হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সিগারেট কেসের রহস্য
খুড়ো ভাইপোর সঙ্গে আধঘণ্টা পরে ফের প্লেনে উঠলাম। কাউয়াই দ্বীপে পৌঁছতে মোটে সাতাশ মিনিট লাগল। এই এয়ারপোর্টের নাম লিহিউ। চারদিকে আখের ক্ষেত, মধ্যিখানে বিমানবন্দর। গেট পেরিয়ে গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলাম তিনজনে। জনখুড়ো ট্যাকসি চালককে বললেন,–হায়েনা টাউনশিপ।
কাউয়াইকে বলা হয় উদ্যানদ্বীপ। সবুজ গাছে ভরা। দূরে হাজার পাঁচেক উঁচু পাহাড় মাউন্ট ওয়াইয়ালেয়ালে। আসলে দ্বীপটার চারদিকেই উঁচু পাহাড়। খাড়িগুলো বিপজ্জনক। কাউয়াইদ্বীপে তাই জাহাজ ভেড়ার জায়গা নেই। কয়েক মাইল দূরে জাহাজ রেখে ছোট ছোট বোটে দুঃসাহসীরা খাড়িতে যদি বা ঢুকতে পারে, তীরে ওঠা অসম্ভব। খাড়া পাহাড়। তাই এ দ্বীপের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ শুধু প্লেনে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে টমাস কুক এ দ্বীপে নামতেই পারেননি।
ছোটবড় গোটা আষ্টেক দ্বীপ নিয়ে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ। আমেরিকার শাসনে রয়েছে। তাই আমেরিকায় ঘুরে যেমনটি দেখেছি, এখানেও তাই। সুন্দর সুন্দর চকচকে রাস্তাঘাটে পায়ে হাঁটা লোক নেই। এই কাউয়াই দ্বীপকে সত্যি একটা বাগানের মতো সাজিয়ে রেখেছে। হায়েনা উপনগরী পাহাড়ি টিলার গায়ে। উত্তর-পশ্চিম জুড়ে প্রশান্ত মহাসাগর। প্রায় হাজার ফুট নীচে সমুদ্রের জল গর্জন করছে। সাদা ফেনা দুলছে। ঝকে-ঝকে সমুদ্রপাখি উড়ছে। শব্দে কান পাতা দায়।
ততক্ষণে লিহিউতে নেমেই জনখুড়ো ফোন করে হোটেল বুক করেছেন। হোটেলের নাম কোকো পাম হোটেল। দোতলা হোটেল। ওপরতলায় আমি একটা সিঙ্গল স্যুট, খুড়োভাইপো একটা ডাবল সট ভাড়া করেছেন। এ হোটেলেও যা রাজকীয় বিলাস আর আরামের ব্যবস্থা, আমাদের দেশের সেরা হোটেলেও তা কল্পনা করা যায় না। জানলা দিয়ে খাড়ির নীচে সমুদ্র চোখে পড়ছিল। বিকেল-চারটে বেজে গেছে। পাশের ঘর থেকে ফোন করলেন জনখুড়ো। কফি খেতে ডাকলেন।
গিয়ে দেখি, নিজেরাই কফি তৈরি করেছেন। প্রতি ঘরে কফি তৈরির ব্যবস্থা আছে। কফি খেতে খেতে জন বললেন, কী মনে হচ্ছে? কাউয়াই স্বর্গোদ্যান না?
স্বীকার করলাম। … অবশ্যই মিঃ নর্থধ্রুব। এমন জায়গা থাকতে পারে, ভাবিনি। তা ছাড়া …
কথা কেড়ে বব বলল,–তুমিও আমার মতো ওঁকে আংকল জন বা জনখুড়ো বলতে পার জায়েন্টো! তাতে উনি রাগ করবেন না।
জনখুড়ো হাসিমুখে বললেন,–মোটেও রাগ করব না। তুমিও আমার ভাইপোর বয়সি জয়ন্ত! বললাম, আপনি তো দিব্যি জয়ন্ত উচ্চারণ করতে পারছেন, কিন্তু বব আমাকে জায়েন্টো বানিয়ে ছাড়ল। অথচ আমি জায়েন্টো বা দৈত্যের এক শতাংশও নই।
এই সময় দেখলাম বব সিগারেটের প্যাকেট বের করে খুড়োর দিকে বাড়িয়ে দিল। আমার চোখে এটা দৃষ্টিকটু। গুরুজনদের সিগারেট দেওয়া তো দূরের কথা, তাদের সামনেও আমরা ভারতীয়রা সিগারেট খাই না। কিন্তু সায়েবদের রীতিনীতি আলাদা। জন সিগারেট নিলেন, বব আমার দিকে এগিয়ে দিল প্যাকেট। বললাম,–ধন্যবাদ বব। আমি আলাদা ব্রান্ডের সিগারেট খাই। আমার কড়া সিগারেট পছন্দ।
বলে পকেট থেকে আমার সিগারেটকেস বের করলাম।
জনখুড়ো আমা সিগারেটকেসটার দিকে তাকিয়েই কেমন যেন চমকে উঠলেন। তারপর খপ করে ওটা প্রায় কেড়ে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে থাকলেন। আমি তো হতভম্ব। বব মিটিমিটি হেসে বলল,দেখছ কী জায়েন্টো! খুড়োর তোমার সিগারেটকেসটির মধ্যে নিশ্চয় হাজার-হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে গেছেন। খুডোমশাই প্রাচীন ইতিহাসের দিগগজ পণ্ডিত কি না। দেখবে, হয়তো তোমার সিগারেটকেস নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার বক্তৃতা দিতে দৌডুবেন।
ভাইপোর তামাশার দিকে মন নেই জনখুডোর। সিগারেটকেসটা খুলে উনি সিগারেটগুলো বের করে টেবিলে রাখলেন। তারপর জানলার কাছে গিয়ে ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে-দেখতে বললেন,–হুম! জয়ন্ত, এ জিনিস তুমি কোথায় পেলে? নিশ্চয় লস এঞ্জেলিসের কোনো কিউরিও শপে?
বললাম,–না খুড়োমশাই। কিউরিও শপের জিনিসের দাম দেবার পয়সা কোথায় আমার? সিগারেটকেসটা আমি পয়সা দিয়ে কিনিনি। ওটা আমার এক বাল্যবন্ধুর উপহার।
জনখুড়ো উত্তেজিতভাবে বললেন,–বাল্যবন্ধু! কে সে বাল্যবন্ধু?
বললে কি চিনবেন?–হাসতে-হাসতে বললাম : সে থাকে পশ্চিমবঙ্গের এক অজ পাড়াগাঁয়ে। নিছক চাষাভুষো মানুষ। গাঁয়ের পাঠশালায় আমার সঙ্গে দিনকতক অ আ ক খ শিখেছিল। তারপর পড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে জমি চষতে গিয়েছিল। আর পড়াশোনা হয়নি তার। বছর দুই আগে কলকাতা থেকে গাঁয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম–তখন সে এটা উপহার দিয়েছে।
জন নর্থব্রুক আমার মুখোমুখি বসে তেমনি উত্তেজনায় প্রশ্ন করলেন,–আশ্চর্য! সে কোথায় পেল এ জিনিস?
মাঠে জমি চাষ করতে গিয়ে লাঙলের ফালে এটা মাটির তলা থেকে উঠে এসেছিল। এবার একটু গম্ভীর হয়েই জবাব দিলাম। আমার বিস্ময়টা বেড়ে যাচ্ছিল, তাই।
জনখুড়ো চিন্তিতভাবে বললেন,–এ বড় আশ্চর্য জয়ন্ত! এখন আমার মনে হচ্ছে, যেন তোমার এই কাউয়াই দ্বীপের হায়েনা উপনগরীতে ছুটে আসার মধ্যে নিয়তির অনিবার্য টান টের পাচ্ছি। জয়ন্ত, এই সিগারেটকেস এখানকারই পলিনেশীয় জাতির লোকেরা তৈরি করে। এই দেখো, খুদে হরফে লেখা আছে ‘মেড ইন হায়েনা’। কিন্তু তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, এর গায়ে প্রাচীন পলিনেশীয় ভাষায় লেখা কয়েকটা কথা। ‘আহোয়ায়ালোয়া’। তার পাশে দেখতে পাচ্ছ এই চিহ্নটা? একটা ত্রিভুজের মাথায় যেন চন্দ্রকলা আঁকা। বড় রহস্যময় ব্যাপার জয়ন্ত! আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।
খুড়ো মুঠোয় সিগারেটকেসটা আঁকড়ে ধরে চোখ বুজে কী যেন ভাবতে লাগলেন। বব আমার দিকে চোখ টিপে কী ইশারা করল এবং মিটিমিট হাসতে লাগল।
চোখ খুলে জনখুড়ো বললেন,–কাছিমজাতীয় একরকম সামুদ্রিক প্রাণীর খোলা থেকে এসব সিগারেটকেস তৈরি করে ওরা। আমার চোখে পড়েছিল ওই ত্রিভুজের মাথায় চন্দ্রকলা চিহ্নটা। এটা এই দ্বীপের আদিম রাজার প্রতীকচিহ্ন। আর ‘আহোয়ায়ালোয়া’ কথাটার মানে এর ভেতরে গোপন বৃত্তান্ত আছে। আমি বুঝতে পারছি না, এটা ভারতের একটা গ্রামের মাঠে চাষের জমিতে কীভাবে গেল?
আমিও ব্যাপারটা ভাবছিলাম। এতক্ষণে হদিস মিলে গেল। বললাম,–জনখুড়ো! একটা যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছি মনে হচ্ছে। আমাদের গ্রামের যে মাঠে জিনিসটা আমার চাষীবন্ধু কুড়িয়ে পেয়েছিল, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটা সামরিক বিমানঘাঁটি বানানো হয়েছিল। তখন আমি নেহাত বাচ্চা। শুনেছি, একদিন একটা ছোট্ট প্লেন কীভাবে সেখানে আছড়ে পড়েছিল নামবার সময়। প্লেনটায় আগুন ধরে যায়। পাইলট বা তার সঙ্গীরা কেউ বাঁচেনি। এখন মনে হচ্ছে, এই সিগারেটকেসটা তাদেরই কারুর কাছে ছিল। যেভাবে হোক, ওটা ধ্বংসস্তূপে টিকে গিয়েছিল। তারপর বিমানঘাঁটিটা যুদ্ধের শেষে উঠে যায়। অনেকবছর পরে জমিতে চাষ পড়ে। তখন সিগারেটকেসটা বেরিয়ে আসে লাঙলের ফলায়।
জন সায় দিয়ে বললেন,–ঠিক ঠিক। বোঝা গেল সব। এ নিশ্চয় কোনো আমেরিকানের কাছে ছিল। কিন্তু জয়ন্ত, আবার বলছি–যেন তুমি নিয়তির টানেই ছুটে এসেছ হায়েনাতে। কারণ হায়েনার আদিম রাজার প্রতীক-চিহ্ন আঁকা সিগারেটকে তোমার কাছে।
ভয় পেয়ে বললাম,–ওরে বাবা! নিয়তি-নিয়তি শুনলে বুক ঢিপঢিপ করে কাঁপে যে!
বব বলল,–খুড়ো! ওই হোয়া হোয়াহোয়া ব্যাপারটা কী বলছিলেন যেন?
জন বললেন,–তামাশা নয় বব! কথাটার মানে এর ভেতরে গোপন বৃত্তান্ত আছে। তার মানে এই সিগারেটকেসটার ভেতর আদিম রাজা হোলাহুয়া সংক্রান্ত কোনো গোপন বিবরণ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তা প্লেন দুর্ঘটনার সময় নষ্ট হয়ে গেছে। কিংবা ..
বাধা দিয়ে বললাম,জনখুড়ো! আমার চাষীবন্ধু বলেছিল এর ভেতর দলাপাকানো শক্ত কিছু জিনিস ছিল। সেগুলো সে ধুয়ে সাফ করেছিল।
জন বললেন,–হুঁ। যা ভেবেছি, তাই।
বব বলল,–দলাপাকানো শক্ত জিনিসগুলো সিগারেট ছাড়া কিছু নয়।
জন ভাইপোর দিকে তাকিয়ে বললেন,–হ্যাঁ-হ্যাঁ। তা হতে পারে জয়ন্ত, জিনিসটা আমি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চাই। তোমার কি আপত্তি আছে?
আমি বলার আগেই বব বলে উঠল,–জায়েন্টো খুব ভালো ছেলে। ওর কোনো আপত্তি নেই। আপনি ওটা নিয়ে গবেষণায় লেগে যান। ততক্ষণ আমি জায়েন্টোকে নিয়ে একবার চক্কর দিয়ে আসি।
জনখুড়ো গম্ভীর মুখে বললেন,–যেখানে যাবে যাও, গুহা-টুহায় যেন ঢুকো না। সাবধান। আর জয়ন্ত, ও যদি কোনো গুহায় ঢুকতে চায়, তুমি ওর চুপ খামচে ধরে ঠেকাবে। বব চুলে জব্দ।
বব তার মাথায় লম্বা মেয়েলি চুলগুলো দুহাতে ঢেকে বলল,–জায়েন্টো, আমার চুলে কিন্তু বিদ্যুৎ আছে। শক মারবে। ছুঁয়ো না।
বলে সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বাইরে নিয়ে গেল।…
