কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ছয়
কর্নেলের কথা শুনে চমকে উঠেছিলাম। বললাম, সর্ষের মধ্যে এই ভূতের নাম সি এস সিনহা। মিসেস ব্যানার্জিকে এখনই জিজ্ঞেস করে জেনে নিন লোকটা কে?
কর্নেল ববের টুকরো কাগজগুলো দেখতে দেখতে বললেন, ধীরে জয়ন্ত, ধীরে!
ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, বঙ্কিমচন্দ্র কোট করছেন শুধু!
কোট করছি না ডার্লিং। অনুকরণ করছি! বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ধীরে রজনী, ধীরে! তবে তোমাকে বলেছিলাম, এবার শুধু চমকের পর চমক। সি এস সিনহা সেইসব চমকের আর একটা চমকমাত্র। হু, ববের লেখা একটা অসমাপ্ত চিঠি দেখছি। কর্নেল কুঁচকে যাওয়া একটা ইনল্যান্ড লেটারের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। তারপর বললেন, ববেরই লেখা। তাড়াহুড়ো করে কয়েক লাইন লিখেছিল। কিন্তু ম্যাডাম সম্বোধনে বোঝা যাচ্ছে সে শ্রীলেখা ব্যানার্জিকে চিঠিটা লিখতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনও কারণে মত বদলায়। কি কেউ সেই সময় হঠাৎ এসে পড়ায় আর লেখা হয়নি, তাই যেমন-তেমন ভাবে ভাঁজ করে লুকিয়ে ফেলেছিল।
কর্নেল চিঠিটা পড়ার পর আমাকে পড়তে দিলেন। ম্যাডাম সম্বোধনের পর যা লিখেছে, তা বাংলায় এরকম দাঁড়ায় :
আপনার স্বামীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। আমি অনুতপ্ত। স্বীকার করছি, ওঁর হাতের ঘড়ি ছিনতাই করাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ভদ্রলোক অত বেশি ভয় পেয়ে বাচ্চা ছেলের মতো দৌড়বেন, চিন্তাই করিনি। আমার হাতে ছুরি ছিল। ভেবেছিলাম ছুরি দেখামাত্র থমকে দাঁড়াবেন। তখন ঘড়িটা চাইব। কিন্তু সেই সুযোগ তিনি দেননি। পরে জেনেছি, প্রাণভয়ে নয় তিনি ঘড়িটা বাঁচানোর জন্যই কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং…।
চিঠিটা কর্নেলকে ফেরত দিয়ে বললাম, আপনার মনে থাকা তো উচিত। আমি বলেছিলাম, ঘড়ি ছিনতাইকারীকে সৎ এবং বিবেকবান বলে মনে হয় যেন। আপনি বলেছিলেন, সো ইট অ্যাপিয়ারস। এবার তার পরিচয় মোটামুটি জেনে গেলেন। তা হলে দেখা যাচ্ছে, আমার ধারণা ঠিকই ছিল।
হ্যাঁ। আচমকা জয়দীপের পথদুর্ঘটনায় মৃত্যু ববকে বিচলিত করেছিল। আসলে কোনও মানুষই নির্ভেজাল মন্দ বা নির্ভেজাল ভালো নয়। ভাল-মন্দ বোধ সব মানুষের মধ্যেই আছে। বব ছিল স্পয়েলট চাইল্ড। পরিবেশ ওকে নষ্ট করেছিল। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি, সে পেশাদার খুনী তো নয়ই, পেশাদার অপরাধীও বলা যাবে না তাকে। কখনও-সখনও টাকার জন্য বেপরোয়া হয়ে সে। কিছু খারাপ কাজ করে থাকবে।
কর্নেল। আমার মনে হচ্ছে, শ্রীলেখা ব্যানার্জির কর্মচারী সি এস সিনহাই ববকে টাকা খাইয়ে জয়দীপের ঘড়ি ছিনতাই করতে বলেছিল।
তা আর বলতে? বলে কর্নেল কফি শেষ করে কিটব্যাগটায় ববের জিনিসপত্র আগের মতো ঠেসে ভরলেন। তারপর ব্যাগটা ভেতরের ঘরে কোথাও রাখতে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, মিসেস ব্যানার্জির পি এর কিডন্যাপার সময় বেঁধে দিয়েছে সাড়ে পাঁচটা। এর কারণ বোঝা যাচ্ছে শীতের সন্ধ্যা। তা ছাড়া আউট্রাম ঘাটের কোনও কোনও জায়গায় ল্যাম্পপোস্টে আলো থাকলেও গাছপালার ছায়া পড়ে দেখেছি। লোকটা ঝুঁকি নিতে চায় না। যাই হোক, অপেক্ষা করা যাক।….
সাড়ে পাঁচটার পর কর্নেল শ্রীলেখাকে টেলিফোন করলেন। ক্রমাগত হ্যাঁ, ঠিক আছে, তাই নাকি ইত্যাদি ছাড়া কিছু বুঝতে পারলাম না। একটু পরে ফোন রেখে কর্নেল হাসিমুখে আমার দিকে তাকালেন।
বললাম, কী ব্যাপার? আপনাকে খুশি-খুশি দেখাচ্ছে!
হালদারমশাই গিয়ে ঘটনাটা শোনার পর চুপচাপ বেরিয়ে গেছেন। শ্রীলেখা ওঁকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, যেন ওত পাততে না যান। তার পি এর কোনও ক্ষতি হলে হালদারমশাই দায়ী হবেন।
ঘড়িটা পাঠিয়ে দিয়েছেন শ্রীলেখা?
শেখরবাবু নামে ওঁর একজন আস্থাভাজন কর্মীর হাতে দিয়ে পাঠিয়েছেন। শেখরবাবুর মোটরবাইক আছে। ফিরতে দেরি হবে না। উনি ফিরলেই শ্রীলেখা বাড়ি ফিরবেন। আমরা ওর বাড়িতে যেন সাড়ে ছটায় অবশ্য যাই। শ্রীলেখা অনীশ রায়ের লেখা একটা অদ্ভুত চিঠির কথা সকালে বলছিলেন। সেটা দেখাতে চান।
কিন্তু আপনার খুশির কারণ কি এই যে, ওরা এরপর জয়দীপের কম্পিউটার চুরি করলেও গোপনীয় ডেটা দুটো পাবে না?
ঠিক ধরেছ। তবে আমার খুশি হওয়ার আর একটা কারণ আছে। হালদারমশাইকে শ্রীলেখা নিষেধ করার পর উনি চুপচাপ বেরিয়ে গেছেন। অথচ আমার এখানে এখনও এলেন না। তার মানে কী বুঝতে পারছ?
ওত পাততে গেছেন তা হলে! উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, কর্নেল! হালদারমশাইকে। আমরা জানি। দেখবেন উনি নির্ঘাত একটা ঝামেলা বাধাবেন। আর মাঝখান থেকে মেয়েটার প্রাণ যাবে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, যাবে না। বরং হালদারমশাই আগেভাগে গিয়ে ওখানে ওত পাতবেন বলেই ওঁকে তখন ওঁর মক্কেলের অফিসে যেতে বলেছিলাম।
কিন্তু উনি ঝামেলা বাধালে নিজেই বিপদে পড়তে পারেন। আর মিসেস ব্যানার্জির পি এর প্রাণ যাবে না বলছেন কেন বুঝতে পারছি না।
কর্নেল আস্তেসুস্থে চুরুট ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সুসান ওরফে সুদেষ্ণা দত্তের প্রাণ যাবে না। কারণ সে কিডন্যাই হয়নি। তাকে কেউ আটকে রাখেনি।
অবাক হয়ে বললাম, বলেন কী! সুদেষ্ণা কিডন্যাপড হয়নি?
আমি যখন তার ফ্ল্যাট লক করে নিচে নেমেছি, তখন আমার পাশ কাটিয়ে তাকে হন্তদন্ত করে সিঁড়িতে উঠতে দেখলাম। জাস্ট আধমিনিট আমার দেরি হলে আমি ঝামেলায় পড়তাম। অবশ্য ববের ব্যাগটা যে উধাও হয়েছে, তা সে লক্ষ্য করতেও পারে। না-ও পারে। এখন আর কিছু যায় আসে না।
কর্নেল! আপনি তো ওকে দেখেননি! কী করে চিনলেন সে-ই মিস দত্ত?
ফ্ল্যাটে ঢুকে ওর ছবি দেখেছি। দেয়ালে এবং টেবিলে। ববের সঙ্গেও একটা রঙিন ফটো বাঁধানো আছে দেখেছি।
হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বললাম, তা হলে সুদেষ্ণা এই চক্রান্তে জড়িত।
নিশ্চয় জড়িত। আর এ-ও বোঝা যাচ্ছে, জয়দীপের কম্পিউটারাইজড় গোপন ডেটার কথা কোনওভাবে সে জানতে পেরেছিল। ফার্স্ট কি ওয়ার্ডস ব্রেড এবং পরের কি যে কয়েকটা নাম্বার, তা-ও সে জানে। সেই নাম্বার বা ডিজিটাল কোড একটা নীলডায়াল রোমার ঘড়িতে আছে, সুসানের তা অজানা ছিল না। হ্যাঁ, বব তার এই গার্লফ্রেন্ডের কাছেই এ সব কথা জেনেছিল। কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর ফের বললেন, ববের কাছে সি এস সিনহার নেমকার্ড পেয়েছি। তাই আমার কাছে একটা টাইম ফ্যাক্টরের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কি ওয়ার্ড ব্রেড এবং রোমার ঘড়িতে খোদাই করা নাম্বারের কথা বব সম্ভবত জয়দীপের মৃত্যুর পর জেনেছিল। দুর্ঘটনায় জয়দীপের মৃত্যু ববকে বিচলিত করেছিল, আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। বিচলিত বব তার গার্লফ্রেন্ডের কাছে ঘটনাটা বলতেই পারে। হয়তো অনুতপ্ত বব নেশার ঘোরেই বলে ফেলেছিল। তখন সুসান কে সব কথা জানাতে পারে। কিন্তু বিবেক যন্ত্রণায়। পীড়িত বব তখন সতর্ক হয়ে যায়। ঘড়িটা সুসানকে সে দেয়নি। জয়দীপের স্ত্রীকে ফেরত দিতে চেয়েছিল। শ্রীলেখা ব্যাকগ্রাউন্ড জানতেন না বলেই ভড়কে যান। যাই হোক, পুলিশ সুসানকে জেরা করলে আমার ধারণার সত্যতা যাচাই হবে।
ওকে পুলিশের হাতে এখনই ধরিয়ে দেওয়া উচিত!
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে বললেন, মিসেস লিজা হেওয়ার্থের কাছে আমরা জেনেছি, একটা লোক ববের খোঁজে গিয়ে হুমকি দিয়ে এসেছে। তাকে লিজা আগেও দেখেছেন। সম্ভবত সে সি এস সিনহা।
তাকেই বা পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন না কেন?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে আবার বললেন, ধীরে জয়ন্ত, ধীরে! বলে ঘড়ি দেখলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলো। এবার শ্রীলখোর বাড়ি যাওয়া যাক।..
আমরা সবে নেমে নিচের লনে পৌঁছেছি, গেটের কাছে ট্যাক্সি থেকে হালদারমশাই অবতরণ করলেন এবং দ্রুত ভাড়া মিটিয়ে গেট দিয়ে সবেগে প্রবেশ করলেন। তারপর আমাদের দেখামাত্র ছুটে এলেন।
কর্নেল বললেন, চলুন হালদারমশাই! যেতে যেতে শোনা যাবে।
আপনারা যাবেন কৈ?
আপনার ক্লায়েন্টের বাড়িতে। আসুন, আমরা পেছনের সিটে বসি।
দুজনে গাড়িতে উঠলেন। স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। কর্নেলকে বলতে শুনলাম কী হলো হালদারমশাই? চুপ করে আছেন যে?
ভাবতাছি।
কী ভাবছেন।
ব্যাকভিউ মিররে দেখলাম, প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর রুমালে-নাক মুছে বললেন, হেভি মিস্ট্রি। ম্যাডামেরে জানানো উচিত। কিন্তু তার আগে আপনার লগেনসাল্ট করা দরকার। আমার মাথা বেবাক
গণ্ডগোল হইয়া গেছে।
আপনি কি আউট্রাম ঘাট থেকে আসছেন?
নাহ! ম্যাডাম নিষেধ করছিলেন। রিস্ক লই নাই!
তাহলে এখন আসছেন কোথা থেকে?
হালদারমশাই শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, গোবরায় মিস দত্তের ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটে সেই বুড়া সায়েবের লগে আলাপ করতে গিছলাম।
মিঃ গোমসের সঙ্গে?
হঃ! বব সম্পর্কে যদি কিছু স্পেশাল ইনফরমেশন পাই, তার কিলারেরে শনাক্তকরণে হেল্পফুল হইলে হইতে পারে। কী কন?
ঠিক বলেছেন। তারপর কী হলো বলুন?
শীত-সন্ধ্যার রাস্তায় যানবাহনের গর্জন এবং আমার গাড়ির চাপা গর্জনও কম নয়, হালদারমশাইয়ের সব কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম না। তবু যতখানি শুনতে পেলাম বা বুঝতে পারলাম, তা থেকে গোয়েন্দা ভদ্রলোকের একটা বিপজ্জনক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী দাঁড় করানো যায়।
হালদারমশাই শ্রীলেখা এন্টারপ্রাইজ থেকে বেরিয়ে বারকয়েক যানবাহন বদল করে গোবরা এলাকার ফ্ল্যাটে যখন পৌঁছান, তখন পাঁচটা বেজে গেছে। সবখানে আলো জ্বলে উঠেছে। উনি মিস্ এস দত্তের ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে অবাক হন। ফ্ল্যাটের তালা খোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে। দরজায় কান পেতে কারা কথা বলছে শুনতে পান। সন্দেহজনক ব্যাপার। প্যান্টের পকেটে রিভলভারের বাঁট চেপে ধরে ডোরবেলের সুইচ টেপেন হালদারমশাই।
দরজায় লুকিং গ্লাস ফিট করা আছে। তাই একটু সরে দাঁড়ান। দরজা একটু ফাঁক করে পুরুষকণ্ঠে কেউ বলে, হু ইজ ইট?
হালদারমশাই বলেন, আই হ্যাভ কাম ফ্রম দা পোলিস স্টেশন। প্লিজ ওপেন দা ডোর।
দরজা আরও ফাঁক করে একজন লোক তাকে দেখে নিয়ে বাংলায় বলে, কী ব্যাপার?
হালদারমশাই ইংরিজিতে বলেন, আমি ববের ব্যাপারে কথা বলতে চাই।
লোকটার পরনে টাই-স্যুট! চি এক কাঁচাপাকা দাড়ি। বয়স আন্দাজ পঞ্চাশের ওপারে। সে একটু ইতস্তত করে দরজার ভেতরকার চেন খুলে দিয়ে বলে, ঠিক আছে। ভেতরে আসুন।
হালদার তার চাউনি দেখেই বিপদ আঁচ করেছিলেন। ঘরে ঢুকে দরজায় পিঠ রেখে তিনি দ্রুত লোকটার গলার কাছে রিভলভারের নল ঠেকান। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের আলো নিভে যায়। তারপরই লোকটা তাকে এত জোরে ধাক্কা মারে তিনি মেঝেয় পড়ে যান। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে পালিয়ে যায়। অন্ধকার ঘর। হাঁটুতে চোট লেগেছিল। হালদারমশাই কোনও রকমে উঠে দাঁড়িয়েছেন, ঘরের দ্বিতীয় ব্যক্তি দরজা খুলে পালায়।
বাইরে করিডরের আলোয় তাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখেছেন হালদারমশাই। সে মেয়ে। পরনে ফুলস্লিভ সোয়েটার এবং জিনস। কাঁধ অব্দি ছাঁটা চুল।
ঘরের আলো যে সেই মেয়েটিই নিভিয়ে দিয়েছিল, তাতে হালদারমশাইয়ের কোনও সন্দেহ নেই।
দেয়াল হাতড়ে সুইচবোর্ড খুঁজে পেয়ে আলো জ্বালেন হালদারমশাই। তারপর তার মাথায় আসে, ওরা যদি নিচে গিয়ে ফ্ল্যাটে ডাকাত ঢুকেছে বলে লোক জড়ো করে, তিনি বিপদে পড়বেন। তাই ঘর থেকে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসেন।
ঘর সার্চ করার ইচ্ছা ছিল তার। তবে মেঝেয় পড়ে থাকা দলাপাকানো একটা কাগজ তিনি কুড়িয়ে এনেছেন।
কিন্তু না–ওরা লোক জড়ো করেনি। হালদারমশাই সংকীর্ণ রাস্তার ভিড়ে গা ঢাকা দিয়ে নিরাপদে রেলব্রিজের কাছে পৌঁছান এবং একটা খালি ট্যাক্সি পেয়ে যান।
লক্ষ্য করছিলাম, কর্নেল পকেট থেকে তার খুদে টর্চ বের করে কাগজটা পড়ছেন এবং হালদারমশাই নস্যি নিচ্ছেন।….
মিসেস ব্যানার্জির বাড়ির সামনে হর্ন দিতেই কুকুরের গর্জন এবং বদ্রীর সাড়া এল।
কর্নেলকে দেখতে পাওয়ার পর সে সেলাম দিয়ে গেট খুলে দিল। গাড়ি ভেতরে ঢোকালাম। বাড়িটা আজ যেন বেশি স্তব্ধ। বদ্রীনাথকেও মনে হলো অস্বাভাবিক গম্ভীর। সুরেনও মুখ তুম্বো করে আছে। পুতুলের মতো সেলাম দিল মাত্র। তারপর সে আমাদের দোতলায় নিয়ে গেল।
শ্রীলেখা করিডরে দাঁড়িয়েছিলেন। ক্ষুব্ধভাবে বলে উঠলেন, কর্নেল সরকার! আমি প্রতারিত হয়েছি। তবে এ জন্য আপনিও দায়ী। আপনি আজ আমাকে কেন মিথ্যা ভয় দেখিয়ে অফিসে উপস্থিত থাকতে বলেছিলেন, বুঝতে পারছি। আমি আজ বাড়িতে থাকলে কখনই এ সর্বনাশ হতো না। তাছাড়া আপনি এই ঘরটা আর লক করে রাখার দরকার নেই বলেছিলেন। লক করা থাকলে এমন সর্বনাশ কিছুতেই হতো না।
কর্নেল বললেন, কী সর্বনাশ হয়েছে মিসেস ব্যানার্জি? কম্পিউটারটা চুরি গেছে তো?
শ্রীলেখা চমকে উঠে বললেন, আপনি কী করে জানলেন?
কর্নেল পর্দা সরিয়ে যে ঘরে ঢুকলেন এবং কর্নেলের পেছনে আমরাও ঢুকলাম, সেই ঘরটা আমাদের পরিচিত। শান্তভাবে উনি সোফায় বসলেন। আমরাও বসলাম। শ্রীলেখা রুষ্টমুখে বললেন, চুরি যায়নি। দিনদুপুরে বাটপাড়ি করেছে। আমাকে আপনি এমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন যে মালতী বা সুরেনদের সতর্ক করার কথা চিন্তা করিনি। তা ছাড়া আমি অফিসে যাওয়ার পর সাংঘাতিক উড়ো ফোন, সুদেষ্ণা কিডন্যা
কর্নেল ওঁর কথার পর বললেন, কিন্তু আসলে সে কিডন্যাপড হয়নি। যাই হোক বুঝতে পারছি সুদেষ্ণা এসে কম্পিউটারটা আস্ত তুলে নিয়ে গেছে। সম্ভবত আমি এখানে একটা হারানো চাবি খুঁজতে আসার পর সে এসেছিল। তবে হ্যাঁ–কম্পিউটারটা চুরি যেতই। যে-কোনও দিনই যেত।
শ্রীলেখা তীক্ষ্ণদৃষ্টে কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, দেন ইউ নো ইট!
কর্নেল হাসলেন। এ বাড়িতে সুদেষ্ণার গতিবিধি অবাধ। আপনার বিশ্বস্ত পি এ।
আমি কল্পনাও করিনি সে এমন কিছু করবে। শ্রীলেখার কণ্ঠস্বর ভেঙে গেল উত্তেজনায়। সে এসে মালতাঁকে বলে, অফিস থেকে আসছে। জয়দীপের কম্পিউটারটা আমি নাকি তাকে নিয়ে যেতে বলেছি। ফ্যাক্টরিতে পাঠাতে হবে। কম্পিউটারটা গণ্ডগোল করছে। মালতীর অবিশ্বাসের কারণ ছিল না। বজ্জাত মেয়েটা কম্পিউটারটা খোলে। সুরেনকে ওটা গাড়িতে পৌঁছে দিতে বলে। হাল্কা মেশিন।
গাড়িটা সুরেন দেখেছে তাহলে? কী গাড়ি?
সাদা রঙের মারুতি! আমার গাড়িটাও সাদা মারুতি।
গাড়িতে কেউ ছিল?
না। সুদেষ্ণা ড্রাইভিং জানে। কাজেই সুরেনের সন্দেহের কারণ ছিল না।
আপনি কি বাড়ি ফিরে দেখলেন কম্পিউটার নেই?
হ্যাঁ। ওটা নেই দেখেই চমকে উঠেছিলাম। তারপর মালতাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। শ্রীলেখা দুহাতে মুখ ঢেকে কান্না সম্বরণ করে বললেন, আমি এত বোকা! অনীশের চিঠিটা দেখার পর আমার সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আপনি আমাকে মিসলিড করলেন। কেন কর্নেল সরকার?
কর্নেল চুরুট বের করে বললেন, এ ঘরে এখন ধুমপান করা যায়। তারপর চুরুট ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে ফের বললেন, মিসেস ব্যানার্জি! আপনার বিচলিত হবার কারণ নেই। কম্পিউটারের দুটো গোপন তথ্যই আমি আপনার অগোচরে মুছে নষ্ট করে দিয়েছিলাম। দুটো তথ্যই আমার কাছে আছে। তো আপনি ঘড়িটা যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন কি?
দিয়েছি। শেখর নামে আমার এক কর্মচারীকে আউট্রাম ঘাটে পাঠিয়েছিলাম। শেখর ফিরে এসে বলল, লালরঙের মোটরসাইকেল নিয়ে
জাস্ট এ মিনিট। বলে কর্নেল পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে শ্রীলেখাকে দিলেন। দেখুন তো মিসেস ব্যানার্জি! সি এস সিনহা নামে আপনার কোনও কর্মচারী আছেন কি না?
শ্রীলেখা চমকে উঠে বললেন, এ তো শেখরের কার্ড। তার নাম চন্দ্রশেখর সিনহা। জয় তাকে শেখর বলতো, আমিও বলি। কিন্তু আপনি ওর কার্ড কোথায় পেলেন? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
পারবেন। এবার আমাকে অনীশ রায়ের চিঠিটা দেখান।
শ্রীলেখা আলমারি খুলে একটা ব্রিফকেস বের করলেন। ব্রিফকেস খুলে একটা এয়ারোগ্রাম লেটার বের করে কর্নেলকে দিলেন। সেটার ওপর বিদেশি টিকিট ছাপানো। কর্নেল নিবিষ্ট মনে চিঠিটা পড়র পর বললেন, হু। আপনার স্বামী অনীশবাবুর চিঠির মর্ম বুঝতে পারেননি। তাই আপনাকে ভুল বুঝেছিলেন। মিঃ ব্যানার্জি ভেবেছিলেন আপনি ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেছেন। তা না হলে জনৈক বি আর সোমকে অত পাত্তা দেবেন কেন? কিন্তু কে এই ভদ্রলোক?
শ্রীলেখা উত্তেজিতভাবে বললেন, ফরেন ট্রেড কনসালট্যান্ট। ওঁকে অনীশের প্রতিদ্বন্দ্বী বলতে পারেন! ওঁর সম্পর্কে অনীশের রাগ থাকতেই পারে। অনীশের ফার্ম মিঃ সোমের ফার্মের সঙ্গে কমপিটিশনে টিকতে পারেনি। কিন্তু আমার আশ্চর্য লাগছে, জয় তো মিঃ সোমের পরামর্শেই চলত। কাজেই আমি ওঁকে পাত্তা দিয়েছি। অবশ্য পাত্তা বলতে কখনও-সখনও কোনও বড় হোটেলে ওঁর পার্টিতে যাওয়া। জয়ও গেছে। আবার কখনও তার কোনও জরুরি কাজ থাকলে আমাকে একা যেতে বলেছে। ইভ হি ইনসিস্টেন্ মি টু অ্যাটেন্ড।
মিঃ সোমের ফার্ম কোথায়?
যে বাড়িতে আমার কোম্পানি-অফিস, সেই বাড়িতেই। আমার অফিস সিক্সথ ফ্লোরে। মিঃ সোমের অফিস সেকেন্ড ফ্লোরে।
ওঁর সঙ্গে টেলিফোনে এখন যোগাযোগ করা যায়? আই মিন, ওঁর বাড়িতে?
মিঃ সোম এখন জাপানে। গত সপ্তাহে গেছেন। ফিরবেন জানুয়ারির মাঝামাঝি। শ্রীলেখা কর্নেলের দিকে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড পরে ফের বললেন, আপনি ওঁর সম্পর্কে আগ্রহী কেন কর্নেল সরকার?
কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে দুটো কাগজ বের করে বললেন, যে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবকটি খুন হয়েছে, তার নাম বব। হা–আপনার। পি. এ.র বয়ফ্রেন্ড। এটা তারই হাতের লেখা। এতে বি আর সোম এবং তার বাড়ির ঠিকানা লেখা আছে। আর এই দলপাকানো কাগজটা আপনার কর্মচারী। শেখরের চিঠি। সে সুদেষ্ণাকে লিখেছে, মিঃ সোম এই চিঠি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন। শেখর না যাওয়া পর্যন্ত যেন দুজনে অপেক্ষা করে। যদি ইতিমধ্যে কোনও গণ্ডগোল হয়, তা হলে মিঃ সোম সুদেষ্ণাকে নিয়ে তার বাড়িতে চলে যাবেন। জিনিসটা শেখরের কাছে আছে। কাজেই সুদেষ্ণার কোনও দ্বিধার কারণ নেই। সে যেন মিঃ সোমের সঙ্গে তার বাড়ি চলে যায়। অবস্থা বুঝে শেখর জিনিসটা নিয়ে সেখানেই যাবে এবং চূড়ান্ত মীমাংসা হবে।
শ্রীলেখার বিস্মিত দৃষ্টে তাকিয়েছিলেন। বললেন, কিছু বুঝতে পারছি না।
এই সময় মালতী কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে আনল। ট্রে রেখে সে চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন, মিঃ সোমের মুখে দাড়ি আছে কি?
শ্রীলেখা বললেন, না তো! কেন?
হালদারমশাই বলে উঠলেন, বুঝছি! হা– সামলে নিয়ে ফের বললেন, নকল দাড়ি জানলে আগে তার দাড়িতে টান দিতাম। ঘুঘু দেখেছে, ফান্দ দেখে নাই।
শ্রীলেখা ক্লান্তভাবে বললেন, আপনারা কফি তৈরি করে নিন প্লিজ!
একটু পরে কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, চিয়ার আপ মিসেস ব্যানার্জি! শেষ অব্দি আপনিই জিতে গেছেন। আপনার প্রতিপক্ষ এখন হা হুতাশ করছে। কারণ কম্পিউটারের গোপন ডেটা আমি মুছে নষ্ট করে দিয়েছি।
শ্রীলেখার মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে আঠল। আপনি কি সব কথা খুলে বলবেন?
বলব। আগে একটা অপ্রিয় প্রশ্নের সঠিক উত্তর চাই। তা হলে একটা পয়েন্ট পরিষ্কার হবে।
বলুন!
দুমাস ধরে সুদেষ্ণা আপনার পি এর কাজ করছে। তার আগে সে আপনারবরং বলা উচিত, আপনাদের কোম্পানি-অফিসে স্টেনো-টাইপিস্ট ছিল। আপনি আমাকে বলেছেন, মিঃ ব্যানার্জিই তাকে আপনার পি এ হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তাই কি? নাকি আপনিই তাকে চেয়েছিলেন?
শ্রীলেখা আস্তে বললেন, আমিই তাকে চেয়েছিলাম।
এর বিশেষ কারণ ছিল কি?
ছিল। জয়কে মেয়েটা পেয়ে বসেছিল। ওর প্রতি জয়ের দুর্বলতা আমার চোখ এড়ায়নি। জয় ওকে কম্পিউটার ট্রেনিং দিচ্ছিল। শ্রীলেখা মুখ ঘুরিয়ে জোরে শ্বাস ফেলে বললেন থাক। ও সর কথা বলতে রুচিতে বাধে। শি ওয়াজ এ ন্যাস্টি গার্ল।
তাই আপনি সুদেষ্ণাকে চোখে-চোখে রাখতে চেয়েছিলেন?
হ্যাঁ।
তাহলে পয়েন্টটা পরিষ্কার হলো। সম্ভবত কোনও এমোশনাল অবস্থায় মিঃ ব্যানার্জি সুদেষ্ণাকে এমন গোপন কথা জানিয়ে ফেলেছিলেন, যা তাকে লোভী করে তুলেছিল। কিন্তু সে একা কাজে নামতে সাহস পায়নি। তা ছাড়া রোমার ঘড়িটাও দরকার ছিল। আপনি কোনও রোমার ঘড়ি আপনার স্বামীর কাছে দেখেননি। তার মানে, মিঃ ব্যানার্জি সেই ঘড়িটা সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন।
শ্রীলেখা আবার রুষ্ট হলেন। কর্নেল সরকার! আগেও আপনাকে বলেছি, জয়ের অনেক ঘড়ি ছিল। স্বামী কখন কোন ঘড়ি হাতে পরছে, কোনও স্ত্রী তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।
ঠিক, ঠিক। কর্নেল সায় দিলেন। তবে অনীশ রায়ের চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে, মিঃ সোমের মতো ঝানু লোকের সঙ্গে আপনার মেলামেশায় আপনাকে ভুল সন্দেহ করেছিলেন মিঃ ব্যানার্জি। আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কারণ–
কর্নেল হঠাৎ থেমে গেলে শ্রীলেখা তীব্র কণ্ঠে বললেন, কারণ? কর্নেল সরকার! উইল ইউ প্লিজ এক্সপ্লেন মি?
জুয়ে্লস্ মিসেস ব্যানার্জি! এ বাজারে যার দাম প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।
জুয়েলস্! শ্রীলেখা চমকে উঠলেন। কী বলছেন আপনি!
হ্যাঁ। চোরাই হীরে। আপনার শ্বশুরমশাইয়ের ঘড়ির ব্যবসা ছিল। জাপান থেকে তিনি ঘড়ি আমদানি করতেন। একটা দেয়ালঘড়ির ভেতর একজন কুখ্যাত স্মাগলার হীরে পাচার করেছিল। ঘড়িটা যখন সুশোভনবাবুর কাছে পৌঁছেছে, তখন লোকটা অন্য একটা স্মাগলিং কেসে ধরা পড়ে যায়। পাঁচ বছর জেলে কাটিয়ে সে যখন মুক্তি পায়, তখন সুশোভনবাবুর সুদক্ষিণা ওয়াচ কোম্পানি উঠে গেছে এবং তিনিও মারা গেছেন। তার ছেলে জয়দীপ কম্পিউটার ট্রেনিং নিয়ে কম্পিউটার তৈরির কারবারে নামার প্ল্যান করছেন। তিনি এ বাড়ির একটা অচল দেয়ালঘড়ির ভেতর হীরেগুলোর সন্ধান পান। হা–তার বাবা মৃত্যুর আগে নার্সিংহোমে থাকার সময় গোপনে তাকে এ বিষয়ে আভাস দিয়েছিলেন। আর মিসেস ব্যানার্জি! সেই কুখ্যাত স্মাগলারের নাম বিমলারঞ্জন সোম অর্থাৎ বি আর সোম। জয়দীপ ব্যানার্জি তাই তাকে সমীহ করে চলতেন। এমন ভাব দেখাতেন, যেন সোমের আসল পরিচয় তার জানা নেই।…
