কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
পাঁচ
নিচের রাস্তায় এসে কর্নেল বললেন, তুমি গাড়িতে অপেক্ষা করো। আমি এখনই আসছি।
সেই ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে যাচ্ছেন তো?
হ্যাঁ। বলে কর্নেল রাস্তার ভিড়ের মধ্যে উধাও হলেন। কোথাও হয়তো যানজট বেধেছে। তাই এখন রাস্তায় ঠেলা, রিকশা, টেম্পো, ট্রাক আর মানুষজনের অচল ঠাসাঠাসি অবস্থা। আমার গাড়িকে পেছন থেকে শাসাচ্ছে কারা। ফুটপাত নেই। অগত্যা একটা পাঁচিলের পাশে গাড়ি সরিয়ে নিয়ে গেলাম। এবার বুঝলাম কেন কর্নেল আমাকে গাড়িতে বসে থাকতে বলে গেলেন।
কর্নেল ফিরলেন মিনিট দশেক পরে। ততক্ষণে ভিড় একটু সচল হয়েছে। বললেন, আবার আমাদের মিসেস ব্যানার্জির বাড়ি যেতে হবে। জ্যামের জন্য একটু দেরি হবে। কিন্তু উপায় কী?
সাবধানে ড্রাইভ করছিলাম। সদ্য কিছুদিন আগে গাড়ির বডি পালিশ করিয়েছি। ঠেলাবোঝাই লম্বা লম্বা লোহার রড যেভাবে পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে, একটু ছড়ে গেলেই আবার একগাদা টাকা খরচ। বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। ক্রমশ। কর্নেল যেন তা টের পেয়ে বললেন, কলকাতার এই অংশটার সঙ্গে বড়বাজারের অলিগলির তুলনা করে তুমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় একটা রিপোর্টাজ লিখতে পারো। এখানে কিন্তু সত্যি আর একটা বড়বাজার গজিয়ে উঠছে। তোমার কেমন একটা অভিজ্ঞতা হলো বোঝো জয়ন্ত!
হেসে ফেললাম। সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা!
হ্যাঁ। সাংঘাতিকই বটে। কর্নেল চুরুট ধরালেন। ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির মালিক ভদ্রলোক বলছিলেন, তিন বছর আগেও এরিয়ায় এত মানুষজন ছিল না। বস্তিও ছিল না অত। মোটামুটি ফাঁকা জায়গা ছিল। তাই এখানে ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির অফিস খুলেছিলেন। এখন অন্য কোথাও সরে যাবার চেষ্টা করছেন।
ববের মোটরসাইকেলের হদিস পেলেন কি না বলুন?
পেয়েছি। মালিকের এক ছেলের নাম সেলিম আখতার। বব তার নাকি জিগরি দোস্ত। মাঝে মাঝে সেলিম তার মোটরসাইকেল ববকে ব্যবহার করতে দেয়। গতকাল বিকেলেও দিয়েছিল। তারপর ববের পাত্তা নেই। গতরাতে ববের স্ত্রী-হ্যাঁ, সবাই জানে সুসান ডাট্টা ববের স্ত্রী–তো সেলিম খোঁজ নিতে গেলে বলেছে, কোনও কোনও রাতে বব রিপন স্ট্রিটে ওর আত্মীয়ের বাড়িতে থাকে। সকালে সেলিম গোমস্ সায়েবের কাছে গিয়ে শোনে, ববের স্ত্রী ভোরে বেরিয়েছে। এটা স্বাভাবিক। বেলা দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে সেলিম গেছে রিপন স্ট্রিটে। আমি তার বাবাকে আমার নেমকার্ড দিয়ে এলাম। ববের খোঁজ পেল কি না আমাকে যেন রিং করে জানায়।
আপনি কি ভদ্রলোকের কাছে ববের খোঁজ করছিলেন?
তা আর বলতে? বললাম, বব আমার কাছে টাকা ধার করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সেলিমের বাবা জাভেদ সাহেব বললেন, ববকে টাকা ধার দেওয়া উচিত হয়নি। তার ধারণা, বব সাট্টা জুয়া খেলেটেলে। সেলিম ওর পাল্লায় পড়ছে। কিন্তু আজকাল ছেলেরা বাবাকে গ্রাহ্য করে না।
আপনি আসল কথাটা বললেই পারতেন।
কর্নেল আস্তে বললেন, ববের রিপন স্ট্রিটের ঠিকানাটা আমার দরকার।
মিসেস ব্যানার্জির বাড়ির গেটের কাছে হর্ন বাজালাম। বদ্রীনাথ দৌড়ে এসে সেলাম দিল। কর্নেলকে বলল, মেমসাব অফিসে আছেন স্যার! আপনি চলে গেলেন। তার একটু পরে মেমসাব চলে গেলেন।
কর্নেল বললেন, বদ্রী! তোমরা কি বাগানে বা পাঁচিলে রক্তের ছাপগুলো ধুয়ে ফেলেছ?
হ্যাঁ স্যার! মেমসাব বলেছিলেন ধুয়ে সাফ করতে। আমি আর সুরেন সব সাফ করেছি।
তোমরা ওখানে কোনও চাবি কুড়িয়ে পাওনি?
বদ্রী অবাক হয়ে বলল, না স্যার।
একটা চাবি ওখানে কোথাও পড়ে থাকা উচিত। বলে কর্নেল গাড়ি থেকে নামলেন। জয়ন্ত! আমি এখনই আসছি।
কর্নেল বদ্রীর সঙ্গে প্রাঙ্গণের ছোট্ট বাগানে ঢুকে গেলেন। অ্যালসেশিয়ান কুকুরটার গজরানি শোনা গেল। সুরেনেরও সাড়া পেলাম। তারপর দোতলার ব্যালকনিতে মালতাঁকে দেখা গেল। সে বলল, কী হয়েছে বদ্রী?
সুরেনের গলা শোনা গেল। কর্নেলসায়েব গত রাতে এখানে চাবি ফেলে গেছেন।
মালতী অদৃশ্য হলো। আমি ভেবে পেলাম না কর্নেল ওখানে চাবি ফেলে গেছেন কী করে? ওই ধরনের ভুল তার কখনও হয় না। তা ছাড়া চাবি টাবি ওঁর পকেটে থাকার কথা। ওখানে গতরাতে চাবি বের করেছিলেন কেন? চাবিটাই বা কিসের?
প্রায় আধঘণ্টা পরে কর্নেল ফিরে এলেন। তার পেছনে সুরেন ও বদ্রী ছিল। দুজনের মুখেই স্বস্তির নিঃশব্দ হাসি। কর্নেল গাড়িতে ঢুকে বললেন, হাত থেকে ছিটকে ঘাসের ভেতরে পড়েছিল চাবিটা! চলো, বাড়ি ফেরা যাক। খিদে পেয়েছে।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললাম, আপনি ওখানে কাল রাতে চাবি বের করেছিলেন কেন?
আমি না। হতভাগ্য বব।
বব? ববের চাবি?
কর্নেল একটু পরে বললেন, গোমস্ সায়েবের কথা শুনে তোমার বোঝা উচিত ছিল, ববের কাছে সুসান ওরফে সুদেষ্ণার ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি থাকত। অন্তিম মুহূর্তে বেচারা ঘড়ি এবং চাবি দুটোই মিসেস ব্যানার্জির হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। মিসেস ব্যানার্জি ঘড়িটা নেন। কিন্তু চাবিটা ববের হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল।…
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে দিয়ে ষষ্ঠীচরণ বলল, হালদারমশাই ফোং করেছিলেন। তারপর কী যেন নাম, মেয়েছেলে বাবামশাই!
কর্নেল যথারীতি চোখ কটমটিয়ে বললেন, মিসেস ব্যানার্জি?
আজ্ঞে। পেটে আসছিল, মুখে আসছিল না।
তোর দাদাবাবুকে নেমন্তন্ন কর!
ষষ্ঠী হাসল। করাই আছে। সব রেডি।
বললাম, কর্নেল! নেমন্তন্ন না হয় খাওয়া গেল। কিন্তু আজ অফিসে যেতেই হবে।
কর্নেল ষড়যন্ত্রসঙ্কুল কণ্ঠস্বরে বললেন, ফোন করে জানিয়ে দাও, একটা দুর্দান্ত স্টোরির জন্য নিজেকে লড়িয়ে দিয়েছ। আর ডার্লিং! আমরা এবার একটা প্রচণ্ড নাটকীয় অবস্থার মুখোমুখি এসে গেছি। এখন প্রতিটি মুহূর্তে চমক, শুধু চমক!
উনি টুপি খুলে রেখে টাকে হাত বুলিয়ে টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। ডায়াল করার পর বললেন, শ্রীলেখা এন্টারপ্রাইজ? আমি মিসেস শ্রীলেখা ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলতে চাই।…বলুন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার কথা বলবেন।…মিসেস ব্যানার্জি! আপনি ফোন করেছিলেন….হ্যাঁ। আমি ঠিক এটাই আশঙ্কা করেছিলাম।…ঠিক আছে আপনি ঘড়িটা ওদের কথামতো জায়গায় ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দিন …না। ঘড়িটা একটা প্রাণের চেয়ে মূল্যবান নয়।…আমি বলছি, আপনি আপনার পি এ-কে বাঁচান। কেন বলছি, তা যথাসময়ে জানাব।…ঠিক আছে। অনীশ রায়ের চিঠিটা আমার পরে দেখলেও চলবে।…অফিস থেকে কখন বেরুবেন?…ও কে! আমি তাহলে কালকের মতো সন্ধ্যা ৭টায় আপনার বাড়িতে যাব। উইশ ইউ গুড লাক। ছাড়ছি।
কর্নেল ফোন রেখে আমার দিকে তাকালেন। বললাম, সুদেষ্ণা কিডন্যা?
হ্যাঁ। কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, একটু আগেই বলছিলাম এবার শুধু চমকের পর চমক।
আমি বলেছিলাম নিশ্চয় সুদেষ্ণার কোনও বিপদ হয়েছে। আপনি পাত্তা দেননি।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, কিডন্যাপারদের এটাই চিরাচরিত পদ্ধতি। রোমার ঘড়িটা ঠিক সাড়ে পাঁচটায় আউট্রাম ঘাটের সামনে পৌঁছে দিতে হবে। সেখানে মোটরসাইকেলের পাশে কালো জ্যাকেট পরা একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকবে। তার মাথায় মাংকি ক্যাপ। পুলিশ বা গোয়েন্দা তাকে পাকড়াও করলে মিসেস ব্যানার্জির পি-এর শ্বাসনালী কাটা যাবে।
কিন্তু ঘড়ি পেয়ে তো ওদের আর লাভ হবে না। আপনি জয়দীপের কম্পিউটারে দুটো ডেটাই মুছে নষ্ট করে দিয়েছেন!
দিয়েছি।
তা না দিলেও মিসেস ব্যানার্জির বাড়ি থেকে ওই কম্পিউটার চুরি অসম্ভব কাজ।
ঠিক বলেছ। তবে কিডন্যাপারদের বিশ্বাস আছে, সেই অসম্ভবকে তারা সম্ভব করতে পারবে। কিন্তু মূল দুটো প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। জয়দীপের গোপন তথ্যের প্রারম্ভিক কি ওয়ার্ডস ছিল ব্রেড। বব কী করে তা টের পেয়েছিল? দ্বিতীয় মূল প্রশ্ন : বব কি করে জানল জয়দীপের হাতে বাঁধা নীল ডায়াল রোমার ঘড়িরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে?
একটু ভেবে বললাম, সুদেষ্ণা ববকে জানিয়ে থাকবে।
তা হলে প্রশ্ন আসছে, মিসেস ব্যানার্জি যা জানেন না, তা সুদেষ্ণা কী করে জেনেছিল?
ওঃ কর্নেল! হালদারমশাইয়ের মতো আমার মাথাও গণ্ডগোলে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
কর্নেল হাসলেন। কাল থেকে তুমি স্নান করোনি। আজ স্নান করে নাও। মাথা ঠাণ্ডা হবে।
স্নান করে শরীর ঝরঝরে হয়ে গেল এবং মাথাও এবার ঠাণ্ডা। খাওয়ার টেবিলে কর্নেল কথা বলার পক্ষপাতী নন। ওঁর মতে, খাওয়ার সময় কথা বললে খাদ্যের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। হজমে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং খাদ্য শ্বাসনালীতে আটকে যাওয়ার আশঙ্কাও নাকি আছে।
প্রথাভঙ্গ মাঝেমাঝে অবশ্য উনি নিজেই করেন। আজ করলেন। বললেন, তুমি যখন বাথরুমে ছিলে, সেই সেলিম আখতার ফোন করেছিল। জানতে চাইছিল কী ব্যাপার। তো আমি বললাম, রিপন স্ট্রিটে ববের আত্মীয়ের ঠিকানা দিলে আমি তাকে তার মোটরসাইকেলের খবর দেব। গিভ অ্যান্ড টেক। সেলিম ঠকানা দিল। আমি বললাম, তুমি কড়েয়া থানায় চলে যাও। সেখানে তোমার মোটরসাইকেল আছে।
বললাম, ববের আত্মীয়ের ঠিকানা নিয়ে কী করবেন? বব ইজ ডেড।
ববের জীবনের ব্যাকগ্রাউন্ড যদি পেয়ে যাই? ববকে আমার জানা খুবই দরকার। তাহলে তার অদ্ভুত আচরণের অর্থ বোঝা যাবে।
আর কোনও প্রশ্ন করলাম না। খাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে গিয়ে ভাতঘুমের জন্য তৈরি হচ্ছি, কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! আড়াইটে বাজে। আমরা বেরুব। মৃত বব আমাকে উত্ত্যক্ত করছে।
রিপন স্ট্রিটে যাবেন?
হ্যাঁ। তবে পায়ে হেঁটে যাব। রিপন স্ট্রিট এখান থেকে শর্টকাটে পাঁচমিনিটের পথ। ওঠ।
বাড়িটা রিপন স্ট্রিটের ওপর নয়। একটা সংকীর্ণ গলির মুখে দোতলা পুরনো বাড়ি। নিচের তলায় যারা থাকে, তাদের কেমন যেন সন্দেহজনক হাবভাব। তাদের চাউনি অস্বস্তিকর। গাউনপরা স্থূলাঙ্গী এক মহিলা বুকের কাছে একটা সাদা কুকুর নিয়ে অপরিসর বারান্দায় বসেছিলেন। কর্নেলকে দেখে ইংরেজিতে বলনে, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?
কর্নেল বললেন, বব নামে এক যুবক আমাকে এই ঠিকানা দিয়েছিল।
ভদ্রমহিলা বাঁকা হেসে বললেন, ববের খোঁজে প্রায়ই এখানে হোমরাচোমরা লোকেরা আসে। শুনলাম কাল সে একজনের মোটরসাইকেল চুরি করে পালিয়েছে। আপনার কী নিয়েছে?
টাকা।
পুলিশের কাছে যান! ববকে এখানে খুঁজে পাবেন না।
ববের ঘরে কি তালা দেওয়া আছে।
দিশি মেমসায়েব পুরুষালি ভঙ্গিতে সশব্দে বিকট হাসলেন। ববের ঘর! চালচুলোহীন বাউণ্ডুলে!
তাহলে এখানে সে কার কাছে থাকত?
ওই সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যান। ববের খুড়ি লিজাকে জিজ্ঞেস করুন। বব কী তা জানতে পারবেন। তবে সে আপনার সঙ্গে দেখা করবে কি না বলতে পারছি না।
দুজনে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে গেলাম। ফ্ৰকপরা এক বালিকা হাঁ করে কর্নেলকে দেখছিল। চাউনি দেখে মনে হলো, খ্রিসমাস ইভে সে স্বয়ং ফাদার খ্রিসমাসকে দেখছে যেন। কর্নেল মিষ্টি হেসে তার হাতে কয়েকটা চকোলেট গুঁজে দিলেন। আড়ষ্টভঙ্গিতে সে নিল। কর্নেল বললেন, আন্টি লিজার ঘর কোনটা?
সে আঙুল তুলে ঘরটা দেখিয়ে দিল। ঘরের রজায় পর্দা ঝুলছে। টানা বারান্দায় একদল ছেলেমেয়ে রঙিন কাগজ সুতোয় বেঁধে টাঙাতে ব্যস্ত। খ্রিসমাসের প্রস্তুতি। তারা আমাদের গ্রাহ্য করল না। কর্নেল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আন্টি লিজার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
দরজার পর্দা সরিয়ে রোগা প্রৌঢ়া রুক্ষ চেহারার এক মেমসাহেব উঁকি দিলেন। কর্নেল এবং আমাকে দেখে নিয়ে শীতল কণ্ঠস্বরে বললেন, আপনারা যদি ববের খোঁজে এসে থাকেন, আমি দুঃখিত, সে এখানে আর থাকে না। গোবরা এলাকায় থাকে শুনেছি। তার সম্পর্কে আর কিছু জানি না।
কর্নেল আস্তে বললেন, আমিও দুঃখিত মিসেস লিজা
আমি লিজা হেওয়ার্থ!
মিসেস লিজা হেওয়ার্থ! ববের একটা শোচনীয় দুঃসংবাদ দিতে আমি এসেছি।
ববকে পুলিশ ধরেছে? ওটা কিছু নয়।
না। সে খুন হয়েছে।
লিজা মুহূর্তে বদলে গেলেন। মুখের রুক্ষ শীতলতা গলে গেল। দরজার পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালেন। ভাঙাগলায় বলে উঠলেন, ও জেসাস! তাহলে সত্যি ওরা ববকে মেরে ফেলল?
মিসেস হেওয়ার্থ! আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে আমি কিছু কথা বলতে চাই।
কান্না সামলে লিজা বললেন, ভেতরে আসুন।
ঘরে আলো জ্বলছে। একপাশে খাট। অন্যপাশে জীর্ণ সোফাসেটে নতুন কভার চাপানো আছে। পাশাপাশি ছোট্ট কিচেন এবং বাথরুমের দরজা দেখতে পেলাম। কোণে একটা টুলের ওপর ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ভাস্কর্য। দুটো পুরোনো আলমারি। খাটের পাশে কিচেনের দরজার কাছাকাছি ছোট্ট ডাইনিং টেবিল এবং একটা চেয়ার। বেশ পরিচ্ছন্ন করে সাজানো ঘর। দেয়াল জুড়ে বাঁধানো অনেকগুলো ফটো ঝুলছে। হঠাৎ চোখে পড়ল ফ্রেমে বাঁধানো এক টুকরো সাদা কাপড়ে এমব্রয়ডারি করা একটা বাক্য; ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন। মনে পড়ল, কর্নেল বলেছেন ওটা যিশু খ্রিস্টের বিখ্যাত বাণী। কিন্তু এই বাণীর অন্য একটা পরিপ্রেক্ষিত আছে। আমি বিস্মিত দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম।
লিজা চোখ মুছে বললেন, ববকে কোথায় ওরা খুন করেছে? গোবরায় সেই বাঙালি মেয়েটির বাড়িতে?
কর্নেল বললেন, না। গত রাতে সার্কাস অ্যাভেনিউ এলাকায় তাকে ছুরি মেরে খুন করা হয়েছে। আপনার বেশি সময় নেব না। আপনার এখানে টেলিফোন আছে?
ছিল। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আর রাখতে পারিনি।
আপনি যে ভাবে হোক, কড়েয়া থানার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। ববের বডি এখনও মর্গে আছে। আপনি গিয়ে শনাক্ত করার পর বডি শেষকৃত্যের জন্য চাইবেন। তো আমার কয়েকটা কথার জবাব দিন। কারা ববকে খুন করেছে বলে আপনি মনে করেন?
প্রায় এক সপ্তাহ আগে একটা লোক এসে ববকে খুঁজছিল। আমাকে হুমকি দিয়ে গেল, ববকে যেন বলি, সে তার সঙ্গে দেখা না করলে প্রাণে মারা পড়বে। লোকটা বাঙালি। ববের বয়সী। তাকে এই বাড়িতে আগেও ববের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। তাকে দেখলে চিনতে পারব।
তারপর বব কি আপনার কাছে এসেছিল?
দুবার এসেছিল। আমি ওকে লোকটার কথা বলেছিলাম। বব গ্রাহ্যই করল না।
সেই লোকটা আর এসেছিল আপনার কাছে?
না। আমি তাকে আর দেখিনি।
ববের আসল নাম কী?
বব। ওর বাবা আমার স্বামীর মাসতুতো ভাই। স্যাম হেওয়ার্থ। স্যাম রেলে চাকরি করত। ববের ছবছর বয়সে ওর মা রোজি একটা লোকের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। স্যাম ববকে আমার কাছে রেখেছিল। তখন আমার স্বামী ডানলপ কোম্পানিতে চাকরি করত। ববকে আমিই মানুষ করেছি। আমাদের সন্তান ছিল না। তারপর স্যাম আত্মহত্যা করেছিল। হতভাগা বব!
লিজা আবার কেঁদে উঠলেন। কর্নেল তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, বব কি কোথাও চাকরি করত?
খেয়ালি ছন্নছাড়া স্বভাবের ছেলে। কোথাও বেশিদিন কাজ করার মেজাজ ছিল না ওর। আসলে বড্ড জেদি প্রকৃতির ছিল। মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যেত কোথায়। তারপর হঠাৎ চলে আসত।
কর্নেল ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়ালেন। আপনি এখনই কড়েয়া থানায় যান। আমার এই নেমকার্ডটা থানায় দেখিয়ে বলবেন, আমিই আপনাকে পাঠিয়েছি। সম্ভব হলে সঙ্গে কাউকে নিয়ে যাবেন। আচ্ছা, চলি!…।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বললাম, দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো কথাগুলো দেখেছেন?
কর্নেল অনমনস্কভাবে বললেন, দেখেছি। তবে ওসব নিয়ে এখন ভাবছি না। ফিরে গিয়ে সুসান ওরফে সুদেষ্ণার ফ্ল্যাটের দিকে ছুটতে হবে।
সেই দম আটকানো রাস্তায়? সর্বনাশ!
কারও সর্বনাশ কারও পৌষমাস। পুরনো বাংলা প্রবচন। তাছাড়া এখন সত্যিই পৌষমাস চলেছে। ক্যালেন্ডার দেখতে পারো।
কর্নেলের রসিকতা কানে নিলাম না। গোবরা এলাকার সেই ফ্ল্যাটের কথা ভাবছিলাম। কর্নেল যেন বড় বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন।
বাড়ির গেটে পৌঁছে কর্নেল বললেন, এক পেয়ালা কফির ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সময় কম। ওপরে উঠছি না। তুমি গাড়িটা এখানে নিয়ে এস।
হঠাৎ সেই সময় পের্টিকোর দিক থেকে হন্তদন্ত ছুটে এলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই। বললেন, নিচে ওয়েট করছিলাম। ষষ্ঠী কইল, বাবামশাই জয়ন্তবাবুরে লইয়া গেছেন। এদিকে আমার হাতে টাইম কম।
কর্নেল বললেন, চলুন। গাড়িতে যেতে যেতে সব শুনব। আপনি ফোন করেছিলেন। ষষ্ঠী বলেছে আমাকে।
আগে জিগাই, যাবেন কই? ম্যাডামের বাড়ি তো?
নাহ্। গোবরা এরিয়ায় যাব।
হালদারমশাই লম্বা মানুষ। যেন আরও লম্বা হয়ে গেলেন। গোঁফ কাঁপতে থাকল। বললেন, গোবরা এরিয়ায়? কী কাণ্ড। জাস্ট নাও আই অ্যাম কামিং ফ্রম দ্যাট প্লেস। মোটরভেহিকল্স্ অফিসে আমার ভাগনা আজ আসে নাই। তাই এত দেরি। নাম্বার দিয়া নাম-ঠিকানা পাইলাম তখন বেলা প্রায় বারোটা। পাবলিক বুথে গিয়া আপনারে ফোন করলাম। পাইলাম না।তখন কড়েয়া থানায় গেলাম। নিজের কার্ড দেখাইলাম। এক পুলিশ অফিসার ধমক দিয়ে কইলেন, আপনারে গত রাত্রে মিসেস ব্যানার্জির বাড়ি দেখছিলাম না?
হালদারমশাই খি, খি করে হেসে উঠলেন। কর্নেল বললেন, তা হলে আপনি পুলিশের সঙ্গে সেলিম আখতারের কাছে গিয়েছিলেন?
আঁ? আপনি অরে চিনলেন ক্যামনে?
পুলিশ কি সেলিমকে অ্যারেস্ট করেছে?
থানায় লইয়া গেছে। তবে সেলিম ভিকটিমের বডি শনাক্ত করছে। ভিকটিমের নাম–
কর্নেল বললেন, বব। কিন্তু পুলিশ কি ববের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল?
হালদারমশাই আরও অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, গিছল। কিন্তু নেমেপ্লেটে লেখা ছিল
মিস এস দত্ত। পুলিশ কি তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে সার্চ করেছে?
নাহ্ কর্নেলস্যার! পাশের ফ্ল্যাটের এক বুড়াকী য্যান তার নাম—
গোমস্।
হঃ। গোমস্ বুড়া কইল, বব মিস এস দত্তের রিলেটিভ। মাঝেমাঝে আসে বব থাকে রিপন স্ট্রিটে। বুড়া সেলিমেরে ধমক দিল, ইউ নো হিজ অ্যাড্রেস। হোয়াই ইউ আর নট গিভিং ইট টু দা পোলিস? তখন সেলিম অ্যাড্রেস দিল। পুলিশ অরে প্রথমে লইয়া গেল চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের মর্গে। বডি শনাক্ত করল সেলিম। তারপর পুলিশ অরে থানায় লইয়া গেল। আমি আপনারে ইনফরমেশন দিতে দৌড়াইলাম।
কর্নেল ঘড়ি দেখে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, তিনটে পনের বাজে হালদারমশাই? আপনি আপনার ক্লায়েন্টের অফিসে চলে যান। উনি অফিসে আছেন। আপনাকে ওঁর দরকার হতে পারে।
হালদারমশাই একটু ইতস্তত করে চলে গেলেন। বুঝলাম কর্নেলের সঙ্গে ওঁর আবার গোবরা এরিয়ায় যাবার ইচ্ছা ছিল।
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বললাম, মনে হচ্ছে সেলিম আপনাকে ফোন করার পরই হালদারমশাই পুলিশ নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলেন।
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন, হুঁ।
হাই ওল্ড বস্! সেই সাদা মারুতিটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম!
গোবরা যাবার সময় গাড়িটা আমাদের ফলো করেনি। এখনও করছে না। কর্নেল একটু হেসে ফের বললেন, অবশ্য আজকাল সর্বত্র রঙবেরঙের মারুতি তুমি দেখতে পাবে। তুমি বরং একটা মারুতি কিনে ফেলো। তোমার ফিয়াট সেকেলে হয়ে গেছে। বাই দা বাই, শর্টকাট করো। সময় কম।
গলিরাস্তা ধরে এগিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের কাছে পৌঁছে গেলাম। তারপর রেলব্রিজ পেরিয়ে কর্নেল বলেন, এখানেই পার্ক করে রাখো। আমার জন্য অপেক্ষা করো।
আপনি একা যাবেন?
হ্যাঁ। কর্নেল নেমে গেলেন। বললেন, সামনে জ্যাম দেখতে পাচ্ছি। এখানে রাস্তার পাশে অনেকটা জায়গা। পার্কিংয়ে অসুবিধে নেই। বড় জোর আধঘণ্টা তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে।
কর্নেল বাঁকের মুখে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সময় কাটানোর জন্য আমি বেরিয়ে কাছেই একটা চায়ের দোকানে গেলাম। রাস্তার ধারে এসব চায়ের দোকান বড় অপরিচ্ছন্ন। কিন্তু এ বেলা শীতটা বেশ পড়েছে। মাটির ভাঁড়ে ক্রমাগত গরম করে রাখা গাঢ় তরল পদার্থে চায়ের কোনও স্বাদ নেই। তবু মন্দ লাগছিল না।
কর্নেল ফিরে এলেন প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পরে। কাঁধে একটা কিটব্যাগ ছিল। বললেন, কুইক! যে পথে এসেছ, সেই পথে।
স্টার্ট দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাগটা কার?
ববের। একপ্রস্থ পোশক ঠাসা আছে। এর কারণ সেগুলো সুসান ওরফে সুদেষ্ণার নয়। ভাগ্যিস দেয়ালের ব্র্যাকেটে ঝুলছিল। বেশি কিছু খুঁজতে হয়নি। গোমসের ঘরে জোরে টি ভির শব্দ হচ্ছিল। আজ নিশ্চয় বড় খেলা আছে। কোথাও।
নিউজিল্যান্ড ভার্সেস ইন্ডিয়া। ক্রিকেট।
হু। সব ফ্ল্যাটে তাই টি ভির দিকে সবার চোখ। এমনকি নিচের তলায় একটা দোকানের সামনে ভিড় দেখলাম।…
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল ষষ্ঠীকে কফির হুকুম দিলেন। তারপর ড্রয়িংরুমে ইজিচেয়ারে বসে মাথার টুপি খুললেন। টাকে হাত বুলিয়ে কিটব্যাগের চেন খুললেন।
ঠাসাঠাসি করে ভরা একটা জিনসের প্যান্ট, দুটো শার্ট, তারপর একটা জ্যাকেট বেরুল। কর্নেল জ্যাকেটটা তুলতেই ওঁর পায়ের কাছে ঠকাস করে একটা ছুরি পড়ল। ইঞ্চি ছয়েক ফলা। কর্নেল ছুরিটা টেবিলে রেখে জ্যাকেটের বাইরের পকেটে হাত ভরলেন। কিছু বেরুল না। কিন্তু ভেতর পকেট খুঁজতেই বেরিয়ে এল একটা নেমকার্ড।
কর্নেল কার্ডটা দেখে টেবিলে রাখলেন। বললাম, দেখতে পারি?
নিশ্চয় পারো।
তুলে নিয়ে দেখি, বেশ দামী কার্ড। সি এস সিনহা। তার তলায় ঠিকানা আছে। ভবানীপুর এলাকা বলে মনে হলো। দুটো ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। একটা বাড়ির, অন্যটা অফিসের।
কর্নেল কিটব্যাগের ছোট চেনগুলো টেনে টুকরো কাগজপত্র বের করছিলেন। বললেন, অফিসের ফোন নাম্বারটা শ্রীলেখা এন্টারপ্রাইজের। সর্ষের মধ্যে ভূত।
ষষ্ঠী কফি আনল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল আবার আওড়ালেন, সর্ষের মধ্যে জব্বর ভূত, জয়ন্ত! এই ভূত এখনও বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে।….
