(২০)
শোভন চৌধুরি বললেন, “যাচ্চলে, যেমন ন্যাটো কি ইউনেস্কো কি ইউনিসেফ, তেমনি পিসিও যে একটা অ্যাক্রোনিম হতে পারে, এটা তো স্ট্রাইকই করেনি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “অ্যাক্রোনিমটা আবার কী ব্যাপার?”
কৌশিক বলল, “নামের আদ্যক্ষর দিয়ে বানানো শব্দ।”
“ওরে বাবা, এ তো ভয়ঙ্কর কাণ্ড দেখচি।”
“নতুন কিছু দেখছেন না।” আমি বললুম, “পিজি যে প্রসাদ গুপ্তের অ্যাক্রোনিম, সেটা তো আপনিই বলেছিলেন। তবে ডিয়ার কে, সেটা ধরতে পারেননি। ওটা অ্যাক্রোনিম মিস ডরোথি রবিনসনের।”
“তাই নাকি ম্যাডাম?”
মিস রবিনসন চুপ করে বসে ছিলেন। সদানন্দবাবুর প্রশ্নের তিনি কোনও জবাব দিলেন না।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সময় নষ্ট করে লাভ নেই, আসল কথায় আসা যাক। প্রসাদ গুপ্তকে কে বিদেশে পাঠাচ্ছিলেন আর কেন পাঠাচ্ছিলেন, সেটা বোঝা গেল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁকে যেতে না-দিয়ে এই যে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে আটকে দেওয়া হল, শুধু তা-ই নয়, নার্সিংহোমে পৌঁছে দেবার নাম করে মেরে ফেলা হল তাঁকে, এটা করল কারা?”
কৌশিক বলল, “যারাই করে থাকুক, এটা আমরা ধরে নিতে পারি যে, প্রসাদ গুপ্ত যে কেন বিদেশে যাচ্ছিলেন, তারা তা জানত।”
“রাইট। কিন্তু সেটা জানা সম্ভব একমাত্র তাদেরই পক্ষে, যারা প্রসাদ গুপ্ত কিংবা প্রকাশ চৌহানের খুবই কাছের লোক। কলকাতা শহরে প্রসাদ গুপ্ত খুব বেশিদিন আসেননি, ফলে এখানে তাঁর কাছের লোক বলতে এমন কেউ ছিল বলে আমার মনে হয় না, যার কাছে তাঁর বিদেশ যাত্রার উদ্দেশ্যটা তিনি বিশ্বাস করে বলতে পারেন। এক এই মিস রবিনসন ছাড়া। কিন্তু মিস রবিনসন বলছেন, সুইস ব্যাঙ্কে টাকা পাচার করার ব্যাপারটা তিনি জানতেন না। যদি ধরে নিই যে, তিনি সত্যিকথা বলছেন, তা হলে সিদ্ধান্ত করতে হয় যে, যারা জানত, তারা প্রকাশ চৌহানের কাছের লোক।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর তাঁর আগের কথার জের টেনে বললেন, “কাছের লোক, কিন্তু বন্ধু নয়। সম্ভবত কাছের লোক বলেই তারা আঁচ পেয়ে গিয়েছিল যে, বিদেশে রফতানির বাবদে যে-টাকা কোম্পানির প্রাপ্য হওয়া উচিত, তার একটা মোটা অংশ মিঃ চৌহান বিদেশেই নিজের নামে সরিয়ে রাখছেন। সম্ভবত এটাও তারা বুঝতে পেরেছিল যে, সেই টাকা খুব শিগগির সুইস ব্যাঙ্কে মিঃ চৌহানের লকারে গিয়ে ঢুকবে।”
কৌশিক বলল, “কিন্তু মামাবাবু, লন্ডন থেকে পাউন্ড কি ডলার নিয়ে সুইস ব্যাঙ্কের লকারে ঢোকাবার কাজটা যে মিঃ চৌহান নিজে না-করে প্রসাদ গুপ্তকে দিয়ে করাবেন, তাও কি তারা জানত নাকি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার মনে হয়, জানত না। কেন মনে হয় জানিস? দিল্লি টু লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের টিকিট যে প্রকাশ চৌহানের নামে কাটা হয়েছে, তা তাদের না-জানবার কথা নয়। ফলে, তারা ধরেই নিয়েছিল যে, প্রকাশ চৌহানই বিদেশে যাচ্ছেন। আসলে, প্রকাশ চৌহানের বিদেশ-যাত্রাই তারা পণ্ড করতে চেয়েছিল।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছেন, কোম্পানির পাওনা টাকা হাতিয়ে নিয়ে সুইস ব্যাঙ্কে রাখার আঁচও যখন পেয়েছিল, তখন তারা মিঃ চৌহানের কাছের লোক না-হয়ে যায় না।”
“কাছের লোক মানে ভিতরের লোক। এমন লোক, কোম্পানির হিসেবপত্তরের খাতা যে কিনা রাইটফুলি পরীক্ষা করে দেখতে পারে। বিদেশি কোন ফার্মের কাছ থেকে কোম্পানির কত পাওনা, তা যার অজানা নয়। তা, দিনের পর দিন লন্ডনের একটা ফার্ম কম-কম পেমেন্ট করছে, অথচ প্রকাশ চৌহানের তরফে তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই, এটা দেখলে তার সন্দেহ হবে না? সে তখনই বুঝে নেয় যে, যে-পরিমাণ টাকা কম আসছে, লন্ডনেই সেটা সরিয়ে রাখা হচ্ছে প্রকাশ চৌহানের নামে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সে খেপে যায়। কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ না-করে বদলা নেবার সুযোগ খুঁজতে থাকে। প্রকাশ চৌহানের নামে লন্ডনের এয়ার-টিকিট কেনা হয়েছে, এই খবর পাবার পরে সে আর দেরি করে না। সে ধরে নেয় যে, ফার্মের হয়ে কোনও এগ্রিমেন্ট করাটা একটা ছুতো, চৌহান আসলে লন্ডনে যাচ্ছে ওই টাকাটা নেবার জন্যে। বাস্, তক্ষুনি সে ঠিক করে যে, যাত্রাটা পণ্ড করতে হবে। কীভাবে পণ্ড করা হল, তা আমরা জানি।”
বললুম, “দুটো ব্যাপারে আমার একটু খটকা রয়েছে। প্রথমত, দিল্লির ফ্লাইট ছিল বিকেলে। গাড়িটা তা হলে সকালবেলায় ও-পথ দিয়ে যাচ্ছিল কেন? তা ছাড়া, যে-গাড়ির টায়ার ফাটানো হল, সেটার মালিক যে মিঃ রুংতা, তাও আমরা জেনেছি। সুতরাং দ্বিতীয় প্রশ্ন, দমদম এয়ারপোর্টে যাবার জন্য চৌহানের গাড়ি না-নিয়ে রুংতার গাড়ি নেওয়া হল কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ দুটো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে মিস রবিনসন আমাদের সাহায্য করতে পারেন। অন্তত প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা নিশ্চয় জানেন তিনি। তবে জানলেই যে তিনি জানাবেন, তা বলতে পারি না।”
মিস রবিনসন বললেন, “একে তো প্রসাদ বেঁচে নেই, তার উপরে যা বুঝতে পারছি, জেনেশুনে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। তা হলে আর আমার বাধা কোথায়, সবই আমি বলব। হ্যাঁ, দুটো প্রশ্নেরই উত্তর আমি জানি।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ ফর কামিং ক্লিন। আর তা ছাড়া সব কথা খুলে বললে আপনি নিজেও অনেক ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন।”
মিস রবিনসন তিক্ত হেসে বললেন, “বেঁচে যাব! নাউ দ্যাট প্রসাদ ইজ ডেড, ডু আই রিয়েলি কেয়ার? আমাকে ও-সব কথা বলবেন না, বলবার কোনও দরকারই নেই। তার চেয়ে যা জানতে চান, তা শুনে রাখুন। টিকিট আর পাসপোর্ট শুক্রবার দুপুরেই প্রসাদ পেয়ে গিয়েছিল। গাড়ি ছিল আপিসের গ্যারাজে। শুক্রবার রাত্তিরটা সে আমার ফ্ল্যাটে কাটায়। তারপর শনিবার সকালে তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট খেয়ে গাড়িটা আনতে আপিসে চলে যায়। তখন আমি তার সঙ্গে ছিলুম। আপিসের গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করে প্রথমে সে আমাকে আমার ফ্ল্যাটে নামিয়ে দেয়। তারপর গাড়ি নিয়ে রওনা হয় যায় এয়ারপোর্টের দিকে।”
কৌশিক বলল, “সকাল তখন কটা?”
“আটটা থেকে সওয়া আটটা। তার বেশি নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু অত সকালে তিনি এয়ারপোর্টে রওনা হলেন কেন? দিল্লির টিকিট তো বিকেলের ফ্লাইটের।”
“আই ওয়াজ কামিং টু দ্যাট। কথাটা যে প্রসাদকে আমি জিজ্ঞেস করিনি, তা ভাববেন না। তাতে সে বলে যে, এয়ারপোর্ট হোটেলে মিঃ চৌহান একটা ঘর নিয়ে রেখেছেন, দশটার মধ্যে প্রসাদকে সেখানে পৌঁছে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে। লন্ডনে গিয়ে কী করতে হবে না হবে, তাই নিয়ে নাকি মিঃ চৌহান ওঁকে জরুরি কয়েকটা কথা বলতে চান। তা প্রসাদ বলল যে, মিঃ চৌহানের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে দুপুরের খাওয়া সে এয়ারপোর্ট হোটেলেই খেয়ে নেবে। তারপর ঘণ্টা দেড়েক ওখানেই বিশ্রাম নিয়ে সাড়ে তিনটে নাগাদ ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে রিপোর্ট করবে।”
“প্রসাদ গুপ্ত কি আপনার ওখান থেকে রওনা হবার সময় একেবারে রেডি হয়েই বেরিয়েছিলেন? মানে যে স্যুটকেস নিয়ে তাঁর লন্ডনে যাবার কথা, সেটা কি তখন তাঁর সঙ্গেই ছিল? কথাটা এইজন্যে জিজ্ঞেস করছি যে, অ্যাক্সিডেন্ট হবার পর তাঁর গাড়ি থেকে শুধু দুটো এয়ার-টিকিট আর ওই পাসপোর্টটাই পাওয়া গেছে, কোনও স্যুটকেস পাওয়া যায়নি। হ্যান্ডব্যাগও না।”
“পাওয়া যাবার কথাও নয়।” মিস রবিনসন বললেন, “প্রসাদ তো লেক-টাউনে একটা ওয়ান-রুম ফ্ল্যাট নিয়ে একা থাকত। তা সে ঠিক করেছিল যে, এয়ারপোর্টে যাবার পথে লেক-টাউনের ফ্ল্যাট থেকে স্যুটকেসটা সে তুলে নেবে। আগের দিন অর্থাৎ শুক্রবারই সে সবকিছু গুছিয়ে রেখে তারপর আমার ওখানে চলে গিয়েছিল।”
“লেক-টাউনের ঠিকানাটা আপনার কাছে পাওয়া যাবে?”
“আপনার দরকার?”
“খুবই দরকার।”
ব্যাগ থেকে একটা পেন্সিল বার করে কৌশিকের কাছ থেকে এক-টুকরো কাগজ চেয়ে নিয়ে তাতে ঠিকানা লিখে কাগজটা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন মিস রবিনসন। ভাদুড়িমশাই সেটা শোভন চৌধুরির হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “ফ্ল্যাটটা সিজ করবার ব্যবস্থা করো, স্যুটকেসে কী আছে, সেটা জানা দরকার। কাজটা আরও আগেই করা উচিত ছিল। আশা করি, দেরি হয়ে যায়নি।”
মিস রবিনসন বললেন, “আর-কিছু জানতে চান?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর এখনও পাইনি। মিঃ রুংতা যে-গাড়ির মালিক, প্রসাদ গুপ্ত সেই গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে যাচ্ছিলেন কেন?”
“গাড়িটা মিঃ রুংতার হলেও আমাদের আপিসের কাজে ওটা ভাড়া খাটে। তার জন্যে মিঃ রুংতা মাসে-মাসে পাঁচ হাজার টাকা পান।”
“দ্যাট এক্সপ্লেনস ইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুরো ছবিটা এবারে পাওয়া যাচ্ছে। … হ্যাঁরে কৌশিক, আমি কোন্ পর্যন্ত এসেছিলুম?”
কৌশিক বলল, “কোম্পানির পাওনা টাকা মিঃ চৌহান বিদেশে নিজের নামে সরিয়েছেন আর লন্ডন থেকে সেই টাকা সুইস ব্যাঙ্কে পাচার করবার জন্যে বিদেশ যাত্রার ব্যবস্থা হয়েছে; মিঃ চৌহানের কাছের কোনও মানুষ সেটা টের পেয়ে যায়। কিন্তু কাছের মানুষ হয়েও সে যেহেতু মিঃ চৌহানের শত্রুপক্ষ, তাই সে ভণ্ডুল করতে চায় এই বিদেশ-যাত্রার প্ল্যান।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ছবিটা যখন পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছি, তখন আর ধোঁয়াটে কথা বলে লাভ নেই। স্ট্রেট বলা ভাল যে, এই শত্রুপক্ষটি হচ্ছেন মিঃ মানিকচাঁদ রুংতা, যিনি কিনা মিঃ চৌহানেরই ব্যাবসার অংশীদার।”
মিস রবিনসন বললেন, “মিঃ রুংতা! বলেন কী! এ তো ভাবাই যায় না।”
বিমল বরাট বলল, “এই লোকটাই কাল রাত্তিরে আমার বাড়ির মধ্যে একটা গুণ্ডা ঢুকিয়ে দিয়েছিল?”
সদানন্দবাবু বললেন, “এ তো দেখচি ডেঞ্জারাস লোক! কে জানে, উড়ো চিঠি লিখে এই লোকটাই আমাদের ভয় দেখাচ্চে কি না!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এরা নিজেরা কি আর ভয় দেখায়? যা-কিছু করবার, ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে করায়। ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে শুধু যে ভয় দেখায়, তা নয়, খুনও করায়। যেমন কিনা প্রসাদ গুপ্তকে করিয়েছে। কিন্তু সেটাও তো পরের ঘটনা, তার আগে তাকে টায়ার ফাটিয়ে গাড়ি থামাবার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।”
কৌশিক বলল, “তা তো হল, কিন্তু গাড়িটা যে ওই সময়ে ওইখান দিয়ে যাবে, তা তারা জানল কী করে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি সেটা আঁচ করেছি। …মিস রবিনসন, আপিসের কাজের জন্যে মিঃ রুংতার কাছ থেকে এই যে গাড়িটা আপনারা ভাড়া নিয়েছিলেন, এটা তো ড্রাইভারসুদ্ধুই নিয়েছিলেন, তাই না?”
“হ্যাঁ।” মিস রবিনসন বললেন, “পেট্রোল আমরা কিনে দিই, কিন্তু ড্রাইভার প্রোভাইড করতে হয় গাড়ির মালিককে। তার মাইনেও তিনিই দিয়ে দেন। ভাড়াগাড়ির এটাই নিয়ম।”
“গাড়ি তো আপিসের গ্যারাজে থাকত। আর ড্রাইভার? সে থাকত কোথায়?
“সেও ওই গ্যারাজে রাত কাটাত।”
“শনিবার সকালে আপনারা যখন আপিসের গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করেন, সে তখন সেখানে ছিল?”
“হ্যাঁ। কিন্তু গাড়ি চালাবার জন্যে তার দরকার হয়নি। প্রসাদ ঠিক করেছিল, সে নিজেই ড্রাইভ করে এয়ারপোর্টে যাবে, আর মিঃ চৌহান সেখান থেকে গাড়িটা নিয়ে ফিরে আসবেন।”
“বুঝতে পেরেছি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে গাড়িটা যে এয়ারপোর্টে যাবে, এই কথাটা ড্রাইভারের সামনেই তখন আপনারা হয়তো বলে থাকবেন। কোন্ পথে যাবে, তাও হয়তো বলেছিলেন!”
“হ্যাঁ, তা তো বলেইছিলুম। গাড়ির পেট্রোল-ইন্ডিকেটরটা ঠিকমতো কাজ করছিল না। তাই ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, মানিকতলা, সি. আই. টি. রোড ধরে এয়ারপোর্টে গিয়ে আবার ফিরে আসবার মতো তেল গাড়িতে আছে কি না।”
“বাস, ড্রাইভার তো রুংতারই লোক। আপনারা ওখান থেকে বেরিয়ে আসবার সঙ্গে-সঙ্গেই সে নিশ্চয় ফোন করে রুংতাকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, গাড়িটা এয়ারপোর্টে যাচ্ছে। রুংতাও সেই খবর পেয়ে মাঝপথে গাড়ি থামাবার ব্যবস্থা করে। কিন্তু ওই গাড়িতে যে প্রসাদ গুপ্ত থাকবে, তা সে ভাবতে পারেনি।”
ব্যাপারটা আস্তে-আস্তে আমার কাছেও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। বললুম, “রুংতা ভেবেছিল প্রকাশ চৌহান থাকবে।”
“সেটা ভাবাই তো স্বাভাবিক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রুংতা জানত যে, প্লেনের টিকিট কাটা হয়েছে চৌহানের নামে। সবই তো এক্সপেন্স অ্যাকাউন্ট অর্থাৎ কিনা কোম্পানির খাতায় খরচ দেখাবার ব্যাপার, তাই কোম্পানির খাতাপত্তর পরীক্ষা করেই রুংতা এই টিকিট কেনার ব্যাপারটা জানতে পারে। ফলে সে ধরে নেয় যে, চৌহানই লন্ডনে যাচ্ছে। চৌহান যে বে-আইনিভাবে তারই টিকিটে অন্য লোককে লন্ডনে পাঠাচ্ছে, তা সে জানত না।”
“কিন্তু নিজের টিকিটে আর কাউকে বিদেশে পাঠাবার মস্ত একটা অসুবিধেও তো রয়েছে। মানে আর কাউকে বিদেশে পাঠালেও খাতায়-পত্রে তো এটাই রেজিস্টার্ড হত যে, সে নিজেই বিদেশে গেছে। বাট হি কান্ট গো অ্যাব্রড অ্যান্ড অলসো স্টে ইন ক্যালকাটা অ্যাট ওয়ান অ্যান্ড দ্য সেম টাইম।”
“চৌহান কি আর সেটা ভেবে দেখেনি?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে নিশ্চয় ঠিক করে রেখেছিল যে, প্রসাদ গুপ্ত যতদিন না কাজ হাসিল করে বিদেশ থেকে ফিরে আসছেন, তদ্দিন সে গা ঢাকা দিয়ে থাকবে। …মিস রবিনসন, চৌহান এ-ব্যাপারে আপনাকে কী ইন্সট্রাকশন দিয়েছিল, বলুন তো?”
মিস রবিনসন অস্ফুট গলায় বললেন, “শুক্রবার তিনি বলেছিলেন যে, শনিবার থেকে কয়েকটা দিন তিনি আপিসে আসবেন না। ইতিমধ্যে কেউ যদি আপিসে এসে কিংবা ফোন করে তাঁর খবর জানতে চায়, তা হলে আমি যেন তাকে বলে দিই যে…।”
“তিনি লন্ডনে গেছেন, কেমন?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু শনিবার সকাল দশটায় এয়ারপোর্ট হোটেলে গিয়ে প্রসাদ গুপ্ত তার সঙ্গে দেখা করেন না। দশটার পরেও নিশ্চয় বেশ কিছুক্ষণ সে প্রসাদ গুপ্তের জন্য অপেক্ষা করেছিল। তাতেও যখন প্ৰসাদ গুপ্তের দেখা মেলে না, তখন সে ধরে নেয় যে, কিছু একটা বিভ্রাট ঘটেছে। এয়ারপোর্ট হোটেল থেকে সে তখন বেরিয়ে পড়ে। কাঁকুড়গাছির মোড়ে এসে উলটো দিকের ফুটপাথে অ্যাম্বাসাডর গাড়িটাকে দেখতে পায়। দেখবামাত্র বুঝতে পারে, অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, ছোটখাটো অ্যাক্সিডেন্ট নয়, ড্রাইভার মারাত্মক জখম, তার কপাল ফেটে গেছে। ড্রাইভারের বর্ণনা শুনে সে বুঝতে পারে যে, তিনি প্রসাদ শুপ্ত। তা হলে? প্রসাদ গুপ্তের পক্ষে তা হলে আর সেইদিনই বিদেশযাত্রা সম্ভব হচ্ছে না। চৌহানের প্ল্যান বিলকুল ভেস্তে যায়।”
কৌশিক বলল, “তারপর?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সবটাই তো আমি অনুমানের উপরে নির্ভর করে বলছি। এ-ক্ষেত্রেও আমাকে অনুমানই করতে হবে। আমার অনুমান, অ্যাক্সিডেন্টের জায়গায় খোঁজ করতে গিয়ে সে নিশ্চয়ই জেনেছিল যে, ইনজিয়োর্ড ড্রাইভারকে এক বুড়ো ভদ্রলোক কাছাকাছি কোনও নার্সিংহোমে পৌঁছে দিতে গিয়েছেন। কাছাকাছি সব কটা নার্সিংহোমেই সে তাই খোঁজ করে। কিন্তু সব নার্সিংহোমেই তাকে এক কথা শুনতে হয় : না, অমন কোনও পেশেন্টকে কেউ তাদের ওখানে নিয়ে যায়নি। কলকাতার হাসপাতালগুলো থেকেও একই উত্তর শুনতে হয়। সন্ধের দিকে এয়ারপোর্টেও কি আর খোঁজ নেয়নি সে? তাও নিয়েছিল নিশ্চয়। কিন্তু সেখানেও ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয় যে, না, সন্ধের ফ্লাইটে ওই নামের একজন প্যাসেঞ্জারের একটা বুকিং ছিল বটে, কিন্তু তিনি ওই ফ্লাইটে দিল্লি যাননি। প্রকাশ চৌহান ঘাবড়ে যায়। তার কারণ, একে তো প্রসাদ গুপ্তের কাছে তার টিকিট আর পাসপোর্ট রয়েছে, তার উপরে আবার প্রসাদের জুতোর সোলের মধ্যে রয়েছে তার সুইস ব্যাঙ্কের লকারের চাবি। পাসপোর্ট যদি পুলিশের হাতে পড়ে, তা হলে? তার ভিতরের ঠিকানা দেখে পুলিশ নিশ্চয় তার আপিসে এসে হাজির হবে। পুলিশকে সে কী বলবে তখন? একটাই কথা বলতে পারে। বলবে যে, তার পাসপোর্ট চুরি হয়ে গিয়েছে।”
বললুম, “রবিবার যখন তার আপিসে যাই, তখন ঠিক ওই কথাটাই সে বলেছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে আমরা যে রবিবারেই গিয়ে হাজির হব, তা বোধহয় সে ভাবেনি। আসলে তার মতলব ছিল গা-ঢাকা দেওয়ার। তার আগে আপিসেরই কয়েকটা কাজ চটপট চুকিয়ে নেওয়া দরকার, তা নইলে আর রবিবারে সে আপিস খুলবে কেন? ও-দিন তো সাধারণত সব আপিসই বন্ধ থাকে।”
মিস রবিনসন বললেন, “আমাদেরর আপিসে রবিবার কোনও কাজ হয় না। তবে আগের রাত্তিরে মিঃ চৌহান আমাকে ফোন করে বলেছিলেন যে, পরের দিন অর্থাৎ রবিবার সকাল আটটার মধ্যেই আমি যেন আপিসে চলে যাই, কয়েকটা চিঠি টাইপ করতে হবে।”
“অ্যাক্সিডেন্টের খবরটাও বোধহয় চৌহানের কাছে তখনই পান আপনি?”
“হ্যাঁ, তখনই পাই। মিঃ চৌহান এটাও আমাকে তখনই বলেন যে, সোমবার থেকে বেশ কিছুদিন তিনি আপিসে আসবেন না।”
“আসেনওনি, কেমন?”
“না। আমি অবশ্য কাল পর্যন্ত নিয়মিত আপিস করেছি। ফোনে কেউ-কেউ মিঃ চৌহানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিঃ চৌহানেরই নির্দেশমতো তাঁদের বলে দিয়েছি যে, হি ইজ ইন লন্ডন।”
“অর্থাৎ তিনি গা-ঢাকা দিলেন। …ওহে শোভন, মিঃ চৌহানকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে বলছিলে না?”
“সে তো যখন খাচ্ছিলুম, তখনই ফোনে সেই খবর এল।”
“কোথায় অ্যারেস্ট করা হল, সেটা বলেছে?”
“বলেছে। আজ সকালেই মিঃ চৌহানের আপিস রেড করা হয়। সেখানে কাগজপত্তর ঘেঁটে জানা যায় যে, রোল্যান্ড রোডেও মিঃ চৌহানের একটা ফ্ল্যাট রয়েছে। তিনি নিজে অবশ্য সেখানে থাকেন না। থাকেন তাঁর শ্বশুর আর শাশুড়ি। তো সেখানেই তাঁকে পাওয়া গেল।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “অর্থাৎ লোকটাকে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে অ্যারেস্ট করে থানা-হাজতে নিয়ে গেলে। কাজটা কি ভাল হল, শোভন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “কেন, খারাপ হল কীসে? এক শ্বশুরবাড়ি থেকে আর-এক শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল বই তো নয়।”
