হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

আবার মোহেনজোদাড়ো

 

রওনা হতে পাঁচটা বেজে গেল। রমিতার জন্য রুণ্ডি বাজার থেকে কয়েকটা সুন্দর পাথরের মালা আর একজোড়া সোনার দুল কিনে এনেছিলুম। সেগুলো পেয়ে রমিতা কি খুশি!

 

কিন্তু যাবার সময় সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,–ভাইজি এমন করে চলে যাবে জানলে ওই মরুভূমিতেই ফেলে রেখে আসতুম।

 

ওকে আদর করে বললুম,–বোনটি আমার! রাগ করো না। আবার দেখা হবে।

 

সে বেণী দুলিয়ে জোরে মাথা নেড়ে বলল,হবে না। বাইরের লোকের সঙ্গে আমাদের দুবার দেখা হয় না।

 

–বেশ। তা হলে মরে গিয়ে আমি তোমাদের দলে জন্মাব।

 

রমিতা কী বুঝল কে জানে, হঠাৎ, ভেংচি কেটে দৌড়ে চলে গেল তাবুর দিকে। কিছুক্ষণ পরে পাহাড়ের চড়াইয়ে ওঠার সময় ঘুরে নীচের উপত্যকার জিপসি,তাঁবুগুলোর দিকে তাকালুম। হঠাৎ দেখতে পেলুম, উপত্যকার পুবদিকের টিলার চূড়ার একটা পাথরের ওপর রমিতা দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে রুমাল নাড়ছে।

 

আমি হাত নেড়ে মনে মনে বললুম–বিদায় রমিতা! বিদায়! মন খারাপ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্যে। এই যাযাবর মানুষগুলোর সম্পর্কে কত ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে। ওরা নাকি চোর-ডাকাত, খুনে এবং জাদুকর।

 

মনে হল, সব মিথ্যা। ওদের চির-যাযাবর জীবনের আনন্দ, ওদের স্বাধীনতা আর বাধাবন্ধনহীন উদ্দাম জীবন দেখে ঈর্ষাবশত আমরা ওদের নামে বদনাম রটাই।

 

কিছুক্ষণ পরে আমাদের জিপ পৌঁছল একটা প্রশস্ত হাইওয়েতে। অজস্র যানবাহন যাতায়াত করছে। কর্নেল কামাল খাঁ জানালেন–এই হাইওয়ে লারকানায় পৌঁছেছে। উনি জিপ চালাচ্ছেন। কর্নেল ও আমি ওর ডানপাশে বসেছি। এতক্ষণে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করার সময় পেলাম। শেষ পর্যন্ত কী হল গুপ্তধনের?

 

কর্নেল বললেন,–হিটাইট সীলমোহরের অবিকল একটা নকল ভাগ্যিস আগেভাগেই তৈরি করিয়ে রেখেছিলুম। সেটা দেওয়া হয়েছে কিষাণচাঁদকে। চিত্রলিপি অদলবদল করা হয়েছে ডঃ তিড়কের সাহায্যে। ওই সূত্র ধরে কিষাণচাঁদ ফাঁদে পড়বে। কামালসাহেব ফাঁদ পেতে রেখেছেন। মোহেনজোদাড়োর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লুকিয়ে আছে ওঁর বাহিনী।

 

–গতরাতে দুহালার সেই গুহায় কি আমার খোঁজ করেননি আপনারা?

 

–করেছিলাম। তোমাকে পাইনি। তারপর …

 

-–থাক ও কথা। এবার হিটাইট সীলমোহরটার কথা বলুন।

 

–ওটা হিটাইটরাজ বার্নার সীলমোহর। ওটা একটা আদেশপত্র! তাতে লেখা আছে : ‘এতদ্বারা হিটাইটারাজ তাবার্না তার পুত্র হেহয়কে আদেশ দিচ্ছেন, প্রিয় সখা ইন্দিলম্মার অস্থিভস্ম সিন্ধুতীরবর্তী সূর্য-উপাসক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

 

বললুম,–কিন্তু হেহয় তো উত্তর ভারতের রাজা ছিলেন!

 

কর্নেল বললেন,–হ্যাঁ, ও ঘটনা আর্যদের আগমনের প্রথম যুগের। হিটাইটরাও আর্য। আর্যদের যে-গোষ্ঠীকে বলা হয় ইন্দো-ইরানীয়, তাদের উপাস্য দুই দেবতা অসুর ও দেবকে কেন্দ্র করে পরস্পর সংঘর্ষ বেধেছিল। দেব-ভক্ত আর্যগোষ্ঠী পালিয়ে এসে পশ্চিম ভারতে বসতি স্থাপন করে। অসুর-ভক্তরা ইরানে থেকে যায়। ওদিকে একদল হিটাইটও কাশ্মীর হয়ে ভারতে এসে বসতি করে। তাবার্নার পুত্র হেহয় ছিল এই গোষ্ঠীর নেতা। এ পর্যন্ত আমরা প্রমাণসিদ্ধ ইতিহাস পাচ্ছি। পরেরটুকু এই চাকতি থেকে অনুমান করে নিতে হয়েছে।

 

–বলুন, শুনি।

 

–সম্ভবত দেবভক্ত আর্যদের আর একটা দল সূর্য-উপাসক হয়ে ওঠে এবং দুহালায় গিয়ে বাস করতে থাকে। তাদেরই নেতার নাম ইন্দিলাম্মা। ইন্দি শব্দটাতে সিন্ধুর আভাস আছে। যাই হোক, ইন্দিলাম্মা হিটাইটরাজ তাবানার প্রিয় বন্ধু ছিলেন। হাট্টিদেশে বেড়াতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাই তাবার্না তার অস্থিভস্ম পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পুত্র হেহয়ের কাছে উত্তর ভারতে। এর পর কী ঘটেছিল, তিব্বতি মঠের পুঁথিতে পাওয়া যাচ্ছে। এখানে একটা কথা বলা দরকার। গৌতম বুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের। আর এ ঘটনা তার আড়াই হাজার বছর আগের। কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতদের মতে, বৌদ্ধধর্ম আরও প্রাচীন। গৌতম বুদ্ধ ১৯তম বুদ্ধ ছিলেন। কাজেই আর্যযুগেও বৌদ্ধ ছিল। তিব্বত অঞ্চলে। হেহয় এই সময় রাজ্যচ্যুতি হন এবং পিতৃ আদেশ পালন করতে ঘঘাড়ার পিঠে একটা বাক্সে ইন্দিলাম্মার চিতাভস্ম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। পশ্চিম-তিব্বত ঘুরে তিনি কাশ্মীর হয়ে পাঞ্জাব পেরিয়ে দুহালা পৌঁছানো নিরাপদ মনে করেছিলেন। তারপর যথাসময়ে তিনি পৌঁছান মোহেনজোদাড়ো শহরে। বাক্সে বিন্দুচিহ্ন মৃতের প্রতীক। শ্মশানগুহার জালার গায়ে এই চিহ্ন আমরা দেখেছি।

 

–কিন্তু তিনি অস্থিভস্মের বাক্স পুঁততে গেলেন কেন?

 

–ডঃ তিড়কে ব্রোঞ্জের সেই ফলকটা পরীক্ষা করে একটা কারণ খুঁজে পেয়েছেন। ঘোড়াটার যে চিত্রকল্প আঁকা হয়েছে, তা একটা রুগ্ন ঘোড়ারই। কারণ ঘোড়র পেটের দিকটায় টানা কয়েকটা রেখা আছে। ওগুলো পাঁজরের হাড় বেরিয়ে পড়া ঘোড়া। তা না হলে স্বাভাবিক নীতিতে অন্যান্য জীবজন্তুর ছবির মতোই পেটটা চৌকো করে আঁকা হত। কোন রেখার আঁকিবুকি থাকত না?

 

-খুব যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা। তারপর?

 

-ঘোড়াটা বাক্স বইতে পারছিল না। ওদিকে সম্ভবত দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত হেহয় দুহালা পৌঁছতে পারেননি। বিশ্রাম করতে চেয়েছিলেন মোহেনজোদাড়োতে। কিন্তু পবিত্র অস্থিভস্মের বাক্স দেখে লোকেরা কানাকানি শুরু করেছিল। পাছে বাক্সটা কেউ কেড়ে নিয়ে ধনরত্নের বদলে ছাই দেখে তা নষ্ট করে ফেলে, তাই হেহয় ওটা সেবারের মতো নির্জন কোনো গুপ্তস্থানে পুঁতে রাখতে গিয়েছিলেন। ঘোড়াটাও আর ভার বইতে পারছিল না। তার পক্ষে বাক্স বয়ে নিয়ে সৌর উপাসক সম্প্রদায়ের জনপদ খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। ফলে যা স্বাভাবিক, তাই করতে গেলেন এবং এক গুপ্ত অনুসরণকারীর পাল্লায় পড়লেন। আশা করি, আবার সব স্পষ্ট হয়েছে তোমার কাছে।

 

–হয়েছে। তা হলে অস্থিভস্মের জন্যেই এতকাল ধরে এত হাঙ্গামা আর খুনোখুনি? ভ্যাট! কোনো মানে হয়?

 

হ্যাঁ, জয়ন্ত। অলীক গুপ্তধনের নেশা। এ নেশা চিরকালের।

 

একটু পরে জিজ্ঞেস করলুম,–ফকিরসাহেব কোথায় আছেন?

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–করাচি রওনা হয়ে গেছেন। সেখান থেকে মক্কাতীর্থে যাবেন। সেখানেই বাকি জীবন সন্ন্যাসব্রতে কাটাবেন।

 

–একটা প্রশ্নের জবাব বাকি আছে।

 

–কী?

 

–কাল সন্ধ্যায় সব জেনেও কেন দুহালা অভিযানে গিয়েছিলেন? খামোকা যত রাজ্যের বিপদ আমাকেই ভুগিয়ে ছাড়লেন।

 

কর্নেল জোরে হাসলেন,–গিয়েছিলুম, শ্মশানগুহায় হেহয়ের বাক্সটারই সন্ধানে। সেই সঙ্গে বন্ধুবর কামাল খায়ের প্ল্যান ছিল দুর্ধর্ষ ডাকু কিষাণচাঁদকে বন্দি করা।

 

কর্নেল কামাল খাঁ বললেন,–কাল হাত ফসকে পালিয়েছিল। উটের পিঠে যে জয়ন্তবাবুকে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাটা, কীভাবে বুঝব? ব্যাটা ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ। দিব্যি উটওয়ালা সেজে নাকের ডগা দিয়ে চলে গেল। তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা। তবে আজ আর নিস্তার নেই। ফাঁদে পড়বেই।

 

বললুম,–আচ্ছা কর্নেল, অস্থিভস্মের বাক্সটা কি পেয়েছেন?

 

কর্নেল বললেন,–পেয়েছি। শ্মশানগুহায় একটা জালার মধ্যে ছিল। পাথরের বাক্স। দু ফুট চওড়া আড়াই ফুট লম্বা। মজার ব্যাপার, হেহয়ের হত্যাকারী এটা পৌঁছে দিয়ে থাকবে। সেই বাক্সের গায়েও অবিকল একই কথা লিখে রেখেছে সে। ব্রোঞ্জের ফলকে এবং ঘোড়ার চোয়াল রাখা সিন্দুকের গায়ে লেখা ছিল, হুবহু তাই। বোঝা যায়, খুব অনুতপ্ত হয়েছিল লোকটা।…

 

বাকি পথ আমরা চুপচাপ ছিলুম। জিপের গতি ক্রমশ বাড়ছিল। সাতটার মধ্যে পৌঁছে গেলুম লারকানায়। সেই হোটেলের পরিচিত ঘরে আমাদের পোঁছে দিয়ে কর্নেল কামাল খাঁ চলে গেলেন। অনেক রাতে কর্নেলের ডাকে ঘুম ভাঙল। কর্নেল বললেন,–সুসংবাদ ডার্লিং! এইমাত্র বন্ধুবর কামালের ফোন পেলুম। মোহেনজোদাভোর শস্যগোলার ওখানে কিষাণচাঁদ এবং তার সঙ্গীরা ধরা পড়েছে। এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোও। অনেক ভোগান্তি গেছে তোমার ওপর। তবু তোমার বাকি রাতের সুনিদ্রার কথা ভেবে তোমাকে এই খবর দেওয়া জরুরি ভেবেছিলুম। আর ডার্লিং জয়ন্ত, আগামীকাল সকালে আমরা সিন্ধুসভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাব। শুভরাত্রি। সুনিদ্রা সুখের হোক! ….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *