হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

হিটাইট সীলমোহর

 

ঘরে ঢুকেই রুদ্ধশ্বাসে যা ঘটেছে বললুম। শুনে কর্নেল একটু হাসলেন। বললেন,–কিষাণচাঁদ ওরফে ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী সহজে ছাড়বে না। এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে।

 

অবাক হয়ে বললুম,–কেন? গুপ্তধনের সিন্দুক তো খালি! মিছিমিছি আর কেন সে ঝামেলা করতে চাইছে?

 

কর্নেল চাকতিটা দেখিয়ে বললেন,–জয়ন্ত, ভেবেছিলুম রাজা হেহয়ের গুপ্তধন রহস্যের পর্দা এতদিন খুলতে পেরেছি। কিন্তু তার বদলে দেখছি, রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল।

 

-বলেন কী!

 

–এই চাকতিটা লক্ষ করো। একটা ফুটো দেখতে পাচ্ছ। তাই না? আমার ধারণা, ব্রোঞ্জের এই চাকতি বা সীলমোহরটা রাজা হেহয়ের ঘোড়ার কপালে ঝোলানো ছিল। চাকতির হরফগুলোর পাঠোদ্ধার করা পণ্ডিতদের কাজ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ব্রোঞ্জের ফলকটা বা পাথরের সিন্দুকের গায়ে যে-চিত্রলিপি আমরা দেখেছি, এগুলো সেই ঢঙের চিত্রলিপি নয়। তুমি এই আতস কাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখতে পার এ কিছুতেই সিন্ধুসভ্যতার চিত্রলিপি নয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের।

 

আতস কাঁচের সাহায্যে ব্রোঞ্জের চাকতিটা দেখতে থাকলুম। হ্যাঁ, কর্নেল যা বলছেন তাই বটে।

 

-এই চাকতির মধ্যে দণ্ডধারী পুরুষটি নিশ্চয় রাজা। ব্রহ্মাবর্তের রাজা হেহয়। কী বলেন কর্নেল?

 

 

কর্নেল হেসে বললেন,–ব্যস! তা হলে তুমি তো পাঠোদ্ধার করেই ফেলেছ দেখছি। তোমাকে পণ্ডিতরা এবার বিদ্যাদিগগজ বাচস্পতি উপাধি দেবেন, জয়ন্ত! নাকি বিদ্যার্ণব–বিদ্যাবাগীশ, গোছের কিছু চাই তোমার?

 

ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম,–এটা একটা রামছাগলকে দেখান। বলবে, এই মূর্তিটা একজন রাজার। রাজার হাতে রাজদণ্ড থাকে না?

 

কে জানে।–বলে কর্নেল অন্যমনস্কভাবে ঘড়ি দেখলেন। তারপর হাই তুলে বললেন,– ডঃ করিম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা। তারপর বেরুব।

 

–কোথায় বেরুবেন? আবার ওই ঘোড়াভূতের আড্ডায় নাকি?

 

–হুম। কিন্তু তুমি ওকে এখনও ঘোড়াভূত বলছ কেন জয়ন্ত? বেচারী আসলে তো একজন মানুষ। রাজা হেহয়ের গুপ্তধনের লোভে এ পর্যন্ত কত মানুষ যে অমনি পাগল হয়ে গেছে, তার সংখ্যা নেই। এই হতভাগ্যের পরিচয় আর জানা সম্ভব নয়। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, সে পাগল হয়ে যাবার পর ওই এলাকার কোনো একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করছিল। আর শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ভেবেছিল, রাজা হেহয়ের সেই ঘোড়া!

 

–কিন্তু ওর গায়ের রঙ এত কালো হল কীভাবে?

 

–যে গুহায় ও ছিল, সম্ভবত সেই গুহায় কালো ছাই ভর্তি রয়েছে। কীসের ছাই, তাও এখানে ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে। শুনলে অবাক হবে, কারবন-১৪ নামে একরকম আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি আছে। তাতে প্রায় নিখুঁত হিসেব করে বলা যায়, জিনিসটি কত বছরের পুরনো। জানা গেছে, লোকটার গায়ে যে ছাই লেগে আছে, তা আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কাঠ পোড়ানো ছাই।

 

–বলেন কী! তাহলে মোহেনজোদাড়োতে যখন মানুষ বাস করত, তখনকার ছাই!

 

–হ্যাঁ জয়ন্ত। তখনকারই।

 

–কিন্তু গুহার মধ্যে কাঠ পুড়িয়েছিল কেন?

 

–সম্ভবত ওটা ছিল মোহেনজোদাড়োবাসীদের শ্মশান।

 

–গুহার মধ্যে শ্মশান! কেন?

 

–জয়ন্ত, সব দেশেই প্রাগৈতিহাসিক কালে গোপনে মৃতদেহের সৎকার করার প্রথা ছিল। সর্বত্র এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। লোকে বিশ্বাস করত, মৃতদের আত্মা শান্তিতে থাকতে চায়। তাই এমন নির্জন জায়গায় তাদের শেষকৃত্য করা হত–যাতে কোনো ক্রমেই জীবিত মানুষদের জীবনযাত্রার কোনো আওয়াজ তাদের কানে না পৌঁছয়। নইলে তাদের শান্তির ঘুম ভেঙে যাবে এবং বিরক্ত হয়ে জীবিতদের ক্ষতি করতে থাকবে। বুঝলে তো?

 

–বুঝলুম। কিন্তু এও বুঝলুম, আপনি সেই শ্মশান গুহা আবিষ্কার না করে ছাড়বেন না। কিন্তু একটু আগে সম্বর্ধনা সভায় যা ঘটল, তাতে কি আপনার একটুও ভয় হচ্ছে না?

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে শুধু মাথা দোলালেন।

 

–কিষাণচাঁদ ডাকুর হাতে নির্ঘাত এবার প্রাণটি খোয়াবেন দেখছি।

 

–তুমি কি খুব ভয় পেয়েছ, ডার্লিং?

 

–আলবাৎ পেয়েছি। সবসময় আমার বুকে ভূমিকম্প হচ্ছে!

 

কর্নেল হো হো করে হেসে উঠলেন। তত ভয়ের কারণ নেই জয়ন্ত! আমার বন্ধু কর্নেল কামাল খাঁ অতি ধুরন্ধর গোয়েন্দাসদার। কিষাণচাঁদের দলেও ওঁর এজেন্ট রয়েছে। কাজেই নিশ্চিন্তে গোঁফে তা দাও।

 

আমার গোঁফই নেই।

 

–গোঁফ রাখতে শুরু করো। .. বলে কর্নেল ফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। ফোন বাজছিল। কাকে কী জবাব দিয়ে বললেন,–ডঃ করিম এবং আমাদের প্রতিনিধিদলের নেতা ডঃ তিড়কে এসে গেছেন।

 

একটু পরেই ওঁরা দুজনে ঘরে ঢুকলেন। ডঃ তিড়কে কর্নেলের বয়সি। মস্ত গোঁফ আছে। লম্বা ঢ্যাঙা রোগাটে গড়নের মানুষ। একটু কুঁজোও। তিনজনে টেবিলে ঘিরে বসে চাকতিটা দেখতে ব্যস্ত হলেন। আমি কর্নেলের নির্দেশমতো কফির অর্ডার দিলুম ফোনে। ঘড়িতে এখন বাজছে দুপুর বারোটা। লাঞ্চ সেই একটায়।

 

একটু পরে প্রথমে মুখ খুললেন ডঃ তিড়কে।–এটা হিটাইট চিত্রলিপি মনে হচ্ছে।

 

ডঃ করিম বললেন,–হ্যাঁ, আমারও তাই ধারণা।

 

কর্নেল বললেন,–হিটাইট? পশ্চিম এশিয়াবাসি আর্যদের একটা শাখা ছিল ওরা তাই না?

 

ডঃ তিড়কে বললেন, হ্যাঁ, কর্নেল সরকার। হিটাইটরাও আর্য জনগোষ্ঠীভুক্ত ছিল। প্রথমে ওরাও বর্বর পশুপালক ছিল। অনেক প্রাচীন কৃষিকেন্দ্রিক নগরসভ্যতা ওরা ধ্বংস করেছিল। পরে ওরা ক্রমশ সভ্য হয়ে ওঠে। বাইবেলেও ওদের কথা আছে। সিরিয়ায় ওদের অনেক ফলক ও সীলমোহর পাওয়া গেছে।

 

ডঃ করিম বললেন,–হিটাইটরা নিজেদের দেশকে বলত হাট্টি বা হত্তি।

 

কর্নেল বললেন,–কিন্তু হিটাইট ভাষায় লেখা এই চাকতি রাজা হেহয়ের ঘোড়ার মাথায় ঝোলানো ছিল কেন? হেহয়কে তো উত্তর ভারতের ব্রহ্মাবর্ত রাজ্যের লোক বলা হয়। কোথায় সিরিয়া, কোথায় উত্তর ভারত!

 

ডঃ তিড়কে একটু ভেবে নিয়ে বললেন,–বড্ড গোলমেলে ব্যাপার, তা সত্যি। এই চাকতিতে কী লেখা আছে না জানা পর্যন্ত রহস্যভেদ করা যাচ্ছে না ড: করিম, চলুন বরং আপনার স্টাডিতে গিয়ে দুজনে কিছুক্ষণ মাথা ঘামানো যাক্। হিটাইট লিপির পাঠোদ্ধার তো জার্মান পণ্ডিত হেলমুথ থিওডোর বোসার্ট ১৯৪৬ সালে করে ফেলেছেন। কাজেই সেই সূত্র ধরে এগোলে আমরাও নিশ্চয় চাকতির লেখাগুলো পড়ে ফেলতে পারব।

 

ডঃ করিম বললেন,–কর্নেল সরকারকেও আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

 

কর্নেল সবিনয়ে হাসতে হাসতে বললেন,–ক্ষমা করবেন ডঃ করিম। আপনাদের কাজের সময় এই অপণ্ডিত মহামূখের উপস্থিতি অনেক বিঘ্ন ঘটাবে। আপনারা অনুগ্রহ করে সময়মতো জানাবেন, চাকতিতে কী লেখা আছে। ব্যস, তাহলেই যথেষ্ট।

 

চাকতি নিয়ে ওঁরা চলে গেলেন। দরজা লক করে এসে কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত আশা করি, বুঝতে পেরেছ যে রাজা হেহয়ের গুপ্তধনরহস্য কেন ঘনীভূত হয়েছে?

 

মাথা দুলিয়ে বললুম,–কিচ্ছু বুঝিনি।

 

–যে সিন্দুকটা আমরা গুপ্তধনের আধার বলে ভেবেছি, ওটা আসলে মৃত ঘোড়ার চোয়াল সংরক্ষণের জন্য প্রাচীন প্রথা অনুসারে তৈরি একটা পাথরের সিন্দুক।… কর্নেল ছাত্রকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতে থাকলেন। … একটা ব্যাপার গোড়াতেই আমাদের বুঝতে ভুল হয়েছিল। ব্রহ্মাবর্তরাজ হেহয়ের মাতৃভাষা কিছুতেই সিন্ধুভাষা ছিল না-হতেই পারে না। তিনি এখানে বিদেশি মাত্র। যদি গুপ্তধনের সঙ্কেত তিনি ফলকে লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে মাতৃভাষাতেই করা স্বাভাবিক ছিল। কাজেই এটা মোটেই রাজা হেহয়ের লিপি নয়। নিশ্চয় অন্য কারুর। তিনি স্থানীয় লিপিকারকে দিয়ে মোহেনজোদাড়োর ভাষায় লিখিয়ে নিয়েছিলেন, তাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে । কারণ তাতে দ্বিতীয় একজন গুপ্তধনের হদিস পেয়ে যাবে। কোন বুদ্ধিমান মানুষ এটা করবেন না।

 

–তা হলে?

 

-এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। কোনো মোহেনজোদাড়োবাসী সন্দেহবশে রাজা হেহয়ের পিছু নিয়েছিল এবং সে যা দেখেছিল, তা একটা ব্রোঞ্জের ফলকে লিপিবদ্ধ করেছিল। এবার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডঃ ভট্টাচার্যের অনুবাদটা পড়া যাক। কী দাঁড়াচ্ছে শোনো :

 

‘আমি দেখেছি : সৌরবর্ষের ষষ্ঠ মাসে চাঁদের প্রথম তিথিতে একজন লোক একটা ঘোড়া নিয়ে সিন্ধুনদের তীরে ত্রিকোণ ভূমিতে উপস্থিত হল। ঘোড়ার পিঠে একটা বাক্স ছিল। সে বাক্সটা শস্যক্ষেত্রের সীমানায় একটি বৃক্ষের নীচে পুঁতে রাখল।‘

 

বললুম,–‘আমি দেখেছি’-টা কোথায় পাচ্ছেন?

 

কর্নেল হতাশভঙ্গিতে বললেন,–তা হলে সব প্রাচীন লিপির ইতিহাস তোমাকে শোনাতে হয়। আপাতত সে-সময় হাতে নেই। শুধু জেনে রাখ, সব প্রাগৈতিহাসিক ফলক বা শিলালিপি বা সীলমোহর যা কিছু লেখা আছে, সবের গোড়ার ধরে নিতে হবে, কেউ কিছু বলছেন কিংবা ঘোষণা করছেন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি লেখা ব্যক্তিগত উক্তি। আজকালকার মতো নৈর্ব্যক্তিক নয়। কোনো পুরোহিত বা কোনো রাজা বা কেউ না কেউ কিছু স্থায়ীভাবে অন্যান্য মানুষকে জানাতেই ওগুলো লিখেছেন। নিজে না লিখুন, লিপিকারকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন। কাজেই সব লেখার গোড়ায় ‘আমি দেখেছি’ বা ‘আমি বলছি এই কথাটা ধরে নিতেই হবে। এই ফলকে একটা ঘটনার কথা লেখা রয়েছে। কাজেই …।

 

বাধা দিয়ে বললুম,–বেশ, তাই। তা হলে পাথরের বাক্সেও অবিকল একই লেখা এল কী ভাবে?

 

–এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। সে লোভ সামলাতে না পেরে রাজা হেহয় এবং তার ঘোড়াটিকেও হত্যা করেছিল। তারপর তখনকার প্রথা অনুসারে পালিত পশু হিসাবে ঘোড়ার চোয়াল একটা পাথরের সিন্দুকে ভরে ওই গুহায় সমাধিস্থ করেছিল। ঘোড়ার মাথায় ঝোলানো সীলমোহর বা চাকতিটাও সিন্দুকে রেখে দিয়েছিল। কারণ ওটা ঘোড়াটারই একটা সাজ।

 

–কিন্তু গুপ্তধন?

 

–বলছি। পাথরের সিন্দুকের গায়েও একই কথা লিখে রাখার কারণ : নিজের জীবনে যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, তার একটা বিবরণ আরও স্থায়ীভাবে রেখে যেতে চেয়েছিল সে। এবার গুপ্তধনের প্রসঙ্গে আসি। আমরা দুটো লেখাতেই কিন্তু এমন কোনো আভাস পাচ্ছি না, যাতে নিশ্চয় করে বলা যায় ঘোড়ার পিঠে সোনাদানা হীরা-জহরত ছিল। একটা বাক্স-জাতীয় জিনিস চিত্রলিপির ঘোড়ার পিঠে দেখছি এবং তিনটে ডালওয়ালা গাছের তলাতেও শুধু সেই বাক্সই দেখছি। একই চৌকোণা জিনিস এবং মধ্যিখানে একটা বিন্দুচিহ্ন।

 

–তা হলে কী এমন অমূল্য জিনিস ছিল বাক্সে, যা রাজা হেহয় কাকেও জানতে দিতে চাননি?

 

-বোঝা যাচ্ছে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছি মোহেনজোদাড়োবাসী লোভী ও খুনে লোকটি বাক্সর মধ্যে হিরে-জহরত সোনাদানা না পেয়ে নিরাশ হয়ে কিংবা পাপবোধে অনুতপ্ত হয়েই ঘটনাটা লিখে রেখেছিল।

 

–ভ্যাট! আরও গোলমাল হয়ে গেল সব। তিব্বতি মঠের পুঁথিতে বলা হয়েছে নাকি, রাজা হেহয় ধনরত্ন নিয়েই আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে।

 

–তিব্বতি মঠের সাধুরাও কি ওই লোকটির মতো ভুল করতে পারে না?

 

–হ্যাঁ! তা অবশ্য ঠিকই।

 

এই সময় ফের ফোন বাজল। কর্নেল ফোন তুলে কী শুনে নিয়ে বললেন,–অলরাইট। উই আর রেডি। তারপর ফোন রেখে বললেন,–জয়ন্ত, লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে। তৈরি হয়ে নাও।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *