হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ফাদার গ্রিনকট বনাম আংকল ড্রাম
ওয়েইকাপালি গুহার সামনে গিয়ে দেখি যেন যুদ্ধের ঘাঁটি। চারদিকে খাড়ির মাথায় হাজার-হাজার লোক দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখছে। পাথরে ম্যাপ বিছিয়ে জনখুড়ো, পুলিশকর্তা গ্যাল্লার এবং আরও সব অফিসার তখনও জল্পনা করছেন। আমাদের সেখানে যাওয়ার বাধা ছিল না। কারণ আমরাই তো এই কাণ্ডের মূলে। উঁকি মেরে ম্যাপ দেখে জ্যোৎস্না বলল,–দেখছ জয়ন্তদা? ওয়েইকাপালি, ওয়াইকানালে আর মানিনিতোলা–এই তিনটে গুহার মধ্যে কেমন যোগাযোগ রয়েছে। এটা মিলিটারি ম্যাপ মনে হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য, যাঁরা গুহার ভেতর সার্ভে করে ম্যাপ এঁকেছেন, তার রাজা হোলাহুয়ার পাতালপুরীর হদিস পাননি! অথচ দেখে, কনটিকি এবং পিলির মূর্তি কোথায়, তাও ম্যাপে চিহ্ন দিয়ে বলা হয়েছে।
বব হঠাৎ লাফিয়ে উঠল–ইউরেকা।
পুলিশকর্তা গ্যান্সলার হাঁড়িপানা মুখ করে বললেন,–কী হে ছোকরা? লাফাচ্ছ কেন?
বব বলল,–তুয়া! তুয়াকে আনলেই তো সে পাতালপুরীতে নিয়ে যেতে পারে।
তুয়া! সেটা আবার কী বস্তু? গ্যান্সলার ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
জ্যোৎস্না বলল,–মিনিন। মারিয়া ঠাকমার মিনিহুনটার নাম তুয়া। তুয়াই তো আমাদের গাইড।
জনখুড়ো সোজা হয়ে বললেন,–মাই গড! এটা আমরা কেউ এতক্ষণ খেয়াল করিনি বব! শিগগির! ম্যাডাম মারিয়াকে গিয়ে বললো, এক্ষুনি ওঁর পোষা প্রাণীটিকে নিয়ে যেন চলে আসেন।
বব বলল,–তা যাচ্ছি। কিন্তু খুড়ো মশাই, তুয়াকে প্রাণী বলা কি ঠিক হচ্ছে?
জন ধমক দিয়ে বললেন,–সবটাতে তক্ক করা চইি! প্রাণী না তো কী? মিনিহুন আসলে অধুনালুপ্ত পলিনেশীয় বাঁদর। তবে তারা বুদ্ধিমান বাঁদর।
জ্যোৎস্না বলল,–অধুনালুপ্ত বলছেন কেন খুড়োমশাই? ফাদার গ্রিনকটের দেখা পেলে দেখবেন অসংখ্য মিনিন এখনও বেঁচে আছে পাতালপুরীতে।
বব পুলিশের মোটরবোটে চলে গেল। আমরা ওর ফিরে আসার পথে তাকিয়ে রইলাম। ইতিমধ্যে এসে গেল খবর শিকারী সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার আর টি.ভি. ক্যামেরা নিয়ে একদল লোক। মারকিন মুল্লুকে এদের প্রচুর স্বাধীনতা। পুলিশকে গ্রাহ্যও করে না। বরং পুলিশ জানে, এই সুযোগে তাদের নাম যেমন ছড়াবে, তেমনি টি.ভি-তে ঘরে ঘরে তাদের ছবিও লোকে দেখবে।
জনখুড়ো তাদের উদ্দেশে ঘোষণা করলেন,বন্ধুগণ! আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমাদের ‘পাতালপুরী অপারেশন’ শুরু হয়ে যাবে। এই পাতালপুরীতে আছেন এক ধুরন্ধর জীববিজ্ঞানী–তার নাম ফাদার গ্রিনকট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইনি বানরকে মানুষ এবং মানুষকে বানর করা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। শোনা যায়, হিটলারের হুকুমে তাকে জার্মান গুপ্তচরেরা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। হিটলারের উদ্দেশ্য ছিল, পৃথিবীর সব মানুষকে বার করে ছাড়বেন।
সবাই হেসে উঠল। জনখুড়োর সামনে গোটা পাঁচেক টিভি ক্যামেরার চোখ–এদিকে অনবরত ক্লিক-ক্লিক করে শাটার চলেছে কাগজের ফোটোগ্রাফারের। রিপোর্টাররা নোট করে যাচ্ছে কথাগুলো। আমিও কলকাতার প্রখ্যাত দৈনিক সত্যসেবকের রিপোর্টার। কিন্তু এদের আদিখ্যেতা দেখে হাসি পাচ্ছিল।
কতক্ষণ পরে বব ফিরে এল মারিয়া আর তুয়াকে নিয়ে তারপর ‘অপারেশন শুরু হল।
ওয়েইকাপালি গুহার ভেতর উজ্জ্বল আলো ফেলে সামনের সারিতে চলেছেন মারিয়া ও তুয়া, পেছনে সশস্ত্র পুলিশ হাতে সাবমেশিন গান, স্টেনগান, টমিমান, এমন কী কারুর হাতে গ্রেনেডও। তাদের পেছনে জনখুড়ো, আমি, বব ও জ্যোৎস্না। আমাদের পেছনে টিভি-র ক্যামেরা।
কনটিকির মূর্তি পেরিয়ে তুয়া বাঁয়ে ঘুরল। বাঁদিকে একটা সরু ফাটল। ফাটলে হাত ভরে সে একটা কিছু টানল। অমনি এবড়ো-খেবড়ো দেয়ালের খানিকটা অংশ ঘুরে গেল এবং ভেতরে এমনি চওড়া গুহাপথ দেখা গেল।
প্রায় আধঘণ্টা ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরে একখানে তুয়া ফের তেমনি একটা সরু ফাটলে হাত ভরে কী টানল। এখানেও দরজার মতো ফাঁক হয়ে গেল দেয়াল।
ভেতরে মসৃণ বারান্দার মতো চওড়া খানিকটা জায়গা। তার সামনে কারুকার্যখচিত সুন্দর দরজা। তুয়া দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। তীব্র মিঠে গন্ধ ভেসে এল। পাতালপুরীতে ঢুকলাম আমরা।
কিন্তু এখনও কোথাও আলো জ্বলছে না।
এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে তুয়া যেখানে নিয়ে এল, দেখেই চিনতে পারলাম। সেই যন্ত্রঘর। কাঁচের দেয়াল। কিন্তু কোথায় ফাদার গ্রিনকট? কোথায় তার মিনিহুনের দল? কোথায় বা সেইসব হিংস্র হায়েনার পাল?
রাজা হোলাবোয়ার পাতাপুৈরী স্তব্ধ নির্জন। যন্ত্রঘরে যন্ত্রগুলো আছে। কিন্তু বড়-বড় কাঁচের পাত্র থেকে বাষ্প উঠছে না। কোনো আলোও জ্বলছে না। তারপর তুয়ার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। তুয়া সেই গোলাকার মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে যোবা মানুষের মতো গলার ভেতর শব্দ করছে–কান্নার মতো শব্দ।
মঞ্চে একটা কালো ছাইয়ের বিরাট স্তূপ দেখা যাচ্ছে। মারিয়া চেঁচিয়ে উঠলেন, সর্বনাশ। শয়তানটা ওদের পারমাণবিক আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।
জন বললেন,–কাদের? মিনিহুনদের?
মারিয়া কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, হ্যাঁ। শয়তান গ্রিনকট ওদের পুড়িয়ে মেরে পালিয়েছে। তুয়া! তুয়া! কোথায় গেল গ্রিনকট, খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। প্রতিশোধ নিতে হবে বাছা!
তুয়া অমনি চলতে শুরু করল। তাকে অনুসরণ করলাম আমরা। হায়েনার খাঁচার পাশ দিয়ে যাবার সময় একই দৃশ্য দেখলাম। পলিনেশীয় এক বিচিত্র প্রজাতির হায়েনাদেরও সে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। একি জীববিজ্ঞানীর প্রতিহিংসা?
এবার অগ্নিদেবী পিলির মূর্তি সামনে পড়ল। তার ডাইনে সরু একটা গুহাপথ দিয়ে এগিয়ে বাইরের রোদ্দুর দেখা গেল।
তুয়া একটা ফাটল বেয়ে নামতে শুরু করল।
পিঁপড়ের সার যেমন করে নামে, তেমনি করে আমরা, পুলিশ-বাহিনী, সাংবাদিকরা, টিভির লোকেরা। নেমে গিয়ে মোটামুটি একটা সমতল বিশাল চাতালমতো জায়গায় পৌঁছিলাম।
হঠাৎ জ্যোৎস্না চেঁচিয়ে উঠল,–ও কী! বাবার সঙ্গে গ্রিনকট মারামারি করছে যে।
চাতালের আন্দাজ কুড়ি ফুট নীচে হ্রদের ধারে খানিকটা জায়গায় বালির বিচ। তার ওপর দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড বিক্রমে লড়ে যাচ্ছেন আংকল ড্রাম এবং ফাদার গ্রিনকট। জ্যোৎস্না লাফ দিয়ে যাচ্ছিল, তাকে ধরে আটকালাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে তুয়া ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে গ্রিনকটের ওপর।
ঢাকুচাচা ওপর দিকে তাকিয়ে আমাদের দেখে বিরাট হাসি হাসলেন। ঢাকের মতো গমগম করে বললে,–হুঁমুন্দিরে ধরছিলাম। এ বান্দরটা না আইলে অরে ডুবাইয়া ছাড়তাম ঠাণ্ডা পানিতে। হঃ! আমার নাম ঢাকু মিয়া! আমারে চেনে নাই হুমুন্দির পোলা।
হাসবো কী, তুয়া যা করল, দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
সে সরু লিকলিকে হাতে গ্রিনকটের গলা টিপে ধরে হ্যাঁচকা টানে ছুঁড়ে ফেলল হ্রদের জলে। তারপর জলের ভেতর হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল। একবারের জন্য ফাদার গ্রিনকটের পা দুটো দেখা গেল। তারপর তলিয়ে গেল চিরকালের মতো।
ঢাকুচাচা দেখতে-দেখতে বললেন,–হাঙরের পাল হুমুন্দিরে লইয়া গেল। যাউক! …
