হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
রাজা হেহয়ের গুপ্তধন
ইলিয়ট রোডে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে সেদিন দুপুর অব্দি কাটাতে হল আমাকে। কাপের পর কাপ কফি খেলুম এবং অসংখ্য প্রশ্ন করলুম। জবাবে যেটুকু জানলুম, তা আগেই যা জেনেছি তার একচুল বেশি নয়। অর্থাৎ বর্ধমানের এক গ্রামের জনৈক স্কুল শিক্ষক শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ি থেকে ব্রোঞ্জের ফলক চুরি গেছে। শচীনবাবু কবে এসে কর্নেলকে ধরে ছিলেন। কর্নেল কথা দিয়েছিলেন, চেষ্টা করবেন ফলকের হদিস পেতে। মনে হচ্ছে, পেয়েও গেছেন। ব্যস, এটুকুই।
কর্নেল ডঃ আলুওয়ালার আঁকা সেই স্কেচটার দিকে তাকিয়ে ধ্যানমগ্ন। কয়েকবার প্রশ্ন করে যখন জবাব আর পেলুম না, তখন বললুম,–বেলা হয়ে গেছে। আমি উঠি তাহলে।
কর্নেলের ধ্যান ভাঙল একথায়। বললেন,–আচ্ছা, জয়ন্ত! ফলকের স্কেচে এই চিহ্নটা দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার? বাঁদিক থেকে পঞ্চম চিহ্নটা।
তারপর স্কেচটা আমার সামনে এগিয়ে ধরলেন।

দেখে নিয়েই বললুম,–হনুমান ওটা। অবশ্য অনুমানের হনুমানও বলতে পারেন।
কর্নেল হেসে উঠলেন। বললেন, তা হলে ডঃ আলুওয়ালার পাঠোদ্ধারটা দাঁড়াচ্ছে : শস্য অধিকর্তাকে একটি সেরা জাতের হনুমান পাঠানো হল। এই তো? বৎস, হনুমান শস্যের যম। অতএব শস্য অধিকর্তার কাছে হনুমান পাঠিয়ে রসিকতা করেছিল কেউ!
–তা ছাড়া আর কী হতে পারে? ডঃ আলুওয়ালা ওটাকে কীভাবে বলদ ভাবলেন কে জানে! –আচ্ছা জয়ন্ত, ওটাকে ঘোড়া ভাবতে দোষ কী?
–কিন্তু ডঃ আলুওয়ালা তো বললেন, মোহেনজোদাড়োতে ঘোড়ার কোনো মূর্তি পাওয়া যায়নি। বুনো জন্তু-জানোয়ারের মূর্তি আছে। ঘোড়ার মতো উপকারি গৃহপালিত প্রাণীর মূর্তি কেন থাকবে না? তার মানে ঘোড়ার কথা কেউ জানত না। তাই ঘোড়ার চিহ্নই নেই।
–তা বটে। হরাপ্পাতে কুকুর আর মুরগির মূর্তি পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
–তা হলে বুঝতেই পারছেন, ওটা ঘোড়া নয়, হনুমান!
–হুম! জয়ন্ত তুমি শুনলে খুশি হবে যে ওখানে হনুমানের ছবিও পাওয়া গেছে।
লাফিয়ে উঠে বললুম,–তবে তো আর কথাই নেই। ওটা হনুমান। বাঁদিক থেকে চতুর্থ চিহ্নটা লক্ষ করুন না! হনুমানটার তাড়া খেয়ে একটা লোক পালাচ্ছে। এই লোকটাই শস্যঅধিকর্তা।
কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন,–শাবাশ জয়ন্ত, শাবাশ! প্রত্নতত্ত্ব দফতর তোমাকে যাতে পুরস্কৃত করেন, তার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু মুশকিল কী হয়েছে জানো? ডঃ পরমেশ্বর ভট্টাচার্যও এই ফলকটার পাঠোদ্ধার করেছেন বলে দাবি করেছিলেন। তার অনুবাদ একেবারে আলাদা। তোমাকে দেখাচ্ছি।
বলে কর্নেল উঠে টেবিলের দেরাজ থেকে একটা কালো জীর্ণ নোট বই বের করে আনলেন। নোট বই খুলে বললেন,–ডঃ ভট্টাচার্যের মতে প্রাচীন যুগের ভারতে প্রচলিত খরোষ্ঠী লিপির মতো সিন্ধুলিপি ডানদিক থেকে পড়তে হবে। সেইভাবে পড়ে উনি কী অনুবাদ করেছেন শোনো :
‘… প্রথম চিহ্নের অর্থ : সৌর বৎসরের ষষ্ঠ মাস। সূর্যের চাকার মধ্যে ছটা রেখা থাকায় ওটা হবে ষষ্ঠ মাস। দ্বিতীয় চিহ্নের অর্থ : চন্দ্রের প্রতিপদ। চন্দ্রকলার মধ্যে একটা দাঁড়ি রয়েছে। তৃতীয় চিহ্নের অর্থ : সিন্ধুনদের বাঁকের মধ্যবর্তী ত্রিকোণ ভূমি। চতুর্থ চিহ্নের অর্থ : ঘোড়া। পঞ্চম চিহ্নের অর্থ : মানুষ। ষষ্ঠ চিহ্নের অর্থ : খণ্ডিকৃত কৃষিজমি। সপ্তম চিহ্নের অর্থ : শস্য। অষ্টম চিহ্নের অর্থ : বৃক্ষমূলে প্রোথিত সম্পদ।
কথাগুলি বাক্যের আকারে সাজালে দাঁড়ায় : বৎসরের ষষ্ঠ মাসে চাঁদের প্রথম তিথিতে এক ব্যক্তি ঘোড়া নিয়ে সিন্ধুনদের বাঁকে ত্রিকোণ শস্যক্ষেত্রের সীমানায় এক বিশাল গাছের তলায় ধনসম্পদ পুঁতে রেখেছিল। ..
আমি চমকে উঠে বললুম,–গুপ্তধন! গুপ্তধন!
কর্নেল হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–ডঃ ভট্টাচার্যের ডাইরি থেকে পড়ে শোনাচ্ছি। শুনে যাও।
‘… রাখালদাসবাবুর সঙ্গে আমার এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। উনি আমার অনুবাদ যথার্থ বলে স্বীকার করেছেন। সিন্ধুনদ এখন মোহেনজোদাড়ো থেকে সামান্য দুরে সরে গেলেও ধ্বংসাবশেষের দু’মাইল দুরে প্রাচীন খাতের চিহ্ন আমরা দুজনেই দেখে এসেছি। অবিকল ওই তৃতীয় চিহ্নের মতো বাঁক দেখেছি। তিনকোণা জমিটার আয়তন আন্দাজ বারো একর। পোড়ো রুক্ষ জমি। ক্ষয়াখবুটে গুল্মে ঢাকা। রাখালদাস বলেছেন, প্রত্নদফতরের কর্তা জন মার্শালকে কথাটা বলবেন এবং ওই জায়গায় মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু করা হবে।‘ …
কর্নেল আবার কয়েকটা পাতা উল্টে গিয়ে পড়তে শুরু করলেন :
‘…আমাদের দুর্ভাগ্য। প্রবল বর্ষার জন্য খোঁড়ার কাজ একবছর পিছিয়ে গেল। তা ছাড়া জন মার্শালও বিশেষ উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। রাখালদাস বলেছিলেন তাঁর শরীর ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। শীঘ্র কলকাতায় ফিরতে চান। …
‘…রাখালদাস কাল চলে গেলেন দেশে। আমি স্টেশনে তাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসেছি। স্টেশন মাস্টার রামচন্দ্র আলুওয়ালার সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম। কথায় কথায় ঝোঁকের মুখে ওঁকে ব্রোঞ্জের ফলকটার কথা বলে ফেললাম। কাজটা ঠিক হল কিনা কে জানে! ভদ্রলোক কিন্তু পুরাতত্ত্বের ব্যাপারে খুব উৎসাহী। অনেক খোঁজখবর রাখেন। বললেন, সরকারি দফতরের ব্যাপার স্যাপারই এরকম। ওদের বিশ মাসে বছর। বরং আপনি যদি আমার সাহায্য চান, বলুন। মাটি কাটার লোক জোগাড় করে দেব। আমি বললুম ওখানে বেসরকারি লোককে মাটি কাটতে দেওয়া হবে না। আইনে বাধা আছে। তাই শুনে স্টেশনমাস্টার বললেন, তা হলে রাতে লুকিয়ে মাটি খোঁড়ার ব্যবস্থা করা যায়। আমার হাসি পেল। গুপ্তধনের কথা শুনেই ভদ্রলোক লোভে চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। বললুম, তা কি সম্ভব? এক রাতের কাজ নয়। কাজেই ধরা পড়ে যাবার চান্স আছে। আমারও চাকরি যাবে মশাই? এতে মিঃ আলুওয়ালা খুব নিরাশ হলেন।
‘…স্যার জন মার্শালকে কলকাতার অফিসে সব জানিয়ে আবার চিঠি লিখেছিলাম। আজ জবাব এসেছে। উনি এবার স্পষ্ট করে বলেছেন যে আমার পাঠোদ্ধার ভুল। তা ছাড়া ওই বিশেষ চিহ্নটা ঘোড়া নয়। সিন্ধুসভ্যতায় ঘোড়ার কথা অবান্তর। তখন প্রাক-আর্য যুগে ওখানে ঘোড়ার কথা কেউই জানত না। ঘোড়াকে বশ মানানো হয়েছিল মধ্য এশিয়ায়। সে সিন্ধুসভ্যতার যুগের অন্তত দেড় দুই হাজার বছর পরের কথা।
‘…হায়! কীভাবে বোঝাব, আমার অনুবাদ যথার্থ। মার্শাল কেন বুঝতে পারছেন না, এমনও তো হতে পারে, তারও আগে তিব্বত বা চীনে ঘোড়াকে বশ মানানো হয়ে থাকবে এবং কোনো দেশত্যাগী অথবা পলাতক রাজপুরুষ ঘোড়ার পিঠে ধনরত্ন নিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মোহেনজোদাড়ো শহরে! তিনিই ধনরত্ন ওইভাবে গুপ্তস্থানে পুঁতে রেখেছিলেন এবং সেই সংবাদ প্রাচীন প্রথামতো একটা ব্রোঞ্জের ফলকে খোদাই করেছিলেন–যাতে তার অবর্তমানে কেউ না কেউ ধনরত্নের সঙ্গতি করতে পারে।
‘… এই অনুমানের কারণ আছে। তিব্বতের মঠে এক পুরোনো পুঁথিতে লেখা আছে : মর্ম অর্থাৎ ব্রহ্মবংশোদ্ভূত রাজা হেহয় এক দুর্যোগের রাতে অশ্বসহ এই মঠে আশ্রয় নেন। তার সঙ্গে প্রচুর ধনরত্ন ছিল। বিবেকবান বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা ধনরত্ন ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে চলেন। তাই রাজা হেহয়কে পরামর্শ দেন, স্বরাজ্য ব্রহ্মাবর্তে ফিরে গিয়ে আপসে মিটমাট করুন। তা শুনে রাজা হেহয় ক্রুদ্ধ হয়ে মঠ ত্যাগ করেন।
‘…কোথায় গিয়েছিলেন হেহয়? নিশ্চয় মোহেনজোদাড়ো নামে দ্রাবিড় রাজ্যে। আমার ধারণা হেহয় থেকেই হয় কথাটির উদ্ভব। হয় মানে ঘোড়া। পুরাণে হয়গ্রীব অবতারের কথা আছে। সে কি ব্রহ্মবৰ্তরাজ হেহয়েরই উপাখ্যান? সম্ভবত রাজ্যে বিদ্রোহের ফলে হেহয়কে উত্তরে পালাতে হয়েছিল। আশ্রয় না পেয়ে সেখান থেকে তিনি কাশ্মীর ঘুরে দক্ষিণ-পশ্চিমে দ্রাবিড় রাজ্যের রাজধানীতে চলে আসেন। কাশ্মীরে একটি গিরিপথের নাম হোহো।…’
কর্নেল ডাইরিটি বন্ধ করে বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে ডঃ আলুওয়ালার ফলকচুরির উদ্দেশ্য সম্ভবত নিছক পুরাতত্ত্ব নয়, গুপ্তধন। পৈতৃক নেশার ব্যাপার।
বললুম,–কিন্তু মোহেনজোদাড়ো তো এখন পাকিস্তানে। আর কি সুবিধে করতে পারবেন ডঃ আলুওয়ালা?
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন,–জানি না। তবে সম্প্রতি একটা সুযোগ ওঁর সামনে এসেছে। সিমলাচুক্তি অনুসারে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের জ্ঞান আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারই ভিত্তিতে খুব শিগগিরি ভারত থেকে একদল পুরাতাত্ত্বিক পাকিস্তানে মোহেনজোদাড়ো এবং হরাপ্পা দেখতে যাচ্ছেন। খবরের কাগজের নোক হয়েও এ খবর রাখ না দেখে অবাক লাগছে বৎস!
বললুম,রোজ হাজার হাজার খবর বেরোয়। অত মনে থাকে না।
–তা স্বীকার করছি। … বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। একটু পায়চারি করলেন। তারপর বললেন,–পুরাতাত্ত্বিকদের সঙ্গে একদল সাংবাদিকও যাচ্ছেন শুনেছি। জয়ন্ত, তোমাকে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি। তুমি যেভাবে হোক, কর্তৃপক্ষকে রাজি করিয়ে দৈনিক সত্যসেবকের পক্ষ থেকে তোমার নামটা সেই দলে ঢোকাবার ব্যবস্থা করো। আর আমিও চেষ্টা করে দেখি, কোনো ফিকিরে নিজেকে ঢোকাতে পারি।
হাসতে-হাসতে বললুম-খুব সোজা রাস্তা আছে। আপনি তো ইদানীং ন্যাচারালিস্ট বা প্রকৃতিবিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন। দুর্লভ ও বিরলজাতের পাখি প্রজাপতি পোকামাকড় নিয়ে ধানাইপানাই করছেন বিস্তর। বিদেশি কাগজে অনেক প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন। মাকড়সা আর প্রজাপতি সম্পর্কে তো আপনার খুব মাথাব্যথা। কারণ নাকি, দুইয়ের মধ্যে খুনী ও জোচ্চোরদের প্রবৃত্তি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অতএব হে প্রাজ্ঞ ঘুঘু! আপনার অসুবিধেটা কোথায়? বিশেষ করে কেন্দ্রীয় দফতরে দিল্লিওয়ালারা অনেকেই তো আপনার বন্ধু। আপনি …
কর্নেল হাত তুলে থামিয়ে হাসতে বললেন,–যথেষ্ট, যথেষ্ট ডার্লিং। তোমার প্রদর্শিত পথেই আমি এগবো। ….
