কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

দুই 

 

হালদারমশাই তাঁর মক্কেলকে বিদায় দিতে নিচে গেলেন। দেখলাম কর্নেল চোখ বুজে স্বগতোক্তি করছেন, নীলডায়াল রোমার রিস্টওয়াচ! রোমার! বিখ্যাত জাপানি ওয়াচ কোম্পানির তৈরি ঘড়ি। শ্ৰী এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে জাপানের কারবারি যোগাযোগ আছে। এদিকে যে লোকটা শ্রীলেখা ব্যানার্জিকে একটা রোমার ঘড়ির জন্য হুমকি দিচ্ছে, তার বক্তব্য–ঘড়িটা নাকি সে-ই জয়দীপ ব্যানার্জিকে দিয়েছিল। এটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।

 

বললাম, কর্নেল! ঘড়ি-টড়ি পরে। আগে সেই পাগলাটার কথা ভাবুন।

 

কর্নেল, চোখ খুলে বললেন, মিসেস ব্যানার্জিকে সে-ই টিজ করে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কেন করে সেটাই প্রশ্ন।

 

ওঁকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, হিপিটাইপ চেহারার ওইরকম অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবককে উনি চেনেন কি না। আপনি কড়েয়া থানার ব্যাপারটা ওঁকে বললেন না কেন?

 

ধীরে জয়ন্ত, ধীরে। বলে কর্নেল ড্রয়ার থেকে নোটবই বের করে পাতা ওল্টালেন। তারপর টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন। একটু পরে বললেন, চেতনা নার্সিংহোম?…ডাঃ প্রতুল বাগচী আছেন?…শুনুন, আমি কড়েয়া থানা থেকে বলছি। দিস ইজ আর্জেন্ট।…নমস্কার ডাঃ বাগচী!..হ্যাঁ। আপনি সেই পালিয়ে যাওয়া পেশেন্টকে কি খুঁজে পেয়েছেন?….সে কী! আপনার কোনও পেশেন্ট….কিন্তু গতকাল আপনি থানায় এসেছিলেন। আপনার নেমকার্ড দিয়ে গেছেন।…আই সি! হ্যাঁ, দ্যাটস রাইট। নেমকার্ড আপনি কতজনকে দিতেই পারেন….না, না। আপনাকে কষ্ট করে আসতে হবে না। এ নিয়ে আপনার চিন্তার কারণ নেই। জাস্ট এ রুটিন এনকোয়ারি …হ্যাঁ। আজকাল সর্বত্র প্রতারকরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্লিজ ডোন্ট ওয়ারি। রাখছি।

 

কর্নেল টেলিফোন রেখে আমার দিকে তাকালেন।

 

বললাম, ওঁর কোনও রোগী পালায়নি?

 

নাহ্। কাজেই ওঁর থানায় যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

 

কিন্তু দেখা যাচ্ছে ডাঃ বাগচী সেজে কাল যে থানায় গিয়েছিল, যুবকটিকে তার খুবই দরকার। এদিকে যুবকটি তাকে দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। তাই না?

 

কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন। এই সময় হালদারমশাই ফিরে এলেন। ধপাস করে সোফায় বসে আবার একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, ফোনে জয়ন্তবাবু আমারে কইছিলেন ম্যান ক্যান নট লিভ

 

পাগল! বলে কর্নেল তাকে থামিয়ে দিলেন।

 

হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন, কেডা পাগল? জয়ন্তবাবু পাগল হইবেন। ক্যান?

 

কর্নেল হাসলেন। জয়ন্ত নয়, সেই লোকটা।

 

হঃ! আমি মিসেস ব্যানার্জিরে তা-ই কইয়া দিছি। পাগলের কথায় কান দেবেন না। কিন্তু তখন জয়ন্তবাবু ফোনে পাগলের কথা অবিকল রিসাইট করলেন। কর্নেলস্যার! আমার হেভি খটকা বাধছে। হালদারমশাই সন্দিগ্ধদৃষ্টে আমার দিকে তাকালেন।

 

বললাম, কর্নেল! ঘটনাটা হালদারমশাইকে জানানো উচিত।

 

কর্নেল বললেন, উচিত বৈকি! তবে উনি এখনও উত্তেজিত। একটু ধাতস্থ হতে দাও ওঁকে।

 

হালদারমশাই খি খি করে তার অনবদ্য হাসি হেসে বললেন, আই অ্যাম অলওয়েজ কাম অ্যান্ড কোয়াইট কর্নেলস্যার! কন, শুনি।

 

একটু চুপ করে থাকার পর কর্নেল আস্তে সুস্থে পাগল যুবকটির ঘটনা সবিস্তারে হালদারমশাইকে বললেন। শোনার পর হালদারমশাই আবার উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। চাপা স্বরে বললেন, অল ক্লিয়ার! মিসেস ব্যানার্জিরে ঘড়ির জন্য যে থ্রেটন করেছে, সেই রাস্কেল থানায় গেছিল।

 

কর্নেল বললেন, ঠিক। দুদিন আগে সে মিসেস ব্যানার্জিকে হুমকি দিতে গিয়েছিল। পরে সে জানতে পেরেছে, ঘড়িটা ওই পাগল যুবকের কাছে আছে। এখন প্রশ্ন হলো, জয়দীপ ব্যানার্জির ঘড়ি যুবকটি পেল কী ভাবে?

 

বললাম, ভদ্রমহিলা তো তার স্বামীর তেমন কোন ঘড়ি ছিল কি না জানেন না!

 

কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, তার চেয়ে বড় কথা, কী আছে ঘড়িটাতে?

 

আচ্ছা কর্নেল! লোকটাকে তো ফাঁদে ফেলা সোজা।

 

কী ভাবে?

 

মিসেস ব্যানার্জিকে সে ফোন নাম্বার দিয়েছে। কাজেই একটা ফাঁদ পেতে তাকে ধরা যায়।

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ হঠাৎ খি খি করে হেসে উঠলেন। বললেন, রিস্ক লইয়া গত রাত্রে দুইবার, মর্নিয়েও কয়বার রিং করছি। খালি কয়, দা নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড ডাজ নট একজিস্ট! কর্নেলস্যার রিং করতে পারেন।

 

কর্নেল ডায়াল করার পর টেলিফোন রেখে বললেন, হ্যাঁ। ভুয়ো নাম্বার দিয়েছে। তা আপনি কি মিসেস ব্যানার্জিকে কথাটা জানিয়েছেন?

 

ইয়েস? শি ইজ মাই ক্লায়েন্ট। তারে না জানাইলে চলে? আপনি তো জানেন কর্নেলস্যার, আমি প্রোফেশোনাল এথিক্স মেইনটেন করি!

 

বললাম, উত্তেজনার ফলে নাম্বার টুকতে মিসেস ব্যানার্জির ভুল হয়নি তো?

 

ভেরি স্ট্রং নার্ভের মহিলা। কইলেন, ভুল হয় নাই।

 

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। হালদারমশাইয়ের কাছে নাম্বারটা ভুয়ো শুনেও মিসেস ব্যানার্জি যখন আমাকে ওই নাম্বারই দিয়ে গেলেন, তখন বোঝা যাচ্ছে, টুকতে উনি ভুল করেননি।

 

আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে। এইমাত্র নিচে ক্লায়েন্টের লগে কনসাল্ট করলাম। হঠাৎ হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, সব খরচ উনি দিতে রাজি। নিউজপেপারে বিজ্ঞাপন দিমু।

 

কী বিজ্ঞাপন?

 

পথে একটি রিস্টওয়াচ কুড়াইয়া পাইয়াছি। মালিক উপযুক্ত প্রমাণাদি দিয়া ফেরত লইয়া যান। প্রাইভেট গোয়েন্দা আবার একচোট হেসে বললেন, নামঠিকানা দিমু না। বক্সনাম্বারে বিজ্ঞাপন। দেখি, হালায় ফান্দে পা দেয় কি না।

 

ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া! দেরি করবেন না হালদারমশাই! জয়ন্ত কাগজের লোক। দরকার হলে ওর সাহায্য নিন, যাতে শীগগির বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ার মতো জায়গায় ছাপা হয়।

 

বললাম, আমি শুধু আমাদের কাগজের বিজ্ঞাপন বিভাগে বলে দিতে পারি। কিন্তু বক্সনাম্বারের বিজ্ঞাপনের জবাব পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। বরং ভুয়ো নাম দিয়ে হালদারমশাই তাঁর বাড়ির ঠিকানা দিন। কিংবা এক কাজ করতে পারেন। নামঠিকানার বদলে শুধু ফোন নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করতে বলুন।

 

হালদারমশাই কর্নেলের দিকে তাকালেন। আপনি কী কন কর্নেলস্যার?

 

কর্নেল বললেন, জয়ন্ত মন্দ বলেনি। তবে আপনার ডিটেকটিভ এজেন্সির নাম্বার দেবেন না। আপনি তো প্রায়ই আপনার এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেন। বাড়ির ফোন নাম্বার দেবেন বরং। কেউ যোগাযোগ করলে আমাকে তখনই জানিয়ে দেবেন কিন্তু। আর একটা কথা হালদারমশাই! হিপিটাইপ পাগলের যে ঘটনা আপনি শুনলেন, তা যেন ঘুণাক্ষরে আপনার ক্লায়েন্টকে জানাবেন না। জানালে আমি এই কেস থেকে সরে দাঁড়াব।

 

পাগল? বলে হালদারমশাই উত্তেজিত ভাবে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অভ্যাসমতো যাই গিয়া বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন, হালদারমশাই সত্যি বিচক্ষণ মানুষ। তবে ওঁর ওই এক দোষ হঠকারিতা। আমার ধারণা, লোকটি সেয়ানা। এত সহজে ফাঁদে পা দেবে না। তবে যদি বলো, হালদারমশাইকে নিষেধ করলাম না কেন–আমি বলব, নিষেধ করলেও উনি শুনতেন না। বরাবর দেখে আসছি, ওঁর মাথায় একটা আইডিয়া এলেই তা-ই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

 

ঘড়ি দেখে বললাম, এগারোটা বাজে! উঠি।

 

একটু বসো। আমিও উঠব। কারণ এতক্ষণ শুধু ইজিচেয়ারে বসে একটা রহস্যের জট ছাড়াতে ঘিলু জল করেছি। হা–প্রচুর তথ্য হাতে এসে গেল, তা ঠিক। কিন্তু পথে না নামলে জট ছাড়ানোর খেইটা পাওয়া যাবে না।

 

কর্নেল উঠে দাঁড়ালে বললাম, আমার আজ এখানে লাঞ্চের নেমন্তন্ন। তারপর অফিস।

 

ডার্লিং! তুমি এলেই ষষ্ঠী তোমাকে লাঞ্চ সার্ভ করতে উদ্যোগী হয়। ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারো। বলে কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন। সেই ভুয়ো টেলিফোনের নাম্বারের মতো তোমার ওই নেমন্তন্নও ভুয়ো নয় তো?

 

হাই ওল্ড ম্যান! আমাকে আজ নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবেন বোঝা যাচ্ছে।

 

রহস্য জয়ন্ত, রহস্য! রহস্যে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে আনন্দ আর কিসে? এক মিনিট। পোশাক বদলে আসি।…।

 

কিছুক্ষণ পরে কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নিচে নেমে এলাম। লনের এককোণে আমার গাড়ি পার্ক করা ছিল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললাম, কোথায় যাবেন এখন?

 

কর্নেল বললেন, তুমিই বলল এখন কোথায় যাওয়া উচিত!

 

মিসেস ব্যানার্জির অফিসে।

 

কর্নেল হাসলেন। পাগল যুবকটিকে মিসেস ব্যানার্জি চেনেন কি না এই প্রশ্ন তোমাকে হন্ট করছে। তবে তোমাকে বলেছি, ধীরে। এখন আমরা যাব হেস্টিংস থানায়।

 

রাস্তায় পৌঁছে বললাম, হেস্টিংস থানায় কী ব্যাপার?

 

গড়ের মাঠের পশ্চিমে রেড রোডের অংশটা ওই থানার আওতায় পড়ে।

 

আপনি জয়দীপ ব্যানার্জির দুর্ঘটনায় মৃত্যু সম্পর্কে আগ্রহী তাহলে?

 

দ্যাটস রাইট।

 

কর্নেল! আপনি কি মিসেস ব্যানার্জিকে–

 

না, না! শি ইজ ইনোসেন্ট। মহিলা পাক্ষিকে ওঁর ইন্টারভিউ পড়ে দেখো।

 

কিন্তু আমার একটা খটকা লাগছে।

 

বলো।

 

ভদ্রমহিলা স্মার্ট, শিক্ষিতা এবং মডার্ন। নিশ্চয় স্বামীর সঙ্গে নানা দেশে ঘুরেছেন।

 

হুউ।

 

এ ধরনের দম্পতিকে একসঙ্গে জগিং করতে দেখেছি। জয়দীপ একা জগিং করতে গিয়েছিলেন কেন?

 

তার একশো একটা কারণ থাকতেই পারে।

 

কিন্তু স্বামীর কোনও নীলডায়াল রোমার ঘড়ি ছিল কি না স্ত্রীর অবশ্য জানা উচিত।

 

হ্যাঁ। এটা একটা পয়েন্ট। তবে এ মুহূর্তে হেস্টিংস থানা ছাড়া আর কিছু ভাবছি না।

 

কর্নেল সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। বুঝলাম, এখন আর মুখ খুলতে রাজি নন। কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না, জয়দীপ ব্যানার্জির পথদুর্ঘটনায় মৃত্যু ওঁকে কোন সূত্র যোগাবে? মহিলা পাক্ষিক পত্রিকায় শ্রীলেখা তার স্বামীর মৃত্যু। সম্পর্কে কী বলেছেন আমি অবশ্য এখনও জানি না। তবে এখন মনে হচ্ছে। নিশ্চয় এমন কিছু বলে থাকবেন, যা আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুর কাছে সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

 

হেস্টিংস থানায় পৌঁছতে আধঘণ্টার বেশি সময় লাগল। সারা পথ ট্রাফিক জট। শীতের কলকাতা, পেট থেকে তার সব মানুষজন এবং যানবাহনকে যেন রাস্তাঘাটে উগরে দেয়। থানার পাশে গাড়ি দাঁড় করাতে বলে কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। বললেন, দেরি হবে না। এখনই আসছি।

 

কৌতূহল চেপে বসে থাকতে হলো। কর্নেল ফিরলেন প্রায় মিনিট কুড়ি পরে। গাড়িতে ঢুকে বললেন, পথদুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির কাছে পাওয়া জিনিসপত্রের একটা লিস্ট থানায় রাখার নিয়ম আছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি এবং নামঠিকানা নেওয়াও নিয়ম। কিন্তু সব নিয়মই যে মানা হয়, এমন নয়। ট্রাফিক সার্জেন্ট আব্দুল করিম দুর্ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অকুস্থলে গিয়ে পড়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে বলেছিলেন একটা ট্রাকের ধাক্কায় মৃত্যু। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে জগিং করছে ময়দানে, সে কেন হঠাৎ রাস্তায় ট্রাকের মুখে পড়বে? এর একটা উত্তর করিমসাহেবের রিপোর্টে আছে। জয়দীপ জগিং করার পর তাঁর গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। ঘন কুয়াশা থাকায় দৈবাৎ রাস্তায় নেমেইনাহ জয়ন্ত! এটা যুক্তিসঙ্গত ঠেকছে না। বডি ছিটকে গিয়ে ফুটপাতে পড়েছিল তা ঠিক। কিন্তু পরে শ্রীলেখা তাঁর স্বামীর গাড়ির খোঁজ করলে সেখানে পুলিশ যায়। তখন উজ্জ্বল রোদ ফুটেছে। বেলা প্রায় দশটা। রাস্তার মাঝখানে খানিকটা রক্ত আবিষ্কার করে পুলিশ। তার মানে জয়দীপকে ট্রাকটা ধাক্কা মারে রাস্তার মাঝখানে। অথচ দেখ, জয়দীপের গাড়ি রাখা ছিল ময়দানের দিকের ফুটপাতের পাশেই।

 

ততক্ষণে গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছি এবং যেদিক থেকে এসেছি, সেইদিকেই গাড়ি ঘুরিয়েছি। আমি চুপ করে আছি দেখে কনেল বললেন, জয়ন্ত আমার পয়েন্টটা যুক্তিসঙ্গত নয়?

 

বললাম, হ্যাঁ। একেই বলা হয়, ডালমে কুছ কালা হ্যায়।

 

কর্নেল হাসলেন। তোমার এই প্রবচনটি লাগসই।

 

জয়দীপের হাতে ঘড়ি ছিল কি না পুলিশের লিস্টে নেই?

 

নাহ্। ছিল না। এবং এ-ও একটা পয়েন্ট। কারণ যারা নিয়মিত জগিং করে, তারা সময় বেঁধেই করে। কাজেই জয়দীপের হাতে একটা ঘড়ি থাকা উচিত ছিল। তিনি নিয়মিত জগিং করতে আসতেন। শ্রীলেখার ইন্টারভিউয়ে কথাটা আছে।

 

আর কোথাও কি যেতে চান?

 

কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, রেসকোর্সের উল্টোদিকে মেঘালয় আবাসনে।

 

সেখানে কী?

 

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা সচরাচর ঝামেলা এড়ানোর জন্য ভুল নাম-ঠিকানা দেয়। কিন্তু জয়দীপের দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একজন রিটায়ার্ড আই এ এস অফিসার আছেন। তিনি অবশ্য জগিং করতে যাননি। বয়স্ক মানুষ। গাড়ি করে রেড রোডে যান এবং ফুটপাতে ঘণ্টাখানেক হাঁটাচলা করে বাড়ি ফেরেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি কাছাকাছি ছিলেন।..

 

মেঘালয় আবাসনের ভেতর ঢুকে পার্কিং জোনে গাড়ি দাঁড় করালাম। কর্নেল সহাস্যে বললেন, এবার তুমি আমার সঙ্গে আসতে পারো। তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি তুমি এখন প্রচণ্ড কৈতূহলী হয়ে উঠেছ।

 

বিনা বাক্যব্যয়ে নেমে গাড়ি লক করলাম। কর্নেলের কথাটা ঠিক। প্রশ্নটা তীব্র হয়ে উঠেছে। কেন জয়দীপ মাঝরাস্তায় গিয়েছিলেন?

 

মেঘালয় আবাসনের বাড়িগুলো বহুতল। সিকিউরিটি অফিস আছে। ই ব্লকের ছতলায় লিফটে উঠে কর্নেল একটা অ্যাপার্টমেন্টের ডোরবেলের সুইচ টিপলেন। দেখলাম নেমপ্লেটে লেখা আছে : এ কে ঘোষ আই এ এস। ব্র্যাকেটে রিটায়ার্ড লেখা।

 

একটি মধ্যবয়সী লোক দরজা খুলে অবাক চোখে কর্নেলের দিকে তাকালো। গৃহভৃত্য বলে মনে হলো তাকে। কর্নেল তার হাতে নেমকার্ড দিয়ে বললেন, মিঃ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে চাই। তুমি কার্ডটা দেখালেই হবে।

 

সে একটু ইতস্তত করে বলল, আপনারা ভেতরে এসে বসুন স্যার।

 

বসার ঘরে রুচির ছাপ আছে। বইয়ের র‍্যাক, চিত্রকলা, টুকিটাকি ভাস্কর্য সুন্দর সাজানো। আমরা সোফায় বসার একটু পরেই পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ এসে সম্ভাষণ করলেন। অমায়িক কণ্ঠস্বরে ইংরেজিতে বললেন, বলুন কী করতে পারি আপনাদের জন্য?

 

এটা একটা কেতা। ভদ্রলোক কর্নেলের মুখোমুখি বসে কার্ডটার দিকে তাকিয়ে ফের বললেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। নেচারিস্ট। বাহ্! আমারও একসময় নেচার বাতিক ছিল। যখন নর্থবেঙ্গলে ছিলাম

 

কর্নেল দ্রুত বললেন, আপনাকে একটু বিরক্ত করতে এসেছি। গত ১৪ ডিসেম্বর ভোরে রেড রোডে পথদুর্ঘটনায় এক ভদ্রলোক মারা যান। ওই সময় আপনি ঘটনাস্থলে ছিলেন।

 

মিঃ ঘোষ ভুরু কুঁচকে তাকালেন। ছিলাম। বাট এনিথিং রং?

 

ইট ডিপেন্ডস্।

 

আপনি একজন রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। আই থিংক, দা ভিকটিম ওয়াজ অ্যান আর্মিম্যান?

 

কর্নেল হাসলেন। না, না মিঃ ঘোষ! আমি তার ফ্যামিলিফ্রেন্ড। আমি আপনার কাছে কিছু কথা জানতে এসেছি।

 

সতর্ক মিঃ ঘোষ বললেন, কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য না বললে আমি মুখ খুলতে রাজি নই। কারণ পুলিশ এ পর্যন্ত আমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেনি। কিছু গণ্ডগোল থাকলে নিশ্চয় করত।

 

কর্নেল আস্তে বললেন, ভিকটিমের নাম জয়দীপ ব্যানার্জি। একটা ট্রেডিং কোম্পানির ওনার ছিল সে। তার স্ত্রীর নামে কোম্পানির ওনারশিপ উইল করা আছে। তাই জয়দীপের আত্মীয়েরা গণ্ডগোল বাধাতে চাইছে। তাদের বক্তব্য স্ত্রীর দুর্ব্যবহারেই জয়দীপ আসলে সুইসাইড করেছে।

 

হুঁ! আমারও সুইসাইড মনে হয়েছিল। কারণ সে মাঠের দিক থেকে ছুটে এসে আমার প্রায় নাকের ডগা দিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ঘন কুয়াশা ছিল বটে, কিন্তু আমার ইন্সটিঙ্ক বলতে পারেন-ট্রাকের সামনে পড়ামাত্র মনে হয়েছিল সুইসাইড করল নাকি লোকটা? তবে পুলিশকে আমি সেকথা বলা উচিত মনে করিনি।

 

একটা ডিটেলস বলুন প্লিজ!

 

দেখুন কর্নেল সরকার! আমি কিন্তু কোর্টে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে রাজি নই। তবে যদি কোর্ট থেকে সমন আসে, আমি পুলিশকে যা বলেছি, তার একটা কথাও বেশি বলব না।

 

না, না। সমন আসবে না। যদি আসে, যা খুশি বলবেন। কিন্তু আমি প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই।

 

বেশ আর কী জানতে চান বলুন।

 

বডি কোথায় পড়েছিল? প্লিজ ডিটেলস বলুন।

 

মিঃ ঘোষ নির্লিপ্ত মুখে বললেন, আমি থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। ট্রাকটা খুব জোরে আসছিল। বডি কোথায় পড়ল, সেই মুহূর্তে লক্ষ্য করিনি। পরে দেখলাম, আমার পিছনে কয়েক হাত দূরে ফুটপাতে বডিটা পড়ে আছে। বেশ কিছু লোক ওখানে হাঁটাচলা এবং জগিং করছিল। তারা দৌড়ে এল। তারপর– মিঃ ঘোষ একটু চুপ করে থাকার পর ফের বললেন, । প্রথমে একজন লোক বডিটাকে চিৎ করে শোয়াতে চেষ্টা করছিল। তার পেছনটা চোখে পড়েছিল। লম্বা চুল–যাকে বলে হর্সটেলের মতো বাঁধা। হিপি বলেই মনে হয়েছিল। মাত্র কয়েক হাত দুরে তো! পরনে হাফস্লিভ ব্যাগি সোয়েটার। শুধু। এটুকুই মনে পড়ছে। আমি কিন্তু ভিড়ে ঢুকিনি।

 

কর্নেল শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, হিপি?

 

হ্যাঁ। আমি প্রতিদিন মর্নিংয়ে ওদিকটায় হাঁটাচলা করি। মাঝে মাঝে হিপিদের দেখতে পাই।

 

সে জয়দীপের বডি চিৎ করে শোয়ানোর চেষ্টা করছিল?

 

করছিল। সেটা স্বাভাবিক। তারপর ভিড় জমে গেল।

 

থ্যাঙ্কস মিঃ ঘোষ। চলি।

 

কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘর থেকে বেরুলেন। আমি ওঁকে অনুসরণ করলাম। লিফটের সামনে না গিয়ে উনি সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলেন। গতিতে দ্রুততা ছিল। উত্তেজিত মনে হচ্ছিল ওঁকে।

 

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললাম, কর্নেল! তা হলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এল দেখছি। একটা ভাইটাল ক্লু।

 

কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন, একটা ভাইটাল যোগসূত্র বলা উচিত।

 

রুটি ছিনতাইকারী পাগল সেদিন ভোরে রেড রোডে কী করছিল?

 

জগিং।

 

হেসে ফেললাম। ভ্যাট! পাগলরা জগিং করে নাকি?

 

সার্জেন্ট আব্দুল করিমকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিল, দুজনকে মাঠ। থেকে দৌড়ে আসতে দেখেছে। তার সামনে দিয়েই ওরা ছুটে যায়। ভিকটিমের পেছনের লোকটার চুল দেখে সে তাকে হিপি ভেবেছিল। পরে আর হিপিটাকে সে দেখতে পায়নি। বোঝা যাচ্ছে, হিপিটাইপ চেহারা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

 

তার নামঠিকানা নিশ্চয় নেওয়া হয়েছিল?

 

হ্যাঁ! বলে কর্নেল পকেট থেকে নোটবই বের করলেন। বাবুয়া। কেয়ার অব রামধন। ঠিকানা বাবুঘাট। পেশা ঠিকা শ্রমিক।

 

বাবুঘাটে যাবেন নাকি?

 

নাহ্। বাবুঘাটে কোনও এক রামধন বা বাবুয়াকে খুঁজে বের করা সহজ নয়। ওখানে বিচিত্র পেশার অসংখ্য মানুষ থাকে। থাকে বলছি বটে, কিন্তু সে-থাকাও ডেরা বেঁধে থাকা নয়। সার্জেন্ট ভদ্রলোক নেহাত রুটিন ওয়ার্ক করেছেন। পথদুর্ঘটনা তো প্রতিদিনই হচ্ছে। এ সব ক্ষেত্রে কী ভাবে দায়সারাগোছের কাজকর্ম চলে, তুমি সাংবাদিক হিসেবে ভালই জানো। তাছাড়া ভিকটিমের পক্ষ থেকে ভালভাবে তদন্তের জন্য চাপ দেওয়া হয়নি।

 

কেন হয়নি, সেটা কি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়?

 

কর্নেল হাসলেন। তোমার সন্দেহের কাঁটা শ্রীলেখা দেবীর দিকে ঘুরে আছে।

 

সেটা অমূলক নয়, বস!

 

কর্নেল আরও জোরালো হেসে বললেন, ঠিক আছে। আজ সন্ধ্যা ৭ টায় মুখোমুখি শ্রীলেখার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবে। তুমি ঝোপ বুঝে কোপ মেরে দেখতে পারো। তুমি সাংবাদিক। কাজেই তোমার সুযোগের অভাব হবে না।….

 

কর্নেলের ইলিয়ট রোডের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরতে প্রায় দেড়টা বেজে গেল। যষ্ঠীচরণ দরজাগুলো দিয়ে বলল, কড়েয়া থানা থেকে বাবামশাইকে ফোং করেছিল!

 

তাকে কিছুতেই ফোন বলাতে পারেন না কর্নেল। কিংবা আমার সন্দেহ সে ইচ্ছে করেই ফোং বলে। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, খিদে পেয়েছে।

 

ষষ্ঠী বলল, সব রেডি। আমিও রেডি হয়ে আছি। কিন্তু থানার পুলিশ বলছিল, সাহেব এলেই যেন ফোং করেন।

 

কর্নেল টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন। তারপর বললেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…বলো বিনয়!…তাই বুঝি? আসলে আমিই ডাঃ বাগচীকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম….হ্যাঁ। ঠিক করেছ। চেপে যাও….যথাসময়ে জানতে পারবে। ছাড়ছি।

 

বললাম, সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ বাগচী থানায় যোগাযোগ করেছিলেন নাকি?

 

কর্নেল হাসলেন। হ্যাঁ। সেটা স্বাভাবিক। পুলিশকে কে না ভয় পায়? যাই হোক, ভাগ্যিস বিনয় থানায় ছিল। বুদ্ধি করে ম্যানেজ করেছে। কার্ডটা ওঁকে দেখায়নি। বলেছে, স্রেফ ভুল বোঝাবুঝি।

 

সেই ডিউটি অফিসারকে দিয়ে ডাঃ বাগচীকে শনাক্ত করা উচিত ছিল, কাল উনিই থানায় গিয়েছিলেন কি না!

 

বিনয় তোমার চেয়ে বুদ্ধিমান। নাহ্, ডাঃ বাগচী সেই লোকটি নন। সে ছিল প্রৌঢ় শক্তসমর্থ গাঁট্টাগোট্টা চেহারার লোক। চিবুকে দাড়ি। এদিকে ডাঃ বাগচীর বয়স তার চেয়ে কম। রোগা গড়ন। বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকলেন।

 

তবে স্নানের জন্য নয়, সেটা জানি। কলকাতায় থাকতে গ্রীষ্মে নাকি সপ্তাহে দুদিন এবং শীতে নাকি মাসে একদিন স্নান করেন। বাইরে গেলে অন্যরকম। কর্নেলের এই স্বাস্থ্যবিধি আমার কাছে আজও রহস্যময়। এ বয়সে অত কফি এবং চুরুট টানা সত্ত্বেও সবসময় তাজা থাকেন। কখনও জ্বরজ্বালাও দেখিনি। অবশ্য একবার ঠাণ্ডা লেগে স্বরভঙ্গ হয়েছিল দেখেছি।…..

 

লাঞ্চের পর আমার ভাতঘুমের অভ্যাস বহুদিনের। ষষ্ঠী তা জানে বলে ড্রয়িংরুমের সোফায় একটা বালিশ এবং কম্বল রেখেছিল। কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একটা গাদা বই খুলে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়েছিলেন। বইটা যে প্রজাপতি পোকামাকড় সংক্রান্ত, তা ছবি দেখেই বোঝা গিয়েছিল।

 

ষষ্ঠীর ডাকে ঘুম ভেঙে দেখি, ঘরে আবছায়া ঘনিয়েছে। ষষ্ঠী কফির পেয়ালা রেখে বলল, বাবামশাই একটু বেরিয়েছেন। বলে গেছেন, দাদাবাবুকে যেন আটকে রাখবি। আলো জ্বালব নাকি দাদাবাবু?

 

নাহ। থাক।

 

কফিতে চুমুক দেওয়ার পর ক্রমে শরীরের ম্যাজমেজে ভাবটা কেটে গেল। সাড়ে পাঁচটা বাজে। শীতকালে এখন সন্ধ্যাবেলা। রাস্তার আলোর আভাস জানালার পর্দার ফাঁকে ফুটে উঠছে।

 

কফি শেষ করেছি, সেইসময় টেলিফোন বাজল। হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে সাড়া দিলাম। হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কেডা? কর্নেলস্যারেরে চাই।

 

সকালের মতো রসিকতা করে বললাম, আপনার কর্নেলস্যার একটু বেরিয়েছেন হালদারমশাই।

 

জয়ন্তবাবু নাকি? বিজ্ঞাপন দিয়া ফ্যালাইছি। একখান ইংরাজি, দুইখান বাংলা। কিন্তু এদিকে এক কাণ্ড বাধছে।

 

বলুন!

 

এইমাত্র কোন হালায় আমারে থ্রেটন করছিল। কয় কী, হার্ট ফুটা করব।

 

বলেন কী!

 

হঃ। ট্যার পাইয়া গেছে। আই ডাউট জয়ন্তবাবু, মর্নিংয়ে আমাগো ফলো করছিল। আর কর্নেলস্যারের কথাও কইছিল। ওই বুড়ারও টাক ফুটা করব। কইলাম–কী কইলাম কনতো? খি খি খি–

 

খি খি খি–মানে শুধু হাসলেন?

 

হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর গম্ভীর শোনাল। কইয়া দিলাম, পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে!

 

আজ সন্ধ্যায় আপনার ক্লায়েন্টের ওখানে যাবার কথা।

 

হঃ! কর্নেলস্যারেরে কইবেন, আমি ম্যাডামের বাড়িতে উপস্থিত থাকব।

 

হালদারমশাই! ছদ্মবেশে বেরুবেন কিন্তু!

 

জয়ন্তবাবু! আই হ্যাভ আ লাইসেন্সড় গান দ্যাট ইউ নো ভেরি ওয়েল।

 

আচ্ছা, রাখছি।

 

বুঝলাম প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভদ্রলোক আমার ওপর চটে গেলেন। এতক্ষণে ষষ্ঠী এসে আলো জ্বেলে দিল।

 

কর্নেল ফিরলেন ছটা নাগাদ। ফিরেই টুপি খুলে রেখে হাঁকলেন, ষষ্ঠী! কফি। আমরা বেরুব।

 

উনি ইজিচেয়ারে বসে হেলান দিলেন। বললাম, গোয়েন্দাগিরিতে বেরিয়েছিলেন?

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন, কতকটা। কোনও ফোন এসেছিল নাকি? হালদারমশাইয়ের কথা বললাম। কর্নেল টাকে হাত বুলোতে থাকলেন। ষষ্ঠী শীগগির কফি আনল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, হঠাৎ একটা আইডিয়া মাথায় এসেছিল। কড়েয়া থানায় গিয়েছিলাম সেই রুটির দোকানের খোঁজে। বিনয় ছিল না। তবে তাতে আমার অসুবিধে হয়নি। প্রথমে জেনে নিলাম সো-কল্ড পাগলের হাতে নীলডায়াল ঘড়ি ছিল কি না। ছিল দামী জাপানি ঘড়ি সিটিজেন। সাদা ডায়াল। তো থানার অফিসারদের চেয়ে কনস্টেবলদের থানা এরিয়াটা নখদর্পণে থাকে। কাজেই দোকানটা খুঁজে বের করা সম্ভব হলো। দোকানদার ফজল মিয়া সত্যিই তেজী এবং রগচটা মানুষ। বললেন, স্যার! ও পাগলটাগল নয়। স্রেফ বদমাশ। কারণ কাছেই বড়রাস্তার মোড়ে তার ভাতিজার টেলারিং শপ আছে। সেই ভাতিজা দেখেছে, বদমাশটা মোটরসাইকেলে চেপে এসে ওর দোকানের সামনে নামে। তারপর মোটরসাইকেলে চাবি দিয়ে গলিতে এগিয়ে যায়। তারপর ফজল মিয়ার ভাতিজা রাত সাড়ে দশটা নাগাদ দোকান বন্ধ করছে, তখন দেখে সেই বজ্জাতটা দৌড়ে এসে মোটরসাইকেলে চাপল। চেপে হাওয়া হয়ে গেল। ফজল মিয়ার ভাতিজা কালকের ঝামেলার কথা শুনেছিল। কিন্তু দোকান থেকে বেরোয়নি। আজ সকালে চাচাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল। সে থাকে পার্ক সার্কাসের ওদিকে।

 

অদ্ভুত তো!

 

অদ্ভুত। কিন্তু জলবৎ তরল।

 

বুঝলাম না।

 

কাল ডাঃ বাগচী দুটো লোক নিয়ে গাড়িতে করে ওকে তাড়া করেছিলেন। মোটরসাইকেল রাস্তার মোড়ে রেখে তাই সে গলিতে ঢুকে পড়ে। ধুরন্ধর বুদ্ধি! এরপর সে আত্মরক্ষার জন্য রুটি তুলে নিয়ে লোক জড়ো করে। বস্তি এরিয়ার ব্যাপার। নিমেষে লোকারণ্য হয়ে যায়। এবার সে পাগল সাজতে বাধ্য হয়। আত্মরক্ষার কৌশল!

 

কিন্তু কর্নেল, একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যারা তাকে গাড়ি চেপে তাড়া করে আসছিল, তারা কী ভাবে জানল সে পাগল সাজবে, তাই আগেভাগে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তারের নেমকার্ড যোগাড় করে রেখেছিল?

 

কর্নেল হাসলেন। বুদ্ধিমানের প্রশ্ন। আসলে এটা দুই ধুরন্ধরের প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের নমুনা।

 

বুঝলাম না।

 

ধরো, জাল পাগলের নাম এক্স এবং তার প্রতিপক্ষের নাম ওয়াই। ওয়াই যখন দেখল এক্স পাগল সেজেছে এবং রুটিওয়ালা সদলবলে তাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছে, তখন ওয়াই বুঝল যে, থানার লকআপে এক্সকে ঢোকানো হবেই। পুলিশের রীতিনীতি ওয়াইয়ের জানা। কার না জানা? অতএব ওয়াই দ্রুত ফন্দি আঁটল। ডাঃ বাগচীর নার্সিংহোম পাম অ্যাভেনিউতে। ঘটনাস্থল থেকে গাড়ি চেপে পৌঁছতে পাঁচনিমিটও লাগে না। কাজেই ওয়াই তৎক্ষণাৎ ডাঃ বাগচীর কাছে ছুটে যায় এবং কল্পিত কোনও মানসিক রোগীকে ভর্তি করানোর কথা তোলে। ডাঃ বাগচীর একটা নেমকার্ড চেয়ে নেয়। যে-কোনও ডাক্তারই তা দিয়ে থাকেন। নেমকার্ড হাতিয়ে ওয়াই ছুটে আসে কড়েয়া থানায়। এবার বাকিটা তোমার জানা।

 

ওঃ! কি সেয়ানা লোক!

 

কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ। সেয়ানে-সেয়ানে কোলাকুলি বলে একটা কথা আছে। তবে এক্ষেত্রে সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই। ওয়াই হেরে ভুট!…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *