হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

আংকল ড্রাম

 

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের নভেম্বর-শেষের আবহাওয়া ভারি মনোরম। কলকাতারই নভেম্বরের মতো। কিন্তু হুট করতেই বৃষ্টির বড় উপদ্রব। বেরুলাম যখন তখন চারদিকে ঝলমল করছে বিকেলের গোলাপি রোদ্দুর। সমুদ্রের দিকটা অবশ্য ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে। পাহাড়ের খাঁজে-খাঁজে চড়াই-উৎরাই রাস্তা। রেলিংঘেরা ফুটপাথের ধারে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। ফুলে-ফুলে ছয়লাপ, যেদিকে তাকাই। নীচের উপত্যকায় ঘন নারকোলবন। চোখ জুড়িয়ে যায়। রাস্তায় পায়ে হাঁটা লোক কিছু-কিছু চোখে পড়ছিল। পৃথিবীর নানা দেশের পর্যটক ওরা। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের প্রাচীন অধিবাসী পলিনেশীয়রা খুব সেজেগুজে ঘুরছে। ওদের মেয়েদের গায়ে ফুলের পোশাক। চওড়া ফুটপাতে বা কোথাও ছোট্ট পার্কে ওরা নাচছে-গাইছে। পুরুষরা বাজনা বাজাচ্ছে। ভিড় জমে আছে। যেতে যেতে হঠাৎ কোত্থেকে বৃষ্টি এসে গেল। দেখলাম বৃষ্টিতে ভিজতে সবাই ভালোবাসে। আমি আর বব বাদে।

 

বব আমার হাত ধরে টানতে-টানতে দৌডুল। একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ঢুকলাম। ঢোকার সময় অবাক হয়ে দেখলাম, কয়েকটা ভাষার সঙ্গে বাংলাতেও বড় বড় হরফে লেখা আছে : ঢাকুচাচার রেস্তোরাঁ। পাশে ইংরেজিতে : আংকল ড্রামস রেস্তোরাঁ।

 

বললাম,–বব! বব! এটা বাঙালি রেস্তোরাঁ দেখছি।

 

বব বলল,–তাই বুঝি?

 

ভেতরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ড ভুড়িওলা বেঁটে একটা লোক তম্বি করছিলেন ইংরাজিতে। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথায় বিশাল টাক। দেখামাত্র আমার প্রিয়তম বন্ধু সেই প্রখ্যাত ‘বুড়োঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কথা মনে পড়ে মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। হায় কর্নেল! তুমি কোথায়, আর তোমার চিরনেওটা জয়ন্তই বা কোথায়? মাঝখানে দু-দুটো মহাসাগরের ব্যবধান-প্রশান্ত মহাসাগর আর ভারত মহাসাগর।

 

বব ফিসফিস করে বলল,–এ দেখছি আরেক আংলক। আমার আংকল জন, আর তোমার তা হলে এই বাঙালি আংকল ড্রাম। সত্যি ড্রাম বটে। ড্রামের মতো গমগম করে বাজছে শোনো!

 

প্রকাণ্ড পিপে-মানুষটা আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন কাউন্টার থেকে। পায়ের চাপে মাটি কাঁপার কথা। কিন্তু মেঝেয় পুরু নরম কার্পেট। কোণার দিকে ছোট্ট মঞ্চে বাজনাপার্টি বসে আছে। সেজেগুজে। অবাক হয়ে দেখলাম, মাইকের সামনে একটা শাড়িপরা বাঙালি মেয়ে এসে দাঁড়াল। তারপর মিঠে গলায় বাংলায় ভাটিয়ালি গেয়ে উঠল। তন্ময় হয়ে গেলাম। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এসে বাংলার ভাটিয়ালি শুনব কে ভেবেছিল?

 

পিপেমানুষটা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। পা থেকে মাথা অব্দি গমগমে গলায় এবং বিরাট হাসি মিশিয়ে বলে উঠলেন,–ঢাকা না কইলকাত্তা?

 

কলকাতা।

 

প্রকাণ্ড দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন,–হঃ। গন্ধ পাইয়াই বুজছি। আহা রে, কতকাল বাদে ভাইপোডারে পাইলাম। আয়েন, আয়েন। আর শোনেন, আমারে চাচা কইবেন। ঢাকুচাচা।

 

তারপর ববকে দেখিয়ে বললেন,–এ হালারে জোটাইলেন ক্যান? মাইয়ামাইনষের লাখন চুল রাখছে মাথায়। হালা বুত না প্যারত? মারকিনগুলান, বোঝলেন? ব্যাবাক জংলি।

 

বব কিছু আঁচ করছিল। ঢাকুচাচা এবার তার হাত নিয়ে জোরালো হ্যান্ডশেক করে নিজস্ব ইংরেজিতে বললেন, হ্যালো হ্যালো হ্যালো! আই অ্যাম ইওর আংকল ড্রাম!

 

বব মুচকি হেসে বলল, আমার একজন আংকল আছে। তবে জোড়া আংকলে আপত্তি নেই।

 

কাঁচের দেওয়ালের পাশে আমাদের বসিয়ে ঢাকুচাচা গল্প করতে লাগলেন। তার নাম মুঝঃফর হোসেন। ডাক নাম তার ঢাকু মিয়া। বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। সতেরো বছর ধরে নানা ঘাটের জল খেয়ে এই হায়েনাতে এসে জুটেছেন। পয়সাকড়ি হয়েছে। মা-মরা মেয়ে জ্যোৎস্নাকে এনেছেন গত বছর। ঢাকায় মামার কাছে থাকত এতদিন জ্যোৎস্না ভালো গাইতে পারে। এই এক বছরে নানাভাষায় গান শিখেছে সে। যে দেশের গান গায়, সেই দেশের পোশাক পরে। ঢাকুচাচা বললেন,–জ্যোৎস্না আইয়া আমার রেস্তোরাঁর বিক্রিবাটা খুব বাড়ছে। হঃ। আর আমার চিন্তা নাই। মাইয়াডার হাতেও রেস্তোরাঁর ভার দিয়া বাইরে ঘোরনের ফুরসত পাই। কাইল সকালে আসেন ভাইপো। আপনারে লইয়া বাইরামু।

 

চারমাস পরে বাংলায় মন খুলে কথা বলতে পেরে আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল। একটু পরে চাচা তার মেয়েকে ডেকে এনে আলাপ করিয়ে দিলেন। জ্যোৎস্না ফুটফুটে সুন্দরী। মাথার চুল ববছাঁট। ভারি মিষ্টিস্বভাবের মেয়ে। এক সময় সে আমাকে অবাক করে বলে উঠল,–আচ্ছা। এবার বলুন, আপনি একা কেন কাউয়াই দ্বীপে? সঙ্গে আপনার কর্নেল নেই কেন?

 

হাঁ করে আছি দেখে সে বলল,–বারে! জয়ন্ত চৌধুরী আর কর্নেলের অ্যাডভেঞ্চার আমি পড়িনি বুঝি? কলকাতায় আমার মাসির বাড়ি। যখন গেছি, একগাদা করে বই কিনে নিয়ে গেছি ঢাকায়। আমি অ্যাডভেঞ্চার আর গোয়েন্দা-কাহিনির পোকা।

 

প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে পাঠিকা পেয়ে যাওয়া আমার পক্ষে খুব আনন্দের। ববকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলে সে প্রশংসার চোখে আমাকে দেখতে লাগল, চাচা কাউন্টারে চলে গেছেন। রেস্তোরাঁয় ভিড় বাড়ছে ডিনার খেতে। এখানে লোকের ছটার মধ্যে ডিনার খাওয়া অভ্যাস। বব উসখুস করছে দেখলাম।

 

জ্যোৎস্না বলল,–আপনাকে জয়ন্তদা বলছি। রাগ করবেন না তো?

 

জ্যোৎস্না চোখে হেসে রহস্যময় ভঙ্গি করে চাপা গলায় বলল,–নিশ্চয় হায়েনার কোনও গুহায় গুপ্তধনের সূত্র পেয়ে পাড়ি জমিয়েছেন। এবং যেখানে জয়ন্ত চৌধুরী, সেখানেই কর্নেল। কাজেই বুঝতে পারছি, কর্নেল একা কিছু তদন্ত করতে বেরিয়েছেন।

 

না জ্যোৎস্না! সত্যি বলছি, উনি আসেন নি।

 

জানি, গোয়েন্দাদের সব কথা গোপন রাখার নিয়ম। তবে জয়ন্তদা আমাকে সঙ্গে নিতে হবে কিন্তু। আমি জানি … বলে সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে শেষে ববের দিকে তাকালো। ইংরেজিতে বলল,–মিঃ বব। আশা করি কিছুক্ষণ মাতৃভাষায় আমাদের আলাপে তোমার অসুবিধে হচ্ছে না। জরুরি কথাটা সেরে নিয়ে আমরা সবাই এবার ইংরেজিতেই বলব। আমরা বন্ধুর মতো। কেমন?

 

বব ফিক করে হেসে বলল,–ওকে-ওক্কে বেবি! তোমরা জরুরি কথাটা সেরে নাও। আমি আমার জনখুড়োকে ফোনে জানিয়ে দিয়ে আসি আমরা ডিনারটা এখানেই সেরে নিচ্ছি। উনি যেন নিজেরটা, কোথাও সেরে নেন।

 

বব ফোনের দিকে এগিয়ে গেল। জ্যোৎস্না বলল,–যা বলছিলাম জয়ন্তদা। এখানে একবছর আছি। মিনিহুন নামে খুদে মানুষের কথা শুনেছি। তারা নাকি গুহার ভেতর থাকে। খুব দুর্গম সে-সব গুহা। ওরা সমুদ্রের মাছের মতো ঘুরতে পারে নাকি। তাই সমুদ্রের তলা থেকে দামি মণিমুক্তা কুড়িয়ে এনে গুহার ভেতর লুকিয়ে রাখে। বছরের পর বছর জমানো সেইসব রত্নের নাকি পাহাড় জমিয়ে রেখেছে ওরা গুহার ভেতর পাতালপুরীতে। রত্নগুলো সূর্যের মতে আলো ছড়ায় সেখানে। পাতালপুরীতে তাই একটুও অন্ধকার নেই। সারাক্ষণ ঝকমকে রোদ্দুর।

 

হাসতে হাসতে বললাম,–রূপকথা বলছ জ্যোৎস্না!

 

জ্যোৎস্না মাথা নেড়ে বলল,–মোটেও না। এখানকার পলিনেশীয়রা এসব দারুণ বিশ্বাস করে। আমাদের তিনজন পলিনেশীয় পরিচারক আছে–দুজন মেয়ে, একজন ছেলে। ওই যে ওরা। দেখছেন তো? ওদের কাছে শুনেছি, কাউয়াই দ্বীপের এক রাজা ছিল। একমাত্র তাকেই নাকি মিনিহুনরা খাতির করত। রাজাকে একবার ওরা নেমন্তন্ন করে নিয়ে গিয়েছিল পাতালপুরীতে।

 

বললাম, ঠিক আছে। যদি সেই পাতালপুরীর খোঁজে বেরোই, তোমাকেও ডাকব। তবে আপাতত আমাকে মাছের ঝোল আর ভাত খাওয়াও তো লক্ষ্মী মেয়ে! চারমাস আমি অখাদ্য খেয়ে কাটাচ্ছি।

 

জ্যোৎস্না নেচে উঠল! … এক্ষুনি। আমাদের নিজেদের জন্যে ইলিশ মাছের ঝোল আর ভাত আছে।

 

ইলিশ! বলো কী? প্রশান্ত মহাসাগরের ইলিশ নাকি?

 

উঁহু খাঁটি পদ্মার ইলিশ। মাসে একবার আসে চট্টগ্রাম থেকে। … বলে জ্যোৎস্না প্রায় দৌড়ে চলে গেল। আমার নোয় জল ঝরার অবস্থা। শুধু চিন্তা, বব বাঙালি খাদ্য খেতে পারবে তো?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *