কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এক
ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন! আমার প্রাজ্ঞ বন্ধু তার সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন। মানুষ শুধু রুটি খেয়ে বাঁচে না। কথাটা কার বলো তো জয়ন্ত?
বললাম, হঠাৎ এ কথা কেন?
তুমি সাংবাদিক। এই ঐতিহাসিক উক্তি কার তা তোমার জানা উচিত ছিল। তা ছাড়া আজকাল যা লক্ষ্য করছ, সাংবাদিকতা যেন একেকটি আস্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। বলে উনি কফিতে চুমুক দিলেন। মুখে সৌম্য-শান্ত ঋষিতুল্য আদল। তারপর একটু হাসলেন। কথাটা যীশু খ্রিস্টের। মানুষ শুধু রুটি খেয়ে বাঁচে না।
কর্নেল! আমি সিওর আপনি আজ সকাল-সকাল খুব তৃপ্তি সহকারে ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছেন।
ঠিক বলেছ ডার্লিং!
আপনার আজ যে-কোন কারণে হোক, বড় বেশি খিদে পেয়েছিল।
হুউ। ঠিক বলেছ।
হাই ওল্ড ম্যান! এ বয়সে নতুন করে জগিং শুরু করেননি তো? বিশেষ করে এ বছর কলকাতায় খ্রিসমাসের সঙ্গে শীতটাও প্রচণ্ড ভাবে এসে গেছে।
কর্নেল মাথা দোলালেন। নাহ্ জয়ন্ত! গোয়েন্দাগিরিতে তুমি বরাবরই কঁচা। একটা জায়গায় গিয়ে থেমে যাও। আমাদের হালদারমশাই হলে এতক্ষণ ঠিকই ধরে ফেলতেন। বলে উনি কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন। তোমার জানা উচিত কলকাতায় আমি কদাচ মর্নিংওয়াক করি না। ততক্ষণ আমাকে ছাদের বাগানে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়।
তা তো রোজই করেন। তাতে এমন কিছু সাংঘাতিক খিদে পায় না যে ছাদ থেকে নেমে এসেই ষষ্ঠীকে ব্রেকফাস্টের টেবিল
ওয়েট, ওয়েট! কর্নেল হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিলেন। তারপর চোখ বুজে চুরুটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। একটু চুপচাপ থাকার পর বললেন, ছাদের বাগানে বিচ্ছিরি রকমের জঞ্জাল জমে ছিল। আজ ষষ্ঠীকে নিয়ে সব সাফ করেছি। তো হা–তুমি ঠিকই ধরেছ। সকালের দিকে খাটা-খাটুনিতে খিদেটা বেশ বেড়ে যায়। আর্মি লাইফের কথা মনে পড়ছিল।
এবার ওঁর সামরিক জীবনের চর্বিতচর্বণ শোনার আশঙ্কায় ঝটপট বললাম, কিন্তু যীশু খ্রিস্টের কথাটা এতে আসছে কেন?
ব্রেকফাস্টের সময় কথাটা মাথায় এল। অমনই মনে হলো, যীশু খ্রিস্টের প্রখ্যাত এই উক্তির অন্য একটা দিকও আছে। মানুষ শুধু রুটি খেয়ে বাঁচে না, তা ঠিক। কিন্তু রুটি না খেলেও তো মানুষ বাঁচে না! দিস ইজ মোর ফান্ডামেন্টাল জয়ন্ত! আগে রুটি, তারপর অন্য কিছু। তাই না?
ওঁর গাম্ভীর্য দেখে হেসে ফেললাম। ও বস! আপনি এতদিনে রাজনীতিতে নাক গলাতে যাচ্ছেন না তো? আজকাল রাজনীতি ভীষণ বিপজ্জনক।
জয়ন্ত! রাজনীতি যত বিপজ্জনক হয়ে উঠুক না কেন রুটির জন্য–হ্যাঁ, আবার বলছি, বেঁচে থাকার এই ফান্ডামেন্টাল কারণের জন্য যা খুশি করা উচিত। যারা তা করে, করছে বা করতে চায়, আমি তাদের সঙ্গে আছি। হোয়াই। নট? অস্তিত্ব রক্ষার এ একটা নিজস্ব লজিক। আদিম লজিক।
এই সময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল চোখ বুজে টাকে হাত বুলাচ্ছেন। গলার ভেতর বললেন, ফোনটা ধরো জয়ন্ত।
ফোন তুলে সাড়া দিতেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্তকুমার হালদার ওরফে কে কে হালদার অর্থাৎ আমাদের প্রিয় হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কেডা? কর্নেলসারেরে দিন।
রসিকতা করে বললাম, বলছি।
নাহ্। রং নাম্বার। টেলিফোনেরে ভূতে ধরছে।
দ্রুত বললাম, আপনি কত নাম্বার চাইছেন?
হালদারমশাই কর্নেলের নাম্বার আওড়ে বললেন, আপনার নাম্বার কত?
যে নাম্বার চাইছেন।
অ্যাঃ! কন কী? কিন্তু আপনি কর্নেল স্যার নন। ষষ্ঠীও না। কেডা?
আপনি তো বিচক্ষণ ডিটেকটিভ। বলুন!
এবার ওঁর অনবদ্য খি খি হাসি ভেসে এল। তাই কন! জয়ন্তবাবু? কী কাণ্ড! আসলে আমার মাথা বেবাক গণ্ডগোল হইয়া গেছে। মাইনষে রুটি খায়। রুটি মাইনষেরে খাইলে কী হয় বুঝুন!
অবাক হয়ে বললাম, রুটি? তার মানে, ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন–
কী কইলেন, কী কইলেন?
এখনই কর্নেল কথাটা নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
কন কী? আমার ক্লায়েন্ট তা হলে আগে ওনারে অ্যাপ্রোচ করছিল।
ব্যাপার কী হালদারমশাই? কেসটা কি রুটিঘটিত?
জয়ন্তবাবু! প্লিজ কলেস্যারেরে দিন।
কর্নেলের দিকে ঘুরতেই উনি তুঘোমুখে বললেন, ওঁকে এখনই আমার কাছে আসতে বললো। ওঁর ক্লায়েন্টকে যেন সঙ্গে আনেন।
হালদারমশাইকে কথাটা জানিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, আধঘণ্টার মধ্যে যাইতাছি। জয়ন্তবাবু! হেভি মিস্ট্রি। কর্নেলস্যারেরে কইবেন য্যান।
ফোন রেখে বললাম, মাই গুডনেস! আপনি তাহলে একটা রুটিসংক্রান্ত রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। তাই রুটি নিয়ে অতক্ষণ গুরুগম্ভীর বুকনি? ছাদের বাগানের জঞ্জাল সাফ এবং প্রচণ্ড খিদে পাওয়া–ওঃ কর্নেল! হেঁয়ালি করার এই অভ্যাসটা সত্যিই মাঝে মাঝে আমার বড্ড খারাপ লাগে।
হেঁয়ালি? কর্নেল ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। না জয়ন্ত! তোমার বোঝা উচিত, রুটি কথাটা আসলে খাদ্যের প্রতীক। প্রাণীমাত্রের বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য চাই-ই। আজ ব্রেকফাস্টের সময় এই কঠিন সত্যটা নতুন করে আমাকে ভাবিয়েছে। যাই হোক, হালদারমশাইয়ের জন্য অপেক্ষা করা যাক।
বিরক্ত হয়ে বললাম, ব্যাপারটা কাকতালীয় বলে মেনে নিতে পারছি না কিন্তু।
আমার প্রাজ্ঞ বন্ধু একটু হেসে বললেন, না। একেবারে কাকতালীয় নয়। খাদ্য এবং খিদে সম্পর্কে আমার নতুন উপলব্ধির পেছনে আজকের কাগজের একটা খবরও দায়ী। তবে তুমি নিজে সাংবাদিক হয়ে সংবাদপত্র খুঁটিয়ে পড়ো না এটাই সমস্যা। হ্যাঁ–তোমার এ বিষয়ে বক্তব্য আমার জানা। কাজেই তা আর ব্যাখ্যা করতে বলছি না। সত্যিই তো! কাগজে কত কিছু ছাপা হয় সবই খুঁটিয়ে পড়ার মানে হয় না। কিন্তু মজাটা হলো, হেলাফেলা করে ছাপা একরত্তি। কোনও খবরের আড়ালেও অনেক গুরুতর সত্য থাকে।
খবরটা কী বলুন তো?
কর্নেল কাঁধে ঝাঁকুনি দিলেন ইউরোপীয় ভঙ্গিতে। কাটিং রাখিনি। এই তো কাগজগুলো টেবিলে পড়ে আছে।
আহা! মুখেই বলুন না!
কাল বিকেলের ঘটনা। একটা লোক দৌড়ে এসে আচমকা একটা দোকান থেকে একপাউন্ড সাইজের পাঁউরুটি তুলে নেয়। দোকানদার পয়সা চাইলে সে গ্রাহ্য করে না। বুঝতেই পারছ, এসব ক্ষেত্রে যা হয়। বচসা, হল্লা, ভিড়। তাতে ওটা বস্তি এলাকা।
এটা আবার এমন কী খবর!
তোমাদের দৈনিক সত্যসেবকও ছেপেছে।
হাসতে হাসতে বললাম, জানেন তো? সাংবাদিক মহলে একটা জোক চালু আছে : আজ-কিছু-আছে নাকি-দাদা-খবর! তার মানে, কাগজের অফিসের টেবিলে বসে পুলিশকে ফোন করে পাওয়া খবর।
কর্নেল তেমনই গম্ভীর মুখে বললেন, হ্যাঁ, পুলিশ সোর্সেরই খবর।
লোকটা তা হলে বেপাড়ার মস্তান।
খবরে তা বলা হয়নি। লোকটাকে মারমুখী ভিড় ঘিরে ধরতেই সে নাকি রুটিতে কামড় দেয় এবং চিৎকার করে বলে, ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন। বাট ক্যান এনি ম্যান লিভ উইদাউট ব্রেড? সম্ভবত ইংরেজি শুনেই সব ভড়কে যায়। তবে বোঝা যায় দোকানদারটি জেদী এবং ঝানু। এটা মেনে নিলে ভবিষ্যতেও একইভাবে তার রুটি ছিনতাই হওয়ার আশঙ্কা আছে।
ঠিক ধরেছেন। তাই সে ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে এই তো?
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু কল্পনা করো জয়ন্ত তাকে যখন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তখনও সে পাউরুটি কামড়ে খাচ্ছিল। অবশ্য পুলিশ বলেছে, রুটি ছিনতাইকারী আসলে মানসিক রোগী।
আপনি বলছিলেন এই খবরে গুরুতর সত্য আছে। সত্যটা কী?
কী আসাধারণ প্রশ্ন! ক্যান এনি ম্যান লিভ উইদাউট ব্রেড?
ওঃ কর্নেল! ফিলোসফির ভূতটাকে কাধ থেকে নামান প্লিজ!!
ফিলোসফি নয় ডার্লিং, হার্ড ট্রুথ। বলে কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা নোটবই বের করলেন। তারপর পাতা উল্টে দেখে টেলিফোন টেনে নিলেন। ডায়াল করে সাড়া পাওয়ার পর বললেন, ও সি বিনয় ঘটক আছেন নাকি?…বলুন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার কথা বলবেন।…বিনয়! কনগ্রাচুলেশন!…না, না। তুমি তো জানো….কবে জয়েন করছ?….ভালো খুব ভাল। তো শোনো। আজ কাগজে দেখলাম তোমার থানায় একজন রুটিছিনতাইকারীকে….হ্যাঁ, আমি ইন্টারেস্টেড। পরে বলবখন।…বলো কী? তারপর?….হ্যাঁ, ঠিকই করেছ। ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা….জাস্ট এ মিনিট! লিখে নিচ্ছি।…কার্ডে নিশ্চয় ফোন নাম্বার আছে?….হ্যাঁ বলো। কর্নেল সেই নোটবইয়ের পাতায় কোনার দিকে কার নাম-ঠিকানা টুকে নিলেন। তারপর টেলিফোন রেখে আমার দিকে ঘুরে বসলেন।
জিজ্ঞেস করলাম, কোন থানা?
বিনয় ঘটককে তোমার চেনা উচিত। তুমি সাংবাদিক। ডক এরিয়ায় গত বছর একটা বড় স্মাগলিং র্যাকেট গুঁড়িয়ে দিয়ে তুলকালাম করেছিল। শেষে সেই র্যাকেটের রাজনৈতিক মুরুব্বিরা ওকে সেখান থেকে হটিয়ে দিয়েছে কড়েয়া থানায়। তাতেও ক্ষান্তি নেই। নখদন্তহীন স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চে প্রমোশন দিয়ে– আবার সরাচ্ছে। বললাম বটে কনগ্রাচুলেশন, কিন্তু এই পদোন্নতির মানে একজন সৎ দক্ষ অফিসারকে ঠুটো জগন্নাথ করে দেওয়া।
বুঝলাম। কিন্তু এবার দেখছি রহস্য ঘনীভূত। হালদারমশাই বলছিলেন হেভি মিস্টি
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে অভ্যাস মতো চোখ বুজে মৃদুস্বরে বললেন, পুলিশ কাগজকে সব কথা বলেনি। কোনও সময়ই বলে না। হ্যাঁ, রুটিছিনতাইকারীর আচরণ-হাবভাবে পাগলামি ছিল। সে একজন যুবক। বাংলা বলতে পারে না। ভাঙা ভাঙা হিন্দি জানে। ইংরেজি তার মাতৃভাষা। পুলিশের ধারণা, সে অ্যাংলোইন্ডিয়ান এবং কলকাতায় সদ্য এসেছে। মাথায় হিপিদের মতো চুল। তাকে সার্চ করে শতিনেক টাকা পাওয়া যায়। হাতে দামী একটা বিদেশি ঘড়িও ছিল। অতএব পাগল। দোকানদারকে তার টাকা থেকে পাঁউরুটির দাম মিটিয়ে বুঝিয়েসুঝিয়ে বিদায় দেওয়া হয়। তারপর ডিউটি অফিসার তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে লকআপে ঢোকান। কিছুক্ষণ পরে একজন হোমরাচোমরা গোছের বাঙালি ভদ্রলোক গিয়ে হাজির। তার সঙ্গে দুজন লোক ছিল। কার্ড দেখিয়ে বলেন তিনি সাইকিয়াট্রিক ডাক্তার। তার নার্সিংহোম থেকে একজন সাংঘাতিক রোগী পালিয়েছে। তার পেছনে গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করেছিলেন। রোগী যে-বস্তি এলাকায় ঢুকেছিল, এইমাত্র সেখানে তিনি খবর পেয়েছেন একজন পাগলকে নাকি এই থানায় ধরে আনা হয়েছে। রোগীর চেহারার বর্ণনাও তিনি দেন। তারপর তাকে লকআপে নিয়ে যাওয়া হয় রোগীকে শনাক্ত করতে। তিনি বলেন, হ্যাঁ–এই সেই রোগী।
কর্নেল হঠাৎ চুপ করলে বললাম, ইন্টারেস্টিং। তারপর?
কর্নেল ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, তাঁকে দেখামাত্র যুবকটি ঘুরে দাঁড়িয়ে দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলে, ও গড! হি হ্যাঁজ কাম টু কিল মি। হি ইজ এ কিলার। প্লিজ সেইভ মি ফ্রম দা ন্যাস্টি ডগ। হি ইজ ফলোয়িং মি সি এ লং টাইম ইত্যাদি। ডিউটি অফিসার অগত্যা বলেন, ও সি ডিসিশন নেবেন। আপনি অপেক্ষা করুন। ভদ্রলোক রাগ করে চলে যান। হ্যাঁ যাওয়ার সময় তার নেমকার্ড ফেরত চেয়েছিলেন। বুদ্ধিমান অফিসার সেটি ফেরত দেননি। তো বিনয় থানায় ফেরে রাত দশটা নাগাদ। সব শুনে সে যুবকটিকে লকআপ থেকে এনে জেরা শুরু করে। কিন্তু যুবকটি কোনও প্রশ্নের জবাব না। দিয়ে ক্রমাগত আওড়ায়, ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন। বাট ক্যান এনি ম্যান লিভ উইদাউট ব্রেড? বিনয়ের ধারণা হয়, যুবকটি সত্যিই মানসিক রোগী। তারপর বিনয় সেই ডাক্তারকে ফোন করতে টেলিফোন তুলেছে, আচমকা যুবকটি পালিয়ে যায়। তাকে তাড়া করে লাগাল পাওয়া যায়নি।
হেসে ফেললাম, পাগলই বটে। বিনয়বাবু ডাক্তারকে ফোন করে নিশ্চয় ব্যাপারটা জানিয়েছেন?
বিনয় পাগল নয়। থানা থেকে আসামি পালানোর মানে কী বুঝতে পারছ না? দাগী ক্রিমিন্যাল হলে কথা ছিল। গা করতেই হতো। তবে সেক্ষেত্রে সে ঘটনাটা চেপে গেছে। এদিকে আমি এ ব্যাপারে আগ্রহী। আমাকে বিনয় ভালই চেনে। কাজেই আমাকে সব খুলে বলল। নাহ–সেই ডাক্তারের সঙ্গে সে যোগাযোগ করেনি। করতেও চায় না। ডাক্তারও এখন পর্যন্ত আর থানায় যোগাযোগ করেননি। বিনয় বলল, তার একটু খটকা লেগেছে অবশ্য। আমার কথায় খটকাটা বেড়ে গেল। তবে ও এখন নিজের ব্যাপারে বেশি ব্যস্ত। প্রমোশন পেয়ে অন্য দফতরে বদলিতে বিনয় খুশি হয়নি।
এতক্ষণে ডোরবেল বাজল। কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন ষষ্ঠী!
কর্নেলের এই প্রশস্ত ড্রয়িংরুমের এক কোণে বাইরের দিকে একটা ছোট্ট ওয়েটিং রুম মতো আছে। অ্যাপার্টমেন্টের বাইরের দরজা সেই ঘরটাতে। একটু পরে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাইয়ের অমায়িক কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। প্লিজ কাম ইন ম্যাডাম! তারপর চাপা স্বরে–ওনারে বুড়া ভাববেন না। লুকিং বুড়া। বাট স্ট্রং অ্যান্ড হাড়ে হাড়ে বুদ্ধি। কাম ইন প্লিজ!
পর্দা তুলে হালদারমশাই বললেন, মর্নিং কর্নেল স্যার! আলাপ করাইয়া দিই। মিসেস শ্রীলেখা ব্যানার্জি। আর মিসেস ব্যানার্জি, একজন জিনিয়াসের কাছে আপনারে লইয়া আইছি। আমাগো গুরুদেব কইতে পারেন। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। অ্যান্ড–ইনি হইলেন গিয়া দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী!
মহিলাদের বয়স অনুমান করতে গিয়ে আমি বাবর ঠকেছি। তবে এঁকে পূর্ণ যুবতী বলা চলে। উপমায় বলতে হলে বলব পূর্ণিমার চাঁদ। তার মানে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয় আসন্ন। তবে পূর্ণ চন্দ্রিমাটি যেন ঈষৎ মেঘে ঢাকা। তাই উজ্জ্বলতা কম। কিন্তু চোখ দুটি চশমার ভেতরও ধারালো। চেহারায় স্মার্টনেস স্পষ্ট। ছিপছিপে গড়ন পরনে নীলচে শাড়ি ব্লাউস। একটা কালো মোটাসোটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলছিল। সেটা নামিয়ে পায়ের কাছে রাখলেন।
কর্নেল ওঁকে দেখছিলেন। বললেন, আমি সম্ভবত ভুল করছি না। কদিন আগে একটা কাগজে আপনার ইন্টারভিউ পড়েছি এবং ছবিও দেখেছি। আপনি শ্রী এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটার। জাপান থেকে কম্পিউটার সফ্টওয়্যার আমদানি করে আপনার কোম্পানি পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরি করে। আরব এবং পশ্চিম এশিয়ায় ইতিমধ্যে আপনার কোম্পানি বড় মার্কেট পেয়ে গেছে।
হালদারমশাই উত্তেজিত ভাবে নস্যি নিচ্ছিলেন দ্রুত, বললেন, আপনারে কইছিলাম ম্যাডাম–তাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, আপনার স্বামী ইন্টারভিউতে আপনিই বলেছেন, সম্প্রতি রেড রোডে পথ-দুর্ঘটনায় মারা গেছেন!
শ্রীলেখা মৃদুস্বরে বললেন, ময়দানে জগিং করতে গিয়েছিল। সেদিন ভোরে প্রচণ্ড কুয়াশা ছিল। ওর পকেটে একটা ক্লাবের মেম্বারশিপ কার্ড ছিল। তাতে ঠিকানা পেয়ে পি জি হাসপাতালের এমার্জেন্সি ওয়ার্ড থেকে আমাকে খবর দেওয়া হয়েছিল।
হ্যাঁ, এবার বলুন কী ব্যাপারে আপনি ওঁর ডিটেকটিড এজেন্সিতে গেলেন?
হালদারমশাই কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন। বললেন না। শ্রীলেখা বললেন, পুলিশকে জানাতে সাহস পাইনি। কারণ একটু থেমে আস্তে শ্বাস ছেড়ে বললেন ফের, গোড়া থেকে বলা উচিত। আমার স্বামীর মৃত্যুর পরদিন থেকে যখন-তখন উড়ো ফোনে কেউ আমাকে একটা উদ্ভট কথা বলে টিজ করছিল। মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছিলাম না।
কী কথা? বলেই কর্নেল হাসলেন। ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন। বাট ক্যান এনি ম্যান লিভ উইদাউট ব্রেড?
শ্রীলেখার দৃষ্টিতে বিস্ময় ফুটে উঠল। হালদারমশাইয়ের গোঁফ উত্তেজনার সময় তিরতির করে কাপে লক্ষ্য করেছি। এতক্ষণে সেই কাপন দেখতে পেলাম। শ্রীলেখা বললেন, আপনি কী করে জানলেন?
কর্নেল সকৌতুকে হালদারমশাইকে দেখিয়ে বলেন, প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদারকে আমরা হালদারমশাই বলে থাকি। উনি চৌত্রিশ বছর পুলিশে কাজ করে অবসর নেওয়ার পর ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। ওঁর সাহস, দক্ষতা, বুদ্ধিসুদ্ধি সত্যিই অসাধারণ। তবে উত্তেজনার ঝেকে উনি অনেকসময় কিছু কথাবার্তা বলে ফেলেন–না, না হালদারমশাই আপনার সংকোচের কারণ নেই। মিসেস ব্যানার্জিকে নিয়ে আসার সময় আপনি বলছিলেন, বুড়ার হাড়ে হাড়ে বুদ্ধি
হালদারমশাই ম্রিয়মাণ হয়ে বললেন, ভেরি সরি কর্নেল স্যার! ক্ষমা চাইছি। আমার এই এক ভেরি-ভেরি ব্যাড হ্যাবিট। আসলে মাদারটাং ছাড়তে পারিনি এখনও। তাই মুখ দিয়ে বুড়া বেরিয়ে যায়!
নাহ্! শব্দটার মানে তো একই। বুড়া বলুন, বুড়ো বলুন বৃদ্ধ বলুন। এনিওয়ে! তবে বলা হয় বটে হাড়ে-হাড়ে বুদ্ধি, আসলে বুদ্ধির ডেরা মগজের কোষে কোষে। মিসেস ব্যানার্জি, আমার এই তরুণ বন্ধু সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী আমাকে মুখোমুখি ওল্ডম্যান বলে সম্ভাষণ করে। হা–ওল্ড ইজ গোল্ড। ষষ্ঠী! কফি নিয়ে আয়।
ষষ্ঠীচরণ বোঝে, তার বাবামশাই কাকে বা কাদের কফি দিয়ে আপ্যায়ন করবেন। সে নেপথ্যে তৈরিই ছিল যেন। তখনই ট্রেতে কফির সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হলো।
শ্রীলেখা ঘড়ি দেখে বললেন, আমি কিন্তু চা বা কফি কিছু খাই না।
কর্নেল পেয়ালায় কফি ঢালতে ঢালতে বললেন, ডাক্তাররা যা-ই বলুন, আমি দেখেছি কফি নার্ভ চাঙ্গা করে। তবে আপনাকে ইসি করব না। জয়ন্ত! হালদারমশাই! হিজ হিজ হুজ হুজ তৈরি করে নিন।
কফিতে চুমুক দিয়ে হালদারমশাই বললেন, ম্যাডাম! আপনার কেস হিস্ট্রি শুরু করুন।
শ্রীলেখা কর্নেলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, উড়ো ফোনের ঘটনাটা নিশ্চয় মিঃ হালদার আপনাকে জানিয়েছেন?
হালদারমশাই ঝটপট বললেন, না ম্যাডাম! আমি কিছু কই নাই।
কর্নেল বললেন, আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া আমার অভ্যাস। আপনি উড়ো ফোনে অদ্ভুত কথা শুনতে পান। অদ্ভুত কথা–এটাই আমার কানে বিঁধেছে। যাই হোক। তাহলে দেখা যাচ্ছে কেউ আপনাকে ওই কথাগুলো বলে উত্ত্যক্ত করছে। এই তো? নাকি আরও কিছু ঘটেছে?
শ্রীলেখা বললেন, দুদিন আগে চৌরঙ্গিতে আমার কোম্পানির অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, তখন প্রায় ছটা বাজে–হঠাৎ একটা লোক কাছ ঘেঁষে এসে বলে উঠল আপনার স্বামীর রিস্টওয়াচটা কি ফেরত পেয়েছেন? পার্কিং জোনের ওখানটাতে আলো কম ছিল। তবে বয়স্ক লোক মনে হলো। বললাম, কে আপনি? লোকটা চাপা গলায় বলল, ফেরত পেয়েছে কি না জানতে চাইছি মিসেস ব্যানার্জি! আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, আমার স্বামীর অনেকগুলো রিস্টওয়াচ আছে। কিন্তু কে আপনি? কেন এ কথা জানতে চাইছেন? তখন সে হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, নীলডায়াল রোমার রিস্টওয়াচটা আমি জয়কে দিয়েছিলাম। ওটা ফেরত চাই। আমি চড়া গলায় বললাম, আর একটা কথা বললে গার্ডদের ডাকব। অমনই লোকটা চলে গেল। দেখলাম, ফুটপাতে গিয়ে সে একটা গাড়িতে উঠল। স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। সত্যি বলতে কী, আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম।
নীলডায়াল রোমার রিস্টওয়াচ?
হ্যাঁ। কিন্তু জয়ের তেমন কোনও ঘড়ি আমি দেখিনি।
জগিংয়ের সময় ওঁর হাতে ঘড়ি থাকত নিশ্চয়। থাকা উচিত। তো হাসপাতাল থেকে ওঁর কোনও ঘড়ি আপনাকে দেওয়া হয়নি?
না।
হালদারমশাই বললেন, অ্যাকসিডেন্টের সময় ওনার হাতে ঘড়ি থাকলে গুঁড়া হওনের কথা। যে পুলিশ অফিসার অ্যাকসিডেন্টের তদন্ত করছিলেন, তিনি কইতে পারেন।
আমি বললাম, ঘড়ি ভেঙে গেলেও রিস্টে চেন বা ব্যান্ড আটকে থাকা উচিত। হয়তো হাসপাতাল-স্টাফ তা ফেলে দিয়েছিল?
শ্রীলেখা বললেন, আমিও তা-ই ভেবেছি কারণ তন্নতন্ন খুঁজে তেমন কোনও ঘড়ি দেখতে পাইনি। তো গতকাল দুপুরে অফিসে আবার একটা উড়ো ফোন এল। না–যে ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড অ্যালোন বলে সেই লোকটা নয়। অন্য লোক। দুদিন আগে সন্ধ্যায় যে আমাকে হুমকি দিচ্ছিল, সম্ভবত সেই। বলল, কেউ যদি আমাকে রোমার রিস্টওয়াচটা বেচতে যায়, আমি যেন তাকে আটকে রেখে এই নাম্বারে ফোন করি। হঠাৎ সেই সময় মনে পড়ল নিউজপেপারে হালদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেখেছি। বাড়ি ফিরে বিজ্ঞাপনটা খুঁজে বের করে মিঃ হালদারকে রিং করলাম। উনি বললেন, আপনাকে আসতে হবে না। ঠিকানা বলুন। আমি এখনই যাচ্ছি।
হালদারমশাই বললেন, হঃ। সার্কাস অ্যাভেনিউয়ে তখনই গিয়া হাজির হইলাম।
কর্নেল বললেন, সেই ফোন নাম্বারটা আমাকে দিন। আপনার নেমকার্ডও দিন। আমি আজ সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ আপনার বাড়িতে যাব। আর এই নিন আমার নেমকার্ড। নতুন কিছু ঘটলে তখনই জানাবেন।…
