(১৮)
ঘুম আসতে-আসতে রাত তা প্রায় দুটো-আড়াইটে বেজে গিয়েছিল, ফলে ঘুম ভাঙতে-ভাঙতে সকাল প্রায় আটটা। তাও ভাঙত না, যদি না বাসন্তী এসে হাঁকডাক শুরু করে দিত। বললুম, “কী ব্যাপার, এত চেঁচাচ্ছ কেন? আপিস থেকে তো ছুটি নিয়েছি, তাও একটু বেলা করে উঠতে পারব না?”
বাসন্তী বলল, “দুটো খবর। ভাদুড়িদা ঘন্টাখানেক আগে ফোন করেছিলেন। দশটা নাগাদ যে তোমার কাঁকুড়গাছিতে যাবার কথা, সেটা মনে করিয়ে দিতে বললেন।”
“মনে করিয়ে দেবার কী আছে? পাশ ফিরে শুয়ে বললুম, “আমি কি সবই আজকাল ভুলে যাচ্ছি নাকি?…নাও, এখন দ্বিতীয় খবরটা বলো।”
“দ্বিতীয় খবর, কখন তোমার ঘুম ভাঙবে, সেই অপেক্ষায় সদানন্দবাবু সেই সাড়ে সাতটা থেকে বৈঠকখানা ঘরে বসে আছেন।”
“কোনও কাজ আছে?”
“তা আমি কী করে বলব। তবে কথা শুনে মনে হল, তুমি যে কাল রাত বারোটায় ভাদুড়িদার সঙ্গে বাড়ি ফিরেছ, ভদ্রলোক সেটা জানেন।”
“বারোটা নয়, সাড়ে এগারোটা।”
“ওই হল। তা মনে হচ্ছে, কোথায় গিয়েছিলে, কেন গিয়েছিলে, তোমার নিজের মুখে সে-সব না শুনে উনি এখান থেকে নড়বেন না।”
এরপর আর শুয়ে থাকা চলে না। বিছানা থেকে উঠে, চোখেমুখে জল দিয়ে, বৈঠকখানা-ঘরে চলে এলুম। সদানন্দবাবু কাগজ পড়ছিলেন। আমাকে ঢুকতে দেখে ‘দৈনিক বার্তাবহ’খানাকে ভাঁজ করে টেবিলে রেখে দিয়ে একগাল হেসে বললেন, “কী ব্যাপার মশাই, ওখান থেকে তো বিকেলবেলায় একসঙ্গে বাড়ি ফিরলুম, তারপর আবার কোথায় গেসলেন?”
বললুম, “বাঃ, আপনার সামনেই তো কাঁকুড়গাছিতে কথা হল যে, ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে রাত্তিরের দিকে একবার বেরুতে হবে। আপনার মনে নেই?”
“তা কেন থাকবে না,” সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু গেসলেন কোথায়?”
বললুম, “সে-সব কথা ভাদুড়িমশাইয়ের কাছেই বরং শুনবেন, এখন বাড়ি যান তো।”
“অ্যাঁ?”
“হ্যাঁ। বাড়ি গিয়ে সংসারের কাজকর্ম সেরে সাড়ে ন’টা নাগাদ এখানে চলে আসুন। আপনাকে নিয়ে কাঁকুড়গাছিতে যাব। যান, যান, আর দেরি করবেন না।”
বইয়ের আলমারির উপর থেকে তাঁর মাথায় লোহার বল-বসানো বেঁড়ে লাঠিখানাকে নামিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন সদানন্দবাবু। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “কী ব্যাপার বলুন তো? আজও কি ওখানে খাওয়া-দাওয়া আচে নাকি?”
“তা তো জানি না, তবে থাকলে আমি তার মধ্যে নেই, রোজ-রোজ অত নেমন্তন্ন খাওয়া আমার পোষায় না, ভাবছি যা-হোক চাট্টি ভাতে-ভাত খেয়ে নিয়ে রওনা হব।”
“সেই ভাল।” সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “আমিও তা হলে চান করে কিছু খেয়ে নিয়ে রওনা হচ্ছি। সাড়ে ন’টায় আসব তো?”
“ঠিক সাড়ে ন’টা।”
বিমল বরাটের বাড়িতে যেতে ভাদুড়িমশাই নিষেধ করে দিয়েছিলেন। ফলে মানিকতলায় না-থেমে সরাসরি কাঁকুড়গাছিতে চলে যাই। পৌঁছতে তবু যে পাঁচ-সাত মিনিট দেরি হয়ে যায়, তার কারণ, আপিস-টাইম বলে খালের উপরের ব্রিজে বেশ জ্যাম ছিল। বিমলের জন্য উদ্বিগ্নও ছিলুম একটু। বাড়ি থেকে রওনা হবার আগে তাকে ফোন করেছিলুম, কিন্তু রিং হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কেউ সাড়া দেয়নি। বাসন্তীকে সে-কথা বলতে বলেছিল, “সম্ভবত ফল্স রিং। তুমি শুনতে পাচ্ছ, কিন্তু ওখানে ওরা শুনতে পাচ্ছে না।” বিচিত্র নয়। কলকাতার ফোনের যা অবস্থা! মনের মধ্যে একটা অস্বস্তির কাঁটা তবু খচখচ করছিল।
আকাশ-বিহারের তলায় দেখলুম একটা জিপ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের জিপ। তার মানে শোভন চৌধুরি এসে গেছেন। জিপের সামনে অল্প-একটু জায়গা তখনও ফাঁকা পড়ে আছে দেখে আমার ফিয়াটটাকে পার্ক করে উপরে চলে এলুম। ড্রইং রুমে, সেন্টার টেবিলের চারপাশের সোফা-সেটিতে বসে, কথা বলছেন ভাদুড়িমশাই, শোভন চৌধুরি, অরুণ সান্যাল আর মিস রবিনসন। কৌশিক তার নোট-বইয়ে কিছু লিখে রাখছে।
আমাদের দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসুন আসুন। …সদানন্দবাবু, আপনার সঙ্গে তো এই ভদ্রমহিলার পরিচয় হয়নি। আসুন, পরিচয়টা করিয়ে দেওয়া যাক। ইনি মিস ডরোথি রবিনসন, এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসায়ী মিঃ প্রকাশ চৌহানের সেক্রেটারি। …আর ইনি সদানন্দবাবু, আমাদের বিশেষ বন্ধু।”
মিস রবিনসন আমাদের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে হাত জোড় করে বললেন, “নমস্কার।”
সদানন্দবাবু তাঁর মাথাটাকে ঈষৎ সামনে ঝুঁকিয়ে ফের টান হয়ে দাঁড়ালেন। তবে, বাংলায় কথা বলা উচিত হবে না বিবেচনা করে ইংরেজিতে বললেন, “গুড মর্নিং, ম্যাডাম।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন। …শোভন, পোস্ট-মর্টেমের রিপোর্ট তো আমরা শুনেছি। এবার এঁদেরও শুনিয়ে দাও।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “মারুতি গাড়ির ড্রাইভারটিকে গলায় ছুরি মেরে খুন করা হয়েছে। যে খুন করেছে, সম্ভবত সে ড্রাইভারটির চেনা লোক। কথাটা এইজন্য বলছি যে, ড্রাইভারটি যে তাকে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল, এমন মনে হয় না। অন্তত তার কোনও চিহ্ন নেই। সম্ভবত সে ভাবতেই পারেনি যে, তাকে খুন করা হবে। আবার এমনও সম্ভব যে, ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে খুন করা হয়েছিল। আমরা যখন তার ডেডবডি খুঁজে পাই, লোকটি সম্ভবত খুন হয় তার ঘন্টা তিনেক আগে। পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে অন্তত সেই কথাই বলা হয়েছে।
শোভন চৌধুরি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, আমি তাঁকে বাধা দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “একটা কথা আপনাদের জানা দরকার। বাড়ি থেকে বেরুবার আগে বিমল বরাটকে আমি ফোন করেছিলুম। এই ধরুন ন’টা কুড়ি থেকে ন’টা পঁচিশের মধ্যে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কোনও উত্তর পাননি, কেমন?”
“হ্যাঁ, ফোন বেজে গেল, কিন্তু কেউ ধরল না।”
“কে ধরবে। বাড়িতে থাকেন তো শুধু বিমলবাবু আর তাঁর ছোটভাই। তা ছোটভাইটি সম্ভবত ন’টার মধ্যেই আপিসে বেরিয়ে যান।”
“কিন্তু বিমলের তো চব্বিশ ঘণ্টা এখন বাড়িতেই থাকার কথা। সে কেন ফোন ধরেনি?”
“ওহে শোভন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিমলবাবু কেন ফোন ধরেননি, কিরণবাবুকে সেটা বলে দাও।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “তিনিই বা কী করে ফোন ধরবেন। সকাল ন’টায় তো তাঁকে আমরা লালবাজারে নিয়ে গেছি।”
“তার মানে?”
“মানে আর কিছুই নয়, কাল শেষ রাত্তিরে…এই ধরুন সাড়ে তিনটে-চারটের সময়…একটা গাড়ি হঠাৎ বিমলবাবুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। গাড়ির মধ্যে দু’জন লোক ছিল। একজন গাড়ি থেকে! নেমে বিমলবাবুর বাড়ির পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকবার চেষ্টা করে। সঙ্গে-সঙ্গে তাকে অ্যারেস্ট করা হয়।”
“উরে সব্বনাশ।” সদানন্দবাবু বললেন, “আর যে লোকটা গাড়ির মধ্যে ছিল?”
“গাড়ি নিয়ে সে সরে পড়বার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। উই গেভ হিম আ হট চেজ। মানিকতলা ব্রিজের উপরে রাস্ত” মেরামতির কাজ চলছে, সেখানে একটা রোড-রোলারে ধাক্কা খেয়ে সে দাঁড়িয়ে যায়। তাকেও আমর’ অ্যারেস্ট করেছি। দু’জনকেই লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।”
“কিন্তু বিমলকে আপনারা লালবাজারে নিয়ে গেলেন কেন?”
“ফর আ ভেরি সিম্পল রিজন।” শোভন চৌধুরি বললেন, “ফোনে কে বিমলবাবুকে ভয় দেখাচ্ছে, তা তো জানবার কোনও উপায় নেই। কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টের ছবিগুলোকে নেগেটিভসুদ্ধ কিনবার জন্যে যে-লোকটা বিমলবাবুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিল, তাকে নিশ্চয় বিমলবাবু চিনতে পারবেন। আমাদের ধারণা, যে দুজনকে আমরা অ্যারেস্ট করেছি, তার মধ্যে একজন নিশ্চয়ই সেই লোক। এখন বিমলবাবু তাকে আইডেন্টিফাই করলে সে-বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি।”
“বিমল কি আইডেন্টিফাই করেছে?”
“তা আমি এখনও জানি না। তবে লালবাজারকে বলা আছে, ওখানকার কাজ মিটে গেলেই যেন বিমলবাবুকে একজন এসকর্ট দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তার মানে তো একটু বাদেই তিনি এখানে এসে যাবেন।”
“তা এসে যাবেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু ততক্ষণ তো বসে থেকে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। ওহে শোভন, যে-কথা হচ্ছিল, সেটা শেষ করো।”
কৌশিক বলল, “কথা হচ্ছিল পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট নিয়ে।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “মারুতি-গাড়ির ড্রাইভারের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টের কথা বলেছি। মিঃ ভাদুড়ি ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন, অ্যাম্বাসাডরের পিছনের দিকের ধাক্কায় লোকটির ডান হাত বেশ ‘ভালমতোই জখম হয়েছিল, ব্যান্ডেজ খুলে দেখা যায় যে, কনুই থেকে কব্জি অব্দি হাতটা বলতে গেলে থেঁতলে গেছে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “একটা কথা বলব?”
কৌশিক বলল, “পরে বলবেন। আগে শোভনবাবুর কথা শোনা যাক। ওঁর কথা এখনও শেষ হয়নি। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট তো একটা নয়, দুটো। একটার কথা তো শুনেছেন, এখন আর-একটার কথা ওঁকে বলতে দিন।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “দ্বিতীয় পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টের কথা কি মিস রবিনসনের সামনে বলা ঠিক হবে?…মানে প্রসাদ গুপ্তের সঙ্গে ওঁর…আই মিন একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই ভাবছিলুম যে…”
মিস রবিনসন এতক্ষণ মাথা নিচু করে ম্যাগাজিনের পাতা উলটে যাচ্ছিলেন, কারও কথাই যে তিনি শুনছেন, এমন আমার মনে হচ্ছিল না। ভাবছিলুম যে, এটাই স্বাভাবিক। প্রসাদ গুপ্তের মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে যে ধাক্কাটা খেয়েছেন, তাতে এই ধরনের আলোচনায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ থাকবার কথা নয়। মনে হচ্ছিল, এখানে তাঁকে বসিয়ে না রাখলেই ভাল হত। বললুম, “শোভনবাবু ঠিকই বলেছেন, আমিও ঠিক এই কথাটাই…”
কথাটা শেষ করতে পারলুম না। ম্যাগাজিন থেকে মুখ তুলে মিস রবিনসন বললেন, “আপনাদের কাউকে কিছু ভাবতে হবে না। প্রসাদ সম্পর্কে যা-কিছু জানা গেছে, আমার সামনেই সেটা বলুন। অস্বস্তির কিছু নেই, আমি সহ্য করতে পারব।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শোনা ওঁর দরকারও।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে শুনুন। অ্যাকসিডেন্টের পরে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়ার নাম করে ওঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা শনিবার সকালের ব্যাপার। সেইদিনই রাত্তিরে কোনও একটা সময়ে খুন করা হয় প্রসাদ গুপ্তকে। ডাক্তার বলছেন, হি ওয়াজ মার্ডারড ডিউরিং দ্য আর্লি আওয়ার্স অব দ্য মর্নিং। তার মানে এই ধরুন রাত একটা থেকে দুটোর মধ্যে। মাথার পিছনে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে মার্ডার করা হয়েছে।”
মিস রবিনসন বললেন, “ওটা তো পা র কথা। যে গাড়িতে করে প্রসাদ যাচ্ছিল, সেটার অ্যাকসিডেন্ট কীভাবে হল, তা কিছু জানতে রলেন?”
“পথের পাশে পার্ক করা একটি গাড়ি থেকে গুলি চালিয়ে প্রসাদ গুপ্তের অ্যাম্বাসাডরের টায়ার ফাটিয়ে অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটানো হয়েছিল।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমি একটা কথা বলব?”
মিস রবিনসন বললেন, “কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটানো হল কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা, অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটানো হয়েছিল প্রসাদ গুপ্তের বিদেশ যাত্রা পণ্ড করবার জন্য। বাট বিফোর উই কাম টু দ্যাট, আর-একটা প্রশ্নের উত্তর আমাদের পাওয়া দরকার। প্রসাদ গুপ্ত যে প্রকাশ চৌহানের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ যাচ্ছিলেন, এটা আমরা সহজেই বুঝতে পারছি। ইন ফ্যাক্ট, চৌহানের পাসপোর্টের ছবিটার উপরে সেইজন্যেই একটু কারিকুরি করে নেওয়া হয়েছিল, যাতে কিনা প্রসাদ গুপ্তের চেহারার সঙ্গে পাসপোর্টের ছবিটা পুরোপুরি মিলে যায়। কিন্তু তা তো হল, প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ একটা জাল পাসপোর্ট নিয়ে প্রসাদ গুপ্তের বিদেশে যাওয়ার দরকার হল কেন?…আমার বিশ্বাস, মিস রবিনসনের কাছ থেকে এই প্রশ্নের একটা উত্তর আমরা আশা করতে পারি।”
“উত্তরটা আমি দেব।” মিস রবিনসন বললেন, “যদি তাতে প্রসাদের খুনের একটা কিনারা হয়।”
“আমার বিশ্বাস, হবে।”
“তা হলে শুনুন, নিজের নামে নয়, প্রকাশ চৌহানের নামেই প্রসাদ গুপ্তের লন্ডনে যাবার দরকার ছিল।”
“কেন?”
“যেহেতু লন্ডনের একটা ফার্মের কাছ থেকে আমাদের কোম্পানির একটা মোটা টাকার অর্ডার পাবার কথা। তার জন্যে মিঃ চৌহানের সেখানে যাবার দরকার ছিল। কিন্তু এদিককার কাজকর্ম ফেলে তিনি কোথাও যেতে পারছিলেন না। তাই প্রসাদকে তিনিই বলেন যে, সে যেন লন্ডনে গিয়ে ওই ফার্মের লোকেদের সঙ্গে কথা বলে এগ্রিমেন্টে সই করে আসে।”
“অর্থাৎ প্রসাদ গুপ্ত লন্ডনে যেতেন প্রকাশ চৌহান সেজে, আর এগ্রিমেন্টে সইও করতেন প্রকাশ চৌহানের নামে। জাল পাসপোর্ট, জাল সিগনেচার! এটা কী রকমের অ্যাসাইমেন্ট হল মিস রবিনসন?”
মিস রবিনসন কোনও উত্তর দিলেন না। ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রসাদ গুপ্ত এ-কাজে রাজি হলেন কেন?”
মিস রবিনসন এবারও কোনও উত্তর দিলেন না। এক মিনিট অপেক্ষা করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি চুপ করে থাকলেও কিন্তু উত্তরটা আমি অনুমান করে নিতে পারি। আসলে মিঃ চৌহানের কথায় রাজি হয়ে গিয়ে ওই যে একটা জাল সার্টিফিকেট দাখিল করে প্রসাদ গুপ্ত গিয়ে ব্রেবোর্ন রোডের ইলেকট্রিক গুড়সের ফার্মের চাকরিতে ঢোকেন, ওটাই হয়েছিল তাঁর মস্ত ভুল। ওইটে করেই তিনি মিঃ চৌহানের খপ্পরে পড়ে যান। মিঃ চৌহান তাঁকে ভয় দেখাতে থাকেন যে, তাঁর কথামতো জাল পাসপোর্ট নিয়ে যদি বিদেশে না যান, তা হলে ওই জাল সার্টিফিকেটের কথা তিনি ফাঁস করে দেবেন। ফলে মিঃ চৌহানের কথায় রাজি না হয়ে তাঁর উপায় ছিল না।”
অস্ফুট গলায় মিস রবিনসন বললেন, “সত্যিই ছিল না।”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “কিন্তু প্রসাদ গুপ্তকে বিলেতে পাঠাবার কারণ সম্পর্কে আপনি যা বলেছেন, সেটাও তো নেহাতই আপনার শোনা কথা। যদ্দুর বুঝতে পারছি, মিঃ চৌহানই ওটা আপনাকে বলে থাকবেন। তাই না?”
“হ্যাঁ, ওটা মিঃ চৌহানের কাছেই আমি শুনেছি।”
“কিন্তু যে-কারণ তিনি দেখিয়েছেন, দ্যাট ওন্ট ওয়াশ!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহে শোভন, তোমাকে তো বলেছিলুম যে, প্রসাদ গুপ্তের বডি যেন তন্ন-তন্ন করে সার্চ করা হয়। তার কারণ, আমি আশা করেছিলুম যে, এমন-কিছু পেয়ে যেতে পারো, খুনিরা যার খোঁজ পায়নি। তা, সার্চ করে যা পেয়েছ, সেটা এঁকে দেখিয়ে দাও।”
শোভন চৌধুরি তাঁর পকেট থেকে একটা ব্রাউন-রঙের ম্যানিলা খাম বার করে খুব সন্তর্পণে তার ভিতর থেকে যা বের করে আনলেন, সেটা একটা চাবি। চাবিটিকে সেন্টার টেবিলের উপরে রেখে তিনি বললেন, “প্রসাদ গুপ্তের বাঁ- পায়ের জুতোর সোলের মধ্যে এটি পাওয়া গেছে।”
ভাদুড়িমশাই চাবিটি তুলে নিয়ে বললেন, “চাবির গায়ে কী খোদাই করা আছে জানেন? সি.সি. আই.। একটা নম্বর খোদাই করা রয়েছে—৯০৯৮। এর অর্থ আপনারা বোধহয় বুঝতে পারছেন না। সুতরাং জেনে রাখুন, সি. সি. আই. মানে হল ক্রেডিট কমার্শিয়াল ইন্টারন্যাশনাল, ওটা একটা মস্ত বড় সুইস ব্যাঙ্কের নাম। আর ওই ৯০৯৮ হল সেই ব্যাঙ্কের একটা লকারের নম্বর। তা এর থেকে কিছু আন্দাজ করা গেল?”
আন্দাজ একটা করতে পারছিলুম ঠিকই, কিন্তু সকলেই চুপ করে আছে দেখে আমিও আর মুখ খুললুম না। ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, মিস রবিনসন, মিঃ চৌহান আপনাকে ঠিক-কথা বলেননি। প্রসাদ গুপ্তকে যে স্রেফ একটা এগ্রিমেন্টে জাল-সই করবার জন্যে প্রকাশ চৌহানের পাসপোর্ট নিয়ে লন্ডনে পাঠানো হচ্ছিল, এটা সত্যি-কথা নয়। আসলে, রফতানি বাবদে যে ফরেন এক্সচেঞ্জ তাঁর প্রাপ্য হয়, তার সবটা তো তিনি এ-দেশে আনান না, সরকারকে ফাঁকি দেবার জন্যে ইনভয়েসে কারচুপি করে তার একটা মস্ত অংশই লন্ডনে তাঁর পার্টির কাছে গচ্ছিত রাখেন। প্রসাদ গুপ্ত লন্ডন থেকে সেটা নিয়ে ফিরতি পথে ওই সুইস ব্যাঙ্কের লকারে সেটা জমা রেখে আসবেন, মোটামুটি এটাই ছিল প্রকাশ চৌহানের প্ল্যান।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর, অনুচ্চ গলায়, যেন-বা শুধুই নিজেকে শুনিয়ে বললেন, “পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে। রবীন্দ্রনাথ বড় খাঁটি কথাই লিখেছেন। জাল— সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরিতে ঢোকাই প্রসাদ গুপ্তের প্রথম পাপ। কিন্তু তাতেই তাঁর কাল হল। তারপরে আর প্রকাশ চৌহানের কথায় রাজি না-হয়ে তাঁর উপায় ছিল না। …আরে, বিমলবাবু এসে গেছেন দেখছি।”
বিমল বরাট এসে ঘরে ঢুকে বলল, “এক গ্লাস জল খাব। বড্ড ধকল গেছে।”
কৌশিক গিয়ে জলের কথা বলে এল। শোভন চৌধুরি বললেন, “শনাক্ত করতে পারলেন?”
“তা কেন পারব না? ঢ্যাঙামতো লোকটাই তো ফোটো আর নেগেটিভ কিনবার জন্যে আমার বাড়িতে গিয়ে ঝুলোঝুলি করছিল।”
“আর যে লোকটা তত ঢ্যাঙা নয়?”
“তাকে চিনতে পারলুম না। মনে হল না যে, আগে কোথাও দেখেছি।”
“আমরা কিন্তু ঠিকই চিনেছি।” শোভন চৌধুরি বললেন, “মানিকচাঁদ রুংতা।”
মিস রবিনসন বললেন, “সে কী, তিনি তো মিঃ চৌহানের পার্টনার!”
“তাই বলে তাঁকে অ্যারেস্ট করা যাবে না? কাল রাত্তিরের ওই ঘটনার পরেও?” শোভন চৌধুরি হেসে বললেন, “মিঃ প্রকাশ চৌহানের নামেও অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বেরিয়ে গেছে, মিস রবিনসন। ইন ফ্যাক্ট, লালবাজার থেকে রওনা হবার আগে আমিই তাতে সই করে দিয়ে এসেছি।”
