

 

“কেন?”

 

“ঘাবড়ে যাবার কারণ, তার নিশ্চয় মনে হয় থাকবে, অ্যাম্বাসাডর-গাড়ির জখম ড্রাইভারটি হয়তো দেখে ফেলেছে যে, গুলিটা কে চালিয়েছে। পুলিশ-কেস হলে সেটা সে বলে দেবে। তৎক্ষণাৎ সে ঠিক করে যে, জখম ড্রাইভারটির হতভম্ব অবস্থা কেটে যাবার আগেই ঘটনাস্থলে থেকে তাকে সরিয়ে ফেলা দরকার। আমার ধারণা, যে বুড়ো লোকটি ওখান থেকে প্রসাদ গুপ্তকে তুলে নিয়ে যায়, সে রুংতারই লোক। কিংবা এমনও হতে পারে যে, রুংতা তখন ছদ্মবেশে ছিল। যা-ই হোক, প্রসাদ গুপ্তকে সেই রাত্রেই একেবারে চিরকালের মতো চুপ করিয়ে দেওয়া হয়।”

 

কৌশিক বলল, “তারপর?”

 

ভাদুড়িমশাই তাঁর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলে বললেন, “কিন্তু রুংতার সমস্যা তাতেও মিটল না। ক্রমাগত তার মনে হতে লাগল, দুর্ঘটনার যে-সব ছবি তোলা হয়েছে, তারই মধ্যে নিশ্চয় থেকে যাবে সেই দাগি লোকটির মুখ, যাকে দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল। ছবিগুলি যদি পুলিশের হাতে পড়ে, তা হলে পুলিশ তো তাকে প্রথমেই ধরবে। জেরার মুখে সে কি তখন সব ফাঁস করে দেবে না? এই ভাবনাটা দেখা দেওয়ামাত্র সে দুটো কাজ করে। এক, লোক লাগিয়ে বিমল বরাটের বাড়ির হদিশ জেনে নিয়ে তার কাছ থেকে নেগেটিভসুদ্ধ ছবিগুলি কিনে নেবার চেষ্টা করতে থাকে, আর দুই, ট্যাংরার বস্তিতে একজন পেশাদার খুনি পাঠিয়ে মারুতি গাড়ির ড্রাইভারটিকে খতম করে দেয়।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর মিস রবিনসনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইউ হ্যাভ বিন মোস্ট হেল্পফুল, ফর হুইচ আই মাস্ট থ্যাংক ইউ। দু’-একটা জায়গায় একটু ফাঁক থেকে যাচ্ছিল, সেগুলো আপনি ভরাট করে দিয়েছেন বলেই অন্তত এই পর্যন্ত পুরো ছবিটা আমি ভিশুয়ালাইজ করতে পারছি।”

 

মিস রবিনসন বললেন, “আপনি তো ধন্যবাদ দিচ্ছেন, কিন্তু পুলিশ তো আমাকে রেহাই দেবে না।”

 

“না-দেবার তো কোনও কারণ নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুলিশ যে-ভাবে কেস সাজাবে, তাতে অন্যায়ের তালিকাটা অবশ্য খুব ছোট হবে না। সেটাই স্বাভাবিক, কেন না মার্ডার থেকে শুরু করে ইকনমিক অফেন্স, সবই তো তার মধ্যে থাকবে। তবে, অন্যায় যা ঘটেছে, তার একটাও তো আপনি ঘটাননি। হ্যাঁ, দু’-একটা ভুল অবশ্য আপনিও করেছেন, তবে সেও ইচ্ছাকৃত নয়, আনউইটিংলি করেছেন। আমার তো মনে হয়, অ্যাজ ফার অ্যাজ ইউ আর কনসার্নড, দ্য কোর্ট উইল টেক আ লিনিয়েন্ট ভিউ।”

 

কৌশিক বলল, “ছবিটা কিন্তু পুরো হয়নি, মামাবাবু।”

 

“জানি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বুড়ো লোকটি যে ফিয়াট গাড়িতে করে প্রসাদ গুপ্তকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, আর যে মারুতি গাড়ি থেকে গুলি চালিয়ে অ্যাম্বাসাডরের টায়ার ফাটানো হয়েছিল, তার কোনওটারই তো খোঁজ পাওয়া গেল না। গাড়ি দুটোর মালিকের নাম জানলে একেবারে আঙুল তুলে বলা যেত যে, অপরাধী কে।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “খোঁজ পাওয়া শক্ত হবে। দুটোরই তো নাম্বার-প্লেট ফল্স। অবশ্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাতে কোনও ত্রুটি হবে না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “একটা কথা বলব?”

 

কৌশিক বলল, “একটু পরে বলবেন। তার আগে মামাবাবুকে আমার কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্যাখ্ কৌশিক, সদানন্দবাবু এই নিয়ে তা অন্তত বার-তিনেক জিজ্ঞেস করলেন যে, একটা কথা উনি বলতে পারেন কি না। তা প্রতিবারই তোরা ওঁকে থাবড়া মেরে থামিয়ে দিচ্ছিস। কিন্তু না, আর ওঁকে থামিয়ে দেওয়া চলবে না। তোর কথা পরে শোনা যাবে, আগে বরং ওঁর কথাটাই শুনি। …নিন সদানন্দবাবু, কী বলবেন বলুন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “দেখুন মশাই, ফিয়াটের ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না, তবে কিনা মারুতির ব্যাপারে আপনার কাছে যা শুনিচি, তাতে আমার একটা কথা জানবার আছে।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বেশ তো, কী জানতে চান বলে ফেলুন।”

 

“আপনি বলেছিলেন, অ্যাক্সিডেন্টের সময় অ্যাম্বাসাডর গাড়ির পিছন দিকটা এসে মারুতির ড্রাইভারের হাতে অ্যায়সা ধাক্কা লাগিয়েছিল যে, তারই জন্যে তার হাত থেকে পিস্তলটা ছিটকে পড়ে যায়। বলেননি?”

 

“হ্যাঁ, তা তো বলেইছিলুম। এও বলেছিলুম যে, ওই ধাক্কাটা লাগার ফলে তার ডান হাতটা জখম হয়ে থাকতে পারে। তা পরে তো দেখা গেল যে, আমি ভুল বলিনি। ড্রাইভারকে যখন খুঁজে পাওয়া গেল, তখন সত্যিই তো দেখা গেল যে, তার ডান হাতটা কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত ব্যান্ডেজ বাঁধা।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “পোস্ট-মর্টেমে ধরা পড়ে যে, ড্রাইভারের ওই হাতটা থেঁতলে গেছে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “যাবে না? ধাক্কা মানে রামধাক্কা! পাত তো থেঁতলে যেতেই পারে।”

 

কৌশিক বলল, “বাস্, এতক্ষণ ধরে এই কথাটাই আপনি বলতে চেয়েছিলেন তো?”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ দুটো দেখলুম অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কৌশিককে একটা মৃদু ধমক দিয়ে তিনি বললেন, “থাম্ কৌশিক। আমার ধারণা, সদানন্দবাবুর কথা এখনও শেষ হয়নি। ওঁর নিশ্চয়ই আরও দু’-একটা কথা বলবার আছে।”

 

সদানন্দবাবু খুবই কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “না না, তেমন কিছু জরুরি কতা নয়। … মানে ভাবছিলুম যে, যে-রকমের ধাক্কায় ড্রাইভারের হাত থেঁতলে যেতে পারে, তাতে গাড়িটারও কি চোট লাগতে পারে না? …এই ধরুন গাড়িটার ডানদিকের রং চটে যেতে পারে কি ওই দিকের বডিও তুবড়ে যেতে পারে। …কী, আমি ভুল বললুম?”

 

“কিচ্ছু ভুল বলেননি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শোভন, নম্বরের দরকার নেই, যত তাড়াতাড়ি পারো গ্যারাজগুলোতে খোঁজ নাও যে, ডানদিকে রংচটা কি তুবড়ে যাওয়া কোনও মারুতি গাড়ি গত শনিবার কেউ সারাতে দিয়েছে কি না।”

 

শোভন চৌধুরি ফোন করবার জন্যে সোফা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, সদানন্দবাবু তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “না না, উঠবার দরকার নেই, অমন একটা মারুতি গাড়ি আমাদের কাছেই রয়েছে। নীল রঙের মারুতি। আগে সেইটে দেখলেই তো হয়।”

 

“কোথায় রয়েছে?” প্রশ্নটা কৌশিকের

 

“তোমাদের এই আটতলা বাড়ির একতলার গ্যারাজে।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “আমাদের একতলায় যদি দেখে থাকেন, তা হলে আমিই বলে দিচ্ছি নীল রঙের গাড়িটা কার।”

 

“কার?”

 

“ডঃ মিরচন্দানির।”

 

কৌশিক বলল, “রাইট। ডঃ মিরচন্দানিকে এই জন্যেই ইদানীং মারুতিটা নিয়ে বেরুতে দেখছি না। একতলায় ওঁর দুটো গ্যারাজ। একটায় ওই নীল মারুতি থাকে, অন্যটায় একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর। সেটা ওঁর স্ত্রীর গাড়ি। অথচ গত চার-পাঁচদিন হল স্ত্রীর গাড়িতে করে ভদ্রলোক চেম্বারে যাচ্ছেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহে শোভন, এই জন্যই আমাদের সদানন্দবাবুকে ছাড়া চলে না। উনি মনে হচ্ছে তোমার খাটুনি অনেক কমিয়ে দিলেন। এখন দ্যাখো, ডঃ মিরচন্দানিকে জেরা করে কিছু পাও কি না। উনি অবশ্য বলবেন যে, ওঁর গাড়ি চুরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ও-কথা বিশ্বাস কোরো না। আমার মনে হয়, এ-ব্যাপারে এই ডাক্তারবাবুটিও জড়িত। রুংতার সঙ্গে ওঁর কোনও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে কি না, সেটা খুঁজে বার করবার চেষ্টা করো। মোট কথা, তমা দেখে ঘাবড়ে যেয়ো না। …নাও, এবারে বেরিয়ে পড়ো। চিফের সঙ্গে কথা বলে আর জেরার পর্ব চুকিয়ে ফেলে কেসটা চটপট তৈরি করে ফ্যালো। ছবিটা তো পেয়ে গেছ, এবারে কাজের কাজ শুরু করে দাও।”

 

কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে শোভন চৌধুরি বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে ভাদুড়িমশাই তাকে ডেকে বললেন, “ও হ্যাঁ, একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি। টাইপের কাজ তুমি কাকে দিয়ে করাও হে?”

 

“আপিসের কাজকর্ম আপিসেই টাইপ করাই। অবশ্য আমার নিজেরও নানা কাজকর্ম থাকে। তা হঠাৎ এ-কথা উঠছে কেন?”

 

প্রশ্নটার জবাব না দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিজের কাজকর্ম কোথা থেকে টাইপ করাও?”

 

“পাড়ার একটি ছেলে সেগুলো টাইপ করে দেয়।”

 

“দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেস কোম্পানির যে ঠিকানাটা গত বুধবার আমাকে দিয়েছিলে, সেটা টাইপ করে দিয়েছিল কে?”

 

“যদ্দুর মনে পড়ছে, আর-পাঁচটা কাজের সঙ্গে ওই ঠিকানাটাও সে-ই টাইপ করে দিয়েছিল। কেন, ঠিকানাটায় ভুল ছিল কোনও?”

 

ভাদুড়িমশাই এবারেও শোভন চৌধুরির প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না। বললেন, “সে-ই যদি টাইপ করে থাকে, তো তার উপরে একটু নজর রেখো।”

 

“কেন?”

 

“তার টাইপরাইটারের ছোট-হাতের ‘এ’ আর বড়-হাতের ‘টি’ ভাঙা।

 

“তাতে কী হল?”

 

“তাও বুঝতে পারছ না?” ভাদুড়িমশাই হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “মেমারি বাড়ে, এমন কোনও ওষুধ খাও শোভন। যে টাইপ-করা উড়ো চিঠি পাঠিয়ে আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল, তাতেও যে ছোট-হাতের ‘এ’ আর বড়হাতের ‘টি’ ভাঙা ছিল, তা দেখছি তোমার মনেই নেই।”

 

শোভন চৌধুরি একেবারে হতবাক হয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর, একটিও কথা না-বলে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

 

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর মিস রবিনসন বললেন, “মিঃ চৌধুরির কথা থেকে মনে হল, আমাদের আপিসে বোধহয় তালা ঝুলবে। আমি তা হলে কী করব?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেক্রেটারিয়েল কোর্স যখন শেষ করেছেন, তখন আপনার চাকরির অভাব হবে না। এক দরজা বন্ধ তো হাজার দরজা খোলা। অন্য কোথাও চাকরি ঠিকই পেয়ে যাবেন।”

 

“কিন্তু বাঘে ছুঁলে তো আঠারো ঘা!”

 

“পুলিশের কথা বলছেন, তো? ও নিয়ে চিন্তা করবেন না। শোভনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, ওকে বলে দিয়েছি নাহক যেন আপনাকে হ্যারাস করা না হয়। আর তা ছাড়া, আপনার তো কোনও দোষও নেই, সুতরাং খুব একটা আপনাকে জড়াবে বলে মনেও হয় না। ওই দু’-এক দিন হয়তো আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে হতে পারে। তাতে ভয়ের কিছু নেই। যা জানেন, অকপটে বলবেন।”

 

“ধন্যবাদ।” মিস রবিনসন বললেন, “তা হলে আমি এখন যেতে পারি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চা খেয়ে যান। যাওয়া নিয়ে ভাববার কিছু নেই। চা খেয়ে কিরণবাবু ও সম্ভবত উঠবেন। উনিই ওঁর গাড়িতে করে আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসবেন অখন।”

 

আমাকে আর কিছু বলতে হল না। আমার হয়ে দানন্দবাবুই বললেন, “উইথ প্লেজার, ম্যাডাম।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *