হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

জিপসি মেয়ে রমিতা

 

কিছুক্ষণ পরে দিগন্তের আকাশ লালচে হয়ে উঠছে, দেখে জানলুম ওটাই তাহলে পূর্বদিক। আমি উত্তর দিকেই এগিয়েছি। আমার পায়ের ছাপ দেখে সেটা বোঝা গেল। কিন্তু এবার সূর্য ওঠার সময় হয়েছে। দেখতে-দেখতে মরুভূমির সূর্য উঁকি দিল। লাল প্রকাণ্ড একটা চাকার মতো সূর্য। বুক শুকিয়ে গেল আতঙ্কে।

 

চাকাটা ক্রমশ বড় হতে-হতে এক লাফে মাটি ছাড়া হল। এক ভয়ংকর একচক্ষু দানব যেন আমাকে দেখতে পেয়েই লাল জিভ বের করে ঠোঁট চাটছে।

 

ওদিকে তাকাতে ভয় করছিল। তাই ঘুরে দক্ষিণে দৃষ্টি রাখলুম। তারপর এক আজব দৃশ্য দেখলুম। শূন্যে কী একটা কালো জিনিস ভাসছে।

 

জিনিসটা কাঁপতে কাঁপতে রঙ বদলাল ক্রমশ। মনে হল কী একটা প্রকাণ্ড চারঠেঙে প্রাণী দিগন্তের আকাশে নড়বড় করে পাখির মতো সাঁতার কাটছে।

 

একটু পরে দেখি, প্রাণীটা যেন একটা উট।

 

তা হলে কি মরুভূমিতে দিনের প্রথম মরীচিকা দেখতে পাচ্ছি আমি? মনে-মনে ঠিক করলুম, মরীচিৎকার দিকে তাকাবো না। মরীচিৎকার নাকি মায়া আছে। মানুষ বা প্রাণীকে আকর্ষণ করে নিয়ে যায় এবং পরিণামে ওই মিথ্যার পিছনে ছোটাছুটি করে মারা পড়তে হয়।

 

কিন্তু আবার দেখবার ইচ্ছে হল ব্যাপারটা। তখন ঘুরে, স্পষ্ট দেখলুম সত্যি সত্যি একটি উট দৌড়ে আসছে। উটের পিঠে একটা ছাতার মতো কিংবা নৌকার ছইয়ের মতো জিনিস চাপানো রয়েছে এবং তাতে দু-জন মানুষ বসে আছে।

 

মরীচিৎকার পিছনে মানুষ ছোট। কিন্তু এ যে দেখছি মরীচিকাই আমার দিকে ছুটে আসছে। হতবাক এবং অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইলুম।

 

ততক্ষণে সূর্যের রঙ সোনালি হয়ে উঠছে। দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু বালির সমুদ্রে তরল সোনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে যেন। ক্রমশ উত্তাপ জেগে উঠছে শীতল বালিতে।

 

উটটা দেখতে দেখতে এসে পড়ল কাছাকাছি। তখন দেখলুম সামনের দিকে বসে আছে একটি কিশোরী মেয়ে। তার হাতে উটের দড়ি। পিছনে বসে আছে এক বৃদ্ধ। ওরা আমাকে দেখতে পেয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছিল না।

 

তাই অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলুম,–বাঁচাও! বাঁচাও!

 

সঙ্গে সঙ্গে কিশোরীটি উটের দড়ি টেনে ধরল এবং উটটা মুখ উঁচুতে তুলে দাঁড়িয়ে গেল।

 

আবার চিৎকার করে বললুম,–বাঁচাও! বাঁচাও!

 

উট দৌড়তে শুরু করছে আমার দিকে। এ কখনও মরীচিকা হতে পারে না। মরীচিৎকার কোনো ছায়া পড়ে না। কিন্তু এই উট এবং তার আরোহীদের লম্বাটে ছায়া পড়েছে।

 

উটটা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। কিশোরীটি ড্যাবডেবে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ দুর্বোধ্য ভাষায় আমাকে কী বলল, বুঝতে পারলুম না। ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করলুম, পথ হারিয়ে বিপদে পড়েছি। আমাকে উদ্ধার করো।

 

উটকে ইশারা করতেই হাঁটু ভাজ করল। তখন বৃদ্ধ এবং কিশোরী নেমে দাঁড়াল। আমাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টে দেখে নিয়ে বৃদ্ধ এবার উর্দু ভাষায় বলল, তুমি কে? এখান কেমন করে এলে?

 

উর্দু আর হিন্দিতে তফাত খুব কম। আমি হিন্দিতেই জবাব দিলুম,আমি হিন্দুস্থানী। খবরের কাগজের লোক। দোশান মরুভূমি দেখতে এসে দিগভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। সারারাত ঘুরে মরছি।

 

বৃদ্ধ হাসল।–তাজ্জব কথা বটে। মরুভূমি দেখার শখ এত বেশি তোমার? ঠিক আছে। এসো আমাদের সঙ্গে। তবে আমার উটটা খুব ক্লান্ত। আগের রাতে আমরা গিয়েছিলুম এই মরুভূমির একটা তীর্থে। সেখানে এক পীরের দরগা আছে। সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছিলুম। কিন্তু উটটা পাজি। পথ ভুল করে উল্টোদিকে চলে গিয়েছিল। তাই সকাল হয়ে গেল। আমরা ফিরে যাচ্ছি রুণ্ডির বাজারে।

 

বৃদ্ধের গায়ে একটা হাতকাটা ফতুয়া, পরনে ঢিলেঢালা পাতলুন, কোমরে একপ্রস্থ কাপড় জড়ানো। মাথায় পাগড়ি আছে। তার কাছে একটা বল্লম আর সেকেলে গাদা বন্দুকও দেখতে পাচ্ছিলুম।

 

মেয়েটির পরনে একটা ঘাগরা। কোমরবন্ধ আছে। ফুলহাতা জামার ওপর একটা হাতকাটা ক্ষুদের জহরকোটের মতো সবুজ ও নকশাদার আঙরাখা চাপানো। পরনে সালোয়ার ও পায়ে নাগরা জুতো। তার চুল বেণীবাঁধা। মাথায় একটা রুমালও সুন্দরভাবে জড়ানো আছে। সে ফ্যালফ্যাল করে আমাকে দেখছে আর দেখছে।

 

সাজ-পোশাক দেখে মনে হল এরা কি জিপসিদলের নোক? তাই জিজ্ঞেস করলুম,–আপনারা কি রোমানি?

 

জিপসিরা নিজেদের রোমানি বলে। বৃদ্ধ জবাব দিল,–হ্যাঁ, আমরা রোমানি। আমাদের লোকেরা রুণ্ডি বাজারের ওখানে একটা মাঠে তাবু পেতেছে। আমি ওদের সর্দার। দলের জন্যে মানত দিতে গিয়েছিলুম। তা, তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, খাওয়া জোটেনি। ঠিক আছে। রোদ বেড়ে যাচ্ছে। উটের পিঠে যেতে-যেতে খেয়ে নেবে।

 

উটের পিঠে সুন্দর গদির আসন। ছইয়ের মতো একটা কাঠামো চাপানো। তিন দিক তেরপলের মতো শক্ত কাপড়ে ঘেরা। ছাদও রয়েছে। আরামে বসব ভাবলুম। কিন্তু উট চলতে শুরু করলে বেজায় ঝাঁকুনি টের পেলাম। শরীরের ব্যথা বেড়ে গেল।

 

বৃদ্ধ খুব দয়ালু। সে একটা টিফিন কেরিয়ার বের করে একটুকরো মোটা রুটি, খানিকটা জেলির মতো জিনিস আর একমুঠো কিসমিস দিল। বলল,–খেয়ে নাও। আর এই রইল জল। সবটাই খেয়ে নিতে পার। আর আমাদের জলের দরকার হবে না। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাব।

 

ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটিয়ে নিয়ে ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করলুম। কথায় কথায় জানা গেল, বৃদ্ধ সর্দারের নাম মেহেরু। ওর মেয়ের নাম রমিতা। ওরা রুণ্ডিবাজারে এসেছে দিন সাতেক আগে। তার আগে ওরা ছিল কাফরিস্তানে। সেটা বালুচিস্তান ও ইরানের মধ্যে একটা পাহাড়ি এলাকা। কাফরিস্তানে থাকার সময় ওদের তিনটে ভেড়া মারা পড়েছে অসুখে। রুণ্ডিতে এসে কয়েকটা মুরগি মারা পড়েছে। ওদের ধারণা, শয়তানের নজর পড়েছে ওদের দলের ওপর। তাই তিখারি মরূদ্যানের তীর্থে পুজো দিয়ে এল।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই রমিতার সঙ্গেও আমার খুব ভাব হয়ে গেল। আমি কোন দেশের লোক সে-দেশটা কেমন–সব খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করল। তারপর অবাক হয়ে গেল যেন। সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা সবুজ বাংলার ছবি ওর কল্পনায় আসছিল না। তারপর কলকাতার কথা উঠল। কলকাতার কথা ওরা শুনেছে। বড় আজব শহর পুবের দেশে নাকি। বাবা ও মেয়ে অজস্র প্রশ্ন করে কলকাতা শহরের কথা জেনে নিল। তারপর বুড়ো বলল,–কলকাতা না দেখে ওর মৃত্যু হবে না। দেখা চাই। তবে সে তো বহুদিনের রাস্তা। সেই যা সমস্যা। …

 

ঘণ্টা দেড়েক চলার পর দিগন্তে রুণ্ডি বাজারের বাড়িগুলো ভেসে থাকতে দেখা গেল। একটু ভয় হল এবার। কিষাণচাঁদ রুণ্ডির কথা বলছিল। ওখানে নিশ্চয় ওর লোকজন আছে। আমাকে কি তারা চিনতে পারবে?

 

আরও আধঘণ্টা চলার পর আমরা রুণ্ডি পৌঁছে গেলুম। রুক্ষ অনুর্বর পাহাড়ি এলাকা। কিছু কল-কারখানা আছে দেখলুম। শহরের বাইরে একটা উপত্যকায় জিপসিদের গোটা পাঁচেক তাবু রয়েছে। ছাগল-ভেড়া-দুম্বা আর মুরগির পাল আছে। বেঁটে কয়েকটা ঘোড়া আর উটও আছে। কুকুর আছে একডজন। আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করছিল কুকুরগুলো। দু-জন জোয়ান জিপসি তাদের তাড়া করে ভাগিয়ে দিল। তারপর তিরিশ-বত্রিশ জন ক্ষুদে ও বড় নানা বয়সের জিপসি নারী পুরুষ আমাকে ঘিরে ধরল। সর্দার মেহেরু তাদের অল্প কথায় ব্যাপারটা শুনিয়ে আমাকে তার তাবুতে নিয়ে গেল।

 

তাঁবুর মধ্যে একটা খাঁটিয়ায় সুন্দর বিছানা পাতা রয়েছে। আমাকে শুয়ে পড়তে বলল। একটু পরে রমিতা এল হাসতে-হাসতে। ভাঙা উর্দুতে বলল,–ভাইজি। আপনার স্নান করা দরকার। আমি জল এনেছি কুয়ো থেকে। স্নান করে নিন।

 

বেরিয়ে দেখি, তাঁবুর সামনে একটা টুল পেতে রেখেছে। দুটো প্লাস্টিক বালতিতে জল রয়েছে। রমিতার হাতে সাবানের কৌটো আর তোয়ালে। শুধু তাই নয়, একপ্রস্থ পোশাকও এনেছে।

 

টের পাচ্ছিলুম, জিপসিরা একালের শহরে মানুষের ব্যবহৃত সব জিনিসই ব্যবহার করে। স্নান করার পর শরীরের ব্যথা অনেকটা কমে গেল। রমিতা ছাগলের টাটকা দুধ এনে দিল এক গ্লাস। বলল,–ভাইজি, খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও। খাবার সময় হলে ডাকব।

 

চোখের পাতা জড়িয়ে আসছিল। আমার পরনে এখন জিপসি পোশাক। ঘুমিয়ে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলুম। মরুভূমির মধ্যে দুলতে দুলতে উটের পিঠে চলেছি তো চলেছি। রমিতা বলছে–ভাইজি! বাংলা মুল্লুক আর কতদূর।…

 

ঘুম ভেঙে দিল কার ভারী গলার ডাকাডাকিতে। তারপর চোখ খুলে কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারলুম না–কোথায় আছি।

 

–ডার্লিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।

 

সঙ্গে-সঙ্গে হুড়মুড় করে উঠে বসলুম। এই কণ্ঠস্বর এবং এই বাক্যটি বহুকালের পরিচিত।

 

দেখি, আমার খাঁটিয়ার পাশে একটা টুলে বসে আছে আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

 

নিশ্চয় আবার বিদঘুঁটে একটা স্বপ্ন দেখছি। চোখ কচলে বললুম,–আপনি কি সত্যিই কলকাতার ইলিয়ট রোডবাসী সেই বৃদ্ধ ঘুঘু?

 

–অবশ্যই সত্য, ডার্লিং!

 

–কিন্তু কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? জয়ন্ত তো কিষাণচাঁদের হাতে মারা পড়েছে। আমি জয়ন্ত নই! . দেখছেন না আমি একজন জিপসি।

 

–তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

 

–লজ্জা করেনি আপনার আমার কাছে আসতে? কাল সারারাত আমি মরুভূমিতে কী ভোগান

 

কর্নেল হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–সব শুনেছি। জয়ন্ত, আমাদের ক্ষমা করো। তোমাকে উদ্ধারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। সারাটা রাত পুরো একটা মিলিটারি কনভয় নিয়ে কর্নেল কামাল খাঁ আর আমি দোশান মরুভূমি তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছি। কিষাণচাঁদ যে । পথনির্দেশ দিয়েছিল, তা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যে। ওর নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই।

 

–আমি জিপসি তাবুতে আছি, কে বলল?

 

–তোমাকে সারারাত খোঁজাখুঁজি করে আমরা রুণ্ডির দিকে আসছিলুম। একস্থানে উটের পায়ের ছাপ দেখে সন্দেহ হল। পরীক্ষা করে দেখলুম, বালিতে কেউ শুয়েছিল। আশেপাশে কয়েকটা জুতোর ছাপও রয়েছে। তারপর উটের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আমাদের গাড়ি এগোল। ছাপ গেছে সোজা উত্তরে। তখন ভাবলুম, হয়তো কিষাণচাঁদ তোমাকে এখনও ছেড়ে দেয়নি। কোনো কারণে আরও কোনও তথ্য আদায় করতে চায়। যাই হোক, এইমাত্র রুণ্ডি পৌঁছে খবর নিতে শুরু করলুম।-দোশান থেকে কোনো উটওয়ালা এদিকে এসেছে নাকি। তারপর সেইসূত্রে এদের তাবুতে এসে দৈবাৎ তোমাকে পেয়ে গেলুম।

 

তাঁবুর সামনে ভিড় জমেছিল। দুজনে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, কর্নেল কামাল খাঁ একদল সেপাই নিয়ে আসছেন। জিপসিদের মুখে আতঙ্কের ছাপ পড়েছে। ব্যাপারটা কর্নেলকে বললুম। তখন তিনি ওদের উদ্দেশে ছোটখাটো একটা ভাষণ শুরু করলেন। কর্নেল যে এত চমৎকার উর্দু জানেন, কে জানত।

 

কর্নেলের বক্তৃতা শুনে ওরা খুশি হল। জিপসিরা খুব আমুদে। কেউ কেউ অতি উৎসাহে নাচগান জুড়ে দিল আমাদের ঘিরে।

 

ভিড় ঠেলে রমিতা এতক্ষণে এসে আমার হাত ধরল।–ভাইজি, তুমি নাকি চলে যাচ্ছ?

 

–যাচ্ছি বোন!

 

–বা রে! তোমার জন্যে খানার জোগাড় হয়েছে না? তুম আমাদের মেহমান (অতিথি)।

 

কর্নেল ওর চিবুক সস্নেহে নাড়া দিয়ে বললেন,–বেটি! এ বুড়ো বুঝি মেহমান নয়?

 

রমিতা সলজ্জ হেসে মাথা দুলিয়ে বলল,–হ্যাঁ, তুমিও মেহমান।

 

কর্নেল কামাল খাঁ ভিড়ে উঁকি মেরে বললেন,–আর আমি?

 

রমিতা ভেংচি কেটে বলল, তুমি তো মিলিটারি আদমি। মানুষ মারো। তুমি দূর হও এখুনি।

 

সর্দার মেহেরু বলল,–ছি, ছি বেটি! সবাই মেহমান। আজ সবাই খাবে। আজ আমাদের জীবনে একটা খুশির দিন। তিখারির পীরবাবা আমাদের দয়া করেছেন। তাই এত সব বড়া আদমি আমাদের তাঁবুতে এসেছেন।

 

বলে সে জিপসি ভাষায় ভিড়ের উদ্দেশে কিছু বলল। অমনি ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। কাঠের খুঁটি পুঁততে শুরু করল জোয়ানরা! তার ওপর রঙিন নকশাকাটা শামিয়ানা চড়াল। বুঝলুম, রীতিমতো একটা পার্টির আয়োজন হচ্ছে। কী সুন্দর ঝালরওয়ালা শামিয়ানা!

 

একটু তফাতে তেরপলের ছাউনির তলায় উনুনে বড়-বড় পাত্রে রান্না চাপল। যাকে বলে কমিউনিটি ভোজ। একসঙ্গে ওরা খায়। এখন হঠাৎ মেহমান এসে পড়ায় বাড়তি খাদ্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। দুজন জোয়ান একটা মস্ত দুম্বা নিয়ে গেল টানতে টানতে। নিশ্চয় ওই দুম্বার মাংসে অতিথিদের সেবা হবে।

 

গতিক দেখে কর্নেল কামাল খাঁ ওঁর দলবলকে ধমক-ধামক দিয়ে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিলেন। পঞ্চাশজন সেপাইয়ের খাবার জোগানো এদের ওপর অত্যাচারের শামিল হত। জনা দুই মিলিটারি অফিসার এবং স্বয়ং কামাল খাঁ রয়ে গেলেন। একটা জিপ থাকল। জিপ ঘিরে জিপসি ছেলেমেয়েরা খেলা জুড়ে দিল। উজ্জ্বল রৌদ্রে বিশাল নীল আকাশের তলায় রঙিন পোশাকপরা ছেলেমেয়েদের মনে হচ্ছিল প্রজাপতির ঝক।

 

এদিকে তাবুর সামনে একদল যুবক-যুবতী। গিটারের বাজনার সঙ্গে নাচগান শুরু করেছে। দেখলুম, বিশালদেহী কর্নেল কামাল খাঁকে ওরা টানতে টানতে ভেতরে ঢোকাল। তারপর তাজ্জব হয়ে গেলুম। মাথার ওপরে একটা হাত ঘুরিয়ে এবং মাঝে মাঝে গোঁফে তা দিয়ে ভুড়ি দুলিয়ে ও কোমর ঘুরিয়ে গোয়েন্দা দফতরের মিলিটারি অধিকর্তা সে কী নাচ নাচছেন!

 

হঠাৎ রমিতা দৌড়ে এসে কর্নেল বুড়োকে হ্যাঁচকা টান দিল।

 

তারপর দেখলুম, বুড়ো আসরে ঢুকে গেছেন। এবং দিব্যি নাচ শুরু করেছেন। কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের নাচ দেখব, সে কি স্বপ্নেও ভেবেছিলুম?

 

ওদের নাচগান চলতে থাকল। সর্দার মেহেরু আমাকে নিয়ে গেল ওর সেই তাবুতে। তারপর বলল,–তুমি কমজোর হয়ে গেছ, বেটা। তুমি রোদে ঘুরো না। চুপচাপ শুয়ে থাকো। খেতে একটু দেরিই হবে। ততক্ষণ তুমি আংরেজি কেতাবটা পড়তে পার।

 

বইটা দেখে অবাক হলুম। জাঁ পল সাত্রের লেখা ফরাসি বইয়ের ইংরাজি অনুবাদ : দা জিপসিজ। বললুম, এই বই কোথায় পেলেন সর্দারজি?

 

মেহেরু বলল,–এক সাহেব দিয়েছিল। আমাদের খবরা-খবর জানতে এসেছিল। তখন আমরা কাফ্রিস্তানে ছিলুম। ওটা তুমি ইচ্ছে করলে নিতে পার। আমরা কী করব ও নিয়ে?

 

বইটা পড়তে শুরু করলুম। অনেক খবর জানা গেল। এরা আসলে ভারতেরই বাসিন্দা ছিল কোনো যুগে। এদের ভাষায় হিন্দুস্থানী শব্দ প্রচুর। রোমানি কথাটা এসেছে সংস্কৃত রম্যানি’ থেকে। তার মানে ভ্রমণকারী। ফার্সিতে রম্ মানেও ভ্রমণ। রতা’ মানে বেড়াচ্ছে।

 

তাহলে রমিতার মানে দাঁড়ায়-যে মেয়ে সারাজীবন বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়াবে বলে জন্মেছে। হায়, আমি যদি একজন জিপসি হতুম, রমিতা হত আমার ছোটবোন!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *