(১৫)
ত্রিপুরার নীরমহলে বন্ধু ঘোষের ছেলের মাথায় যখন ইট পড়ে, তখন একবার দেখেছিলুম বটে, কিন্তু ভাদুড়িমশাইকে তার পরে আর কখনও এইরকম ঝিম মেরে বসে থাকতে দেখিনি। কেন যে তিনি কথা বলছেন না, একেবারে চুপ করে রয়েছেন, সেটা যে আমি আদৌ আঁচ করতে পারছিলুম না, তা অবশ্য নয়। নিশ্চয় তিনি ধরে রেখেছিলেন যে, অপরাধীকে শনাক্ত করবার ব্যাপারে একদিকে যেমন বিমল বরাটের তোলা ফোটোগ্রাফ হবে তাঁর প্রধান এভিডেন্স, অন্যদিকে তেমন সেই ফোটোগ্রাফ দেখিয়ে ভয় পাইয়ে দিয়ে মারুতি গাড়ির ড্রাইভারটিকেও রাজসাক্ষী হতে রাজি করানো যাবে। ড্রাইভারটি খুন হয়ে যাওয়ায় সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। ভাদুড়িমশাই অতএব মুষড়ে পড়তেই পারেন।
কিন্তু যতই মুষড়ে পড়ুন, হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। যা ঘটে গেছে, তারপর এখন কীভাবে আমাদের এগোনো দরকার, তা তো ভাবতে হবে। বললুম, “কিছু ভাবছেন?”
“তা ভাবছি বই কী।” মুখ তুলে ভাদুড়িমশাই বললেন, “গলায় ছুরি চালিয়ে একজনের মুখ তো বন্ধ করে দেওয়া হল, এখন অন্যজনের কী হবে, তা-ই ভাবছি।”
“অন্যজন মানে বিমল বরাটের?”
“তা ছাড়া আর কার!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে ওঁর মুখও না বন্ধ করে দেবার ব্যবস্থা হয়। আজ এখানে আসবার পথে ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন?”
“তা এসেছিলুম। আপনার কথামতো যথাসম্ভব সাবধান থাকছে। বাড়ি থেকে বিশেষ বেরুচ্ছে না।”
“আদৌ বেরুনো চলবে না। এমনকি, সকালে সম্ভবত একবার বাজার করতে বার হন, সেটাও বন্ধ রাখতে হবে।”
“তার মানে তো লোকটা একেবারে ঘরবন্দি হয়ে গেল!”
“বেশি দিনের জন্যে নয়, আপাতত দিন তিন-চার। এই ধরুন সামনের রোববার পর্যন্ত। ….কৌশিক, দুটো ফোন কর।”
কৌশিক বলল, “কাকে?”
“প্রথম ফোনটা বিমল বরাটকে করবি। আমার নাম করে বলবি যে, রবিবার পর্যন্ত তাঁর বাড়ি থেকে এক পা’ও বার হওয়া চলবে না।”
“দ্বিতীয় ফোনটা কাকে করব?”
“শোভন চৌধুরিকে। বলবি যে, আজ বিকেল থেকেই যেন বিমল বরাটের মানিকতলার বাড়িতে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। রাউন্ড দ্য ক্লক।”
ফোন করবার জন্যে কৌশিক ড্রইং রুম থেকে পাশের ঘরে চলে গেল। ফিরে এল মিনিট দশেক বাদে। ভাগ্নের দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথা হল?”
“তা হল।”
“কে কী বললেন, সেটা বলবি তো।”
“বিমলবাবুকে বড্ড বেজার মনে হল। বললেন যে, তাঁর কাজকর্মের তো অলরেডি বারোটা বেজে গেছে, এখন সকালবেলায় বাজারে যাওয়াও যদি বন্ধ করতে হয় তো নামকাওয়াস্তে বাড়িতে থেকে লাভ কী, আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে গিয়ে থাকলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।”
“বাজারে যাওয়া বলে কথা নেই, বাড়ির চৌকাঠ পেরোলেই যে তাঁর উপরে হামলা হতে পারে, সেটা বলেছিস?”
“তা বলেছি, কিন্তু ভদ্রলোক সে-কথা বিশ্বাস করেছেন বলে মনে হল না।”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিরণবাবু, রাত্তিরের দিকে আপনি একবার বিমলবাবুকে ফোন করতে পারবেন?”
“তা কেন পারব না? কিছু বলতে হবে?”
“এই কথাটাই ওঁকে একটু বুঝিয়ে বলতে হবে। আপনাকে তো খুব বিশ্বাস করেন, আপনি বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় অবিশ্বাস করবেন না।”
“তা বলব। কিন্তু আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে, ওর উপরে হামলা হতে পারে?”
প্রশ্ন শুনে ভাদুড়িমশাই একেবারে স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “হামলা যে এখনও হয়নি, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি কিরণবাবু। ওঁকে বুঝিয়ে বলবেন যে, হিজ লাইফ ইজ ইন গ্রেট ডেনজার।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ফোন করবার দরকার কী, কথাটা তো ওঁকে ফিরতি-পথেই আমরা বলে যেতে পারি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, সেটা ঠিক হবে না। ওঁর বাড়ির ধারেকাছে এখন যত কম যাওয়া যায়, ততই ভাল।”
কৌশিক বলল, “পাহারার ব্যবস্থা কিন্তু আজ বিকেল থেকেই হচ্ছে। শোভন চৌধুরি অন্তত সেই কথাই জানালেন। বললেন, তোমার মামাবাবুকে চিন্তা করতে নিষেধ কোরো, বিমলবাবুর যাতে না কোনও বিপদ ঘটে, তার জন্যে যা-কিছু করা দরকার, লালবাজার থেকে সবই করা হবে।”
“শোভন আর-কিছু বলেনি?”
“ও হ্যাঁ, তুমি কার বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়েছিলে, তা বললেন যে, লোক লাগিয়ে দিয়েছেন, মোটামুটি সন্ধে নাগাদ সেটা পেয়ে যাবেন মনে হয়, পেলেই তোমাকে ফোন করবেন।”
বললুম, “কার ঠিকানা?”
ভাদুড়িমশাই আমার কথার কোনও জবাব না দিয়ে বললেন, “সন্ধে নাগাদ পেলে তো ভালই হয়। কিরণবাবু, সন্ধের সময় কি আপনি বাড়িতে থাকবেন? নাকি কোথাও বেরুবার আছে?”
বললুম, “এক পাবলিশারের কাছে যাবার কথা ছিল। তা সেটা আজ না-গিয়ে কাল গেলেও কিছু ক্ষতি হবে না। কেন, সন্ধের সময় আপনি ওদিকে আসছেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসছি কি না, সে তো এখুনি বলা সম্ভব নয়। সবই আসলে ঠিকানাটা পাওয়ার উপরে নির্ভর করছে। যদি পেয়ে যাই, একমাত্র তা হলেই হয়তো আপনার ওখানে একবার চুঁ মারব। আপনাকে পেয়ে গেলুম তো ভাল, না হলে যেখানে যাবার সেখানে একাই যেতে হবে।”
“কোথায় যাবেন, সেটা বলবেন তো?”
“তা কি ছাই আমি নিজেই জানি। ঠিকানাটা না-পাওয়া পর্যন্ত সেটা জানা যাচ্ছে না।”
কার ঠিকানা, ভাদুড়িমশাই যে এক্ষুনি সেটা বলবেন না, সেটা বুঝতে পেরেছিলুম। বললুম, “ঠিক আছে, সন্ধের সময় তা হলে আর কোথাও বেরুচ্ছি না, বাড়িতেই থাকব।”
কাজের মেয়েটি চা দিয়ে গিয়েছিল। চায়ের পাত্রে চুমুক দিয়ে অরুণ সান্যাল বললেন, “আমাকে কিন্তু এবারে উঠতে হবে দাদা। চেম্বারে যাওয়ার সময় হল।”
বাসন্তী আর মালতী এসে ঘরে ঢুকল। বাসন্তী বলল, “ক’টা বাজে খেয়াল আছে?”
হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললুম, “প্রায় পাঁচটা। মিনিট পাঁচেক বাকি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “উরে বাবা, তা হলে তো এবারে বাড়ি ফিরতে হয়।”
বাসন্তী হেসে বলল, “যাক্, অন্তত একজনের তা হলে বাড়ির কথা মনে পড়েছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথাটা বোধহয় আপনাকে শুনিয়ে বলা হল, কিরণবাবু।”
মালতী বলল, “কিরণদার আর দোষ কী, উনি ওঁর বাড়িটিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।”
বললুম, “না না, সত্যি বড্ড দেরি হয়ে গেছে, এবারে ফেরা দরকার। …চলুন সদানন্দবাবু, ওঠা যাক।”
চা শেষ করে, বিদায় নিয়ে, আমরা বেরিয়ে পড়লুম।
বাড়ি ফিরতে সাড়ে পাঁচটা। জামাকাপড় পালটে, স্নান সেরে, লেখার টেবিলে এসে বসতে-বসতে ছ’টা। বাড়ি ফিরে লেটার বক্স খুলে একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠি না বলে চিরকুট বললেই ঠিক হয়। টাইপ-করা একটিমাত্র লাইন : ট্রাই টু কনভিন্স ইয়োর ফ্রেন্ড দ্যাট হিজ টাইম ইজ ফাস্ট রানিং আউট। বড় হাতের ‘টি’ আর ছোট হাতের ‘এ’ যে ভাঙা, সেটা আমার নজর এড়ায়নি।
নিজের বাড়িতে হাজিরা দিয়ে সদানন্দবাবু এরই মধ্যে একবার আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে গেছেন। পাছে ঘাবড়ে যান, তাই চিরকুটের কথাটা তাঁকে জানাব না, ভেবেছিলুম। পরে মনে হল জানিয়ে রাখাই ভাল। কিন্তু সব শুনে ভদ্রলোক তো ঘাবড়ে গেলেনই না, উলটে একটা ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব, দেখিয়ে বললেন, “আমি কী ভাবছি জানেন?”
“কী ভাবছেন?”
“ভাবছি যে, অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স!”
“তার মানে?”
“তার মানে, ওরাই তো শুধু ভয় দেখাচ্ছে, এবারে আমরাও ওদের ভয় দেখিয়ে এই রকমের এক-একটা চিরকুট ছাড়লে পারি। তাতে কড়া-কড়া সব কথা লিখে ব্যাটাদের দাবড়ে দিতে হবে।”
আমার বাক্শক্তি লোপ পেয়েছিল। অনেক কষ্টে সেটা ফিরে পেয়ে বললুম, “কড়া-কড়া কথা মানে কীরকম কথা?”
“সেটা আমি ভেবে রেখেছি।” সদানন্দবাবু বললেন, “প্রথমটায় লিখব, ইয়োর ডেজ আর নাম্বার্ড। দ্বিতীয়টায়…”
বললুম, “বাঃ, চমৎকার। কিন্তু চিরকুটগুলো যে পাঠাবেন, তার জন্যে ওদের ঠিকানাটা তো জানা চাই। সেটা জানছেন কোত্থেকে?”
মাথা চুলকে সদানন্দবাবু বললেন, “তা বটে।” বলে আর কথা না-বাড়িয়ে ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন। হাতে নাইলনের দড়ির বুনট-করা ব্যাগ। তার মধ্যে অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান বসানো। বুঝলুম, ভদ্রলোক মাদার ডেয়ারির বুথ থেকে দুধ আনতে চললেন।
ভাদুড়িমশাইয়ের ফোন এল সাতটায়।
“বাড়িতেই আছেন তো?”
“তা আছি।”
“ঠিক আছে, আমি সাড়ে সাতটার মধ্যেই আপনার ওখানে পৌঁছে যাব।”
ঠিক সাড়ে সাতটাতেই নীচের গলিতে হর্ন বাজল।
ফোন পেয়েই ফের জামাকাপড় পালটে নিয়েছিলুম। নীচে নামতে তাই দেরি হল না। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে বললুম, “ঠিকানাটা পেয়েছেন তা হলে?”
“তা পেয়েছি। ইতিমধ্যে আর-একটা খবর পাওয়া গেছে। মারুতির নাম্বার প্লেট সেই ফিয়াটের মতোই ফল্স। অর্থাৎ ওটার সূত্র ধরে এগোনো যাবে না। এখন এই ঠিকানাটাই একমাত্র লিড।”
“ঠিকানাটা কার?”
ভাদুড়িমশাইয়ের কাছ থেকে এবারেও কোনও স্পষ্ট জবাব পাওয়া গেল না। শুধু মৃদু হেসে বললেন, “একটু বাদেই সেটা জানতে পারবেন।”
