হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

পালানোর চেষ্টা

 

মারিয়ার সঙ্গে জ্যোৎস্না ঠাকমা সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছে। কথায় কথায় গ্র্যান্ডমা বলে ডাকছে। ঠামার ঘরে আধুনিক যুগের আরামের সবরকম ব্যবস্থা আছে। জ্যোৎস্না দেখলাম ইতিমধ্যে ঘরের ভেতর কোথায় কী আছে, সব জেনে ফেলেছে। সে কফি বানাল নিজের হাতে। ঠাকমাকেও খাওয়াল। ঘড়িতে তখন বিকেল চারটে বেজেছে। জ্যোৎস্না আগেই দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে নিয়েছে মারিয়ার সঙ্গে। খেয়ে মারিয়া ফাদার গ্রিনকটের আদেশ পালন করতে গিয়েছিলেন–অর্থাৎ কি না আমার হৃৎপিণ্ড ওপড়াতে।

 

দু-দুটো পলিনেশীয় কলা খেয়ে আমার তখনও পেট ফুলে রয়েছে। অমন সাংঘাতিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল, তাতেও কলা দুটো পেটে হজম হয়নি। কী সাংঘাতিক এসব কলা।

 

আমরা তাড়াহুড়ো করছি না। কারণ মারিয়া ঠাকমা বলেছেন, গ্রিনকট কারুর হৃদপিণ্ড ওপড়ানোর দিন চব্বিশ ঘণ্টা তার যন্ত্র-ঘরে কাটায়। মিনিহুনের পাল তার সঙ্গে থাকে। কাজেই সামনের রাতটা পর্যন্ত আমরা নিশ্চিন্ত। কিন্তু তার মধ্যেই আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় খুঁজে বের করতে হবে বাইরে যাওয়ার পথ।

 

মাঝে মাঝে দমেও যাচ্ছি। ছত্রিশ বছর ধরে মারিয়া যখন বেরুনোর পথ খুঁজে পাননি, তখন মাত্র চৌদ্দ ঘণ্টা সময় হাতে নিয়ে আমরা কি পথটা খুঁজে পাব?

 

জ্যোৎস্না বলল,–আচ্ছা ঠাকমা। বাইরের লোকেরা হৃৎপিণ্ড কিনতে আসে বললে, তুমি কি লক্ষ করোনি, কোন পথে তারা যায়?

 

মারিয়া বললেন,–গ্রিনকট তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে। সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কিন্তু তখন আমার তাদের ধারে কাছে যাবার উপায় থাকে না। একদল মিনিহুন গ্রিনকটের ঘরের দরজায় পাহারা দেয়। তবে আড়ি পেতে শুনে যা বুঝেছি, মনে হয়েছে যে পূর্বদিকের কোনো একটা হ্রদে তারা মোটরবোট রেখে অপেক্ষা করে। তারপর গ্রিনকট সেখানে হাজির হয়। তাদের চোখ বেঁধে ফেলে মিনিহুনগুলো। ওই অবস্থায় কোনো সুড়ঙ্গপথে এই পাতালপুরীতে নিয়ে আসে।

 

শুনে লাফিয়ে উঠলাম।… ঠাকমা! আমি লেকটা দেখেছি। ওই সুড়ঙ্গপথেই আমি ঢুকেছিলাম পাতালপুরীতে।

 

মারিয়া বললেন,–কিন্তু সেটা খুঁজে বের করতে পারবে কি?

 

বললাম,–অগ্নিদেবী পিলির মূর্তি যেখানে আছে, সেখানে আমাকে বন্দী করেছিল মিনিহুনরা। মূর্তিটা কোথায় আছে আপনি জানেন?

 

মারিয়া বললেন,–জানি। কিন্তু মূর্তির ওধারে অজস্র সুড়ঙ্গপথ। আমি সব পথেই বাইরে যাবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। বেশির ভাগ সুড়ঙ্গপথই হঠাৎ শেষ হয়েছে। কোনোটার শেষে গভীর গর্ত এবং গর্তে জল ফুঁসছে।

 

আমি স্মরণ করার চেষ্টা করছিলাম, মূর্তি পর্যন্ত আসার সময় কতবার কোনদিকে বাঁক নিয়েছি। বললাম,–আর দেরি না করে বরং মূর্তিটার কাছে চলুন। আমার মনে পড়েছে, একটা জায়গায় বাঁদিকে ঘুরেছিলাম। বাকিটা সিধে নাক বরাবর এসেছিলাম। চলুন, চেষ্টা করে দেখি।

 

জ্যোৎস্না বলল,–ঠাকমা। যা নেবার গুছিয়ে একটা পোঁটলা করে নিন।

 

মারিয়া করুণ হেসে বললেন,–নেবার কিছু নেই। আমার জিনিসপত্র এবং পরিচিতিপত্র আর যা ছিল–সবই সেই প্লেনে রেখে এসেছিলাম।

 

আমি বললাম,–একটা আলো-টালো থাকলে বড় ভালো হত।

 

মারিয়া বললেন,–পাতালপুরীর যেসব আলো দেখছ, তা ফাদার গ্রিনকটের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র থেকে অদ্ভুত কৌশলে প্রতিফলিত করা হয়েছে একটুকরো সামুদ্রিক পাথরে। এ পাথর পাতালপুরীর যেখানে রাখবে অদৃশ্য আলো এসে প্রতিফলিত হবে তার ওপর।

 

জ্যোত্সা বলল,–লোকটা তাহলে প্রতিভাবান বিজ্ঞানী।

 

বললাম,–একটুকরো সেই পাথর পেলে ভালো হত তা হলে।

 

মারিয়া হাসলেন। … পাতালপুরীর বাইরে কিন্তু পাথরের ওপর প্রতিফলন ঘটবে না। কাজেই আমাদের অন্ধকারেই এগুতে হবে।

 

আমরা আর দেরি করলাম না। বেরিয়ে পড়লাম। মারিয়া ঠাকমা এ-ঘর ও-ঘর করে অনেক করিডোর পেরিয়ে নিয়ে চললেন। একখানে থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন,–সাবধান। সামনে যন্ত্রঘর। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হবে। কারণ ওটার দেয়ালের ওপরটা কাঁচের। আমাদের দেখতে পাবে ওরা।

 

আগে মারিয়া, তারপর জ্যোৎস্না শেষে আমি নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিলাম। শেষ প্রান্তে গিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড কৌতূহল হল, ভেতরে কী ঘটছে দেখে নিতে।

 

সাবধানে মুখটা তুললাম। ভেতরে উজ্জ্বল আলো দেখলাম। প্রকাণ্ড হলঘরের একদিকে গোল একটা মঞ্চ। মঞ্চে মিনিহুনেরা ভিড় করে বসে আছে। আর মঞ্চটা আস্তে-আস্তে ঘুরছে। ওদের ওপর একটা প্রচণ্ড লাল আলো এসে পড়ছে। ওদের লাল দেখাচ্ছে। ওরা যেন ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে।

 

সারা ঘরে আজব সব যন্ত্র, বড় বড় কাঁচের পাত্র। কোনোটাতে বাষ্প উঠছে।

 

তারপর দেখতে পেলাম ফাদার গ্রিনকটকে।

 

হলুদ রঙের অদ্ভুদ একটা পোশাক পরা লম্বা চওড়া দৈত্যের মতো এক বুড়ো দাঁড়িয়ে আছে একটা যন্ত্রের সামনে। চাবি টিপছে আর কী সব বলছে। তার মাথায় হলুদ টুপিও আছে। মুখে সাদা গোঁফ দাড়ি। কিন্তু কী মিঠে অমায়িক মুখের ভাব! হাসি লেগেই আছে।

 

জ্যোৎস্নার টানে ঝটপট মাথা নামিয়ে সরে গেলাম। কাঁচের দেয়াল শেষ হলে নীল আলোয় ভরা একটা করিডোর দেখা গেল। করিডোর পেরিয়ে ডাইনে একটা ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখি সেই ঘর–যেখানে আমাকে মিনিহুনরা ডাব ও কলা খাইয়েছিল।

 

এখনও সেগুলো পড়ে আছে। বুদ্ধি করে কলার কাঁদি দুটো নিলাম। ইশারায় জ্যোৎস্নাকে ডাবের কাদিটা নিতে বললাম। মারিয়া ঠাকমা একটু হাসলেন শুধু।

 

এ ঘর থেকে বেরিয়ে আবার একটা করিডোর। তারপর দরজা খুলতেই দেখি ঘন অন্ধকার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মারিয়া ফিসফিস করে বললেন, বাইরে থেকে এই দরজাটা খোলা যায় না। কিন্তু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা যায়।

 

আমার পকেটে লাইটার আছে। কিন্তু মারিয়া ঠাকমা লাইটার জ্বালতে নিষেধ করলেন। অন্ধকারে অনেকটা পথ গিয়ে তারপর মারিয়া ফিসফিস করে বললেন,–অগ্নিদেবী পিলির মূর্তিটা এখানেই কোথাও আছে।

 

লাইটার জ্বালালাম। সামনে বেদীর ওপর সেই হিংস্র দেবীমূর্তি। তার চোখ থেকে হিংসা ঠিকরে বেরুচ্ছে যেন। লাইটার নিভিয়ে বললাম,–এবার আমি আগে যাব। ঠামা, আপনারা আমার পেছনে আসুন।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *